ছোটো গল্পঃ কালবীন - কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়



কালবীন


কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়



অদ্ভুত যন্ত্রটা হাতে নিয়ে একবার পরখ করতেই গগনবিহারীর চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি যন্ত্রটা চোখ থেকে সরিয়ে স্বয়ম্ভূর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ কী সাংঘাতিক জিনিষ আবিষ্কার করেছ হে? লোকে এর দাম দিতে পারবে?”

স্বয়ম্ভূ মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন, “দাম চাইছেটা কে শুনি? এ তো আর আমি বিক্রি করতে যাচ্ছি না। স্রেফ নিজের খেয়ালখুশি মেটাবার জন্যে তৈরি করলাম, ব্যস। তবে তোমার যদি কাজে লাগে, তাহলে তোমাকে গিফট করতে পারি। লাগবে কি না বলো।”

গগনবিহারী তো হাঁ। বলে কী স্বয়ম্ভূ? এই তো মাত্র বছর কয়েক আগের কথা। ব্যারিস্টার গগনবিহারী পাকড়াশীর তখন এত নামডাকও হয়নি। সেইসময় হঠাৎ একদিন তাঁর প্রাণের বন্ধু পদার্থবিজ্ঞানী স্বয়ম্ভূ শর্মা যখন পৃথিবীর পাততাড়ি গুটিয়ে এই ইউরেনাসে চলে এলেন বরাবরের মতো, তখন তো আসার সময় তাঁর সাধের টাইম মেশিনটা এই গগনকেই তিনি দিয়ে এসেছিলেন। সেটা তো বেশ যত্নেই ছিল গগনের কাছে; দরকার বুঝে সেটা তিনি ব্যবহারও করেছেন বহুবার। তবে হ্যাঁ, মাঝখানে সেটা হঠাৎ খারাপ হয়ে পড়ায় আর সারানো হয়নি। কিন্তু সে বেশ যত্ন করেই রাখা আছে এখনও। অথচ আজ আবার…

যদিও তারপর অনেকগুলো দিন গড়িয়ে গেছে, আর তাঁদের দু’জনের জীবনেও অনেক পটবদল হয়েছে। গগনবিহারী এখন এক ডাকসাইটে ব্যারিস্টার। সৌরজগতের যে ক’টা গ্রহে আর উপগ্রহে মানুষের উপনিবেশ গড়ে উঠেছে, তার প্রায় সমস্ত কোর্টে আর এজলাসেই গগনবিহারীর দোর্দণ্ডপ্রতাপ। বিভিন্ন গ্রহ আর উপগ্রহের হাজারো মামলা আর কিম্ভূত সব সমস্যার নিষ্পত্তি করতে করতে গগনবিহারী সৌরজগতের এক দুঁদে উকিল হয়ে উঠেছেন।

আর আশ্চর্য ব্যাপার, এইসব কিম্ভূতুড়ে মামলা কীভাবে যেন জিতেও যান গগনবিহারী। তবে সবই কি আর খুব সহজে জেতেন? মাঝে মাঝে একেকটা মামলা খুবই বেগ দেয় তাঁকে। যেমন এখন এই গ্যানিমিডের মামলা। বৃহস্পতির সবচেয়ে বড়ো চাঁদ গ্যানিমিডে গত চারমাস যাবত এক বিশাল ঝামেলা শুরু হয়েছে। আর সেই মামলার ভার এসে পড়েছে গগনের ঘাড়ে। তিনি কিছুতেই ঠিক বাগে আনতে পারছেন না মামলাটা। তাই মনটা বড়ো অশান্তিতে আছে। ওদিকে তাঁর বন্ধুর নাম-যশ তো আগে থেকেই ছিল, তবে সেটা এখন পৃথিবী ছেড়ে গোটা গ্যালাক্সিতেই ছড়িয়েছে। বিজ্ঞানী স্বয়ম্ভূ শর্মাকে একডাকে চেনে না, এমন কাউকে গোটা গ্যালাক্সি খুঁজলে পাওয়া যাবে না।

তবে এর ফলে একটাই সুবিধে হয়েছে, দুই বন্ধুর মধ্যে আবার নতুন করে বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়েছে। গগন মাঝেমাঝেই এখন তাঁর এয়ারকারে চেপে ইউরেনাসে এসে স্বয়ম্ভূর সঙ্গে দেখা করে যান, আর স্বয়ম্ভূও তখন তাঁর কাজ-টাজ ভুলে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন।

যেমন আজ। গগন আজ দুপুরে এসেছিলেন ইউরেনাসের কাছেই। সেন্ট্রাল শনির সদর দপ্তরে এক মন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং ছিল। তা সেটা বেশ তাড়াতাড়িই মিটে যাওয়ায় গগন ভাবলেন, প্রায় মাস খানেক হল স্বয়ম্ভূর কাছে যাওয়া হয়নি। যাই, আজ একটু ঘুরেই আসি।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। হুশ করে চলে এলেন গগন। কিন্তু এসে যে এমন অবাক হতে হবে তা তো আর ভাবেননি! সেই অবাকটা তাঁকে করে দিলেন স্বয়ম্ভূ। একটা যন্ত্র এনে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এটা একবার পরীক্ষা করে দ্যাখো তো হে।”

গগন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। যন্ত্রটা খুবই ছোটো। মাত্র হাত খানেক লম্বা। অনেকটা দূরবীনের মতো দেখতে। দুটো নল আছে, দুই চোখের সামনে ধরে দেখতে হয়। আর সামনের দিকে ওপরনিচে দুটো ডিসপ্লে। ওপরের ডিসপ্লেটার পাশে ০ থেকে ৯ পর্যন্ত দশটা অক্ষর, তার পাশে প্লাস মাইনাস দুটো বোতাম, আর নিচেরটার পাশে A থেকে Z লেখা। নলে চোখ দিয়ে দেখলেন। সেখানে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু কালো একটা পর্দা।

জিজ্ঞাসু চোখে স্বয়ম্ভূর দিকে তাকাতে তিনি নির্বিকার মুখে বললেন, “কিছু দেখতে পাচ্ছ না তো? পাবে না। তার জন্যে একটু কায়দা করতে হবে। বলো কী দেখতে চাও। ঐতিহাসিক কোনও দৃশ্য, নাকি আরও দুশো বছর পরের গ্যালাক্সির কোনও ছবি?”

গগনবিহারী হাঁ করে স্বয়ম্ভূর দিকে তাকিয়ে বললেন, “মানে?”

স্বয়ম্ভূ একটু হেসে বললেন, “মানে একটা ম্যাজিক। ওই ওপরের যে সংখ্যাগুলো আছে, ও দিয়ে তারিখটা লিখতে হবে, যেদিনের দৃশ্য তুমি দেখতে চাও। নির্দিষ্ট তারিখ না থাকলে শুধু সালটা লিখলেই চলবে। আর নিচের অক্ষরগুলো দিয়ে লিখতে হবে জায়গার নাম। তাহলেই ম্যাজিকটা দেখতে পাবে। দ্যাখো না, দ্যাখো। কী দেখবে, গিজার সেই বিখ্যাত পিরামিড তৈরি করা দেখবে?”

গগন তখনও অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন বন্ধুর দিকে। আর স্বয়ম্ভূ বলে চলেছেন, “তবে আমি এখানে সালটা সেট করেছি খ্রিস্ট-জন্মের হিসেবে, তাই তার আগের কোনও সময়ে যেতে গেলে মাইনাস বাটনটা টিপে সালটা লিখতে হবে। যেমন ধরো ইজিপ্টের ওই গিজার পিরামিড, যেটা ফারাও খুফুর আমলে তৈরি হয়েছিল, মানে ২৫৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তা সেটার জন্যে তোমায় সালটা লিখতে হবে মাইনাস ২৫৬০, আর জায়গাটা লিখতে হবে গিজা। নাও লেখো, এগুলো লিখে যন্ত্রটা চোখের সামনে ধরো।”

হতবাক গগনবিহারী বন্ধুর কথামতো লিখে ফেললেন সাল আর জায়গা। ডিসপ্লেতে কথাগুলো ফুটে উঠল। আর তারপর যন্ত্রটা তুলে চোখে দিতেই…

এ কী দেখছেন গগনবিহারী? এ তো সেই চেনা ছবি! অনেকদিন আগে একবার স্বয়ম্ভূর টাইম মেশিনে চেপে ঠিক এই জায়গায় গিয়েছিলেন গগন। তখন যা যা দেখেছিলেন, এখনও ঠিক তাই দেখছেন তিনি! সেই হাজার হাজার শ্রমিকের দল, মস্ত বড়ো বড়ো সব পাথর টেনে তুলছে ঢালু রাস্তা দিয়ে, তাদের পাহারা দিচ্ছে চাবুক হাতে সশস্ত্র প্রহরীর দল; ওদিকে পরের পর স্লেজগাড়ির মতো গাড়িতে আনা হচ্ছে পাথর, স্তূপীকৃত করা হচ্ছে চারপাশে, আর সবকিছুর মাঝখানে তৈরি হয়ে চলেছে এক সুবিশাল পাথরের সৌধ, যার নাম পিরামিড। দৃশ্যটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

কিন্তু তখন তো গগন সশরীরে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন আর নিজের চোখে দেখেছিলেন এইসব দৃশ্য। কিন্তু এ তো এইখানে ঘরে বসে দেখা! এ যে অবিশ্বাস্য ব্যাপার!

গগন চোখ থেকে যন্ত্রটা নামিয়ে হাঁ হয়ে বসে আছেন দেখে স্বয়ম্ভূ মজা পেলেন। বললেন, “কী হে? তুমি যে পুরো ব্যোমকে গেলে দেখছি।”

গগনবিহারী বললেন, “তা একটু হয়েছি বৈকি। দেখো, টাইম মেশিনের কথা তবুও লোকে শুনেছে, তাই তার একটা মানে বোঝা যায়। কিন্তু…”

স্বয়ম্ভূ বললেন, “আরে, এও তো একরকম তাই। টাইম মেশিনের বদলে টাইমস্কোপ বা কালবীক্ষণ। চলতি ভাষায় কালবীন। ভেবেচিন্তে যন্ত্রটার ওই নামই শেষমেশ রাখলাম, বুঝলে? তা এবার বলো দিকি, যন্ত্রটা কি তোমার দরকার লাগবে?”

বন্ধু বলেই তার থেকে অযাচিত কৃপা নিতে হবে, এ গগনের ধাতে নেই। তাই মাথা নেড়ে প্রথমেই উড়িয়ে দিতে যাচ্ছিলেন স্বয়ম্ভূর কথা। বলতে যাচ্ছিলেন যে, না না, এ আমার কোনও কাজে আসবে না। কিন্তু তখনই হঠাৎ বিদ্যুৎ-চমকের মতো একটা চিন্তা মাথায় আসতে তাঁর মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল।

তাই তো! এ যন্ত্র তো তাঁর কাজে লাগবে! দিব্যি কাজে লাগবে! যেসব মামলায় তিনি কোনও কূলকিনারা খুঁজে পাবেন না, তার সমাধান তো একমাত্র করতে পারবে এই যন্ত্র! এটা দিয়ে তিনি যেকোনও সময়ের যেকোনও ছবি দেখে নিয়ে…

তড়বড় করে বলে উঠলেন, “তা হ্যাঁ হে স্বয়ম্ভূ, ভেবে দেখলাম, এটা একটু আধটু কাজে লাগবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে তোমার কোনও অসুবিধে হবে না তো?”

স্বয়ম্ভূ বললেন, “আরে দূর! অসুবিধে হলে কি আর আমি নিজেই তোমায় বলি? যাও যাও, এটা নিয়ে যাও। যদি তোমার কোনও কাজে লাগে, তাহলে আমারই বরং ভালো লাগবে।”

এবার গগনের মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে গেল। যন্ত্রটা তিনি বগলদাবা করেই নিলেন।


***


পৃথিবীর ছোট্ট একটা দেশ কিউবা। আজ থেকে বেশ কয়েক শতাব্দী আগে পৃথিবীর অন্যান্য বড়ো আর ধনী দেশগুলো পাত্তাই দিত না তাকে। কিন্তু হলে কী হবে, গোপনে গোপনে তারা যে বিজ্ঞানে এত উন্নতি করে ফেলবে কে জানত? গত একশো বছর ধরে কিউবা মহাকাশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর গ্রহে গ্রহান্তরে তাদের দাপট দেখে হতভম্ব হয়ে যাচ্ছে অন্য দেশগুলো। সৌরজগতের বেশ কিছু গ্রহে আর উপগ্রহে তারা ইতিমধ্যেই নিজেদের জায়গা দখল করে ফেলেছে।

ঠিক যেরকম এই গ্যানিমিড উপগ্রহে। আয়তনে বৃহস্পতির সবচেয়ে বড়ো উপগ্রহ এটি। অথচ সেভাবে কেউ এক্সপ্লোরই করেনি একে। বছর কুড়ি আগে প্রথম এখানে পা রেখেছিল কিউবা। ফলে অলিখিতভাবে তারাই হয়ে উঠেছিল এ জায়গাটার অধিপতি। কিন্তু তখন এই উপগ্রহটায় কিছুই ছিল না। রুক্ষ, ধূসর একটা মরুভূমি। ওরাই ধীরে ধীরে একটু একটু করে এই নিষ্প্রাণ ভূমিতে প্রাণ ফিরিয়েছিল। আর তারপর বাকিটা তো গল্পকথা। এখন এ জায়গার দাম হু হু করে বাড়ছে। পৃথিবীর ডাকসাইটে ধনীরা এখানে এসে বসবাস করার জন্য লালায়িত। চারদিকে কৃত্রিম অক্সিজেন দিয়ে মোড়া দেড়শো-দুশোতলা কমপ্যাক্ট বিল্ডিং, সাজানো গোছানো রাস্তাঘাট আর চূড়ান্ত বিলাসিতায় ভরা ঝকঝকে শহর। আধুনিক টেকনোলজির জ্বলন্ত নিদর্শন গোটা উপগ্রহ জুড়ে।

কিন্তু এখানেই সেই ভয়ংকর কাণ্ডটা ঘটে গেল চারমাস আগে। গ্যানিমিডের প্রাণকেন্দ্র হিউবান শহরের প্রধান যে জলাধার, যেখান থেকে গোটা শহরে পানীয় জল সরবরাহ করা হয়, সেখানে সবার অলক্ষ্যে কারা যেন সাংঘাতিক বিষ মিশিয়ে দিয়ে গেল হঠাৎ। আর তারপর সেই রাত্রের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শহরের হাজার হাজার লোকের প্রাণ চলে গেল নিমেষে। ব্যাপারটা ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই।

প্রথম দফায় কিউবার নিজস্ব সিকিউরিটি দপ্তর তদন্ত করেছিল, কিন্তু তাতে কিছুই ধরা পড়েনি। তারপর তারা স্পেস-পুলিশের সাহায্য নেয়, কিন্তু তাতেও আজ পর্যন্ত কোনও দিশা খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও কিউবার পক্ষ থেকে সন্দেহের আঙুল তোলা হয়েছে দুটো দেশের দিকে, চিন আর ইতালি। কারণ বেশ কিছুদিন ধরেই এই দুটো দেশ পাল্লা দিয়ে কিউবার সঙ্গে নানাভাবে শত্রুতা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে এই গ্যানিমিডের দখল নেবার জন্য চিন আর ইতালি একেবারে উঠেপড়ে লেগেছিল। কিন্তু নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া গেলে তো নির্দিষ্ট অভিযোগ তারা করতে পারছে না। তবুও মহাকাশ নিরাপত্তা আইনের সাহায্য নিয়ে তারা একটা মামলা ঠুকে দিয়েছে এই দুই দেশের বিরুদ্ধে। আর সেই মামলারই ভার এসে পড়েছে গগনবিহারীর হাতে।

কিন্তু মুশকিল হল, এতদিন ধরে চেষ্টা করেও গগনবিহারী ঠিকমতো সুবিধে করে উঠতে পারছেন না। কাগজপত্র ঘেঁটেঘুঁটে যা বুঝেছেন, তাতে ইতালি নয়, এ-কাজ চিনেরই। কিন্তু প্রমাণ কোথায়? অকাট্য প্রমাণ না পেলে তো কোনও যুক্তিই ধোপে টিকবে না। বরং উলটে তারাই মানহানির মামলা করে দিলে তার ঠেলা সামলাতে প্রাণ জেরবার হয়ে উঠবে।

তাই গগনের মনমেজাজ খুবই খারাপ যাচ্ছিল এতদিন। তবে আজ যে মোক্ষম দাওয়াই তিনি হাতে পেয়ে গেলেন, তাতে আর কাউকে তোয়াক্কা করেন না গগন। এবার প্রমাণ অক্লেশে তাঁর হাতের মুঠোয় চলে আসবে।

বাড়ির দিকে ফিরে আসতে-আসতেই তাঁর প্ল্যান করা হয়ে গেল। আর সেইমতোই রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর তিনি কালবীনটা নিয়ে তাঁর স্টাডিতে চলে গেলেন। তারিখটা কবে ছিল যেন? পামটপটা খুলে বসলেন গগন। তারপর নানা ফাইল সার্চ করতে করতে চলে এলেন একদম মামলা শুরুর প্রথমদিকে। এই তো! দেখা যাচ্ছে যে, চারমাস আগের বারো তারিখ রাত্রে ঘটনাটা ঘটেছিল। অতএব ওই বারো তারিখের ছবিই তাঁর চাই। তারিখ আর জায়গার নাম লিখে যন্ত্রটা চোখে দিলেন গগন।

সঙ্গে-সঙ্গেই ম্যাজিক! স্বয়ম্ভূর হাতের ম্যাজিক। ওই তো হিউবান শহরের মাঝখানে থাকা সেই জলাধারটা। চারপাশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এ তো দুপুরবেলা। গগনের চাই সেদিন রাতের ছবি। অতএব যন্ত্রটার দুটো নলের মাঝখানে যে খাঁজ কাটা গোল চাকতিটা ফিট করা আছে, সেটা আঙুল দিয়ে ঘোরাতে লাগলেন গগন। এটা দিয়েই সময়ের আগুপিছু করা যায়, গগন স্বয়ম্ভূর কাছে জেনে নিয়েছেন। ঘোরাতে ঘোরাতে সময়ের বদল হতে লাগল। তারপর দুপুর থেকে বিকেল, আর বিকেল পেরিয়ে সন্ধের একটু পরে পৌঁছেই হঠাৎ থেমে গেলেন গগনবিহারী। ওটা কী?

জলাধারের পেছনদিকে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। তার পেছনে এলোমেলো গাছপালায় ঘেরা একটা অঞ্চল। বেশ বোঝা যায় এদিকটায় কারুর পা পড়ে না। গগন দেখলেন, হঠাৎ সেই নির্জন জায়গাটার মাথার ওপর ঘুরছে একটা বড়ো এয়ারকার। আকাশে পাক খেতে খেতে সেটা নেমে এল সেই জঙ্গলের মধ্যে। আর আশ্চর্য! তার গায়ে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা চিনের একটা বিখ্যাত কোম্পানির নাম। একইসঙ্গে গগনের চোখে পড়ল, জলাধারের পেছনের ফাঁকা মাঠটা অতিক্রম করে সেই জঙ্গলের মধ্যে চলেছে একটা লোক।

আরে! লোকটাকে চেনা চেনা লাগছে যেন! গগন ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। ঠিক যা ভেবেছিলেন। এ তো বেনসন! এই জলাধারের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়ার অফিসার। একে তিনি দেখেছেন, এমনকি মামলা চলাকালীন একবার এর সাক্ষ্যও নিয়েছেন। উত্তেজনায় ছটফট করে উঠলেন গগনবিহারী। এবার তাঁর কাছে পুরো ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার।

বেনসন এগিয়ে গিয়ে যানটার কাছে পৌঁছল। ততক্ষণে যানটা থেকে বেরিয়ে এসেছে একজন চিনা। একটা বড়ো প্যাকিং বাক্স সে তুলে দিল বেনসনের হাতে। দুয়েকটা বাক্য বিনিময় হল। তারপর এয়ারকারটাও আকাশে উড়ল, আর বেনসনও নিঃসাড়ে ফিরে এল জলাধারের দিকে।

গগনের বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আর একটু পরেই কী ঘটবে তিনি জানেন। আর তার জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। জলাধারের গেট দিয়ে ঢুকে চট করে বাক্সটা নিয়ে একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল বেনসন। কিন্তু গগনের কাছে ঘর কোনও বাধা নয়। আশ্চর্য কালবীনের দৌলতে সবকিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি।

বেনসন বাক্সটা খুলল। তার ভেতর থেকে বার করে আনল কয়েকটা বোতল। তারপর সেগুলো একটা ব্যাগে পুরে নিরীহ মুখে চলে গেল জলাধারের কাছে। দুয়েকজন কর্মী এদিকে ওদিকে কাজ করছিল। তাদের এড়িয়ে ট্যাঙ্কের একটা ঢাকনা খুলে একে একে সেই বোতলগুলো উপুড় করে দিল জলাধারের ভেতর।

দৃশ্যটা দেখতে দেখতে প্রচণ্ড রাগে ফুলছিলেন গগন। এর শাস্তি তো বেনসনকে পেতেই হবে। কিন্তু তার আগে তাকে হাতেনাতে ধরার মতো প্রমাণ চাই। আর তার জন্য আর একটু দেখা দরকার।

প্রায় ঘণ্টা খানেক পর। হাতের টুকটাক কাজগুলো সেরে নিয়ে বেনসন বেরোবার জন্য তৈরি হচ্ছিল। খালি বোতলগুলো সে একটা ব্যাগে পুরে নিল। আর প্যাকিং বাক্সটাকে দুমড়ে ভেঙে ছোটো করে নিয়ে সেটাও ঢুকিয়ে নিল ব্যাগে। তারপর ছুটি করে বেরিয়ে পড়ল তার গাড়িটা নিয়ে। সঙ্গে সেই ব্যাগটা।

প্রায় মাইল খানেক যাবার পর রাস্তার ওপর একটা কালভার্ট। তার নিচে ভাঙাচোরা পাথুরে খাদ। সেখানে বেনসন ছুড়ে ফেলল ব্যাগটা। এ রাস্তায় কেউ আসে না, সুতরাং নিশ্চিন্ত। তারপর গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেল রাস্তা ধরে।

একটা বড়ো করে শ্বাস নিয়ে গগন যন্ত্রটা চোখ থেকে নামালেন। আর চিন্তা নেই। ওই খাদ থেকে ব্যাগটা উদ্ধার করে আনলেই হবে। বোতলগুলোয় চিনা লেবেল আটকানো আছে, আর তার গায়ে আছে বেনসনের হাতের ছাপ। আর বেনসন যে চিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই ভয়ংকর অপরাধটা করেছে, সেটা তাকে দিয়ে স্বীকার করাতে স্পেস-পুলিশের বেশিক্ষণ লাগবে না। সে কায়দা তাদের ভালোই জানা আছে।

___


অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল

No comments:

Post a Comment