না-মানুষের পাঁচালিঃ মানুষ ছিল বনমানুষের রূপে - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষ ছিল বনমানুষের রূপে


অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়



বিবর্তনের ইতিহাস জানায় মানুষ আর শিম্পাঞ্জির পিতৃপুরুষ একই। বিজ্ঞানীরা এই দুই প্রজাতির প্রাণীর পিতৃপুরুষের নাম দিয়েছেন হোমিনিনি। হোমিনিনি থেকে হোমিনিনা, অর্থাৎ মানুষ; এবং প্যানিনা, অর্থাৎ শিম্পাঞ্জির প্রজাতিয় শাখা বিভক্ত হয়ে যায়। কবে সেটা হল, তা জানতে গিয়ে আধুনিক মানুষ বা হোমিনিনা প্রজাতির প্রাণী, মাটি খুঁড়ে পাওয়া ফসিলের কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে যা বয়স জানাচ্ছে, তা হল ১২০ থেকে ১৩০ লক্ষ বছর আগে। এরপর কীভাবে দুটি প্রজাতি সমান্তরালভাবে বিবর্তনের পথে হাঁটতে হাঁটতে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে, তার হুবহু ইতিহাস কেউই বিবৃত করতে পারবে না। তবে দুই প্রজাতির জন্ম হয় আফ্রিকার জঙ্গলে, সে নিয়ে কোনো মত পার্থক্য নেই।

দেহের গঠনের দিক থেকে যেমন প্রচুর অমিল যেমন আছে, তেমনি প্রচুর মিলও দেখতে পাওয়া যায় শিম্পাঞ্জি আর মানুষের মধ্যে। মানুষের মতো সোজা হয়ে হাঁটাচলা শিম্পাঞ্জিরা করে না, তবে তাদের দুই লম্বা হাত মাটি ছুঁয়ে থাকলেও চলাফেরার সময় প্রায় হাতের সাহায্য নিতে হয় না বললেই চলে। যাক, দেহগত মিল অমিল নিয়ে প্রাণীবিজ্ঞানীরা মাথা ঘামান, কিংবা চিড়িয়াখানায় গিয়ে একনজর শিম্পাঞ্জিদের দেখে আসাও যেতে পারে। এখানে বরং আমরা দেখে নেব বুদ্ধিবৃত্তিতে শিম্পাঞ্জির দৌড় কতখানি।

নিজের জীবনধারণের তাগিদে যন্ত্র বানাবার কৌশলকেই প্রাণীবিজ্ঞানীরা বুদ্ধিবৃত্তি মাপবার প্রাথমিক স্তর বলে মনে করেন। শিম্পাঞ্জি এই ক্ষেত্রে অন্য প্রাণীদের চাইতে অনেক এগিয়ে। জঙ্গলের শক্ত খোলযুক্ত ফল কুড়িয়ে পাথরের টুকরো দিয়ে ভেঙে শাঁস বার করে খেতে ওস্তাদ সব এক-একজন শিম্পাঞ্জি। জঙ্গলের মোটা মোটা গাছের ছালের আড়ালে বসবাস করে নানা জাতের পোকামাকড়। এগুলো শিম্পাঞ্জিদের বড়ো প্রিয়। ফলমূল খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর যেন বাদাম ভাজা খাওয়ার মতো করে তারা পোকামাকড় মুখে পুরে চিবিয়ে খায়। গাছের ছালের আড়ালে যেসব পোকামাকড় থাকে তাদের টেনে বার করতে গেলে কসরত লাগে। শিম্পাঞ্জিরা এই কাজটা বেশ দক্ষতার সঙ্গে করে থাকে। গাছের ডাল ভেঙে একটা খুঁচিয়ে বার করার মতো লম্বা ডান্ডা তৈরি করে নিতে পারে তারা। মায়ের কোলে জন্ম নিতে না নিতেই খুব তাড়াতাড়ি শিম্পাঞ্জির বাচ্চারা এইসব কাজ শিখে নিতে পারে। মানুষের বাচ্চাদের মতো বছরের পর বছর ধরে স্কুল যাওয়ার সময় তাদের খাইয়ে দিতে হয় না।

স্কুল যাওয়ার কথা যখন উঠল, তখন শিম্পাঞ্জিদের পাঠশালার দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। এই পাঠশালাতে উঁকি দিয়েছেন বহু দুর্ধর্ষ ইউরোপের অভিযাত্রী। তাদের লিখিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, শিম্পাঞ্জিরা বাল্যকাল থেকে মায়ের যত্নে বেড়ে ওঠে। যত্ন বলতে হাতে ধরে কিছুই শিখিয়ে দেওয়া হয় না, সবটাই দেখে এবং বুঝে শিখে নিতে হয়। খুব ছোটোবেলায় মায়েরা তাদের সামান্য সাহায্য করে, এই যা। খুব স্বাভাবিকভাবে বাচ্চারা শিখে নেয় কোন গাছ থেকে কোন ফল সংগ্রহ করতে হয়, কোথায় মাটি খুঁড়ে বার করে নেওয়া যায় মস্ত মেটে আলু, কোথায় লুকিয়ে থাকে ছোটো ছোটো খরগোশের মতো দেখতে প্রাণী, আর কেমনভাবে তাদের খুঁজে বার করে শিকার করে মেরে খেয়ে নেওয়া যায়। শিম্পাঞ্জিদের আরেকটা প্রিয় খাবার বড়ো বড়ো পিঁপড়ে। গাছের শুকনো ডাল ভেঙে জঙ্গলের মধ্যে পিঁপড়ের ঢিপি খুঁচিয়ে পিঁপড়ে বার করে খেয়ে নিতে তাদের জুড়ি নেই।

অসুখ করলে শিম্পাঞ্জিরা আলাদা করে ডাক্তার ডাকে না। তারা নিজেরাই তাদের বদ্যি। জন্ম থেকে মায়ের পাঠশালায় তারা জেনে নেয় কোন গাছের পাতা চিবিয়ে খেলে পেটে আর ব্যথা করে না, কোন গাছের শিকড়ের রস জ্বরজারি সারিয়ে দেয়। কারো যদি অসুখ করে, সবাই মিলে তার সেবা করতেও পিছপা হয় না শিম্পাঞ্জিরা।

গাছের উঁচু মগডালে কীভাবে অস্থায়ী বিছানা তৈরি করতে হয়, সেই পাঠও যত্ন করে শিখিয়ে দেওয়া হয় শিম্পাঞ্জির মায়ের ইস্কুলে। এমন জায়গায় রাতের বিছানা তৈরি করে তারা সকলের নজরের আড়ালে ঘুমাতে যায়, যাতে অন্য কোনো জংলি প্রতিবেশী তাদের মেরে খেয়ে না নিতে পারে। মাটির কাছাকাছি খুব কম সময়ের জন্যই শিম্পাঞ্জিদের দেখা যায়, কারণ মাটিতে বিষধর সাপ থেকে আরও অনেক পোকামাকড়েরে উপদ্রব থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে চলতে হয় শিম্পাঞ্জিদের। যেহেতু পরিণত বয়সের শিম্পাঞ্জিদের শরীর অনেক ভারী, তাই তারা গাছের একেবারে মাথায় কখনো চড়ে বসে না বা বসবাস করে না। মগডালের জায়গাটা হল হালকা শরীরের বাঁদরদের জন্য। শিম্পাঞ্জিদের বসবাস গভীর জঙ্গলের মধ্যে যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। গাছের বড়ো বড়ো পাতা ছাতার মতো আড়াল দিয়ে কেমনভাবে বৃষ্টি থেকে নিজেদের শরীর বাঁচাতে হয়, সেই শিক্ষা বাচ্চা অবস্থাতেই মায়ের করা প্রশিক্ষণে তারা শিখে ফেলে। আবার জল তেষ্টা পেলে মোটা স্পঞ্জের মতো পাতা চুষে তৃষ্ণা মেটানোর স্বাভাবিক পদ্ধতি শিখে নিতেও বাচ্চাদের সময় লাগে না।

শিম্পাঞ্জিরা দল বেঁধে থাকতে ভালোবাসে। বড়ো একান্নবর্তী পরিবার তাদের। পরিবারে ৫০ থেকে ১৫০ জন সদস্য থাকে। তাদের পরিবার কঠিনভাবে পুরুষতান্ত্রিক। একটি পরিবারে মাত্র একজন পুরুষই সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার বিরুদ্ধাচারণ পরিবারের কেউ করে না। পরিবারের কর্তাটি তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে গণভোটের মাধ্যমে করে থাকে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ১৩ বছর বয়সে সাধারণত একটি শিম্পাঞ্জি যুবক বা যুবতী জীবনে পা রাখে। যতক্ষণ পর্যন্ত না একটি পুরুষ শিম্পাঞ্জি সে বয়সে পৌঁছচ্ছে, ততদিন তার পরিবারের তত্ত্বাবধানে থাকার নিয়ম। এরপর সে চলে যেতে পারে অন্য কোনো পরিবারে, বেছে নিতে পারে নিজের জীবনসঙ্গিনী কিংবা থেকে যেতে পারে নিজের পরিবারেই। মেয়ে শিম্পাঞ্জি বড়ো হয়ে অন্য পরিবারের সঙ্গীর সঙ্গে জীবন কাটাতে থাকে। কিন্তু মাঝেমধ্যে মায়ের বাড়ি বেড়াতে আসে তারা। গর্ভবতী শিম্পাঞ্জির প্রসবের সময় মা শিম্পাঞ্জি তাকে সহায়তা করে।

পরিবারের নিরাপত্তার ব্যাপারে শিম্পাঞ্জিরা খুব সচেতন। তাই একদল গুন্ডা শিম্পাঞ্জি তাদের এলাকা পাহারা দেয় গাছের মাঝারি উচ্চতায় ক্রমাগত নজরদারি করে। একদলের সীমান্ত প্রহরীদের সঙ্গে অন্য দলের সীমান্ত প্রহরীদের মধ্যে লড়াই মাঝে মাঝে হয় বটে, তবে মানুষের সমাজের মতো দেশ দখল, জমি দখল করার প্রবণতা অভিযাত্রী বা পর্যবেক্ষকরা দেখতে পাননি।

আদিম অধিবাসীরা যেমন রাত হলেই জঙ্গলে আগুন জ্বেলে শিকার করা, মাংস ঝলসে খাওয়ার সময় গান বাজনায় মেতে উঠত, দেখা গেছে শিম্পাঞ্জিরাও তেমনই উৎসবে মেতে ওঠে। তবে তাদের গানের ভাষা মানুষের বোধের বাইরে। ফাঁপা কাঠে আওয়াজ করে তাদের বাজনা বাজাতে যেমন দেখা গেছে, তেমনি এক অদ্ভুত বাজনা তারা গভীর জঙ্গলে নিজেরাই বানিয়ে নেয়।

জঙ্গলের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় অনেকগুলো ফাঁপা মাটির ঢিপি দেখতে পান অভিযাত্রী আর.এল. গার্নার। তিনি শিম্পাঞ্জিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবার জন্য কয়েকমাস আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে বাস করেছিলেন। প্রায় দুই ফুট লম্বা আর দুই ফুট চওড়া শুকনো মাটির ঢিপিতে তিনি শিম্পাঞ্জিদের হাতের ছাপ দেখতে পান। তারপর জানতে পারেন নদী থেকে উপযুক্ত নরম মাটি এনে শিম্পাঞ্জিরা ঢিপি তৈরি করে রোদে শুকানোর জন্য অনেকদিন ফেলে রাখে। তারপর সেই ঢিপি শুকনো হয়ে গেলে হাতের তালু দিয়ে বাজিয়ে আনন্দ উল্লাস করে থাকে।

শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে মানুষের মিল দেখতে পেয়ে শিম্পাঞ্জিদের জঙ্গল থেকে ধরে এনে খাঁচায় বন্দি করে তাদের বুদ্ধিবৃত্তির উপর গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু মানুষ হয়তো তাদের বুদ্ধির হদিশ আজও পায়নি। বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের মতে, মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি দিয়ে প্রাণীদের বুদ্ধি বিচার করতে যাওয়া উচিত নয় এবং তাতে সঠিক তথ্যও উঠে আসতে পারে না। প্রতিটি প্রাণীর বুদ্ধির প্রকৃত প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় কেবলমাত্র যে পরিবেশে সে বেঁচে থাকে সেই পরিবেশে। খাঁচায় বন্দি শিম্পাঞ্জিরা তাদের স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে বিরক্ত হয়। তবে মানুষকে তারা খুব ভালোবাসে। আক্রমণ না করে বরং শিশুসুলভ এক সরল কৌতূহলে মানুষের হাবভাব লক্ষ করে মন দিয়ে। কখনো কখনো মানুষকে নকল করবার প্রবণতাও তাদের মধ্যে দেখা যায়।

শিম্পাঞ্জির বুদ্ধি পরীক্ষা করবার জন্য আমেরিকার স্পেস এজেন্সি নাসা একটি শিম্পাঞ্জিকে মহাকাশ অভিযানে পাঠায়। তাকে যথাযথ তালিম দিয়ে পাঠানোর ফলে আংশিকভাবে নাসার উদ্দেশ্য সফল হয়। শিম্পাঞ্জিটি অক্ষত শরীরে পৃথিবীতে ফেরত আসে। তবে দ্বিতীয়বার আর রকেটে চড়তে সম্মত হয় না। অনেক চেষ্টা করে তাকে দ্বিতীয়বার রকেটে চড়াতে না পারার ঘটনা সংবাদ মাধ্যমের গোচরে আসে। তীব্র জনপ্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় নাসাকে। জানা যায় মহাকাশে তাকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করাবার জন্য ইলেকট্রিক্যাল শক দেওয়া হত। এরপর থেকে পশুপ্রেমী সংস্থাগুলির উদ্যোগে বনের প্রাণীদের মহাকাশে পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়। নিঃসন্দেহে ডারউইনের মতামতকে সমর্থন করে বলা যায়, মানুষের কৌতূহল চরিতার্থ করতে গিয়ে শিম্পাঞ্জিকে জঙ্গল থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে মানুষের লোকালয়ে মানুষের সমাজের উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা একেবারেই মুর্খামি।


___


No comments:

Post a Comment