ছোটো গল্পঃ ল্যাংড়া - প্রকল্প ভট্টাচার্য


“ফজলি… হিমসাগর… আলফানসো… গোপালভোগ… ল্যাং-ড়া!”

কে বা কারা শুরু করেছিল জানি না, তবে আওয়াজটা মাঠের এককোণ থেকে গুনগুন করতে করতে সারা মাঠে ছড়িয়ে গেল। বেলেডাঙা শিক্ষায়তনের ছেলেরা চেঁচাচ্ছিল আনন্দে, আর আমাদের কনকলতা বিদ্যালয়ের ছাত্ররাও চেঁচাতে আরম্ভ করল দুঃখে আর হতাশায়।

দুঃখের কারণ ছিল বৈকি। এই জগবন্ধু স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আমাদের কাছে অত্যন্ত সম্মানের একটা প্রতিযোগিতা। সারাবছর আমরা এর জন্যই অপেক্ষা করে থাকি। বেলেডাঙা গত দু-বছরের চ্যাম্পিয়ন, তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়নও প্রায় হতে চলল বলে। আর আমরা কোনোবার সেমিফাইনালেও উঠিনি। এইবছর অসম্ভব ভালো খেলে প্রথমবার ফাইনালে খেলছি। আমাদের পিটি-স্যার উদয়নদা এই বছরই অবসর নেবেন। প্রতিযোগিতার শুরুতে আমাদের ডেকে প্রায় হাতজোড় করে বলেছিলেন, “বাবারা, আমার সারাজীবনের স্বপ্ন স্কুলকে একবার টুর্নামেন্টটা জেতাব। তোরা সেটা হতে দিবি না?”

আমাদের ক্যাপ্টেন তুষার বলেছিল, “আমরা জান লড়িয়ে দেব স্যার! এটাই হবে আমাদের গুরুদক্ষিণা।”

তা দিয়েওছিলাম আমরা। তুষার নিজেই যেমন ব্যাটিং তেমন বোলিং করে ধ্বসিয়ে দিয়েছে একের পর এক নামজাদা টিমকে। আমরাও যথাসাধ্য তার সঙ্গ দিয়েছি। কিন্তু সেমিফাইনালের শেষের দিকে একটা প্রায় অসম্ভব ক্যাচ ধরতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে গিয়ে কব্জির হাড়টা ভাঙল, আর…

আর আমাদের স্বপ্নেরও প্রায় ভরাডুবি হতে চলল।

ভাইস ক্যাপ্টেন আমি। আমাকে আলাদা ডেকে হেডস্যার সদানন্দবাবুও বললেন যেন আমরা ফাইনালটা জিতি। আমি মাথা নেড়েছিলাম বটে, কিন্তু জানতাম তুষারকে ছাড়া কাজটা খুব কঠিন হবে। বিশেষ করে দলের টুয়েলভথ ম্যান ল্যাংড়াকে যখন খেলাতে হবে।

ল্যাংড়ার আসল নামটা আমরা সকলেই ভুলে গেছি। এই বছরই ভর্তি হয়েছে আমাদের স্কুলে। চুপচাপ ছেলে, কথা কম বলে শুধু হাসে। বাঁ পা-টা একটু টেনে টেনে চলে বলে শুরুতেই ওর ডাকনাম হয়ে গেল ল্যাংড়া, আর ও সেটা মেনেও নিল। সাড়া দিত, হাসত। আমরাও দিব্যি ওকে ল্যাংড়া বলে ডাকতে লাগলাম। একদিন সদানন্দবাবু শুনতে পেয়ে আমাদের খুব বকাবকি করলেন, কারো শারীরিক সমস্যা নিয়ে হাসি মশকরা করা মোটেই উচিত কাজ নয়। এও বললেন, ওকে কেউ কোনোদিন ল্যাংড়া বলে ডাকছে শুনলে উনি ভীষণ শাস্তি দেবেন। কিন্তু ল্যাংড়াকে ল্যাংড়া ছাড়া অন্য নামে ডাকা যায় নাকি! তাই কিছুদিন আমরা ওকে আর ডাকতামও না। তারপর শুরু হল ওকে ‘ফজলি, হিমসাগর, আলফানসো, গোপালভোগ’ এইসব বলে ডাকা। ল্যাংড়া নির্বিকার। তাতেও সাড়া দিত, হাসত। নির্বিরোধী ভালো মানুষ হলে যা হয় আর কী।

বেশ চলছিল। মুশকিল হল উদয়নদা যখন ওকে ক্রিকেট টিমে ঢুকিয়ে নিলেন। পায়ের সমস্যার কারণে ল্যাংড়া জোরে ছুটতে পারত না, তবে ক্লোজ ইন ফিল্ডিংটা দুর্দান্ত করত। স্লিপ বা ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে অসম্ভব রিফ্লেক্সে কিছু ক্যাচ ধরে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তবে ওকে ব্যাটিং বোলিং দেওয়া হত না, টুয়েলভথ ম্যান হিসেবে কারো পরিবর্তে ফিল্ডিং করত শুধু। প্র্যাকটিসেও কোনোদিন আমরা ওকে ব্যাট-বল দিয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। ধরেই নেওয়া হয়েছিল, ও শুধু ফিল্ডার।

তুষারের কব্জি ভেঙে যেতে নিরুপায় হয়ে আমরা ল্যাংড়াকে আজ দলে নিয়েছি। টসে জিতে বেলেডাঙা তুখোড় ব্যাট করেছে, কুড়ি ওভারে একশো পঁয়ত্রিশ! সব বোলাররাই পিটুনি খেয়েছি। ল্যাংড়া ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে একটা ভালো ক্যাচ ধরলেও এক ওভার স্পিন বোলিং করতে গিয়ে বারো রান দিয়েছে। ওকে আর বোলিং দেওয়ার সাহস হয়নি আমার।

হাতে প্লাস্টার নিয়ে তুষারও খেলা দেখতে এসেছে, হেডস্যারের পাশেই বসেছে।

ইনিংস ব্রেকে উদয়নদা আমাদের বললেন, “দ্যাখো, কঠিন হলেও জেতা সম্ভব। শুরুতেই উইকেট হারিও না। ওপেনার শ্যামল আর রঞ্জিত একটু ধরে খেলিস বাবারা।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই ম্যাচটা এখন তোর হাতে বাবা সুতীর্থ। তুষার খেলছে না, এখন কেউ বাঁচাতে পারলে একমাত্র তুইই পারবি।”

তুষার প্রায় ছলছল চোখে আমাদের উৎসাহ দিল। সব শুনে-টুনে ব্যাট করতে নেমে প্রথম বলেই রঞ্জিত গেল আউট হয়ে।

বেলেডাঙার কান ফাটানো চিৎকার, তুষারের মাথা নীচু, উদয়নদার মুখ শুকনো, সদানন্দবাবুর চোখে জলーএইসব দেখতে দেখতে ওয়ান ডাউন ব্যাট করতে নামলাম আমি। জীবনে অত ফোকাস করে খেলিনি। একটু হাত সেট হতেই রান আসতে শুরু করল। শ্যামলের সঙ্গে পার্টনারশিপটা সবে দানা বাঁধছে, ছয় মারতে গিয়ে শ্যামল বাউন্ডারিতে ক্যাচ আউট হয়ে গেল।

সুনীল, আব্দুল, বিশে সকলেই কিছু কিছু রান করল, কিন্তু আমরা কিছুতেই একটা ভালো পার্টনারশিপ বানাতে পারছিলাম না। আট উইকেট পড়ে গেল বিরাশি রানেই। নামল কাদির। এ বলটা খুব ভালো করে, কিন্তু মোটেই ব্যাট করতে পারে না। এই টুর্নামেন্টে আগে কখনো একে ব্যাট করতেও হয়নি। আমি দেখলাম গতিক সুবিধার নয়, তাই ওকে স্ট্রাইক নিতে না দিয়ে হাত খুলে পেটাতে আরম্ভ করলাম। আমার হাফ সেঞ্চুরি হয়ে গেল, কিন্তু দর্শকদের দিকে ব্যাট তুলতেও ইচ্ছা করল না।

উনিশ ওভারের যখন এক বল বাকি, আমাদের রান একশো কুড়ি। আমাদের লড়াই দেখে একটু আগে যারা উঠে চলে যাচ্ছিল তারা মাঠে ফিরে আসছে, বেলেডাঙাও আর অত চিৎকার করতে পারছে না। বরং আমরাই কিছু হাততালি সমর্থন পাচ্ছি। ওভারের শেষ বলে এক রান নিয়ে স্ট্রাইক রাখব ভেবেছিলাম, কিন্তু দৌড়তে গিয়ে কাদির মাঝ পিচে পা পিছলে পড়ে গেল, আর রান আউট হয়ে গেল!

সারা মাঠ দমবন্ধ। শেষ ব্যাটসম্যান ল্যাংড়া নামছে মাঠে, আর ওকেই স্ট্রাইক নিতে হবে। সক্কলে আওয়াজ দিচ্ছে, “ফজলি… হিমসাগর… আলফানসো… গোপালভোগ… ল্যাং-ড়া!” তুষারের দিকে তাকানো যাচ্ছে না, সদানন্দবাবু গম্ভীর, শুধু উদয়নদা চিৎকার করে আমাকে উৎসাহ দিচ্ছেন, “কাম অন সুতীর্থ, ইউ ক্যান ডু ইট!”

আর ‘ডু ইট!’ ল্যাংড়ার কাছে গিয়ে বললাম “ভাই, আমাদের জিততেই হবে। এক ওভারে ষোলো রান চাই। কোনোমতে ব্যাটে বলে লাগিয়ে আমাকে স্ট্রাইক দে। দেখি কতদূর কী করতে পারি।”

ল্যাংড়া তার সেই নির্বিকার হাসিটা হেসে বলল, “আমার বাবা এসেছে আমার খেলা দেখবে বলে। হুই যে বসে আছে।”

শুনে খুব রাগ হল। তখন আমার ওর বাবাকে দেখবার কোনো আগ্রহ ছিল না। মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য কথা না বাড়িয়ে নন-স্ট্রাইকারে গিয়ে দাঁড়ালাম। বোলারের হাত থেকে বল রিলিজ হলেই দৌড় শুরু করব।

বেলেডাঙার সেরা বোলার বিজয় নির্ঘাত ল্যাংড়ার স্টান্স আর বডি ল্যাংগুয়েজ দেখে বুঝেছিল যে এ একেবারেই হেলাফেলার খেলোয়াড়, আর ম্যাচটা তারা জিতেই গেছে প্রায়। ছোটো রান আপ নিয়ে মাঝারি পেসে একটা বল করল। কী আশ্চর্য, অদ্ভুতভাবে ফ্রন্ট ফুটে গিয়ে ল্যাংড়া একটা ক্লাসিক কভার ড্রাইভ করল! সারা মাঠ হাততালি দিয়ে উঠল, আর আমিও, “ল্যাংড়া, টু!” বলে রান নিতে শুরু করলাম। নেহাত সুইপার কভার ডাইভ দিয়ে আটকাল, নয়তো চারই হত। দুই রান হলো। আর পাঁচ বলে চোদ্দ রান দরকার।

পরের বল। বিজয় বেশ অপমানিত হয়ে একটা ফুল পেসে বাউন্সার দিল, ল্যাংড়া মাথা সরিয়ে নিল। নির্ঘাত নো বল ডাকা উচিত, কিন্তু আম্পায়ার কিছুই বললেন না। আমি বুঝতে পারলাম এবার ওরা নোংরামি শুরু করবে। অসহায় হয়ে ল্যাংড়ার কাছে গিয়ে বললাম, “স্টেডি। চার বলে চোদ্দ। তুই এক রান নিয়ে আমাকে স্ট্রাইক দে, তিন বলে তেরো রান করা সম্ভব। আমাদের জিততেই হবে!”

ল্যাংড়া কিছু বলল না, কিন্তু আশ্চর্য, হাসলও না। কেমন যেন অদ্ভুত চোখে তাকাল আমার দিকে।

পরের বল, যথারীতি আবার বাউন্সার! কিন্তু সবাইকে হতবাক করে ল্যাংড়া হুক করল এবং বলটা বোর্ডে মধুস্যারের আঁকা প্যারাবোলার মতো উড়ে গিয়ে পড়ল মাঠের বাইরে! ছক্কা! অবিশ্বাস্য এক মুহূর্ত নীরবতার পর সারা মাঠে হাততালিতে ফেটে পড়ল। সদানন্দবাবুর হুমকি ভুলে সক্কলে “ল্যাং-ড়া! ল্যাং-ড়া!!” চিৎকারে মাঠ কাঁপাতে লাগল। ল্যাংড়া নির্বিকার। আমি চেঁচিয়ে বললাম, “গ্রেট শট! আর তিন বল, আট রান।”

বিজয়ের রান আপ দেখেই বোঝা গেল সে অসম্ভব রেগে গেছে। যা ভেবেছিলাম, একটা খুনি ইয়র্কার এল। ঠিক সময়ে ব্যাট নামিয়ে ল্যাংড়া থার্ড ম্যানের দিকে পাঠিয়েই আমাকে বলল, “সুতীর্থ, টু!”

আমি ভেবেছিলাম এক রান নিয়ে স্ট্রাইক নেব, কিন্তু ওর স্বরে এমন একটা কনফিডেন্স ছিল যে আবার ছুটে দুই রান নিলাম। ল্যাংড়া জোরে ছুটতে পারে না, বেচারা হাঁফাচ্ছিল। তবুও ক্রিজে পৌঁছে আমার দিকে তাকিয়ে একটা জয়ের হাসি হাসল। আমিও হাসলাম ওর দিকে তাকিয়ে, সম্ভবত এই প্রথমবার। দুই বল, ছয় রান দরকার।

গোটা ম্যাচে এই প্রথম মনে হল বেলেডাঙা চিন্তায় পড়েছে। অনেকখানি সময় নিয়ে ফিল্ড সাজাল, বিজয়ের সঙ্গে ওদের ক্যাপ্টেন অনিরুদ্ধ কীসব আলোচনা করল। তারপর বিজয় রান আপ শুরু করল। গোটা মাঠ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। স্লোয়ার, গুড লেংথ বল। এবার ল্যাংড়া আরো সুন্দর ফুটওয়ার্কে অসাধারণ স্কোয়ার ড্রাইভ করল। সব ফিল্ডারদের দাঁড় করিয়ে রেখে বল তিরের মতো ছুটে চলে গেল বাউন্ডারির বাইরে। চার রান।

আমার চোখে কেমন যেন সব ঝাপসা দেখাচ্ছিল। আবছা দেখতে পাচ্ছিলাম, কব্জির ব্যথা ভুলে তুষার হাত তুলে নাচছে, সদানন্দবাবু উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন, আর উদয়নদা পাগলের মতো লাফাচ্ছেনーসারা মাঠে সকলের মুখে একটাই আওয়াজ, “ল্যাং-ড়া! ল্যাং-ড়া!!”

এক বল বাকি। এক রান হলে টাই, দুই হলেই জিত! তুমুল আওয়াজের মধ্যে বিজয় বল করল ঠিক ল্যাংড়ার পা লক্ষ্য করে। লেগ সাইডে ব্যাটে বলে হতেই আমরা ছুটতে শুরু করলাম। এক রান নিয়ে ঘুরে দেখি ল্যাংড়া খুব কষ্ট করে দৌড়চ্ছে। আমি সাইড চেঞ্জ করতে করতে, “কাম অন ল্যাংড়া!” বললাম, ও প্রাণপণে খচমচ করে দ্বিতীয় রানের জন্য ছুটল। ততক্ষণে ফিল্ডার বলটা ধরে ছুড়ে দিয়েছে। আমি যেন ঠিক সিনেমার মতো স্লো মোশনে দেখলাম, উইকেট কিপার বলটা ধরে স্ট্যাম্প ভাঙার ঠিক আগের মুহূর্তে ল্যাংড়া ডাইভ দিয়ে হাতের ব্যাটটা ক্রিজে ঢুকিয়ে দিল!

তারপর আমার কিছু মাথায় ঢুকছিল না। খালি মনে আছে, দলের সক্কলে আমাকে কাঁধে তুলে সারা মাঠ ঘোরাচ্ছে, উদয়নদা দু-চোখে জল নিয়ে হাউহাউ করে কী বলছেন, সদানন্দবাবু দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করছেন, তুষার আনন্দে পাগল হয়ে নাচছে, আর দর্শকদের থেকে একটু দূরে এক সাধারণ পোশাকের ভদ্রলোক ল্যাংড়াকে জড়িয়ে ধরে আছেন, তাঁরও দু-চোখে জল।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক


No comments:

Post a Comment