ছোটো গল্পঃ তুলি ও লালি - কৃষ্ণেন্দু দেব



তুলি ও লালি


কৃষ্ণেন্দু দেব



তুলি ওর ঠাম্মাকে চাক্ষুষ দেখেনি। ওর জন্মের অনেক আগেই ভদ্রমহিলা গত হয়েছিলেন। দাদুন প্রিয়তোষ সরকারই ওকে দিয়েছেন একই সঙ্গে দাদু-ঠাকুমার আদর। প্রিয়তোষবাবু চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন প্রায় বছর দশেক হল। তবে শরীর-স্বাস্থ্য ওঁর এখনো যথেষ্টই ভালো। ছেলে অভীক আর পুত্রবধূ তানিয়া দু’জনেই চাকরি করেন। আর উনি থাকেন একমাত্র নাতনি, ওই তুলিকে নিয়ে। তুলিও সারাদিন দাদুনের সঙ্গ পেয়ে দারুণ খুশি। দাদুনই ওর এই মুহূর্তে সবচেয়ে কাছের মানুষ, বন্ধুও বলা যায়।

তুলি পড়ে একটা নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। ওর এখন মর্নিং সেশন। ভোর ছ’টায় চড়ে বসতে হয় স্কুল বাসে। মা রোজ পাঁচটার সময় ঘুম থেকে তুলে ওকে রেডি করে দেন। ছ’টা বাজার দশ মিনিট আগে ও স্কুল ড্রেস পরে দাদুনের হাত ধরে স্কুল বাস ধরার জন্য রওনা হয়ে যায়। হেঁটে বড়ো রাস্তায় পৌঁছতে লাগে মিনিট পাঁচেক। বাড়ি থেকে যখন বেরোয়, বাবা তখন ঘুমিয়ে থাকেন। অভীক চাকরি করেন একটা মস্ত কোম্পানিতে, খুব উঁচু পদে। সেই সকালে রোজ অফিসে চলে যান, আর বাড়ি ফেরেন রাত সাড়ে ন’টা-দশটায়। আবার মাঝেমধ্যেই অফিস ট্যুরে দিল্লি-মুম্বই-পুনেও যেতে হয়। তাই বাবার সান্নিধ্য তুলি পায় না বললেই চলে।

মা তানিয়া একটা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। স্কুলটা অনেক দূরে। ওঁকেও তাই বেরিয়ে পড়তে হয় সকাল ন’টার মধ্যেই। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা ছ’টা। সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে মা তুলিকে হোমওয়ার্ক করাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি আবার বেশ কড়া ধাঁচের মহিলা। এতটুকু ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই। স্কুলের পড়া শেষ করতেই ন’টা পার হয়ে যায়। তারপরেই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পালা, না হলে পরদিন ভোরে ওঠা যাবে না যে। তাই রোজ বেলা একটা নাগাদ স্কুল থেকে ফিরে একমাত্র দাদুনের সাহচর্যই তুলি বেশ উপভোগ করে। দাদুনের কাছে বকা খাওয়ার ব্যাপার নেই, রোজ গল্প শুনে আর নিজের পছন্দমতো কাজকর্ম করে তুলির বেশ আনন্দেই দিন কাটে। ওর সব চাহিদা দাদুনই মিটিয়ে দেন। তুলি কেবল ভাবে, ওর স্কুলের বন্ধু আর্য বা ঋতমার কথা। ওদের বাড়িতে কোনো দাদুন বা ঠাম্মা নেই। চাকরির জন্য বাবা-মাও দুপুরে বাড়ি থাকেন না। ওদের দুপুরগুলো কাটে কাজের মাসির কঠোর শাসনের মধ্যে। তারা কেউ গল্প শোনায় না, শুধু খাবারটুকু খাইয়ে দিয়ে বাকি সময়টা টিভি দেখে। ভাগ্যিস ওর দাদুন আছে!

এই আট বছর বয়সেই তুলি দাদুনের কাছ থেকে বোধ হয় আট হাজার গল্প শুনে ফেলেছে। দাদুন শুধু ওকে বইয়ের গল্প বলেন না, শোনান নিজের ছেলেবেলার নানা গল্পও। ইদানীং দাদুন আবার ওকে মাঝেমধ্যেই নানা গল্পের বই কিনে দেন। ইংরাজি-বাংলা দু-রকমই। দাদুনের বক্তব্য, স্কুলের পড়া ছাড়াও আরও অনেক কিছু পড়তে হবে। না হলে প্রকৃত মানুষ হওয়া যাবে না। এই ‘প্রকৃত মানুষ হওয়া’ ব্যাপারটা তুলির মাথায় ঠিক ঢোকে না। তবে ঠাকুমার ঝুলি, ক্ষীরের পুতুল, ভোঁদড় বাহাদুর কিংবা গালিভার্স ট্রাভেল, টিনটিন পড়তে ওর বেশ ভালোই লাগে। তুলি সেই জ্ঞান হওয়া ইস্তক দাদুনকে পড়তেই দেখছে। দাদুনের ঘরে দুটো বড়ো আলমারিতে কেবল গাদা গাদা বই। এই বয়সেও দাদুন রোজ নিয়ম করে অত কী পড়েন? তুলি দু-একবার কয়েকটা বই উলটেপালটে দেখেওছে। কীসব কঠিন কঠিন বিষয়। দাদুনকে একদিন জিজ্ঞাসাও করেছিল, “তুমি এইসব বই পড়েছ? কী পাও এত বই পড়ে?”

দাদুন মুচকি হেসে জবাব দিয়েছিলেন, “তৃপ্তি পাই, শান্তি পাই। বড়ো হয়ে তুমিও এইসব বই পড়বে। তখন…”

দাদুনকে সেদিন তুলি কথা শেষ করতে দেয়নি। বলেছিল, “আমি এত মোটা মোটা বই পড়তে পারব না। আর একটু বড়ো হলে তুমি বরং আমাকে এগুলোতে যা লেখা আছে, তা গল্প করে শুনিয়ে দিও, কেমন?”

প্রিয়তোষবাবু নাতনির এই মন্তব্যে সেদিন হেসে ফেলেছিলেন, আর কিছু বলেননি।

এবার আসল ঘটনায় আসি। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। অন্যান্য দিনের মতো ভোরবেলা তুলি দাদুনের হাত ধরে পাড়ার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল স্কুল বাস ধরতে। হঠাৎই একটা দোকানের শেডের তলায় শুনতে পেল সমবেত মিউ মিউ ধ্বনি। একটা মা বেড়াল তিনখানা পুঁচকে বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। বাচ্চা তিনটেকে দেখেই তুলি লাফিয়ে উঠল। ওর অনেকদিনের শখ বাড়িতে বেড়াল পোষার। কিন্তু মা তার ঘোরতর বিরোধী। ছেলেবেলায় নিজের পিসির বাড়ি বেড়াতে গিয়ে কোনোরকম প্ররোচনা ছাড়াই নাকি একটা পোষা বেড়াল ওঁর পায়ে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল। তারপর থেকেই বেড়াল দেখলেই মায়ের মেজাজ খাপ্পা হয়ে যায়। তুলি মাকে একাধিকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে ওটা ছিল একটা বদমেজাজি দুষ্টু বেড়াল। অন্যরা মোটেই ওর মতো নয়। দিয়াদের বাড়িতে একটা বেড়াল আছে। ও কক্ষনো কামড়ায় বা আঁচড়ায় না, উলটে জিভ দিয়ে চেটে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানায়। একথা শুনে মায়ের মত তো বদলায়ইনি, উলটে উনি তুলিকে দিয়াদের বাড়ি খেলতে যেতেই মানা করে দিয়েছিলেন।

বেড়ালছানাগুলোকে দেখে তুলি দাঁড়িয়ে গেছে দেখে প্রিয়তোষবাবু নাতনির মনোবাসনা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেললেন। তুলির মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “তোমার এই ইচ্ছাটা আমি পূরণ করতে পারব না দিদিভাই। আসলে তোমার মায়ের বেড়াল নিয়ে একটা দারুণ অ্যালার্জি আছে। সেটা কোনোভাবেই যাওয়ার নয়। এই অবস্থায় আমি যদি শুধু তোমাকে খুশি করতে একটা বেড়ালছানা বাড়িতে নিয়ে যাই, তাহলে তোমার মা মুখে কিছু না বললেও মনে মনে খুব আঘাত পাবে। সেটা তো আমি হতে দিতে পারি না। তাই বেড়াল পোষার ইচ্ছাটা তুমি ত্যাগ করো।”

দাদুনের মুখে একথা শোনার পর তুলি আর ওখানে দাঁড়ায়নি। জোরে পা চালিয়ে বাসে উঠে পড়েছিল। সেদিন দুপুরে স্কুল থেকে ফিরেও সে বেশ মনমরাই রইল। সেটা লক্ষ করে প্রিয়তোষবাবু ওকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দেশের বাড়ির বেড়ালের গল্প শোনালেন। প্রায় ঘণ্টা খানেক সেই গল্প শোনার পর তুলির মনোকষ্ট অনেকটা লাঘব হল। তুলি অবাক হয়েছিল, পোষা বেড়ালের স্বভাব-চরিত্র সম্বন্ধে দাদুনের জ্ঞান দেখে। দাদুন কি এসব শুধু বেড়ালদের ভালোমতো লক্ষ করেই জেনেছেন? নাকি যেসব বই দাদুন দিনরাত পড়েন তার কোনোটায় এসব লেখা আছে? ও তো এতদিন কত বিড়াল দেখেছে, কিন্তু এসব কথা একদম জানতই না।

এই যে দিয়াদের বাড়ির বেড়ালটা মাঝেমধ্যেই দিয়ার হাত-মুখ চেটে দেয়, সেটা ওকে খুব পছন্দ করে বলেই। যার কাছে বেশি আদর বা প্রশ্রয় পায়, তাকেই অমন করে, অন্য কাউকে নয়। দাদুন বলেছে, কোনো বেড়াল যে-বাড়িতে থাকে, সে নিজেকে সেই বাড়ির একজন সদস্যই মনে করে এবং সে ওই বাড়ির কোনো মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার খাতিরেই কেবল ‘মিয়াও’ বলে ডাকে। অন্য কোনো পশুর ক্ষেত্রে কখনো ওই শব্দ ব্যবহার করে না। বাড়ির ছেলেদের থেকে মেয়েদের সঙ্গেই বিড়ালের বন্ধুত্ব হয় বেশি। তুলি নিজেও দেখেছে, দিয়ার দাদা আছে, কিন্তু তার থেকে দিয়ার সঙ্গেই ওদের বেড়ালটার ভাব বেশি। সেইজন্য অনেকক্ষণ বাদে দিয়াকে দেখতে পেলেই বেড়ালটা লেজখানা উপরে তুলে ওকে অভিবাদন জানায়।

দাদুন ওকে আরো বলেছেন যে একটা বেড়াল নাকি সারাদিনে প্রায় ষোলো থেকে আঠারো ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাটায়। তবে ওদের ঘুম খুবই পাতলা। সামান্য আওয়াজেই ওরা ঘুম ছেড়ে তড়াক করে উঠে পড়তে পারে, আর করতে পারে নিজেদের করণীয় কাজটুকু। অনেক সময় বেড়াল চিত হয়ে ঘুমায়। এই সময় বাড়ির কারুর উপস্থিতি টের পেয়েও সে যদি ওই একইভাবে শুয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে যে ওই লোকটিকেই সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে। দাদুনের দেশের বাড়ির একটা কালো বেড়াল নাকি দাদুনকে দেখেও প্রায়ই ওইভাবে চিত হয়েই শুয়ে থাকত, সোজা হয়ে বসত না। ওটাই ছিল দাদুদের সবচেয়ে ন্যাওটা। দাদুন প্রতিদিন ওকে নিজের ভাগ থেকে খাবার দিতেন। আর খাওয়া শেষ করেই বেড়ালটা সঙ্গে সঙ্গে থাবা দিয়ে নিজের মুখ পরিষ্কার করে নিত। এটা নাকি বেড়ালের অতি প্রাচীন স্বভাব। মুখে লেগে থাকা খাবারের গন্ধ পেয়ে কোনো শত্রু যাতে ওকে আক্রমণ করতে না পারে, তার জন্যই ওরা অমনটা করে।

যাই হোক, বেড়াল সম্পর্কে এত কিছু জানার পরও সেটা পোষার সৌভাগ্য তুলির কোনোদিন হবে না, এই যা দুঃখ। দাদুন বলেছেন, মানুষের সব আশা কখনো পূর্ণ হয় না। তা নিয়ে বেশি হা-হুতাশ না করাই ভালো। তাতে দুঃখ বাড়ে বৈ কমে না। তাই সেদিন বিকালবেলা তুলি ড্রয়িং খাতা খুলে আঁকতে বসে গেল। গল্প শোনা আর গল্পের বই পড়া বাদ দিলে আঁকাআঁকিই ওর প্রথম পছন্দ। সেদিন তুলি আঁকল একটা বেড়ালছানার ছবি। তারপর তার গায়ে চড়াল চার রকমের রংーসাদা, কালো, বাদামি আর ধূসর। দাদুন বলেছেন, সাধারণত মেয়ে বেড়ালরাই অমন তিন-চাররঙা হয়। আর মেনি বেড়ালের দৃষ্টিশক্তিও হয় হুলোদের চেয়ে বেশি। যাই হোক, আজ ভোরে যে তিনটে বেড়ালছানা দেখেছে, তাদের মধ্যে একটা ওইরকম চাররঙা ছিল। সেটাকেই তুলি আঁকার চেষ্টা করেছে। তবে আজ স্কুল থেকে ফেরার পথে ওদের কাউকেই আর কোথাও চোখে পড়েনি।

ঠিক এর পরদিন মানে শুক্রবারের ঘটনা। সেদিন ভোরবেলা দাদুনের সঙ্গে স্কুলের বাস ধরার পথে যাওয়ার সময় তুলি সেই দোকানটার সামনে একবার দাঁড়াল। কিন্তু এদিক ওদিক তাকিয়েও আগের দিনের ওই মা বেড়াল বা তার ছানাপোনাদের কাউকেই দেখতে পেল না। মনটা ওর বেশ হতাশ হয়ে গেল। কিন্তু দুপুরবেলা বাস থেকে নেমে বাড়ি ফেরার পথে দেখতে পেল, ওই দোকানের পাশের কৃষ্ণচূড়াগাছটার তলায় সেই চাররঙা বেড়ালছানাটা একলা কুঁইকুঁই করে ডাকছে। আর রাস্তার ওপারে একটা ইয়াবড়ো কালো কুকুর লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। প্রিয়তোষবাবু ওখানকার আদি বাসিন্দা, তাই পাড়ার কমবেশি সকলকেই চেনেন। উনি তক্ষুনি পাশের বাড়ির একটা ছেলেকে ডেকে বেড়ালছানাটা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ছেলেটা জানাল, আজ বেলা দশটা নাগাদ নাকি একটা বাইকের ধাক্কায় মা বেড়ালটা মারা গেছে। ওরা তখন বাচ্চা তিনটেকে একটা প্যাকিং বাক্সে তুলে বিস্কুট-টিস্কুট খাইয়ে ওই শেডের তলাতেই রেখে দিয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে ওই একটা ছানা ছাড়া অন্য দুটোর হদিশ নেই। মনে হয় ওরা রাস্তার কুকুরগুলোরই পেটে গেছে।

এই কথাবার্তার মাঝখানেই চাররঙা বেড়ালছানাটা মিউ মিউ করতে করতে ওই গাছতলা থেকে চলে এল তুলির কাছে। মা বেড়ালটা মারা গেছে শুনে তখন তুলির চোখে জল। এই সময় প্রিয়তোষবাবু এক কাণ্ড করে বসলেন। তুলির দিকে তাকিয়ে বললেন, “চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছ কেন? ওকে কোলে নিয়ে বাড়ি চলো!  না হলে ও-ও তো আজ কুকুরের খাদ্য হয়ে যাবে।”

এমন কিছু শোনার জন্য তুলি মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ও ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে বলল, “কিন্তু মা যদি বকে?”

প্রিয়তোষবাবু নাতনিকে আশ্বস্ত করলেন, “ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি যা বলছি, তাই করো।”

আর তুলিকে পায় কে! আনন্দে আত্মহারা হয়ে ও সঙ্গে সঙ্গে বেড়ালছানাটাকে কোলে তুলে নিল আর হনহন করে হাঁটতে শুরু করল বাড়ির দিকে। কতদিনের ইচ্ছা ছিল বাড়িতে একটা বেড়ালছানা পুষবে। আজ হঠাৎই সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। কিন্তু দাদুন মাকে ম্যানেজ করবেন কীভাবে?

বাড়িতে ঢুকেই প্রিয়তোষবাবু চিলেকোঠার ঘর থেকে টিভির একটা প্যাকিং বাক্স বের করে আনলেন। তার মধ্যে পুরোনো কাপড় পেতে গদিমতো বানিয়ে দিলেন। তারপর বেড়ালছানাটাকে বাক্সতে রেখে তুলিকে বললেন, “তুমি এক্ষুনি ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নাও। তারপর লতামাসিকে বলো ভাত বেড়ে দিতে। আমি এক্ষুনি ওর জন্যে দুধ আর একটা ফিডিং বটল কিনে নিয়ে আসছি।”

লতামাসি এ-বাড়ির পরিচারিকা। তানিয়া স্কুলে চলে যাওয়ার পর উনি আসেন। প্রথমে ঘরদোর মোছামুছি করেন। তারপর তুলি স্কুল থেকে ফিরলে দাদু-নাতনিকে খাবার বেড়ে দেন। ওদের খাওয়া শেষ হলে সব বাসনপত্র ধোয়াধুয়ি করে বাড়ি ফিরে যান। আজ প্রিয়তোষবাবু বেরিয়ে যেতেই উনি তুলিকে বললেন, “বৌদি কিন্তু বেড়াল-টেরাল একদম পছন্দ করে না। সন্ধ্যাবেলা বাড়ি এসে ওটাকে দেখলে তুলকালাম বাধাবে, এই বলে দিলাম।”

তুলিও সেটা বিলক্ষণ জানে। কিন্তু দাদুনের ওপর ওর ভরসা আছে। তাই ও বেশ দেমাকের সুরেই বলল, “ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি তাড়াতাড়ি আমাকে খেতে দাও।”

মিনিট পনেরো বাদেই প্রিয়তোষবাবু বাড়ি ফিরে এলেন। ততক্ষণে তুলির খাওয়া শেষ। উনি জলে গুঁড়ো দুধ গুলে ফিডিং বটলে ভরে সেটা ধরিয়ে দিলেন নাতনির হাতে। বললেন, “দেখি কেমন ওকে খাওয়াতে পারো!”

প্রথমটা একটু অসুবিধা হলেও বেড়ালছানাটাকে নিজের কোলে নিয়ে তুলি দিব্যি পুরো দুধটুকু খাইয়ে দিল। এই দৃশ্য দেখে প্রিয়তোষবাবু খুব খুশি হলেন। বললেন, “বাহ্‌, ঠিকঠাক খাইয়েছ। এ-যাত্রায় ও প্রাণে বেঁচে গেল। নাও, এবার ওকে আবার বাক্সে রেখে দাও। ও ঘুমিয়ে পড়বে।”

তুলি দাদুনের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। আজ ওর দারুণ আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু মা বাড়ি এসে কী করবে, তা ভেবে ভয়ও করছে খুব। দাদুনকে বলেও ফেলল সেই আশঙ্কার কথা। প্রিয়তোষবাবু আবারও নাতনিকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, “বললাম তো, মাকে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তু্মি বরং বেড়ালছানাটার একটা নাম ঠিক করে ফেলো।”

তুলি সেটা আগেই ঠিক করে ফেলেছিল। বলল, “ভাবছি ওর নাম দেব লালি।”

প্রিয়তোষবাবু হেসে বললেন, “বেশ নাম। তুলির পোষ্য লালি।”

বিকালবেলা লালিকে আরেকবার দুধ খাওয়ানো হল। তুলি যদিও মুসাম্বির রস খাওয়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু প্রিয়তোষবাবুর বাধায় সেটা সম্ভব হয়নি। উনি নাতনিকে সাবধান করে বললেন, “বেড়ালকে কখনো লেবু জাতীয় কিছু খাওয়াতে যাবে না। লেবুর গন্ধ ওরা এক্কেবারে পছন্দ করে না। তবে ওরা মেনথল মানে টুথপেস্ট আর চুইং গামের গন্ধ ভালোবাসে। কিন্তু ওগুলো তো আর খাওয়ানো যায় না! আর মনে রাখবে, ওকে কখনো চকোলেট খেতে দেবে না। বেড়ালের কাছে ওটা বিষ।”

সত্যি, দাদুন কত কী জানেন! অত বই পড়েন বলেই না এত কিছু জেনেছেন।

লালিকে বেশ কিছুক্ষণ কোলে নিয়ে ঘোরাঘুরি করে তুলি ওকে আবার বাক্সের মধ্যে রেখে দিল। মায়ের বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে।

সেদিন ছ’টা বাজার সামান্য আগেই তানিয়া চলে এলেন। বাড়িতে ঢোকামাত্রই প্রিয়তোষবাবু বৌমাকে নিজের ঘরে ডেকে নিলেন, কিছুক্ষণ আলাদা করে কথা বললেন। তুলি লক্ষ করল, মা দাদুনের ঘর থেকে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে এলেন, কিন্তু কোনোরকম রাগারাগি করলেন না।

খানিকবাদে মা এলেন ওর ঘরে টিফিন নিয়ে। তুলি ইতিমধ্যেই হোমওয়ার্ক শুরু করে দিয়েছিল। মা কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে চাপা স্বরে বললেন, “কান খুলে শুনে নাও। ওই বেড়ালছানাটা মাস তিনেকের মধ্যেই বড়ো হয়ে যাবে, তখন নিজের খাবার নিজেই জোগাড় করতে পারবে। নিজেকে রক্ষা করতেও শিখে যাবে। তখন কিন্তু এবাড়িতে ওকে আর রাখা যাবে না। নেহাত ওর মা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে, তাই ক’দিনের জন্য এখানে থাকতে দিচ্ছি।”

তুলি একথা শুনে কেবল নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ল। তানিয়া আবার বললেন, “আর হ্যাঁ, যে ক’টা দিন ও এ-বাড়িতে আছে, ওকে নিয়ে বেশি আদিখ্যেতার দরকার নেই। একবার আঁচড়ে বা কামড়ে দিলে কিন্তু অনেকগুলো ইনজেকশন নিতে হবে, এই বলে দিলাম।”

তুলি এবারও শুধু আগের মতোই ঘাড় নাড়ল, তারপর বাধ্য মেয়ের মতো টিফিনটা খেয়ে ঝটপট শেষ করে নিল নিজের হোমওয়ার্ক। ও বুঝে গেছে, মা বাড়িতে থাকাকালিন মোটেই লালিকে নিয়ে মাতামাতি করা যাবে না। ওকে আদর-টাদর যা কিছু করতে হবে, স্কুল থেকে ফেরার পর।

এরপর মূলত প্রিয়তোষবাবুর পরিচর্যায় লালি দ্রুত বড়ো হয়ে উঠতে লাগল। সে এখন ওই টিভির বাক্স ছেড়ে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বেড়ায়। তুলি লক্ষ করেছে, প্রথম দু-একদিন সে মায়ের কাছে যাবার তাল করেছিল, কিন্তু বকুনি খেয়ে আর ওদিকে ঘেঁষেনি। ওর কিছু ভালো গুণ আছে। লালি কখনোই কারুর খাবারে মুখ দেওয়ার চেষ্টা করে না, আর মা থাকলে ওর ধারেবারেই আসে না। এ-বাড়িতে মা যে ওকে একদম পছন্দ করে না, সেটা ও বেশ ভালোই বুঝে গেছে। আজকাল ছুটির দিন মানে রবিবার বাবাও লালিকে মাঝেসাঝে কোলে তুলে নেন, তখন সে বাবার হাত চেটে দেয়। আবার রোজ দুপুরে লতামাসিও নিজের খাবার থেকে ওকে খাওয়ান। মানে লালি ইতিমধ্যেই বাড়ির সকলের মন জয় করে নিয়েছে, একমাত্র মা ছাড়া। অথচ এই দু-মাসে লালি কিন্তু কাউকে আঁচড়ে-কামড়ে দেয়নি, বাড়ির কোনো জিনিস নষ্টও করেনি। মা যেন কেমন! কবে কোন একটা বেড়াল ওঁর পায়ে দাঁত বসিয়েছিল, সেই রাগ এখনো মনে পুষে রেখেছেন।

এই ক্ষোভের কথা তুলি দাদুনকেও জানিয়েছে। দাদুন জবাবে মাথা নেড়ে বলেছেন, “কিছু মানুষের কারুর প্রতি একটা পার্মানেন্ট অ্যালার্জি থেকে যায় দিদিভাই। সেটা কোনোভাবেই দূর হয় না। তুমি এবার আস্তে আস্তে লালির মায়া ত্যাগ করো। ও কিন্তু এর মধ্যেই বেশ বড়ো হয়ে গেছে। আর মাস খানেক বাদেই এক্কেবারে সাবলম্বী হয়ে যাবে। আমি তোমার মাকে কথা দিয়েছি, সেদিন ওকে দূরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসব যাতে ও এ-বাড়িতে আর ফিরে আসতে না পারে।”

প্রিয়তোষবাবুর মুখে একথা শুনে তুলি কেঁদে ফেলল। ধরা গলায় বলল, “ওকে দূরে ছেড়ে দিয়ে আসতে তোমার কষ্ট হবে না দাদুন?”

“সে তো হবেই। কিন্তু কী আর করা যাবে বলো। লালিকে যেদিন এ-বাড়িতে এনেছিলাম, সেদিনই আমি তোমার মাকে ওই কথা দিয়েছিলাম যে। আমি তো আর কথার খেলাপ করতে পারি না।”

এরপর থেকে তুলির মন আরও খারাপ হয়ে গেল। ও নিজের ঘরে রাখা ছোট্ট সরস্বতী মূর্তির কাছে রোজ ঘুম থেকে উঠে প্রার্থনা করত, ‘হে ঠাকুর, আমার লালি যেন আর বড়ো না হয়।’

বলাই বাহুল্য, তুলির প্রার্থনা ঠাকুরের কানে পৌঁছায়নি। পরের একমাসে তাই লালি বেশ লায়েক হয়ে উঠল। এখন সে তুলিদের বাড়ির বাইরেও ঘুরতে বেরোয়, বাড়ির পিছনের বাগানে গিরগিটিদের তাড়া করে, পাশের বাড়ির কার্নিশেও বেশ কিছুটা সময় কাটায়।

এসব দেখে প্রিয়তোষবাবু তুলিকে একদিন বললেন, “দিদিভাই, এবার মন শক্ত করো। সামনের মাসেই লালিকে দূরে কোথাও…”

এর কয়েকদিন বাদে এক রবিবারের ঘটনা। তুলিদের বাড়িতে দু’জন ছুতোর মিস্ত্রি এল একটা ওয়ারড্রোব বানাবার জন্য। সকাল ন’টা থেকেই ওরা দু’জন কাজ শুরু করল। একজন বয়স্ক হেড মিস্ত্রি, আরেকজন কমবয়সী তাঁর হেল্পার। অভীক এবং তানিয়া দু’জনেই সেই কাজ তত্ত্বাবধান করছিলেন। বারান্দার এক কোনায় বসে লালিও সব দেখছিল। আগে কোনোদিন এসব দেখেনি তো। তুলি অবশ্য নিজের ঘরে। মনখারাপ কমানোর জন্য দাদুনের পরামর্শে ‘হযবরল’ খুলে বসেছে। পড়তে পড়তে ভাবছে, ‘ছিল একটা রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল।’ আহা, এর উলটোটাও যদি হত! তবে কী মজাটাই না হত। লালি রুমাল হয়ে গেলে ওকে আজীবন নিজের কাছে রাখতে কোনো সমস্যাই হত না।

সুকুমার সমগ্রতে ডুবে যখন অনেকটা সময় কেটে গেছে, হঠাৎই ড্রয়িং রুম থেকে ‘বাবা গো, মরে গেলুম গো’ বলে একটা চিৎকার তুলির কানে ভেসে এল। ও ছুটে ঘরের বাইরে গিয়ে দেখল, যে কমবয়সী ছেলেটা কাঠের কাজ করছিল সে কমন বাথরুমের সামনেটায় নিজের পা চেপে বসে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। ওর চিৎকার শুনে তুলির দাদুন, হেড মিস্ত্রি সবাই ছুটে গেলেন। অভীক স্টাডি রুমে নিজের অফিসের কাজ করছিলেন। তিনিও ওখানে হাজির হলেন। হেল্পার ছেলেটি জানাল, সে বাথরুমে গিয়েছিল। ওখান থেকে বের হওয়ামাত্রই লালি ওর পায়ে জোরে কামড়ে দিয়েছে।

বিচ্ছিরি ব্যাপার! প্রিয়তোষবাবু সঙ্গে সঙ্গে তুলো আর ডেটল এনে ছেলেটার পায়ের পরিচর্যা করতে শুরু করে দিলেন। কিন্তু রক্ত আর বন্ধ হয় না। এই অবস্থায় প্রিয়তোষবাবু ছেলেকে বললেন, “অভি, তুই ওকে এক্ষুনি সামনের নার্সিং হোমে নিয়ে যা। ব্যান্ডেজ করাতে হবে। টিটেনাস ইনজেকশনও দিতে হবে।”

অভীকও এই কথায় সায় দিলেন। কিন্তু এবার ওই আহত ছেলেটি বেঁকে বসল। বলল, “নার্সিং হোমে যাবার দরকার নেই। এক্ষুনি রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাবে।”

কিন্তু প্রিয়তোষবাবু একরকম জোর করেই ওকে নীচে পাঠিয়ে দিলেন। হেড মিস্ত্রিও গেলেন ওদের সঙ্গে।

তানিয়া স্নান সারতে এতক্ষণ ছিলেন ভিতরের বাথরুমে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে লালির কাণ্ড দেখে রেগে একেবারে লাল হয়ে গেলেন। প্রিয়তোষবাবুকে বললেন, “বাবা, আমি আগেই বলেছিলাম এই বেড়াল পোষা মোটেই ভালো ব্যাপার নয়। অনেক হয়েছে, আজই ওটাকে বিদায় করুন।”

বৌমার কথায় উনি ঘাড় নাড়লেন। তুলি গোটা ব্যাপারটায় একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। লালি যে এমন একটা বিচ্ছিরি কাজ করতে পারে, সেটা ও যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। এই প্রথম লালির ওপর ওর খুব রাগ হল। কিন্তু সে গেল কোথায়!

লালিকে খোঁজার জন্য তুলি বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকাল। এই বেলার দিকটা ও মাঝেমধ্যেই বাগানের দিকে যায়। তুলি দেখল ওর অনুমান সত্যি। লালি নিচে বাগানে জবাগাছের ঝোপে ঢুকে কী যেন করছে। নিশ্চয়ই গিরগিটি দেখেছে। ও একদৃষ্টে চেয়ে রইল লালির দিকে। ইতিমধ্যে প্রিয়তোষবাবুও নাতনির পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ওরা দু’জনেই লক্ষ করলেন, লালি ঝোপের মধ্য থেকে সাদা রঙের একটা কী যেন মুখে করে বেরিয়ে আসছে। এই দৃশ্য দেখে তুলির আরও রাগ হয়ে গেল। এমন একটা ভয়ংকর কাণ্ড ঘটিয়েও লালিটার কোনো অনুশোচনা নেই! বাগানে গিয়ে খেলা করছে!

প্রিয়তোষবাবু নাতনির মনের কথা বুঝে ফেললেন। তুলির পিঠে হাত রেখে বললেন, “এ-বাড়িতে ও আর কয়েক ঘণ্টা থাকবে। ওকে আর বকাবকি কোরো না। একটা বড়ো ভুল করে ফেলেছে, কী আর করা যাবে। ভুল তো কত আমরাও করি, তাই না?”

তুলি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দাদুনকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল। ইতিমধ্যে বাগান থেকে লালি আবার দোতলায় ফিরে এল। দেখা গেল ওর মুখে একটা ছোট্ট সাদা কাপড়ের পুঁটলি। পুঁটলিটা লালি এনে রাখল মেঝের ওপর, দাদু-নাতনির সামনে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে তানিয়াও লালির কীর্তি দেখছিলেন। প্রিয়তোষবাবু নিচু হয়ে পুঁটলিটা হাতে নিলেন। বোঝা গেল কিছু একটা সাদা রুমালে গিঁট পাকানো অবস্থায় আছে। গিঁটটা খুলতেই ভিতরে দেখা গেল একটা লম্বা সোনার চেন। হারটা যে তানিয়ার সেটা কারুরই চিনতে অসুবিধা হল না। ওটা রাখা ছিল তানিয়ার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের ওপর।

এবার গোটা ব্যাপারটা সকলের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। ওই হেল্পার ছেলেটি কাজের ফাঁকে একবার নিশ্চয়ই তানিয়ার বেড রুমে ঢুকেছিল। তখনই সোনার হারটা ওর চোখে পড়ে। সে আর লোভ সামলাতে পারেনি। চারপাশে কেউ নেই দেখে হারটা নিজের রুমালে মুড়ে বেরিয়ে এসেছিল ওই ঘর থেকে। কিন্তু নিজের কাছে হারটা রাখার সাহস পায়নি। হঠাৎ যদি খোঁজ পড়ে তাহলে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। তাই জিনিসটা বারান্দার জানালা গলিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল বাগানের ঝোপে। নিশ্চয়ই ভেবেছিল কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় কোনো অছিলায় বাগানে গিয়ে ওটা পকেটে ভরে নেবে। কিন্তু লালি সেটা আর হতে দিল না। চুরি করার জন্য পায়ে কামড় তো বসালই, সঙ্গে আবার চোরাই মালটাও উদ্ধার করে নিয়ে এল।

এরপরের গল্পটা খুবই সংক্ষিপ্ত। নার্সিং হোম থেকে অভীক ওই হেল্পার ছেলেটিকে পায়ে ব্যান্ডেজ করিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসার পরই সকলে মিলে তাকে চেপে ধরলেন। সে তখন বাধ্য হল হার চুরির ব্যাপারটা স্বীকার করতে। আসলে রুমালটা যে ওর, সেটা অস্বীকার করার তো কোনো উপায় ছিল না। অভীক পুলিশে ফোন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ছেলেটা তখন কেঁদেকেটে একশা। তবে হেড মিস্ত্রি বোধ হয় চুরির ব্যাপারটা জানতেন না। যাই হোক, প্রিয়তোষবাবুও আর বাড়িতে পুলিশ ডাকতে চাইলেন না। দু’জনকেই তৎক্ষণাৎ দিলেন বিদায় করে।

ইতিমধ্যে তুলি তার প্রিয় লালিকে কোলে তুলে নিয়েছিল। কিন্তু মিস্ত্রি দু’জন চলে যেতেই তানিয়া ওর কোল থেকে লালিকে একরকম ছিনিয়ে নিলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোর লালি তো আজ পুলিশের ট্রেনড ডগকেও হার মানিয়ে দিল রে তুলি! এ তো দেখছি এক বিস্ময় বেড়াল। ও না নজর করলে আমার অমন দামি হারটা আজ নির্ঘাত লোপাট হয়ে যেত। শোন, আজ থেকে ও আমার ঘরেই থাকবে।” এই বলে উনি রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে লালিকে নিজের হাতে একখানা মাছভাজা খাইয়ে দিতে লাগলেন। এই দৃশ্য দেখে আনন্দে তুলির চোখে জল এসে গেল। প্রিয়তোষবাবুও নাতনির ওই আনন্দ দেখে তখন বেজায় খুশি।

ওই ঘটনার পর লালির আর সরকারবাড়িতে থাকতে কোনো বাধা রইল না। কিন্তু তুলির সমস্যা দেখা দিল ওর সঙ্গে সময় কাটানো নিয়ে। মা যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন, লালিকে নিয়েই থাকেন। লালি এখন মাকে বারবার জিভ দিয়ে চেটে আদর করে, লেজ খাড়া করে অভিবাদন জানায়। তুলিকে বিশেষ পাত্তাই দেয় না। যে ওকে রাস্তা থেকে তুলে এ-বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, তাকে যেন ভুলেই গেছে। দাদুন অবশ্য তুলিকে বুঝিয়েছেন, এই সংসার বড়োই বিচিত্র। কে কখন কাকে আপন করে নেবে বা পর করে দেবে, তা কেউ বলতে পারে না। তুলি মেনেও নিয়েছে সেটা।

___


অঙ্কনশিল্পীঃ অনির্বাণ সরকার

No comments:

Post a Comment