ছোটো গল্পঃ দুয়োরানির দেশে - অনিরুদ্ধ সেন



দুয়োরানির দেশে


অনিরুদ্ধ সেন



বিল্টুর স্কুলে সেদিন কীসের যেন ছুটি। ঘরে বসে মোবাইলে গেম খেলতে খেলতে বোর হচ্ছে। কিন্তু ফোনে বা চ্যাটে স্কুলের বন্ধুদের পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই যেন ছুটি উপভোগ করতে কাকভোরে উঠেই ঘর ছেড়ে বেপাত্তা হয়ে গেছে। তার চেয়ে বরং কিছুক্ষণ হাত-পা খেলিয়ে আসা যাক। কাজের মাসিকে, ‘আমি একটু মাঠে যাচ্ছি’ বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে সে ধাঁ করে বেরিয়ে গেল।

বেরোলেই তো হল না। তার ছুটি বলে তো পাড়ার সব স্কুল ছুটি নয়। এখন বেলা এগারোটার সময় আর কাকে পাবে! বিল্ডিং কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে একটু ভেবে বিল্টু পাশের পার্কে গিয়ে হাজির হল। সেখানে বেশ বড়ো বড়ো কয়েকটা গাছ। তার একটার তলায় বসে ভাবতে লাগল, এবার কী করা যায়।

কিছুদিন আগে সে কাকুদের সঙ্গে মুম্বই ঘুরে এসেছে। মেরিন ড্রাইভ, চৌপাট্টি, জুহু, এলিফ্যান্টা, আরও কীসব যেন দেখে অজস্র সেলফি তার মোবাইলে বন্দি করেছে। ওগুলোর বাছা বাছা কিছু ফেসবুকে আপলোড করে বন্ধুদের তাকও লাগিয়ে দিয়েছে।

হঠাৎ তার মাথায় এল, আজ একটা নতুন ধরনের সেলফি তুলবে। পাহাড়, সমুদ্র আজকাল ফেসবুকের কল্যাণে পুরনো হয়ে গেছে। পার্কে এখন বিশেষ লোক নেই। ওই যে ঝাঁকড়া গাছটা, ওর মাথায় উঠে কলকাতার এই এলাকাটার একটা চমৎকার ভিউ পাওয়া যাবে। কিছু ফটো তুলে নেওয়ার পর সে গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় নিজের একটা সেলফি তুলে ক্যাপশন দেবে ‘মানুষ কি সত্যিই গাছ থেকে নেমে আসতে পেরেছে?’

প্রথম অংশটা ফ্যান্টা উতরোল। বিশ-ত্রিশ ফুট উঁচু একটা ডালে বসে সে চারপাশের গোটা দশেক ফাটাফাটি স্ন্যাপ নামাল। দুটো ফেসবুকে আপলোডও হয়ে গেল। এবার গাছে ঝুলতে ঝুলতে নিজের একখান। সেটাও হয়ে যেত। কিন্তু বাদ সাধল গাছের ডালের একটা কাকের বাসা। এক সন্দেহজনক প্রাণী এসেছে খবর পেয়েই একটা কাক তার মাথার ওপর বিপজ্জনকভাবে উড়তে লাগল, যেকোনও সময় ঠোক্কর বা নখের আঁচড় দেবে। সেদিকটা সামলাতে গিয়ে বিল্টুর হাত থেকে মোবাইলটা গেল ফসকে। সেটা ধরতে গিয়ে আরও বড়ো বিপদটা হল, টাল সামলাতে না পেরে তার হাত গেল ডাল থেকে পিছলে আর একটা ঘুরপাক খেয়ে সে তিরবেগে ফুট ত্রিশেক নিচের মাটির দিকে ধেয়ে গেল। যে সংক্ষিপ্ত সময়টুকুতে হুঁশ ছিল, তার মাথায় বিদ্যুতের মতো খেলে গেল–সেলফি শহিদের সংখ্যা একটি বাড়ল। তারপরই সব অন্ধকার।

***

হুঁশ ফিরলে বিল্টু চারদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল সে কোথায়। একটু আগে কী হয়েছিল, সেটা তার ধীরে ধীরে মনে পড়ছে। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এখন কোথায় আছে। সে পার্কের একটা গাছের ডাল থেকে পড়ে গিয়েছিল। এখন স্পষ্টতই সেখানে নেই। কিন্তু সে নিজের অথবা অন্য কারও বাড়িতে, এমনকি হাসপাতালের বিছানাতেও নেই। নেড়েচেড়ে দেখল, হাত-পা ঠিকঠাক আছে। আর সে শুয়ে আছে এক অজানা বাগানের মতো জায়গায়। আশেপাশে কোনও মানুষজন দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কিছু গলার আওয়াজ কানে আসছে। আর শোনা যাচ্ছে কিছু মিষ্টি গানের সুর।

‘তাহলে কি আমি মরে গেছি? এটা স্বর্গ, না নরক?’ সে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, অতৃপ্ত আত্মারা নাকি স্বর্গ, নরক কোথাও যায় না। তারা ভূত হয়ে পৃথিবীর হাওয়ায় ঘুরে বেড়ায় যতক্ষণ না বাসনার তৃপ্তি হয়। সেও তো সেলফি তোলার ইচ্ছে পূর্ণ হওয়ার আগেই পড়ে গিয়েছিল। তবে কি সে ভূতেদের রাজ্যে হাজির হয়েছে?

ভাবছে, এমন সময় কানে এল এক ক্যাঁচর-কোচর আওয়াজ। দেখে, তার মায়ের বয়সী এক মহিলা একটা রিকশাগোছের গাড়িতে করে তার কাছাকাছি এসে নেমে দাঁড়ালেন।

“ও, তুমিই আজ এসেছ?” তিনি নিবিষ্টভাবে বিল্টুকে দেখতে দেখতে বললেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু এটা কোন জায়গা?”

মিষ্টি হেসে বললেন মহিলা, “এটা দুয়োরানির দেশ। দুয়োরানি কাদের বলে জানো তো?”

বিল্টু ঘাড় নাড়ল, “হ্যাঁ। আগেকার দিনে রাজাদের অনেক রানি থাকত। তাদের মধ্যে একজন থাকত সুয়োরানি, যে হত রাজার খুব আদরের। আর বাকিরা...”

“সব দুয়োরানি। তাদের হেলায়-ছেদ্দায় দিন কাটত।”

“রাজাদের কিন্তু এ ভারি অন্যায়। হেলা-ছেদ্দাই যদি করবে, তবে রানি করে আনা কেন?”

“এবার তুমি ব্যাপারটা ঠিক বুঝে গেছ। তোমাদের পৃথিবীতেও এমন অনেক জিনিস আছে যা তোমরা কেন বা তৈরি করো, তারপর অবহেলায় ফেলে রাখো? সেগুলো কালক্রমে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আমরা সেইসব ‘দুয়োরানি’দের পরম যত্নে এখানে নিয়ে এসে সাজিয়ে রাখি, তাদের কদর করি।”

সন্ধিগ্ধ দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকিয়ে বিল্টু বলল, “কিন্তু তুমি কে?”

“আমি এখানকার একজন মামণি। এরকম আরও অনেকে আছেন। আমরা এই সুন্দর দেশটা দেখাশোনা করে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখি, যাতে কোথাও কোনও দুঃখ জমা না হতে পারে। তুমি আমাকে ফুলদিদি বলে ডাকতে পারো।”

“কিন্তু আমি এই দুয়োরানির দেশে কেন এলাম আর কীভাবেই বা এলাম?”

একটু দ্বিধার পর ফুলদিদি বললেন, “সেসব সময়মতো জানবে।”

“আমি কি মরে গেছি?”

তার মাথায় হাত বুলিয়ে ফুলদিদি বললেন, “বালাই ষাট, অমন কথা মুখেও এনো না। আমাদের এখানে সবাই জিয়ন্ত। তা চলো, এবার তোমাকে আমাদের দেশ দেখাই। দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে না, কী কী হেলাফেলার দুয়োরানিকে আমরা এখানে এনে সাজিয়ে রেখেছি?”

“হ্যাঁ, তা তো হচ্ছেই। তবে...”

“বুঝেছি।” মহিলা বিল্টুর গাল টিপে বললেন, “বিল্টুবাবুর খিদে পেয়েছে, তাই না? তা তো পাবেই, সেই কোন সকালে দুটি মুখে দিয়েছ। বেশ, সে ব্যবস্থাও হবে।”

একটু লজ্জা পেয়ে বিল্টু বলল, “আমি এখন ক্লাস এইটে। অত বাচ্চা নই যে আমার গাল টিপে দেবে।”

“ও, তাই বুঝি?” ফুলদিদি অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, “তাহলে আই অ্যাম ভেরি সরি। এবার তো যাবে?”


খাওয়াদাওয়া মন্দ হল না। তবে চাইনিজ, মোগলাই নয়। ঠাকুমার কাছে গেলে যেসব নরম, ঠাণ্ডা খাবার বানিয়ে দেয়, তেমন কিছু। খিদে পেয়েছিল, বিল্টু তৃপ্তি করে খেল। তারপর বলল, “তুমি?”

“আমি তো খেয়ে বেরিয়েছি। তা, এখন একটু বিশ্রাম করবে? অনেক তো ধকল গেছে। নাকি...”

“না না, আমার বেশি সময় নেই। চলো, কী দেখাবে।”

“বেশ, চলো। কিন্তু অত তাড়া কীসের? এসেছ যখন, ক’টা দিন থেকেই যাও না।”

“আরে, কাল আবার স্কুল আছে না? নাও, আজকের মধ্যেই কী কী দেখাবে দেখিয়ে দাও।”

ফুলদিদি যেন একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে বললেন, “এহ্‌, আজই ফিরবে? বেশ, সে দেখা যাবে। তবে তোমার যখন তাড়া আছে, চলো আগে তোমার চেনা জিনিসগুলি দেখিয়ে দিই।”

ফুলদিদি এরপর একটা মোবাইলের মতো যন্ত্রে কীসব যেন দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তারপর তিনি বিল্টুকে নিয়ে ওই অদ্ভুত রিকশাগোছের গাড়িটাতে উঠলেন। গাড়িটা উনি নিজেই কীসব বোতাম টিপে চালাচ্ছেন।

একটু দূরে যাওয়ার পর দেখা গেল, সারি সারি ছোটো ছোটো বাড়ি। হাতের যন্ত্রটার সাথে কী মিলিয়ে নিয়ে তিনি বিল্টুকে তার একটার সামনে দাঁড় করালেন।

বাড়িটা অদ্ভুত। হঠাৎ দেখলে মনে হবে একটা ছোটো মিউজিয়াম। ভেতরে ঢুকে সামনের কাউন্টারে বসা একটি ছেলেকে হেসে হাত নেড়ে তিনি বিল্টুকে নিয়ে একটা ঘরে ঢুকলেন। তারপর বিল্টুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে ঘরের একপাশে রাখা ট্যাবের মতো একটা যন্ত্রে কীসব যেন করতে লাগলেন। একটু পরে ঘর এক গানের সুরে ভরে উঠল।

“বাহ্‌, বেশ তো সুরটা।” বিল্টু একটু ভেবে বলল, “মন্দ নয়। তবে আগে শুনেছি বলে তো মনে পড়ে না।”

“এটা শুধু সুর। এর গানটা তুমি মোবাইলে ডাউনলোড করেছ এমন আরও কয়েকশো গানের সঙ্গে।”

“হ্যাঁ, আমি তো সেসব মাঝে মাঝে শুনি। এটা বোধ হয় শোনা হয়নি।”

“তুমি মোটামুটি দশটা গান ডাউনলোড করলে একটা শোনো। বাকিগুলি তো অবহেলায় পড়ে থাকে, তাই না?”

“তাই তো স্বাভাবিক। সব গান কি শোনা যায়? অত টাইম...” বলতে বলতে বিল্টু থেমে গেল। দেখল, ফুলদিদির মুখে মুচকি হাসি। বুঝল, উনি এবার বলবেন, ‘তাহলে ডাউনলোড করো কেন?’ একটু ভেবে সে তাই বলল, “ও, তাই এইসব দুয়োরানিদের তোমরা এখানে নিয়ে এসেছ?”

“বুদ্ধিমান ছেলে, ঠিক ধরে ফেলেছ।” ফুলদিদি বললেন, “তোমাকে একটা ছোট্ট গল্প শোনাই। তোমার ঠাকুমার গল্প।”

“ঠাকুমাকে তুমি চেনো?” বিল্টু উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। ঠাকুমা তার খুউব প্রিয়।

“হ্যাঁ, সে তো চিনতেই হয়। তা, উনি ছোটবেলা থেকেই গান খুব ভালোবাসতেন। ওস্তাদি গান-টান নয়, এই ধরো তখনকার আধুনিক গান। কিন্তু তখন কম্পিউটার, ডিভিডি কেন, টিভিই ছিল না। টেপ রেকর্ডারও ছিল দুর্লভ আর দামি। সাধারণ মানুষের গান শোনার জন্য ছিল শুধু গ্রামোফোন রেকর্ড আর ইলেকট্রিসিটিতে চলা রেডিও। তা, ঠাকুমার গরিব মা-বাবা সেসব আর পাবেন কোথায়? উনি তাই পাশের এক নামকরা ডাক্তারবাবুর বাড়িতে যখন রেডিওতে গান হত, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে সেগুলি শুনে সুরগুলি রপ্ত করতেন। তখন পুজোর সময় নতুন সব গানের রেকর্ড বেরোত। সেসবের কথাগুলি নিয়ে গানের বইও বিক্রি হত। উনি টিফিনের পয়সা জমিয়ে তার একটা কিনে নিতেন আর–বিশ্বাস করতে পারো, ওইভাবে শুনে আর পড়ে প্রায় পঞ্চাশটা গানের প্রত্যেকটা গলায় তুলে নিতেন? অনেক কষ্ট করে তাঁকে গান যোগাড় করতে হত। তাই প্রতিটি গানকেই তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। সেই ভালোবাসা এখনও অটুট আছে।”

“হ্যাঁ, ঠাকুমা তো এখনও সবসময় গুনগুন করে গেয়ে যায়।”

“বেশ, এবার চলো তোমাকে আরেকটা ঘরে নিয়ে যাই। ওখানে ছবি।”

ফুলদিদি এবার যেখানে নিয়ে গেলেন, সেখানে একটা টিভি স্ক্রিনের মতো পর্দায় একটা ছবি ফুটে আছে। একটু পরে সেটা বদলে গেল। আর বিল্টু অবাক হয়ে বলল, “আরে, এটা তো মুম্বইয়ের! আমি কিছুদিন আগে ওখানে গিয়ে এই মেরিন ড্রাইভেই কত ফটো তুলেছি।”

“কেমন লাগছে ছবিটা?”

“দারুণ! দেখো, কী সুন্দর দূরে সূর্য অস্ত যাচ্ছে আর তার পাশেই যেন একটা জাহাজ ভাসছে।”

“বিল্টুবাবু, আমি রংটা একটু পালটে দিয়েছি, কিন্তু এই ফটোটা তুমিই তোমার মোবাইলে তুলেছিলে।”

“তাই নাকি?” বিল্টু অবাক হল, “ওহ্‌, তারপর বোধ হয় ভুলে গেছি।”

“এটা কি ফেসবুকে আপলোড করেছিলে?”

“না তো। আসলে...”

“আসলে এটাতে তুমি নেই। তাই ভেবেছিলে বন্ধুরা তাহলে তত লাইক দেবে না, তাই না?”

বিল্টু লজ্জা ঢাকতে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “হ্যাঁ, তুমি তো সব জানো! আমি কি সেলফি ছাড়া অন্য ফটো আপলোড করি না, নাকি?”

“করো, ওই দশটায় একটা। আর যে ক’টা ফটো তোলো, তার প্রতি চারটের মধ্যে তিনটেই তোমার মোবাইলে পড়ে থাকে। তারপর তুমি ভুলে যাও বা একসময় ডিলিট হয়ে যায়।”

বিল্টু গম্ভীর মুখে বলল, “ওহ্‌, আর তাদের তোমরা এখানে এনে অনেক পরিশ্রম করে বাঁচিয়ে রাখো, তাই না?”

“কী করব? অসুখী আত্মার মতো তারা গুমরে গুমরে কেঁদে মরুক, এ তো আমরা দেখতে পারি না। তা, এবার আমি তোমাকে আরেকটা গল্প বলব। তোমার বড়ো মামার গল্প।”

“জানি। মামা ফাটাফাটি ফটো তুলত। জানো, শুধু সাদা আর কালো ফটো। কিন্তু কী অপূর্ব সেগুলো! সব মামার স্টুডিওয় সাজানো আছে।”

“ঠিক বলেছ। তবে তুমি যা জানো না তা হচ্ছে তাঁর সময় মোবাইল বা ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল না। কিন্তু শুধু ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফোটোগ্রাফির জন্য তিনি অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে একটা দামি ক্যামেরা কিনেছিলেন। তখন ফটো উঠত সেলুলয়েড ফিল্মে, যা ডার্ক রুমে ডেভেলপ করে ফটোর প্রিন্ট তৈরি করা হত। মামার নিজস্ব ডার্ক রুম, ফটো ডেভেলপ করার ব্যবস্থা ছিল। প্রচুর পড়াশোনা করে নানা রাসায়নিক পদার্থ সূক্ষ্ম অনুপাতে মিশিয়ে তিনি ফটোয় অসাধারণ সব শেড আনতেন, বিশেষ করে বনজঙ্গলের ফটোতে। তখন একটা ফটো নষ্ট হয়ে যাওয়া মানে একটা ফিল্ম নষ্ট হয়ে যাওয়া। মামা প্রথমদিকে আনাড়িপনায় কিছু ফটো নষ্ট করে ফেলতেন বটে, কিন্তু একবার হাত পাকা হওয়ার পর তিনি বলতে গেলে একটা ফিল্মও নষ্ট করেননি। অনেক পরিশ্রম করে, মাথা খাটিয়ে, অ্যাডজাস্টমেন্ট করে তবেই শাটার টিপতেন। আর এখন তো তোমরা প্রত্যেক ছবিতে নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটার জায়গায় দু-তিনটে শট নাও।”

বিল্টুর মনটা ভারী হয়ে আসছে। সে উদাসভাবে বলল, “চলো, আর কী দেখাবে।”

“দেখাব না, এখানেও আবার শোনাব।” বলে ফুলদিদি বিল্টুর কানে আর একটা যন্ত্র লাগিয়ে দিলেন। আর বিল্টু শুনতে পেল একটি ছেলে বলে যাচ্ছে, “আমার না, মন খুব খারাপ। কেন জানিস?”

তারপর শুনল আরেকজন বলছে, “আজ ফেসবুকে রোনাল্ডোর একটা ফ্যান্টা ছবি পেয়েছি। বন্ধুদের ট্যাগ করেছি, তোকেও।”

প্রথমজন আবার বলছে, “জানিস আমি একটা ছবি এঁকেছিলাম। একটা নদী, তার তীরে একটা ঝাঁকড়া গাছ, তাতে একটা পাখি। কিন্তু ছবিটা কাউকে...”

“এই, কাল ছুটির পর মলে যাবি? পিৎজা বা বার্গার খাব। অনেকদিন যাওয়া হয়নি।”

“তোকে ওই যে ছবিটার কথা বলছিলাম...”

“ও, কী যেন বলছিলি? ঠিক আছে, কাল কিন্তু টাকা নিয়ে আসিস।”

কিছুক্ষণ শোনার পর বিল্টু চিন্তিতভাবে বলল, “চেনা চেনা মনে হচ্ছে, কিন্তু কে কে কথা বলছে ঠিক বুঝতে পারছি না।”

“গলার স্বরগুলো আমি ইচ্ছে করে একটু পালটে দিয়েছি। কিন্তু কথাগুলো তো মনে থাকা উচিত ছিল। এগুলো তোমার আর তোমার বন্ধু তিমিরের মোবাইলে বাতচিত।”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেইজন্যেই মনে হচ্ছিল...”

“চেনা চেনা। কিন্তু মাত্র গত সপ্তাহে যে কথাগুলো তোমরা বলেছিলে, সেগুলো সব ভুলে গেছ? আর ভালো করে লক্ষ করো, তিমির কী বলছে, সেটাও তুমি শোনোনি। সেও হয়তো শোনেনি তোমার কথা।”

বিল্টু লজ্জিতভাবে বলল, “আসলে আমাদের ফোনে তো অনেক ফ্রি টক টাইম, তাই একটু বেশি কথা বলা হয়ে যায়। অত কথা, সব তো মনে থাকে না।”

“সেই। কথা বলা এত সস্তা হয়ে গেছে যে তার আর দাম নেই। তাই অনেক কথা হারিয়ে যায়–যে বলছে, যাকে বলছে দু’জনেরই মন থেকে।”

“আর সেগুলোকে তোমরা এখানে এনে যত্ন করে সাজিয়ে রাখো, তাই তো?” বিল্টু বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়ল।

“আচ্ছা, এবার তোমাকে শোনাব...”

ফুলদিদিকে বাধা দিয়ে বিল্টু বলল, “তুমি কী বলবে আমি বোধ হয় জানি। কিন্তু তুমি নয়, এবার শোনাব আমি।”

“তাই নাকি বিল্টুবাবু?” ফুলদিদির চোখে মুখে ফুটে উঠল অবাক খুশি, “বেশ তো, বলো।”

উদাস কণ্ঠে বিল্টু শুরু করল, “মাত্র ক’বছর আগের কথা। বাবা তখনও ছিল একজন সামান্য অফিসার। আর মা থিয়েটার করত, বাকি সময় বাড়ি থাকত। বাবা একবার বিদেশে গেল। আমরা সবাই খুব খুশি। কিন্তু কোম্পানি খরচাখরচের যে টাকা দিত তাতে সেখানে টেনেটুনে চালাতে হত। একদিন বাবা ফোন করল। মা ধরে ঠাকুমাকে দিল। তারপর ফোনে একবার ঠাকুমা কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘তুই কী খাচ্ছিস, কীভাবে থাকছিস, কত কষ্ট পাচ্ছিস!’ আর তারপরই আমি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছি, ‘বাবা, তুমি কবে আসবে?’

“তোমরা কিছু না বলে খালি কাঁদছ আর ওদিকে মানুষটার ফোনের মিটার চড়ছে।’ মার ধমকের পর আমাদের হুঁশ ফিরল আর আমরা কথা বলতে শুরু করলাম।”

“আর সেই কথাগুলি…”

“না ফুলদিদি, সেগুলি তোমার কাছে থাকবে না। কারণ এই সময় মা ফোনটা স্পিকারে দিয়েছিল আর কথাগুলির প্রতিটা অক্ষর আমার আজও মনে আছে।”

“সাবাশ!” ফুলদিদি তার হাত চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বললেন, “তাহলে আজ কেন...”

থমথমে মুখে বিল্টু বলল, “তখন তো বাবা মস্ত ম্যানেজার হয়নি, আর মাও হয়নি সেলিব্রিটি। তাদের সময় ছিল, আমার সঙ্গে কথা বলত। সেগুলোর প্রত্যেকটা শব্দ আমি মনে রাখতাম।”

ফুলদিদি কিছু বললেন না। শুধু বিল্টুর মাথায় সান্ত্বনার হাত রাখলেন।

“তুমি কিন্তু বললে না, আমি এত জায়গা থাকতে এখানে কেন এলাম। নাও, তাড়াতাড়ি বলে দাও, আমায় বাড়ি ফিরতে হবে।”

“এত তাড়াতাড়ি ফিরবে? আর একটু থেকে যাও না।”

“কিন্তু আর কীই বা দেখার আছে? হয়তো যেসব খেলনা আমি কিনে ছুঁয়েও দেখিনি অথবা যেসব প্যান্ট-শার্ট আনার পর থেকে পড়েই আছে, সেগুলো সব দেখাবে। তারপর জ্ঞান দেবে, বিল্টু, তোমার মা-বাবা কত কষ্টে ওসব পেত। আর তুমি এত পাচ্ছ যে ওগুলোর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছ না। তাই তো?”

“ওরে বাবা, বিল্টুবাবুর জ্ঞান তো টনটনে!” ফুলদিদি চোখ কপালে তোলার ভান করে বললেন, “না রে বাবু, না। আমি সেইজন্যে তোমাকে থাকতে বলিনি। এখানে তো আরও অনেক ছেলেমেয়ে আছে। তাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতাম। নিশ্চয়ই তোমার ভালো লাগত।”

“তা তো লাগত। কিন্তু কী করব বলো, আমাকে তো ফিরতেই হবে। নইলে ওদিকে সবাই আবার চিন্তা করবে। এতক্ষণে হয়তো থানা-পুলিশ করছে।”

“সেটাও একটা ব্যাপার। ঠিক আছে, চলো তোমাকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। তবে তার আগে এক গ্লাস শরবত খেয়ে যাও। তেষ্টায় তো মুখ শুকিয়ে গেছে।”

“তা খাওয়া যেতে পারে।” বিল্টু বলতে না বলতেই ফুলদিদি তাকে একটা যন্ত্রের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটা বোতাম টেপামাত্র বেরিয়ে এল এক গ্লাস সুগন্ধি শরবত। তাতে চুমুক দিতে দিতে বিল্টু বলল, “কিন্তু তুমি এখনও আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না। কেন আমি এদেশে এলাম?”

“উত্তরটা তুমি একসময় নিজে থেকেই পেয়ে যাবে।” ফুলদিদি উদাস ভঙ্গিতে বললেন।

হঠাৎ বিল্টুর ভীষণ ঘুম পেতে লাগল। কিছুতেই চোখ খুলে রাখতে পারছে না। “উহ্‌, আর জেগে থাকতে পারছি না।” বলতে বলতে সে ফুলদিদির কোলেই ঢলে পড়ল।

***

বিল্টুর চেতনা ফিরে আসছে। কিন্তু চারদিক ছায়া ছায়া। সে যেন কোথায় শুয়ে আছে। সামনে একটা ঝাপসা পর্দা, তার আড়াল থেকে কিছু কথাবার্তা ভেসে আসছে।

“দাদা যথাসাধ্য তাড়াতাড়ি কাজ বুঝিয়ে দিয়ে লন্ডন থেকে ফেরার ব্যবস্থা করছে। আর বৌদি তো আউটডোর শুটিংয়ে হিমাচল প্রদেশে, দু-চারদিন লাগবে আসতে।” বলছে একটি পুরুষ কণ্ঠ।

“যাদের দিকে ফিরে তাকাবার সময় নেই, তাদের পৃথিবীতে আনা কেন?” সখেদে বলছে আরেকটি নারীকণ্ঠ।

গলাদুটো চেনা চেনা। কিন্তু কিছু দেখতে পাচ্ছে না কেন? ভাবতে-ভাবতেই যেন বিল্টুর চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা দ্রুত গুটিয়ে যেতে লাগল আর সে অবশেষে স্পষ্ট দেখতে পেল, সামনে বসে আছেন কাকু আর ঠাকুমা।

“বিল্টু চোখ মেলেছে!” কাকু খুশিতে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।

সেদিকে তাকিয়ে ঠাকুমাও উদ্ভাসিত মুখে কপালে হাত ঠেকিয়ে কাকে যেন কৃতজ্ঞতা জানালেন।

“আমি কি হাসপাতালে?” বিল্টু কোনোমতে বলল।

“হ্যাঁ রে। দাঁড়া, আমি ডাক্তারবাবুকে বলে আসি তোর জ্ঞান ফিরেছে।” কাকু ধাঁ করে বেরিয়ে গেলেন।

একটু পরেই একজন ডাক্তারবাবু এসে ঢুকলেন। বিল্টুর দিকে চেয়ে খুশি খুশি মুখে বললেন, “আমি আগেই বলেছিলাম, ওর বিশেষ কিছু হয়নি। শুধু ছোটোখাটো চোট লেগেছে। আর শক পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ইট’স আ মিরাকল। কিন্তু ঠিক ওই গাছটার পাশেই আরেকটা গাছ লাগাবার জন্য মালিরা মাটি খুঁড়ে রেখেছিল। সেই ঝুরো মাটির ওপর পড়ার ফলে ও বেঁচে গেল।” তারপর উনি বিল্টুর দিকে ফিরে বললেন, “কিন্তু আর অমন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সেলফি তুলতে যেও না, কেমন?”

“আপনি কী করে...” বিল্টু হঠাৎ আঁতকে উঠল, “আমার মোবাইল?”

“সেটারও ক্ষতি হয়নি। খোয়াও যায়নি। ওই মালিরাই সেটা তোমার সঙ্গে নার্সিং হোমে পৌঁছে দিয়েছে। সেটা তোমার কাকুর কাছে আছে। কিন্তু বলতেই হবে, তোমার পড়ে যাওয়ার যা ফ্যান্টাস্টিক একটা ভিডিও উঠেছে না! আমি কিন্তু ফেরত দেওয়ার আগে ওটা আমার নাম্বারে ফরোয়ার্ড করে দিয়েছি।”

বিল্টুর মুখে তৃপ্তির হাসি। যাওয়ার আগে ডাক্তারবাবু কাকুকে বললেন, “আর একে একটু চোখে চোখে রাখবেন, কেমন?”

কাকু ইতস্তত করে বললেন, “আসলে আমরা তো একসঙ্গে থাকি না। এ আমার ভাইপো। খবর পেয়ে আমরাই আগে ছুটে এসেছি।”

কঠোর মুখে বললেন ডাক্তারবাবু, “তাহলে ওর অতিব্যস্ত বাবা-মাকে বলবেন যেন ছেলের জন্য একটু বেশি সময় দেন। নইলে...”

ডাক্তারবাবু চলে গেছেন। কাকুও কীসব ওষুধপত্র আনতে গেলেন। বিল্টু এবার ঠাকুমাকে হাতছানি দিয়ে কাছে আসতে বলল। এমন অনেক কথা আছে যা সবাইকে শোনানো যায় না।

ঠাকুমা চেয়ারটা একটু কাছে টানার পর বিল্টু বলল, “জানো ঠাকুমা, আমি আজ দুয়োরানির দেশে গিয়েছিলাম।”

ঠাকুমার ভুরুটা একটু কুঁচকে গেল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, “ও, তাই বুঝি? তা সেটা আবার কেমন দেশ?”

“যেসব জিনিস আমরা জড়ো করি কিন্তু তারপর আর ফিরেও দেখি না, দুয়োরানির দেশের মামণিরা সেগুলোকে তাদের দেশে নিয়ে গিয়ে একত্র করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখেন, যাতে সবাই তাদের দেখে খুশি হয়।”

“ও, তাই নাকি? দারুণ ব্যাপার তো! আমারও যে সেখানে একবার যেতে ইচ্ছে করছে।”

“যাবে?” বিল্টু উৎসাহে প্রায় উঠে বসল। তারপর আবার একটু বিষণ্ণভাবে বলল, “কিন্তু সে দেশটা কোথায় তাই যে জানি না। তুমি কিছু শুনেছ?”

“না রে দাদা। কে জানে, হয়তো সেটা আছে আমাদেরই মনের ভেতর।”

দু’জন কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বিল্টু ডাকল, “ঠাকুমা?”

“কী, দাদা?”

“আমি কিন্তু দুয়োরানি হব না। আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অনেক বড়ো হব। সবাই আমাকে চিনবে।”

“এই তো মানুষের মতো কথা।” ঠাকুমা বিল্টুর পিঠে হাত রেখে বললেন, “একদিনেই আমাদের বিল্টু কত বড়ো হয়ে গেছে।”

“সে তো ওই দুয়োরানির দেশ ঘুরে এসে।”

“সেসব গল্প আমায় বলবি না?”

“হ্যাঁ।” একটু ভেবে বিল্টু বলল, “কিন্তু এখন একটু আলিস্যি লাগছে। তার চেয়ে তুমিই একটা গান শোনাও না! তুমি তো অনেক অনেক পুরনো গান জানো।”

“তুই কীভাবে জানলি রে?” ঠাকুমার মুখে অবাক খুশির হাসি।

“ওই, ফুলদিদির কাছ থেকে। নাও, এবার শুরু করো।”

ঠাকুমা বিল্টুর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে গুনগুনিয়ে একটা গান ধরলেন। শুনতে শুনতে বিল্টু ধীরে ধীরে আবার তৃপ্তির ঘুমে তলিয়ে গেল।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ


1 comment:

  1. এক টুকরো ছোটবেলা। অসাধারণ। লেখককে ধন্যবাদ। নতুন লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete