ছোটো গল্পঃ ভেষজ বিড়ি - জিৎ দত্ত



ভেষজ বিড়ি


জিৎ দত্ত



মাঠের উত্তরদিকটায় যেখানে ওই বুড়ো আমগাছটার ছায়া পড়েছে, সেখানে গিয়ে একটু বসল পশুপতি। অনেকটা পথ হেঁটে আসছে এই রোদে, একটু না বসলেই নয়। পশুপতির মনটা ভালো নেই। আজও ওর শিল্পকর্ম কেউ কিনল না।

আসলে পশুপতির মনখারাপ হওয়ার অনেক কারণ আছে। পশুপতি বিড়ি বাঁধে। এটাই ওর পূর্বপুরুষদের ব্যাবসা। সেই বিড়ি চালান হয় দেশে বিদেশে। এই নিয়ে মনের মধ্যে একটা চাপা গর্বও আছে পশুপতির। কিন্তু তার এই পেশার জন্য না ঘরে না বাইরে কোথাও ওর এতটুকু সম্মান নেই। লোকে তো কথায় কথায় শুনিয়েই দেয়, ‘তোর আর কী, ওই তো বিড়ি বাঁধা কাজ।’ এতে খুব কষ্ট হয় পশুপতির, কিন্তু কিছু বলতে পারে না। কারণ, কথাটা তো আর মিথ্যে হয়। আজকাল ওর বউও ওকে উঠতে বসতে খোঁটা দেয়, আর বলে এই কাজ ছেড়ে অন্য কোনও কাজকারবার করতে। আর এটাও সত্যি, এই কাজ করে এখন আর পেট চলে না। সংসারে অভাব, রোজ নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।

কিন্তু অন্য কিছু করতে মন মানে না ওর। সেই কোন ছোটবেলায় বাবার মুখে শুনেছিল যে কোন উইলস সাহেবরা নাকি প্রথম সিগারেট তৈরি শুরু করেন। সেই উইলস সাহেবরা যখন ভারতে এসেছিলেন, সেই সময়ে ওঁদের বাড়িতে ফাইফরমাশের কাজ করত পশুপতির এক পূর্বপুরুষ রঘুপতি। উইলস-বাবুরা বারান্দায় বসে ফুক ফুক করে সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতেন আর রঘুপতি ওঁদের মুখের সামনে আগুনটা, ছাইদানিটা এসব ধরত।

একদিন রঘুপতি দেখল, বাবু ছাইদানিতে সিগারেটটা ফেলার পর তখনও সেটা জ্বলছে। বাবুরা এটা টেনে কী মজা পায় সেই কৌতূহলবশত রঘুপতিও জিনিসটা তুলে নিয়ে লাগাল এক সুখটান। প্রথমে তো রঘুপতি কেশে-মেশে একশা হল। কিন্তু সেই সঙ্গে মনের মধ্যে একটা অন্যরকম পুলকও বোধ করল। কেমন যেন জড়িয়ে গেল জিনিসটার মায়ায়। এরপর থেকে বাবুদের ফেলে যাওয়া টুকরোগুলোতে সুযোগ পেলেই লুকিয়ে টান লাগাত রঘুপতি। কিন্তু এসব বেশিদিন চলল না। ক’দিন পরেই বাবুরা নিজেদের দেশে ফিরে গেলেন। ততদিনে রীতিমতন জিনিসটার নেশা হয়ে গেছে রঘুপতির, এবার তো না পেয়ে পেয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার অবস্থা। রঘুপতি শুনেছিল যে তামাক পাতা দিয়ে জিনিসটা বানানো। সেই মতন মোটা কাগজের খোলে তামাক পাতা ভরে, আগুন ধরিয়ে রঘুপতি টেনে দেখল মোটেই ভালো লাগছে না, বরং কাগজ পোড়া গন্ধ বেশি নাকে লাগছে। তবুও ওইভাবেই মোটা কাগজে চলল রঘুপতির ধূমপান।

একদিন হল কী, তামাক পাতা কুঁচিয়ে বসে আছে রঘুপতি, কিন্তু কোথাও একটুকরো কাগজ খুঁজে পাচ্ছে না। সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও একটুকরো কাগজ পেল না। এদিকে নেশার ডাক নিশির ডাকের থেকেও ভয়ংকর। কী করবে? হাতের কাছে দেখে একটা শুকনো তেন্দু পাতা পড়ে আছে। কোনোরকমে সেটাকেই মুড়ে-চুড়ে একটা খোল বানিয়ে তার মধ্যেই তামাক পাতা ভরে আগুন জ্বালিয়ে দিল সুখটান। আর টান দিতেই চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল রঘুপতির। এ কী টানছে সে! এ তো স্বর্গীয় অনুভূতি! এ যে একেবারে অন্যরকম একটা জিনিস। বাবুদের ওই সিগারেটের থেকেও এই জিনিসটা আরও বেশি ভালো মনে হল রঘুপতির।

এরপর থেকে সেই তেন্দু পাতার খোলে তামাক চূর্ণ ভরে বিড়ি বানাতে লাগল রঘুপতি। নিজের পাশাপাশি দোস্ত-বন্ধুদেরও খাওয়াতে লাগল। সবাই খুব তারিফ করল রঘুপতির এই নতুন আবিষ্কৃত জিনিসটার। ধীরে ধীরে রঘুপতির বিড়ি মাহাত্ম্য দেশে বিদেশে প্রচার পেতে লাগল। বিদেশি সিগারেটের তুলনায় এর দাম অনেক কম, তাই ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তাও বাড়তে লাগল বিড়ির। জন্ম নিল এক নতুন কুটির শিল্প। কিন্তু হারিয়ে গেল রঘুপতির নাম। ইতিহাস তাকে মনে রাখেনি।

কিন্তু ইতিহাস মনে না রাখলেও তার নিজের লোকেরা কী করে ভুলে যায় তাকে? তাই বংশপরম্পরায় আজও ওদের পরিবারে চলে আসছে বিড়ির ব্যাবসা।

সেই রঘুপতিরই বংশধর পশুপতি আজ অভাবের তাড়নায় বিড়ির ব্যাবসা বন্ধ করে দেবে, এ কি মেনে নেওয়া যায়? লোকে বলে, তামাক নাকি স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। এই ব্যাপারটা পশুপতি নিজেও জানে। তাই ও অল্প তামাকের সঙ্গে তুলসী, অশ্বগন্ধা, নিম, পিপুল, আর হরিতকী চূর্ণের মিশ্রণ করে, শুকনো বাসক পাতার খোলে মুড়ে একধরনের নতুন বিড়ি তৈরি করেছে যা শরীরের জন্য মোটেই ক্ষতিকর নয়, বরং উলটে সর্দি-কাশিসহ ফুসফুসের অনেক রোগ সারাতেও সক্ষম। এটা ও নিজের উপরেই প্রয়োগ করেছে। ক’দিন আগে যখন ওর সর্দি-কাশি সমেত মারাত্মক ইনফ্লুয়েঞ্জা হয় তখন ওই ভবানী ডাক্তার তো হাত তুলেই দিয়েছিল। তখন শুধু নিজের তৈরি ওই ভেষজ বিড়ি টেনে সুস্থ হয়েছে পশুপতি। কিন্তু যেই সেকথাটা কাউকে বলতে যায়, লোকে হেসে লুটোপুটি খায়। মজা করে বলে, ‘বিড়ি খেয়ে লোকের শতেক রোগ বালাই হতে শুনেছি। এই প্রথম শুনছি যে বিড়ি খেয়েও নাকি রোগ সারে, হেঁ হেঁ।’ আর বাইরের লোককেই বা বলবে কী, নিজের বউ অবধি তার এই কথায় বিশ্বাস করে না। তার বিশ্বাস, ভবানী ডাক্তারের ওই লাল মিক্সচার, আর মা মুণ্ডেশ্বরী কালীর আশীর্বাদেই নাকি এ-যাত্রা ও বেঁচে গেছে।

নিজের তৈরি এই ভেষজ বিড়িই আজ শহরে বিক্রি করতে নিয়ে গেছিল পশুপতি। কিন্তু এক প্যাকেটও বিক্রি হয়নি। একটা লোক অবশ্য এক পিস পরখ করতে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু একটা টান দেওয়ার পরই থু থু করে নাক মুখ সিটকে বলে, “এটা কী মশাই? ইশ, কী বিচ্ছিরি স্বাদ আর গন্ধ!”

তাকে পশুপতি বোঝাতে আর পারে না যে ভালো জিনিস কক্ষনই খেতে ভালো হয় না। এটা তো শুধু বিড়ি নয়, একধরনের ভেষজ ওষুধ। কিন্তু ভদ্রলোক পালটা বলেন, “আরে বিড়ি যদি বিড়ির মতনই না খেতে হবে তাহলে আর সে বিড়ি টেনে লাভ কী? না মশাই, এ আমার চাই না। ধুর ধুর, পুরো মুখটাই খারাপ করে দিলেন।”

আমগাছের শীতল ছায়ায় বসে এসবই সাতপাঁচ ভাবছিল পশুপতি। আজ বাড়ি গেলে আর রক্ষে নেই। বউ যদি জানতে পারে একটা টাকাও আমদানি হয়নি, তাহলে কাল থেকে এসব ছেড়ে অন্য কাজ দেখতে হবে। শুনেছে চটকলে নাকি লোক নিচ্ছে, ওখানেই না হয় যাবে একবার।

সবে পকেট থেকে নিজের তৈরি একটা বিড়ি ধরিয়ে একটা টান দিয়েছে, এমন সময় লোকটাকে পাশের ভাঁট ফুলের ঝোপের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখল। কালো কুচকুচে শুঁটকি মাছের মতন চেহারা, পরনে যেটা সেটা লুঙ্গি না হাফ প্যান্ট সেটা বলা মুশকিল। মাথাটা দেহের তুলনায় বড়ো। কানদুটো তদাপেক্ষাও বড়ো, আর তার ডগার দিকগুলো ছুঁচলো মতন। চোখগুলো খুদে খুদে। লোকটা সোজা পশুপতির দিকেই এগিয়ে এসে ওর পাশে বসে পড়ল। পশুপতির মনে হল, এই লোকটাকে তো সে আগে কখনও দেখেনি। নিতান্ত আলাপের জন্যই জিজ্ঞেস করল, “আপনার নাম কী মশাই?”

উত্তরে লোকটা বলল, “কচ কচ কিচ ক্ষ ক্ষ হাং চিং পু পু।”

পশুপতি ছিটকে একটু পিছনে সরে এসে অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, ‘পাগল নাকি রে বাবা! কামড়ে দেবে না তো আবার?’ পশুপতিকে ওইভাবে অবাক হয়ে ছিটকে যেতে দেখেই বোধ হয় লোকটা নিজের সেই প্যাঁকাটির মতন গলার নলিটায় হাত দিয়ে গার্গল করার মতন একটু শব্দ করল, তারপর পশুপতির দিকে ফিরে বলল, “আমায় কিছু বললেন মশাই?”

পশুপতি এবার স্বাভাবিক হয়ে বলল, “বলছি, আপনার নাম কী?”

“আমি মেসো।”

“মেসো? কার মেসো?”

“না না, কারও মেসো নই। আমার নাম মেসো। তা আপনার নাম?”

“আমার নাম পশুপতি। তা মশাই কি এখানে নতুন নাকি? আগে তো কোনোদিন দেখিনি।”

“হ্যাঁ, এইমাত্র এলাম।”

“তা মশাইয়ের বাড়ি কোথায়?”

“আমার বাড়ি ভারানুস্কি।”

“ও বারানসী? বাবা বিশ্বনাথের ধাম? (দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে) জয় বাবা বিশ্বনাথ।”

“না না, বারানসী নয়, ভারানুস্কি।”

“ও বাবা। তা সে কোন গাঁ? অনেকদূর বুঝি? নাম শুনিনি তো কখনও!”

“ভারানুস্কি এখান থেকে খুব বেশি দূর নয়। মাত্র সাড়ে তেইশ হাজার আলোকবর্ষ।”

পশুপতি মাথা চুলকে বলল, “ও, তাহলে তো খুব বেশি দূর নয় মনে হচ্ছে। তা মশাইয়ের এখানে আসার কারণ?” কোনও কুটুমবাড়ি এসেছেন বুঝি?”

“না না, আসলে আমি আর আমার ভাই যাচ্ছিলাম ‘অ্যামান্যাট’ নামের একটা জায়গায়। সেটা আপনাদের এখান থেকে মাত্র পৌনে সাত হাজার আলোকবর্ষ দূরে।”

“ও, অমরনাথ? জয় বাবা…”

“না না, কী মুশকিল! ওটা অ্যামান্যাট। খামোখা অমরনাথ হতে যাবে কেন?”

“কীসব নাম রে বাবা, জম্মে শুনিনি। তা সেখানে গেলেন না কেন?”

“আরে দেখুন না। মাঝ রাস্তাতেই পিসের শরীরটা এমন খারাপ হয়ে গেল যে এখানেই আটকে যেতে হল।”

“ও, আপনাদের পিসেও আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছিলেন বুঝি?”

“আরে, পিসে আমার ভাই।”

“ও, আচ্ছা আচ্ছা। তা ভালো, মেসোর ভাই পিসে। তা ওঁর কী হয়েছে?”

“সেটাই তো বুঝতে পারছি না। আমাদের ‘ম্যাগারি’টা আপনাদের এখান দিয়ে যাওয়ার সময়েই দেখলাম ও হঠাৎ কেমন ছটফট করছে। কী হয়েছে বুঝতে পারছি না। তাই তো ওকে ম্যাগারিতে রেখে আমি এসেছি কিছু ওষুধ পাওয়া যায় কি না খুঁজতে। আপনাদের এই জায়গাটাও অনেকটা আমাদের ভারানুস্কির মতন। তাই ভাবলাম, দেখি কোনও ভেষজ ওষুধ পাই কি না।”

ভেষজ ওষুধ নামটা শুনে পশুপতি নড়েচড়ে বসল। একবার দেখাই যাক না চেষ্টা করে, যদি এই লোকটাকে কিছু বিড়ি গছানো যায়। নিজের হাতের বিড়িটায় একটা শেষ টান দিয়ে, শেষ টুকরোটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে পশুপতি বলল, “বলছি মেসোমশাই, আপনি কি আমাকে একবার আপনাদের ওই মালগাড়িতে নিয়ে যাবেন? একবার চেষ্টা করে দেখতুম যদি আপনার ভাইকে সারাতে পারি।”

পশুপতির কথা শুনে লোকটা তিড়িং করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, “আপনি পারবেন আমার ভাইকে সারাতে? তাহলে তো খুব উপকার হয়। আমাদের হাতে বেশি সময়ও নেই। তবে আমাদের ওটা না মালগাড়ি নয়, ম্যাগা... যাক গে বাদ দিন। তাড়াতাড়ি চলুন।”

লোকটা পশুপতির হাত ধরে সেই ভাঁট ফুলের ঝোপের মধ্যে দিয়ে টানতে টানতে মাঠের পিছনেই ঘোষালদের লিচু বাগানের মধ্যে এনে দাঁড় করাল। পশুপতি দেখল একটা উলটো করা হাঁড়ির আকারের প্রকাণ্ড একখানা বস্তু বাগানের মধ্যে দাঁড় করানো।

“এটাই বুঝি আপনাদের মালগাড়ি?” প্রশ্ন করল পশুপতি।

লোকটা কী একটা বলতে গিয়ে তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘাড় নেড়ে নিজের সেই অদ্ভুত দর্শন লুঙ্গির ট্যাঁকে হাত ঢুকিয়ে কী একটা লম্বা হাতল মতন বের করে আনল। তারপর তাতে চাপ দিতেই হাঁড়িটার একটা দিক ফট করে ফেটে গিয়ে একটা দরজা মতন খুলে গেল। দু’জনে সেই দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকল। পশুপতি দেখল ঘরের মধ্যে মেসোর মতনই দেখতে আরেকটা লোক শুয়ে আছে আর ভয়ংকর রকমের কাশছে। পশুপতি বুঝল, লোকটার বুকে মারাত্মক সর্দি বসেছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখল গা বেশ গরম। বুঝতে পারল, এটা ইনফ্লুয়েঞ্জা না হয়ে যায় না। সে নিজেও ক’দিন আগে এই রোগ থেকেই উঠেছে, তাই সে এর সবরকম উপসর্গই জানে।

বেশি কথা না বাড়িয়ে পশুপতি নিজের ব্যাগ থেকে একটা ভেষজ বিড়ি বার করে ধরিয়ে লোকটার হাতে দিয়ে বলল, “এটা মুখে দিয়ে খুব করে টানুন দেখি।”

লোকটা অবাক হয়ে পশুপতির দিকে তাকিয়ে আছে দেখে ওই মেসো ভদ্রলোক নিজের গলায় আবার হাত দিয়ে ঘড় ঘড় করে নিয়ে ভাইকে বলল, “তু ক্ষ চিং চিং পুং ফুক ফুক।”

এবার লোকটা পশুপতির হাত থেকে বিড়িটা নিয়ে বেশ গোটাকতক টান লাগিয়ে বিড়িটা শেষ করে ফেলল। পুরোটাই খেয়ে ফেলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সুতোর কাছাকাছি আগুন যেতেই পশুপতি বিড়িটা কেড়ে নিয়ে বাইরে ফেলে দিল। আর হাত নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিল বিড়ির বেশি আর খেতে নেই।

বিড়িটা খেয়ে লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে চোখ বন্ধ করে বসে রইল। তারপর হঠাৎ খামচি মেরে পশুপতির চুলের মুঠি ধরে বেশ কয়েকবার ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, “খঞ খঞ পুং পাং ক্ষঞ্চ তূং ঞ্ছ।”

পশুপতি কাঁদো কাঁদো মুখ করে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “এ কী, এ কী, চুলের মুঠি ধরে মারছেন কেন? বিড়ি ভালো নাই লাগতে পারে, তা বলে নিজেদের মালগাড়িতে ডেকে নিয়ে এসে মারধর করবেন? ও মেসোমশাই, আপনি একটু পিসেমশাইকে পিং পাং করে বোঝান না।”

মেসো আবার গলায় ঘড়াং ঘড়াং করে নিয়ে পশুপতিকে বলল, “না না, ও আপনাকে মারছে না, ধন্যবাদ জানাচ্ছে। আমাদের ওখানে এভাবেই কাউকে ধন্যবাদ জানায়। পিসে বলছে, ও এখন অনেকটা সুস্থ বোধ করছে।”

পশুপতি একটু রাগ করে বলল, “ধন্যবাদ জানানোর কী ছিরি! আর একটু হলে ব্রহ্মতালুটাই খুলে যেত। যাই হোক, উনি এখন সুস্থ আছেন এটাই অনেক। তা কিনবেন নাকি এক প্যাকেট বিড়ি? না মানে, রাস্তায় যদি আবার দরকার লাগে।”

মেসো বলল, “আচ্ছা, দিন তবে। রাখি এক প্যাকেট সঙ্গে, বলা তো যায় না। যদি আবার আমাদের কারও শরীর খারাপ হয়!”

পশুপতি লোকটার হাতে একটা ভেষজ বিড়ির প্যাকেট দেয়। লোকটা ভিতর থেকে একটা মুখবন্ধ থলিতে কিছু জিনিস এনে পশুপতিকে দিয়ে বলল, “বেশি কিছু আমাদের নেই। এই ছোট্ট উপহারটাই রাখুন। আমরা গরিব ভারানুস্কিয়ান, এর বেশি আমাদের সামর্থ্য নেই। আপনি আমাদের যে উপকার করলেন তার সাপেক্ষে এটা নিতান্তই ক্ষুদ্র উপহার। দয়া করে এইটুকু গ্রহণ করুন।”

পশুপতির মনটা দমে গেল। ভেবেছিল বিড়ি বেচে কিছু টাকা পাবে। কিন্তু এরা তো নিজেদের দারিদ্রের দোহাই দিয়ে কী একটা ধরিয়ে দিল। তবুও একটাই সান্ত্বনা, ওর বিড়ির জন্য কারও জীবন তো বেঁচেছে। লোকটার হাত থেকে ব্যাজার মুখেই থলিটা নিল পশুপতি।

মেসো লোকটা আরেকবার পশুপতির চুলের মুঠিটা ধরে ভালো করে নেড়ে দিয়ে বলল, “অশেষ ধন্যবাদ আপনাকে। আচ্ছা, আপনি তবে আসুন। আমাদেরও এবার বেরোতে হবে। অনেকটা দেরি হয়ে গেল। এতক্ষণে অ্যামান্যাট-এ না জানি কত বছর পার হয়ে গেছে। ম্যাগারিটাকে এবার আলোর থেকে হাজার গুণ জোরে চালাতে হবে দেখছি।”

হাঁড়ির মতন মালগাড়িটা থেকে গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে এল পশুপতি। টাকাপয়সা তো পেলই না, উলটে দু-দু’বার ধন্যবাদ জানানোর নাম করে চুলের মুঠি ধরে নেড়ে দিল। কী যা তা লোক এই মেসোমশাই আর পিসেমশাই। পিছন ফিরে দেখল, হাঁড়ির মতন মালগাড়িটা ধীরে ধীরে প্রায় নিঃশব্দে উপরে উঠে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। যাক, জাহান্নামে যাক, ওর কী।

নিতান্ত অভক্তিভরেই এবার লোকটার দেওয়া থলিটা খুলল পশুপতি। আর খোলার সঙ্গে-সঙ্গেই বিস্ময়ে দু’চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ওর। থলির ভিতরে ঝলমল করছে গরিব বারানসীয়ান না কী যেন, তার দেওয়া ক্ষুদ্র উপহার, এক মুঠো উজ্জ্বল হীরে!


___


অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল


No comments:

Post a Comment