বড়ো গল্পঃ গোলকুণ্ডায় গণ্ডগোল - দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়


গোলকুণ্ডায় গণ্ডগোল


দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়

 


(১)

 

পরীক্ষা শেষ করে সেন্ট জর্জেস স্কুলের গেটে এসে দাঁড়ায় রুবাই। আকাশ তখনো লিখছে, একবার আড়চোখে দেখেছিল ও। ওদের স্যার অন্বয়দা শান বাঁধানো পিপুলগাছটার নীচে বসে ছিলেন ওদের অপেক্ষায়। কালকেই আকাশ আর রুবাই এসে পৌঁছেছে তেলেঙ্গানায়। ন্যাশনাল ম্যাথ অ্যান্ড সায়েন্স অলিম্পিয়াডের পরীক্ষা দিতে ওরা এসেছিল এবার এই হায়দ্রাবাদে। অন্বয়দা স্কুলের তরফ থেকে ওদের নিয়ে এসেছিলেন। পরীক্ষার পর ওরা দু-দিন তেলেঙ্গানা ঘুরে বাড়ি ফিরবে, এভাবেই প্ল্যান করা ছিল। আজ আপাতত লাঞ্চের পর ওদের গন্তব্য গোলকুণ্ডা ফোর্ট।

অন্বয়দা ওদের গেম টিচার হলেও ইতিহাস থেকে কারেন্ট এফেয়ার্স—সবেতেই ওঁর দারুণ দখল। অন্বয়দা আগেও এসেছেন এই গোলকুণ্ডা ফোর্টে। তাই গাইড ছাড়াই তিনি ফোর্টটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন ওদের।

মুল ফটকের উপরের ছাদটা কেমন বরফির মতো নকশা কাটা, বহুদূরে পাহাড়ের মাথায় মহলের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে। অন্বয়টা ওদের বললেন, “এখান থেকে কিছু বললে তা ওই নকশায় ধাক্কা খেয়ে পাহাড়ের মাথায় মহলের একটা অংশ থেকে পরিষ্কার শোনা যায়। বাইরে থেকে কেউ এলে দুর্গ রক্ষকরা এভাবেই উপরে খবর পাঠাত। কতবছর আগের আর্কিটেকচার, কত উন্নত ভাব একটু।”

“এত বড়ো দুর্গ কুলী কুতুব শাহ বানিয়েছিলেন?” আকাশ জানতে চায়।

“প্রথম কাকাতিয় রাজবংশ এই দুর্গ তৈরি করেছিল, সেটা ছিল মাটির। বাহমনিদের হাত ঘুরে তাতে রাজত্ব করেছিল কুলী কুতুব শাহর বংশধরেরা। তাঁরা গ্রানাইটের এই বিশাল দুর্গ তৈরি করেন। এই দুর্গ প্রায় ৪ কিলোমিটার পরিধি নিয়ে বিস্তৃত ছিল। হায়দ্রাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পরে ১৫৯০ অবধি এটি কুতুব শাহী রাজবংশের রাজধানী ছিল। দুর্গটি ১৬৮৭ সালে পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয় এবং যখন মুঘল শাসক আওরঙ্গজেব হায়দ্রাবাদ দখল করেন তখন দুর্গটি মুঘল অধীনে চলে আসে।”

“বাবা বলেছিল, এই দুর্গেই প্রথম কোহিনূরের অকশন হয়।” রুবাই বলে।

“ঠিক। শুধু কোহিনূর কেন, হোপ ডায়মন্ড থেকে শুরু করে অনেক বিখ্যাত হীরা এই গোলকুণ্ডার হীরার খনিতে পাওয়া গেছিল। গোলকুণ্ডার হীরা হত আয়তনে বেশ বড়ো আর উজ্জ্বল। এর দাম সবসময় বেশি ছিল।” অন্বয়দা ওদের বুঝিয়ে বলেন।

দু-ধারে বাগান আর লনের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দর্শকের ভিড়। ওরা এগিয়ে যায়। দুর্গের বাইরের দিকে দুটো আলাদা প্যাভিলিয়ন রয়েছে। ভিতরে দিকে রয়েছে আশলাহ খানা, বন্দিশালা, হাবশি কামান, উটের আস্তাবল, নাগিনা বাগ, আম্বরখানা ইত্যাদি।

একটা জায়গা দেখিয়ে অন্বয়দা ওদের বলেন, “এখানেই কোহিনূরের প্রথম অকশন হয়। এই জায়গায় বসত বিশাল বাজার। ওই যে চৌবাচ্চার মতো দেখছিস, ওতে টলটল করত জল। নবাব, বেগম এখানে দোলনায় চড়ে জলের উপর দোল খেতেন। দাসেরা খিদমত খাটত। সামনের ওই খোলা জায়গাতে হীরার বাজার বসত, কোহিনূর থেকে হোপ ডায়মন্ড, আরো সব বিখ্যাত...”

 “ডু ইউ নো দ্য হিস্ট্রি অফ হোপ ডায়মন্ড?” একটি ফরেনার ভদ্রলোক ওদের পাশেই হাঁটছিলেন। তিনি হঠাৎ প্রশ্নটা করেন অন্বয়কে।

 “সেটা তো ১৯৫৮ সাল থেকে স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামে রয়েছে জানি।” ইংরাজিতে অন্বয়দা বলেন ভদ্রলোককে।

“না, আমি ওটার ইতিহাস জানতে চাইছি। এই গোলকুণ্ডাতেই পাওয়া গিয়েছিল হোপ ডায়মন্ড। তারপর... এক্সকিউজ মি প্লিজ!” বলে হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে ভদ্রলোক একটা ভাঙা দেওয়ালের পিছনে চলে গেলেন।

সামনে একটা বড়ো দল হইহই করে ছবি তুলছে। পিছনেও বেশ কিছু টুরিস্ট একটা কামানকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গাইডের মুখে ইতিহাস শুনতে ব্যস্ত। রুবাই চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলে, “এভাবে চলে গেলেন কেন? ভয় পেলেন মনে হল!”

“না। ওইদিকে দেখ।” আকাশ দেখায় ওই ভগ্ন দেওয়ালটার শেষে রয়েছে পাবলিক টয়লেট। বলে, “জোর পেয়েছিল বোধ হয়।”

ততক্ষণে অন্বয়দা ছবি তুলতে তুলতে একটা মসজিদের দিকে এগিয়ে গেছে। ওরাও এগিয়ে যায়।

বেশ কিছু সিঁড়ি ভেঙে ওরা অনেকটা উঠে এসেছিল। পরিত্যক্ত পরিখায় এখন শ্যাওলার আস্তরণ। দ্বিতীয় মসজিদ পার করে ভগ্নপ্রায় দুর্গের উপর থেকে চারদিক দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। রুবাই মাঝেমধ্যেই ওর দূরবীনটায় চোখ রাখছিল। অন্বয়দা ওদের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা বলতে বলতে এগোচ্ছিল। দুর্গের একটা অংশ প্রায় ধ্বংসস্তূপ। হঠাৎ সেদিকে দূরবীন তাক করে রুবাই দেখতে পায় একটু আগে দেখা সেই বিদেশি ভদ্রলোককে। সঙ্গে আরো দু’জন ভারতীয়। কিন্তু লোকগুলো যেন কেমন! ওরা ওই বিদেশি ভদ্রলোককে টেনে নিয়ে আবার একটা ধ্বংসস্তূপের ভেতর ঢুকে পড়ল।

ওদিকে অন্বয়দা আর আকাশ আরও এগিয়ে গেছে। বাধ্য হয়েই রুবাই ওদের ফলো করে। আসলে অন্বয়দার ইতিহাসের গল্প ওকে ভীষণ টানছিল। দুর্গের মাথায় এক বিশেষ জায়গায় দাঁড়িয়ে ওরাও শুনতে পেল তালির আওয়াজ। অন্বয়দা বলল, “নীচের ওই ফতেহ দরোয়াজাতে দাঁড়িয়ে গাইডরা তালি বাজাচ্ছে, এটা সেই শব্দ।”

মহলের ধ্বংসাবশেষ দেখতে দেখতে ওরা এগিয়ে চলেছে। এদিক দিয়েও একটা সিঁড়ি রয়েছে। আকাশ বলে, “এই গোলকুণ্ডার ভেতরেই হীরার খনি ছিল?”

“এখানেও ছিল, তবে বেশিরভাগ কোল্লুরে কৃষ্ণা নদীর ধারে ছিল খনিগুলো। পরে ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। নদীও গতিপথ বদলে গ্ৰাস করে নিয়েছে সেসব শুনেছি। অনেক ঐতিহাসিক বলেন এই দুর্গের ভেতর নাকি বেশ কিছু সুড়ঙ্গ রয়েছে, যা সেসব খনির সঙ্গে যুক্ত। যুদ্ধবন্দিদের ক্রীতদাস বানিয়ে খনিতে কাজ করানো হত সে সময়।”

কথা বলতে বলতে ওরা চলে এসেছিল দুর্গের পিছন দিকে। প্রায় এক কিমি হেঁটে কুতুব শাহী সমাধি দেখে ওরা এগিয়ে যাচ্ছিল তারামতি বরাদরি দেখতে। এদিকটায় টুরিস্ট কম। শর্টকাটের জন্য ওরা একটা ধ্বংসস্তূপের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল। একজন মুসলমান ফেজ টুপি পরা মাঝবয়সী লোক ওদের ওদিকে যেতে দেখে বলল, “উস বিরানে মে মত যাইয়ে জনাব, সাপ বিচ্ছু কা ডর হ্যায় উধার।”

একটা লাল বলের মতো সূর্যটা তখন দূরে একটা টিলা পাহাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়তে চলেছে। ওরা ফিরে আসছিল মক্কা দরজার দিকে। হঠাৎ একটা হট্টগোল ভেসে আসে। আর একটু এগোতেই একটা ধ্বংসস্তূপের আড়ালে দৃশ্যটা ওরা দেখতে পায়।

সেই বিদেশি ভদ্রলোক একটা ঝোপের আড়ালে পড়ে রয়েছেন, রক্তে ভেসে যাচ্ছে গলা, বুক। রুবাইয়ের বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। চারদিকে ভিড়ের ভেতর চোখ বুলিয়েও ও অন্য লোকগুলোকে দেখতে পায় না যাদের ও দূরবীন দিয়ে দেখেছিল। মুহূর্তের ভেতর পুলিশ এসে গেছিল, ভিড় বাড়ছে ধীরে ধীরে। ওদিকে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো শুরু হবে বলে অন্বয়দা উশখুশ করছে। অমিতাভ বচ্চনজির গলায় এই দুর্গের ঐতিহাসিক আখ্যান শোনার ইচ্ছাও প্রবল। পুলিশের দুই অফিসার পরীক্ষা করছিলেন। একজন তেলেগু ভাষায় কিছু বলছিলেন। ধারালো কিছু দিয়ে লোকটার গলার নলি কেটে দিয়েছে আততায়ী। অন্বয়দা দু’জন লোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন। সবার চোখে ভয়। ফরেনসিক টিম আসায় সবাইকে সরিয়ে দিল পুলিশ।

অন্বয়দার সঙ্গে রুবাই আর আকাশ এগিয়ে যায় যেখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো হবে। কিন্তু শুনল ওই ঘটনার জেরে আজ শো আর হবে না। সবাইকে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে।

একটা গাইডের সঙ্গে কথা বলছিল রুবাই। ওই বিদেশি ভদ্রলোক এই গোলকুণ্ডা ফোর্টে গত কয়েক সপ্তাহে নাকি বেশ কয়েকবার এসেছেন। উনি একটা কিছু রিসার্চ করছিলেন। ভদ্রলোক লিভারপুল থেকে এসেছিলেন এদেশে। নাম রজার পিট।

রুবাইয়ের বার বার সেই লোকদুটোর কথা মনে পড়ছিল। ও অন্বয়দাকে বলে, “আমি ওঁকে দুটো লোকের সঙ্গে ওই ধ্বংসস্তূপের ভেতর ঢুকতে দেখেছিলাম। সেই লোকদুটোকে এখন আর কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।”

“এইধরনের টুরিস্টদের সঙ্গে প্রচুর টাকা থাকে। অনেক সময় এরা অ্যান্টিক পাচারকারী বা স্মাগলারও হয়। হীরার কথা জানতে চাইছিল লোকটা!” অন্বয়দা বলে।

চেরুভু লেক দেখে ওদের বিড়লা মন্দির ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটা মৃত্যুকে এতটা কাছ থেকে দেখার পর আপাতত কারোর কিছুই ভালো লাগছিল না। ওরা তাই সেদিন হোটেলে ফিরে আসে।

হোটেলের একটু দূরে চারমিনারের আলোগুলো ঝলমল করে জ্বলছিল। ডিনার করতে করতে অন্বয় দার কাছে ওরা শুনছিল কুতুব শাহী বংশের গল্প। কিন্তু রুবাইয়ের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল ওই রজার পিট ও তার দুই সঙ্গীর মুখ।

পরদিন ভোরে ওদের নাগার্জুনা সাগর দেখতে যাওয়ার কথা, তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল সবাই।


(২)


লঞ্চের আপার ডেকের রেলিংয়ে ভর দিয়ে নার্গাজুনা সাগরের বুকে ঝুড়ি নৌকাগুলোর ভেসে যাওয়া দেখছিল রুবাই আর আকাশ। ও কোথাও পড়েছিল ওই ঝুড়িগুলোকে কোরাকেল বলে। কয়েকজন ফরেনার ঘুরছে ওই কোরাকেলে চেপে।

আপাতত ওদের গন্তব্য নাগার্জুনা সাগরের বুকে ছোট্ট দ্বীপ নাগার্জুনাকুণ্ডা। আসার পথেই অন্বয়দা ওদের গল্প বলেছিলেন যে কৃষ্ণা নদীতে বাঁধ দিয়ে এই বিশাল জলাধার বানানোর কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৫৫-তে নেহেরুজির হাত ধরে। ১৯৬৭-তে তা সম্পূর্ণ হয়। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট দীর্ঘ জলযাত্রার পর ওরা এসে নামে এই দ্বীপভূমিতে। লঞ্চে প্রায় একশো লোক, সবাই টুরিস্ট। ভারতীয়র সংখ্যাই বেশি।

এখানে আসার পথে লঞ্চেই অন্বয়দা ওদের বলেছিলেন, “একসময় এই অঞ্চলে ইক্ষ্বাক্ষু বংশের রাজারা রাজত্ব করত। নাগার্জুনাকুণ্ডায় বেশ কিছু বৌদ্ধ বিহার ও প্রাচীন স্থাপত্য এই বাঁধ তৈরির সময় জলের তলায় তলিয়ে যায়। তবে বেশ কিছু স্থাপত্য এখনো রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বৌদ্ধদের বেশ কিছু পোড়া ইটের স্থাপত্য দেখতে দেখতে ওরা এগিয়ে চলে। কিছু মূর্তি, পুরাতাত্ত্বিক সামগ্ৰী উদ্ধার করে এই দ্বীপে একটি মিউজিয়াম করা হয়েছে।”

দ্বীপের ঠিক মধ্যভাগেই সেই মিউজিয়াম, তবে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেশি আকর্ষণ করছিল রুবাইকে। মিউজিয়ামে রয়েছে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বুদ্ধের বেশ কিছু মূর্তি, শিলালিপি, বাসনপত্র।

ছোট্ট একটা রেস্তোরাঁ রয়েছে দ্বীপের শেষ মাথায়। সেখানেই লাঞ্চ করছিল ওরা। অন্ধ্র থালি নিয়েছিল সেদিন ওরা তিনজন—ছোটো ছোটো বারোটা বাটিতে নানারকম সবজি, টক, চাটনি, রসম আর কলাপাতায় লেমন রাইস। হঠাৎ কোণের টেবিলে একটি লোককে দেখে ছটফট করে ওঠে রুবাই। লোকটার সঙ্গে রয়েছে আরো দুই বিদেশি। রুবাই খেতে খেতেই লক্ষ করছিল লোকটাকে। খুব নীচু গলায় কিছু আলোচনা হচ্ছে ওই টেবিলে। প্রত্যেকেই বেশ গম্ভীর। ওদের পাশ দিয়ে হাত ধুতে যাওয়ার সময় ইচ্ছা করেই নিজের রুমালটা ফেল দিল রুবাই। সেটা তুলতে কয়েকটা সেকেন্ড দাঁড়িয়েছিল ও। ওই কয়েক সেকেন্ডে ওর যদি ভুল না হয়, দুটো শব্দ ওর কানে এসেছে, ‘ম্যাপ’ আর ‘লিটল হোপ’। বাকি কথা ও চেষ্টা করেও বুঝতে পারেনি। আশেপাশে একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে ও ফিরে আসে নিজের টেবিলে। সবার খাওয়া শেষ হয়ে গেছিল।

বাইরে এসেই রুবাই অন্বয়দাকে বলে, “ওই কোণের টেবিলে মোটা করে কটা চোখ লোকটাকে দেখলে? সেদিন রজার পিট মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেও লোকটা ওঁর সঙ্গে ছিল। আরেকটা লোক ছিল ওদের সঙ্গে। তার চুলে মেহেন্দি করা, গালে লাল জড়ুল রয়েছে।”

“সে তো আমরাও রজারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম সেদিন। তাতে কী প্রমাণ হয়?” অন্বয়দা নির্লিপ্ত মুখে বলেন।

“না, এই লোকটা আর এর সঙ্গীদের...” কথাটা শেষ না করেই রুবাই অবাক হয়ে দেখে সেই মেহেন্দি চুল গালে লাল জড়ুলওয়ালা লোকটা মিউজিয়ামের একটা গার্ডের হাতে খৈনি ঢেলে দিচ্ছে।

“এবার ফিরতে হবে, চল। এই লঞ্চটাতেই ফিরব।” অন্বয়দা এগোতে থাকেন।

“আমি একবার টয়লেটে যাব।” আকাশ বলে।

“আমিও।” রুবাইও ওর সঙ্গী হয়। টয়লেটটা রেস্তোরাঁর পিছনদিকে।

অন্বয়দা একটা পাখিকে লেন্সের মাধ্যমে বন্দি করতে করতে বলেন, “দেরি করিস না। নয়তো আজ ইথিপোটালা ঝরনা দেখতে পাবি না।”

নাগার্জুনা সাগরের পর ওদের আজকের গন্তব্য ইথিপোটালা ওয়াটার ফলস।

রুবাই টয়লেটের সামনে গিয়ে আকাশকে বলে, “দেখ, আমি ওই দুটো লোককেই দেখেছি এই দ্বীপে। ওরাই রজারকে মেরেছে কি না জানি না। কিন্তু মৃত্যুর আগে ওরা রজারের সঙ্গে ছিল।”

“তুই কী করতে চাইছিস?”

আকাশ রুবাইয়ের বিভিন্ন দুঃসাহসিক ঘটনার কথা জানে। একবার ওকেই টেররিষ্টদের খপ্পর থেকে বাঁচিয়েছিল ওর বন্ধু রুবাই ও অন্বয়দা।

“লোকদুটোকে একটু ওয়াচ করতে চাইছি।” বলেই রুবাই দেখতে পায় লোকদুটো ওই বিদেশি দু’জনের সঙ্গে মিউজিয়ামের পিছনদিকে যাচ্ছে। ও আকাশকে টয়লেটে যেতে বলে ওদের পিছনে হাঁটতে থাকে। মাঝে মাঝে দূরবীনটা এমনভাবে চোখে লাগায় যেন ও পাখি খুঁজছে। ওদিকটায় একটু ঝোপ-জঙ্গল রয়েছে। লোকগুলো কথা বলতে বলতে এগিয়ে যায় আরও গভীরে। রুবাই বড়ো বড়ো গাছগুলোর আড়ালে দাঁড়িয়ে ভাবে ওর কী করা উচিত। আকাশ এসে ওকে ডাকে। দেরি হলে অন্বয়দা আবার ওদের খুঁজতে আসবেন। একটু বিরক্তিসহ রুবাই ফিরে আসে অন্বয়দার কাছে।

ফেরার সময় বেশ ছোটো একটা লঞ্চে উঠেছিল ওরা। এবছর বৃষ্টি কম হওয়ায় নাগার্জুনা সাগরে জল কম। দক্ষিণের নদীগুলো বৃষ্টির জলে পুষ্ট, নিয়মিত কিছুটা জল ছাড়তেই হয় ক্যানেলগুলোয়। পরপর কয়েকবছর অনাবৃষ্টিতে জল কমেছে আসলে।

মাত্র এগারো কিমি দূরে ইথিপোটালা ফলসেও অনাবৃষ্টিতে এবছর জল কম। পাহাড়ের উপর থেকে খরস্রোতা নদী লাফিয়ে নেমেছে বেশ নিচে। ওর গায়েই এপিটিডিসির একটা সুন্দর রিসর্ট রয়েছে। কিন্তু সেখানে জায়গা পেল না ওরা। আসলে আগে থেকে তো অন্বয় কিছুই বুক করে আসেননি। বাধ্য হয়ে ওরা নাগার্জুনা সাগরেই ফিরে এল। এই বিশাল জলাধারের দক্ষিণে একটা সুন্দর রিসর্টে উঠল ওরা। রুবাই ব্যালকনিতে বসে বিকেলের শেষ আলোয় লেকের জলে ভাসমান ঝুড়ি নৌকা দেখছিল। মাঝে মধ্যে দূরবীনে চোখ রাখছিল। অন্বয়দা আর আকাশ পেপার পড়ছিল বিছানায়। হঠাৎ রুবাই দেখতে পায় একটা ঝুড়ি নৌকায় করে ওই লোকগুলো ও বিদেশি দু’জন ভেসে চলেছে একটা ভগ্ন দ্বীপ লক্ষ্য করে। ও অন্বয়দাকে ডাকতে গিয়েও ডাকে না। ফোনের ক্যামেরাটায় জুম করে কয়েকটা ফটো তুলে নেয়।

“এই দেখো, কালকের খবরটা বেরিয়েছে পেপারে। মিঃ রজার পিট একজন ঐতিহাসিক। উনি এদেশে এসেছিলেন ঘুরতে, কিন্তু গত তিন সপ্তাহ ধরে হায়দ্রাবাদেই ছিলেন।” আকাশ বলে।

অন্বয়দা ততক্ষণে ঝুঁকে পড়েছেন খবরটার ওপর।


(৩)


রুবাই ওর মোবাইলে রজার পিট লিখে সার্চ করে। বেশ কিছু তথ্য ভেসে ওঠে। বাইরে ততক্ষণে ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এসেছে। সাগরের জলে কয়েকটা নৌকায় আলো কাঁপছে তিরতির করে। জোনাকির মতো লাগছে দেখতে।

“লোকটার ঠাকুরদা ও তাঁর পূর্বপুরুষরা ১৯৩২ সাল অবধি প্রায় তিন পুরুষ ভারতে ছিলেন। তার মধ্যে হায়দ্রাবাদেই ছিলেন টানা দশ বছর। সেই স্মৃতিতেই উনি এসেছিলেন বোধ হয়।” রুবাই বলতে বলতে ঘরে ঢোকে।

“কিন্তু লোকটা খুন হল কেন?” আকাশ বলে।

“তা তো জানি না, কিন্তু উনি সেদিন হোপ ডায়মন্ডের ব্যাপারে জানতে চাইছিলেন। আর আজ রেস্তোরাঁয় ওঁর সঙ্গীদের আমি ম্যাপ শব্দটা বলতে শুনেছি। কিছু একটা খুঁজছে ওরা। লিটল হোপ মানে ক্ষীণ আশা রয়েছে ওদের মনে।” রুবাই বলে।

“দেখ, কাল আমারা ভোরে বেরিয়ে রামোজি ফিল্ম সিটি যাব, সারাদিন ঘুরব। রাতে ট্রেন ধরব। এর ভেতর জড়িয়ে আমাদের লাভ নেই।” অন্বয়দা ওদের বলেন।

“ওরা কি কোনো পরিত্যক্ত হীরার খনি খুঁজছে?” রুবাই যেন অন্বয়দার কথা শুনতেই পায় না। আপন মনে বলে।

“কী জানি! আচ্ছা, হোপ ডায়মন্ডটা কী?” আকাশ বলে।

 “সে এক বিশাল গল্প। দুনিয়ার বিখ্যাত হীরাগুলোর মধ্যে কিছু হীরা আবার খুব কুখ্যাত। হোপ ডায়মন্ড একটা অভিশপ্ত হীরা বলে মনে করে অনেকেই। এই হীরা অনেক মালিকের অপমৃত্যু থেকে শুরু করে নানা দুর্ঘটনা ডেকে এনেছে। হীরাটি উত্তোলিত হয়েছিল কোল্লুর খনি থেকেই।” অন্বয়দা বলেন ওদের।

“একটু ডিটেলে বলো, গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে।” বলে রুবাই।

“এই হীরাকে সর্বপ্রথম পশ্চিম পৃথিবীর সামনে আনেন বিখ্যাত ফরাসি পর্যটক ও রত্ন-ব্যবসায়ী জাঁ ব্যাপটিস্ট ট্যাভেনিয়ার। কথিত আছে, তিনি ভারতের এক প্রাচীন মন্দিরের মূর্তির চোখ থেকে হীরাটি সরিয়েছেন। সেখানকার পুরোহিতের দেয়া অভিশাপই হীরাটি বয়ে বেড়াচ্ছে।”

“কিন্তু এরকমটা হয়ে থাকলে তো আরেকটি হীরা থাকার কথা। অন্য চোখটা! সেটি কোথায়?” রুবাই বলে।

“এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা গবেষকরা দিতে পারেননি। অনেকে বলে এটা তৃতীয় নয়ন। দেবীর কপালের থেকে খোলা হয়েছিল। তবে অনেকেই চুরির কথাটা মানতে চায় না, বলা হয় ট্যাভেনিয়ার কিনেছিলেন মন্দিরের পুরোহিতের থেকে। ট্যাভেনিয়ারের মৃত্যু নিয়েও নানা গল্প রয়েছে। তিনি নাকি বৃদ্ধ বয়সে কুকুরের আক্রমণে মারা যান। যাই হোক, ট্যাভেনিয়ার যখন হীরাটি সংগ্রহ করেন, তখন এর ওজন ছিল প্রায় ১১৫ ক্যারাট। এটি ছিল ত্রিভুজাকৃতি। তিনি ১৬৬৮ সালে আরো ছোটো বড়ো চোদ্দটি হীরার সাথে এই হীরাটিও বিক্রি করেন সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর কাছে। নীল দ্যুতিময় হীরাটি পরিচিত হয় ‘ফ্রেঞ্চ ব্লু’ নামে। রাজা চতুর্দশ লুই ৭২ বছর বয়সে গ্যাংগ্রিন রোগে ভুগে বেশ কষ্ট পেয়ে মারা যান। দরবারের রাজপুরুষ নিকোলাস ফুকে রাজার অনুমতি নিয়ে এক পার্টিতে হীরাটি পরেছিলেন। এরপর তাকে ‘ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা’র অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। পিগ্নেরল দুর্গে ফুকুয়েটকে ১৫ বছর বন্দি করে রাখা হয়। ১৭৯২ সালে ফরাসি বিপ্লব শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত হীরাটি ফ্রান্সের রাজপরিবারের জিম্মায় ছিল। উত্তরাধিকার সূত্রে তখন ‘হোপ ডায়মন্ডের’ মালিক ছিলেন রাজা ষোড়শ লুই। বিপ্লবের সময় রাজা ষোড়শ লুই এবং রানি ম্যারি অ্যান্টোইনেটকে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করে মেরে ফেলা হয়। সেসময় রাজপ্রাসাদের থেকে হীরাটি চুরি হয়ে যায়।

“উনিশ শতকের শুরুতে হীরাটি আবার দেখা যায় ব্রিটেনে। এবার কেনেন রাজা চতুর্থ জর্জ। কিন্তু মৃত্যুর পর দেনা পরিশোধ করতে তাঁর সহায় সম্পত্তি বিক্রি করা হয়। সেই তালিকায় হীরাটিও ছিল। ইতিমধ্যে হীরাটি কাটাই হয়েছিল।

“১৮৩৯ সালে সার উইলিয়াম ফিলিপ হোপ নামে এক ব্রিটিশ ব্যাঙ্কার হীরাটি কেনেন। তখন হীরাটির ওজন ছিল প্রায় ৪৬ ক্যারাট। তাঁর পরে হীরাটি হস্তগত হয় ভ্রাতুষ্পুত্র হেনরি থমাস হোপের কাছে। অভিশাপ নেমে আসে সার হেনরির ছেলে লর্ড ফ্রান্সিস হোপ-এর উপর। উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ ভালোই সম্পত্তি পেয়েছিলেন তিনি। জুয়ার নেশা আর বেহিসেবি খরচের কারণে ফ্রান্সিস দেউলিয়া হন। তাঁর স্ত্রী মেরি ইয়োহে তাঁরই প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজনের সঙ্গে পালিয়ে যান, পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন নিদারুণ দারিদ্র্যে। এই হোপ পরিবারের নামানুসারেই এরপর হীরাটির নাম হয় ‘হোপ ডায়মন্ড’। ঘুরতে ঘুরতে এবার হীরাটি গিয়ে পৌঁছে যায় আমেরিকান রত্ন-ব্যবসায়ী পিয়েরে কার্তিয়ের কাছে।

“অনেকেই বলেন এই কার্তিয়ে আসলে এসব গুজব ছড়ান, তাই নিলামে কেউ কিনতে চায়নি এই নীল হীরা। এই বক্তব্যর কারণ তিনি কিন্তু কোনো বিপদের শিকার হননি। যাই হোক, বিংশ শতকের শুরুর দিকে সাইমন ফ্রাঙ্কেল নামক এক ব্যবসায়ী হীরাটিকে নিলামে তোলেন। এরপর তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের কাছে যায় হীরাটি। কিন্তু এবার তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। হীরা বিক্রি হয়ে যায়, তবে তাঁর ভাগ্য ফেরেনি।

“গ্রীসের এক বণিক সাইমন মাওনকারেডসও একসময় হীরাটা কিনেছিলেন। পাহাড়ি গিরি খাঁদে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রী-সন্তান সহ মৃত্যুবরণ করেন সাইমন।

“এরপর ১৯১২ সালে ওয়াশিংটনের ম্যাকলিন দম্পতি হীরাটি কেনেন। তাঁদের ছেলে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান, মেয়ে নেশা করে আত্মহত্যা করেছিলেন। ইভালিনের স্বামী অন্য নারীতে আসক্ত হয়ে মারা যান এক উন্মাদ-আশ্রমে।

“ম্যাকলিন এস্টেটের কাছ থেকে ১৯৪৫ সালে হীরাটি কিনে হ্যারি উইনস্টোন। অভিশাপ এড়িয়ে যেতে ১৯৫৮ সালে তিনি এটি দান করেন স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউটের ‘ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’কে। এই অবধি মিউজিয়ামটি কোনো দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়নি। তবে যে পোস্টম্যান হীরাটি মিউজিয়ামে পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই জেমস টড ট্রাকের ধাক্কায় পা হারান, অল্প কিছুদিন পরেই তাঁর স্ত্রী ও পোষা কুকুরটি মারা যায়। আরো কিছুদিন পর তাঁর বাড়িতে আগুন লাগে।”

“বাপ রে! এ তো ফারাওয়ের অভিশাপের থেকেও ভয়ানক!” রুবাই বলে।

“এছাড়াও আরো কিছু ঘটনা রয়েছে, শোন। রানি আন্তোনেতেঁর সবচেয়ে বিশ্বস্তদের মধ্যে একজন মেরি লুই, হীরাটা তিনি ছুঁয়েছিলেন। তিনি উন্মত্ত জনতার হাতে নৃশংসভাবে খুন হন। ডাচ রত্ন-ব্যবসায়ী উইলিয়াম ফলস রত্নটির কাটাই করেছিলেন। তাঁর ছেলে তাঁকে হত্যা করে আত্মহত্যা করে।

“১৯৫৮ সাল থেকে হীরাটি রয়েছে স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামে। এর বর্তমান ওজন প্রায় ৪৫.৫২ ক্যারাট। পিয়েরে কার্তিয়ের করা ডিজাইন অনুযায়ীই শেষবার হীরাটি কাটাই হয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, এর নীলাভ দ্যুতির কারণ বোরন কণার উপস্থিতি।”

“এই লোকটাও হোপ ডায়মন্ডের সম্পর্কে জানতে চাইছিল। খুন হয়ে গেল। মানে হীরার অভিশাপ এখনো রয়েছে।” আকাশ বলে।

“লোকটা হীরাটার ইতিহাস জানতে চাইছিল। অথচ এই খবরটুকু তো নেট সার্চ করলেই জানা যায়। হোপ ডায়মন্ডের খোঁজে এদেশে আসবে কেন?” রুবাই বলে।

“গোলকুণ্ডার নীচে চারমিনার পর্যন্ত এক টানেল রয়েছে। অনেকে বলে সেই টানেলের ভেতর রয়েছে মহম্মদ কুলি কুতুব শাহের গুপ্তধন। বহু অভিযান হয়েছে এসব নিয়ে। তুই ম্যাপ বললি বলে কথাটা বললাম। হয়তো সেই গুপ্তধনের সন্ধানেই এসেছিল লোকটা।” অন্বয়দা বললেন।

“তাহলে এই লোকগুলো নাগার্জুনাসাগরে কী করছে? ওরা ঝুড়ি নৌকা করে ভেসে বেড়াচ্ছিল সাগরে। আমি ওদের একটা ছোট্ট দ্বীপে যেতে দেখেছি।” রুবাই বলে।

“ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন শহরে, দুর্গে এমন বহু গুপ্তধনের গল্প প্রচলিত। এই অঞ্চলে এক প্রাচীন সাম্রাজ্য ছিল যার ধ্বংসাবশেষ আজ এই জলাধারের নীচে চলে গেছে। আপাতত খেয়ে আসি চল। ভোরে উঠতে হবে কাল।” অন্বয়দা দেখায় ঘড়িতে সাড়ে আটটা প্রায়।


(৪)


চিকেন কষা আর রুটি খেতে খেতে টিভিতে চোখ রেখেছিল ওরা। ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে আগামীকাল মাঝরাতে এক সুপার সাইক্লোন আছড়ে পড়তে চলেছে উড়িষ্যার উপকূলে। তার জেরে সব ট্রেন বাতিল। এমনকি মালগাড়িগুলোকে চেন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে লাইনের সঙ্গে। এবার দেখাল বাতিল ট্রেনের লিস্ট।

“যাহ্‌, আমাদের ট্রেনও বাতিল হয়ে গেছে।” অন্বয়দা বলেন।

“তাহলে বাড়ি যাব কী করে?”

“আপাতত দু-দিন ট্রেন বন্ধ। ঝড়ের পর আবার চলবে। একদিকে তোদের জন্য ভালোই হল। আমরা এই পাশেই অনুপু গ্রামে ওপেন এয়ার মিউজিয়াম দেখে আসতে পারি। সেই সময়কার অ্যাম্ফিথিয়েটার, হারিতি মন্দির, মঠ, চৈত্য ইত্যাদি নিয়ে গড়া সেই গ্ৰাম। তাছাড়া হায়দ্রাবাদে সালার জং মিউজিয়াম, চৌমহলা প্যালেস সব ঘুরে দেখব এই দু-দিন। বাড়িতে জানিয়ে দিচ্ছি তোরা আমার সঙ্গে আছিস চিন্তার কিছু নেই।” অন্বয়দা ফোন তুলে নেন।

আকাশ একটু চিন্তিত, তবে রুবাইয়ের বেশ আনন্দ হচ্ছিল। হঠাৎ টিভির পর্দায় পরবর্তী খবর দেখে ওরা নড়েচড়ে বসে। আজ বিকেলে নাগার্জুনাকুণ্ডায় এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপে একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যাক্তি খুন হয়েছে। লোকটাকে দেখে চমকে ওঠে রুবাই। ওরা দুপুরে যে টেবিলে বসে খাচ্ছিল, তার একটু দূরেই একা বসে ছিল এই লোকটা। রুবাই যখন ওই বিদেশিদের টেবিলের পাশে গিয়ে রুমালটা ফেলে আবার তুলছিল তখন কোনার টেবিলে এই ভদ্রলোককে দেখেছিল। লোকটার পরিচয় নাকি এখনো জানা যায়নি। কোনো আই.কার্ড ছিল না লোকটার কাছে। লোকটার গলার নলি কেটে দিয়েছে কেউ।

এসি চললেও ভেতর ভেতর ঘামছিল রুবাই। এই সাংঘাতিক খুনি কে? কেনই বা একের পর এক খুন হচ্ছে?

ওরা তাড়াতাড়ি নিজেদের ঘরে ফিরে আসে। টিভিটা চালিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলের খবর দেখতে থাকে ওরা। একটা লোকাল চ্যানেল বলছে এই লোকটা কোনো গুপ্ত সংগঠনের কেউ ছিল। কেউ বলছে লোকটা অ্যান্টিক পাচারকারী।

রুবাইয়ের আর কিছুই ভালো লাগছে না। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এই জট যতক্ষণ ছাড়াতে না পারবে এই অস্বস্তি ওর কাটবে না ও জানে। কিন্তু এই ভিন রাজ্যেও কী করে এ রহস্য সমাধান করবে ও বুঝতে পারে না। বড্ড অসহায় লাগে ওর।

নেট খুলে হোপ ডায়মন্ডের ইতিহাস পড়তে থাকে ও। ওই বিদেশি ভদ্রলোক তো এটাই জানতে চেয়েছিলেন সেদিন। অন্বয়দা যদি কিছু মিস করে যান!

হঠাৎ একটা সাইটে ওর চোখ আটকে যায়। এক ঐতিহাসিক বলছেন, হীরাটা কেটে দুটো হীরা বানানো হয়েছিল। ১১৫ ক্যারেটকে দু-ভাগে ভাগ করে কাটিং করে একটা ৪৬, আরেকটা ৩৬ ক্যারেটের হীরা পাওয়া যায়। ছোটোটির নাম লিটল হোপ। চমকে ওঠে রুবাই। আবার দু’জন লিখেছেন যে দেবীর চোখ থেকে এই হীরা তুলে নেওয়া হয় তার অন্য চোখেও ছিল অমন আরেকটি হীরক খণ্ড। সেটা খুঁজতে বহু অভিযান হয়েছে ভারতে। সেটার কোড নেমও লিটল হোপ। ৩৬ ক্যারেটের হীরাটা আর কখনো খবরের শিরোনামে আসেনি। সেটা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করে। কিন্তু মন্দিরের দ্বিতীয় হীরাটি সম্পর্কে আর কিছুই জানা যায় না। ওই হীরক খণ্ড চুরির পর নাকি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়ে যায় সেই মন্দির। মৃত্যু হয় পুরোহিত ও অন্যান্য মন্দিরের সেবায়েতদের।

“অন্বয়দা! আমরা থানায় যেতে পারি না? ওই লোকগুলোর ছবি আছে আমার ক্যামেরায়।” ও বলে।

“কী বলব পুলিশকে? আমরা কি খুন হতে দেখেছি? তেমন প্রমাণ তো নেই হাতে! কেউ মানবে না।” অন্বয়দা টিভিটা বন্ধ করতে করতে বলেন।

রুবাই বারান্দায় এসে লেকের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেকের বুকে লুকিয়ে আছে রহস্য। কে জানে ওরা কেন এখানে ঘুরঘুর করছে। ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে লোকগুলো ডেঞ্জারাস।


(৫)


পরদিন সকালে উঠে অন্বয় বললেন, ওঁরা ঘুরতে ঘুরতে হায়দ্রাবাদ ফিরবেন। পথে একটা কোচিপুরি নৃত্যর জন্য বিখ্যাত গ্ৰামে যাবেন, হায়দ্রাবাদ পৌঁছে আজ বাকি দ্রষ্টব্য দেখবেন। তার পরেরদিন রামোজি ফ্লিম সিটি ঘুরতে নিয়ে যাবেন ওদের।

রুবাইয়ের এগুলো কিছুই ভালো লাগছিল না। ওর ঘোরায় মন নেই। রিসর্ট ছেড়ে বেরিয়ে বেশ কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁয় জলখাবার খাচ্ছিল ওরা। নাগার্জুনা সাগর তখনো রয়েছে ওদের সঙ্গে। আসলে এটা জলাধারের অপর প্রান্ত। এখানেও দু-একটা ঝুড়ি নৌকা ভাসছে লেকের বুকে। অন্বয়দা ওদের দিকে তাকিয়ে বলেন, “এই রাইডটা করবি নাকি? সাউথের আরো কয়েকটা জায়গায় হয় এই ঝুড়িতে ভ্রমণ।”

ওরাও তো শুনে লাফিয়ে ওঠে। দরদাম করে একঘণ্টার জন্য একটা ঝুড়ি ভাড়া করে অন্বয়দা। চালকের নাম শিবা, বয়স বড়োজোর কুড়ি-বাইশ। লেকের এদিকে বেশ কয়েকটি সবুজ দ্বীপ রয়েছে, আর রয়েছে প্রচুর পাখি। অন্বয়দা পাখির ফটো তুলবেন বলে ছেলেটাকে একটা দ্বীপে ঝুড়িটা লাগাতে বলেন। ও মাথা নেড়ে না বলে। এসব দ্বীপে নাকি অপদেবতা রয়েছে। ওরা বেশ কয়েকবার দ্বীপে আলো জ্বলতে দেখেছে। তাই কিছুতেই দ্বীপে দাঁড়াতে চায় না। আরো কিছুটা যেতেই একটা একটু বড়ো দ্বীপ দেখা গেল। পাথুরে জমিতেও বেশ কিছু ঝাঁকড়া গাছ মাথা তুলেছে। ছোটো ছোটো টিলা, পাহাড় আর ঝোপঝাড়ের ফাঁকে লাল লাল ইট বলে দিচ্ছে এই অঞ্চলে কখনো সভ্যতা মাথা তুলেছিল। ইতিহাসের গন্ধমাখা দ্বীপকে বেড় দিয়ে ঘোরার সময় একটা ঝুড়ি নৌকাকে ওরা দেখল দ্বীপের গায়ে কেউ থামিয়েছে। কিন্তু লোক বা মাঝি কেউ নেই।

অন্বয় ওদের ঝুড়ি নৌকার চালক শিবাকে হিন্দিতে বলেন, “এই তো একটা কোরাকেল থেমেছে ওই দ্বীপে। তুমি যে বললে দ্বীপে নামা বারণ! এরা তবে কোথায় গেছে?”

“এই দ্বীপকে গ্ৰামের লোক বলে দেবী আম্মার দ্বীপ। বহু প্রাচীন এক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে দ্বীপে। যদিও এখন আর পূজা হয় না। তবুও গ্ৰামবাসীদের কাছে দেবী খুব জাগ্ৰত। তাই অনেক সময় গ্ৰামের মেয়ে-বৌরা আম্মার পূজা দিতে আসে এখানে।” ছেলেটা হিন্দি উর্দু মিশিয়ে বলে।

“আমরাও এই দ্বীপে একটু নামতে চাই।” রুবাই বলে।

“না। দেবী আম্মার দ্বীপে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষেধ। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এ প্রথা। আমি আপনাদের নিয়ে যাব না।” মাথা নাড়ে ছেলেটা।

“আরে ভাই, আমরা দেবীর মন্দিরে যাব না। পাখির ফটো তুলব চুপচাপ। চলে আসব।” অন্বয় বলেন। কিন্তু ছেলেটি মানতে রাজি নয়। 

ওদের অনেক অনুরোধে শেষে ও নৌকাটা ওই ঝুড়ি নৌকাটার কাছে নিয়ে যায়। ওরা তিনজন নেমে যায়। শিবাকে অন্বয় একটু অপেক্ষা করতে বলে। ঘন ঝোপঝাড় আর বড়ো বড়ো গাছের ফাঁক দিয়ে পায়ে চলা সরু পথ বলছে এখানে মানুষ আসে। একটা এশিয়ান প্যারাডাইস ফ্লাই ক্যাচার দেখে অন্বয়দা নিঃশব্দে এগিয়ে গেছেন ডানদিকে। রুবাই ওর দূরবীনে চোখ রেখে দ্বীপের চারদিকটা দেখছিল। আকাশ একটা শুকনো গাছের ডাল হাতে লজ্জাবতীর ঝাড়কে ঘুম পাড়াতে থাকে।

রুবাই আসলে দেখতে চাইছিল মন্দিরটা কোথায়। সামনে একটা ঝাঁকড়া ডালপালাওয়ালা গাছ দেখে ও এগিয়ে যায়। তখনই ওর চোখে পড়ে একটা সিগারেটের ফিল্টার, তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। পূজা দিতে এসে গ্ৰামের লোক সিগারেট খাচ্ছে ভাবতেও কেমন যেন লাগে। আর একটু এগিয়ে যায় ও। কিছু পুরোনো ইটের স্তূপ, ভগ্ন দেওয়াল, পাথরের সিঁড়ি দেখতে পায় ও। দ্বীপের মাঝখানটা বেশ উঁচু। সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা উঠতেই ফাটলটা চোখে পড়ে ওর। এটা একটা গুহা মন্দির। ও ভিডিও করছিল পথটার। গুহার ভিতরে মৃদু কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। ও চট করে একটা বড়ো পাথরের আড়ালে লুকিয়ে যায়। একটু পরেই লোকগুলো বেরিয়ে আসে। ওই দুই বিদেশির সঙ্গে সেই মেহেন্দি করা চুল আর মোটা লোকটাকে দেখে ওর গলা শুকিয়ে আসে। আরেকজন কালো করে বোধ হয় নৌকার চালক। রুবাই ফোনটা অফ করেনি, আড়াল থেকে সবটা রেকর্ড করতে থাকে ও। পাঁচজন একসঙ্গেই নামতে থাকে সিঁড়ি দিয়ে।

মেহেন্দি রঙের চুলের লোকটা ইংরেজিতে বলে, “এত কাণ্ড করে ম্যাপটা আমরা পেলাম, এখন আমার মনে হচ্ছে ওটা ভুল। এমন দ্বীপের মাঝে দেবীর মন্দির এদিকে আর কোথাও নেই, আমি খোঁজ নিয়েছি।”

“ম্যাপটার বয়স তিনশো বছরের কিছু বেশি। তারপর বহু ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধবিগ্ৰহ এসবে মানচিত্র বদলে গেছে। গোলকুণ্ডা থেকে যে গুপ্ত পাতাল পথটা ছিল সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে।” বলে লম্বা করে নীল চোখ প্রথম বিদেশি লোকটা।

তেলেগু ভাষায় নৌকার চালককে কিছু বলে ওরা। লোকটা দু-দিকে মাথা নেড়ে কী যেন বলে। আম্মা কথাটা কানে লাগে শুধু।

 “স্মিথ স্যার, আপনারা বার বার বলছেন জায়গাটা গোলকুণ্ডার দেড়শো কিমি রেডিয়াসের মধ্যে। এইটুকুর ভেতর যদি সেই মন্দির এখনো থাকত আমরা জানতে পারতাম।” মোটা করে কটা চোখ লোকটা বলে।

“হোয়াট ডু ইউ মিন জাকির!” দাঁড়িয়ে যায় সোনালি চুলের মাঝবয়সী লোকটা। রুবাই বুঝতে পারে এর নাম স্মিথ। লোকটা একটু রেগে গিয়েই বলে, “রজারের পূর্বপুরুষ মিথ্যা কথা লিখে যায়নি। আমি পড়েছি সেই দিনলিপি। ওর সেই গ্রেট গ্র্যান্ড ফাদার নিজে গেছিলেন ঘোড়ায় চড়ে সেই মন্দিরে। গোলকুণ্ডা ফোর্ট থেকে একদিনের পথ লিখেছেন নিজের জীবনীতে। যদিও গোলকুণ্ডা ফোর্ট থেকে সারা দিনরাত না থেমে ঘোড়ার পিঠে চলে ১৫০ কিমির বেশি যেতে পারে না।”

“স্যার, সেসময় পথঘাট ছিল না, সোজা পাহাড়-জঙ্গল ভেঙে ঘোড়া ছুটত। এই নাগার্জুনা সাগর ছিল না। এখানে ছিল বিশাল এক রাজ্য।”

“আমি জানি না সেসব কথা। উনি লিখেছিলেন অন্য চোখটা সেখানেই রয়েছে। ওই জিনিসটার জন্য এত খরচ করেছি, ওটা আমার চাই।” দ্বিতীয় বিদেশি বলে ওঠে। লোকগুলো এগিয়ে যায় ফেরার পথে।

রুবাই দরদর করে ঘামতে থাকে। ওরা তার মানে ওই হীরাটা খুঁজছে! তবে বুদ্ধি করে ভিডিওটা তুলে নিয়েছে ও ফোনে। কিন্তু ওরা তো নীচে গেলেই ওদের ঝুড়ি নৌকাটা দেখতে পাবে! ওদিকে যদি অন্বয়দা বা আকাশকে দেখে ফেলে কী হবে! লোকগুলো সাংঘাতিক। রুবাইয়ের মন বলছে দুটো খুন এই লোকগুলোই করেছে।

ও ফোনটা বের করে অন্বয়দাকে সাবধান করে দেবে বলে। কিন্তু টাওয়ার নেই। লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। ওরা নিশ্চয়ই আর ফিরে আসবে না। রুবাই একটু ঘুরপথে এগিয়ে যায় গাছের আড়াল ধরে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারে ও পথ হারিয়েছে। কিছুতেই ও সেই ঝাঁকড়া গাছটা খুঁজে পায় না।

তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ, জল রয়েছে আকাশের পিঠের ব্যাগে। দূরবীন দিয়ে চারদিক দেখতে দেখতে ও এগোয় লেকের খোঁজে। দ্বীপটা খুব বেশি বড়ো তো নয়! প্রায় একঘণ্টা হাঁটার পর ও আরেক প্রান্তে এসে পৌঁছায়। নাগার্জুনা সাগরের নীল জলরাশি দেখা গেলেও কোনো ঝুড়ি নৌকা ওর চোখে পড়ে না। ও সূর্যের দিকে তাকিয়ে দিকনির্ণয় করে লেকের পাড় বরাবর হাঁটতে থাকে। বার বার ফোন বার করে দেখে টাওয়ার এল কি না। অবশেষে প্রায় দু-ঘণ্টা পর একটা বাঁক ঘুরতেই ও সেই গাছটার নিচে এসে পৌঁছায়। দেখতে পায় একটা গাছের নীচে আকাশের পিঠের ব্যাগটা পড়ে রয়েছে। জলের বোতল নিয়ে জল খায় রুবাই। চারদিকে তাকায়। কিন্তু না ওদের ঝুড়ি নৌকাটা রয়েছে, না আকাশ, না অন্বয়দা। এখন কী করবে রুবাই? তবে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ও এর আগেও পড়েছে। তাই মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে বসে।


(৬)


আকাশ বেশ কয়েকটা লোকের গলার আওয়াজ পেয়ে সেদিকে এগিয়ে গেছিল। ক্যামেরা হাতে অন্বয়দাকেও দেখতে পেয়েছিল লোকগুলো। মেহেন্দি রঙের চুলের লোকটাকে দেখে আকাশ চিনতে পারে। একজন ততক্ষণে অন্বয়দাকে হিন্দিতে প্রশ্ন করে, “আপনারা... এখানে?”

“টুরিস্ট। পাখির ছবি তুলছি।” অন্বয়দা ক্যামেরাটা দেখায়।

“এখানে তো টুরিস্ট আসে না খুব একটা!” দ্বিতীয়জন বলে।

মোটা লোকটা হঠাৎ তেলেগুতে কিছু বলে অন্যজনকে।

অন্যজন বলে, “এদের কালকেও দেখেছি। নাগার্জুনাকুণ্ডায়। এরা আমাদের ফলো করছে।”

সঙ্গে সঙ্গে প্রথমজনের হাতে ঝলসে ওঠে একটা রিভলভার। কিন্তু তা দেখে বিদেশি একজন ইংরেজিতে বলে, “নো মোর মার্ডার।”

“ওদের হাত-পা বেঁধে এখানেই ফেলে রেখে যাই চলো।” দ্বিতীয় বিদেশি বলে।

“কিন্তু ওরা যে নৌকায় এসেছে সে তো ওদের খুঁজতে আসবেই। তার চেয়ে শেষ করে দিই গল্প!” মেহেন্দি চুল বলে।

“না, এদের বেঁধে নিয়ে যাই।”

“আমরা সত্যি বার্ড ওয়াচার। কেন বিশ্বাস করছেন না আপনারা?” অন্বয়দা বলেন।

অন্য একজন ততক্ষণে তরতরিয়ে জলের ধারে নেমে গেছে। কিন্তু নিজেদের নৌকা ছাড়া আর কোনো নৌকা তার চোখে পড়েনি। অন্বয় আর আকাশকে গান পয়েন্টে নামিয়ে আনে বাকিরা।

এবার কটা চোখ লোকটা ওদের প্রশ্ন করে, “তোমাদের নৌকা কোথায়? কীসে এসেছ?”

“একটা ছেলে নামিয়ে দিয়ে গেছে, দু-ঘণ্টা পর এসে নিয়ে যাবে।” ইচ্ছা করেই মিথ্যা বলেন অন্বয়। আপাতত শিবা নিশ্চয়ই আশেপাশে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। রুবাইও আছে এই দ্বীপেই। বাঁচতে হলে এদের বিশ্বাস জিততে হবে।

“এদের নিয়েই চলো। রেখে গেলে এরা পুলিশে যাবে।” লম্বা করে যে বিদেশি, সে বলে।

“পুলিশে যাব কেন? আপনাদের চিনি না, দেখিনি কখনো। কিন্তু দু-ঘণ্টা পর এসে নৌকার ছেলেটা আমাদের না পেলে পুলিশে যাবে। তাছাড়া পাড়ে আমাদের গাড়ি রয়েছে। ড্রাইভার রয়েছে। সেও একটা সময় পর আমরা না ফিরলে পুলিশে যাবে।” অন্বয় বলেন।

“ততক্ষণে আমরা অনেক দূর চলে যাব। রহমান, বেঁধে ফেল এদের। আর মোবাইল, ক্যামেরা সব নিয়ে নে।” মোটা লোকটা বলে।

“এই একটা কোরাকেলে আমরা পাঁচজন ওদের দু-জনকে নিয়ে ফিরতে পারব? ভয়ের কিছু নেই তো? তার চেয়ে ফেলে যাও এখানেই।” সোনালি চুলের মাঝবয়সী লোকটা বলে।

“দেখো, আমারও মনে হয় এদের ফেলে যাওয়াই ঠিক হবে। হাত-পা বেঁধে নৌকায় করে নিয়ে জলে ফেলে দিলেই গল্প শেষ। সঙ্গে নিলে অনেক ঝামেলা, এদের খোঁজে পুলিশ রাস্তাঘাটে নাকাবন্দি করবে, জিনিসটা আমরা এখনো পাইনি কিন্তু। দুটো খুন হয়ে গেছে।” নীল চোখের বিদেশি বলে।

তেলেগুতে রহমান কীসব নির্দেশ দেয়। মাঝি একগাছা দড়ি নিয়ে আসে।

অতঃপর ওরা চটপট ওদের বেঁধে ফেলে দড়ি দিয়ে। অন্বয়ের ক্যামেরা আর মোবাইলটা নিয়ে ছুড়ে ফেলে জঙ্গলের ভিতর। তেলেগুতে কীসব বলে তিনজন নিজেদের ভেতর। তারপর ঝুড়ি নৌকায় তুলে নেয় ওদের।

অন্বয় ঘষটে ঘষটে কোরাকেলের ধারে চলে যান। নৌকাটা জলে ভাসতেই তিনি বাংলায় ফিসফিস করে আকাশকে বলেন, “ভয় পাস না। এসব বাঁধন খোলা শিখিয়েছিলাম স্কুলে, মনে আছে?”

ওঁকে ফিসফিস করতে দেখে রহমান একটা ধমক দেয়। উনি চোখের ইশারায় আকাশকে সাহস দেন। আসলে অন্বয় ওদের গেম টিচার। ক্যারাটে থেকে ভলিবল, সাঁতার সব শিখেছে ওরা অন্বয়ের থেকে। স্কাউটের ট্রেনিং নিয়েছে ওরা। রুবাই যেহেতু এইধরনের কিছু ঘটনায় আগেও জড়িয়ে গেছিল, অন্বয় ওদের একটা স্পেশাল ট্রেনিং দিয়েছিলেন হাত-পায়ের বাঁধন খোলার। অন্বয় নিজেরটা খুলে ফেলেছেন ততক্ষণে, কিন্তু দড়িটা হাতেই জড়িয়ে রেখেছিলেন। লোকদুটো কিছুক্ষণ পর ওদের জলে ফেলে দেয়। অল্প সময় ডুবে থেকে নৌকাটার থেকে একটু দূরে যাওয়ার চেষ্টা করেন অন্বয়। জলের ভেতরেই তিনি দেখেছেন আকাশ হাতের বাঁধন খুলে ফেলেছে। বেশ কিছুক্ষণ জলে ডুবে থাকার পর ভেসে ওঠে ও। কোরাকেলটা তখনো বেশ দূরে চলে গেছে। পায়ের বাঁধনটা খোলা হয়নি অবশ্য। তাছাড়া জুতোয় জল ঢুকে ভারী হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ চিত সাঁতারে ভেসে থাকে দু-জনেই। বহুদূরে দ্বীপটা দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ দূরে একটা ঝুড়ি নৌকা দেখে সেদিকে এগিয়ে যান অন্বয়। কিন্তু আকাশ পা বাঁধা থাকায় এগোতে পারছিল না। বারবার ডুবে যাচ্ছিল, আর জল খাচ্ছিল।

অন্বয় এগিয়ে এসে ওকে বলেন, “আমায় ধরে শুধু ভেসে থাক। ওই নৌকাটা আসুক। মনে হয় বেঁচে যাব।”

ততক্ষণে পায়ের জুতো খুলে ফেলেছেন অন্বয়। দড়িও আলগা হয়ে এসেছে। কিন্তু নৌকাটা ওদের দেখতে পায় না। কিছুটা এগিয়ে একটা ছোট্ট পাথুরে ডুবোপাহাড় দেখে অন্বয় সেদিকে এগিয়ে যান। পাথরটায় উঠে আকাশকে টেনে তোলেন। প্রচুর জল খেয়েছে ছেলেটা। দু-জনেই ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে পাথরের উপর। চারদিকে জল, একটা নৌকা বা বোট এলে তবেই ওরা ফিরতে পারবে। ওদিকে রুবাই একা ওই দ্বীপে কী করছে কে জানে। শিবা কি ওকে ফেরত নিয়ে যেতে পারবে?


(৭)


হঠাৎ দূরবীনের সাহায্যে বহুদূরে একটা ঝুড়ি নৌকা দেখতে পায় রুবাই। ঝুড়িটা আর একটু কাছে আসতেই ও ছেলেটাকে চিনতে পারে। শিবা। এর নৌকাতেই তো এসেছিল ওরা। রুমালটা বার করে ও নাড়তে থাকে, তবে শিবা এদিকেই আসছিল। ওর সামনে এসেই ভাঙা ভাঙা হিন্দি-ইংরেজি-তেলেগু মিশিয়ে শিবা বলে, “তোমার সঙ্গীদের তো হাত-পা বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে লোকগুলো। আমি দেখেছি।”

“তুমি কোথায় ছিলে?”

“আমি ওই বাঁকের ওধারে একটা খাঁড়িতে মাছ ধরছিলাম। হঠাৎ ওদের গলার আওয়াজ পাই। ভেবেছিলাম তোমরা ফিরে এসেছ। কিন্তু ওই বড়ো পাথরটার আড়াল থেকে দেখি চার-পাঁচটা লোক ওদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। রিভলভার দেখে আমি বাধা দিইনি।”

“কিন্তু কোথায় নিয়ে গেল ওদের?” রুবাই অধৈর্য হয়ে যায়।

“স্যারের ক্যামেরা আর মোবাইলটা ওরা ছুড়ে ফেলেছিল জঙ্গলে। আমি পরে কুড়িয়ে নিয়েছি। নৌকায় রয়েছে। কিন্তু ওরা বলছিল ওদের হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দেবে। তাড়াতাড়ি এসো। কোরাকেলটা বেরিয়ে গেছে বহুক্ষণ। আমি জলেই এতক্ষণ খুঁজলাম। কিন্তু কোথাও পেলাম না।”

রুবাই তাড়াতাড়ি ঝুড়িতে উঠে বসে। শিবা দাঁড় বাইতে থাকে। রুবাইয়ের মাথায় হাজারটা চিন্তা পাক খায়। এখনই পুলিশের কাছে যাওয়া দরকার। কিন্তু অন্বয়দা আর আকাশকে ছেড়ে ও একা কোথায় যাবে! এখনো ফোনে টাওয়ার নেই। নাহলে বাবাকে ফোন করে হেল্প চাইত ও। বাবার অনেক পরিচিতি।

“এখান থেকে জলপথে নাগার্জুনাকুণ্ডা কতদূর গো?” ও শিবাকে প্রশ্ন করে।

“পনেরো মাইলমতো হবে। এতদূর এই কোরাকেল নিয়ে যাইনি কখনো। কেন?”

রুবাই মাথা নাড়ে। ওই লোকগুলো তবে ওদিক দিয়ে আসেনি। কাছাকাছি কোথাও থেকে এসেছে। কিন্তু দু-ঘণ্টা খোঁজার পরেও ওরা অন্বয় বা আকাশকে খুঁজে পায় না। একটা ছোটো দ্বীপের বালুর চরে একপাটি জুতো দেখে রুবাইয়ের চোখে জল এসে যায়। এটাই তো অন্বয়দার জুতো। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় এই জুতোয় হাত দিয়ে প্রণাম করেছিল ও। ওরা দ্বীপটায় নেমে পড়ে। ছোট্ট একটা পাহাড়ের মাথা, চারদিকে বালি। কিন্তু আকাশ বা অন্বয় নেই।

অন্বয়দা তো ওদের স্কুলে কতরকম রেসকিউ অ্যাক্টিভিটি শেখাতেন। হাত-পায়ের বাঁধন খোলাও অন্বয়দার কাছে সহজ কাজ। আকাশও শিখেছিল। সাঁতারেও ওরা পারদর্শী। তবে কী হল!

এখানে সূর্য অস্ত যায় দেরিতে। ও শিবাকে বলে কাছাকাছি থানা বা পুলিশ চেকপোস্ট থাকলে ওকে নিয়ে যেতে।

শিবা পাড়ের দিকে এগিয়ে চলে। পাড়ের কাছাকাছি আসতেই রুবাইয়ের ফোন বেজে ওঠে। ড্রাইভারের ফোন। লোকটা তেলেগু টানে হিন্দিতে বলে ওরা এত দেরি করছে কেন? এমন হলে হায়দ্রাবাদ পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। রুবাই আসছে বলে ফোন কেটে দেয়। আবার টাওয়ার চলে গেছে। শিবাকে নিয়েই ও পাড়ে নামে। ড্রাইভারকে গিয়ে বলে ওদের বিপদের কথা, কাছাকাছি একটা পুলিশ চেকপোস্টে নিয়ে যেতে বলে ওকে। ড্রাইভার এই বারো-তেরো বছরের ছেলের কথায় ভরসা পাচ্ছিল না। শিবা তেলেগুতে ওকে বুঝিয়ে বলতে ও সামনেই একটা পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায় ওদের।

কিন্তু পুলিশরা সব শুনে বলল এটা জল-পুলিশের আওতায়। ওদের নাগার্জুনা সাগর ফিরে গিয়ে ওখানে জল-পুলিশে কমপ্লেন করতে হবে। ওরা কিছুই করতে পারবে না। বাধ্য হয়ে রুবাই বাবাকে ফোন করে।

ওর বাবা সব শুনে ওকে বলে, “আমার বন্ধু রঙ্গনের কথা তোর মনে আছে তো? তিনদিন আগে ফোন করেছিল ও। ওর নম্বর দিচ্ছি এখনই। ও একটা কাজের ব্যাপারে তেলেঙ্গানাতেই আছে এখন বলেছিল। ওকে একবার বলে দেখ।”

গতবছর কেরালায় একজন অপরাধীকে ধরতে রঙ্গন-আঙ্কলকে সাহায্য করেছিল রুবাই। আঙ্কল মাঝেমধ্যে ফোন করতেন ওদের। রুবাইকে খুব পছন্দ করতেন আঙ্কল। রুবাই সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে। দু-বার রিং হতেই ও-ধার থেকে আঙ্কেলের ব্যারিটোন আওয়াজ ভেসে আসে। ও আঙ্কলকে অন্বয়দাদের বিপদের কথা বলে।

রঙ্গন-আঙ্কল ও তেলেঙ্গানাতে এসেছে শুনে খুব খুশি হন। কিন্তু সব শুনে বেশ গম্ভীর হয়ে বলেন, “তোমার কাছে লোকগুলোর ছবি আছে? থাকলে আমায় পাঠাও। আমি নাগার্জুনা সাগরের জল-পুলিশকে ইনফর্ম করছি। আর নিজেও যাচ্ছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তুমি ওখানেই থাকবে ততক্ষণ।”

একটু পরেই ওপর মহল থেকে ওই পুলিশ ফাঁড়িতে ফোন চলে আসে। ওরা হঠাৎ করে রুবাইকে খুব খাতির করতে শুরু করে। রুবাই ওর তোলা ওই লোকগুলোর ফটো আর ভিডিও পাঠিয়ে দেয় আঙ্কলকে। ফোনে ও সবকিছু বলতে পারেনি খুলে। শুধু বলেছে এই লোকগুলো রজার পিট আর নাগার্জুনাকুণ্ডায় যে লোকটা খুন হয়েছে তাদের সঙ্গে যুক্ত। এরা একটা হীরা খোঁজে ঘুরছে এই অঞ্চলে।

ফটো পাঠিয়ে ও বসে ভাবছিল হায়দ্রাবাদ থেকে এই জায়গায় আসতে কম করে তিন ঘণ্টা লাগবে। রঙ্গন-আঙ্কল একজন সরকারী উচ্চপদস্থ আমলা, কিন্তু ঠিক কোন ডিপার্টমেন্টের সেটা রুবাই জানে না। গোপনীয়তা দেখে ওর মনে হয় আইবি বা র-এর অফিসার হয়তো। অথবা অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে রয়েছেন। কিছুক্ষণ পরেই হেলিকপ্টারের ক্যাটক্যাট শব্দে ফাঁড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে রুবাই। সিকিমে ও মিলিটারি হেলিকপ্টারে চড়েছিল একবার। সামনের খোলা চত্বরে নামে কপ্টার, আর ছয় ফিট দুই ইঞ্চির রঙ্গন-আঙ্কল নেমে আসেন কপ্টার থেকে।

রুবাই ছুটে যায় আঙ্কলকে দেখে। সব শুনে রঙ্গন-আঙ্কল ওদের দু-জনকে কপ্টারে তুলে নেন। শিবার থেকে দ্বীপটার অবস্থান জেনে সেদিকে উড়ে যায় কপ্টার।

রুবাই বলে, “কিন্তু ওই দ্বীপে তো কপ্টার নামার জায়গা নেই। আর সন্ধ্যাও নেমে পড়বে এখনই।”

“আজ আমরা আশেপাশের দ্বীপগুলোয় তোমার বন্ধু আর স্যারকে খুঁজব। ওই দ্বীপে নামব না।” রঙ্গন-আঙ্কল বলেন।

নাগার্জুনা সাগরের উপর উড়ে বেড়ায় কপ্টার। দিবাকর তখন কমলা রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে জলে। জল-পুলিশের দুটো স্পিড বোটও চলে এসেছে নীচে তাকিয়ে দেখে রুবাই। কয়েকবার পাক খেতেই জল-পুলিশের থেকে খবর আসে রেসকিউ করা হয়েছে দু-জনকে একটা ছোট্ট পাথুরে দ্বীপ থেকে। আপাতত ওদের সেই ফাঁড়িতেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে কপ্টার ফিরে আসে ফাঁড়িতে। গাড়ি করে অন্বয়দা আর আকাশকেও নিয়ে আসা হয় ফাঁড়িতে। ওরা এসে পৌঁছতেই রুবাই ছুটে যায়। জড়িয়ে ধরে ওদের।

অন্বয়দা বলেন, “আমি জানতাম রুবাই-মাস্টার যখন রয়েছে, আমাদের ঠিক কেউ না কেউ উদ্ধার করবে। রুবাইয়ের বুদ্ধির উপর ভরসা ছিল পুরোপুরি।”

“কিন্তু ওই ক্রিমিনাল লোকগুলো তো পালিয়ে গেল!” রুবাই বলে।

“না, পালায়নি। হায়দ্রাবাদ ঢোকার আগে যে রিং রোড রয়েছে সেখানে চেকপোস্টে ধরা পড়েছে। রুবাইয়ের পাঠানো ছবি দেখেই ওদের ধরা হয়েছে। আপাতত আমাদের হায়দ্রাবাদ ফিরতে হবে।”

ফাঁড়ির কাজ মিটিয়ে ওদের নিয়ে কপ্টার আবার আকাশে ভেসে যায়। সবাই তখন উশখুশ করছে সবটা জানার জন্য।

হায়দ্রাবাদ পুলিশের হেড কোয়ার্টারে পৌঁছে যায় ওরা কিছুক্ষণের মধ্যেই। রুবাই, অন্বয় আর আকাশ ওই চারজন অপরাধীকে সহজেই সনাক্ত করে। লোকগুলোকে আপাতত শ্রীঘরে ঢুকিয়ে রঙ্গন-আঙ্কল একটু ফ্রি হয়ে ওদের নিয়ে বসেন একটা ঘরে।

অন্বয় এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। এবার বলেন, “কিন্তু ওই লোকগুলো আমাদের শত্রু ভেবেছিল কেন তাই তো বুঝলাম না! আমাদের কিছু না করলে ওরা ধরাও পড়ত না।”

“ওরা খুনি, বড়ো ক্রিমিনাল!” রুবাই বলে।

“হ্যাঁ, ওই রহমান আর জাকির বেশ বড়ো ক্রিমিনাল। অ্যান্টিক চুরি থেকে খুন, বেশ কিছু মামলার আসামি ওরা। আর ওই স্মিথ আর পিটার ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল, ওদের অ্যান্টিক স্মাগলার বলা যায়। কিছুদিন আগেই ওরা আঙ্করভাটে মূর্তি চুরি করে কাস্টমসকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছিল কোনোভাবে। আমাদের কাছে খবর ছিল ওরা এবার হায়দ্রাবাদে এসেছে। আমরা সালারজং মিউজিয়াম চৌমহলা প্যালেসের মতো জায়গায় সিক্যুরিটি বাড়িয়ে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ইন ফেক্ট এই কেসের জন্যই আমি তেলেঙ্গানা এসেছিলাম। কিন্তু ওদের এদেশে আসার লক্ষ্য কী আমরা ঠিক জানতাম না।” রঙ্গন-আঙ্কল বলেন।

“ওরা এদেশে এসেছিল একটা হীরার খোঁজে। হোপ ডায়মন্ড ট্যাভেনিয়ারের হাত ধরে বিদেশ পাড়ি দিলেও অনেকের বিশ্বাস ওর অন্যটা থেকে গেছিল এদেশেই। স্মিথের পূর্বপুরুষ জানত সেটা কোথায় আছে। কোনো বহু প্রাচীন মন্দিরে দেবীর চোখ হিসাবে ছিল ওই হীরক খণ্ড। সেই পূর্বপুরুষের বিবরণ পড়ে ও এদেশে আসে। একটা প্রাচীন ম্যাপ ছিল ওদের কাছে। জলাশয়ের মাঝে এক প্রাচীন মন্দির যার সঙ্গে গুহাপথে যোগাযোগ ছিল গোলকুণ্ডায় ফোর্টের, এমন কিছু খুঁজছিল ওরা। ওদের কথা শুনে আমার তাই মনে হয়েছে। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবর্তন হয়েছে। এত বড়ো জলাধার তৈরি করতে গিয়ে সভ্যতার অনেক নিদর্শন হারিয়েই গেছে। কত পাহাড় কেটে বসতি হয়েছে, জঙ্গল কেটে হাইটেক সিটি তৈরি হয়েছে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। তাই ওই ম্যাপ আজ অপ্রাসঙ্গিক।” রুবাই বলে।

“কিন্তু এত কথা তুমি কী করে জানলে?” এবার রঙ্গন-আঙ্কল ওকে প্রশ্ন করেন।

“আমি ওদের বেশ কিছু কথা শুনে বুঝতে পারি। ওই দ্বীপে আমি লুকিয়ে সব শুনেছিলাম। ভিডিও করে নিয়েছিলাম সবটা। আর গোলকুণ্ডাতে ওদের দেখেছিলাম মিঃ রজারের সঙ্গে। তারপরেই মিঃ রজার পিট খুন হন।”

“ঠিক। ওরাই গোলকুণ্ডা ফোর্টে ডঃ রজার পিটকে খুন করেছিল। আর আমাদের এক অফিসারকে খুন করেছিল গতকাল নাগার্জুনাকুণ্ডায়। ওরা ঠিক কী চুরি করতে এসেছে বুঝতে পারছিলাম না আমরা।”

“কিন্তু মিঃ রজারকে ওরা খুন করল কেন?” অন্বয় জিজ্ঞেস করেন।

“আসলে ডঃ পিট একজন ঐতিহাসিক। ওঁর বংশের এক পূর্বপুরুষও এদেশে এসেছিলেন স্বাধীনতার আগে। উনি এসেছিলেন সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো ঘুরে দেখতে। এটুকুই আমরা জানতে পেরেছি।” রঙ্গন-আঙ্কল বলেন।

“ওঁর বংশের কোনো আদি পুরুষ তার আগেও এদেশে এসেছিলেন। ট্যাভেনিয়ারের সঙ্গী ছিলেন তিনি। তাঁর কোনো দিনলিপি ছিল ওঁর কাছে। এই স্মিথ আর পিটার ঘটনাটা জেনেছিল কোনোভাবে। উনি গোলকুণ্ডার হীরার খনিগুলো সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিলেন। হয়তো উনিও সেই দিনলিপি পড়েই জিনিসটা খুঁজছিলেন। আর তাই ওঁকে খুন হতে হয়। ওঁর থেকেই ওই ম্যাপ আর দিনলিপি ওরা পেয়েছিল। উনি গোলকুণ্ডায় আমাদের হোপ ডায়মন্ডের ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। সে সময় মনে হয়েছিল কাউকে দেখে উনি ভয় পেয়েছিলেন।” রুবাই বলে।

“কিন্তু যাকে নিয়ে এত কাণ্ড সেই লিটল হোপ বা ওই নীল হীরার জোড়া কি সত্যিই আছে?” অন্বয় প্রশ্ন করেন।

“কতশত হীরা এদেশ থেকে যুগে যুগে চুরি হয়েছে। আগে ভারতের সব মন্দিরেই সোনা, রূপা, হীরা জহরত থাকত। কিন্তু তার বেশিরভাগ লুঠ হয়ে গেছে। কোনটা কোথায় গেছে তা সবসময় জানাও যায় না। সে সময় তো আর সবকথা লেখা হত না। শ্রীশৈলমের মল্লিকার্জুন মন্দির থেকে তিরুপতি বা কেরালার পদ্মনাভ স্বামী মন্দির এসব জায়গাতে এখনো প্রচুর জহরত লুকানো আছে। সেখানেও থাকতে পারে এই হীরক খণ্ড। তবে তা জনসমক্ষে না এলেই মঙ্গল। কারণ আমদের দেশে তো সর্ষের মধ্যেই ভূত। তাই সরকার এসব নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় না।” রঙ্গন-আঙ্কল বলেন।

“কিন্তু ওই দ্বীপে যে প্রাচীন মন্দির আছে তা আর আমাদের দেখা হল না।” রুবাই বলে।

“কাল যদি ওদিকে যেতে চাও জল-পুলিশের লঞ্চ তোমাদের ঘুরিয়ে দেবে ওই দ্বীপ আর মন্দির। এমন প্রাচীন মন্দির এ রাজ্যে প্রচুর রয়েছে। সাতবাহনদের তৈরি প্রচুর স্থাপত্য এখনো রয়ে গেছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।” রঙ্গন-আঙ্কল বলেন।

“আপাতত আমাদের ট্রেনের টিকিট কাটতে হবে। সাইক্লোনে আমাদের টিকিট ক্যানসেল হয়ে গেছে। পরশু থেকে ট্রেন চলবে মনে হয়।” অন্বয়দা বলেন।

“আমি বলে দিচ্ছি, টিকিটের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমার একটা প্রেস কনফারেন্স আছে আজ রাতেই। আর কাল হায়দ্রাবাদে আমরা রুবাইকে একটা ছোটো সম্বর্ধনা দেব, কারণ ও না থাকলে এত সহজে লোকগুলো ধরা পড়ত না। আর ওরা যে হোপ ডায়মন্ড খুঁজতে এসেছে তাও জানতে পারতাম না। আমার লোকেরা ভেবেছিল ওরা গোলকুণ্ডাতে কিছু খুঁজছে।”

“আসলে গণ্ডগোলটা তো গোলকুণ্ডাতেই শুরু হয়েছিল, তাই জটায়ুর মতো এই ঘটনাকে আমরা গোলকুণ্ডায় গণ্ডগোল নাম দিতেই পারি।” আকাশ বলে ওঠে।

সবাই হো হো করে হেসে ফেলে ওর কথা শুনে। দূরে ঝলমল করছে চারমিনার। সেদিকে তাকিয়ে রুবাই ভাবে ইতিহাসের আরও কত রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ওইসব পৌরাণিক স্থাপত্যর আড়ালে।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সুজাতা


No comments:

Post a Comment