বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ পদার্থ কণার ব্রাউনীয় গতি - নীলোত্পল ঘোষ


পদার্থ কণার ব্রাউনীয় গতি


নীলোত্পল ঘোষ



পদার্থ কী, সেটা বুঝতে হলে তার সম্পর্কে জানা দরকার যার গণ্ডি সুদূর প্রসারিত। ‘পদার্থমাত্রই স্থান আর কাল ব্যাপিয়া  থাকে’ এইরকম ধারণা খানিকটা  দার্শনিক, যা ঠিক বিজ্ঞানের চৌহদ্দির মধ্যে পড়ে না বলেই মনে হয়। তাহলে পদার্থ যে কঠিন, তরল আর গ্যাসীয় অবস্থায় থাকতে পারে তার কারণই বা কী, আর ওই সব বিভিন্ন অবস্থার মৌলিক ধর্মই বা কীরকম? পদার্থের উপদানভূত অণূ-পরমাণুর সাহায্যে কঠিনের ধর্মগুলি  অনেকটা ব্যাখা করা সম্ভব হয়েছে, যেমন কেলাসের গঠন (crystallography), ধাতু, সংকর ধাতু, আপেক্ষিক তাপ, তাপীয় কম্পন, তাপীয় ও বিদ্যুৎ পরিবাহিতা, অর্ধপরিবাহিতা (semi-conductivity), অতিপরিবাহিতা (superconductivity), প্রভৃতি। তরলের ক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞান সেই অর্থে এখনও সীমিত, কারণ তরলের ধর্ম বেশ জটিল। হিমাঙ্কের কাছাকাছি তরলের সঙ্গে কঠিনের কিছু মিল আছে। আবার ক্রান্তিক উষ্ণতার (critical temperature) কাছাকাছি গ্যাসের সঙ্গে তার অনেক মিল। এখানে দশা চিত্রের (phase diagram) উল্লেখ করা যায়, যেখানে ক্রান্তিক বিন্দুতে (critical point) এবং উচ্চতম তাপমাত্রা ও চাপে, তরল আর গ্যাসকে আলাদা করা যায় না। এদিক থেকে দেখলে, গ্যাসের জটিলতা অপেক্ষাকৃত কম এবং তার কারণ গ্যাস-কণার পরস্পরিক আকর্ষণের ক্ষীণতা।

গ্যাসের ধর্ম আলোচনা করতে গেলে প্রথমে গ্যাসের গতিতত্ত্ব সম্বন্ধে জানতে হবে। এই তত্ত্বে কতগুলো বিষয় মেনে নেওয়া হয়, যেমন কণাগুলোর শাশ্বত, এলোমেলো গতি (eternal, random motion), পরস্পরের সঙ্গে স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ (elastic collisions) ইত্যাদি। গ্যাস অণুর শাশ্বত, এলোমেলো গতি খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু বিশেষ অবস্থায় ক্ষুদ্র কণার এরকম গতি আমরা দেখতে পাই। একে ব্রাউনীয় গতি বলে।

ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায়, ব্রিটিশ উদ্ভিদ বিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন (১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে) শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে দেখতে পান যে জলে নিলম্বিত (suspended) পরাগরেণু (pollen grain) যেন বিনা কারণেই অবিরাম ইতস্তত ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। এই গতি এলোমেলো এবং অবিরাম চলতে থাকে, কখনো কমে না বা থামেও না। আবিষ্কারকের নামানুসারে এই গতিকে ‘ব্রাউনীয় গতি’ (Brownian Motion) নাম দেওয়া হয়েছিল। জলে অথবা বায়ূতে নিলম্বিত 10-3- 10-5 ব্যাসের কঠিন বা তরল কণায় এই গতি পর্যবেক্ষণ করা যায়। প্রায় ৮০ বছর বাদে ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein) তাঁর গবেষণা পত্রে এই গতির গাণিতিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন।

ব্রাউনীয় গতি কী এবং কেন হয়, সেই ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা নীচের ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করেন।

১) ব্রাউনীয় গতি অবিচ্ছিন্ন, বিরামহীন ও সম্পূর্ণ এলোমেলো। কণার যে-কোনো দিকে চলবার সম্ভাব্যতা (probability) সমান। কাছাকাছি থাকা দুটি কণা কখনো একই সময় একই দিকে চলে না।

২) আধারের কোনো কম্পনের উপর ব্রাউনীয় গতি নির্ভর করে না।

৩) মাধ্যমের সান্দ্রতা (viscosity) কম হলে গতি বেশি পরিস্ফুটিত হয়। অর্থাৎ জলের চেয়ে বায়ুতে এই গতি বেশি বোঝা যাবে।

8) ছোটো কণার গতি বড়ো কণার গতির থেকে বেশি জোরালো।

৫) একই পদার্থের সমান আকারের দুইটি কণা একই উষ্ণতায় গড়ে সমান বেগে চলে।

৬) উষ্ণতা বাড়লে গতিও বাড়ে।

উপরের ঘটনাগুলো ভালোভাবে বুঝতে হলে পদার্থের গতীয় তত্ত্বের (kinetic theory of matter) সাহায্য নিতে হবে। নিলম্বিত পদার্থ-কণাগুলো মাধ্যমের অণুর তুলনায় 106– 1012 গুণ বড়ো। অণুগুলি তাপীয় গতির (thermal motion) জন্য অবিরাম তীব্র বেগে ছুটে বেড়ায় আর গতিপথে যেটা পড়ে তার সঙ্গে ধাক্কা খায় অর্থাৎ সংঘর্ষ হয়। নিলম্বিত কণাগুলো আকারে বড়ো হলে গড়ে সবদিক থেকে তাদের উপর অণুগুলোর ধাক্কা সমান হয়। কিন্তু কণা আকারে যথেষ্ট ছোটো হলে সবদিক থেকে অণুর ধাক্কা সমান না হবার সম্ভাবনা বাড়ে। এই কারণে ছোটো কণার উপর অপ্রতিমিত বল (unbalanced force) কাজ করে এবং কণা এরকম বলের অভিমুখে চলে। অণুর গতি সম্পূর্ণ এলোমেলো বলে কণার ধাক্কাগুলো এলোমেলো হয়। স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপ্রতিমিত বলের মান আর দিক অনির্দিষ্টভাবে বদলায়। এজন্য কণার গতির অভিমুখও এলোমেলোভাবে বদলায়। স্বভাবতই কণার ভর যত কম হয়, সমান বলের ক্রিয়ায় ওর গতিও তত বেশি হয়। মাধ্যমের সান্দ্রতা কণার গতিতে বাধা দেয়, কাজেই সান্দ্রতা কম হলে গতি বাড়ে। উষ্ণতা বাড়লে অণুর তাপীয় গতি (thermal motion) বাড়ে। এর ফলে উষ্ণতা বাড়াতে একই কণার উপর ক্রিয়াশীল বলের মান বাড়ে এবং তার গতি অনেক জোরালো হয়।


নিলম্বিত কণাগুলোকে যদি পদার্থর বড়ো অণু হিসেবে কল্পনা করা যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে যে অণুর  তাপীয় গতির মতোই কণার গতি। ব্রাউনীয় কণার গতি মাইক্রোস্কোপের মধ্যমে চোখে দেখা যায়। কিন্তু অণুর গতি চোখে দেখা কঠিন। কণাগুলো অণুর মতো আচরণ করলে অণুর অন্য কোনো ধর্মও কণাগুলোতে দেখা যাবে। তাই ব্রাউনীয় গতি অণুর গতিরই চাক্ষুষ প্রতিরূপ।


সম্পাদকীয় সংযোজনঃ ধরা যাক তুমি একটা বদ্ধ ঘরে শুয়ে আছ। ঘর অন্ধকার, শীতের সকাল। ঘুম ভাঙতেই চোখে পড়ল, বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের প্রথম কিরণ একটা ছোট্ট ফুটো দিয়ে ঘরের মেঝেয় আছড়ে পড়েছে। আলোর রশ্মিটার গতিপথে দেখবে অনেক ধুলো কণা নাচানাচি করছে। এটা হল ব্রাউনীয় গতির একটা ব্যবহারিক উদাহরণ।


No comments:

Post a Comment