চলো যাইঃ ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা - সায়নদীপা পলমল

ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা

সায়নদীপা পলমল



প্রাক-কথন


“Afoot and light-hearted I take to the open road,

Healthy, free, the world before me,

The long brown path before me leading wherever I choose.

Henceforth I ask not good-fortune, I myself am good-fortune,

Henceforth I whimper no more, postpone no more, need nothing,

Done with indoor complaints, libraries, querulous criticisms,

Strong and content I travel the open road.

The earth, that is sufficient,

I do not want the constellations any nearer,

I know they are very well where they are,

I know they suffice for those who belong to them.

(Still here I carry my old delicious burdens,

I carry them, men and women, I carry them with me wherever I go,

I swear it is impossible for me to get rid of them,

I am fill’d with them, and I will fill them in return.)”

by WALT WHITMAN (SONG OF THE OPEN ROAD)


 ঠিকই বলেছেন কবি, আমরা কখনোই আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িত থাকা কিছু জিনিসকে ছুড়ে ফেলতে পারি না। আমাদের রোজনামচায় সামিল যারা তারা আমাদের শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতোই আমাদের সঙ্গে আটকে থাকে প্রতিনিয়ত। আর এই আটকে থাকাই একসময় হাঁফ ধরিয়ে দেয়, বোঝা মনে হয় তাদের, মনে হয় কোনোভাবে যদি পালাতে পারতাম এদের থেকে! কবির মতোই প্রশান্ত চিত্তে যদি একটা মুক্ত সজীব পথ ধরে পৃথিবীর রূপ খুঁজতে যেতে পারতাম, তাহলে কত না ভালোই হত। কিন্তু বাস্তবে তো তেমনটা সম্ভব নয়, তবুও আমরা আমাদের ওই দৈনিক রুটিনের বেড়াজাল থেকে কিছুটা সময় চুরি করে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়তে পারি আমাদের হৃদয়টাকে খানিক স্বস্তি দিতে।

এমনই এক সময় চুরি করতে পেরেছিলাম সে বছর পুজোর সময়। সপরিবারে গিয়েছিলাম মহারাষ্ট্র-গোয়া। সেখানে আমার সবচেয়ে প্রিয় দুটো জায়গায় ভ্রমণের গল্পই বলব তাতাইয়ের জবানিতে।


প্রস্তুতি পর্ব


“গোয়া যাবি! মা-বাবার সাথে!”

“মুম্বাই যাবি মা-বাবার সাথে!”

সমীর আর টিয়ার এমন আঁতকে ওঠার কারণটা ঠিক বুঝতে পারল না তাতাই। এমনিতেই মনমেজাজ ভালো নেই, তার ওপর ওদের এই অতি নাটকীয়ভাবে আঁতকে ওঠাতে বেশ বিরক্তিই লাগল তাতাইয়ের।

“কেন, কী সমস্যা?”

“আরে বাবা বম্বে-গোয়া হল প্রেম করার জায়গা আর সেখানে তুই যাবি মা-বাবার সাথে! তুই কি মানুষ রে!”

“আমি এমনই। আপাতত মা-বাবার সাথে ছাড়া অন্য কারুর সাথে ঘুরতে যাওয়ার কথা আমি ভাবতেও পারি না।”

কলেজ থেকে ফিরেও মনটা ভার হয়ে ছিল তাতাইয়ের। কত পড়া, কত খাতা লেখা জমে আছে! আজ বাদে কাল ষষ্ঠী। সবাই যখন পুজোতে আনন্দ করবে তখনো তাতাইকে বইখাতা সামনে নিয়ে বসে থাকতে হবে। আগেকার পদ্ধতিই ভালো ছিল, বছর শেষে একটা পরীক্ষা, তাতে বছরের কয়েকটা দিন মিস গেলেও কোনো সমস্যা হত না। কিন্তু এই সেমিস্টার সিস্টেম বড়োই বালাই। তাতাইয়ের মনে হয় যেন একটা সেমিস্টার দিয়ে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই আরেকটা সেমিস্টার হাজির হয়ে যায়। সে বছর বাবা ট্যুর প্ল্যান করার আগে তাতাইকে জানালেন না অবধি। সবকিছু রেডি করে পেমেন্ট করে দেওয়ার পর সব শুনল তাতাই। শুনেই সে অনুযোগ করেছিল, “আমাকে একবার জিজ্ঞেস করতে পারতে অন্তত।”

“জিজ্ঞেস করলে কী বলতিস?”

“আমি যেতাম না। মাসিমণি বা পিসিমণি কারুর বাড়িতে রয়ে যেতাম।”

“কুড়ি দিন ওদের বাড়িতে থাকতিস?”

“কুড়ি দিন! তোমরা কি পাগল হলে নাকি? এতদিন ঘুরলে পড়া সামলাব কী করে!”

“পড়া যাতে ভালো করে সামলাতে পারিস, তাই তো বেড়াতে যাওয়া। দেখবি ঘুরে আসার পর মনটা ভালো হয়ে গেছে।”

“ধুর, বেড়াতে গিয়েও কোনো এনজয় করতে পারব না জানি। মাথায় সবসময় ঘুরতে থাকবে খাতা তৈরি করার চিন্তা।”


ভ্রমণ ডায়েরি


কোনোভাবেই বেড়াতে যাওয়াটা এড়ানো গেল না। তার ওপর তাতাইরা যাচ্ছে ভারতের সবথেকে কস্টলি জায়গাগুলোতে। কাজেই এক্ষেত্রে বায়না করে বেড়াতে যাওয়া ক্যান্সেল করা মানে বাবাকে বিপদে ফেলা ছাড়া কিছুই নয়। তারিখটা ১২ই অক্টোবর, ২০১৯। রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেসে চড়ে বসল তাতাইরা, গন্তব্য জলগাঁও। ব্যস্ততার চোটে এবারে বাবার কাছে ট্যুর প্ল্যানটাও জানা হয়নি, তাই কোথায় কোথায় যাওয়া হবে না যাওয়া হবে সেটাও সে জানে না।

ট্রেনের সময় ছিল রাত্রি দশটা কুড়ি। সে জায়গায় ট্রেন এল প্রায় একঘণ্টা লেটে। তাতাই ভাবল যে যাত্রার শুরুটাই এত খারাপ সে যাত্রা কেমন হবে কে জানে! তার ওপর এসি কোচের ওই কাচের জানালাটা বড়ো অসহ্য লাগে তাতাইয়ের। মনে হয় যেন কেউ ওকে জোর করে বাইরের পৃথিবীটা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। পৃথিবীটাকে ও দেখতে যাচ্ছে, কিন্তু ছুঁতে পারছে না। নামার কথা পরের দিন রাত ন’টা পঞ্চাশে। এই ট্রেন যাত্রার সময় সন্ধে নামলেই ভীষণ অস্বস্তি করে তাতাইয়ের, কোথাও কিছু দেখা যায় না। অন্ধকারের বুক চিরে ট্রেনটা ছুটে চলে দুরন্ত গতিতে।

যাই হোক, ১৩ই অক্টোবর রাত সাড়ে দশটা নাগাদ তাতাইরা পৌঁছাল জলগাঁও। ট্যুর কোম্পানির লোকেরা আগের থেকে হোটেলে পৌঁছে খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করে রেখেছিল। তাতাইরা হোটেলে ঢুকতেই মিলল গরম গরম বাঙালি খাবার—ভাত, ডাল, ফুলকপির ডালনা, মাছ ভাজা আর পাঁপড় ভাজা। খাবারটা খেয়ে পেটটা যেন জুড়োল খানিক।

খাওয়া শেষ হতেই ট্যুর ম্যানেজার বললেন, “কালকে আমাদের গন্তব্য ইলোরা কেভস…”

ম্যানেজারকাকু আরো অনেক কিছু বলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেসব যেন কানে ঢুকল না তাতাইয়ের। সে ফিসফিস করে বাবাকে বলল, “বাবা, ইলোরা!”

“হুম।”

তাতাইয়ের যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না সেই ইতিহাসে পড়া অজন্তা ইলোরাকে ও ছুঁয়ে দেখতে পারবে।

১৪ই অক্টোবর সকাল সকাল এসি বাসে চড়ে শুরু হল ইলোরার উদ্দেশে যাত্রা। পথে বসেই গুগল করে তাতাই জেনে নিন ইলোরার সম্পর্কে কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য। মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গবাদ জেলার থেকে ১৮ মাইল দূরত্বে অবস্থিত হচ্ছে ইলোরার গুহাগুলো। এই গুহার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে তিনটি পৃথক ধর্মের স্থাপত্য দেখা যায়—বৌদ্ধ, হিন্দু এবং জৈন। তার মধ্যে বৌদ্ধ গুহাগুলো হচ্ছে সবচেয়ে প্রাচীন যেগুলি আনুমানিক ৫০০ থেকে ৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। আর সবচেয়ে নবীন হচ্ছে জৈন গুহাগুলো।

যাওয়ার পথেই ঘ্রিষণেশ্বর মন্দির দর্শন হল। ভারতে অবস্থিত বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ জেলায় অবস্থিত এই ঘ্রিষণেশ্বর মন্দির।

মন্দির দর্শন ও দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর্ব মিটতেই কিছু পরেই বাস এসে উপস্থিত হল তাতাইয়ের বহু প্রতীক্ষিত গন্তব্যে ইলোরা, UNESCO স্বীকৃতি একটি World Heritage Site। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতেই বেশ অনেকটা দূরে নজর পড়ল প্রাচীনত্বের গন্ধমাখা একটা সুবিশাল গুহায়, পাঁচ নম্বর গুহা। সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল তাতাইয়ের। অবশেষে ওর চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে ইতিহাসকে! পাঁচ নম্বর গুহা হচ্ছে এখানকার গুহাগুলোর মধ্যে সবথেকে বড়ো এবং সবথেকে শৌখিন। ১১৭ ফুট × ৫৬ ফুট আয়তনের এই গুহা আদপে একটি বৌদ্ধ বিহার। ২৪টি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই স্থাপত্য। এখানে বুদ্ধদেবের মূর্তি, উপাসনা কক্ষ থেকে শুরু করে সারিবদ্ধভাবে হাতিসহ অন্যান্য আরো অনেক পশুর মূর্তি রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আক্রমণে আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত হওয়ার কারণে ক্ষয়েও গেছে অনেক কিছু। মূর্তিরগুলোর গায়ে হাত রাখতেই কেঁপে উঠছিল তাতাই। ভাবতেও অবাক লাগছিল, এত যুগ আগে এভাবে একেকটা বিশাল পাথরকে কেটে কেটে এমন সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম নিখুঁত কারুকার্য করা হয়েছে! ১ থেকে ১২ নম্বর গুহা হচ্ছে বৌদ্ধদের স্থাপত্য। সঙ্গী অনেকেই পাঁচ নম্বর গুহা দেখতে দেখতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু তাতাই আর বাবা ঘুরে ঘুরে বাকি প্রতিটা গুহা দেখলেন। সেগুলো পাঁচ নম্বর গুহার তুলনায় অনেকটাই ছোটো। গুহাগুলোর কোনোটা বৌদ্ধ চৈত্য, আবার কোনোটাতে রয়েছে বুদ্ধদেবের বিভিন্ন আসনে বসা মূর্তি।

পরবর্তী ষোলোটি গুহা হিন্দুধর্মের স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করছে। প্রতিটা গুহাতেই মূলত শিব-পার্বতীর মূর্তি বা তাঁদের নিয়ে ছোটো ছোটো গল্প মূর্তির আকারে গুহার দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে।

বৌদ্ধ ও হিন্দু গুহাগুলোর থেকে প্রায় এক কিলোমিটারেও বেশি দূরে রয়েছে জৈন গুহাগুলো। এগুলো সংখ্যায় অল্প, ৩০ নম্বর থেকে ৩৪ নম্বর গুহা। ওখানকার বাস সার্ভিসের মাধ্যমে এই গুহার কাছে পৌঁছাতে হয়, হেঁটে যাওয়া যায় না। ৩০ নম্বর গুহাটি অনেকটা ১৬ নম্বর গুহার আদলে তৈরি, এর নাম ‘ছোটো কৈলাস’। এই গুহার ছাদে পদ্মফুলের সূক্ষ্ম কারুকার্য সত্যিই মুগ্ধ করে। বাকি গুহাগুলোতে খোদাই করা রয়েছে বিভিন্ন জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি, ইন্দ্রদেবের মূর্তি, ইন্দ্রসভা ইত্যাদি।

পরেরদিন অর্থাৎ ১৫ই অক্টোবর তাতাইদের গন্তব্য ছিল অজন্তার গুহা চিত্র। জলগাঁও থেকে ৫৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অজন্তার গুহাগুলো মূলত বৌদ্ধগুহাচিত্র। এগুলো খ্রিস্টের জন্মের আগে তৈরি হয়েছিল। সেই অর্থে ইলোরার থেকে অনেক প্রাচীন অজন্তার গুহাচিত্রগুলো। এখানে মোট ৩০টি গুহা থাকলেও তার মধ্যে অনেকগুলো গুহার কাজই অসম্পূর্ণ। মোট ষোলোটি গুহাতে রয়েছে দেওয়াল চিত্র, তার মধ্যে ১, ২, ১৬ আর ১৭ নম্বর গুহার কাজ সত্যিই মুগ্ধ করে। দেওয়ালের গায়ে আটকানো সাদা প্লেটের ওপর রঙিন ছবির মাধ্যমে একেকটা গল্প খোদাই করা। যত দেখছিল তত বিস্ময়ে অভিভূত হচ্ছিল তাতাই। অত যুগ আগে কীভাবে এমন সূক্ষ্ম কাজ সম্ভব! তখন তো এত আধুনিক যন্ত্রপাতিও ছিল না, কিছু না! ১৯ নম্বর গুহা থেকে শুরু হয়েছে ভাস্কর্য, এখানকার গুহাগুলোর সঙ্গে ইলোরার কাজের অনেকটা মিল রয়েছে। ১৯, ২৬ আর ২৯ নম্বর গুহা হল চৈত্য এবং বাকিগুলো বিহার। অজন্তার গুহাগুলো কিন্তু ইলোরার মতো সমান জায়গায় নেই। এখানে পাহাড়ি পথের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হচ্ছিল একটার পর একটা গুহায়। ১৬ নম্বর গুহার পর চড়াই দেখে ক্ষান্ত দিলেন অনেকেই। তাতাই আর বাবা দু’জনে চড়া রোদের মধ্যেও এগিয়ে চলল। বাবার একটাই বক্তব্য, “আর কোনোদিনও আসতে পারব কিনা জানি না, এসেছি যখন তখন দেখেই যাব। কোনো আফসোসের জায়গা যেন না থাকে।”

কাজ চলছিল বলে ১৭ আর ১৮ নম্বর গুহা বন্ধ ছিল। ১৯ নম্বর গুহায় পৌঁছাবার পথে পাহাড় থেকে নিচের দিকে তাকাতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল তাতাইয়ের। খাদের মধ্যে সবুজ বনানীর সমাহার, রংবেরঙের ফুল ফুটে আছে সেখানে, ছোট্ট উচ্ছ্বল ঝরনার জল নামছে তার আপন গতিতে, খাদের ওপর দিয়েই একটা কাঠের সেতু বাঁধা রয়েছে। কারা ওই পথে যায় কে জানে! একপাশে প্রাচীনত্বের গন্ধ আর অন্যপাশে প্রকৃতির অপরূপ শোভা। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবে ভেবেই পাচ্ছিল না তাতাই। বাবার তাগাদায় সম্বিৎ ফিরল। ১৯ নম্বর গুহার সামনে আরো চমক অপেক্ষা করছিল ওদের জন্য। এই গুহার বাইরের কারুকার্যই দেখার মতো। ভেতরের রয়েছে বুদ্ধদেবের মূর্তিসহ গুহার দেওয়ালে খোদাই করা চিত্র, স্তম্ভ। ১৯ নম্বর গুহা দেখা শেষ করে এগোল তাতাই আর বাবা। ওরা যত এগোচ্ছিল লোকজনের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় নেই হয়ে গিয়েছিল। বেশিরভাগ মানুষই এই প্রচণ্ড রোদে চড়াই রাস্তায় ওঠার ধকল নিতে পারছিলেন না। এতদূর এসে তাতাইয়েরও কষ্ট শুরু হয়েছিল খানিক। বাবা ইশারায় দেখালেন শেষের দিকের গুহাগুলো বন্ধ, তাই আর মাত্র কয়েকটা গুহা রয়েছে বাকি। অতএব এগোল তাতাই। দেখতে দেখতে সবশেষে পৌঁছল ২৬ নম্বর গুহায়। আর এখানে ঢুকেই তাতাইয়ের সব ক্লান্তি যেন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। সত্যিই এখানে না ঢুকলে কী জিনিসের থেকে যে বঞ্চিত হত বলার নয়। অন্যান্য স্থাপত্যের মাঝেই এখানের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ হল ২৩ ফুট দৈর্ঘ্যের বুদ্ধদেবের শায়িত মূর্তি, মহাপরিনির্বাণে বুদ্ধ। নিজের অজান্তেই বুকের কাছে দুটো হাত জড়ো হয়ে গেল তাতাইয়ের, মনে হল এত কষ্ট, ক্লান্তি সব সার্থক হয়ে গেল বুদ্ধদেবের এমন মূর্তির দর্শন পেয়ে। বিশাল দৈর্ঘ্যের মূর্তিটা মায়ের জন্য ক্যামেরাবন্দি করে আনবে ভেবেছিল তাতাই কিন্তু সম্ভব হল না। বিশাল দৈর্ঘ্য আঁটল না ক্যামেরার লেন্সে। সে হোক, এই অপূর্ব কীর্তি মনের ক্যামেরায়বন্দি করে আবার নীচের দিকে নামতে শুরু করল তাতাইরা।

অনেকখানি ক্ষয়ে গেছে, কিছুটা আবার রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলার জন্য বন্ধ, তবুও যেটুকু ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাতেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল তাতাইয়ের। সে কোনোদিনও ভাবেনি এমন করে ইতিহাসকে ছুঁতে পারবে বলে। ওই গুহা, তার মধ্যে ওই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কারুকাজ, এসব ছুঁয়ে চোখ বন্ধ করলেই তাতাই যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল হাজার হাজার শ্রমিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের ঢালে ওই উঁচু উঁচু গুহায় বসে ছেনি হাতুড়ি নিয়ে ঠুকঠুক করে কাজ করে চলেছে নিরলসভাবে। ইতিহাসের পাতায় তো আমরা শুধু রাজরাজড়াদের বাহবা দিই। বলি অমুক রাজা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সত্যিই কি রাজা তৈরি করেন! হ্যাঁ, রাজরাজড়ারা বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী, তারা পৃষ্ঠপোষকতা করেন, অর্থের বিনিময়ে হাজার হাজার মানুষকে কাজে নিযুক্ত করেন, হয়তো রাজারা না থাকলে এমন অপূর্ব শিল্পের সৃষ্টিও হত না। তাই ইতিহাস রাজাকে মনে রাখে, কিন্তু সেই মানুষগুলো যারা সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিবারাত্র অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই রাজার পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দেন, তাদের আমরা ভুলে যাই, ইতিহাস তাদের নাম লেখে না কোথাও।

মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ জেলা যার উপকণ্ঠে রয়েছে দু-দুটো World Heritage Site, জেলাটা ছেড়ে বেরোবার সময় তাতাই বাবাকে একটা ধন্যবাদ জানাল, আজ বাবার জন্যই ওর একটা স্বপ্ন সত্যি হল, আজ বাবার জন্যই ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে পারল ও। সেই সঙ্গে ও সেই সমস্ত শ্রমিক তথা শিল্পীদের উদ্দেশ্যে মনে মনে প্রণাম জানাল ইতিহাস যাদের ভুলে গিয়েছে।


___


No comments:

Post a Comment