ছোটো গল্পঃ খিদে - অনন্যা সাহা ব্যানার্জী


অনেক কাল আগে এক গ্রামে সত্যনাথ নামে এক গরিব ব্রাহ্মণ বাস করত। রোজ সকালে সে একটা থলে কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ত, গ্রামের অন্যদের দরজায় দরজায় ঘুরে ঘুরে চাল, আলু, কলাটা, মুলোটা যা পেত নিয়ে আসত, তারপর পাতা কাঠ জ্বালিয়ে ফুটিয়ে খেত। ভিক্ষের সঙ্গে অপমানও জুটত কম নয়। দোরে গিয়ে দাঁড়ালেই বলতে শুরু করত সবাই, ‘ওই দেখো এসে গেছে সকাল হতে না হতেই। এখনও আমাদের পেটে কিছু পড়ল না, উনি এসে হাজির।’ তো এইভাবেই গঞ্জনা শুনে শুনে দিন কাটছিল সত্যনাথের। সেও ভাবত, কথা শুনি আর যাই হোক, দিন তো চলে যাচ্ছে আরামেই। শুধু শুধু দুটো কথা না হয় শুনতে হল, হোক না।

কিন্তু এইভাবে চিরদিন কাটতে পারে না। তাই একদিন সে কোনও ভিক্ষাই পেল না। সারাদিন ঘুরে ঘুরে শেষে খালি হাতে কুটিরে ফিরে আগের জমানো চাল-ডাল থেকেই অল্প একটু ফুটিয়ে নিল। পরেরদিনও এক অবস্থা। গ্রামবাসী তাকে দরজায় দেখলেই গালিগালাজ করে তাড়িয়ে দেয়।

একদিন রাতে ফিরে সে তার ঘরের জলচৌকিতে বসানো ঠাকুরের সামনে বসে খুব কাঁদতে লাগল। খালি বলতে লাগল, “হে ঈশ্বর, কেন আমার এই দুর্দশা! এই অবস্থা কি কোনোদিনও কাটবে না?”

সত্যনাথের কান্না দেখে ভগবানের খুব দয়া হল। তিনি ছোট্ট কুটির আলোকিত করে তার সামনে উপস্থিত হলেন। আলোয় সত্যনাথের চোখ ঝলসে গেল।

“কী রে, কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে তোর?”

“প্রভু, আমার এই দারিদ্র, এই অনাহারে আধপেটা খেয়ে লোকের লাঠি-ঝেঁটা খাওয়ার দিন কি কোনোদিন ঘুচবে না? ব্রাহ্মণ সন্তান হয়ে জন্মেও আমার এই পরিণতি?”

“ওরে বোকা বামুন, গ্রামের মানুষদের দেখে শেখ। ওরা সকাল থেকে রাত অবধি খেটে তবে খায়। আর তুই শুয়ে বসে কাটাবি, আর গ্রামের লোকেরা তাদের পরিশ্রমের রোজগার থেকে তোকে রোজ খেতে দেবে? সে গুড়ে বালি। যদি ভালো চাস তো কাল ভোরে উঠবি, তারপর বেরিয়ে কাজ খুঁজবি। পরিশ্রম করবি, নিজের রোজগারে খাবি। কারোর দোরে দোরে ঘুরতে হবে না।”

সত্যনাথও সেই কথামতো ভোরবেলা উঠে বেরিয়ে পড়ল। যেতে যেতে দেখল, ক্ষেতে চাষি হাল-বলদ নিয়ে পৌঁছে গেছে, লাঙল টেনে টেনে কী খাটছে! সে ভাবল, ধুর! আমি ব্রাহ্মণ মানুষ, আমার কি আর এইসব চাষাভুষোর কাজ মানায়? এসব ওদের কাজ ওরাই করুক। এই ভেবে সত্যনাথ হাঁটতে লাগল।

হাঁটতে হাঁটতে একটু দূরে সত্যনাথ দেখে এক গোয়ালা দুধ দোয়াচ্ছে। মনে মনে ভাবল, একবার যাবে? তারপর পিছিয়ে এল। আরে! আমি হলাম উপবীতধারী কুলীন ব্রাহ্মণ। এইসব গোয়ালার কাজ আমাকে মানায় না। সেখান থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার এগোতে লাগল।

এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে দেখল তাঁতি কাপড় বুনছে, দর্জি সেলাই করছে, ধোপা কাপড় কাচছে, মেথর নোংরা সাফ করছে, ধুনুরি তুলো ধুনছে… কোনও কাজই তার মনের মতো হল না।

ঘুরতে ঘুরতে সে এসে পড়ল গ্রামের বটতলায়।

প্রায় দু’শো বছরের পুরনো বটগাছের ঠাণ্ডা ছায়ায় চাটাই পেতে বসে বুড়ো পণ্ডিত ছেলেদের পড়াচ্ছেন। দেখে সে ভাবল, এই তো এতক্ষণে পাওয়া গেছে আমার যোগ্য কাজ। বুড়ো পণ্ডিতের কাছে গিয়ে সত্যনাথ বলল, “ও বুড়ো ঠাকুর, অনেক হয়েছে, আর তোমার পড়িয়ে কাজ নেই, বয়স হয়েছে, এ আর তোমার দ্বারা হবে না। তোমার এই পাঠশালা আমার হাতে ছেড়ে দাও, আমিই ওদের পড়িয়ে দেব।”

বুড়ো পণ্ডিত কিছু একটা আন্দাজ করে মুচকি হাসলেন। চুপচাপ আসন ছেড়ে দিয়ে বললেন, “বেশ, বসো তবে পড়াও।”

সত্যনাথ বুড়ো পণ্ডিতের আসনে আরাম করে বসল। বেতটা হাতে নিয়ে ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই, বল কী পড়া হচ্ছিল।”

“শব্দরূপ, পণ্ডিতমশাই।”

“শ-শ-শব-দ-রূপ!” সত্যনাথ তোতলাতে থাকল, তার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। যা সব জানা ছিল, একবর্ণও মনে করতে পারল না।

দূরে দাঁড়িয়ে বুড়ো পণ্ডিত মুচকি মুচকি হাসছেন। শেষে শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে ছাত্রদের কাছ থেকে কোনোরকমে পালিয়ে বাঁচল সত্যনাথ।

বাড়ি ফিরে খুব মনখারাপ করে বসে রইল সত্যনাথ। ঘরে মজুত খাবার ছিল ভালোই। তাই যা ছিল ফুটিয়ে খেল। পরেরদিন একটা কাজ জোটাতেই হবে।

এইভাবে বেশ কিছু দিন ভোরবেলা বেরিয়ে দেখতে লাগল চাষি, গোয়ালা, জেলে, তাঁতি, বুড়ো পণ্ডিত যে যার কাজে ব্যস্ত। কোনও কাজই তো তার পারার মতো নয়। এদিকে মজুত খাবারও শেষের পথে।

অন্যদিনের মতো সেদিনও ঘুরতে ঘুরতে সন্ধে নেমে এলে আবার কুটিরে ফিরে গেল ব্রাহ্মণ। আজ অনেকটা পথ হেঁটেছে সে। সারাদিন কিছুই পড়েনি পেটে। খিদের পেট জ্বলছে। কিন্তু ঘরের সব জায়গা আতিপাতি করে খুঁজেও একটা দানা চাল বা চিঁড়ে কিছুই পেল না। খিদের জ্বালায় সারারাত ছটফট করতে লাগল সত্যনাথ। অনেক কেঁদে-ডেকেও দেবতার দেখা পেল না।

কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুম ভাঙল ভোরের আলোয় পাখির ডাকে। রোজের মতো সেদিনও কুটির থেকে বেরিয়ে পড়ল। মাঠে ভর্তি ধান। চাষিরা ধান কাটার কাজে লেগেছে, খুব ব্যস্ত।

“ও চাষি ভাই, আমায় কাজে নেবে?”

“কাজের সময় মজা কোরো না। তোমার মতো নই আমরা, আমাদের খেটে খেতে হয়। এ কাজ তুমি করবেও না। তাহলে শুধু শুধু কথা বাড়াচ্ছ কেন? যাও খুব ব্যস্ত আছি, অনেক কাজ। একেই লোক কম…”

“আহা রাগ করছ কেন? আমি মজা করছি না গো। সত্যি আমি কাজ করব। তোমার ধান কাটার কাজে আমায় নাও গো। কোনও কাজই ছোটো নয়, সে আমি বুঝেছি।”

চাষি অবাক হল। এই ব্রাহ্মণই তো চাষিদের দেখে নাক সিঁটকে চলে যেত। আজ তাদের সঙ্গে হাত লাগাতে চাইছে? চাষি বলল, “করবে সত্যি? বেশ এসো তবে। এই, একটা কাস্তে দে তো ব্রাহ্মণকে।”

সত্যনাথ কাস্তে নিয়ে ধান কাটতে লাগল। খুব কষ্ট হল। একেই পেটে খিদে, তার ওপর দীর্ঘদিন শারীরিক পরিশ্রম করার অভ্যাস নেই। তাও সব কষ্ট দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে কাজ করতে লাগল।

বিকেল পর্যন্ত কাজ করার পর চাষি বলল, “এই নাও গো তোমার আজকের মজুরি। অনেক খেটেছ, এসো একটু গুড়-চিঁড়ে খাও আমদের সঙ্গে বসে। তোমার জাত যাবে না তো?”

আর জাত! খিদের জ্বালায় তখন সত্যনাথ নিজের গায়ের মাংস পারলে কেটে খেয়ে নেয়, সেখানে জাত। হাসিমুখে সবার সঙ্গে বসে গুড়-চিঁড়ে খেয়ে, জল খেয়ে পেটে একটু শান্তি পেল।

পরেরদিন আবার বেরিয়ে গোয়ালার সঙ্গে দেখা। তার গাই বকনা বাছুর দিয়েছে, তাকে নিয়ে গোয়ালার নাজেহাল দশা। সত্যনাথ বলল, “ও গোয়ালা ভাই, আমি তোমার গরুদের দেখাশুনা করে দিই?”

গোয়ালাও তো অবাক। শেষে বারণ করল না। সে গোয়াল ঘর পরিষ্কার করে, গরুদের খড়-বিচুলি খেতে দিয়ে তাদের দুধ দুইয়ে বাড়ি বাড়ি দিয়ে এল। দিনের শেষে গোয়ালার থেকে মজুরি বাবদ এক সের দুধ পেল।

বাড়ি এসে আগের দিনের পাওয়া চাল আর দুধ দিয়ে মনের মতো পায়েস তৈরি করল। পায়েসের ঘ্রাণে তার ছোট্ট কুটির ভরে উঠল। তার দেবতাকে নিবেদন করে পেট ভরে পায়েস খেয়ে ব্রাহ্মণ তার তক্তাপোষের পেছন থেকে থেকে একটা পুরনো কাঠের বাক্স বার করল। এর ভেতরে রয়েছে তার যাবতীয় পুথি। ধুলো ঝেড়ে বাক্স খুলে সেইসব পুথি খুলে বসল। চর্চার অভাবে যে বিদ্যা সে প্রায় ভুলতে বসেছে, সেই বিদ্যা আবার অধ্যয়ন শুরু করল।

রোজ সকালে বেরিয়ে সারাদিন মাঠে ঘাটে, গোয়াল ঘরে, তাঁতির বাড়ি, কুমোর বাড়ি কাজ করত। রাতে এসে রান্না করে খেয়ে মাঝরাত অবধি প্রদীপ জ্বালিয়ে বিদ্যাচর্চা করত। এইভাবে সে তার সমস্ত বিস্মৃত বিদ্যা আবার আত্মস্থ করল। তারপর একদিন গিয়ে উপস্থিত হল সেই বটতলায়। গিয়ে দেখে, বুড়ো পণ্ডিত খুব অসুস্থ, খুব কাশছেন, পড়াতেই পারছেন না। সত্যনাথ গিয়ে বলল, “ও পণ্ডিতমশাই, আমি চেষ্টা করব?”

“তুমি? তুমি তো সব ভুলে খেয়েছ।”

“না পণ্ডিতমশাই, আমি আবার সব চর্চা করেছি। আপনি পাশে বসে শুনুন।” এই বলে বুড়ো পণ্ডিতের পাশে বসে সত্যনাথ ছাত্রদের সুন্দরভাবে সংস্কৃত শ্লোক ব্যাখ্যা করে একের পর এক বোঝাতে লাগল। ছাত্ররা মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল। বুড়ো পণ্ডিতও অবাক হয়ে গেলেন।

অধ্যয়ন শেষে ছাত্ররা বুড়ো পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণকে প্রণাম করে চলে গেলে বুড়ো পণ্ডিত সত্যনাথকে বললেন, “এই পাঠশালার ভার আমি তোমায় দিলাম সত্যনাথ। আজ থেকে তুমিই এই পাঠশালার গুরু।”

বলেই বুড়ো পণ্ডিত খুব কাশতে লাগলেন। সত্যনাথ তাঁকে এসে ধরতেই বুঝতে পারল পণ্ডিতের গায়ে ধুম জ্বর। তাঁর বাড়িতেও কেউ ছিল না। সত্যনাথ তাঁকে নিজের কুটিরে নিয়ে গেল। শেষ ক’টা দিন সারা দিনরাত এক করে খুব সেবাশুশ্রূষা করল। শেষে এক ভোররাত্রে বুড়ো পণ্ডিত সত্যনাথকে অনেক আশীর্বাদ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

বুড়ো পণ্ডিত মারা যাবার পর সত্যনাথ পাঠশালাকে আরও সুন্দরভাবে সাজাল। নাম রাখল বুড়ো পণ্ডিতের পাঠশালা। ধীরে ধীরে সত্যনাথ গুরুমশাইয়ের নাম গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের জমিদার একটা পাকা ঘর বানিয়ে দিলেন পাঠশালার জন্য।

একদিন রাতে সত্যনাথ বসে লেখালেখি করছে, তখনই কুটির আলো করে আবির্ভূত হলেন আবার সেই দেবতা। সত্যনাথ দুই হাত জোড় করে দাঁড়াল। দেবতা বললেন, “বুঝলি তো?”

“কী, প্রভু?”

“এই যে, চাষির কাজ, গোয়ালার কাজ যা করতে চাইতিস না তা কী করে করে ফেললি! দিনের পর দিন যে পুথি কোনায় ফেলে রেখেছিলি, সেগুলো আবার কেন বের করলি!”

“প্রভু, ঠিক ভেবে তো দেখিনি।”

“এর উত্তর হল খিদে। যতদিন তোর খিদেটা প্রচণ্ডরকম তৈরি হয়নি, ততক্ষণ তুই কিছুই চেষ্টা করিসনি। তারপর যখন তোর সত্যিকারের খিদেটা পেল, তখন তুই কাজের বড়ো ছোটো বিচার করিসনি। তারপর নিজের চেষ্টায় যখন খিদে মেটালি, তখন নিজের ভেতরের ক্ষমতাকে নতুন করে আবিষ্কার করে তাকে ঘষে মেজে চকচকে করে তুললি।”

আলো মিলিয়ে গেল কথাগুলো বলেই। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে। অনেকক্ষণ সত্যনাথ বসে কালকের কথাগুলো ভাবল। তার মধ্যে নতুন এক উপলব্ধির জন্ম হল। সে বুঝল, প্রকৃত খিদেই মানুষকে সাফল্যের পথ প্রদর্শন করে।

সত্যনাথ তার পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত করল আরও একটি অধ্যায়।

সে এখন ছাত্রদের বিদ্যাদানের সঙ্গে এই খিদের গল্প বলে, যাতে তাদের মধ্যেও আলস্য দূর হয়ে সফল হওয়ার প্রবল ইচ্ছাশক্তির বীজটা বপন করা যায়, যাতে তারাও অক্লান্ত পরিশ্রম করেই নিজেদের প্রাপ্যটুকু অর্জন করতে শেখে।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী


No comments:

Post a Comment