ছোটো গল্পঃ ছায়া দ্বীপ - অনির্বাণ সরকার



ছায়া দ্বীপ


অনির্বাণ সরকার



সম্রাট একদিন এক বিষণ্ণ বিকেলে মনের দুঃখে সমুদ্রের পাড়ে বসে ছিল। বয়স তার কুড়ি ছুঁইছুঁই, কিন্তু এখনো অবধি সে জীবনে তেমন কিছু অগ্রগতি করে উঠতে পারেনি। কিছু যে করতে পারবে সেই বিশ্বাসটাও ধীরে ধীরে যেতে বসেছে। সে এক অতিসরল ছেলে, বর্তমান যুগের সুযোগসন্ধানী চতুরতা তার ভালোমানুষি মনটাকে স্পর্শ অবধি করতে পারেনি। বাড়ি ছিল তাদের উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের পাশে রায়পুর নামের একটি গ্রামে। বাবা-মা তার নামকরণ ‘সম্রাট’ করার সময় বিধাতা হয়তো আড়ালে মুচকি হাসি হেসেছিলেন। লক্ষ্মীদেবীর কৃপাদৃষ্টি তাদের ওপর কোনোদিনই বর্ষিত হয়নি। প্রবল দারিদ্রতা তাদের পরিবারের নিত্য সঙ্গী। অতিসরলতার জন্য সে ছিল সবার উপহাসের পাত্র। অনেকে আবার তার সুযোগও নিত। তবে দেবী সরস্বতী তাকে আশীর্বাদে কার্পণ্য করেননি, সম্রাট পড়াশোনাতে খুবই ভালো ছিল। মাধ্যমিকে জেলায় সে প্রথম হয়েছিল। কিন্তু তাতে কী? এই যুগে সম্মান-প্রতিপত্তি পড়াশোনা দিয়ে নয়, টাকাপয়সায় জোরে হয়, যেটা কোনোদিনই তাদের ছিল না। তাই সম্রাটের সাম্রাজ্য চিরাচরিত উপহাসের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর হঠাৎই বাবা-মা অল্পদিনের ব্যবধানে মারা গেলে তার ওপর দুর্ভোগের পাহাড় নেমে আসে। ব্যস, পড়াশোনার ওখানেই ইতি। তারপর ভাগ্য তাকে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে এখন এনে ফেলেছে দীঘায়, এক হোটেলে কেয়ারটেকারের চাকরি করে সে পেট চালাচ্ছে। প্রতিটা দিন কাটে আবার লেখাপড়া শুরু করে জীবনটাকে নতুন করে সাজানোর স্বপ্নে। কিন্তু তা আর হয় না।

ঠিক তখনই দূরে সমুদ্রের ঢেউয়ে সে কিছু ভেসে আসতে দেখল। এতদূর থেকে ঠাহর করা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমুদ্রের ঢেউ জিনিসটাকে ভাসিয়ে পারে নিয়ে এল। একটা কাচের বোতল। মুখটা কর্ক দিয়ে শক্ত করে আঁটা। সম্রাট কৌতূহলবশত এগিয়ে গেল। বোতলটা হাতে নিয়ে দেখল, ভেতরে একটা কাগজ পাকানো। বেশ পুরোনো কাগজ মনে হচ্ছে। কী আছে কাগজটাতে? সে প্রবল রোমাঞ্চ অনুভব করল। এরকম কাগজে অনেক সময় প্রাচীন কোনো গুপ্তধনের হদিশ থাকে। হতেই পারে এটি তার ভাগ্য পরিবর্তনের একটি সুযোগ।

বোতলটা ভেঙে পাকানো কাগজটা খোলার পর সে যুগপৎ অবাক ও হতাশ হল। কাগজটা নিঃসন্দেহে বেশ কয়েক শতাব্দী পুরোনো, কিন্তু একেবারে ফাঁকা। কোনো লেখা বা নকশা কিছুই নেই, বা কখনো থেকে থাকলেও তা ধুয়ে মুছে একদম সাফ। চরম বিরক্তিতে সে কাগজটা মুচড়ে ছুড়ে ফেলে দিল। কী অবাক কাণ্ড! একটা জোরালো হাওয়া কাগজটাকে আবার তার গায়ে উড়িয়ে এনে ফেলল। সম্রাট অবাক হয়ে দেখল, মুচড়ে দলা পাকিয়ে ফেলার পরেও এখন কাগজটাতে একটা ভাঁজও নেই। কী অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার! কাগজটায় নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে এবং ভাগ্যবিধাতাও মনে হয় চাইছেন সে কাগজটা রাখুক।

সম্রাট কাগজটা তার ঘরে নিয়ে এল। রাতে টিমটিম করা বাতির আলোয় সে খুঁটিয়ে কাগজটাকে  পরীক্ষা করছিল। কিন্তু কিছুই সে বুঝে উঠতে পারল না। যাই হোক, পরদিন আবার সকালে ওঠা আছে, এখন ঘুমোতে হবে। একটা চাপা অস্বস্তি নিয়েই সে আলো নিভিয়ে দিল। তখনই ঘটল পরমাশ্চর্য ঘটনাটি। অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন কাগজটি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। কাগজ থেকে ঠিকরে বেরোনো আলোয় ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। সম্রাট একটা ভয়মিশ্রিত বিস্ময়ের সঙ্গে কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল, তাতে কিছু লেখা আপনা-আপনি ফুটে উঠছে। যা ব্বাবা, এ কী অদ্ভুত ম্যাজিক!

কাগজটিতে দুটি ঘড়ির ছবির সঙ্গে একটি ধাঁধার মটো দু-লাইন কবিতা ভেসে উঠল। কাগজটির ছবি নীচে দেওয়া হল।

Pattern.jpg

সম্রাট প্রথমে এটা দেখে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। বার বার করে সে এটা পড়ে মর্মোদ্ধার করার চেষ্টা করতে থাকল। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কেন জানি না বলছিল, এই ধাঁধার উত্তরেই আছে কোনো পরমপ্রাপ্তির আভাস; তার ভাগ্যলিপি পরিবর্তনের সংকেত। ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে দেখল, দুটো ঘড়ির নীচেই PM লেখা, অর্থাৎ প্রথম ঘড়িটা সময় নির্দেশ করছে রাত ৯টা বেজে ২৪ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড, আর দ্বিতীয় ঘড়িটা রাত ৯টা বেজে ৫৪ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। দ্বিতীয় ঘড়ির সময়কে আবার ৪ দিয়ে গুণ করার চিহ্ন দেওয়া আছে। তো এগুলো দিয়ে কী মানে দাঁড়াচ্ছে? উঁহু! সে কিছুই খুজে পাচ্ছে না।

এইভাবে ভাবতে ভাবতে কখন যে তার চোখে ঘুম চলে এসেছিল কে জানে।

প্রথম রাত এইভাবেই পার হল। দ্বিতীয় রাতও তাই। তৃতীয় দিন ভোররাতে তড়াক করে সে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। স্বপ্নের মধ্যেই যেন সে ধাঁধাটির সমাধান করে ফেলেছে। ইউরেকা! তাই তো! এইভাবে সে ভাবেনি কেন?

ঘড়ির ছবি দেখে সে আগেই এটিকে সময় ধরে নিয়ে ভুল করে ফেলেছে। ঘড়ির সময় দুটি আসলে একটি স্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্দেশ করছে এবং কবিতার লাইনে আছে ‘সময় ধাঁধায় উত্তর    পুবে চলো সত্বর’, যার মানে স্থানটি উত্তর-পূর্ব গোলার্ধে। প্রথম ঘড়ির সময়কে পড়তে হবে এইভাবেー২১টা বেজে ২৪ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড বা অক্ষাংশের হিসাবে ২১°২৪’৪৫” বা ২১.৪১২৫° উত্তর এবং দ্বিতীয় ঘড়ির সময় দ্রাঘিমাংশের হিসাবে দাঁড়াচ্ছে ২১°৫৬’১৫” বা ২১.৯৩৭৫° পূর্ব। একে চার দিয়ে গুণ করলে প্রকৃত দ্রাঘিমাংশ দাঁড়াচ্ছে ৮৭.৭৫° পূর্ব। চমৎকার! সে নিজেই নিজের মাথার তারিফ না করে পারল না। সত্যিই, এটি একটি সময় ধাঁধাই বটে। যদিও সে শেষ লাইনটার মানে এখনো বের করতে পারেনি। কে জানে, হয়তো স্থানটিতে পৌঁছে বাকি মানেটাও বোঝা যাবে। উফ্‌, হতেই পারে এটি কোনো গুপ্তধনের সংকেত বা আরও কোনো রহস্যময় প্রাচুর্যের খোঁজ। সঙ্গে সঙ্গে সে মোবাইলে গুগল ম্যাপ খুলে অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ থেকে স্থানটিকে শনাক্ত করে আবার হতাশ হয়ে গেল। গুগল ম্যাপে স্থানটি অদূরেই বঙ্গোপসাগরের মধ্যে দেখাচ্ছে, কিন্তু সেখানে কোনো ভূভাগ বা দ্বীপের চিহ্ন অবধি নেই। তাহলে কি সেই অপার রহস্যের খোঁজ সমুদ্রের তলায়? যাই হোক, সে জানতে হলে তো তাকে সেখানে যেতে হবে। তার আর জীবনে নতুন করে কিছু হারানোর নেই। তার খোঁজখবর নেওয়ার মতোও কেউ নেই। তাই সে একেবারেই পিছুটানহীন। ভেতর থেকে একটা তাগিদ আসছে, তাকে ওখানে যেতেই হবে। তাতে যা হয় হবে।

সকাল হতেই সে ছুটল বাবলুর কাছে। বাবলুর বাবা সজল কোলে মস্ত মাছের ব্যবসায়ী। তার নিজের বেশ কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা ও লঞ্চ আছে। সম্রাটের এখন লঞ্চ বা নৌকা যা হয় একটা কিছু দরকার। বাবলুর সঙ্গে মাছের ব্যাবসার সূত্রেই আলাপ। তাদের হোটেলের মাছও বাবলুদের আড়ত থেকেই আসে। যাই হোক, সে বাবলুকে গিয়েই বলল, “ভাই, আমাকে একটা নৌকা বা লঞ্চের ব্যবস্থা করে দাও, একটা জায়গায় যেতে হবে।”

পাক্কা ব্যবসায়ীর ছেলে বাবলু হাসতে হাসতে বলল, “সে তো বুঝলাম ভায়া। নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় টুরিস্ট পেয়েছ নাকি? নৌকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে, কিন্তু পাঁচ হাজার টাকা নেব, চার ঘণ্টা ঘোরাব। তোমার কমিশন ধরে বললাম।”

“না না, টুরিস্ট নয়, আমিই যাব।”

“একটু ঝেড়ে কাশো তো বাপু! তোমার হঠাৎ সমুদ্র-বিহারের শখ জাগল!” বাবলু বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।

“আছে আছে, কাজ আছে। আমাকে শুধু এই জায়গায় নিয়ে যেও।” এই বলে সম্রাট বাবলুকে গুগল ম্যাপে জায়গাটা দেখাল।

বাবলু চমকে বলে উঠল, “ওরে বাবা, এত সমুদ্রের বেশ মাঝে! লঞ্চেই যেতে হবে। আর খালি যেতেই প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা লেগে যাবে। আর তো অথৈ জল দেখছি ওখানে, কোনো ডাঙা তো নেই! ভায়া, তোমার মতলবটা ঠিক কী বলো তো।”

“সময়ে জানতে পারবে। তোমার মনে হয় আরও ভাড়া লাগবে। সে আমি দেব। তুমি আমাকে ফোন করে শুধু জানিও কোন লঞ্চে কখন যাব।” এই বলে সম্রাট বেরিয়ে গেল।

চতুর বাবলু এদিকে ভাবা শুরু করল, কী এমন ব্যাপার যে এই সাদাসিধে ছেলেটা ওই ভর সমুদ্রে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল! কিছু তো একটা সন্দেহজনক ব্যাপার আছেই। দেখতে হচ্ছে। সে ফোন করে সম্রাটের হোটেলেরই এক ছেলেকে সম্রাটকে লুকিয়ে নজরে রেখে ওকে খবর দিতে বলল। যথারীতি বাবলুর ওই কাগজ বৃত্তান্ত জানা হয়েও গেল। মহা অলৌকিক ব্যাপার! কিন্তু এক্কেবারে পাক্কা খবর, বিশ্বাস না করার উপায় নেই। কিন্তু বাজে ব্যাপারটা হল, কাগজের লেখা কেবলমাত্র সম্রাটই দেখতে পায়, আর কেউ নয়। নাহ্‌, ব্যাপারটা ক্রমশই খুবই চমকপ্রদ ও রহস্যজনক হয়ে উঠছে। কাগজটাতে নিশ্চয়ই কোনো অত্যাশ্চর্য কিছুর হদিশ আছে যা হয়তো প্রচুর অর্থ এনে দিতে পারে। বাবলুর লোভাতুর চোখদুটো জ্বলে উঠল।

পরদিনই বাবলু কিছু মাল্লা আর অভিজ্ঞ ডুবুরি সঙ্গে করে লঞ্চ নিয়ে প্রস্তুত। সম্রাটকে আসতে বলা হয়েছে এবং বাবলু এর জন্য সম্রাটের কাছ থেকে কোনো টাকা নেবে না বলেছে। এমন ভাব দেখিয়েছে যেন সে বন্ধু হিসাবে সম্রাটকে সাহায্য করছে। সম্রাটের মনে মারপ্যাঁচ নেই, বাবলুর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝেনি, সরল মনে বাবলুকে বিশ্বাস করেছে। আসলে ছোটোবেলা থেকেই বাবা-মা আর স্কুলের শিক্ষকরা ছাড়া তো আর কারো কাছেই তেমন গুরুত্ব বা ভালোবাসা পায়নি, বাবলুর কাছে হঠাৎ সেটা পেয়ে ভাবে গদগদ হয়ে আছে। আর এদিকে বাবলু ভেবে রেখেছে, কাগজের রহস্য উদ্ধার না হওয়া অবধি খালি সম্রাটের প্রয়োজন, কারণ সম্রাটই একমাত্র কাগজে ফুটে ওঠা লেখা পড়তে পারে। যে ঐশ্বর্যই পাওয়া যাক, ও সেটা নিজে নেবে ও কিছুটা মাল্লা-ডুবুরিদের মধ্যে ভাগ করে দেবে। সম্রাটকে এক কানাকড়িও দেবে না। তেমন দরকার হলে ওকে মাঝসমুদ্রেই ছুড়ে ফেলে দেবে। ওর খোঁজখবর করারও কেউ নেই, আর প্রভাবশালী হওয়ার সুবাদে বাবলুর পক্ষে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়াও খুব একটা অসুবিধার হবে না।

একটুক্ষণের মধ্যেই সম্রাট চলে এল। ওরা সবাই অতঃপর রওনা হল। হায় হতভাগা নিষ্পাপ ছেলে, সে বাবলুর উপকারের বদলে তাকে প্রকৃত বন্ধু ভেবে কাগজের সমস্ত ব্যাপারটা বলল এবং যদি কোনো কিছু সত্যিই পাওয়া যায়, সবাই সমান ভাগে ভাগ করে নেবে বলল। বাবলুও এমন অভিনয় করল যেন সে কিছুই জানত না, এখনই কথাগুলো শুনে খুব অবাক হল।

আজ সমুদ্র কিছুটা অশান্ত। ওদের সেই অভীষ্ট জায়গায় পৌঁছতে প্রায় সাত ঘণ্টা লেগে গেল। কিন্তু সেখানে গিয়ে যেদিকেই তাকাও, শুধু সমুদ্রের অসীম জলরাশি। রহস্যময় কাগজটি এখানে কী নির্দেশ করতে চাইছে! কোন ঐশ্বর্য লুকিয়ে রেখেছে এখানে? কাগজে কি নতুন কোনো নির্দেশ ফুটে উঠবে তবে? আঁধার না নামা অবধি উপায় নেই, কাগজ তখনই যে কেবল আলো বিকিরণ করে। ওদেরকে প্রবল উৎকণ্ঠায় রেখে অবশেষে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামার পর কাগজটা আবার জ্বলে উঠল।

‘সেথায় যখন কালো, তারই মাঝে আলো’, লাইনটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

তখনই কিছুটা দূরে সমুদ্রের মধ্যে একটা আলো প্রকট হল। লাইনটার মানে এখন বোঝা গেল। কালো মানে অন্ধকারে ওই আলো, অর্থাৎ ওই আলোর দিকে হয়তো যেতে হবে। কাগজটা সম্রাট ভাঁজ করে আবার পকেটে রেখে দিল। কীসের আলো ওটা? অবাক হলেও ওরা ওই আলোর দিকে অগ্রসর হল।

ওরা যত এগোচ্ছে, সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠছে। বেশ ঝোড়ো হাওয়া দেওয়া শুরু করল। আবহাওয়া দ্রুত খারাপ হতে থাকল। সহসা প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হল। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঢেউ আছড়ে পড়ে লঞ্চটাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে থাকল। প্রকৃতির ভয়ংকর রুদ্ররোষে অসহায় ওরা প্রবল আশঙ্কায় জীবন মৃত্যুর মাঝে প্রহর গুনছে। প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে দৃশ্যমানতা কমে এসেছিল, তাই ওরা আগে বুঝতে পারেনি যে ওরা একটা বিশাল ঘূর্ণিঝড়ের এক্কেবারে সামনে চলে এসেছে। সর্বনাশ! ঘূর্ণিঝড়টা যেন ওদের গোগ্রাসে গিলতে আসছে! নিমেষে ঘূর্ণিঝড়টি ওদের ওপর আছড়ে পড়ে লঞ্চটিকে টেনে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে নিল। সবার তীব্র আর্তনাদ প্রলয়ঙ্কর মাঝসমুদ্রের অন্ধকারেই মিলিয়ে গেল। সম্রাট অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে খালি দেখল ওই ঝড় ওদের সবাইকে ঘূর্ণির মতো পাক খাওয়াতে খাওয়াতে কোথায় যেন উড়িয়ে নিয়ে চলেছে।

জ্ঞান ফিরে আসার পর সম্রাট দেখল, সে এক পাহাড়বেষ্টিত সমুদ্রতটে শুয়ে আছে। আকাশে ভোরের আলো। উঠে বসতে গিয়ে শরীরে সে প্রবল যন্ত্রণা ও অবসাদ অনুভব করল। সারা শরীরে আঘাত। রাতের ওই ঘূর্ণিঝড় ওকে এ কোথায় নিয়ে এসেছে? পাশে তাকিয়ে সে চমকে উঠল। দু’জন মাল্লা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখল একজনের এখনো শ্বাস চলছে, আরেকজন মৃত। বাকিদের তো দেখা যাচ্ছে না। মনটা তার গুমরে উঠল। সে চিৎকার করে বাবলুর নাম ধরে ডাকতে থাকল। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। সে শিশুর মতো কাঁদল বেশ কিছুক্ষণ। সম্বিৎ ফিরল জীবিত মাল্লাটির জ্ঞান ফিরে আসায়। দু’জনেই একটু সুস্থ বোধ করার পর সমুদ্রতট বরাবর বাবলুদের খোঁজে হাঁটা শুরু করল। পাশেই জঙ্গল, প্রচুর ফলমূলের গাছ ওদের খিদে নিবারণ করল। কয়েকটি স্বাদু জলের নদী থাকাতে তেষ্টাও মিটল। বিকেল অবধি সমুদ্রতট বরাবর হাঁটার পর একই জায়গায় ফিরে এসে ওরা বুঝতে পারল এটি একটি দ্বীপ। দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসামান্য। দ্বীপটির মাঝে আছে পাহাড় পরিবেষ্টিত একটি আগ্নেয়গিরি। এরকম কোনো দ্বীপ বঙ্গোপসাগরে আছে বলে তার জানা ছিল না। এবার তারা দ্বীপটির মাঝের দিকে এগোতে থাকল। এদিকেও খোঁজ করা দরকার। জঙ্গলে প্রবেশ করার কিছুটা পরেই তারা চড়াইয়ে উঠতে থাকল। জায়গাটিকে প্রকৃতি যেন ঢেলে সাজিয়েছে। রঙবেরঙের নানা ফুলে ভরে আছে চারপাশ। একটা অতীব সুন্দর ঝরনা থেকে নেমে তিরতির করে বয়ে চলেছে এক ছোট্ট নদী, জল তার একদম স্বচ্ছ। জলে কতরকম মাছ! সবুজের সমারোহে পাখিদের কলতানে শরীর-মনের অবসাদ অনেকটাই দূর হয়ে গেল। সন্ধ্যা নেমে আসছে। ফলমূল ওরা প্রচুর সঞ্চয় করেছে। এখন রাতে থাকার একটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে হবে, বিশেষ করে ওরা জানেও না এখানে কোনো হিংস্র প্রাণী আছে কি না। ঝরনার পাশ দিয়েই খাড়া ঢাল বেয়ে লতাপাতা আঁকড়ে পাহাড়ের ওপরে উঠতে থাকল ওরা। আঁধার নামতেই পকেটে কাগজটা আবার উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। হাতে নিতেই কাগজে নতুন লেখা ফুটে উঠল -

‘ছায়াময় এই ছায়াদ্বীপ, ছায়াই রাখবে জীবনদীপ।’

দ্বীপটির নাম তবে কি ছায়াদ্বীপ? কী অদ্ভুত নাম! এইরকম কোনো দ্বীপের নাম সে কোনোদিন আগে শোনেনি। এই অদ্ভুত নামের কারণ কী? আবার ‘ছায়াই রাখবে জীবনদীপ’ কথাটির মানেটাই বা কী? লেখার নীচে আবার একটি তিরচিহ্নও ফুটে উঠল। আর অবাক কাণ্ড, কাগজটি এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ধরলেও তিরচিহ্ন ওই আগ্নেয়গিরির দিকেই নির্দেশ করছে। তবে কি কাগজটা ওদেরকে ওইদিকেই যেতে বলছে? তাই ওরা তিরচিহ্ন বরাবর এগোনো শুরু করল। পাহাড়ের ওপরে উঠে ওরা একটা স্বল্পবিস্তৃত সমতলভূমিতে পৌঁছল। জায়গাটি প্রকৃতপক্ষে আগ্নেয়গিরিটির পাদদেশ। জায়গাটিতে জঙ্গল শেষ হয়ে ন্যাড়া রুক্ষ আগ্নেয় পাহাড়ের শুরু। এই আগ্নেয়গিরি মনে হয় সাম্প্রতিককালে লাভা উদ্গীরণ করেনি। আরও একটু এগোতেই একটি টিলার আড়ালে সেই আশ্চর্য জায়গাটিকে দেখা গেল। একটি সুবিশাল প্রাচীন মন্দির যার গর্ভগৃহটি মোটামুটি অক্ষত, কিন্তু ইতিউতি ছড়িয়ে রয়েছে বাকি নিদর্শনগুলির ধ্বংসাবশেষ। এই পাণ্ডববর্জিত দ্বীপে মন্দির! সত্যিই অতীব রহস্যময়।

কাগজের তিরচিহ্ন মন্দিরটির দিকেই দিকনির্দেশ করে আছে। ওরা মন্দিরের দিকে এগিয়ে চলল। অবাক হয়ে দেখল, মন্দিরের গর্ভগৃহের ভেতর থেকে টিমটিমে এক আলো বেরিয়ে আসছে। তাহলে কি মন্দিরের ভেতর কেউ আছে? বাবলুরা নয়তো? মাল্লাটাই এগিয়ে গেল। মন্দিরে পা দেওয়া মাত্রই মাল্লাটা চাপা আর্তনাদ করে উঠল। সম্রাট বুঝতেই পারল না মাল্লাটা আঘাত পেল কোথায় বা কীভাবে। ধাতস্থ হওয়ার আগেই সে দেখল মাল্লাটা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, মনে হচ্ছে ধস্তাধস্তি করছে। কিন্তু করছে কার সঙ্গে? ধস্তাধস্তির শব্দ শুনেই হয়তো সম্রাটের অনুমান সত্যি করে মন্দিরের ভেতর থেকে বাবলু ও আরেকজন মাল্লা বেরিয়ে এল। ততক্ষণে এই মাল্লাটির চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, জিভ বাইরে বেরিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কোন অদৃশ্য শক্তি তার গলা চেপে ধরেছে। মাল্লাটিকে ওইভাবে পড়ে গোঙাতে দেখে অপর মাল্লাটি তাকে সাহায্য করতে যাওয়া মাত্রই তারও ওই একই অবস্থা হল। সম্রাট আর বাবলু একেবারে হতচকিত হয়ে পড়ল। এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করল ওদেরকে। তখনই সম্রাটের নজর আচমকাই পাশের দেওয়ালে পড়তেই মেরুদণ্ড দিয়ে চরম আতঙ্কের চোরাস্রোত বয়ে গেল। গর্ভগৃহ থেকে বেরোনো টিমটিমে আলোয় দেওয়ালে তৈরি হওয়া গড়াগড়ি খাওয়া মাল্লাদুটির ছায়ার পাশে দেখা গেল আরও বেশ কিছু ছায়ামূর্তি। তার মধ্যে দুটি ছায়ামূর্তি মাল্লাদুটির ছায়ার গলা চেপে ধরেছে। অথচ বাস্তবে ছায়াগুলোর কোনো মালিক নেই। কী অশৈলী কাণ্ড! এগুলো তাহলে কী? মন্দিরের দেওয়ালে আবার তাকাতেই ওরা দেখল এরকম আরো প্রচুর অশরীরী ছায়া অন্ধকার থেকে দেওয়াল ধরে এগিয়ে আসছে।

“ছায়াময় এই ছায়াদ্বীপ!”

কথাটি এমনিই সম্রাটের মুখে চলে এল। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে সম্রাট আর বাবলু ছুটে পালাতে যেতেই বাবলু হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। এরপর বাবলু আর উঠতে পারল না। কারা যেন ওকে চেপে ধরেছে। সম্রাট থমকে দাঁড়িয়ে দেখল, বাবলুর শরীরটা শূন্যে উঠে যাচ্ছে, কোন অদৃশ্য শক্তি যেন ওর চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলছে। বাবলু প্রবল ভয়ে ও যন্ত্রণায় তারস্বরে চিৎকার করে যাচ্ছে। দেওয়ালে ছায়াগুলোর দিকে তাকাতে দেখা গেল বেশ কতগুলো ছায়া বাবলুর ছায়ার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলছে। এ যেন এক ভয়ংকর ছায়াবাজি চলছে। হঠাৎ তড়িৎগতিতে সম্রাটের মাথায় এক অদ্ভুত খেয়াল এল, ‘ছায়াই রাখবে জীবনদীপ’ কথাটির একটাই মানে দাঁড়ায়, জীবন বাঁচাতে ওই ছায়াগুলোর সঙ্গে মোলাকাত করতে হবে হয়তো তার নিজের ছায়ার মাধ্যমেই। খেয়ালটি আসা মাত্রই হাতের আলোকিত কাগজটা আপনা-আপনি শূন্যে উঠে এমন দূরত্বে ভেসে থাকল যে সেই আলোয় সৃষ্ট সম্রাটের ছায়া অন্য ছায়ামূর্তিগুলোর থেকে আকারে বেশ বড়ো হয়ে প্রকট হল। কী চমকপ্রদ! এই দ্বীপটি যত অলৌকিক কাণ্ডকারখানার আঁতুড়ঘর! যাই হোক, সম্রাট এগিয়ে গিয়ে নিজের ছায়ার দিকে নজর করতে করতে এমনভাবে হাত পা চালাতে থাকল যে ওর ছায়া ওই ছায়ামূর্তিগুলোর ওপর ঘুসি আর লাথির বর্ষণ শুরু করল। আর সত্যিই কী অবাক কাণ্ড, সম্রাটের অনুমান সত্যি করে ওই ছায়ামূর্তিগুলো তার ছায়ার প্রহারে ছিটকে ছিটকে পড়তে থাকল। সম্রাটও নিজের শরীরে, হাতে অদ্ভুত স্পর্শ ও সংঘর্ষের অনুভূতি টের পেতে থাকল। সম্রাটের ওই বিশালাকার ছায়ার রুদ্রপ্রতাপে ছায়ামূর্তিগুলো পেরে উঠছে না। সম্রাটের সাহস বেড়ে গেল এতে একটু। ছায়াযুদ্ধে ছায়ামূর্তিগুলো চরম পর্যুদস্ত হয়ে পিছু হঠতে থাকল। বাবলু মুক্ত হল। এবার সম্রাট মাল্লাদুটির দিকে এগিয়ে গেল। কাগজটিও শূন্যপথে সমান দূরত্ব বজায় রেখে শূন্যে ভাসমান থেকে তাকে অনুসরণ করল। সে গিয়ে দেখল, একজনের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গিয়েছে। আরেকজনের অবস্থাও প্রায় আধমরা। সম্রাট নিজের ছায়া দেখে দেখে ছায়ামূর্তিগুলোকে লক্ষ্য করে আবার হাত-পা চালানো শুরু করল। আবার একপ্রস্থ প্রবল ছায়াযুদ্ধ। এই ছায়াযুদ্ধে সেও যে অল্পবিস্তর আহত হচ্ছে না, তা নয়। যাই হোক, সম্রাট নিজের আর সবার প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে এগিয়ে যেতে থাকল। ছায়ামূর্তিগুলো আবার পর্যুদস্ত হয়ে পিছু হঠলে সে বাবলু আর মাল্লাটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকে গেল। এতক্ষণে সম্রাট লক্ষ করল যে মন্দিরটির ভেতরে আরাধ্যা আদিম এক দেবীমূর্তি। মূর্তিটির হাতে যে জিনিসটি, তার সঙ্গে পৃথিবীর একটি জিনিসেরই মিল পাওয়া যায়, বীণা! সম্রাটের মুখ থেকে এমনিই অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, “সরস্বতী!”

সম্রাট গর্ভগৃহে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বেদির পেছন দিকে একটা গুপ্ত দরজা ঘড়ঘড় শব্দ করে খুলে গেল। ওদের অবাক হওয়ার পালা আর শেষ হচ্ছে না। তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে ওরা ওই গুপ্ত দরজা দিয়ে মন্দিরের পেছনে এক গুপ্ত কক্ষে প্রবেশ করল। কাগজটিও সম্রাটকে অনুসরণ করল। গুপ্তকক্ষে প্রবেশ করা মাত্রই আবার দরজাটি ঘড়ঘড় করে বন্ধ হয়ে গেল। এই যাহ্‌, আধমরা মাল্লাটি যে বাইরে গর্ভগৃহে পড়ে থাকল! ওরা অনেক চেষ্টা করেও দরজাটা খুলতে পারল না। আর তো বেরোবার উপায় নেই। ঘরটা কুয়াশাচ্ছন্ন অদ্ভুত ভৌতিক গাম্ভীর্যময়। জ্বলন্ত কাগজটিতে এবার লেখা ফুটে উঠল –

‘করবে সঠিক নির্বাচন, আপন ভাগ্য নির্ধারণ”

তারপরই কাগজটা জ্বলে ছাই হয়ে গেল। কুয়াশায় একটু ঠাহর করতেই ওরা দেখল বিপরীত দিকের দেওয়ালের দুই প্রান্তে বোধ হয় দুটো মশাল জ্বলছে। ওরা এগিয়ে চলল ভয়ে ভয়ে। এগিয়ে গিয়ে দেখে, দেওয়ালের দুই প্রান্তে দুটি দরজা, মশালদুটি ঠিক দরজাদুটির পাশেই দেওয়ালে আঁটা। ওরা দুইজন ঠিক দরজাদুটির মাঝে সমান দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। দুটো মশাল থাকায় মেঝেতে তাদের দুটি করে ছায়া তৈরি হয়েছে। যাক রক্ষা, এবার আরো ছায়ামূর্তি এলে দুটো ছায়া নিয়ে যুদ্ধ করা যাবে। ঠিক তখনই দরজাদুটি ঘড়ঘড় করে খুলে গেল। একটি দরজা খুলতেই তার ভেতর প্রচুর সোনাদানা, হিরেমানিক ওদের চোখ ঝলসে দিল। উরেব্বাস, এ যে সাতরাজার ধন! আর অপর দরজাটি খুলতেই দেখা গেল এক থলে ভর্তি প্রচুর দুষ্প্রাপ্য পুথি। সঙ্গে একটি অদ্ভুত পাথর, যার থেকে হালকা একটি নীলচে আভা বেরোচ্ছে। সম্রাটের মনে প্রবল দ্বন্দ্ব শুরু হল সে কোন দরজায় ঢুকবে। একদিকে অনন্ত বৈভব, আরেকদিকে অসীম জ্ঞান ভাণ্ডার। আজন্ম দারিদ্র তার সঙ্গী, এই টাকাপয়সা ওরা ভাগ করে নিলেও শুধু ওর ভাগে যা থাকবে তা দিয়েই বাকি জীবন সে অনন্ত বৈভবে কাটিয়ে তার কয়েক উত্তরপুরুষরাও কোনো কাজ না করে পায়ের ওপর পা তুলে কাটিয়ে দিতে পারবে। সে নির্লোভ, কিন্তু জীবনে টাকাপয়সার তারও দরকার। তাহলেও সে যে আরো অনেক বেশি করে জ্ঞানের কাঙাল। এতদিন তো সে আরো পড়াশোনা করে জ্ঞানলাভই করতে চেয়ে এসেছে। আর সে বিশ্বাস করে, প্রকৃত জ্ঞানই তাকে প্রকৃত সুখ ও যথোপযুক্ত বিত্ত দেবে। শুধুমাত্র বৈভব কখনোই মানুষকে আত্মিক সুখ দিতে সক্ষম নয়। বরং তা মানুষকে ভোগবাদী করে চিরকাল অতৃপ্ত রাখে। তাই সে মনের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে অসীম জ্ঞান ভাণ্ডারের দরজার দিকে অগ্রসর হল। আর চিরকালের অর্থলিপ্সায় নিমজ্জিত বাবলু ওই প্রাচুর্য দেখে খুশির আতিশয্যে অনন্ত বৈভবের দরজা দিয়ে ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তখনই ঘটল সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং প্রবল হৃদয়বিদারক ঘটনাটি! ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুক্ষণের জন্য ওরা নিজেদের ছায়ার দিকে তাকাতে ভুলে গিয়েছিল। আসলে ওই কক্ষে ছায়াগুলো ছিল ওদের অন্তরাত্মার প্রতিফলন। যেই মাত্র বাবলু প্রাচুর্যের দিকে ধাবিত হয়েছে, তখনি ‘অনন্ত বৈভব’-এর দরজার পাশের মশাল দ্বারা সৃষ্ট ছায়াটি ‘অসীম জ্ঞান ভাণ্ডার’-এর দরজার পাশের মশালসৃষ্ট ছায়া থেকে বড়ো হয়ে যায়, অর্থাৎ তার পাপ ও লোভী সত্তা মুখ্য ও শক্তিশালী হয়ে পড়ে। নিমেষে অশুভ সত্তার প্রতিভূ সেই ছায়া ওর ভালোমানুষি ছায়াকে গ্রাস করে বাবলুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। বাবলুর মর্মভেদী আর্তনাদ ওই গুপ্তকক্ষের দেওয়ালেই প্রতিফলিত হতে থাকল। সম্রাটের কিছুই করার ছিল না। বাবলু ধীরে ধীরে নিজেই ছায়ায় পরিণত হয়ে এই ছায়াদ্বীপে সমাহিত হয়ে গেল। সম্রাটের ক্ষেত্রে ঘটল উলটো, তার ভালোমানুষির জয় হল। প্রকৃত মানবিকতার জয় হল। সে ওই পাথর আর পুথির থলি তুলে ধরতেই কী অবাক কাণ্ড, মন্দিরের সব দরজা আপনা-আপনি খুলে গেল। সে পুথিপত্র ঠাসা থলি আর ওই পাথর নিয়ে বেরিয়ে এল। আধমরা মাল্লাটিকে আর দেখা গেল না। ঠিক তখনই দ্বীপটির মাটি যেন নড়ে উঠল। ভূমিকম্প! সমগ্র দ্বীপটি প্রবলভাবে কাঁপছে। মন্দির ভেঙে পড়তে থাকল। সহসা কান ফাটানো শব্দ! ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি প্রকাণ্ড শব্দ করে জেগে উঠেছে। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে নির্গত ছাই ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশকে ঢেকে ফেলল। লাভা স্রোত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে আসতে থাকল। ওই প্রলয়ঙ্কর রূপ দেখে সম্রাট জঙ্গল-পাহাড় ভেঙে সমুদ্রতটের দিকে দৌড়নো শুরু করল। সেই অপূর্ব ঝরনার সামনে এসে সে ওপর থেকে নদীতে ঝাঁপ দিল। বাবা রে, নদীর জল বেশ গরম হয়ে উঠেছে। পড়িমরি করে ডাঙায় উঠতেই আবার একটা প্রবল কম্পন। মাটি দু-ভাগ হয়ে যাচ্ছে। সর্বনাশ! সম্রাট নীচে তাকিয়ে দেখে মাটি দু-ভাগ হয়ে গভীর খাত হয়ে গিয়ে নীচ দিয়ে লাভা স্রোত বইছে। সম্রাট মরিয়া হয়ে প্রকাণ্ড একটা লাফ দিল। কোনোরকমে লাফ দিয়ে অপর পারে পৌঁছতেই আবার দৌড়। হাত-পা ছড়ে যাচ্ছে তার, কিন্তু থামলে চলবে না, বাঁচার একটা শেষ চেষ্টা করে দেখতে হবে। গাছ ভেঙে পড়ছে। আকাশ থেকে মাঝে মাঝে আগুনের গোলা নেমে আসছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বড়ো পাথর গড়িয়ে পড়ছে। সবকিছু বাঁচিয়ে সে অবশেষে সমুদ্রতটে পৌঁছে যা প্রলয়ঙ্কর রূপ দেখল, তাতে তার বাঁচার আশাই চলে গেল। প্রবল জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে। দ্বীপটা প্রবল ভূমিকম্পের সঙ্গে মনে হয় ডুবে যাচ্ছে। হুশ হুশ করে সমুদ্রের জল দ্বীপের ভেতরে ঢুকে ভূ-ভাগ গ্রাস করা শুরু করল। ওদিকে দ্বীপ থেকে লাভা স্রোত সমুদ্রে মিশে তাণ্ডব শুরু করেছে। চারপাশটা ছাই আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢেকে যাচ্ছে, চারপাশের জল টগবগ করে ফুটছে, ওর মধ্যে থেকেই জলের তলা থেকে উঠে আসা অগ্নিশিখা আর স্ফুলিঙ্গ প্রবল আক্রোশে আস্ফালন করছে।

সম্রাট সমুদ্রতটে সব আশা ছেড়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। কিন্তু ও কী! ওই ধুম্র কুণ্ডলীর মধ্যে থেকে আবছা দেখা যাচ্ছে কী একটা যেন এগিয়ে আসছে! একটু এগিয়ে আসতেই স্পষ্ট হল,  আরে! একটা নৌকা! কী অভাবনীয়, আশ্চর্য ব্যাপার! এটা এখানে এল কী করে? আবার আগ্নেয়গিরিতে প্রবল বিস্ফোরণে চারপাশ কেঁপে উঠল আর দ্বীপটা হুশ হুশ করে ডুবতে থাকল। আর অত কিছু ভাবার সময় নেই। সম্রাট সে নৌকায় কোনোরকমে চেপে বসে দাঁড় বেয়ে দ্বীপটি থেকে দূরে সরে এল। আর দেখতে দেখতে পুরো ছায়াদ্বীপ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে গেল। বাবলু, মাল্লা আর সবাই ওই দ্বীপেই ছায়ারূপে সমাহিত হয়ে গেল। দ্বীপটা ডোবার পরই একটা বিশাল ঢেউ নৌকোটিকে দূরে, অনেক দূরে ঠেলে দিল। টালমাটাল হতে হতে অবশেষে নৌকাটি একসময় স্থির হল।

“উফ্‌, আমি বেঁচে আছি!” সম্রাট ঈশ্বরকে অস্যংখ্য ধন্যবাদ দিল। এ এক অনন্য রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা!

ধাতস্থ হওয়ার পর সম্রাট ওই অদ্ভুত পাথরটা বের করে দেখতে থাকল। পাথরটা থেকে এক অপার্থিব নীল আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। হঠাৎ সে তার নিজের মধ্যে এক পরিবর্তন উপলদ্ধি করতে শুরু করল। জগতের সব ছলচাতুরি কলুষতাগুলো যেন এখন সে পরিষ্কার চিনতে বুঝতে পারছে। সে আর অতি সরলটি নেই, বিচক্ষণ হয়ে উঠছে। মাথা খুলে যাওয়াতে সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল। সমগ্র ঘটনাটিকে সে এবার নিজের মতো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল।

আমাদের ত্রিমাত্রিক জগৎ ছাড়াও আরও বহুমাত্রিক জগৎ হয়তো অবশ্যই আছে এবং প্রতি জগতেই আমাদের প্রত্যেকের একটি করে অস্তিত্ব ও সত্তা আছে। প্রতিটি সত্তাই একে অপরের প্রতিফলন। এক-একটি জগতে আমাদের সত্তার এক-একটি বৈশিষ্ট্য। আর এই ছায়াদ্বীপ ওই বহুমাত্রিক জগতের সংযোগস্থল যেখানে এক-একটি সত্তার যোগাযোগ, সংঘর্ষ যাই হোক, সেটা ঘটে ওই ছায়ার মাধ্যমেই। এমনকি অন্য মানুষের বা প্রাণীর সত্তার সঙ্গেও যোগাযোগ বা সংঘর্ষের মাধ্যম ওই ছায়া। আর যে সত্তা সংঘর্ষে জয়লাভ করে সেই সত্তাই তার নিজের মতো করে স্বতন্ত্র জগতে অস্তিত্ব বজায় রাখে। এই ছায়াদ্বীপ প্রকৃতই মানুষের বিবেকের দর্পণ স্বরূপ। বাবলুদের নষ্ট হয়ে যাওয়া মানবিকতা ও লোভই ওদের ওই পরিণতির জন্য দায়ী। বাবলু বা ওই মাল্লারা যে এখন কোন মাত্রার জগতে চলে গেছে সম্রাটের জানা নেই, তবে সেই মাত্রা কখনোই শুভ হতে পারে না। আচ্ছা, এরাই কি তবে ভূত? অপদেবতা? হয়তো তাই-ই। আবার সমগ্র ঘটনায় যে অলৌকিক শক্তির অস্তিত্ব অদ্ভুত অদ্ভুত উপায়ে সম্রাটের পরীক্ষা নিল, সাহায্য করল, তিনি বা তাঁরা কে? হয়তো আরো উন্নত কোনো বহুমাত্রিক জীব, আর ওই অলৌকিক কাগজ, অদ্ভুত ঘূর্ণিঝড় বা এই পাথর, পুথি এবং সর্বশেষে এই নৌকা পাঠিয়ে তার প্রাণ বাঁচানো, সবই তাঁর বা তাঁদের অতীব উন্নত বহুমাত্রিক প্রযুক্তির ফসল। হয়তো এদেরকে বা এঁকেই আমরা সর্বশক্তিমান ভগবান বলে পূজা করি। হয়তো বিধাতাই এই ছায়াদ্বীপে অনন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার স্বরূপ এইসব পুথি আর এই পাথর দিয়ে শিক্ষা দিয়ে গেলেন যে প্রকৃত জ্ঞান আর মানবিকতার ওপরে আর কিছুই হয় না এবং কখনো এর বিনাশ নেই।

সে উপলদ্ধি করছে, তার ভাগ্যের চাকা এবার সত্যিই অন্যদিকে ঘুরতে চলেছে। এখন তাকে ফিরতে হবে। সে আবার পড়াশোনা শুরু করবে এবার। কিন্তু এখন সে এই মাঝসমুদ্রে যাবে কোনদিকে যেখানে সে নিজেই তার অবস্থান সম্বন্ধে অজ্ঞাত! আর মোবাইলটিও তার কাছে নেই। যাই হোক, ওই রহস্যময় জায়গা থেকে ওই ছোটো নৌকায় ফেরার ঘটনাটিও কম চমকপ্রদ নয়। তবে সে এক অন্য গল্প।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ অনির্বাণ সরকার


7 comments:

  1. অদ্ভুত সুন্দর গল্প, সত্যিকারের শিশু-কিশোর উপযোগী বলতে যা বোঝায় - সঠিক উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। লেখককে অনেক প্রশংসা আর শুভেচ্ছা, এরকম লেখা আরো চাই। সঙ্গের ছবিটিও সার্থক।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অজস্র ধন্যবাদ। গুরুদেবের ভালো লেগেছে বলে কথা! 😊😊

      Delete
  2. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  3. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  4. Replies
    1. আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনাদের ভালো লাগলে মন থেকে খুশি খুশি লাগে।

      Delete
  5. কী বলি! অসাধারণ লাগলো লেখাটা। সার্থক শিশু কিশোর সাহিত্য। সঙ্গের বার্তাটিও খুব সুন্দর। বৈভব নয়, জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ। অনেক অনেক অভিনন্দন রইল লেখকের জন্যে। আপনার নতুন লেখার অপেক্ষায় রইলাম অনির্বাণ বাবু।

    ReplyDelete