বড়ো গল্পঃ টেক্কা - দৃপ্ত বর্মন রায়



“স্যার উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যানের নাম শুনেছ? তিনি কীসের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন জানো?”

ওপরের প্রশ্নদুটো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি কারো চোখে কোনো ক্যুইজ কম্পিটিশনের মঞ্চে দাঁড়ানো ক্যুইজ মাস্টার বা বোরিং হিস্ট্রি ক্লাসের জাঁদরেল গুঁফো টিচারের মুখ ভেসে ওঠে তাহলে সেটা নিতান্তই ভুল হবে, কারণ প্রশ্নদুটো করা হয়েছিল ‘জাগরণী সংঘ’-র উলটোদিকে সুবলদার চায়ের দোকানে আমাদের বিখ্যাত সান্ধ্যকালীন আড্ডাটায় আর প্রশ্নকর্তা ছিলেন প্রলয়েন্দু ঘোষাল মানে আমাদের সবার প্রিয় ঘোষালজেঠু।

ব্যাপারটা তাহলে একদম গোড়া থেকে খুলেই বলা যাক।

আসলে হয়েছে কী, ঘোষালজেঠু গত দেড় মাস ধরে আমাদের আড্ডায় আসেননি। না না! আমাদের সঙ্গে কোনো রাগারাগি বা মন কষাকষি হয়নি। উনি গিয়েছিলেন লন্ডনে, ওঁর ছেলের কাছে বেড়াতে। ওঁর অনুপস্থিতিতে এই কয়েকটা দিন আমাদের ভীষণ জোলো কেটেছে। বাধ্য হয়ে তাই আমরা কোনোরকমে কোনোদিন পাবলো নেরুদা আবার কোনোদিন পাড়ার ন্যাড়াদাকে নিয়ে চর্চা করেই সময় কাটিয়েছি। আর ওদিকে এই দেড় মাস ঘোষালজেঠু আর শুভ্রাজেঠিমা লন্ডনে ছেলে-বৌমা-নাতি-নাতনির সঙ্গে আনন্দ করে কাটানোর পর আজ ভোররাতে ল্যান্ড করেছেন কলকাতায়। আমরা ভেবেছিলাম জেটল্যাগের জন্যে আজ হয়তো উনি আর আসবেন না আমাদের আড্ডায়। কিন্তু সোয়া ছ’টা বাজতে না বাজতেই বিমলজেঠুর সঙ্গে ওঁকে হেঁটে আসতে দেখে আমরা নিমেষের মধ্যে চাঙ্গা হয়ে গেলাম। মুহূর্তের মধ্যে হইহই করে ল্যাংড়া আমের গন্ধে ধেয়ে আসা মাছির মতো ছেঁকে ধরলাম ওঁকে।

“লন্ডন কেমন ঘুরলে ঘোষাল? খালি ওখানেই ছিলে, না পুরো ইংল্যান্ডটাই ঘুরেছ?” জানতে চাইলেন শ্যামলজেঠু।

“লর্ডসে গিয়েছিলেন জেঠু? দেখলেন ওই ব্যালকনিটা যেখানে দাদা জার্সি ঘুরিয়েছিল?”

অভি প্রমাণ করল ওর পৃথিবীটা সূর্যের বদলে ক্রিকেটের চারপাশে পাক খায়।

“কেমব্রিজ বা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিটা ঘুরেছেন? পড়াশোনার পরিবেশ কেমন ওখানকার?”

কেমিস্ট্রির টিচার কল্লোলকাকুর বিলেতে পি.এইচ.ডি করার বাসনাটা যে একেবারে সুপ্ত হয়ে যায়নি বোঝা গেল।

চঞ্চলদা কয়েকদিন আগে নিউটাউনের মাদারস ওয়াক্স মিউজ়িয়মে ঘুরতে গিয়েছিল। সেই শকটা ও এখনও ভুলতে পারেনি। জিজ্ঞেস করল, “মাদাম ত্যুঁসোর মিউজ়িয়মে গিয়েছিলেন? কেমন ওখানকার মূর্তিগুলো?”

“আজ্ঞে, লন্ডন দেশটা কেমন দেখলেন বাবু? এখানকার সাথে মিল আছে?” হট্টগোলের মাঝে এক ফাঁকে পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করে সুবলদাও জেনে নিল কলকাতার লন্ডন হতে আর কতটা বাকি।

“আরে থামো তো তোমরা সবাই।” গলা চড়িয়ে বুম্বা দাবড়ে দিল সবাইকে, “আরে এসব প্রশ্নের উত্তর তো আমরা যে-কোনো ট্র্যাভেল ব্লগ থেকেই জেনে নিতে পারব। এসব বাদ দিন তো জেঠু, আপনি বরং ওখানকার কোনো অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা বলুন। টাওয়ার অফ লন্ডনে গেসলেন? নিজের কাটা মুণ্ডু হাতে অ্যান বোলিনের প্রেতাত্মাটা দেখেছেন?”

হাসিমুখেই এইসব প্রশ্নের ঝড় উপভোগ করছিলেন ঘোষালজেঠু। এবার ধীরেসুস্থে হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে বললেন, “তিষ্ঠ! তিষ্ঠ! বলব, সব বলব। তবে সবার আগে সুবল, এক কাপ চা দে তো বাবা। বহুদিন তোর হাতের তৈরি ‘ইস্পেশাল মশলা চা’ খাওয়া হয়নি।”

চা রেডিই ছিল। চট করে সুবলদা কাপ ধরিয়ে দিল হাতে। দুধ ছাড়া আদা দেওয়া সেই স্পেশাল চায়ে পরম নিশ্চিন্তে এক চুমুক দিয়ে ঘোষালজেঠু রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, “হ্যাঁ, যা বলছিলাম। সে তো খুবই ভালো সময় কাটালাম লন্ডনে, বুঝলে। সব গল্পই তোমাদের বলব একে একে। তবে সবচেয়ে আগে বলব এমন একটা কথা, যেটা আমি জানার সাথে সাথে কতদিনে তোমাদের সাথে শেয়ার করব বলে অপেক্ষা করে রয়েছি।”

আমরা কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। আরেক চুমুক চা খেয়ে ঘোষালজেঠু বললেন, “তবে আসল ঘটনাটা বলার আগে কয়েকটা কথা বলে নেওয়া দরকার। নাহলে তোমাদের বুঝতে একটু অসুবিধা হতে পারে। আচ্ছা বলো তো, তোমরা স্যার উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যানের নাম শুনেছ? তিনি কীসের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন জানো?”

আচমকা এরকম একটা বেয়াড়া প্রশ্নের ধাক্কায় আমাদের একে অপরের দিকে চেয়ে আমতা আমতা করতে দেখে ঘোষালজেঠু আবার প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, বাদ দাও। এটা বলো তো, ঠগি কারা ছিল জানো?”

“ঠগি! মানে থাগস?” এবার একটু কমন ঠেকল আমার, “ওরা তো সম্ভবত ডাকাত ছিল। তাই না?”

“কারেক্ট!” আমার দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন ঘোষালজেঠু, “একদম ঠিক বলেছ। এই ঠগিরা ছিল প্রাচীন ভারতবর্ষের এক ভয়ংকর, দুর্ধর্ষ দস্যুদল। অবশ্য একটা দল বলাটা ঠিক নয়, অসংখ্য ছোটো ছোটো দল ছিল এই ঠগিদের। ইন ফ্যাক্ট ওরা ছিল একটা... উম... কাইন্ড অফ গুপ্ত সংগঠন। ভীষণ নিষ্ঠুর, অবলীলায় মানুষ মারতে ওদের একটুও হাত কাঁপত না। এমনিতে ওরা ছিল একদম সাধারণ গরিব গ্রামবাসী। বছরের বেশিরভাগ সময়ই আর পাঁচটা দশটা লোকের মতো চাষবাস করে জীবন কাটাত এই ঠগিরা। কিন্তু চাষের মরসুম শেষ হলেই ওরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ত রাস্তায়। ওদের মূল টার্গেট কারা ছিল জানো? পথেঘাটে চলাচলকারী বিভিন্ন পথিক, তীর্থযাত্রী বা ব্যবসায়ীর দল যারা পায়ে হেঁটে একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত। এই ঠগিরাও সেইরকমই সাধারণ পথিক সেজে অন্যান্য পথিকদের দলের সাথে যোগ দিত। একসাথে পথ চলতে চলতে বিশ্বাস অর্জন করত নিরীহ মানুষগুলোর। তারপর কোনো নির্জন জায়গায় সেই পথিকদের গলায় রুমালের ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলে তাদের সর্বস্ব লুটে নিত। মেরে ফেলার পর ওইসব হতভাগ্য লোকগুলোর মৃতদেহ এমনভাবে মাটিতে পুঁতে গায়েব করে দিত যে কোনোদিন কেউ জানতেও পারত না যে মানুষগুলো কোথায় হারিয়ে গেল।”

ঠগিদের সম্বন্ধে অল্পবিস্তর পড়েছিলাম আগে। কিন্তু এতটা জানতাম না। দেখলাম আমার মতো বাকিরাও যেন শিউরে উঠল ভয়ংকর এই দস্যুদের কথা শুনে।

ঘোষালজেঠু বলতে থাকলেন, “ঠগিদের এক-একটা দলে হিন্দু, মুসলমান দুই ধর্মের লোকেরাই থাকত। কিন্তু মজার ব্যাপার হল হিন্দুরা তো বটেই, এদের মধ্যে মুসলমান ঠগিরাও সবাই প্রচণ্ড মা কালীর ভক্ত ছিল। ওরা মনে করত মা কালীর নির্দেশেই ওরা এই জীবিকায় নেমেছে এবং এই নিরপরাধ মানুষগুলোকে এমন নৃশংসভাবে মেরে ফেলেও ওদের কোনো পাপ হচ্ছে না বরং মা কালীর নির্দেশ সফলভাবে পালন করার জন্যে দেবীর কৃপাদৃষ্টি পড়ছে ওদের ওপর। আবার নতুন বছর বর্ষার সিজন শুরু হবার আগে ওরা কালীমন্দিরে গিয়ে মায়ের পুজো দিয়ে সব পাপ ধুয়ে মুছে ফেলে বৌ-বাচ্চাদের জন্যে নানা উপহার কিনে ফিরে যেত নিজের নিজের গ্রামে। এভাবে প্রায় পাঁচশো বছর ধরে ওরা দাপিয়ে বেরিয়েছে ভারতবর্ষের বুকে।”

“পাঁচশো বছর!” অভির এত বড়ো একটা হাঁ করে কথাটা বলল যে আরামসে একটা টেবিল টেনিস বল ঢুকে যাবে ওর মুখে।

“হ্যাঁ, প্রায় পাঁচশো বছর। এদের অস্তিত্বের কথা প্রথম জানা যায় জিয়াউদ্দিন বার্নির একটা লেখায় অ্যারাউন্ড তেরশ ছাপ্পান্ন সালে...”

“বাব্বা, একদম সন তারিখ অবধি গড়গড়িয়ে বলে দিচ্ছ! ব্যাপার কী? আড্ডায় আসার আগে ইতিহাসের বই মুখস্থ করে এসেছ নাকি?” বিমলজেঠু আর ঘোষালজেঠু পাশাপাশি বাড়িতে থাকেন। বয়সটাও কাছাকাছি। ভাবও যেরকম গলায় গলায়, কথায় কথায় ঠেস দিতেও ছাড়েন না একে অপরকে।

“ন্যাচরালি!” গল্পের মাঝে বাধা পড়ায় বিরক্ত হয়ে বললেন কল্লোলকাকু, “সেটাই তো স্বাভাবিক। কেউ যখন কোনো টপিক নিয়ে কিছু বলবে তখন সেই টপিক সম্বন্ধে সমস্ত হোমওয়ার্ক করেই তো আসা উচিত। তাই না?”

“সেটাই তো! আর তাছাড়া ইতিহাস বইয়ের কী দরকার? আজকাল স্মার্টফোনের মাধ্যমে গুগল, উইকিপিডিয়া তো হাতের মুঠোয়। কোনো বিষয় নিয়ে ডিটেলে হোমওয়ার্ক করার কোনো সমস্যাই তো নেই।” ঘোষালজেঠু পাদপূরণ করলেন।

“বাদ দিন তো জেঠু, আপনি বলুন কী বলছিলেন।” চঞ্চলদা বলে উঠল।

“হ্যাঁ যাই হোক, কোম্পানির আমল শুরু হবার পর এই ঠগিরা যখন মাঝে মাঝে কোম্পানির লোকেদের ওপর লুটপাট শুরু করল, তখন আস্তে আস্তে ব্রিটিশদের টনক নড়ল। ওঁরা তদন্ত শুরু করল এই ঠগিদের ব্যাপারে। এই কাজে সবচেয়ে অগ্রণী ছিলেন স্যার উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান। মূলত এঁরই একার প্রচেষ্টায় সবথেকে আগে ধরা পড়ল ফিরিঙ্গিয়া নামের এক কুখ্যাত ঠগি। তারপর এই ফিরিঙ্গিয়াকে রাজসাক্ষী বানিয়ে স্লিম্যান সাহেব একের পর এক ঠগিদলের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেন। শুধু এই ঠগিদস্যুদের ধরার জন্যে গঠিত হল একটা আলাদা ডিপার্টমেন্ট ‘ঠাগি অ্যান্ড ডেকোয়েটি ডিপার্টমেন্ট’। স্লিম্যান সাহেব হলেন এই দপ্তরের সুপারিন্টেনডেন্ট। এই দপ্তরের ব্যাপক ধরপাকড় অভিযানের দৌলতে সাত-আট বছরের মধ্যে ভারতবর্ষে প্রায় চোদ্দশো ঠগি ধরা পড়ল। প্রায় পাঁচশো বছর পর শেষ হল ভারতবর্ষে ঠগিদের জমানা। এই ধরা পড়া ঠগিদের বিচারে বেশিরভাগের হল মৃত্যুদণ্ড, বাকিদের হল কালাপানি, মানে দ্বীপান্তর আর কী। জানো, এদের মধ্যে একজন ছিল ঠগি বেহরাম। বললে বিশ্বাস করবে না, আনঅফিসিয়াল সূত্রে শোনা যায়, এই ঠগি বেহরাম নাকি প্রায় নয়শো লোককে হত্যা করেছিল তার পাগড়ির ফাঁস লাগিয়ে।”

আমরা প্রত্যেকেই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম এই দুর্ধর্ষ দস্যুদের কথা শুনে। তারপর নীরবতা ভাঙলেন ঘোষালজেঠুই, “যাই হোক, হিস্ট্রি লেকচার শেষ। এবার মূল গল্পে ফিরি। হয়েছে কী, আমার অকম্মার ঢেঁকি ছেলেটা জীবনে আর কিছু করতে পারুক বা না পারুক, অফিস থেকে লন্ডনের অন্যতম পশ এলাকা কিংস ক্রসে একখানা বাংলো আদায় করেছে। এবার আমরা ওখানেই গিয়ে উঠেছিলাম। কিংস ক্রস জায়গাটা, ধরে নাও, কলকাতার যেমন সল্টলেক, ঠিক সেরকমই। সমাজের উঁচুতলার হাই-ফাই লোকেদের বাড়ি সেখানে। সে অবশ্য আমার ছেলে বাড়ি আর অফিস ছাড়া আর কিছুই জানে না। ওকে দোষ দিয়েও লাভ নেই, আজকালকার ছেলেপুলেরা এইরকমই। তাই পাড়াপ্রতিবেশীদের সাথে হাই হ্যালো ছাড়া ওদের খুব বেশি আলাপ পরিচয় ছিল না। কিন্তু আমি সেখানে গিয়ে অভ্যাসমতো সকালবেলা নিয়মিত বাড়ির কাছাকাছি একটা জগারস পার্কে মর্নিং ওয়াক করতে যেতাম। সেখানে এক সাহেবের সাথে প্রত্যেকদিনই দেখা হত। কিছুদিনের মধ্যে শুরু হল হাসি বিনিময়। তারপর একদিন সাহেব যেচে এসে আলাপ করলেন আমার সাথে। তাঁর নাম ড্যামিয়েন মরিস। বাড়ি আমার ছেলের বাড়ির কয়েকটা বাড়ি পড়েই। বয়স আমার থেকে একটু বেশি। কিন্তু একদম ফিট চেহারা। দুই ছেলের বড়োজন থাকে নিউ ইয়র্কে, ছোটোটা অস্ট্রেলিয়ায়। কথা বলে বুঝলাম বুড়োবুড়িও আমাদের মতোই একলা মস্ত বড়ো বাড়ি পাহারা দেন। আমি ইন্ডিয়ান জেনে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে জানালেন, ওঁর বাবা ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে পোস্টেড ছিলেন। ওঁর জন্মও হয় ভারতে, সাতচল্লিশের কিছু আগে। ভারত স্বাধীন হবার পর ওঁরা সপরিবারে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। শুধু তাই নয় ওঁর আরেক পূর্বপুরুষও আগে কোম্পানির আমলে ভারতবর্ষে ছিলেন বেশ কিছুদিন। যে জিনিসটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগল সেটা হল ওঁর কথাবার্তা থেকে হামবড়াই বা তাচ্ছিল্যের বদলে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে একটা শ্রদ্ধার ভাব ফুটে উঠছিল। গ্যাংগুলি আর টেনডুলকারের বিশাল ভক্ত। আমার সাথে আলাপ করে উনি যে খুব খুশি হয়েছিলেন সেটা ওঁর কথাবার্তায় বেশ ভালোই টের পাওয়া যাচ্ছিল। কথায় কথায় আমাদের ওঁর বাড়িতে চায়ের নেমন্তন্নও করে বসলেন। বললেন আমি এলে নাকি উনি আমাকে দারুণ একটা জিনিস দেখাবেন। জানতে চাইলাম কী জিনিস? কিন্তু বললেন না। বললেন ওটা সারপ্রাইজ।”

“তারপর? গেলেন ওঁর বাড়িতে?” প্রশ্ন করল অভি।

“হ্যাঁ। দুয়েকদিন পর এক বিকেলে তোমাদের জেঠিমাকে নিয়ে গেলাম সাহেবের বাংলোয়। অনেকটা জায়গা নিয়ে ভিক্টোরিয়ান আর্কিটেকচারে তৈরি দোতলা বাড়ি। সামনে চারপাশে পাঁচিল ঘেরা মস্ত বড়ো একটা লন। গেট থেকে মোরাম ঢালা পথ সোজা চলে গেছে সদর দরজার নীচে পোর্টিকো পর্যন্ত। ডোর বেল বাজানোর পর টাক্সিডো পরা এক বাটলার এসে দরজা খুলে দিল। লিভিং রুমটা এত বড়ো যে অনায়াসে ক্রিকেট খেলা যাবে। মেঝে পর্যন্ত লম্বা বড়ো বড়ো ফ্রেঞ্চ উইন্ডোতে লাল রং-এর সাটিনের পর্দা ঝুলছে। দু-দিক থেকে ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার দিকে। ঘরের সমস্ত আসবাবপত্রগুলোতেই বৈভব আর আভিজাত্যের ছোঁয়া। চারদিকের দেওয়ালে ঝুলছে একের পর এক নাম না জানা দামি দামি পেন্টিং। সবমিলিয়ে একেবারে এলাহি ব্যাপার-স্যাপার।”

“বাপ রে!” চোখ বড়ো বড়ো করে মন্তব্য করল বুম্বা, “একদম সিনেমার মতো।”

“হ্যাঁ, সেই। আগে তো ভদ্রলোককে দেখে এতটা বুঝতে পারিনি, তাই এসে পড়েছি। এবার ভাবছি মানে মানে কেটে পড়ব নাকি, এমন সময় দোতলা থেকে নেমে এলেন গৃহস্বামী মিঃ মরিস আর তাঁর স্ত্রী। আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের। ভদ্রমহিলাও দেখলাম স্বামীর মতোই মিশুকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মিসেসের সাথে ওঁর ভালো জমে গেল। কথায় কথায় জানলাম মিঃ মরিস ব্রিটেনের এক খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। রিটায়ারমেন্টের আগে উনি ব্রিটিশ মিউজিয়মের কিউরেটর ছিলেন। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করার পর একজন বাটলার এসে আমাদের বলল যে টেবিল রেডি। আমরা চায়ের জন্যে চলে আসতে পারি। ওঁরা আমাদের নিয়ে এলেন পাশের ডাইনিং হলে। সেখানে গিয়ে দেখি প্রায় ষোলোজন বসার মতো বিশাল লম্বা একটা টেবিল-ভরা প্রচুর খাবারদাবার। পুডিং, কাস্টার্ড, কেক, পেস্ট্রি, চিকেন স্যান্ডউইচ, হ্যাম, সসেজ—কী নেই সেখানে। চিন্তা নেই, খাওয়াদাওয়ার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তোমাদের মনে আর দুঃখ দেব না। মোদ্দা কথা, খাওয়াদাওয়া সেরে কফির কাপ হাতে নিয়ে আমরা আবার এসে বসলাম লিভিং রুমে। আমি একটু উসখুস করছিলাম কী সারপ্রাইজ উনি আমাকে দেখাতে চলেছিলেন সেটার জন্যে। হয়তো ব্যাপারটা বুঝেই মিঃ মরিস আমাকে বললেন চলুন আপনাকে আমার স্টাডি কাম লাইব্রেরিতে নিয়ে যাই।”

একটু থামলেন ঘোষালজেঠু। চা-টা শেষ করে কাপটা নামিয়ে রাখলেন বেঞ্চের তলায়। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “স্টাডি কাম লাইব্রেরিটা দেখে আবার আমার তাক লেগে গেল। আমাদের প্রায় তিনটে ঘরের সমান ওঁর লাইব্রেরিটা। দশ-বারোটা দেড় মানুষ উঁচু বইয়ের র‍্যাকভর্তি হরেকরকমের বই। মনে হয় পৃথিবীর হেন কোনো বিষয় নেই যে বিষয়ের বই ওঁর কালেকশনে নেই। আমি অবাক হয়ে ওঁর বইয়ের বিরাট সম্ভার দেখছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম এটাই হয়তো ওঁর বলা সেই সারপ্রাইজ, এমন সময় উনি আমাকে নিয়ে গেলেন ঘরের একপ্রান্তে রাখা মস্ত সেক্রেটারিয়েট টেবিলটার কাছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম একটা সুন্দর নকশা করা কাঠের বাক্স টেবিলটার ওপরে রাখা। উনি বাক্সটার ডালা খুলে আমাকে দেখালেন। দেখলাম বাক্সটার ভিতরে লাল চামড়ায় বাঁধানো মলাটের কয়েকটা ডায়েরির মতো কিছু রাখা। আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে মিঃ মরিস বললেন উনি যে আগে বলেছিলেন ওঁর আরেকজন পূর্বপুরুষ কোম্পানির আমলে কিছুদিন ভারতে ছিলেন, এগুলো সেই পূর্বপুরুষ, জোনাথন মরিসের ভারতে থাকাকালিন লেখা ডায়েরি। জোনাথন মরিস আঠেরোশো ছত্রিশ সালে মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে ভারতে যান। ছয় বছর সেখানে থাকার পর আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ায় আঠেরোশো বিয়াল্লিশে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। ভারতবর্ষে থাকাকালিন একাকিত্বের জন্যে সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে উনি ডায়েরি লেখা শুরু করেন। এগুলো সেই ডায়েরিগুলোই যেগুলো বংশপরম্পরায় মরিস পরিবার সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছেন।”

“তারপর?”

ঘোষালজেঠুর কথা শুনতে শুনতে এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম যে খেয়াল করলাম না কে করল প্রশ্নটা।

“ডায়েরিগুলোর পাতা উলটে দেখলাম সুন্দর হ্যান্ড রাইটিং-এ ঝরঝরে ইংরাজিতে লেখা দিনলিপি। আমার তো দেখামাত্রই খুব লোভ হচ্ছিল পড়ার। মিঃ মরিসও বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন ব্যাপারটা। জানতে চাইলেন আমার পড়তে ইচ্ছে করছে নাকি। লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই বসলাম হ্যাঁ। তখন উনি নিজে থেকেই প্রস্তাব দিলেন যে আমি পরের কয়েকদিন যে-কোনো সময় এখানে চলে এসে পড়ে যেতে পারি ডায়েরিগুলো। শুধু আসার আগে ওঁকে একটু জানিয়ে দিলেই হবে। আমি তো শোনামাত্রই লুফে নিলাম প্রস্তাবটা। পরেরদিন থেকেই শুরু করলাম ওঁর বাড়ি গিয়ে ডায়েরি পড়া। টানা চারদিন রোজ দুপুর দুটো থেকে চারটে অবধি পড়ে শেষ করলাম ডায়েরিগুলো।”

“কী লেখা ছিল ডায়েরিগুলোতে?” শ্যামলজেঠু জানতে চাইলেন।

“প্রথম বছরের ডায়েরিটার বেশিরভাগ দিনেই ছিল ইংল্যান্ড ছেড়ে আসা জোনাথন মরিসের একাকিত্বের বর্ণনা। ভারতবর্ষে এসে যে তাঁর সময় কাটছিল না, বন্ধুবান্ধবদের মিস করছিলেন, ইংল্যান্ডে রেখে আসা নববিবাহিত স্ত্রীকে ছেড়ে থাকার জন্যে কষ্ট পাচ্ছিলেন—এসবই ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। পরের দিকের লেখা অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিল। মাসে মাত্র চার-পাঁচদিনের এন্ট্রি থাকত, তাও আবার কোনো বিশেষ বিশেষ ঘটনা ঘটলে। ঊনচল্লিশ সালে উনি নিযুক্ত হন ‘ঠাগি অ্যান্ড ডেকোয়েটি ডিপার্টমেন্ট’-এ। এই দপ্তরে যোগ দেবার পর জোনাথন মরিস স্লিম্যান সাহেবের অধীনে কাজ করার সুযোগ পান। স্লিম্যান সাহেব ততদিনে এই দপ্তরের সুপারিন্টেনডেন্ট থেকে কমিশনার পদে উন্নীত হয়েছেন। এই সময় থেকে ওই ডায়েরিগুলোতে মাঝে মাঝেই কোনো দিনলিপিতে বিভিন্ন ঠগিদস্যু বা ডাকাতদের নাম, তাদের অত্যাচারের বিবরণ, তাদের ধরার গল্প এইসব লেখা ছিল।”

“আরে বাপ রে! দারুণ ব্যাপার তো।” বুম্বা আবদারের সুরে বলল, “শোনান না এরকম কয়েকটা গল্প।”

“সব তো আর বলা সম্ভব না। এইসবের মধ্যে যে ঘটনাটা আমার সবথেকে ইন্টারেস্টিং লেগেছে সেই ঘটনাটাই তোমাদের শোনাতে পারি। ইন ফ্যাক্ট ডায়েরির সেই দু-দিনের এন্ট্রি পড়েই আমি ঠিক করে ফেলি যে এটা তোমাদের শোনাতে হবে। তাই মিঃ মরিসের অলক্ষ্যে ওই দু-দিনের লেখাগুলো আমি আমার স্মার্টফোনে ফটো তুলে নিই। পরে অবসর সময়ে বসে সেই লেখাগুলো আমি বাংলাতে ট্রান্সলেটও করে ফেলেছি। অনুবাদ করার সময় জোনাথন মরিসের লেখা মোটামুটি নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট অবিকৃত রেখে শুধু গল্পের খাতিরে কিছু লাইন এদিক ওদিক করে বা কিছু অবান্তর লাইন বাদ দিয়ে একটু ড্রামাটাইজ করে নিয়েছি আর কী। আর হ্যাঁ, শুধু তাই নয়, আঠেরোশো শতাব্দীর ফিলিংস আনার জন্যে চলতি বাংলার বদলে সাধু ভাষার প্রয়োগ করেছি। এখন দ্যাখো, লেখক হিসেবে আমার খুব একটা সুনাম কোনোকালেই ছিল না আবার জোনাথন মরিসও শেক্সপিয়ারের আত্মীয় নন। তাই সবমিলিয়ে ব্যাপারটা যে খুব একটা সুখপাঠ্য বা সুখশ্রাব্য হয়েছে সেই দাবি করাটা ঠিক হবে না। তবে তোমরা যদি গিনিপিগ হতে রাজি থাকো তাহলে তোমাদের সেটা পড়ে শোনাতে পারি।”

ঘোষালজেঠুর প্রস্তাবে সম্মতি জানাতে আমরা যতটুকু সময় নিলাম উসেইন বোল্টও বোধ হয় সেটুকু সময়ের মধ্যে একশো মিটার দৌড়তে পারতেন না। সিগারেটে শেষ সুখটানটা দিয়ে সেটাকে ফেলে জেঠু পকেট থেকে কয়েকটা প্রিন্ট আউট করা এ-ফোর শিট বের করে পড়তে শুরু করলেন।



১৪ই অগাস্ট, ১৮৪১। শনিবার। লক্ষ্ণৌ।

গত তিনদিন এত ব্যস্ততার মধ্যে দিয়া দিন কাটিয়াছে যে ডাইরি লিখিবার সময় করিয়া উঠিতে পারি নাই। তাই অদ্য রাত্রে একটু সময় পাইয়া লিখিতেছি। গত বৃহস্পতিবার বৈকালে দপ্তরে থাকাকালীন আর্দালি আসিয়া আমাকে জানাইল যে কমিশনার স্যার স্লিম্যান আমাকে তলব করিয়াছেন। শুনিবামাত্র তাঁহার ঘরে উপস্থিত হইতে তিনি আমাকে বলিলেন আমাকে অবিলম্বে লক্ষ্ণৌ যাইতে হইবে। তিনি আরো জানাইলেন যে দুইদিন পূর্বে অর্থাৎ সোমবার লক্ষ্ণৌয়ের পার্শ্ববর্তী একটি গ্রাম হইতে কুখ্যাত ঠগি ভুবন সাধু ধরা পড়িয়াছে। যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে আগামী রবিবার তাহার ফাঁসির সাজা কার্যকরী করিবার সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছে। আমার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছে যাতে আমি লক্ষ্ণৌ গিয়া সমস্ত প্রক্রিয়াটি যাহাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় তাহা সুনিশ্চিত করি।

ঠগি ভুবন সাধু সম্বন্ধে আমি পূর্বেই শুনিয়াছিলাম। তবে কখনো চাক্ষুষ করি নাই। ঠগি ফিরিঙ্গিয়ার বক্তব্য অনুসারে এই ভুবন সাধু হইল ঠগি বেহরামের পর ভারতবর্ষের সবচেয়ে নৃশংস এবং দুর্ধর্ষ এক ঠগি দলনেতা। প্রায় শতাধিক নিরীহ ব্যক্তির হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এই পাপিষ্ঠ অপরাধী তিন মাস পূর্বে ধরা পড়িয়াছিল। বিচারে তাহার ফাঁসির সাজা ধার্য হয়। কিন্তু চতুর এই ঠগিদস্যু ফাঁসির হুকুম কার্যকরী করিবার আগেই জাবালপুর কারাগার হইতে পলায়ন করে। প্রায় একমাস ফেরার থাকিবার পর তাহাকে পুনরায় ধরিতে সক্ষম হওয়াটা সত্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু ফাঁসির সাজা দিবার জন্য তাহাকে লক্ষ্ণৌ হইতে জাবালপুর লইয়া আসিতে গেলে পথে সে পুনরায় পলায়ন করিবার প্রচেষ্টা করিতে পারে। তাই স্যার স্লিম্যান এইযাত্রা আর কোনোরূপ ঝুঁকি না লইয়া লক্ষ্ণৌ কারাগারেই তাহাকে ফাঁসিতে ঝুলাইবার সিদ্ধান্ত লইয়াছেন এবং ইহা তদারক করিবার জন্যই আমাকে লক্ষ্ণৌ যাইতে হইবে।

যাহাই হউক, গতকল্য ভোর থাকিতে থাকিতেই আমি জাবালপুর হইতে লক্ষ্ণৌয়ের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। সমস্ত দিন পথেই কাটিয়া গেল। রাত্রে বিশ্রাম লইয়া আবার অদ্য ভোরে যাত্রা শুরু করিয়া লক্ষ্ণৌ পৌঁছাইলাম বেলা দশ ঘটিকায়। কারাগারের চৌহদ্দির ভিতরেই জেলার মিঃ গ্রিফিথের বাংলোয় আমার থাকিবার বন্দোবস্ত হইয়াছিল। মিঃ গ্রিফিথ আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। আমি পৌঁছাইবা মাত্র আমাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাইয়া লইয়া গেলেন আমার জন্যে সুসজ্জিত অতিথি কক্ষে। জানাইলেন যে প্রাতরাশ প্রস্তুত। আমি যেন হস্ত মুখ প্রক্ষালন করিয়া চলিয়া আসি প্রাতরাশ সম্পন্ন করিতে। প্রাতরাশ চলাকালীন মিঃ গ্রিফিথ জানাইলেন যে যদিও তাঁহারা সর্বদিক হইতে প্রস্তুত আগামী কল্য ফাঁসির হুকুম কার্যকরী করিবার ব্যাপারে, তাহা সত্ত্বেও আমি আসাতে তিনি কিঞ্চিৎ ভরসা পাইয়াছেন। ভুবন সাধু অতীব বিপজ্জনক অপরাধী, তদুপরি সে একজন ধর্মীয় গুরু স্থানীয় ব্যক্তিত্ব। সকলের বিশ্বাস সে তন্ত্রমন্ত্রে শিক্ষিত এবং অনেক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতীয় সিপাহীরা পাছে এই সাধু কর্তৃক তাহাদের কোনো ক্ষতিসাধন হয় এই ভয়ে ভীত হইয়া রহিয়াছে। এমতাবস্থায় আমার উপস্থিতি তাহাদের সাহস যোগাইবে।

প্রাতরাশ সম্পন্ন হইলে আমি মিঃ গ্রিফিথের সহিত ভুবন সাধুর সহিত দেখা করিবার নিমিত্ত ভুবন সাধুর প্রকোষ্ঠে আসিলাম। লৌহনির্মিত দ্বারের অপর পার্শ্বে অতীব ক্ষুদ্রাকার প্রকোষ্ঠটিতে বেলা বারো ঘটিকার সময়েও নিকষ কালো অন্ধকার। লণ্ঠনের আলোয় দেখিলাম কুখ্যাত ভুবন সাধুকে। প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা, দৈত্যাকার চেহারা। পরনে বহু ব্যবহারে মলিন গাঢ় রক্তবর্ণের কটিবস্ত্র, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। মস্তকে রুক্ষ কেশরাশি জটাকারে বদ্ধ। গৌরবর্ণ মুখমণ্ডলে দীর্ঘ ঘনকৃষ্ণ শ্মশ্রু-গুম্ফরাজি। ললাটে রক্তবর্ণের টীকা। আমি ভাবিয়াছিলাম মৃত্যুর দোরগোড়ায় আসিয়া হয়তো এই দুর্ধর্ষ দস্যুর মনে ভীতির উদ্রেক হইবে। কিন্তু স্তম্ভিত হইয়া দেখিলাম ইহার মনে ভীতি অথবা অনুশোচনার লেশমাত্র চিহ্ন অনুপস্থিত। আমাকে দেখিয়া সে বিদ্রূপের স্বরে মিঃ গ্রিফিথকে প্রশ্ন করিল, “কী জেলার সাহেব, এ কাহাকে লইয়া আসিয়াছ আমার সম্মুখে?”

মিঃ গ্রিফিথ আমার পরিচয় দিবামাত্র সেই নরাধম আমার প্রতি দৃষ্টি ফিরাইয়া উচ্চৈঃস্বরে হাস্য করিয়া বলিল, “ওহ-হো! তোমাকে সিলম্যান সাহেব পাঠাইয়াছেন বুঝি আমাকে ফাঁসিতে চড়াইবার জন্য? কিন্তু তোমাদিগের আশা তো পূর্ণ হইবে না সাহেব। কালীমাতা আমার সহায়। তাঁহার কৃপায় তোমাদিগকে টেক্কা দিয়া আমি ঠিক পলাইয়া যাইব, দেখিয়া লইয়ো। আর তোমরা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ চোষণ ব্যতীত আর কিছুই করিতে পারিবে না। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।”

পাপিষ্ঠের স্পর্ধা দেখিয়া আমার ইচ্ছা করিতেছিল পার্শ্বে দণ্ডায়মান কারারক্ষীর হস্ত হইতে রাইফেলটি কাড়িয়া লইয়া গুলি করিয়া ইহার মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া দিই। অতিকষ্টে আত্মসংবরণ করিয়া বাহির হইয়া আসিলাম প্রকোষ্ঠ হইতে। মিঃ গ্রিফিথ জানাইলেন ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। আমি চাহিলে তাহা পরিদর্শন করিতে পারি। আমি সম্মত হইয়া তাঁহার সহিত আসিলাম কারাগারের এক প্রান্তে নির্মিত ফাঁসিমঞ্চের পার্শ্বে। প্রায় দশ ফুট উচ্চতা মঞ্চটির। একপার্শ্বে নির্মিত সোপানাবলী বাহিয়া মঞ্চে উঠিলাম। মঞ্চের মধ্যবর্তী স্থানে দুইপার্শ্বে শক্ত কাষ্ঠ দ্বারা নির্মিত প্রায় আট ফুট উচ্চ দুইটি উলম্ব স্তম্ভ। স্তম্ভদুইটিকে যুক্ত করিয়া রাখিয়াছে আরেকটি অনুভূমিক কাষ্ঠদণ্ড। সেই কাষ্ঠদণ্ড হইতে ঝুলিতেছে শেষপ্রান্তে ফাঁস সমেত ফাঁসির রজ্জু। উহার নিচে মঞ্চের ওপর রহিয়াছে একটি পাটাতন যাহা ফাঁসির মুহূর্তে মঞ্চের পার্শ্বস্থিত লিভারের টানে নিম্নাভিমুখে খুলিয়া যাইবে এবং গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ভুবন সাধুর দেহ মঞ্চের নিম্নে অন্তর্হিত হইবে। আমার উপস্থিতিতে ফাঁসুড়েরা ভুবন সাধুর দেহভারের সমান ভারবিশিষ্ট বালুকাপূর্ণ থলি ঝুলাইয়া পরীক্ষা করিয়া দেখাইল ফাঁসিকাষ্ঠের ভারবহনকারী ক্ষমতা। সম্পূর্ণ আয়োজন এতটাই নিখুঁত যে সন্তুষ্ট না হইবার কোনো কারণ নাই। আমার বক্ষ হইতে দুশ্চিন্তার ভার যেন কিছুটা কমিল।

বৈকালে মিঃ গ্রিফিথের কক্ষে বসিয়া তাঁহার সহিত কফি সেবন করিতেছি, এমতাবস্থায় জনৈক কারারক্ষী আসিয়া জানাইল যে কদিপয় গ্রামবাসী আসিয়াছে। তাহারা ভুবন সাধুর গ্রামের লোক, ভুবন সাধুর দর্শনপ্রার্থী। উহাদের ভুবন সাধুর সহিত সাক্ষাৎ করিতে দেওয়া যাইবে কি না? আমি এবং মিঃ গ্রিফিথ কিছুক্ষণ আলোচনা করিয়া ঠিক করিলাম যে উহাদের সাক্ষাৎ করিতে দিতে কোনো বাধা নাই। কারারক্ষীকে শুধু নির্দেশ দিলাম যে উহাদের যেন অতি উত্তমরূপে তল্লাশি করিয়া তাহার পর ভুবন সাধুর নিকটে লইয়া যাওয়া হয়। কারারক্ষী আরো জানাইল যে উহারা একটা প্রকাণ্ড তরমুজ ফল আনিয়াছে। ভুবন সাধু নাকি তরমুজ খাইতে খুব পছন্দ করে। আমরা ইহাতেও আপত্তি করিলাম না, কারণ প্রায়শই কারাগারে বন্দীদের জন্য তাহাদের পরিবারের লোকেরা ফল অথবা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যাদি আনিয়া থাকে। ইহাতে সন্দেহজনক কিছুই নাই।

সাবধানতার নিমিত্ত উহারা থাকাকালীন আমি একবার উপস্থিত হইলাম দর্শনকক্ষে। বাহিরে প্রহরীদের কড়া প্রহরায় রত দেখিয়া মনে মনে খুশি হইয়া উঠিলাম। দর্শনকক্ষের ভিতরে এক ঝলক দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলাম তাহারা সকলে মিলিয়া তরমুজ খাইতে ব্যস্ত। ভুবন সাধুর সহিত দৃষ্টি সংযোগ হইবামাত্র সে উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করিয়া বলিল, “কী সাহেব, তরমুজ খাইবে নাকি? খাইতে হইলে আইস।”

উহার ধৃষ্টতা দেখিয়া আমার সমস্ত গাত্র রি রি করিয়া উঠিল। উত্তর না দিয়া চলিয়া আসিলাম মিঃ গ্রিফিথের কক্ষে।

আগামী কল্য প্রত্যূষে সাড়ে চার ঘটিকায় ফাঁসির প্রহর নির্ধারিত হইয়াছে। তাই রাত্র আটটার মধ্যে ভুবন সাধুর শেষ ইচ্ছা অনুসারে তাহার আহার সম্পন্ন করানো হইল। তাহার পর তাহাকে তাহার প্রকোষ্ঠে ঘুমাইতে দিয়া আমরা চলিয়া আসিলাম মিঃ গ্রিফিথের বাংলোয়। কাল প্রত্যূষে উঠিতে হইবে বলিয়া আমরাও সত্বর আহারাদি সম্পন্ন করিয়া ঘুমাইতে চলিয়া আসিলাম।

এখনো পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক চলিতেছে। পরম করুণাময় যিশুর কৃপায় বাকি কার্যটুকুও যাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় ইহাই প্রার্থনীয়।


১৫ই অগাস্ট, ১৮৪১। রবিবার। লক্ষ্ণৌ।

গতকল্য রাত্রে শীঘ্র শুইতে যাওয়া সত্ত্বেও নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটিতেছিল। দুশ্চিন্তা হইতেছিল সমস্ত কিছু সঠিকরূপে সম্পন্ন হইবে কি না। শেষপর্যন্ত দুই চক্ষু একত্রিত হইলেও ঘুমাইবার বেশি সময় পাইলাম না। উঠিবার সময় হইয়া যাওয়ায় অল্পক্ষণের মধ্যে নিদ্রাত্যাগ করিতে হইল।

প্রস্তুত হইয়া মিঃ গ্রিফিথের দপ্তরে পৌঁছাইলাম তিন ঘটিকায়। দেখিলাম ইতিমধ্যে কারাগারের চিকিৎসক ডঃ মর্গ্যানও উপস্থিত হইয়াছেন। জনাকয়েক কারারক্ষী প্রস্তুত ছিল। মিঃ গ্রিফিথের নির্দেশে তাহারা ভুবন সাধুকে ডাকিবার তরে প্রস্থান করিল। আমার যাইবার প্রয়োজন ছিল না। তথাপি তাহাদের অনুসরণ করিলাম। দেখিলাম ভুবন প্রকোষ্ঠের লৌহদ্বারের গাত্রে অবস্থিত চতুর্ভুজাকার গরাদ ধরিয়া নির্লিপ্ত নির্বিকারচিত্তে দণ্ডায়মান। যেন আমাদেরই প্রতীক্ষায় রত। বিস্মিত হইলাম না। মৃত্যুর পূর্বরাত্রে নিদ্রা না হওয়াটাই স্বাভাবিক। দ্বারে আবদ্ধ কুলুপ খুলিয়া তাহাকে স্নান করাইবার নিমিত্ত বাহিরে লইয়া আসা হইল। তাহাকে দেখিয়া মনে হইতেছিল সে যেন উৎফুল্ল হইয়া সমস্ত নির্দেশ পালন করিতেছে। স্নান সমাপ্ত হইলে তাহার মলিন পোশাক পরিবর্তন করাইয়া তাহাকে শ্বেতশুভ্র বসনে সজ্জিত করা হইল। পণ্ডিত আসিয়া গীতাপাঠ করিয়া শুনাইলেন। সর্বশেষে তাহাকে তাহার অপরাধের নথিপত্র এবং মহামান্য আদালতের দণ্ডাদেশ পড়িয়া শোনানো হইল।

এই সমস্ত প্রক্রিয়া সমাপ্ত হইবার পর তাহাকে লইয়া আসা হইল ফাঁসিমঞ্চের সম্মুখে। আশ্চর্যের বিষয়, তখনো পর্যন্ত তাহার মুখমণ্ডলে অনুতাপের কোনো চিহ্ন প্রকাশ পাইতেছিল না। বরঞ্চ আমাকে দেখিয়া সে হাস্যমুখে আমার নিকটে আসিয়া বলিল, “কী সাহেব, এখনও ভাবিতেছ তোমরা আমাকে সাজা দিতে সক্ষম হইবে? পারিবে না সাহেব, পারিবে না। উপরন্তু ব্যর্থ হইয়া তোমরা উপহাসের পাত্র হইবে। স্বয়ং কালীমাতার সন্তানকে ফাঁসি দিবার ক্ষমতা তোমাদের মতন ম্লেচ্ছ সাহেবদের কখনো ছিলও না, কোনোদিন হইবেও না। তাহার চাইতে আজ আমি তোমাকে একটি কথা বলিতেছি, মন দিয়া শুনো। আজিকের দিবস স্মরণে রাখিও। অদূর ভবিষ্যতে ঠিক এই দিবসে তোমরা সাহেবরা পর্যুদস্ত হইয়া মুখে চুন কালি মাখিয়া আমাদের ভারতবর্ষ হইতে বিতাড়িত হইবে, দেখিও। সেইদিন ভুবন সাধুর এই ভবিষ্যৎবাণী মিলাইয়া লইও।”

তাহার কথা শুনিয়া আশ্চর্য হইয়া গেলাম। ক্রোধান্বিত হইতে গিয়াও অকস্মাৎ একটি ধারণা জন্মাইল আমার মনে। এমনও তো হইতে পারে অনিবার্য মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়া ইহার মস্তিষ্কের বিকার ঘটিয়াছে। তাহা না হইলে আসন্ন মৃত্যুর সম্মুখে দাঁড়াইয়াও কেহ এইরূপ অর্থহীন অসম্ভব কথাবার্তা কী করিয়া বলিতে পারে? যাহাদের সাম্রাজ্যে কদাপি সূর্যাস্ত হয় না, সেই পরাক্রমশালী ব্রিটিশরা এই দুর্বল ভারতবাসীদিগের নিকট পর্যুদস্ত হইয়া বিতাড়িত হইবে? প্রলাপ মনে করিয়া উপেক্ষা করিলাম তাহার বাক্যসমূহ।

ধীর পদক্ষেপে তাহাকে মঞ্চে তুলিয়া ফাঁসিরজ্জুর নিম্নে পাটাতনের উপর দণ্ডায়মান করানো হইল। ফাঁসুড়ে আসিয়া তাহার হস্ত পশ্চাতপানে লইয়া রজ্জুবদ্ধ করিল। মস্তক কৃষ্ণকায় গুণ্ঠন দ্বারা আবৃত করিয়া কণ্ঠে ফাঁস পরাইয়া দেওয়া হইল। আমরা মঞ্চের নিচে অপেক্ষমাণ রহিলাম। ফাঁসুড়ে মঞ্চের পার্শ্বে অবস্থিত লিভারের নিকট গিয়া লিভার হস্তে মিঃ গ্রিফিথের নির্দেশের জন্য তাঁহার প্রতি নির্নিমেষ চাহিয়া রহিল।

পকেট ঘড়িতে ঠিক সাড়ে চারিটা বাজিতেই মিঃ গ্রিফিথ তাঁহার হস্তস্থিত রুমাল ভূমিতে নিক্ষেপ করিলেন। তাহা দেখিয়া ফাঁসুড়ে লিভার আকর্ষণ করিল। একটি কাষ্ঠল শব্দ করিয়া পাটাতনটি খুলিয়া গেল এবং ফাঁসবদ্ধ ভুবনের দেহখানি নিম্নের গহ্বরে অদৃশ্য হইয়া গেল। শুধুমাত্র অনুভূমিক কাষ্ঠদণ্ডের সহিত আবদ্ধ অবস্থায় ফাঁসির রজ্জুটি দ্রুত আন্দোলিত হইতে লাগিল।

কিন্তু ক্ষণিকের মধ্যে এক প্রচণ্ড শব্দে আমরা প্রত্যেকে চমকিত হইয়া উঠিলাম। অতীব বিস্ময়ের সহিত প্রত্যক্ষ করিলাম সমস্ত মঞ্চটি অতর্কিতে তীব্ররূপে কাঁপিয়া উঠিল এবং নিমেষের মধ্যে দিয়াশলাই বাক্সের মতো ধূলিসাৎ হইয়া ভাঙ্গিয়া পড়িল। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হইয়া আমরা চাহিয়া রহিলাম সম্মুখে। কয়েক মুহূর্ত বিহ্বল অবস্থায় কাটাইবার পর মিঃ গ্রিফিথ সক্রোধে দুর্বল মঞ্চ প্রস্তুত করিবার জন্য কারারক্ষীদের তিরস্কার করিতে থাকিলেন এবং ধ্বংসস্তূপ হইতে ভুবনকে উদ্ধার করিয়া বাহিরে লইয়া আসিবার নির্দেশ দিলেন। আমি বিস্ময়াভিভূত নির্বাকচিত্তে খালি ভাবিতেছিলাম স্যার স্লিম্যানকে কী জবাবদিহি করিব। তিনি আমাকে ভরসা করিয়া এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করিয়াছিলেন আর আমি তাহা পালন করিতে চূড়ান্ত ব্যর্থ হইয়াছি।

সহসা এক কারারক্ষীর আর্তনাদে আমরা সকলে আশ্চর্য হইয়া ধাবিত হইলাম ধ্বংসস্তূপের অভিমুখে। নিকটে গিয়া স্বচক্ষে যাহা দেখিলাম তাহা বিশ্বাস করিতে পীড়া হইতেছিল। দেখিলাম ধ্বংসস্তূপের অভ্যন্তরে ফাঁসির রজ্জু, ভুবন সাধুর পরনের শ্বেতশুভ্র পোশাক, মস্তকের কৃষ্ণকায় অবগুণ্ঠন সবই বিদ্যমান। শুধুমাত্র ভুবনের কোনো চিহ্নমাত্র নাই। সে কোন কৌশলে এই গোলযোগের মধ্যে সকলের দৃষ্টির অলক্ষ্যে পলায়ন করিয়াছে।

মিঃ গ্রিফিথের নির্দেশে অবিলম্বে বিপদসংকেত বাজাইয়া সকল কারারক্ষীদের সতর্ক করিয়া দেওয়া হইল। সম্পূর্ণ কারাগার জুড়িয়া কারারক্ষীরা তল্লাশি শুরু করিল। মুহূর্তের মধ্যে যেন এক তীব্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হইল সমস্ত কারাগার চত্বরে। তথাপি তন্নতন্ন করিয়া খুঁজিয়াও ভুবন সাধুর কোনো হদিশ মিলিল না।

আকস্মিকভাবে আমার মনে একটি ভাবনার উদয় হইল। ভুবন সাধুর প্রকোষ্ঠে যদি কোনো সূত্র খুঁজিয়া পাওয়া যায়! অথবা সে যদি সেইখানে লুক্কায়িত থাকে! মিঃ গ্রিফিথকে বলিবামাত্র তিনিও একবাক্যে সম্মত হইলেন। ডঃ মর্গ্যানও আমাদের সঙ্গ লইলেন। দুইজন কারারক্ষীকে লইয়া আমরা রওয়ানা হইলাম ভুবন সাধুর প্রকোষ্ঠের অভিমুখে।

প্রকোষ্ঠের সম্মুখে আসিয়া দেখিলাম লৌহদ্বার বাহির হইতে কুলুপ দ্বারা আবদ্ধ। স্মরণে আসিল ভুবন সাধুকে বাহিরে লইয়া আসিবার পর কারারক্ষী অভ্যাসবশত দ্বার অর্গলবদ্ধ করিয়াছিল। কুলুপ খুলিবার সময় সহসা মিঃ মরিস তলদেশের পানে চাহিয়া বিস্মিতভাবে বলিলেন, “আরে! এত রক্ত কোথা হইতে আসিতেছে?”

সবিস্ময়ে দেখিলাম, দ্বারের তলদেশ হইতে একটি রক্তধারা প্রকোষ্ঠের ভিতর হইতে বহিয়া বাহিরে আসিতেছে।

অত্যন্ত দ্রুততার সহিত দ্বার উন্মুক্ত করা হইল। বাহিরে ততক্ষণে ঊষাকালীন মৃদুমন্দ আলোক ফুটিয়া উঠিয়াছে। পকেট ঘড়িতে দেখিলাম পাঁচটা বাজিতেছে। প্রকোষ্ঠের ভিতর যদিও ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত। লণ্ঠনের আলোক প্রকোষ্ঠের ভিতর পড়িতেই আমাদের সকলের মুখগহ্বর হইতে অস্ফুট এক আর্তনাদ একযোগে বাহির হইয়া আসিল।

ঘরের একপ্রান্তে অধোমুখে ভূপতিত হইয়া রহিয়াছে একটি মনুষ্যদেহ। মুখদর্শন করা যাইতেছিল না বটে, কিন্তু দেহটির আকৃতি, জটাধারী মস্তক এবং লোহিতাভ কটিবস্ত্র দেখিয়া ভুবন সাধুকে সনাক্ত করিতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হইতেছিল না। ভুবনের দক্ষিণ হস্ত বক্ষস্থলের নিকট গুটাইয়া রাখা, বাম হস্ত সম্মুখপানে প্রসারিত। রক্তধারা সেই হস্তের তলদেশ হইতে উৎসারিত হইয়া সমস্ত ঘর ভাসাইয়া বাহিরে আসিয়াছে।

হতচকিত অবস্থা কাটাইয়া উঠিবার পর মিঃ গ্রিফিথের নির্দেশে কারারক্ষীরা ভুবন সাধুর দেহটি সাবধানে সোজা করিয়া দিল। দেখিলাম তাহার বাম হস্তের মণিবন্ধে একটি গভীর রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন। ডঃ মর্গ্যান দ্রুত তাহার দেহের পার্শ্বে বসিয়া দক্ষিণ হস্তে নাড়ির স্পন্দন খুঁজিতে শুরু করিলেন। লক্ষ করিলাম, ভুবনের দক্ষিণ হস্ত হইতে একটি বস্তু মৃদু শব্দে ঘরের তলদেশে পড়িয়া লণ্ঠনের আলোয় দ্যুতিমান হইল। বিস্মিতভাবে উহা হস্তে তুলিয়া লইয়া দেখিলাম শাণিত ইস্পাত নির্মিত একটি আয়তাকার ফলা। দুই হইতে আড়াই ইঞ্চি দীর্ঘ এবং প্রস্থে কম করিয়া এক ইঞ্চি। দেখিয়া কোনো ক্ষুরজাতীয় বস্তুর ভগ্ন অগ্রভাগ বলিয়াই অনুমান হইল। শাণিত প্রান্তে রক্তের চিহ্ন দৃশ্যমান। ইহার দ্বারাই যে ভুবন তাহার হস্ত কাটিয়াছে তাহা অনুধাবন করিতে বড়ো একটা অসুবিধা হইল না। সবিস্ময়ে অনুভব করিলাম, ফলাটির গাত্রে যেন কোনো অদৃশ্য আঠালো তরল লাগিয়া রহিয়াছে। ফলাটি উলটাইতেই অপর পৃষ্ঠে একটি ক্ষুদ্র কৃষ্ণকায় বস্তু দৃষ্টিগোচর হইল। হাতে লইয়া দেখিলাম উহা আর কিছুই নহে, একটি তরমুজের বীজ।

ডঃ মর্গ্যানের পরীক্ষা শেষ হইয়াছিল। তিনি উপবিষ্ট অবস্থাতেই ভুবনের হস্ত ছাড়িয়া দিয়া হতাশায় মস্তক নাড়াইয়া বলিলেন, “নাহ্! আর কোনো আশা নাই। অনেক চেষ্টা করিয়াও হৃদস্পন্দন খুঁজিয়া পাইলাম না। ইহার মৃত্যু হইয়াছে।”

আমি চমৎকৃত হইয়া মৃত ভুবন সাধুর রক্তশূন্য মুখমণ্ডলের প্রতি চাহিয়া ছিলাম। শেষপর্যন্ত সে তাহার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াছে। আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করিয়া ফাঁসির মঞ্চ হইতে পলায়ন করিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, ইহার পর নিজের হস্তে নিজের প্রাণহরণ করিয়া আমাদের প্রহসনের পাত্র বানাইয়া তুলিতে সক্ষম হইয়াছে।

ডঃ মর্গ্যান উঠিয়া দাঁড়াইলেন। কক্ষের তলদেশের পানে চাহিয়া চিন্তিত স্বরে যেন আপন মনে বলিলেন, “কিন্তু সবচাইতে আশ্চর্যজনক ঘটনা হইল...”

ডঃ মর্গ্যান বাক্যের মাঝপথে থামিয়া যাওয়ায় মিঃ গ্রিফিথ জানিতে চাহিলেন, “কী? কী সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা, ডক্টর?”

ডঃ মর্গ্যান উত্তর করিলেন, “ইহার দেহ তাহার স্বাভাবিক উত্তাপ হারাইয়াছে। ইতিমধ্যেই মাংসপেশিসমূহ অনমনীয় হইতে শুরু করিয়াছে। সর্বোপরি ইহার দেহ হইতে এই যে অত্যধিক পরিমাণ রক্তক্ষরণ হইয়াছে, তাহাতে এতদিন ধরিয়া চিকিৎসাশাস্ত্র লইয়া চর্চা করিয়া যদি আমি বিন্দুমাত্র জ্ঞানও অর্জন করিয়া থাকি, আমি নিশ্চিত যে ইহার মৃত্যু হইয়াছে ন্যূনতম চার হইতে পাঁচ ঘণ্টা পূর্বে।”

___

অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল


No comments:

Post a Comment