ছোটো গল্পঃ ম্যামথ শিকারি - গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়



ম্যামথ শিকারি


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়



এসেছিলাম ভূপালে একটা রিসার্চ স্কুলে কয়েকটা বক্তৃতা দিতে। সারাদিন ইউনিভার্সিটিতেই কেটে যায়, সন্ধেবেলা গেস্ট হাউসে ফিরে ভূপালের খবরের কাগজে চোখ বোলাই। একদিন চোখে পড়ল যে গিরাটগঞ্জ বলে একটা জায়গায় বেশ কয়েকটা নতুন গুহাচিত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা এসে দেখে গেছেন, এখনও সাধারণ মানুষের জন্য জায়গাটা খুলে দেওয়া হয়নি। জায়গাটা রায়সেন জেলার মধ্যে। ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত গুহাচিত্র যেখানে পাওয়া গেছে সেই ভিমবেটকা থেকে বেশি দূরে নয়।

রায়সেন, রায়সেন... নামটা চেনা চেনা লাগছে। ওহ্‌, রায়সেনের এখনকার পুলিশ সুপার তো আমার পুরনো বন্ধু শামস, মানে শামসুদ্দিন। এতবার মধ্যপ্রদেশে এসেছি, ওর সঙ্গে কখনও দেখা করিনি বলে ও বহুবার অনুযোগ করেছে। গুগলে খুঁজে দেখলাম, রায়সেন শহরটা ভূপাল থেকে গাড়িতে একঘণ্টা দূরে। হাতে ক’টা দিন ফাঁকা আছে, কারণ আজ শুক্রবার। সোমবারের আগে কোনও ক্লাস নেই। লাগালাম শামসুদ্দিনকে একটা ফোন।

“কোথা থেকে বলছিস?” শামস ফোন তুলেই জিজ্ঞাসা করল।

“ভূপাল। একটা জায়গার…”

কথা শেষ করতে দিল না শামস, “হোটেলের নাম বল।”

“হোটেল নয়, ইউনিভার্সিটির গেস্ট হাউস। কিন্তু…”

“এক্ষুনি যাচ্ছি। ব্যাগ গুছিয়ে রাখ।”

আধঘণ্টার মধ্যে শামসুদ্দিন চলে এল। “চল।”

“আরে, আমার কথাটা শোন।”

অনেক কষ্টে ওকে বোঝালাম যে সোমবার আমার ক্লাস আছে।

“ঠিক আছে, তুই ঘরটা ছেড়ে দে। দু’দিনের মতো জামাকাপড় নিয়ে নে, বাকি ব্যাগ এখানেই রেখে দে। আমি গেস্ট হাউসে বলে দিচ্ছি। সোমবার আবার পৌঁছে দেব।”

গাড়িতে উঠে পড়লাম। শামস ভূপালে এসেছিল সরকারি কাজে। কাজ শেষে ফিরত যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে আমার ফোন। ও এখন বাড়িতে একাই। ওর স্ত্রী ইন্দোরে কলেজে পড়ায়। শামসের বদলির চাকরি, কোনও কোনও উইক-এন্ড দু’জনে একসঙ্গে কাটায়।

“তুই নিশ্চয়ই আজ পুষ্পার সঙ্গে দেখা করতে যেতিস, আমি আটকে দিলাম।”

“প্রতি সপ্তাহে থোড়াই দেখা হয়। দু’জনে এক স্টেটে আছি, এই অনেক।”

শামসুদ্দিন আর পুষ্পার আলাপ হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে, আমরা তিনজন এক ক্লাসেই ছিলাম। পুষ্পা পি.এইচ.ডি করে কলেজে চাকরি নিয়েছে, শামস পরীক্ষা দিয়ে আই.পি.এস হয়েছে।

ইউনিভার্সিটির পুরনো গল্প করতে করতে অনেকটা রাস্তা গেল।

“আমাকে একটা জায়গা দেখাতে হবে।” আমি এক ফাঁকে বললাম।

“রায়সেনে অনেক কিছু দেখার আছে। শহরটা তো একটা পাহাড়ের নিচে, তার উপরে আছে একটা বহু পুরনো দুর্গ। তাছাড়া জেলার মধ্যে সাঁচি আছে, ভিমবেটকা আছে। কোথায় যাবি বল।”

“একজায়গায় গুহাচিত্র পাওয়া গেছে।”

“গুহাচিত্র? ভিমবেটকা তুই আগে যাসনি?”

“ভিমবেটকা নয়, জায়গাটার নাম হল গিরাটগঞ্জ।”

“গিরাটগঞ্জ? ও হ্যাঁ, লোকাল থানা একটা রিপোর্ট পাঠিয়েছিল, একবার চোখ বুলিয়েছিলাম। গত সপ্তাহে ভূপাল থেকে কয়েকজন এক্সপার্ট গিয়েছিল। কিন্তু সেটা গিরাটগঞ্জে নয়, ও তো শহর। তার থেকে কিছুটা দূরে একটা গ্রামের কাছে, নাম খেয়াল নেই। নো প্রবলেম, রবিবার সকালে বেরিয়ে যাব। গাড়িতে দেড় ঘণ্টা। এসবে তোর মতো সাহিত্যের লোকের ইন্টারেস্ট আছে জানতাম না।”

“সেরকম কিছু না। ইংরাজির সেরা ছাত্র যদি পুলিশ হয়, তাহলে আমারও কেভ পেন্টিং দেখতে ইন্টারেস্ট হতে পারে। বসেই আছি, এখনও জায়গাটার কথা বিশেষ কেউ জানে না, ভাবলাম তোর হেল্প নিয়ে ফাঁকায় ফাঁকায় ঘুরে আসি। তোর সঙ্গে দেখাও হয়ে গেল এই সুযোগে।”

আমাকে কিছুই করতে হল না, শামসই সব বন্দোবস্ত করল। তবে ও বলল যে আমার সঙ্গে গুহায় ঘুরতে যাওয়ার সময় ওর হবে না, ও গিরাটগঞ্জে অফিসিয়াল কাজ সারবে, আমি সেই সময় গুহাটা দেখে আসতে পারব। আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অজিত আনন্দ বলে গিরাটগঞ্জের এক কলেজের অধ্যাপককে গাইড ঠিক করল। তাঁর এ সমস্ত ব্যাপারে ইন্টারেস্ট আছে, ভূপাল থেকে আসা লোকজনকে সঙ্গে করে তিনিই নিয়ে গিয়েছিলেন।


রবিবার খুব সকালে দু’জনে রওনা হলাম। গিরাটগঞ্জে পৌঁছে ব্রেকফাস্ট সেরে আমি বেরিয়ে পড়লাম। সন্দুক বলে একটা জায়গার কাছে যেতে হবে। অজিতবাবুকে খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না, অপেক্ষা করছিলেন নিজের বাড়ির সামনে আমার জন্য। গাড়িতে উঠে পড়ে ড্রাইভারকে রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে চললেন।

অজিতবাবুর কাছে শুনলাম গুহাটা ওখানে ছিল আগে কেউ জানত না, মুখটা একটা পাথর পড়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গত বর্ষার সময় ধ্বস নেমে সেই পাথরটা সরে গিয়েছিল। তার কিছুদিন পরে স্থানীয় একটি ছেলে গুহাটাতে ঢুকে ছবিগুলো দেখতে পায়। গুহার মুখটা এতদিন বন্ধ ছিল বলেই বোধ হয় ছবিগুলো এখনো বেশ ভালো আছে। গিরাটগঞ্জের একটা লোকাল কাগজে খবরটা বেরিয়েছিল। ওঁর কলেজের এক ছাত্র এখন ভূপালের বরকতুল্লা ইউনিভার্সিটির আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টে রিসার্চ করেন; খবরটা পড়ে উনি তাঁকে ফোন করেন। ইউনিভার্সিটি থেকে লোকজন এসেছিলেন, ছবি তুলেছেন। কালো রঙের জন্য চারকোল ব্যবহার করা হয়েছিল, তার সামান্য কিছু নমুনা চেঁছে নিয়ে গেছেন। কার্বন ডেটিং করে সেটা কত পুরনো দেখবেন।

ইংরাজি হিন্দি মিশিয়ে কথা হচ্ছিল। অজিতবাবুও শামসের মতো জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার কেভ পেন্টিংয়ের ব্যাপারে ইন্টারেস্টের কারণ কী?”

“সত্যিই আলাদা কোনও কারণ নেই। হঠাৎ খবরটা কাগজে পড়লাম। দু’দিন সময় ছিল, আপনাদের এস.পি আমার কলেজের বন্ধু, তার সঙ্গে দেখাও হল, সব মিলিয়ে উইক-এন্ডটা ভালো কেটে যাচ্ছে। আমি ভিমবেটকার হাতি দেখেছি, স্পেনের বিখ্যাত আলতামিরার বাইসন দেখেছি, ফ্রান্সের লাসকুর ঘোড়া দেখেছি। সেগুলো দারুণ লেগেছিল।”

“এখানে হাতি পাবেন, হরিণ, বুনো শুয়োর আর মোষের ছবিও আছে। বিদেশের গুহাচিত্র দেখার সুযোগ আমার হয়নি, ফটো দেখেছি। ভিমবেটকা তো আমাদের কাছেই। তবে এই গুহার ছবি ভিমবেটকার থেকে ভালো অবস্থায় আছে।”

অজিতবাবু দেখলাম গুহাচিত্র নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। আমার ভাগ্য ভালো, এরকম একজনকে সঙ্গে পেয়ে গেছি। উনিই খবরটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন, তা না হলে লোকাল কাগজ আর ক’জন দেখে! আমি নানা জায়গায় কেভ পেন্টিং দেখার সুযোগ পেয়েছি বটে, কিন্তু আমার জ্ঞান ওঁর তুলনায় কিছুই নয়। দু’জনে এই নিয়ে অনেকক্ষণ কথা হল।

প্রস্তর যুগের মানুষ গুহাচিত্র কেন আঁকত? এক্সপার্টরা এই প্রশ্নের অনেক উত্তর দিয়েছেন, কিন্তু কোনোটাই আমার পছন্দ হয় না। কেউ বলেন জঙ্গল পাহাড়ের দেবতাদের খুশি করার জন্য কিংবা পূর্বপুরুষদের ভূতদের সন্তুষ্ট করার জন্য মানুষ দেওয়ালে ছবি আঁকত। আবার কোথাও পড়েছি, ওঝারা হয়তো বলত যে জাদুর সাহায্যে তারা শিকার যোগাড় করে দেয় কিংবা শিকারিদের রক্ষা করে। অজিতবাবুকে সেই কথা বললাম। উনিও বললেন, যে যুগে মানুষকে সারাদিনই খাবারের খোঁজে বেরোতে হত, সে সময় অন্ধকারের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দেয়ালে ছবি আঁকার কথা মাথায় কেন আসত কে জানে।

কথায় কথায় পৌঁছে গেছি।

“হ্যাঁ, এইখানে।” অজিতবাবু ড্রাইভারকে বললেন। তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন, “গাড়ি আর যাবে না। কিছুটা হাঁটতে হবে, তারপর পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে হবে। চড়াইয়ের পথটা কিন্তু খুব খারাপ, সাবধানে যেতে হবে। রাস্তা যা ছিল, ধ্বসে গেছে।”

গুহাটা যে খুব উঁচুতে তা নয়, কিন্তু রাস্তা বলে সত্যিই কিছু নেই। অজিতবাবু্ আমারই বয়সী, কিন্তু অনেক বেশি ফিট। একটু উঠে আবার ফিরে এলেন; হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আমার হাতটা ধরুন।”

অনেক কষ্ট করে উপরে উঠলাম। গুহার পাশে কিছুটা সমতল জায়গা, কিন্তু গুহার মুখের থেকে পাহাড় সোজা খাড়াই নেমে গেছ। বোঝা যাচ্ছে একটা ধ্বস নেমেছিল, গাছপালা কিছু নেই।

“যাব কেমন করে?” আমি নিচের দিকে তাকিয়ে বলি। গা শিউরে উঠছিল। “আমার একটু ভার্টিগো প্রবলেম আছে।”

সমতল জায়গা থেকে গুহার মুখটা দশ ফুটের মতো দূরে।

“চিন্তা করবেন না। আগের বারে যখন এসেছিলাম, দড়ি লাগানো হয়েছিল।”

নিচের দিকেই চোখ ছিল, এখন গুহার মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি কয়েকটা মোটা কাছি লাগানো আছে। পা রাখার জন্য দুটো দড়ি দিয়ে তিনটে কাঠ বাঁধা আছে। উপরের কাছিটা হাত দিয়ে ধরে কাঠগুলোতে পা রেখে যেতে হবে।

আগে ভালো করে খবর নেওয়া উচিত ছিল। এত দূরে এসে পিছিয়ে যাওয়া যায় না। অজিতবাবু কাঠে কাঠে পা দিয়ে উপরের দড়িটা ধরে চট করে চলে গেলেন। আমিও ধারে গিয়ে পা বাড়ালাম।

“নিচের দিকে তাকাবেন না।” অজিতবাবু মনে করিয়ে দিলেন।

বেকার ভয় পাচ্ছিলাম, সহজেই টপকে গেলাম। অজিতবাবু পিঠের ব্যাগ থেকে একটা টর্চ বার করলেন। সূর্যের আলো কিছুটা ঢুকেছে, কিন্তু গুহাটা একটা বাঁক খেয়ে ডানদিকে ঢুকে গেছে, ভিতরটা অন্ধকার। একটা সুবিধা, শীতকাল, সাপখোপ বেরোবে না।

মোড় ফিরতেই অন্ধকার। অজিতবাবু সামনে আলোটা ফেললেন।

“দেখবেন, এখানে ছাদটা একটু নেমে এসেছে।”

মাথাটা নামিয়ে নিলাম। একটু পরেই গুহাটা হঠাৎ চওড়া হয়ে গেছে। অজিতবাবু দাঁড়িয়ে গেলেন। উপরদিকে আলো ফেললেন। ছাদে কালো-কালোমতো কী ঝুলছে।

“বাদুড়েরা ভালো বাসা পেয়েছে। এই যে এদিকে দেখুন।”

গুহার মেঝেটা সমতল নয়, একটা দেয়ালের দিকে উঠে একটু ঢিপি মতো হয়েছে। তার সামনের দেয়ালের উপর আলো পড়েছে। টর্চ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অজিতবাবু দেখালেন, “ওই দেখুন কতকগুলো লোক গোল হয়ে নাচছে। তার পাশে দেখুন হরিণ শিকার করছে। পাশে আবার হাতি শিকারের দৃশ্য, কতকগুলো লোক বর্শা ছুড়ে মেরেছে, আবার দেখুন একটা শিকারি হাতির একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে বর্শাটা কেমন ঠিক জায়গায় বিঁধিয়ে দিয়েছে।”

ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তোলা একেবারেই উচিত নয়, ফ্ল্যাশের আলোতে রঙ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সত্যিই, এত পুরনো ছবি, কিন্তু রঙ এখনও উজ্জ্বল। অজিতবাবুর টর্চটাও স্পেশাল, আলট্রা-ভায়োলেট রে খুব কম বেরোয়। ইউনিভার্সিটির লোকজন নিয়ে এসেছিলেন, ওঁর ছাত্র একটা রেখে গেছেন। ওঁর কাছে তাঁদের তোলা ফটোও আছে, বললেন আমায় পাঠিয়ে দেবেন।

সত্যিই দারুণ ছবিগুলো।

“কত পুরনো বলে আপনার মনে হয়?”

“তির-ধনুকের ছবি নেই, তার মানে হয়তো সেটা আবিষ্কারের আগে। তাহলে ভিমবেটকার অনেক ছবির থেকে পুরনো হবেই। আধুনিক মানুষ ভারতে এসেছিল মনে হয় পঁচাত্তর হাজার বছর আগে। তার মানে ছবিগুলোর বয়স পঁচাত্তর হাজার থেকে দশ-বারো হাজার বছরের মধ্যে। পৃথিবীতে সবচেয়ে পুরনো কেভ পেন্টিং শুনেছি ষাট কি পঁয়ষট্টি হাজার বছরে পুরনো। কার্বন ডেটিংয়ের রিপোর্ট এলে আমার ছাত্র জানিয়ে দেবে বলেছে। তবে সেটা থেকে ছবির বয়স নয়, চারকোলটা যে-গাছের ডাল পুড়িয়ে বানানো, সেটা কত পুরনো জানা যাবে।”

ছবিগুলোর বর্ণনা দেয়া শক্ত। আলোটা খুব বেশি নয়, তাই খুব ভালো দেখা যাচ্ছে না। অজিতবাবু বললেন ফটোগুলো কম আলোতেই লং এক্সপোজার দিয়ে তোলা হয়েছে, সেগুলো অনেক স্পষ্ট এসেছে।

হাতি শিকারের ছবিটা সত্যিই অপূর্ব। প্রাচীনকালের ছবি যেমন হয়, কাঠির মতো মানুষ, হাতিটার প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কিন্তু খুব যত্ন করে আঁকা হয়েছে। তবে দাঁতগুলো ভীষণ বড়ো, এখনকার হাতির দাঁত অত বড়ো হয় না। কিন্তু সব মিলিয়ে যেন একটা গতির আভাস ফুটে উঠেছে। হরিণগুলো কিন্তু অত যত্ন নিয়ে আঁকা নয়।

উলটোদিকের দেয়ালটাতে দেখলাম আরেকটা শিকারের ছবি, শিং দেখে বুঝলাম বুনো মোষ। কয়েকটা মানুষ মিলে ঘিরে ধরেছে, কিন্তু শিংয়ের নাগালে কেউ নেই। আরেকটা ছবি দেখিয়ে অজিতবাবু বললেন সেটা বুনো শুয়োর। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। এই দেয়ালের ছবিগুলো অত ভালো নয়, দাগগুলো একটু ঝাপসা হয়ে গেছে।

এবার ফেরার পালা।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এখানে আর কোনও গুহা নেই?”

“গুহা কয়েকটা আছে বলেই জানি, কিন্তু তাতে ছবির কথা শুনিনি। ভালো করে খুঁজে দেখতে হবে। এটার মুখ বন্ধ হয়েছিল বলে ছবিগুলো ভালো আছে, না হলে আমাদের মতো আবহাওয়ায় এসব ছবি বেশি দিন টেকা শক্ত। সাবধানে পা দেবেন।”

একেবারেই অসুবিধা হল না ওই সেতু পেরিয়ে আসতে। সাহস বেড়ে গেল। একা-একাই পাহাড় বেয়ে নামতে শুরু করলাম।

অজিতবাবু পিছন থেকে বললেন, “দাঁড়ান, আমি যাচ্ছি।”

আমি বলতে গেলাম, ‘চিন্তা করবেন না।’ কিন্তু মাথা ঘোরে যেতেই সর্বনাশ হল। পা পিছলে গেল। কানে এল অজিতবাবুর চিৎকার, তারপরেই গড়িয়ে পড়ে গেলাম। কিছু একটা ধরার চেষ্টা করলাম, কিন্তু মাথার ডানদিকটা শক্ত কোনও জায়গায় জোরে লাগল। তারপর আর কিছু মনে নেই।


***


আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরে এল।

মাথার ডানদিকটা খুব ব্যথা করছে। হাত দিলাম, জায়গাটা ফুলে গেছে। হাতটা চোখের সামনে আনলাম, রক্তে ভরে গেছে।

“যাক, তোর জ্ঞান ফিরেছে তাহলে।” কে যেন বলল। মাথা ঘোরাতে গেলাম, যন্ত্রণা করে উঠল। শুধু মাথা নয়, অনেক জায়গায় লেগেছে।

“বেশি ছটফট করিস না। এই পাহাড়ের দেও তোকে রেখেছিল, না হলে ওইরকম উঁচু থেকে পড়ে বেশি লোক বাঁচে না।”

উঁচু থেকে পড়ে গিয়েছিলাম? হ্যাঁ, তাই তো। নিচে নামছিলাম, এমন সময় কুম পিছন থেকে ডাকল, আর আমি সামলাতে না পেরে পা পিছলে পড়ে গেলাম। তারপরে আর কিছু মনে নেই।

“হাত-পা ঠিক আছে, না ভেঙেছে?”

এবার চিনতে পারলাম, এটা বড়ো গুনিনের গলা।

“না, মনে হচ্ছে ভাঙেনি।”

আমি আস্তে আস্তে বসলাম। তারপর উঠে দাঁড়ালাম। সারা গায়ে ব্যথা ঠিকই, কিন্তু সেইরকম কিছু নয়।

বিকেল হয়ে গেছে। পড়ে গিয়েছিলাম যখন, সূর্য ছিল মাথার উপর। তার মানে অনেকটা সময় হারিয়ে ফেলেছি।

“নিশ, কাল দাঁতাল শিকারে যেতে পারবি তো?” বড়ো গুনিন আমার চিন্তায় বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল।

আমাদের দলের খাবার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। শিকারে বেরোতেই হবে। কিন্তু হরিণ কি মোষের দল কাছাকাছি নেই, আছে শুধু ক’টা দাঁতাল। তাদের একটাকে মারতে পারলে অনেক দিন খাবারের চিন্তা নেই। লোমভর্তি চামড়াটাও গায়ে জড়াতে কাজে আসবে। তাই কাল আমরা দাঁতাল শিকারে যাব। আমি কখনও বড়ো জন্তু মারার দলের সঙ্গে বেরোইনি, কালই প্রথম যাওয়ার কথা। না গেলে ছোটোই থেকে যাব, বড়ো হব না।

“পারব।”

বড়ো গুনিন আমার হাতে কয়েকটা লতাপাতা তুলে দিয়ে বলল, “মাথাটা জল দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নে, তারপরে এই লতাপাতা থেঁতো করে কাটা জায়গাটায় লাগা। না হলে ওখান দিয়ে পিশাচ তোর রক্তে ঢুকে পড়বে।”

জল! চারদিকে সাদা বরফের চাদর, সেই চাদরের উপর থেকে খাওয়ার জল যোগাড় করতে হয়। তার থেকে বেশি লাগলে বরফ গলাতে হবে। নিচু হয়ে পায়ের তলা থেকে কিছুটা সাদা বরফ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুললাম। সেটা হাতে করে নিয়ে গিয়ে বড়ো আগুনটার পাশে আঁজলা করে ধরলাম। বরফটা গলে যেতেই মাথায় দিলাম, জ্বালা করে উঠল। তাড়াতাড়ি করে হাতের লতাপাতাগুলো পিষে কাটা জায়গাটায় লাগালাম।

আগুনের তাতটা বেশ ভালোই লাগছে। গায়ের হরিণের চামড়াটা একটু আলগা করে নিলাম। দলের অনেকেই আগুনের চারপাশে এসে জুটেছে। কিন্তু গায়ের ব্যথা বাড়তে শুরু করল।

“বড়ো গুনিন, ব্যথা লাগে যে!” আমি চেঁচিয়ে বললাম।

“এদিকে আয়।”

বড়ো গুনিন ওর গুহাটার সামনে বসে আছে। পাশে একটা ছোটো আগুন জ্বলছে। ওই গুহায় কি আছে আমি জানি না, বড়ো গুনিন নিজে না নিয়ে গেলে ওখানে ঢোকা নিষেধ। বাইরে থেকে কিছু দেখা যায় না। ঝোলা থেকে একটা ফলের বীজ বার করে দিল। “চিবিয়ে খা। তোকে আজ রাত্তিরে দিতামই। না হয় এখনই দিলাম। বস আমার পাশে।”

ও, এটা সেই জাদু বীজ। জুরা বলেছিল, এর তিনটে খেলে নাকি প্রাণটা দেহ থেকে বেরিয়ে আকাশে মেঘের উপরে ঘুরতে যায়। কিন্তু তার বেশি খেলে বিপদ, প্রাণটা নাকি আর ফিরে আসার রাস্তা খুঁজে পায় না। শিকারি ছাড়া এটা কেউ পায় না। জীবনে প্রথম বড়ো শিকারে বেরোনোর আগে সবাইকে এই বীজ খেতে হয়। তারপরে বড়ো গুনিন তাদের নিজের গুহায় নিয়ে যায়। সেখানে কী হয় বাইরে বলা বারণ।

বীজটা চিবিয়ে খেলাম। একটু পরেই সত্যিই ব্যথাটা কমে গেল। কেমন যেন নিজেকে হালকা হালকা লাগছে।

“বড়ো গুনিন, আমার প্রাণটা বোধ হয় দেহ থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে। ধরে রাখব কেমন করে?”

বড়ো গুনিন নিঃশ্বাস ফেলে আগুন থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠ তুলে নিল। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “চোখ বোজ, আমার হাত ধর।”

আমায় দাঁড় করাল। তারপরে হাত ধরে টানতে লাগল। মনে হল গুহার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। দু’বার দেওয়ালের সঙ্গে ধাক্কা লাগল। বড়ো গুনিন সাবধান করে দিল, “চোখ খুলিস না।”

কিছুটা গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। বলল, “এবার চোখ খোল।”

চোখ খুললাম। প্রথমে আগুনের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ধোঁয়াতে কাশি আসছিল, কিন্তু সামলে নিলাম। একটা দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বড়ো গুনিন কাঠটা দেয়ালের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ভালো করে দেখ।”

এ যে দাঁতাল! জঙ্গল থেকে দেয়ালে ঢুকল কেমন করে? কিন্তু দাঁতাল তো অনেক বড়ো হয়, এ তো আমার দু’হাতের চেটোর মতো ছোটো।

“জাদু করে একটা দাঁতালের প্রাণ এখানে আটকে রেখেছিল আমার আগের বড়ো গুনিন। ভালো করে দেখ। এত কাছ থেকে দাঁতালকে শিকারের সময় ছাড়া দেখতে পাবি না।”

ভালো করে দেখলাম। আগে বুঝতে পারিনি, এখন দেখলাম শিকারিরা দাঁতালটাকে ঘিরে ধরেছে, কয়েকজন বর্শা ছুড়েছে, একটা চোখে লেগেছে। একজনের খুব সাহস, বাঁদিকে একদম কাছে দাঁড়িয়ে। দাঁতালের গায়ের যেখান থেকে সামনের পা বেরিয়েছে তার ঠিক পিছনে বর্শাটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। শিকারিগুলোও আমার কড়ে আঙুলের থেকে ছোটো।

ধোঁয়ায় অস্বস্তি হচ্ছিল, চোখ দিয়ে জল গড়াতে শুরু করল। ঘুমও পাচ্ছিল। বড়ো গুনিন বুঝতে পেরেছিল। বলল, “যা নিশ, এবার বাইরে গিয়ে ঘুমো। কিন্তু কাউকে বলবি না কী দেখলি এখানে। ওই যে শিকারিগুলোর প্রাণ দেখছিস, ওরাও কথা শোনেনি, এখানে কী দেখেছে বাইরে গিয়ে বলেছিল। তাই মরার পরে ওদের প্রাণ পাহাড়ের দেওর কাছে যায়নি, দেওয়ালের মধ্যে আটকে আছে।”

কোনোরকমে টলতে টলতে বাইরে গিয়ে আগুনের পাশে শুয়ে পড়লাম। হরিণের চামড়াটা ভালো করে জড়িয়ে নিলাম। রাত্রিবেলা দাঁতাল এসেছিল আমার ঘুমের মধ্যে। কিন্তু সকালে তার কিছু মনে নেই।


আজ আমি প্রথম বড়ো জন্তু শিকারে যাব, খরগোশ আর হরিণ মেরে শিকারি হওয়া যায় না। জুরা আর কুম আমার পাশে এসে বসল। দু’জনের হাতে দুটো ঝলসানো মাংসের টুকরো।

“শিকারিদের জন্য এইটুকু মাংস?” আমি জিজ্ঞাসা করি। এতদিন তো দেখেছি শিকারিরা সবচেয়ে বেশি পায়।

“মাংস আর বিশেষ নেই। আজ দাঁতাল মারতে না পারলে কাল থেকে এও জুটবে না। শেকড়বাকড় আর ঘাসের বীজ খেয়ে থাকতে হবে। শিকারিরা ওসব খায় না।” জুরা মুখ বাঁকাল। এমন ভাব যেন ও কত পুরনো শিকারি! আমরা তিনজন একসঙ্গে বড়ো হয়েছি। গত চাঁদের সময় ওরা দু’জন প্রথম বাঘ মারতে গিয়েছিল। ঠিক আছে, আজকের পরে তো আমিও শিকারি হয়ে যাব।

শিকারে বেরোব বলে আমার আজ সকালে মাংস জুটল, অন্যদিন তো ফল আর শেকড়বাকড়ই পাই। বেরিয়ে পড়লাম আমরা। দলের একজন শিকারিও বাদ ছিল না। আমার একারই এবার প্রথম শিকার। সকলের হাতে একটা করে বর্শা। আমার বর্শার মাথার পাথরের ফলাটা খুব ধারালো। সেটা বানাতে বেশি সময় লাগেনি, কিন্তু ঠিকমতো পাথরটা খুঁজতে আমার লেগেছিল এক চাঁদ থেকে আরেক চাঁদ।

আমাদের দলের সবচেয়ে বুড়ো শিকারি হল দোরা। কাল ও চুপিচুপি গিয়ে দেখে এসেছে দাঁতাল কোথায় জল খায়। সেইখানে গিয়ে ওকে মারতে হবে। দোরা অনেক দাঁতাল শিকার করেছে, দলের সবাই ওর কথা শুনে চলে। আমাদের দাঁতালকে ঘিরে ফেলতে হবে, কিন্তু কাছে যাওয়া চলবে না। ওর শুঁড়ের কি পায়ের পাল্লার মধ্যে গেলে আর রক্ষা নেই। একদিকে গেলেই অন্যদিকের শিকারিরা বর্শা দিয়ে খোঁচাবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি বর্শাটা দাঁতালের গায়ে গেঁথে দেওয়া যায়, কিন্তু যেকোনও জায়গায় গেঁথে দিলে হবে না। দেয়ালের গায়ে যেমন দেখেছি, ঠিক তেমনিভাবে শিকার করতে হবে। না হলে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়েই মারতে হবে।

দোরা এইসব কথা আমাদের বুঝিয়ে বলল। আমরা সবাই নদীর ধারে বনের মধ্যে লুকিয়ে রইলাম। এই নদীটাতে আমি জল আনতে অনেকবার এসেছি। এখানে বরফ কম, গাছগুলোতেই কিছু পাতা আছে।

বেশিক্ষণ থাকতে হয়নি। জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল পাহাড়ের মতো বড়ো একটা দাঁতাল। আগে কখনও এত কাছ থেকে দেখিনি। সামনের দাঁতদুটো আমার থেকেও লম্বা, বেঁকে উপরের দিকে উঠে গেছে। গায়ে মোটা বড়ো লোম ঝুলে আছে। ওইরকম একটা চামড়া গায়ে দিলে আমার আর ঠাণ্ডা লাগবে না। আর মাংসে আমাদের দলের সকলের এক চাঁদ থেকে আরেক চাঁদ চলে যাবে। ওর হাড় আর দাঁত থেকে সেলাইয়ের ছুঁচ হবে, বর্শার ফলা হবে।

দোরা একটা চিৎকার করে উঠল। মানুষের গলা থেকে এমন চিৎকার বেরোতে পারে না শুনলে বিশ্বাস হত না। আমরাও সবাই একসঙ্গে চেঁচাতে চেঁচাতে দাঁতালটাকে তাড়া করলাম। সকলের হাতে বর্শা। দোরা দেখি অন্য হাতে একটা গাছের ডাল নিয়ে তাতে আগুন ধরিয়েছে। আরও কয়েকজনের হাতে ওইরকম শুকনো ডাল, তারা দোরার ডালটার থেকে আগুন ধরিয়ে নিল।

দাঁতালটা আওয়াজ শুনে চমকে উঠেছিল, পিছনে ঘুরল। ওইরকম বড়ো জন্তু যে অত জোরে দৌড়োতে পারে ভাবা যায় না। কিন্তু পালাতে পারবে না, আমরা ওর বনে ঢোকার রাস্তার সামনে। দোরা আগুনটা নিয়ে দাঁতালটার দিকে এগিয়ে গেল। সব জন্তুই আগুনকে ভয় পায়। দাঁতালটা ডানদিকে ঘুরল। আমি ছিলাম বাঁদিকে, আরও কয়েকজন ছিল। আমরা বর্শা দিয়ে খোঁচা মারতে গেলাম। মোটা লোম, রক্ত বেরোল কি না বুঝতে পারলাম না, তবুও নিশ্চয়ই চামড়া ফুটো করে একটা দুটো ঢুকেছে। আবার আমাদের দিকে ঘুরল। একই সঙ্গে চিৎকার করে উঠল। এত জোর আওয়াজ যে কান প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। আমরা যে যেদিকে পারি পালিয়ে গেলাম। কেউ একজন একটা বর্শা ছুড়েছে, কিন্তু দাঁতাল মাথা সরিয়ে নিয়েছে, মাথায় না লেগে লাগল কানে।

আরও ক্ষেপে উঠল জন্তুটা। সামনে ছিল দোরা, তাকে তাড়া করল। দোরা কোনোরকমে শুঁড়টা এড়িয়ে গেল, কিন্তু হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে মশাল আর বর্শা দুটোই ছিটকে পড়ে গেল। গাছের গুঁড়ির মতো বড়ো একটা পা ওর পেটের উপর চেপে বসছিল। আর রক্ষা নেই। কিন্তু শেষমুহূর্তে গড়িয়ে সরে গেল দোরা। ওপাশ থেকে কেউ একটা বর্শা ছুড়ল। এবার সেটা লাগল বাঁ চোখের কাছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল।

আবার ঘুরল জন্তুটা। এবার সোজা বনের দিকে দৌড়ল। আমি একদম কাছে চলে এসেছি, সামনের দিকেই আছি, কিন্তু বাঁ চোখটা অকেজো বলে বোধ হয় আমাকে দেখতে পেল না। আমার পাশ দিয়ে যখন দৌড়ে যাচ্ছে, সামনে দেখি জুরা পড়ে গেছে। শুঁড়টা দিয়ে একটা ঝটকা মারল, ছিটকে পড়ে গেল জুরা। বেঁচে আছে কি না জানি না, নড়ছে না।

“জুরা!” আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। হাত বাড়ালে ছুঁতে পারব দাঁতালের এত কাছে চলে এসেছি। কিন্তু কী করব? এখুনি তো পিষে মারবে জুরাকে। হঠাৎ মনে এল কালকের দেয়ালের দাঁতালটার কথা। বড়ো গুনিন কানের কাছে বলেছিল, ‘ভালো করে দেখ।’ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল শিকারিটার কথা। সামনের পাটা যেখানে বুক থেকে বেরিয়েছে, তার ঠিক পিছনে বর্শাটা একটু পিছন দিক করে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বর্শাটা তুলে দাঁতালের ঠিক ওই জায়গায় চাপ দিলাম। একহাতের বেশি ঢুকে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসে আমাকে ভিজিয়ে দিল। দাঁতালটা ধড়ফড় করে উঠল, আমার হাত থেকে বর্শাটা ছিটকে বেরিয়ে গেল। টলতে লাগল অত বড়ো জন্তুটা। শুঁড়ের এক ঝটকাতে আমাকে ছিটকে ফেলে দিল। কেউ একটা ‘নিশ!’ বলে চিৎকার করে উঠল। জ্ঞান হারানোর আগে দেখলাম যে জন্তুটা মুখ থুবড়ে পড়েছে।


***


চোখ খুললাম। গায়ে খুব যন্ত্রণা। মুখ দিয়ে একটু আওয়াজ বেরিয়ে এল।

এক নারীকণ্ঠ ভেসে এল, হিন্দিতে। “ছটফট করবেন না। তাতে ব্যথা আরও বেড়ে যেতে পারে।”

মাথাটা ঘুরিয়ে দেখলাম সাদা পোশাক পরা নার্স।

“সিস্টার, আমি কোথায়?”

“গিরাটগঞ্জের হসপিটালে। চিন্তা করবেন না, আপনার মেজর কোনও চোট লাগেনি। আপনার বন্ধু সমস্তরকম স্ক্যান করিয়েছেন, সব রিপোর্টই ঠিক আছে।”

একটা দরজা খোলার আওয়াজ হল, আমি আবার চোখ বুজলাম।

পরেরবার যখন চোখ খুললাম, মাথার উপর ঝুঁকে আছে শামসের মুখ।

“এখন কেমন আছিস?”

“মাথায় বড্ড ব্যথা।”

“ও কমে যাবে। বাব্বা, যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি! মিস্টার আনন্দ আমাকে ফোন করেন, তাড়াতাড়ি অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে তোকে সন্দক থেকে এনে এই হাসপাতালে ঢোকাই।”

“কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম?”

“বেশিক্ষণ নয়। কাল দুপুরে অ্যাকসিডেন্ট করলি, এখন সোমবার সকাল। তোর ক্লাস নিয়ে চিন্তা করিস না, ইউনিভার্সিটিতে খবর দিয়ে দিয়েছি। বাড়িতে জানাইনি, সবাই চিন্তা করবে। সিস্টার তোকে বলেছেন তো যে তোর কিছু হয়নি? এবার তুই নিজেই ফোনে বাড়িতে কথা বলে নিস। মিস্টার আনন্দের খুব খারাপ লেগেছে, তুই ওঁর হাত না ধরে একা একা নামতে গেছিস। এই বয়সে লাফালাফি করতে কেন যাস?”

শামস হঠাৎ থামল। তারপরে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল, “আমাকে চিনতে পারছিস তো?”

“পারব না কেন?”

“নিজের বাড়ির ঠিকানা মনে আছে?”

“কী উলটোপালটা জিজ্ঞাসা করছিস? এদিকে বলছিস আমার কিছু হয়নি, ওদিকে এমন কথা জিজ্ঞাসা করছিস যেন আমি নিজের নাম ভুলে গেছি।”

“কী নাম তোর? মনে আছে?”

রেগেমেগে বললাম, “আমার নাম নিশ... মানে নীলাদ্রি।”

শামস একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “যাক, ডাক্তাররা বলছে যে তোর চোট সেরকম কিছু লাগেনি। অথচ জ্ঞান আসছে না। বিড়বিড় করে বকছিলি। আমিও শুনেছি, গুনিন, দাঁতাল, জুরা, কীসব ভুলভাল কথা। তাই চিন্তায় ছিলাম মাথায় লাগল কি না।”

সেদিনই হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে গিয়েছিলাম। ফেরার আগে একবার অজিতবাবুর সঙ্গে দেখা করে এসেছিলাম। আমার কিছু ক্ষতি হয়নি জেনে উনিও নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন।

আমার কাহিনি সম্পর্কে আমার ক’টা কথা বলার আছে। স্বপ্নে এইরকম বাস্তবের মতো অভিজ্ঞতা অন্য কারও হয়েছে কি না জানি না, আমার আগে পরে আর কখনও হয়নি। কোনোভাবে আমার মন প্রাগৈতিহাসিক যুগে চলে গিয়েছিল কি না, তা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। বিজ্ঞান বলে, তা সম্ভব নয়। বাস্তবেও দুয়েকটা বিষয় আছে যার থেকে মনে হয় পুরোটাই আমার মনের কল্পনা। শেষ তুষার যুগের সময় ভারতে আধুনিক মানুষ হোমো সেপিয়েন্সের বসবাস ছিল, তারা দল বেঁধে শিকারও করত। যে জায়গাটায় বর্শাটা বিঁধিয়েছি বলে কল্পনা করেছিলাম, হাতির ক্ষেত্রে সেখান দিয়েই হৃৎপিণ্ডের নাগাল পাওয়া যায়। কিন্তু মধ্যভারতে তুষার যুগেও কখনোই মাটি হিমবাহ দিয়ে ঢেকে যায়নি। আমার স্বপ্নের দাঁতাল নিঃসন্দেহে হাতি নয়, রোমশ ম্যামথ। অজিতবাবু গুহাচিত্রের ফটো পাঠিয়েছিলেন, ভালো করে দেখে সেগুলোকে হাতিই মনে হল। তাছাড়া রোমশ ম্যামথ কোনোদিন ভারতে ছিল বলে কোনও প্রমাণ নেই। তাই ইতিহাসের সঙ্গে আমার স্বপ্ন মেলে না।

কিন্তু একটা কথা এখন আমি বুঝতে পেরেছি। গুহার ছবি দেখে মানুষ শিকার কীভাবে করতে হয় শিখত। ওই গুহাচিত্র আর কিছুই নয়, শিকারের নির্দেশিকা一হান্টার্স ম্যানুয়াল।

___


অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

No comments:

Post a Comment