অতীতের আয়নাঃ ইতিহাসের রহস্য - অর্ঘ্য দে

ইতিহাসের রহস্য

অর্ঘ্য দে 



ইতিহাস শুধু তথ্য বা ঘটনার পঞ্জিকা নয়। অনেক সময়ই আমাদের সামনে আসে বেশ কিছু রহস্য। এই ‘রহস্য’ শব্দটার মধ্যে অদ্ভুত একটা টান আছে, তাই না! শুনলেই মুহূর্তে আমরা সচেতন হয়ে যাই। শিরদাঁড়া টানটান করে বসি। শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে ইতিহাস অনেক সময় এমন কিছু রহস্যজনক ঘটনা আমাদের সামনে নিয়ে আসে যার সব রহস্যের সমাধান হয়নি। এমনই কিছু ঐতিহাসিক অথচ রহস্যময় ঘটনার কথা বলব যে ঘটনাগুলোকে অলৌকিক বললেও ভুল হবে না।


কোথায় গেল ‘নবম লিজন’


‘লিজন’ শব্দের অর্থ বিরাট সংখ্যার অশ্বারোহী সৈন্যদল। সংখ্যাটা ৩০০০ থেকে ৬০০০ হয়ে থাকে। রোমান অশ্বারোহী ‘নবম লিজন’-এ ছিল ৫০০০ সাহসী সেনা। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টমের পাশাপাশি এই নবম সেনাদলের প্রশিক্ষণ চলত। বংশানুক্রমে যার দায়িত্বে ছিলেন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার।

খুব বিস্ময়করভাবে এই ‘নবম লিজন’ চিরতরে হারিয়ে যায় ইতিহাসের পাতা থেকে। এমনকি ঘটনার এতকাল পরেও ঐতিহাসিকরা এই নবম লিজন-এর কোনো হদিশ পাননি। রোমান সেনাবাহিনীর রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে গল্পে বা অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত মত প্রকাশেও ভেদ রয়েছে।

১৯৫৪ সালে রোসমেরি সাটক্লিফের লেখা শিশুপাঠ্য উপন্যাস ‘দি ঈগল অফ নাইন্‌থ’-এর মতে এই বাহিনী ক্যালিডনিয়া বর্তমান স্কটল্যান্ডে অগ্রসর হয় ১০৮ খ্রিস্টাব্দে। তারপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে অনেক ঐতিহাসিক পণ্ডিতের মতে ইংল্যান্ডের প্রবল ঠান্ডা, মধ্যপ্রাচ্যের শুষ্ক ভূমি কিংবা পার্থিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধে নাকি কালের অধ্যায় থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এই ‘নবম লিজন’।



আশ্চর্য লিপি রংগোরংগো কোড


প্রাচীন গুহাচিত্র, শিলালিপি থেকে ইতিহাসের নানা অজানা তথ্য আবিষ্কৃত হয়। তবে অনেক শিলালিপি বা ভাষা সাংকেতিক লিপি বিশারদ, ঐতিহাসিক বা নৃতত্ত্ববিদেরাও পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হন না। এমনই এক লিপি হল রংগোরংগো কোড।

১৮৬৮ সালে ইস্টার আইল্যান্ডে (মার্টিন) তিহাটির বিশপ আচমকাই এই লিপি বা কোড খুঁজে পান। হায়রোগ্লিফিক ভাষায় কাঠের ফলকে লেখা এই কোড। একশো কুড়িটি প্রাথমিক গ্লিফস আছে এতে। পাঁচশো অন্যান্য গ্লিফস। এই ধরনের সূক্ষ্ম লিপিতে যে ভাষা ব্যবহৃত হত, সেগুলি সম্পূর্ণ নতুন এক ভাষা। ৩০০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বে পলিনেসিয়ানরা যেখানে বসতি গড়ে তোলে তার নাম ছিল ইস্টার আইল্যান্ড। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সেখানে ভূ-সম্পদের অভাব দেখা দেয়। ফলে আস্তে আস্তে জনসংখ্যা হ্রাস পায়। বিশপ এই লিপি পাঠোদ্ধারের জন্যে কোনো উপযুক্ত ব্যক্তি পাননি। কারণ, এখানকার লোকজন রোগ এবং দাসত্বের কবলে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মনে করা হয় এই লিপি জীবন ও অভিজ্ঞতার কথা বোঝাত। কিন্তু কখন এই লিপি লেখা হয় তা কেউ জানে না। ঐতিহাসিকদের অনুমান যে ইউরোপিয়ানদের আবির্ভাবের পূর্বেই নাকি এই লিপি লেখা হয়।

সবচেয়ে মজার আর বিস্ময়কর ব্যাপার হল, এই লিপির সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার লিপির অনেক মিল পাওয়া গেছে। যদিও প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতার পাঁচশো বছর পর এই লিপি লেখা বলে মনে করা হয়।



ঠিক কোথায় আছে চিঙ্গিজ খাঁর কবর


ইলতুৎমিসের সময়কালে ১২২১ খ্রিস্টাব্দে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার নানা রাজ্য জয় করেন মোঙ্গল নেতা চিঙ্গিজ খাঁ। ভারতের সিন্ধু আর পশ্চিম পাঞ্জাব লুট করেন। এহেন পরাক্রমশালী মোঙ্গল নেতার জীবনের মতোই মৃত্যুও সমান কৌতূহলোদ্দীপক। তাঁর মৃত্যুর আগে সেনার মুখে খবর ছড়ায় যে তাঁকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গোপনে তাঁকে কবর দেয়া হয়। কেউ কেউ এই কবরস্থান খুঁজতে গেলে তাঁর সেনার হাতে মারা যান।

এখনো অবধি কেউ জানে না ঠিক কোথায় তাঁকে কবর দেয়া হয়েছিল। আর্কিওলজিস্টরা অবশ্য এসব ঘটনায় নিরাশ হননি। চিঙ্গিজ খাঁর প্রাসাদ দেখে বরং তাঁদের তাঁর কবর খোঁজার ইচ্ছে শতগুণ বেড়ে গেছে।

শুধু আর্কিওলজিস্টরাই নন, সাধারণ মানুষও চিঙ্গিজ খাঁর কবরের ব্যাপারে সমান আগ্রহী। এমনই কিছু আগ্রহী লোকজনদের নিয়ে এক মার্কিন আইনজীবী একটি দল করেন। চিঙ্গিজ খাঁর কবরের সন্ধান পেতে তাঁরা ষাটটি কবর খোঁড়েন। কিন্তু রহস্য রহস্যই থেকে গেছে। কবরের সঠিক জায়গা আজও অনাবিষ্কৃত।

তবে কবরের আসল সন্ধানে লোকজনের আগ্রহের আরেকটি কারণ অবশ্য আছে। শোনা যায় চিঙ্গিজ খাঁর কবরে যে সম্পদ আছে তা নাকি অনন্য। যদি চিঙ্গিজ খাঁর কবর খুঁজে পাওয়া যায়, যদি ইতিহাসের নতুন কোনো তথ্য উঠে আসে সেই কবর থেকে... আর্কিওলজিস্টরা আজও সেই সন্ধানে।



হারিয়ে যাওয়া নাবিকদল


ক্যাপ্টেন মোরহাউস তার ‘ডে গ্রাটিয়া’ নামক পোতটিকে নিয়ে আসছিলেন। ঠিক সেই সময় বিস্ময়জনকভাবে চিহ্নিত করেন ‘ম্যারি সিলেস্টি’ নামক অন্য একটি জলযানকে যেটি নিউ ইয়র্ক বন্দর থেকে রওনা দিয়েছিল ডে গ্রাটিয়ার আটদিন আগে। সাল ১৮৭২-এর ৭ই নভেম্বর। ততদিনে ম্যারি সিলেস্টির ইতালির জেনয়া বন্দরে পৌঁছে যাবার কথা। জাহাজটিতে মোরহাউস বোর্ডিং দল পাঠান তল্লাশি করার জন্য। এরপর সেই দলটি ফিরে এলে এক আশ্চর্যকর খবর পেলেন। জাহাজটির ছিল খারাপ আবহাওয়ার শিকার এবং জলমগ্ন। কিন্তু অবাক ব্যাপার হল জাহাজটির মালপত্র, তল্পিতল্পা এবং পানীয় অক্ষত। যদিও সেখানে লাইফ বোট পাওয়া যায়নি এবং নাবিকদলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ম্যারি সিলেস্টির দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন স্পুনার ব্রিগস। তিনিও সেই হারিয়ে যাওয়া সাত নাবিকদের সঙ্গেই সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁর স্ত্রী এবং দু’বছর বয়সী মেয়ে। তাঁরা যে শুধু জাহাজটি থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছিলেন তাই নয়, কেউ কোনোদিন তাঁদের সম্বন্ধে আর কোনো খবর পাননি।

এইভাবেই ম্যারি সিলেস্টির হারিয়ে যাওয়া আজ অবধি এক দীর্ঘ অমীমাংসিত সমুদ্র-রহস্য হয়েই থেকে গেছে। তবে জাহাজটির অন্তর্ধান নিয়ে অনেক জল্পনা বা মনগড়া কথা শোনা যায়। জল্পনার সেই সারিতে যেমন আছে জলদস্যুর আক্রমণের কথা, তেমনই আবার আছে সমুদ্রের দৈত্যর আবির্ভাবের প্রসঙ্গ। যাদের কারণেই নাকি হারিয়ে যায় ম্যারি সলেস্টি। এমনও কথিত আছে, জাহাজটিতে ভ্রমণ করছিল কোনো সিরিয়াল কিলার। নাবিকরা সমস্ত পানীয় শেষ করে বিদ্রোহ শুরু করে, তার ফলে হারিয়ে যায় ম্যারি সিলেস্টি।

এখানে উল্লেখ্য, ১৮৮৪ সালে ম্যারি সিলেস্টির অন্তর্ধান রহস্য বিখ্যাত লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের হাত ধরে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্ব সাহিত্যে। জাহাজটির হারিয়ে যাওয়া নিয়ে রয়েছে তাঁর কাল্পনিক ছোটো গল্প ‘জে. হ্যাবাকুক জেফসন’স স্টেটমেন্ট’। গল্পটি ১৮৮৪ সালে ‘দি কর্নহিল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শুধু সাহিত্য নয়, জাহাজটিকে নিয়ে চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছিল। ‘দি মিস্ট্রি অফ ম্যারি সিলেস্টি’ যেটি ১৯৩৫ সালে মুক্তি পায়। আবার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৬ সালে ‘দি ফ্যান্টম শিপ’ নামে আরেকটি চলচ্চিত্র হয়।


___

ছবিঃ আন্তর্জাল


No comments:

Post a Comment