ছোটো গল্পঃ অতীন্দ্রিয়তা - শেলী ভট্টাচার্য


অতীন্দ্রিয়তা


শেলী ভট্টাচার্য



(১)


“জল, জল। টপ্পিড… উঁ উঁ, মা-আ-আ…”

আমরা ঘরে বসে চা খেতে খেতে আজকের ট্যুর প্ল্যানিং করছিলাম। দাদা ট্রাভেল এজেন্সির দেওয়া লিস্ট ধরে ট্যুরিস্ট স্পটগুলোর নাম এক এক করে বলছিল। এমন সময় বিট্টু ঘুমের মধ্যে গুঙিয়ে কেঁদে উঠল।

বৌদি ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতেই ও ঘুম ভেঙে উঠে বসল। ওর চোখেমুখে বরাবরের মতো সেই আতঙ্কের ছাপ। ঘরের মধ্যের সবাই বুঝলাম, ও আবার সেই জলে ডোবার স্বপ্নটা দেখেছে। বৌদি বিট্টুকে পাঁজাকোলা করে বসিয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে লাগল, “আজ ঘুরতে যাব তো। চল, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। ভাইজ্যাগ কী সুন্দর জায়গা, দেখবি না?”

ছোট্ট সাড়ে চার বছরের বিট্টু মায়ের কোলে তখন লেপটে রয়েছে। ওর ভেতরের অব্যক্ত ভয়গুলো একটু একটু করে সরে যাচ্ছিল। জানালা দিয়ে আসা রোদের আলপনার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ও বলল, “কোথায় যাব?”

বৌদি ওকে কোল থেকে নামিয়ে স্নানের জন্য রেডি করাতে করাতে ভাইজ্যাগের কিছু স্পটের কথা বলতে লাগল।

মিট্টু বাইরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বিস্কুট খাচ্ছিল। হঠাৎ ঘরে দৌড়ে এসে বলল, “হোটেলের আঙ্কেল বলে গেল, গাড়ি একঘণ্টার মধ্যেই এসে পড়বে।”

“চলো ঝটপট সবাই রেডি হয়ে নিই। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরোতে হবে। তাছাড়া একবার বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে কালকের জন্য আরাকু যাওয়ার টিকিট বুক করতেও হবে।” সোফার আরাম ছেড়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে তাড়া লাগাল দাদা।

আমি রুমে ফিরে বাথরুমে ঢুকে ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে পুরোনো স্মৃতিতে ডুবলাম। বিট্টুর এই স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা যদিও আজ নতুন নয়। ও ছোটো থেকেই এই স্বপ্নটা দেখে, আর একইরকমভাবে আঁতকে ওঠে। কথা বলতে পারত না যখন, তখন স্বপ্নের বিষয়টা বোঝা যায়নি। কিন্তু পরে কথা ফুটলে প্রথমে ‘টপ্পিড, টপ্পিড’ বলত। তারপর ধীরে ধীরে জলের প্রতি ওর আতঙ্কটা প্রকাশ পেয়েছিল। মনে পড়ল, একবার অ্যাকোয়াটিকা গিয়েছিলাম আমরা সবাই মিলে। সেদিন সবাই জলে নেমে আনন্দ করলেও ও নামেনি। তাই বৌদিরই নামা হয়নি।

শুধু জল নয়, আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপারেও বিট্টুর আতঙ্ক ছিল। সেটা আমরা টের পেয়েছিলাম পুরী যাওয়ার দিন। তখন বিট্টুর দেড় বছর-মতো বয়স হবে। শীতের ছুটিতে পুরী যাওয়ার জন্য হৈ হৈ করে গিয়ে হাওড়া পৌঁছেছিলাম সেদিন। সেখান থেকে জগন্নাথ এক্সপ্রেসে চড়লাম আমি, দাদা, বৌদি, মিট্টু আর বিট্টু। ট্রেনে উঠতে না উঠতেই বিট্টুর মারাত্মক কান্না শুরু হয়ে গেল। সে কান্না কোনোভাবেই থামবার নয়। যে ছেলে লোকাল ট্রেনে উঠে আনন্দে লাফায়, সে দূরপাল্লার ট্রেনে উঠে গলা ফাটা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছিল। আতঙ্কে ওর চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছিল তখন। একরকম ভয় পেয়েই সেদিনকার সেই পরিস্থিতিতে ট্রেন থেকে আমাদের নেমে আসতে হয়েছিল। সেবার আর পুরী যাওয়া হয়নি আমাদের।

এরপর দাদা-বৌদি ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। সবটা শুনে ডাক্তার বলেছিলেন, ‘হয়তো এ বিষয়ে ওর মনে কোনো আতঙ্ক আছে।’ কথাটা শোনার পর বৌদির অবশ্যম্ভাবী প্রশ্ন ছিল জন্মান্তর নিয়ে। ডাক্তার অবশ্য সে বিষয়টা হেসে কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঘরে সেদিন এই ব্যাপারটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। রাতে আমার সাথে শুয়ে আট বছরের মিট্টু ‘জন্মান্তর ঠিক কী, খায় না মাথায় দেয়’ সে বিষয়ে তার যাবতীয় কৌতূহল আমার উপর ঢেলে দিয়েছিল। আমি তখন যতটা সম্ভব সরল সহজভাবে বুঝিয়েছিলাম ওকে। তবে আমার মনে প্রশ্নটা থেকেই গিয়েছিল, কেন বিট্টু ট্রেনের বার্থ দেখে অমন আঁতকে উঠেছিল। ছোটো থেকে ও কী এমন স্বপ্ন দেখে ওরকম আঁতকে ওঠে? আর কেনই বা ওর ছোটোবেলায় বলা প্রথম শব্দগুলোর মধ্যে একটা ছিল ‘টপ্পিড’? তারপর থেকে আমি অনেক কিছুতে এই শব্দটাকে খুঁজেছিলাম। তাও টপ্পিড শব্দটার মানে কোথাও খুঁজে পাইনি। পরে এও ভেবেছি, হয়তো এটি অন্য কোনো ভাষার শব্দ হতে পারে।

এখন যদিও ওই স্বপ্নটা অনেক কম দেখে বিট্টু। ট্রেনের বার্থ দেখে ছটফট করে চিৎকার করার মতো আতঙ্কটাও সেভাবে আর নেই। তবে বোঝা যায় একটা চাপা ভীতিকর অস্বস্তি এখনও ওর মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে। এবার হায়দ্রাবাদ আসার সময়ই ও সাইড লোয়ারে বৌদির কোলের সঙ্গে ঘেঁষে জড়োসড়ো হয়ে যেভাবে শুয়ে ছিল, তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল তা। একটু বড়ো হয়েছে বলেই, নাকি জন্মান্তরের স্মৃতি ফিকে হয়ে এসেছে বলে ওর পুরোনো অভিব্যক্তির কিছু পরিবর্তন হয়েছে, সেটা বলাটা অবশ্য কঠিন।


(২)


একটা ছোট্ট প্রায় অন্ধকার চেম্বার। চারদিকের মজবুতি দেখে মনে হল যেন লোহার সিন্দুকের মতো বডি তার। তার মধ্যে মুখ গুঁজে বসে আছে বিট্টু। আমি ডাকতেই ও হাসিমুখে পেছন ফিরে বলল, “কাকান, টপ্পিড।”

আমি বিস্ময় আর কৌতূহলে চোখ সরু করে এগিয়ে গিয়ে, “কী?” বলে উঠতেই ঘুমটা ভেঙে গেল। তাতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বুঝলাম, আমি গাড়িতে। আড়চোখে খেয়াল করলাম, মধ্যবয়সী ড্রাইভারটি আমার মুখোচ্চারিত শব্দটা শুনে আমার দিকে একবার তাকাল। আমি স্বাভাবিক হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে চলন্ত গাড়ির কাচে চোখ রেখে সামনের রাস্তাটা দেখছিলাম। নিজের মধ্যে একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। এই স্বপ্ন কি নিছকই স্বপ্ন, নাকি কিছুর পূর্বাভাস? জট পাকানো দ্বন্দ্বগুলো সাঁতার কাটছিল মনের ভেতরে। স্তম্ভিত হয়ে ভাবছিলাম পুরী যাওয়ার আগের দিনে দেখা আমার স্বপ্নটার কথা। সেবার বিট্টুর ট্রেনের বার্থের সামনে দাঁড়িয়ে আঁতকে ওঠা কান্নাটা আমি আগেই স্বপ্নে দেখেছিলাম। এমনকি যেবার দাদার বড়ো অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, সেবারও সেই দুর্ঘটনা হওয়ার আগেই আমি একটা ভয়াবহ স্বপ্ন দেখেছিলাম। এসব কথা কাউকে বলি না আমি। বলি না যে, বিভিন্ন ঘটনা ঘটার আগে আমি তার পূর্বাভাস স্বপ্নে পাই। মাঝেমধ্যে ভয় হয় ভেবে, বিট্টু আমার এই অভ্যাসটাই হেরিডিটারিতে পায়নি তো?

আমি যখন ক্লাস ইলেভেনে, তখন থেকে এই স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা আমার খেয়ালে এসেছিল। আগেও অনেক কিছু নিয়ে দেখতাম, কিন্তু সেভাবে ভাবতাম না। তারপর কলেজে পড়াকালিন একদিন আমার খুব কাছের এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ওর জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। অদ্ভুত ধরনের মানুষ তিনি। কোনও ঘরসংসার, এমনকি স্থানও ওঁকে কোথাও বেশিদিন বেঁধে রাখতে পারেনি। একরকম ভবঘুরে মানুষ বলা যেতে পারে। কিন্তু ওঁর মনস্তত্ত্ব ও দর্শনবোধ ছিল অসাধারণ। সেদিন ওঁর সঙ্গে কথাবার্তায় প্রথম জানতে পেরেছিলাম, অনেক মানুষই এরকম স্বপ্ন দেখে, যা সময়ের সঙ্গে সমতাহীন। অর্থাৎ যা ঘটেনি, তার আগামবার্তার স্বপ্ন, আবার যা হয়তো স্মৃতির সীমানার বাইরের অতীতে ঘটেছে, তার আভাস দেওয়া স্বপ্ন। সেদিন উনি আমায় বলেছিলেন, এ ব্যাপারটা খুব কম মানুষের সঙ্গে হয়। এটি চিন্তাশক্তির অতীন্দ্রিয়তা থেকেই হয় সম্ভবত। সেদিন এটাও জেনেছিলাম যে, উনিও নিজের অতীতকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন দেখে পাহাড়ের গা ঘেঁষা গভীর খাদ সম্পর্কে ওঁর মারাত্মক ভীতি ছিল। কিন্তু যেদিন প্রথম পাহাড়ে উঠে সেই খাদের দিকে চেয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেদিন ভয়টা সেরকমভাবে লাগেনি। আর তারপর ধীরে ধীরে সেই ভয়টা যে কবে মনের সীমানার বাইরে চলে গিয়েছিল, তা উনি টেরও পাননি। উনি সেদিন এও বলেছিলেন যে, ভীতির কারণ যাই হোক না কেন, অনেক সময় বাস্তবে তাকে সামনাসামনি দেখলে বা ছুঁতে পারলে তা অনেকটাই কেটে যায়।

ওঁর সঙ্গে কথা বলার পর থেকে আমি আর এই স্বপ্ন দেখা নিয়ে তেমন ভাবতাম না। কিন্তু বিট্টু বড়ো হওয়ার পর ওর মধ্যেও এরকম একটা ব্যাপার দেখে কেমন যেন নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছি বলে মনে হতে লাগল। তবে ওর স্বপ্ন একটা বিষয় নিয়েই। জল আর টপ্পিড। ভাবতেই চমকে উঠলাম। এইমাত্র আমি স্বপ্নে বিট্টুকে তো হাসিমুখে টপ্পিড বলতেই শুনলাম। যে শব্দটা ও এতদিন শুধুমাত্র আঁতকে উঠেই কেঁপে কেঁপে উচ্চারণ করত, সেই শব্দটাকেই প্রশান্ত মুখে বলছিল ও। ভাবতেই দ্বন্দ্বগুলো আবার নড়েচড়ে উঠল আমার মনেーএই আজগুবি স্বপ্ন দেখা, বা সত্যি ঘটনার পূর্বাভাস পাওয়াটা কি আদৌ কোনো অসুখ? নাকি জ্যাঠামশাইয়ের কথা অনুযায়ী অতীন্দ্রিয়তা?

“সাবমেরিন মিউজিয়াম আ গয়ে হ্যায়।”

ড্রাইভারের কথায় সম্বিৎ ফিরল আমার। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের সিটে চেয়ে দেখলাম গাড়িতে প্রায় সবার চোখ ঢুলছে। দেড় দিনের ট্রেন জার্নির পর আজ সারাদিন ঘোরাঘুরির ক্লান্তিতে বিট্টু তো বৌদির কোলে শুয়ে ঘুমে কাদা হয়ে গেছে।

মিট্টু বরাবরই যেখানে যায়, নিজের কৌতূহল অনুযায়ী আমার ইন্টারভিউ নিতে থাকে। বলতে গেলে ও ওর কাকানকে সব ট্যুরিস্ট স্পটের বিশ্বস্ত বাঙালি গাইড বলে মনে করে। এই কারণে আমাকে কোনো ট্যুরিস্ট স্পটে পৌঁছানোর আগে গুগল বাবার শরণাপন্ন হতে হয়। অবশ্য নিজেও তাতে সমৃদ্ধ হই। এই যেমন কিছুক্ষণ আগে রামকৃষ্ণ বিচের ডলফিন মিউজিয়াম আর রাস্তার উলটোদিকের এয়ার ক্রাফট মিউজিয়ামটা দেখতে যাওয়ার আগে এর কী, কেন, কবেーসব ইতিবৃত্ত আমায় জানতে হচ্ছিল। এসব পড়তে পড়তেই চোখটা লেগে এসেছিল। আমাদের গাড়িটা বিচ সংলগ্ন রাস্তায় দাঁড়াতেই সবার চোখ গেল বিশাল লোহার বডির সাবমেরিনটার দিকে।

বৌদি ইশারায় বোঝাল, বিট্টু ঘুমোচ্ছে। তাই ওরা গাড়িতে থাকবে। আমাদের যেতে ইশারা করল। আমরা ফিরলে বিট্টুকে আমাদের কাছে রেখে দাদা-বৌদি যাবে, সেটাও বোঝাল ইশারায়। সেইমতো আমি আর মিট্টু নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। সামনের সমুদ্র তখন বেলাশেষের গর্জনে ব্যস্ত। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলাম সাড়ে চারটে বেজে গেছে। দেরি না করে আগে ঐতিহাসিক কুরসুরা সাবমেরিনেই পা দেব বলে ঠিক করলাম। গাড়ি থেকে নামতেই শুরু হল মিট্টুর প্রশ্নবাণ। আমিও সাবমেরিনটার সম্বন্ধে সবিস্তারে বলতে শুরু করলাম।


(৩)


“১৯৬৯ সালে ১-৬৪১ ক্লাস আই.এন.এস কুরকুরার জন্ম হয়। এটি তৈরি হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের রিগা শহরে। ১৯৭০ সালে এই সাবমেরিনটি ভারতীয় নেভিতে যোগ দেয়। লম্বায় এটি ৯১.৩ মিটার আর চওড়ায় ৮ মিটার। ওজন প্রায় ১৯৪৫ টন। সম্পূর্ণ সাবমেরিনটি সাতটি চেম্বারে বিভক্ত। ভেতরে গেলেই সেগুলো চাক্ষুষ করতে পারবি।”

আমার কথা শেষ না হতেই মিট্টু আবার প্রশ্ন করল, “এসব ডুবোজাহাজের জ্বালানি কী?”

“এখন ডিজেল-চালিত বা পারমাণবিক শক্তি-চালিত ডুবোজাহাজও আছে। কিন্তু এটি সেই কনফিগারেশনের নয়। এটি মূলত ৬৫২ কেজি ওজনের ৪৪৮টি ব্যাটারি নির্ভর ছিল। তাতেই সে প্রায় ১৫.৫ নট গতিতে চলত। বহুবছর দেশকে সেবা করার পর ২০০১ এই সাবমেরিনটি বিশ্রামে আসে। আর আমাদের মানে জনসাধারণের দেখার জন্য হয়ে যায় একটি অসাধারণ মিউজিয়াম। এবার বকবক কম করে চল ভেতরে ঢুকি।” বলে মিট্টুর কাঁধে হাত রেখে কাকা-ভাইঝিতে সাবমেরিনটির দিকে পা বাড়ালাম।

ততক্ষণে আমার টিকিট কাটা হয়ে গিয়েছিল। মিট্টুর দিকে চেয়ে দেখলাম, ও এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে ঘাড় উঁচু করে সাবমেরিনটার দিকে চেয়ে আছে। আমি টিকিট হাতে এগিয়ে গিয়ে একদিকের সাইনবোর্ডের লেখাটা পড়ে নিলাম। সেখানে সাল তারিখ সহ অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এই মিউজিয়ামটির কবে উদ্বোধন করেছিলেন, সেসব লেখা রয়েছে।

সাবমেরিনে ঢোকার জন্য গোল এয়ার-টাইট দরজা থাকে ছাদের উপর যেটি দিয়ে ঢুকে লোহার সিঁড়ি বেয়ে ভেতরের চেম্বারে নামতে হয়। তবে এক্ষেত্রে পর্যটকদের সুবিধার জন্য সাবমেরিনের বডি কেটে মাঝ বরাবর দরজা তৈরি করা হয়েছে। তার সঙ্গে একটা সিঁড়ি ফিট করে দেওয়া হয়েছে যেটি সমুদ্রতট থেকে পর্যটকদের সাবমেরিনের মধ্যে নিয়ে যাবে। কতকটা ফ্লাইটে প্রবেশ করার সিড়ির মতো। মিট্টু আর আমি সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম। সামনে ছিল একদল ট্যুরিস্ট। ওদের সঙ্গে ছিল এজজন লোকাল গাইড। তার মুখের তেলেগু ভাষা কিছু না বুঝলেও যখন সেগুলোকে হিন্দিতে ট্রান্সলেট করে বলছিল, তখন উৎকীর্ণ হয়ে তথ্যগুলো শুনবার চেষ্টা করছিলাম। আমি এটা আগে অন্য ট্যুরিস্ট স্পটেও দেখেছি যে, লোকাল গাইডরা অনেক সময় বইয়ের পাতা বা অনলাইন তথ্যের বাইরেও বেশ কিছু তথ্যাদি ব্যখ্যা করে। সাবমেরিনের ভেতরে ঢুকে মিট্টুর হাঁ দ্বিগুণ হয়ে গেল, আর আমারও বিস্ময় চরমে পৌঁছাল। একটা পিপের মতো সরু আকৃতির লোহার বডির মধ্যে ঠিক কত যন্ত্রপাতি, কত লোহার পাইপ আরও কত যে বিভিন্ন আকৃতির ছোটোবড়ো মেশিন থাকতে পারে, তা দেখে অবাক লাগছিল। কিচেন, টয়লেট, বেড রুম, কাপ্টেনের রুম, রেডিও বার্তা পাঠানোর রুম, টর্পেডো চেম্বারーসবমিলয়ে যেন একটা যান্ত্রব গৃহ সজ্জা। প্রায় সব রুমেই ডামি মানুষ রাখা ছিল। কিচেনের ডামিটিকে দেখে মিট্টু তো প্রায় ঘাবড়েই গিয়েছিল। সব যেন জীবন্ত। যেন এক্ষুনি সচল হয়ে উঠে দেশের শত্রুর উপর হামলে পড়বে। বেড রুমে বার্থ সিস্টেম করা ছিল, কতকটা দূরপাল্লার ট্রেনের মতো। সবমিলিয়ে স্বল্প পরিসরে ৭২ জন অফিসারকে রাখার জন্য অপূর্ব ব্যবস্থাপনা করা ছিল। আমি অবাক হয়ে চেয়েছিলাম সেই বার্থের দিকে। কানে এল গাইডের কথা। ও বলছিল, ১৯৭১-এ পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় নাকি এই সাবমেরিন ওই দেশের এক ডুবন্ত জাহাজ থেকে কিছু মানুষকে উদ্ধার করেছিল। তার মধ্যে একটি ছোটো বাচ্চাও ছিল। সে তার মায়ের সঙ্গে এখানে এসে উঠলেও ডুবন্ত জাহাজের স্মৃতিচারণ করে খুব আঁতকে গিয়েছিল। তারপর যুদ্ধকালিন পরিস্থিতিতে এক-একটা টর্পেডো ফায়ার করায় ও কেঁপে কেঁপে উঠত। ভয়ে ‘টপ্পিড’ বলে চেঁচাত। এই সময় ওর মাও অতিরিক্ত ঠান্ডায় জ্বর আসায় এই সাবমেরিনের বেড রুমের বার্থেই মারা গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে সবমিলিয়ে সেই শিশুটি মানসিকভাবে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। তবে আমাদের বীর সেনারা বাচ্চাটাকে যথাসম্ভব দেখভাল করে যুদ্ধশেষে তাকে হাসপাতালে রেখে সুস্থ করে তুলেছিল। ভারতীয় সেনারা এভাবেই বারংবার সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার নজির গড়ে গেছে। এইসব অভিজ্ঞতার কথা নৌবাহিনীর এক অফিসার তাঁর ডায়েরিতে লিখে গিয়েছিলেন। তাই আমরা পরবর্তীকালে সেসব জানতে পেরেছিলাম।

গাইডের কথাগুলো শুনে আমার সারাটা শরীরে যেন কাঁটা দিয়ে উঠছিল। কোথাও যেন গাইডের মুখে শোনা বাচ্চাটার সঙ্গে বিট্টুর একটা অকারণ মিল পাচ্ছিলাম আমি। আমার ভেতরের অব্যক্ত দ্বন্দ্বটাকে ধাক্কা দিয়ে উস্কে দিচ্ছিল ‘টপ্পিড’ শব্দটা।

এমন সময় হঠাৎ মিট্টু বলে উঠল, “কাকান, মা-বাবারা চলে এসেছে।”

আমি চেয়ে দেখলাম ক্যাপ্টেনের চেম্বারের দিকে দাদা-বৌদি দাঁড়িয়ে আছে। বৌদির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট বিট্টু। ওর চোখেমুখে একটা অদ্ভুত দোলাচল। একমনে ও দু-চোখের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে চলেছে।  সাবমেরিনের আনাচ-কানাচ জুড়ে বিচরণ করে চলেছে ওর অবচেতন কৌতূহল।


(৪)


বৌদি ওর হাত ধরে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, “তোমরা এদিকে আসতেই ঘুম ভেঙে উঠে বসেছিল বিট্টু। তারপর যথারীতি বায়না জুড়ে দিল, বাইরে চলো। তোমার দাদা তোমায় ফোন করেছিল তখন। কিন্তু ফোনটা লাগছিল না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা গাড়ি থেকে নেমেই এলাম।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৌদির কথাগুলো আমার কানে যেন ফিকে শোনাচ্ছিল সেই মুহূর্তে। আমার প্রায় সবটা মনোযোগ অধিকার করে ছিল তখন বিট্টুর চাউনি। আমি দেখলাম, ও সাবমেরিনের বেড রুমে ঢুকে বার্থগুলোতে ধীরে ধীরে হাত বোলাচ্ছে। ছোট্ট মানুষ বড়োদের মতো তার অনুভূতিকে সেভাবে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না সবসময়, কিন্তু তার দু-চোখের দিকে চাইলে তার অনুভবের দোলাচল পরিষ্কার টের পাওয়া যায়। আমিও সেই চেষ্টাতে ওর দিকে একভাবে চেয়ে ছিলাম।

এমন সময় মিট্টুর ডাকে পেছন ফিরে দেখি, ও একটা বড়ো যন্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে বলছে, “এটা কী গো কাকান?”

আমি ওর দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বললাম, “স্পিড কন্ট্রোলার বোধ হয়।”

“এতগুলো ঘড়ির মতো পার্টস থাকে এতে?”

আমি ঘড়িগুলোর দিকে চেয়ে বললাম, “স্পিড কন্ট্রোলারকে জলের তাপ, চাপ, গতি, আরও অনেক ভেক্টরের উপর নির্ভর করে কাজ করতে হয়। তাই বোধ হয়…”

এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এল সেই পরিচিত কথাটা, “কাকান, টপ্পিড!”

আমি মুহূর্তে চমকে গিয়ে পেছনদিকে চেয়ে দেখি, বিট্টু একটা ছোট্ট অন্ধকার চেম্বারের মধ্যে বসে ডানহাতের তর্জনী দিয়ে দেখাচ্ছে একটা বড়ো কামানের গোলার মতো লোহার তৈরি বস্তুকে। যার ছবি ও পরিচয় আমি আগে গুগল থেকেই পেয়েছিলাম। তা হল সাবমেরিনের শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করার অস্ত্র, টর্পেডো।

আমি আর মিট্টু একসঙ্গে ছুটে গেলাম তখন ওর দিকে। একরকম জোর করেই ওকে ওই জায়গা থেকে বের করে আনলাম আমি। দাদা-বৌদি ততক্ষণে চলে এসেছিল সেখানে। বৌদি বেশ উদ্বিগ্ন হয়েই বলছিল, “কী হয়েছে? কোনোকিছু দেখে বিট্টু আবার ভয় পেয়েছে নাকি?”

আমি বিট্টুকে কোলে তুলে নিয়ে ওর গালে আদর করে দিয়ে বললাম, “না না, আর কোনো ভয় নয়। বিট্টু আমাদের সাহসী ছেলে। কী, তাই না বিট্টুবাবু?”

বিট্টুর প্রশান্ত মুখটা যেন আমায় নীরবে ইতিবাচক আশ্বাস দিল।


(৫)


সাবমেরিন থেকে নেমে মিট্টু জুতোজোড়া খুলেই দৌড়ে গেল সমুদ্রের দিকে। একটা চ্যাপ্টা পাথরের উপর উঠে বসে আমায় বলল, “ছবি তোলো কাকান।”

পেছনে অস্তাচলের সূর্যকে রেখে আমি ক্যামেরার লেন্স ঠিক করছিলাম তখন। এমন সময় আমার টি-শার্ট ধরে টান দিল একটা ছোট্ট হাত। চেয়ে দেখি বিট্টু। বিট্টুকে সমুদ্রের কাছে যেতে দেখে সে মুহূর্তে আমার সঙ্গে দাদা-বৌদিও সমানভাবে অবাক হল। আমি নিচু হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বিট্টুর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললাম, “বিট্টুবাবু, কাকানের সঙ্গে সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে তো?”

বিট্টুর দু-চোখ তখন দিগন্তবিস্তৃত নোনা জলরাশির দিকে। সেদিকে চেয়েই হালকা করে মাথাটা বাঁদিকে হেলিয়ে মুচকি হাসল ও। আমি তৎক্ষণাৎ এদিক ওদিক চেয়ে একজনকে ডেকে হিন্দিতে বললাম, “দাদা, আমাদের একটা ছবি তুলে দিন না!”

তারপর দাদা-বৌদির দিকে ফিরে তাড়াতাড়ি আমাদের দিকে আসার জন্য ইশারা করলাম।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল


No comments:

Post a Comment