অণুগল্পঃ সুতো - বনশ্রী মিত্র


লাল সুতো! চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে মুনুর। আড়চোখে একবার খাটের দিকে তাকিয়ে দেখে দিদি ঘুমোচ্ছে। বাক্স থেকে লাল সুতোটা নিয়ে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়েই এক দৌড়ে বারান্দায় চলে যায়। কাল রথ। এখনও কত্ত সাজানো বাকি!

“হ্যাঁ রে মুনু, তুই আমার লাল সুতোটা নিয়েছিস?”

উসকোখুসকো চুলে বোনের সামনে তিরবেগে এসে দাঁড়ায় দীপু। মুনু তখন আঁকার খাতায় একটা হাতির ছবি আঁকছিল। ইয়া বড়ো কানটা সবে আদ্ধেক আঁকা হয়েছে, এমন সময় রক্তচক্ষু দিদির সাংঘাতিক মূর্তি দেখে মুনুর হাত কেঁপে ওঠে।

“না, কই! আমি না তো... নিইনি তো!” আমতা আমতা করে বলে মুনু।

“নিশ্চয়ই তুই নিয়েছিস, নাহলে কোথায় যাবে? আমি সেলাই বাক্সে রেখেছিলুম।এখন দেখতে পাচ্ছি না।” দীপু ঝাঁঝিয়ে ওঠে। “এখন রথটা কী দিয়ে সাজাব আমি?”

এবছরই মুনুর বায়নায় বাবা মুনু আর দীপুকে আলাদা আলাদা রথ এনে দিয়েছে। প্রতিবছর একটাই রথ হয় দু’জনের। কিন্তু মুনুর বন্ধুরা সবাই নিজের রথ নিয়ে বেরোয়। মুনু আর ছোট্টটি নেই। দিদির সঙ্গে সঙ্গে মোটেও রথ নিয়ে ঘুরবে না সে। বন্ধুদের সঙ্গে বেরোবে। বকুলবাগান, আমলকিতলায় বীরদর্পে ঘুরে বেড়াবে।

“তোর লজ্জা নেই। একদম লজ্জা নেই। চুরি করে আবার মিথ্যে কথা বলিস!” দীপু রাগে ফুঁসতে থাকে। মুনুর রথে লাল সুতোর গোলাটা দেখে ফেলেছে সে।

ঠোঁট চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে মুনু। গালটা জ্বলে যাচ্ছে তার। শরীর কাঁপছে।

বড়ো মেয়েকে খুব বকলেন সোমা। “অত ছোটো বোনের গায়ে হাত তুললি তুই? কেন, দু’জনে মিলেমিশে দুটো রথ সাজাতে পারলি না?”

“তুমি আর বাবা সবসময় আমাকেই বলো। মুনুর কোনও দোষ দেখতে পাও না।”

দীপু ঘরে গিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে অভিমানে কাঁদতে থাকে। নিজেকে বাবা-মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত মনে হয়। কেউ তাকে ভালোবাসে না, কেউ তাকে বোঝে না। সে একদম একা।

সেদিন রাতে রথ দুটো সাজিয়ে ফেলেন সোমা। মুনু মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সাজানো দেখে। দীপু অঙ্ক কষার অজুহাতে ঘর থেকে বেরোয় না। একটাও অঙ্ক মেলাতে পারে না সে।

***

আকাশ লাল হয়ে রয়েছে। বৃষ্টি হবে। ছোটো ছোটো বাচ্চারা রথ টানছে। নিজের ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে সেদিকে তাকিয়ে থাকে দীপু। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। অসিত অফিসে। বিয়ের পর এই ফ্ল্যাটে সারাদিন সে একা। বাচ্চাগুলোর রথ টানা দেখতে দেখতে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায় তারー‘তোর থেকে আমার রথটা বেশি ভালো, দেখ! তোরটা ছোটো।’

নিজের মনেই হেসে ওঠে দীপু।

‘বেশি দূরে যাবি না কিন্তু মুনু! মাকে বলে দেব।’


পাশের বাড়ির টুকুর রথ সাজিয়ে দিচ্ছে মুনু।

‘লাল সুতোর গোলাটা আবার কোথায় গেল?’ নিজের মনেই বলে ওঠে মুনু।

ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে লাল সুতোর গোলাটা ছুড়ে দেয় দীপু। বকুলবাগান হয়ে আমলকিতলা পেরিয়ে লাল সুতোর গোলা গড়িয়ে যেতে থাকে মুনুর কাছে।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়


3 comments: