বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ যা দেখি, যা খুঁজি...(৮ম) - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

আগের পর্ব


অষ্টম পর্ব



পশুদের দাঁতের অসুখ হয় না কেন?


দাঁতের অসুখে ভোগেননি এমন মানুষ খুব কমই আছেন। এই রোগের মূল কারণ দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া। মানুষের মধ্যে এই রোগ খুব বেশি দেখা গেলেও পশুদের এই রোগ হয় না বললেই চলে। মানুষের মতো ওদেরও দাঁত আছে, তাহলে ওদেরও দাঁতের অসুখ হয় না কেন?

খাবার খাওয়ার পর দুটো দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে থাকে। এই খাবারে ব্যাক্টেরিয়া বাসা বাঁধে এবং বংশবিস্তার করে। মুখের ভিতরের এই ব্যাক্টেরিয়ার বংশবিস্তারের জন্য প্রয়োজন হয় ‘স্টার্চ’, যা এরা দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাবার থেকে পেয়ে যায়। এরা প্রথমে এই স্টার্চকে গ্লুকোজে পরিবর্তিত করে এবং পরে ল্যাকটিক অ্যাসিডে। এই ল্যাকটিক অ্যাসিডই দাঁতের এনামেলকে নষ্ট করে। ফলে দাঁতের ক্ষয়রোগ শুরু হয়। আমাদের খাদ্য তালিকায় প্রচুর পরিমাণে স্টার্চ জাতীয় খাদ্য থাকে। তাই আমাদের মুখে ব্যাক্টেরিয়ার বংশবিস্তার বেশি হয়।

খাদ্যাভাস অনুসারে পশুদের দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, তৃণভোজী প্রাণী ও মাংসাসী প্রাণী। তৃণভোজী প্রাণীরা যে ধরনের খাবার খায় তাতে স্টার্চের পরিবর্তে সেলুলোজ বেশি থাকে। মাংসাশী প্রাণীদের খাদ্যেও স্টার্চ থাকে খুবই কম। যেহেতু স্টার্চ ছাড়া মুখের ভিতরে বাসা বাঁধা ব্যাক্টেরিয়ার স্বাভাবিক বংশবিস্তার ঘটে না, তাই পশুদের দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবারে এইধরনের ব্যাক্টেরিয়া বংশবিস্তার করতে পারে না। এইধরনের ব্যাক্টেরিয়া সরাসরি সেলুলোজ থেকে গ্লুকোজ তৈরি করতে পারে না। সেলুলোজ ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন এনজাইম যা এদের মধ্যে থাকে না। তাই পশুদের দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে থাকলেও ব্যাক্টেরিয়ার অনুপস্থিতির জন্য ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয় না। এই কারণেই পশুদের মধ্যে দাঁতের ক্ষয়রোগ দেখা যায় না। সেলুলোজের আধিক্যের দরুন তৃণভোজী প্রাণীদের দাঁতে ব্যাক্টেরিয়ার বংশবিস্তার ঘটতে দেখা না গেলেও এইসব প্রাণীদের ক্ষুদ্রান্ত্রে ব্যাক্টেরিয়ার বংশবিস্তার ঘটতে দেখা যায়।

এছাড়াও পশুদের দাঁত এবড়োখেবড়ো থাকে। তাই এদের দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে থাকে খুব কম। মানুষের মধ্যেও যাদের দাঁত এবড়োখেবড়ো তাদের দাঁতের অসুখে ভুগতে কম দেখা যায়।

তবে পশুদের মধ্যে দাঁতের ক্ষয়রোগ যে একেবারেই হয় না এমন নয়। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো পশুর দাঁত ক্ষয়ে যেতে দেখা যায়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ক্ষয় মারাত্মক আকার ধারণ করার আগেই এদের জীবনকাল শেষ হয়ে যায়।


জ্বর হলে শীত শীত করে কেন?


সুস্থ মানুষের শরীরের তাপমাত্রা ৯৮.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মতো থাকে। জ্বর হলে এই তাপমাত্রা বেড়ে যায়। কোনো বস্তুর উষ্ণতা বেড়ে গেলে তা গরম হয়ে ওঠে। আমাদের শরীরেও তাই হয়। অর্থাৎ, জ্বর হলে শরীরের উষ্ণতা বেড়ে যায় বলে তাপমাত্রাও বেড়ে যায়। ফলে শরীর গরম হয়ে ওঠে। অথচ মজার কথা হল, যে ব্যক্তির জ্বর হয় তার শীত শীত করে। জ্বর হলে একদিকে শরীরের উষ্ণতা বাড়ছে, অন্যদিকে শীত করছে। এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শীত বা গরম কেন লাগে তা বুঝতে হবে। আমাদের চারপাশের পরিবেশের উষ্ণতা যদি আমাদের শরীরের উষ্ণতা থেকে কম থাকে তবে আমরা শীত অনুভব করি। আর বিপরীত হলে গরম অনুভব করি। জ্বর হলে আমাদের শরীরের উষ্ণতা বেড়ে যায় ঠিকই, কিন্তু চারপাশের পরিবেশের উষ্ণতা কম থাকায় আমরা শীত অনুভব করি।


শরীরে আঘাত লাগার জায়গায় হাত বুলোলে ব্যথার অনুভূতি কমে যায় কেন?


আমরা শরীরের কোনো অংশে যখন ব্যথা পাই তখন সেই অনুভূতি আমাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন নার্ভের ভিতর দিয়ে মস্তিষ্কে অর্থাৎ ব্রেনে পৌঁছায়। আঘাত লাগার জায়গায় হাত বুলোলে ব্যথার অনুভূতি এবং হাত বুলোনোর অনুভূতি ভাগাভাগি হয়ে ব্রেনে পৌঁছায়। ফলে ব্যথার অনুভূতি অনেকটা কমে যায়। এই কারণেই শরীরের কোথাও আঘাত লাগলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সেখানে হাত বুলোতে শুরু করি।



ডিমের ভিতরে থাকাকালিন বাচ্চা পাখিটি কীভাবে শ্বাস নেয়?


কোনো মা পাখি ডিম পাড়ার পরে ডিমটা বেশ কিছুক্ষণ গরম থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সেটা ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা হওয়ার সময় ডিমের ভিতরে যেসব উপাদান থাকে সেগুলি সংকুচিত হতে থাকে। এর ফলে ডিমের খোলসের ভেতরে থাকা মেমব্রেন বা পর্দাদুটো সামান্য সরে গিয়ে একটা ফাঁক (gap) তৈরি হয়। ডিমের খোলসের উপরে রয়েছে অসংখ্য অণুবীক্ষণিক ছিদ্র। এই ছিদ্রপথে বায়ু প্রবেশ করে ওই ফাঁকে সেটা জমতে থাকে। বাচ্চা পাখিটা বড়ো হওয়ার সময় ওই সঞ্চিত বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছেড়ে দেয়। খোলসের উপরে থাকা অসংখ্য ছিদ্রপথ দিয়েই কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাইরে বের হয়ে যায়, আর বায়ুর সঙ্গে অক্সিজেন ভিতরে প্রবেশ করে। এভাবেই বাচ্চা পাখিটা খোলসের ভিতরে শ্বাসকার্য চালায়।



জল বর্ণহীন হলেও জলপ্রপাতের রঙ সাদা হয় কেন?


সূর্য থেকে যে আলো আসে তা মূলত সাদা দেখতে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সাতটি রঙের আলোর সমষ্টি। কোনো বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়লে বস্তুটিকে আমরা দেখতে পাই। বস্তুটি থেকে যদি সবক’টি রঙের আলো প্রতিফলিত হয় তখন তাকে সাদা দেখতে লাগে। কিন্তু প্রকৃতিতে আমার বিভিন্ন বস্তু বিভিন্ন রঙে দেখি। এর মূলে রয়েছে বস্তুর নিজস্ব ধর্ম। প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তুর আলো প্রতিফলন ও শোষণের ক্ষমতা আছে। যখন বস্তুটি আলোর কোনো একটি রঙ ব্যতীত বাকি রঙগুলি শোষণ করে এবং ওই নির্দিষ্ট রঙটি প্রতিফলিত করে তখন আমরা বস্তুটিকে ওই রঙে দেখে থাকি।

জলপ্রপাতের ক্ষেত্রে আমরা জল ও বায়ুকে একটি অসমসত্ব মিশ্রণ বলে ধরতে পারি। যখন আলো লঘু মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন আলোর একটি অংশ প্রতিফলিত হয় ও বাকি অংশ প্রতিসৃত হয়। জলপ্রপাতের জায়গায় বাতাসে প্রচুর জলকণা ভেসে বেড়ায়। প্রতিটি জলকণার ও মাঝে বায়ুস্তরে ঘনত্বের পার্থক্যের দরুন সেখানে অনবরত প্রতিফলন ও প্রতিসরণ ঘটতে থাকে। একটি রশ্মির একটা স্তরে প্রতিসরণ ঘটলে পরের স্তরে আবার প্রতিফলন ঘটে। এভাবেই বেশিরভাগ আলোই জলপ্রপাতের জল দ্বারা প্রতিফলিত হয়। তাই জলপ্রপাতের রঙ সাদা মনে হয়। এক্ষেত্রে একটা শর্ত আছে, আলো আসতে হবে সবদিক থেকে। কেবলমাত্র কোনো একটি দিক থেকে আলো এলে সেখানে রামধনু-রঙ দেখা যাবে।


মশা কামড়ালে চুলকানি হয় কেন?


মশার খাদ্য মূলত গাছের বা ফলের রস, কোনো প্রাণীর রক্ত নয়। ডিম পাড়ার ঠিক আগে কোনো কোনো প্রজাতির মশার রক্ত থেকে পুষ্টি গ্রহণের প্রয়োজন হয়। তখনই তারা রক্তের সন্ধানে প্রাণীর দেহে হুল বা চোষকটি ফোটায়।

মশা যখন কামড়ায় অর্থাৎ তার নলের মতো চোষক বা প্রোবোসিসটি নিকটবর্তী শিরা তাক করে ফোটায় তখন তার সঙ্গে বেরোয় লালারস। লালারসে তঞ্চনরোধক পদার্থ ও প্রোটিন থাকে। তঞ্চনরোধক রক্তের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ করতে থাকে। আর প্রোটিন যেহেতু আমাদের শরীরের ক্ষেত্রে আগন্তুক তাই অনাক্রম্যতন্ত্র হিস্টামিন নিঃসরণ করায়। এই হিস্টামিন চুলকোতে বাধ্য করে। আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা (Immune systern) আমাদের সেই চুলকানি থেকে রক্ষা করতে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। যার ফলে কামড় দেওয়া জায়গাটা ফুলে ওঠে। অ্যানোফিলিস মশায় থ্রম্বিন নির্দেশিত তঞ্চনরোধক এবং কিউলেক্স মশায় FXa নির্দেশিত তঞ্চনরোধক থাকে। আর প্রোটিনগুলো যথাক্রমে অ্যানোফিলিন ও কিউলিসিন।

শুধু মশাই নয়, যে-কোনো পতঙ্গ কামড়ালে বা বাইরের বস্তু (foreign body) শরীরের প্রবেশ করলে আমাদের শরীরে চুলকানি জাতীয় অস্বস্তি হয়, এর প্রধান কারণ ওই হিস্টামিন যা প্রতিরোধক হিসাবে আমাদের শরীর থাকে।


দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ঘুম পায় কেন?


দুপুরের খাবার খাওয়ার পর শরীরে কেমন একটা ঘুম ঘুম ভাব চলে আসে। মনে হয় শরীরটা একটু এলিয়ে নিতে পারলে ভালো হয়। তখন অনেক চেষ্টা করেও চোখ মেলে রাখা দায় হয়ে যায়। একটু ঘুমিয়ে নিলে তখন শরীর আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। দুপুরের এই ঘুম ভাতঘুম নামে পরিচিত। বাঙালিদের মধ্যে এই ভাতঘুম দেওয়ার প্রবণতা বেশি, এমন একটা ধারণার প্রচলন আছে। যদিও এটি পুরোপুরি ঠিক নয়। ইতালি, গ্রিস, স্পেন প্রভৃতি দেশগুলিতে মধ্যাহ্ন ভোজের (লাঞ্চ) পরে বিশ্রামের জন্য দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত দু-তিন ঘণ্টা অনেক দোকানপাট, বাজার, অফিস বন্ধ থেকে। এই সময়টাকে ওই দেশে বলা হয় ‘সিয়েস্তা’ (Siesta)। উত্তর ইতালিতে একে বলে ‘রিপোজ্‌’ (Ripose)। আরও অনেক দেশেই এরকম কিছু পদ্ধতি আছে। ইংরেজিতে এমন ঘুমকে বলে ‘ন্যাপ’ (Nap)।

যে-কোনো খাবার খাওয়ার পরেই রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণের জন্য প্যানক্রিয়াস ইনসুলিন তৈরি করতে থাকে। অনেক সময় আমরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলি। এর ফলে প্যানক্রিয়াসকে বেশি ইনসুলিন উৎপন্ন করতে হয়। তখন এই হরমোন মস্তিষ্কে গিয়ে বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিনে পরিণত হয়। এই মেলাটোনিন হরমোনের জন্যই ভরপেট খাওয়ার পর ঘুম ঘুম পায়। এছাড়াও উচ্চ কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খেলে একে হজম করতে শরীরের ৬০ থেকে ৭৫ ভাগ শক্তি খরচ হয়। এই শক্তি ক্ষয়ের জন্যও আমাদের ঘুম পায়।

আমাদের শরীরে কোষ সর্বক্ষণই কাজ করে যাচ্ছে। এর জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন। সেই শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ঘুমের প্রয়োজন। হাইপোথ্যালামাস নামক মস্তিষ্কের একটি অংশে ২০০০০ স্নায়ু কোষ দিয়ে তৈরি একটি ছোট্ট অংশের নাম Suprachiasmatic nucleus. সংক্ষেপে একে বলে SCN. এই SCN প্রতি ১০-১২ ঘণ্টা অন্তর শরীরকে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সিগন্যাল পাঠায়। এই কারণেও দুপুরে খাওয়ার পর শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে দিতে SCN মেলাটোনিন উৎপন্ন করে ঘুমের সংকেত পাঠাতে থাকে। আর তাতেই ঘুম ঘুম ভাব আসে।

(ক্রমশ)


No comments:

Post a Comment