ছোটো গল্পঃ স্মৃতিহারা শিবতোষ - তরুণকুমার সরখেল


ভোরবেলা স্টেশনে নেমে পড়তেই ভোজবাজির মতো সবকিছু পালটে গেল। এখানের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি গাছ, অলিগলি রাস্তা সব শিবতোষের মুখস্থ। এখান থেকে তাঁদের গ্রাম চাকমাদল এগারো কিলোমিটার দূরে। গ্রামে যাবার মিনি বাসও পাওয়া যায় সকালের দিকে। শিবতোষ হনহন করে বাস স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে লাগলেন। ওখানেই দেখা হয়ে গেল বিশ্বনাথ মাইতির সঙ্গে। বিশ্বনাথই তাঁকে দেখতে পেয়ে হাঁকডাক জুড়ে দিল, “শিবুদা গাঁয়ে ফিরে এসেছে, শিবুদা গাঁয়ে ফিরে এসেছে!” বলে।

শিবতোষ বড়াল অনেকদিন ধরেই ঘরছাড়া। এখন তিনি একজন ভবঘুরে। কোন এক অজানা কারণে তিনি তাঁর পূর্বের স্মৃতি হারিয়েছেন। শিবতোষ এই ছোট্ট মফস্বল শহরে কেমন করে এলেন, কোথা থেকে এলেন কিছুই মনে করতে পারেন না। ছোট্ট শহরের শেষপ্রান্তে একটা বড়ো পেট্রল পাম্পের পাশেই পরিত্যক্ত প্রাইমারি স্কুলের স্যাঁতসেতে ঘরে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন। পরিত্যক্ত প্রাইমারি স্কুলের এই ঘরটির ছাদ থেকে টপ টপ করে জল পড়ে বলে একটু দূরে দুটি নতুন স্কুল ঘরে তৈরি করা হয়েছে। ফলে শিবতোষ এখন পুরো একটা স্কুল ঘরের মালিক। তবে মাঝেমধ্যে ঘরের ছাদ থেকে সিমেন্টের চাঙড় খসে পড়ে। এই কারণে শিবতোষ এককোণে শুয়ে থাকেন। কোনার দিকের ছাদটা অনেক ভালো আবস্থায় আছে। সেখানে জলও চুঁইয়ে পড়ে না। প্রাইমারি স্কুলের মিড-ডে মিল খেয়ে ছেলেমেয়েরা স্কুল মাঠের এখানে ওখানে এঁটো খাবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিজের নিজের থালা ধুতে চলে যায়। ঠিক এইসময় শিবতোষ একটা ঝাড়ু এনে এঁটো-কাঁটা, শুকনো ঘাস-পাতা পরিষ্কার করার কাজে লেগে পড়েন। তবে তাঁকে দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে তিনি ঝাঁট দেওয়ার ব্যাপারে খুব একটা পারদর্শী নন। স্কুল মাঠ পরিষ্কার করা হয়ে গেলে স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক ভুবনবাবু শিবতোষকে ডেকে খাওয়ান। খাওয়াদাওয়া সেরে শিবতোষ পাশের অমলতাসগাছের ছায়ায় শুয়ে একটা লম্বা ঘুম দেন। বলতে গেলে সারা দিনরাতে এটাই তাঁর তৃপ্তির ঘুম। রাত্রে মশা আর আরশোলার উপদ্রবে তিনি একদম ঘুমোতে পারেন না।

স্মৃতি হারিয়ে ফেললেও শিবতোষ বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা দোকানের সাইনবোর্ড ঠিকই পড়তে পারেন। আজ রবিবার বলে স্কুল ছুটি। আর স্কুল ছুটি মানে তাঁর খাবারও বন্ধ। সকাল থেকে তাঁর কাজ হল শহরের এ-মাথা ও-মাথা যতগুলো দোকান আছে সেগুলোর নাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া। শুধু তাই নয়, কোন দোকানে কী পাওয়া যায়, দোকানে ভিড় কেমন, সেই দোকানের মালিকের কীরকম ব্যবহার এগুলোও তিনি জানার চেষ্টা করেন। দু-একটি দোকানের মালিক তাঁকে দোকানের সামনে দাঁড়াতে দেখলেই খ্যাক খ্যাক করে। শিবতোষ অবশ্য কারো দোকানেই ঢুকে পড়েন না, সবকিছু রাস্তা থেকেই দেখেন। পুরোনো বাজারের দু-তিনটি দোকানের মালিক শিবতোষকে ডেকে পয়সা দেন। তাঁরা তাকে পাগল বলেই জানেন। কিন্তু তিনি তো আর পাগল নন। শুধু স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছেন আর নিজের নামটা মনে করতে পারেন না।

ভন্দুর মোড় পর্যন্ত এসে শিবতোষ আর এগোলেন না। ওটা হরা পাগলার ডেরা। হরাও পুরোপুরি পাগল নয়। তবে ও সবসময় হিন্দিতে কথা বলে। ওর কাজ হল চা তেলেভাজা দোকানে টুকিটাকি ফাইফরমাস খাটা। হরা শিবতোষকে ওর এলাকায় ঢুকতে দেয় না। ঢুকলে ঢিল নিয়ে তাড়া করে আসে।

শিবতোষ দেখলেন একটা কালো রঙের ষাঁড় দু-পা আর সিং দিয়ে ছাই ওড়াচ্ছে। হঠাৎ ষাঁড়টার কী হল কী জানি সেটা শিবতোষকে তাড়া করে এল। শিবতোষ একটা ছোটোখাটো ডাস্টবিনের পাশে সরে গেলেন। তবুও ষাঁড়াটার ফোঁসফোসানি কমল না দেখে তিনি ডাস্টবিনের পাশ থেকে একটা ফেলে দেওয়া ছাতা কুড়িয়ে সেটাকে চট করে ষাঁড়টার মুখের সামনে খুলে দিলেন। এতে ঘাবড়ে গিয়ে ষাঁড়টা পিছু হটল। শিবতোষ আর সেখানে দাঁড়ালেন না। 

তিনি যতটা পথ হেঁটে এসেছিলেন ততটাই এবার হেঁটে যাবেন। রবিবার বলে এমনিতেই আজ বাজারে লোক চলাচল কম। এখন দুপুরবেলা বলে রাস্তায় লোক নেই বললেই চলে। শিবতোষ কুঁড়িয়ে পাওয়া ছাতাটা মাথায় দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। ছাতাটা আজ তাঁর খুব কাজে এসেছে। ষাঁড়টাকে তো শিবতোষ আগে এই শহরে দেখেননি। পুরোনো বাজারে চালের দোকানঘরগুলোর পাশে দু-তিনটি ষাঁড় বসে থাকে। তবে সেগুলো খুব নিরীহ ও গোবেচারা। এই ষাঁড়টার মতো মারকুটে নয়।

“শিবুদা চল্লে কোথায়?”

হঠাৎ এই প্রশ্নটা শুনে শিবতোষ পিছন ফিরে তাকালেন। কেউ তো নেই। কে তাঁকে শিবু বলে ডাকল? তাঁর নাম কি শিবু? না, তিনি বোধ হয় ভুল শুনেছেন। তাঁকে কেউ ডাকেনি। শিবতোষ আবার অলস পায়ে হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে একসময় হাঠাৎই তাঁর চোখের সামনে সাদাকালো ছায়াছবির মত কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল। সিনেমার পর্দায় যেমন ছোটো ছোটো দৃশ্য একটার পর একটা এসে পড়ে সেরকম। তিনি দেখতে পাচ্ছেন বিস্তীর্ণ সমতল চাষের জমি। জমিতে প্রচুর ফসল। মাঠে কাজ করছে লোকজন। তাঁদের দু-তিনজনকে তাঁর খুব চেনা মনে হল।

এরপর ছায়াছবির দৃশ্য খুব দ্রুত পালটে গেল। তবে দৃশ্য পালটে গেলেও শিবতোষ দেখলেন তিনি একটি ফসল ঘেরা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। গয়ে তাঁর চাদর, গলায় মাফলার। মাঠ জুড়ে বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলো, গাজর, শালগমের ছড়াছড়ি। মাঠের লোকজন গায়ে রোদ মেখে চাষের কাজে লেগে পড়েছে। তিনি একটু পরেই দেখতে পেলেন পুরো মাঠ জুড়ে হলুদ সর্ষে ফুলের মেলা। মনে হচ্ছে একটা খুব বড়ো হলুদ নকশা করা চাদর। খানিক পরেই চোখে ভেসে উঠল মাঠের মাঝে জমা করা প্রচুর আলুর বস্তা। একপাশে লোকজন মাটি খুঁড়ে আলু তুলে ফেলছে। সেই আলু বস্তাবন্দি হয়ে লরিতে করে স্টেশনের দিকে চলে যাচ্ছে। দূরে ছোট্ট একটি রেল স্টেশনও চোখে পড়ল। কী যেন নাম স্টেশনটার? শিবতোষ স্পষ্ট পড়তে পারলেন, ‘কাজলডাঙা’।

এই কাজলডাঙা রেল স্টেশন নামটা পড়ার পরেই চোখের উপর ভাসতে থাকা সাদাকালো ছায়াছবিটা দ্রুত পালটে যেতে লাগল। সেই ছবির পুরো অংশটাই শিবতোষের চেনা চেনা মনে হল। শিবতোষ দেখছেন ছোট্ট একটা নদী। নদীতে এক হাঁটুর বেশি জল নেই। নদীর বালি খুঁড়ে বড়ো বড়ো গর্ত করে জল জমানো হয়েছে। সেই জল পাম্পে করে উচ্ছের ক্ষেতে গিয়ে ফেলা হচ্ছে। কিছু লোক নদীর শুকনো বালি লরিতে বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে। বালিভর্তি লরিগুলো গোঁ গোঁ শব্দে নদীর উঁচু পাড় ধরে উঠে যাচ্ছে।

এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল। শিবতোষ ছাতা মাথায় দিয়ে সিনেমা দেখতে দেখতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এবার সেই সিনেমার ছবিটাই ভয়ংকরভাবে কাঁপতে শুরু করল। এটা কেন হল?

কাঁপতে কাঁপতে ছবিটা শেষপর্যন্ত একটা দৃশ্যে গিয়ে শেষ হল। দৃশ্যটা হল, নদীর উঁচু পাড় দিয়ে যেতে যেতে একটা লরির চাকা গর্তে পড়ল। টাল সামলাতে না পেরে লরিটা সবেগে উলটে গেল। লরির খোলা ডালায় বালির উপর যেসব শ্রমিকরা বসে ছিল তারাও বালি চাপা পড়ল। লরির ড্রাইভার বিপদ বুঝে ঠিক সময়েই উলটোদিকে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু তার বাঁদিকে যে লোকটি লরিতে বসে ছিল, তার মাথা ফেটে গেছে। বোঝা যাচ্ছে সে গুরুতর আহত হয়েছে। কে এই লোকটি? শিবতোষ খুব ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন। না, তার একটুও ভুল হয়নি। ওই লোকটি তিনি নিজে!

এরপর শিবতোষের মাথা বনবন করে ঘুরতে লাগল। চোখদুটো বন্ধ হয়ে আসছে। তিনি চোখে অন্ধকার দেখলেন। হঠাৎ ধপ করে রাস্তার মাঝে পড়ে গেলেন। যে ছাতাটা মাথায় দিয়ে ছিলেন সেটা ছিটকে পড়ল একদিকে। এরপর আর তাঁর কিছুই মনে নেই।

তিনদিন পর মহকুমা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে শিবতোষ সোজা স্টেশনে চলে এলেন। কাজলডাঙা রেল স্টেশন কোন ট্রেন-রুটে পড়বে এটা তো তাঁর জানা নেই। তিনি সেদিন শুধু ওই স্টেশনের ছবিটাই দেখতে পেয়েছিলেন। আর তো কিছু দেখতে পাননি। তাই এখানে ওখানে খোঁজ নিতে তাঁর অনেক দেরি হয়ে গেল। তাছাড়া তাঁর জামাকাপড়ের যা ছিরি তাতে সহজে কেউ তাঁর সঙ্গে কথাও বলছে না। বহুকষ্টে কাজলডাঙার ট্রেন-রুট জোগাড় করে শিবতোষ ট্রেনে চেপে পড়লেন।

ছোট্ট বাস স্ট্যান্ডের সব দোকানঘর ও গুমটির মধ্যে খবরটা নিমেষে ছড়িয়ে পড়ল। শিবতোষকে এখানে সবাই চেনে। শিবতোষ ‘ডাবর’ নদীর একটা ঘাটের মালিক ছিলেন। সরকারের কোষাগারে টাকা গচ্ছিত রেখে তিনি একটা ঘাট লিজ নিয়েছিলেন বেশ কিছুদিন আগে। শিবতোষ সেই নদীর বালি পাঠাতেন জেলা শহরে। জেলা শহর এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তো সেই নদীর ঘাটেই একদিন এক দুর্ঘটনায় শিবতোষ তাঁর পুরনো স্মৃতি হারিয়ে ফেলেন।

সকালের মিনি বাস ধরে শিবতোষ গ্রামের পথে ফিরতে ফিরতে ভাবলেন, তিনি যে ক’দিন স্মৃতিহারা হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন সেই স্মৃতিগুলো তো ভুলে যাননি। সবই স্পষ্ট মনে আছে। ছাদের সিলিং থেকে চাঙড় খসে পড়া পুরোনো স্কুল ঘরের যেখানে তিনি এতগুলো দিন কাটিয়ে এলেন সেটা কি তিনি ভুলে যাবেন? এই ক’দিন আগেই তো তিনি ডাস্টবিনের পাশ থেকে একটা পুরোনো ছাতা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেই ছাতা মাথায় দিয়েই তো এক ম্যাজিক ঘটে গেল। দিনেরবেলা রাস্তার মাঝে তিনি ছায়াছবিতে নিজের অতীত দেখতে পেলেন। এসব তাঁর দিব্যি মনে আছে। শুধু কখন তিনি অজ্ঞান হয়ে রাস্তার মাঝে পড়ে গেলেন আর কখন তাঁর মাথা থেকে বিদঘুটে ছাতাটা ছিটকে পড়ল এটাই মনে পড়ছে না।


___


No comments:

Post a Comment