কচিপাতাঃ গল্পঃ ভাই - ক্ষিতিকা বিশ্বাস


“উউফ্!” বাবার গলায় এবার বিরক্তি।

আসলে সকাল থেকে এতবার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছি যে মা আজ ভাইকে নিয়ে আসবে তো? প্রথম কয়েকবার বাবা হ্যাঁ বললেও কখন যে ভাই আসবে কিছুতেই বলতে চাইছে না। আমিও ছাড়বার পাত্রী নই। কতদিন ধরে আবদার করেছি সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে এমন একটা ভাই আমার চাই-ই চাই। তাই...

“চল, এবার বাস ছেড়ে দেবে।” বাবা বেশ রেগেমেগেই বলল।

আমি মনে মনে ভাবলাম, সেটাই তো ভালো, তাহলে তো আমি ভাই এলেই কোলে নিয়ে আদর করতে পারব।

বাবা বাসে তুলে দেওয়ার সময় অন্যদিনের মতন হামি দিল যদিও আমি এখন আর সেটা একদম পছন্দ করি না। বাসের পুঁচকেগুলো পর্যন্ত হাসাহাসি করে, ক্লাস সেভেনের মেয়েকে বাবা-মা স্কুল বাসে তুলে দেওয়ার সময় হামি দেয় দেখে। কিন্তু এদের কে বোঝাবে!

বাসে উঠে আমি রোজ ছোট্ট করে একটু ঘুমিয়ে নিই। ঘুমটা ভাঙে যখন মেইন রাস্তা থেকে বাসটা বাঁক নিয়ে স্কুলের সামনের সরু রাস্তাটায় ঢোকে। আজও ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্ন দেখলাম ভাইয়ের সঙ্গে খেলছি। ওকে চান করাচ্ছি, কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

স্কুলে আজ কিছুতেই সময় কাটতে চায় না। সায়েন্স আমার কখনোই খুব ভালো লাগে না, তার উপর ম্যাথসসুদ্ধু চার-চারটে সায়েন্স পিরিয়ড। মনটা বাড়িতেই পড়ে আছে। বন্ধুরা এইসব বোরিং ক্লাসের মাঝেই হাসি-মজা করে যাচ্ছে। প্রণীতা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ওরই জানার কথা কেন আজ আমার ক্লাসে মন নেই। কিন্তু ও তো আজ আসেনি। তাই আরো যেন অসহ্য লাগছে। বড়ো টিফিন ব্রেকে স্যান্ডউইচ খেতে খেতে ভাবতে লাগলাম ভাইকে কী নামে ডাকব। অনেক ক’টা নাম মা, বাবা, আমি তিনজনে মিলে ভেবে রেখেছি। দেখা যাক কোন নামটা শেষপর্যন্ত ঠিক হয়।

একটা করে পিরিয়ড শেষ হচ্ছে আর আমার মনের আনন্দ ততই বাড়ছে। ম্যাথস ক্লাসে বকুনি খেলাম জোর! বাইরে জানালার দিকে তাকিয়ে কী যে ভাবছিলাম নিজেই জানি না। ম্যামের প্রশ্নগুলোর একটাও ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলাম না। দাঁড়িয়ে থাকতে হল বাকি ক্লাস। বাড়িতে বাবা-মার প্রচুর বকুনি খেলেও স্কুলে আজ পর্যন্ত কোনোদিন এরকম পানিশমেন্ট হয়নি আমার। তাই একটু মনখারাপও হল। কিন্তু একই সঙ্গে ভাইয়ের কথা আবার মনে হওয়াতে সেটা হাওয়ায় ভ্যানিশ হয়ে গেল।

দুটো বাজতেই দৌড়লাম মেইন গেটের দিকে। আজ আমি বাসে ফিরব না। বাবা এসে নিয়ে যাবে। বাবা সবসময় লেট করে, কিন্তু আজ দেখি গেটের বাইরে আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে আগে থেকেই। কাছে গিয়ে প্রশ্ন করার আগেই বাবা বলল, “তোমার ভাই এসে গেছে।”

আমি তো শুনে এত খুশি হলাম যে বাবাকে একটার জায়গায় দু-দুটো হামি দিয়ে দিলাম। একটু আবদার করলাম যে ভিডিও কল করে দেখি। কিন্তু বাবা বলল, ভাই নাকি এখন ঘুমোচ্ছে। যাই হোক, এতদিন যখন অপেক্ষা করতে পেরেছি তখন আর নাহয় আধঘণ্টা বেশিই করব।

বাড়ি পৌঁছেই চটপট জুতো খুলে, সোফার ওপর পিঠের ব্যাগটাকে ছুড়ে দিয়ে গুটি গুটি পায়ে বেডরুমে ঢুকলাম। মা বলল, “বাইরে থেকে এসেছ, হাত-পা-মুখ ভালো করে ধুয়ে এসো।”

একটু উঁকি মেরে দেখলাম মায়ের পিছনে বিছানায় একটা সাদা তোয়ালে মোড়া ছোট্ট একজন... ওটাই তাহলে ভাই! হাতমুখ ধুতে ধুতে মনে পড়ল যে আমি তো ছোট্ট বাচ্চাদের কোলে নিতে একদম পারি না। ভয় লাগে কখন যে বেসামাল হয়ে পড়ে যাবে। তাহলে, ভাইকে কী করে কোলে নেব?

ঘরে ঢুকে দেখি মা ওকে কোলে নিয়ে বসে আছে। চোখদুটো বোতামের মতন গোল, বাদামি রঙের মণি। কানদুটো বড়ো বড়ো। কী মিষ্টি দেখতে! আধো ঘুমে চোখ পিটপিট করছে। ভাগ্যিস ওর গায়ে জড়ানো তোয়ালেটা নিঃশ্বাসের তালে তালে উঠছে নামছে, নাহলে সফট টয় বলে ভুল করবে যে কেউ।

“মা, কোলে নেব ভাইকে?”

“বিছানায় বসে নিতে পারিস, কিন্তু খুব সাবধানে।”

মা হাত বাড়িয়ে দিতে আমি দু-হাত বাড়িয়ে ওকে নিলাম। একদম হালকা। কোলে নিতেই একটু নড়েচড়ে উঠল।

“কী সুইট দেখতে গো ওকে! আমি ওকে চিকু বলে ডাকব।”

“আচ্ছা, সে নাহয় ডাকিস। তবে ওকে এখন খাওয়াতে হবে। তুইও চান করে খেয়ে নে। অনেক বেলা হল।”

মায়ের কথাটা শুনতে শুনতে আমার হাতদুটো ভিজে আর গরম হতে থাকল। বুঝতে পারলাম যে উনি হিসি করে দিয়েছেন। একটু উপরে যেই ওকে তুলেছি, নাকের ভেতর কী যেন একটা সুড়সুড়ি দিল। মা ভাগ্যিস ওকে চট করে কোলে নিল, নাহলে হয়তো হাঁচতে গিয়ে ফেলেই দিতাম। নাক-মুখ মুছতে মুছতে বুঝলাম, ওটা ছিল চিকুর লেজ!


___


অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক


10 comments:

  1. Well-written, darun laglo .. 😊👍👍

    ReplyDelete
  2. শেষের লাইন টা পুরো বাঁধাধরা চিন্তা টাকে পরিবর্তন করে দিলো। তোমার গল্প পড়ে তোমার পিসির কথা মনে পড়ে গেল। যে তোমার বাবা আর জ্যাঠামশাই কে ভাই ফোঁটা দিত। ডায়না।

    ReplyDelete
  3. খুব সুন্দর।

    ReplyDelete
  4. Darun likhechhe. Sheshta anobodyo.

    ReplyDelete
  5. Khub bhalo likhecho 👏👏
    Keep it up

    ReplyDelete
  6. Darun darun!!! Very nice twist! 👏👏👏

    ReplyDelete
  7. ক্ষিতিকা তুমি পারফেক্ট দিদি। এমন সুন্দর অনুভূতি না হলে আসবে কেন? খুব সুন্দর লিখেছ।

    ReplyDelete