ছোটো গল্পঃ অন্ধকার নামে যখন - সঞ্জয় কর্মকার


অনেকটা পথ সাইকেল চালাতে চালাতে এখন বেশ হাঁপিয়ে উঠেছে ফটিক। পরনের ফতুয়াটা জবজবে ঘামে ভিজে লেপটে আছে শরীরের সঙ্গে। অথচ দু-দশ মিনিট কোথাও বসে একটু যে জিরিয়ে নেবে সেই সুযোগটাও নেই। রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলো অনর্গল দাঁত- মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে তেড়ে আসছে। দুয়েকটা নেড়ি আবার সাইকেলের গতির সঙ্গে টক্করও দিচ্ছে মর্জিমাফিক। অথচ এই দাঁতালদের ভয়ে রণে ভঙ্গ দিলেও চলবে না। কাজটা আজই সারতে হবে। এর আগে তিন-তিনবার চান্স নিয়েও সফল হয়নি ও। তার মধ্যে একবার তো হাতেনাতে ধরাই পড়ে যাচ্ছিল। উফ, বেতাই গ্রামের নিশিকান্ত রুইদাস কী যে ঘাঘু লোক! ব্যাটা রাতদুপুরে জ্যোৎস্না দেখার নাম করে সারা বাড়ি হুড্ডি খায়, আর পাঁচ-সাত মাইল উজিয়ে আসা নিরীহ চোরদের বেকুব বানিয়ে দিব্যি ফাঁদে ফেলে। ফটিকের এখনও স্পষ্ট মনে আছে, চারদিকের নিস্তব্ধতায় সেদিন রাতে পরম শান্তির ঘুম দিচ্ছিল নিশিকান্ত রুইদাস। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে হাতসাফাইয়ের কাজটা ফটিক তখন প্রায় সেরেই ফেলেছে। একে একে ওর ঝোলার মধ্যে ঢুকে গেছে রান্নার গামলা থেকে মান্নার আমলা পাচক সবই। নিপুণভাবে কাজটা সারার জন্য নিজেকে নিয়ে বেশ গর্বও হচ্ছিল ওর। কিন্তু গোল বাধাল একটা পড়ার বই। অন্ধকারে বইটা পায়ে ঠেকতেই হাতের টর্চ জ্বেলেছিল ফটিক। আর তখনই তো মেজাজটা খিঁচড়ে গেছিল ওর। আহা, কী বই পড়ছে বেউল্লুক নিশিকান্তটাー‘চোর ধরার একশো একটা সহজ উপায়’! লেখক দেউলিয়া চাকলাদার। চরম রাগে ফটিক বইটা হাতে নিয়ে যেই না জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলতে যাবে, ঠিক তক্ষুনি বুক কাঁপানো শব্দে মাটিতে ছিটকে এসে পড়েছিল একটা সত্যনারায়ণ  পুজোর ঘণ্টা। ফটিক তো থ। বেআক্কেলে নিশিকান্তটা বই আর ঘণ্টা একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে! ব্যস, সেই শব্দ কানে যেতেই হুড়মুড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে চিলচিৎকার জুড়ে দিয়েছিল নিশিকান্ত, “বলি, কোন হতচ্ছাড়া এই রাতদুকুরে বাড়ি বয়ে মশকরা করতে এসেছিস রে! দাঁড়া, তোকে আজ মুগুর ভাঁজা করব।”

সেই চিৎকার শুনে মুহূর্তেই পাশের ঘর থেকে কে যেন একজন উইসন বোল্টের গতিতে ছুটে  আসছিল। কিন্তু ততক্ষণে ফটিক হাতের ঝোলা ফেলে নিশিকান্তর বাড়ির পাঁচিল টপকে গেছে।

সেদিন থেকেই নিশিকান্তর ওপর বেজায় খাপ্পা ফটিক। মনে মনে ও প্রতিজ্ঞা করেই রেখেছিল, নিশিকান্তর মতো কুচুটে লোকের বাড়িতে বড়সড় কোনও দাঁও মারতে পারলেই এগারো জন সৎ ব্রাহ্মণ আর একত্রিশ জন নিষ্ঠাবান কাঙালিকে ডেকে এনে একবেলা ভরপেট খাওয়াবে ও। শেষমেশ অ্যাদ্দিন পর সেই সুবর্ণসুযোগটা এল!

নিশিকান্তর বাড়ির সামনে এসে ফটিক সাইকেলটাকে একটা বেলগাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখল। এখন স্রেফ পাঁচিলটা টপকাতে পারলেই মনোবাঞ্ছাটা পূরণ হবে ওর। নাহ্‌, এবার বেশ সাবধানে পা ফেলতে হবে! তাছাড়া না বুঝে শুনে আলটপকা কোনও জিনিসপত্রে হাতও দেওয়া যাবে না। আগেরবার পড়ার বইয়ের সঙ্গে একটা ঘণ্টা বেঁধে রেখেছিল। এবার হয়তো ঘণ্টার সঙ্গে ওর নিজের ঠ্যাংও বেঁধে রাখতে পারে নিশিকান্ত। আর তখনই…

কথাটা ভাবতেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল ফটিকের। সত্যি, চুরির পেশায় আগের মতো শান্তি আর নেই। আহা, ক’বছর আগেও তো গেরস্থের বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে ভালোমন্দ না খেয়ে আসার উপায় ছিল না। রান্নাঘরে পরম যত্নে রাখা থাকত চালকুমড়োর ছেঁচকি কিংবা মাখা সন্দেশের ‘ডেচকি’। নাও, কত খাবে খাও। এমনও হয়েছে, পেটভরে সুজির পোলাও  খাওয়ার পর চোখ টেনে ঘুম এসে গেছিল ওর। শেষমেশ ঘুমিয়েও পড়েছিল তালে-বেতালে। তবুুও বিপদ কিছুই হয়নি। বরং ভোরবেলা কে যেন একজন মোলায়েম সুরে ডেকে বলেছিল, ‘যা বাপ, এবার বাড়ি যা। আহা রে, ঘুমন্ত মুখখান দেখলেও বড়ো মায়া লাগে! কে বলবে এ চোর! এ যে সাক্ষাৎ  বিষ্ণু।’

সেদিন এক বুক গর্ব নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল ফটিক। বারবার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল একটাই বাক্য, ‘এ যে সাক্ষাৎ বিষ্ণু।’ অথচ সারাজীবন লোকের মুখ থেকে শুনে এসেছে, ‘ফটিকটা একটা  হাঁড়িচাচা। যেমন উদ্ভট চেহারা, তেমন বেচাল স্বভাব।’ তখন ভারি কষ্ট হত ওর। মানুষকে মনে হত এই পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত জীব। কিন্তু নাহ্‌, সব মানুষ সমান হয় না। এখনও এ পোড়া দুনিয়ায় দেবতাগোছের লোক কিছু আছে। আর তার নমুনা ওই গেরস্থ। যদিও ফটিক পরে লোকমুখে জানতে পেরেছিল সেই গেরস্থ বিষ্ণু নামের তার এক দুঃসম্পর্কের ভগ্নিপতির কথা বলেছিল। সুতরাং সেখানে অবতারের কোনও ভূমিকাই ছিল না। তবুও ওর দুঃখ হয়নি একটুও।

ফটিক অত্যন্ত সন্তর্পণে নিশিকান্ত রুইদাসের ঘরের জানালার সামনে এসে দাঁড়ায়। এবার উঁকিঝুঁকি মেরে ঘরের ভিতরটা একবার দেখার চেষ্টা করে ও। নিশিকান্ত ঘরর-ঘরর শব্দে নাক ডাকছে কি না তা কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে বারবার। হ্যাঁ, কীসের যেন একটা শব্দ হল! এ কি, এত রাতে নিশিকান্তর কানের কাছে মোবাইল ফোন বাজছে! ব্যাটা চুরির আঁচ পেয়ে পুলিশ-টুলিশকে টুক করে খবরটা দিয়ে রাখেনি তো? তাই হয়তো থানা থেকেই…

বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল ফটিকের। মনে পড়ে গেল সেই সর্বনাশা বইটার কথা। ‘চোর ধরার একশ একটা…’

দুয়েকবার রিং হতেই কলটা চট করে রিসিভ করল নিশিকান্ত। তারপর  নিশ্চল হয়ে ফোনের ও-প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কথাগুলো শুনে বলতে শুরু করল, “তোরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর  থেকে আমি ভালো নেই রে খোকা। একটা রাতও চোখে ঘুম আসে না। বারবার শুধু মনে হয় তুই বুঝি কোনও বিপদে পড়ে ডাকছিস আমাকে। আর অমনি আমি ছুট্টে চলে যাই তোদের ঘরের সামনে। বাড়িময় খুঁজে বেড়াই তোর ছোটবেলার একেকটা চিহ্ন। তোদের চলে যাওয়ার পর এই একলা ঘরে বড়ো কষ্টে আছি রে খোকা। বড়ো…”

আর কথা বলতে পারে না নিশিকান্ত রুইদাস। লোকটা কি কাদঁছে এখন! বুঝতে পারে না ফটিক। জানালার কার্নিশে এতক্ষণ শক্ত করে ধরে রাখা দুটো হাত ক্রমশ শিথিল হতে থাকে ওর। এবার ঝট করে পাঁচিল ডিঙিয়ে ফটিক নেমে আসে রাস্তায়। নিকষ অন্ধকার সামনের রাস্তাটাকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে। ফটিক পিছন ফিরে একচিলতে আলো দেখার অপেক্ষায় অপলক তাকিয়ে থাকে নিশিকান্তর ঘরের দিকে।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল


1 comment:

  1. শেষটুকু মায়াভরা। ভাল লাগল

    ReplyDelete