ছোটো গল্পঃ কৃপণ কোসিয়ের পুনর্জন্ম - রাখি পুরকায়স্থ



কৃপণ কোসিয়ের পুনর্জন্ম


রাখি পুরকায়স্থ



সে বহুকাল আগের কথা। কোনও এক নাম না জানা রাজ্যে বাস করত এক অতি কৃপণ লোক। তার নামটি ছিল কোসিয়। সে ছিল রাজার খাজাঞ্চি। রাজবাড়ির খাজাঞ্চিখানায় রোজকার হিসেবনিকেশ সেরে দিনের শেষে বাড়ি ফেরার সময় তাকে একটি বাজারের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। সেখানে বেশ কয়েকটি খাবারের দোকান ছিল। খাবারের গন্ধে তাই ম ম করত চারপাশ। পাছে সেসব জিভে জল আনা খাবার খাওয়ার ইচ্ছে মনে জেগে ওঠে, সেই আশঙ্কায় কোসিয় কোনোমতে চোখ-নাক-কান বন্ধ করে তড়িঘড়ি সেই জায়গাটি পার হয়ে যেত।

তেমনই একদিন বাড়ি ফেরার পথে কোসিয়ের নজর পড়ল একটি লোকের ওপর। খাবারের দোকানের পাশে একখানা বড়ো পাথরের ওপর হাসিখুশি মুখ করে বসে রয়েছে সে। কোসিয়ের চোখ আটকে গেল লোকটির হাতে ধরা নরম রসালো বস্তুটির ওপর। আসলে সেই বস্তুটি আর কিছুই নয়, একটি পিঠে। পথের ধারে বসে লোকটি রসিয়ে রসিয়ে সেই বড়সড় পিঠেটি খাচ্ছিল। কোসিয় মনে মনে ভাবল, ‘আহা রে! কতদিন পিঠে খাইনি। জিভের জল আর সামলাতে পারছি না।’

তবে কোসিয় কিন্তু ভুলেও কখনও লোভকে প্রশ্রয় দেয় না। তাই সেখানে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে, দ্রুত পা চালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে সে ভাবতে লাগল, ‘গিন্নিকে বললেই খুশি হয়ে গোটা দুই পিঠে ভেজে খাওয়াবে, কিন্তু তাই বলে খরচের ব্যাপারটাকে তো মোটেই হেলাফেলা করা যায় না!’

বাড়ি পৌঁছে কোসিয় কেমন যেন মনমরা হয়ে চুপচাপ বসে রইল। কোথাও কোনও গোলমাল বেধেছে বুঝতে পেরে কোসিয়ের স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে গো? মুখখানা অমন কালো করে বসে রয়েছ যে বড়ো?”

“না, কিচ্ছু হয়নি।” নিস্তেজভাবে উত্তর দিল কোসিয়।

কোসিয়ের স্ত্রী এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। কৌতূহলী মুখে সে আবার জানতে চাইল, “বলো না গো, কী হয়েছে। রাজবাড়িতে কি কিছু ঝুটঝামেলা হয়েছে আজ? রাজামশাই কি কোনও কারণে তোমার ওপর রেগে আছেন?”

কোসিয় ছোট্ট করে উত্তর দিল, “নাহ্‌!”

“ইস, খুলে বলোই না গো কী হয়েছে!” আবারও জানতে চাইল তার স্ত্রী। তারপর নতুন কিছু আবিষ্কারের ভঙ্গিতে কোসিয়ের স্ত্রী বলে উঠল, “ওহো! বেশ বুঝেছি, চাকরদের মধ্যে কেউ নিশ্চয়ই বেতন বাড়াতে বলেছে। কী? এবারে ঠিক ধরেছি, তাই তো?”

কোসিয়ের স্ত্রী এভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতেই থাকল।

শেষমেশ অতিষ্ঠ হয়ে কোসিয় মাথা চাপড়ে বলে উঠল, “ওহ্‌! বলছি তো তোমায়, সেসব কিছুই নয়। কেন বার বার আজেবাজে প্রশ্ন করে বিরক্ত করছ?”

কোসিয়ের স্ত্রী খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। সহজে রাগ করে না। এবার সে তাই গলা স্বর আরও নরম করে বলল, “তবে সত্যি করে বলো না গো কী হয়েছে তোমার!”

স্ত্রীর স্বভাবখানা খুব ভালো করে জানা আছে কোসিয়ের। মনোমতো উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এভাবেই ক্রমাগত প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে থাকবে সে। তাই প্রশ্নের হাত থেকে নিস্তার পেতে কোসিয় এবার ঠিক করল আসল কথাটা পেড়েই ফেলবে।

ইতিমধ্যে চাকর এসে এক ঘটি খাওয়ার জল আর গামছা রেখে গিয়েছে। পাশে বসে স্ত্রী তালপাতার পাখা দিয়ে হালকা বাতাস করছে। ঢক ঢক করে সবটুকু জল খেয়ে, ঘাড়-মুখ গামছা দিয়ে মুছে নিয়ে পা ছড়িয়ে বসল কোসিয়। কিন্তু তার মুখখানা দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মনে তার এক ফোঁটাও শান্তি নেই।

অল্পক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে কোসিয় স্ত্রীকে বলল, “ঠিক আছে গিন্নি, শোনোই তবে। তোমার হয়তো জানা নেই, আমি পিঠে খেতে কতখানি ভালোবাসি।”

অবাক হয়ে চোখ গোল গোল করে তার স্ত্রী বলল, “পিঠে!”

“হ্যাঁ গো গিন্নি, পিঠে খেতে কী যে ইচ্ছে করছে আমার!” লজ্জা লজ্জা মুখ করে উত্তর দিল কোসিয়।

এমনধারা কথাবার্তা স্বামীর মুখে কস্মিনকালেও শুনেছে বলে মনে করতে পারল না কোসিয়ের স্ত্রীর। তবে বিস্ময় লুকিয়ে মুচকি হেসে সে কোসিয়কে বলল, “তাই বলো! এই ঘটনা? আমি ভাবলাম কী না কী! একটুখানি সবুর কর, এক্ষুনি তোমার জন্যে পিঠে বানিয়ে আনছি।” তারপর কোসিয়কে আরও খানিকটা আশ্বস্ত করবার চেষ্টায় সে বলল, “এত চিন্তা কীসের তোমার? পিঠে বানানোটা এমন কোনও কঠিন কাজ নয়। চাইলে গোটা পাড়াকে পিঠে বানিয়ে খাওয়াতে পারি। বুঝলে?”

স্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে কোসিয়ের মাথায় তো বাজ পড়বার যোগাড়। তেড়েফুঁড়ে উঠে সে স্ত্রীকে বলল, “কী বললে তুমি? গোটা পাড়াকে নেমন্তন্ন করে পিঠে খাওয়াবে? সামান্য বুদ্ধি-বিবেচনাটুকুও লোপ পেল নাকি তোমার?”

থতমত খেয়ে কোসিয়ের স্ত্রী আমতা আমতা করতে লাগল। এই অবস্থায় ঠিক কী বলা উচিত সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না।

“হায় রে হায়! তুমি যে এমনসব বিপদজনক কথাবার্তা বলবে আমি তা কল্পনাও করতে পারিনি! আগে জানলে আমি কখনোই পিঠে খাওয়ার ইচ্ছে তোমার কাছে প্রকাশ করতাম না।” এই বলে কোসিয় মুখ ব্যাজার করে হা-হুতাশ করতে লাগল।

কোসিয়ের স্ত্রী ভীষণ ঠাণ্ডা মাথার মানুষ আগেই বলেছি। স্বামীকে শান্ত করতে সে হেসে হেসে বলল, “ঠিক আছে, শুধুমাত্র আমাদের জন্যেই না হয় পিঠে বানাব। এবার খুশি তো?”

সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কুঁচকিয়ে কোসিয় স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা মানে?”

“আরে বাবা, আমরা মানে বাচ্চারা আর আমরা দু’জন। কী যে সব অদ্ভুত প্রশ্ন করো না তুমি!”

কোসিয় মুখ গোমড়া করে চোখ পিটপিট করতে করতে বলল, “বাচ্চারা আবার কেন? ওদের তো পেটের গোলমাল লেগেই আছে। তাছাড়া আজকালকার বাচ্চারা পিঠে খেতে মোটেই ভালোবাসে না।”

কোসিয়ের স্ত্রী এবার বেশ অবাক হয়েই বলল, “তবে কি কেবলমাত্র আমাদের দু’জনের জন্যেই পিঠে তৈরি করব?”

কোসিয় এবার খানিকক্ষণ বেশ করে মাথা চুলকে নিল। তারপর বলল, “আচ্ছা গিন্নি, পিঠে খাওয়ার ইচ্ছেটা আসলে কার হয়েছে? আমার, তাই তো? তোমার তো আজ অবধি কোনোদিনও সে ইচ্ছে হয়নি! সেক্ষেত্রে…”

এমন অদ্ভুত যুক্তি শুনে কোসিয়ের স্ত্রীর মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে লাগল। সে আমতা আমতা করে বলল, “তা... ঠিক। তবে কি…”

কোসিয় গম্ভীর মুখে বলল, “আমি অনেক ভেবে দেখলাম, আমার জন্যেই না হয় গোটা দুই পিঠে ভাজো। এর বেশি ভেজে কাজ নেই, বুঝেছ?”

মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে কোসিয়ের স্ত্রী রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু কয়েক পা যেতেই কোসিয় আবার তাকে পেছন থেকে ডেকে থামাল। তারপর কাছে গিয়ে গলা খাদে নামিয়ে বলল, “রান্নাঘরে পিঠে ভাজা যাবে না। পিঠের গন্ধে সারা পাড়া ম ম করবে। গন্ধ পেলেই দলে দলে পাড়া প্রতিবেশী এসে হাজির হবে, বুঝতে পারছ না?”

কোসিয়ের স্ত্রী এবার বেশ বিরক্ত হল। “কী মুশকিল রে বাবা! পিঠের গন্ধ আবার আটকানো যায় নাকি? পিঠে ভাজলে গন্ধ তো বেরোবেই।”

“আরে, সেটাই তো তোমাকে বোঝাতে চাইছি। আমাদের তাই খুব সাবধান হতে হবে।”

কোসিয়ের স্ত্রী ব্যাজার মুখে বলল, “তা, সাবধানটা হব কীভাবে শুনি?”

“রান্নার সব সরঞ্জাম নিয়ে চুপচাপ বাড়ির ছাদে চলো। সেখানেই তুমি পিঠে ভাজবে। হাজার গন্ধ বেরোলেও কারোর টেরটি পাওয়ার জো নেই।” বেশ উৎসাহী গলায় বলল কোসিয়।

এবার তাই ছাদে উঠবার পালা। তাই পিঠে বানানোর সমস্ত উপকরণ, তোলা উনুন আর বাসনপত্র নিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে মিলে পা টিপে টিপে ছাদে চলল। তাদের এই পরিকল্পনার কথা কাকপক্ষীতেও টের পেল না।

ছাদে উঠে কোসিয় তো বেজায় খুশি। ছাদে উঠবার দরজাটি শক্ত করে এঁটে একজায়গায় গুছিয়ে বসে পড়ল সে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল, ‘যাক বাবা! নিশ্চিন্ত হলাম। চারদিকে কেউ নেই। এখানে একা একা দু’দণ্ড শান্তিতে বসে পিঠে খাওয়া যাবে।”

এদিকে কোসিয়ের স্ত্রী ইতিমধ্যেই কোমর বেঁধে পিঠে তৈরিতে লেগে পড়েছে।

বেশ কিছুটা সময় এভাবেই যোগাড়যন্ত্র করে কেটে গেল। এখন কড়াইতে পিঠে ভাজা হচ্ছে। পিঠের সুস্বাদু গন্ধে ছাদ ভরে গিয়েছে। জিভের জল সামলাতে কোসিয়কেও তাই বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর অধৈর্য হয়ে সে স্ত্রীকে বলল, “কী গো গিন্নি, আর কতক্ষণ?”

কড়াইতে ঝাঁঝরি হাতা নাড়তে নাড়তে তার স্ত্রী বলল, “এই তো হয়ে এল বলে।”

কোসিয় ছটফট করছে বুঝতে পেরে সে এবার কোসিয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “অল্প সবুর করো। পিঠেগুলোকে একটু জুড়োতে দাও।”

কিন্তু বলতে-বলতেই কী যেন দেখে তার চোখদুটো হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। চোখ বড়ো বড়ো করে সে ভয় মেশানো গলায় বলে উঠল, “আরেকটা লোক কোথা থেকে এখানে এসে পড়েছে দেখছি!”

কোসিয় তার স্ত্রীর দৃষ্টি অনুসরণ করে অবাক হয়ে দেখল, ছাদের উলটো ধারটি ঘেঁষে যেন হাওয়ার ওপর ভেসে একটি অচেনা লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে! লোকটির পরনে গেরুয়া বসন, মস্তক মুণ্ডিত। ‘লোকটা এত উঁচুতে উঠে এল কী করে?’ ভাবতে ভাবতে কোসিয় এগিয়ে গেল লোকটির দিকে।

“এই যে, এখানে কী চাও তুমি? শিগগির দূর হও দেখি এখান থেকে।” আঙুল তুলে লোকটিকে শাসাতে লাগল কোসিয়।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, লোকটি এক্কেবারে নির্বিকার। এতে কোসিয় যেন আরও ক্ষেপে গেল। “এখানে কিচ্ছু পাবে না। ভাবছ উঁকিঝুঁকি মারলেই পিঠে পাবে, তাই তো? যত্তসব! স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি, একটাও পিঠে দেব না। এমনকি ছাদের ওপর নেমে এলেও নয়। এখন ভালোয় ভালোয় কেটে পড়ো দেখি বাছাধন।” কোসিয় গজগজ করতে লাগল।

কিন্তু এ কী! লোকটি যে এখন ছাদের ওপর সত্যি-সত্যিই নেমে এসে সটান দাঁড়িয়ে পড়েছে।

কোসিয় এবার রাগে ফেটে পড়ল, “তুমি ছাদে নেমে এলে কোন সাহসে? নিশ্চয়ই ভাবছ, ছাদে এসে দাঁড়ালেই একটা পিঠে পেয়ে যাবে, তাই না? আবারও স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি, কান খুলে শুনে রাখো, আমার পাশে এসে দাঁড়ালেও তোমার ভাগ্যে একটা পিঠেও জুটবে না।”

কিন্তু এ আবার কী! লোকটি যে এখন কোসিয়ের ঠিক পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে! কোসিয় এবার রীতিমতো হতভম্ব। “কিছুতেই পিঠে দেব না!” দাঁত কিড়মিড় করে এটুকু বলেই সে ছুট্টে গেল ছাদের অন্য ধারে, তারপর স্ত্রীর পাশে ধপ করে বসে পড়ল। কিন্তু বসেই তার চক্ষু চড়কগাছ! বেহায়া লোকটিও কখন যেন এসে তার সামনে আসন করে বসে পড়েছে!

কোসিয় আর তার স্ত্রী নিরুপায় হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। অবশেষে কোসিয় ফিসফিস করে স্ত্রীকে বলল, “খুব ছোট্ট দেখে একটা পিঠে না হয় দিয়েই দাও একে। একখানা পিঠে পেলেই বিদেয় হবে মনে হয়।”

কোসিয়ের স্ত্রী একখানা পিঠে এগিয়ে দিল।

পিঠে দেখে কোসিয় আঁতকে উঠল, “করো কী! করো কী! ওকে এত বড়ো পিঠে দিতে কে বলেছে তোমায়? না হয় একখানা ছোট্ট দেখে পিঠে এক্ষুনি ভাজো ওর জন্য।”

কিন্তু কী যে মুশকিল হল, কোসিয়ের স্ত্রী ছোট্টমতো পিঠে বানাতে গেলেও সব পিঠেই কী এক আশ্চর্য জাদুবলে গরম তেলে পড়তেই ফুলেফেঁপে মস্ত বড়ো হয়ে যাচ্ছে বার বার।

এইসব দেখে আতঙ্কিত হয়ে কোসিয় স্ত্রীকে বলল, “এ কী শুরু করেছ তুমি? এই পিঠেটা তো আগেরটা থেকেও বড়ো!”

“আমার কী দোষ বলো তো? সামান্য একটুখানি গোলা তেলে ফেলছি, কিন্তু সারা কড়া ভরে উঠছে!” তার স্ত্রী হতভম্ব হয়ে ঘামতে ঘামতে বলল।

উত্তেজনায় মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে কোসিয় খেঁকিয়ে উঠল, “আসল কথাটা বললেই তো হয়, তুমি আসলে পিঠে বানাতেই জানো না।”

করুণ মুখে কোসিয়ের স্ত্রী বলল, “না গো, তুমি ব্যাপারটা বুঝতেই পারছ না। এখানে কিন্তু আজব সব কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে!” এই বলে কোসিয়ের স্ত্রী কাঁচুমাচু মুখ করে বসে রইল। এর বেশি তার কীই বা করবার আছে?

শেষমেশ অনেক আকাশপাতাল ভেবে কোসিয় ফিসফিস করে বলল, “যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে, এবার যেমন তেমন একটা পিঠে দিয়ে ভাগাই একে। লোকটা গেলে বাঁচি।”

কিন্তু সেখানেও যে মহাবিপদ! কোসিয়ের স্ত্রী পিঠের পাত্র থেকে একটা পিঠে তুলতে গিয়ে দেখে, কোন এক অদ্ভুত অজানা কারণে সব পিঠেগুলো একে অপরের সঙ্গে জোড়া লেগে গিয়েছে! স্বামী-স্ত্রীতে মিলে জুড়ে যাওয়া পিঠেগুলিকে দু’পাশ থেকে ধরে জোর টানাটানি করতে লাগল। কিন্তু বহু চেষ্টাচরিত্র করেও কিছুতেই একটি পিঠেকেও আলাদা করা সম্ভব হল না।

ক্লান্ত কোসিয় এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। বসে বসে তার মনে হল, গিন্নির কথাগুলো দেখছি একেবারেই ভুল নয়। নিঃসন্দেহে এখানে অলৌকিক ঘটনা ঘটে চলেছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, ইনি মোটেই যে সে মানুষ নন।

স্বামী-স্ত্রীতে মিলে এবার তাই অনেকক্ষণ ধরে এই ব্যাপারে শলাপরামর্শ করতে লাগল। তারপর আচমকা কোসিয় ও তার স্ত্রী এগিয়ে গেল সেই লোকটির দিকে। তাদের হাতে পিঠেভর্তি পাত্র। গদগদ গলায় কোসিয় লোকটিকে বলল, “হে প্রভু, দয়া করে আমাদের ক্ষমা করুন। আপনি এই পাত্রের সব পিঠে গ্রহণ করলে আমরা ধন্য হব।”

কোসিয়ের স্ত্রীও সঙ্গে সঙ্গে বলল, “দয়া করে এই সামান্য কয়টি পিঠে গ্রহণ করুন প্রভু।”

মুণ্ডিত মস্তক গেরুয়াধারী শান্ত সমাহিত মানুষটি এতক্ষণ অবধি একটি কথাও বলেননি। এবার তিনি মুখ ফুটে বললেন, “না না, তোমরা ভুল করছ। আমি নিজের জন্যে একটি পিঠেও চাইনি। চেয়েছি ভগবান তথাগত বুদ্ধ ও তাঁর অগণিত শিষ্যদের জন্যে।”

কোসিয় চমকে উঠল। তার মুখ দিয়ে একটি শব্দই কোনোক্রমে বের হল, “বুদ্ধ!”

“হ্যাঁ, সেই কখন থেকে ওঁরা অপেক্ষা করে আছেন। আমার যে এবার ফিরে যেতে হবে ভাই।” মানুষটির চোখে এক আশ্চর্য প্রশান্তির ছায়া।

কোসিয়ের বুঝতে বাকি রইল না, এই মানুষটি আসলে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু, স্বয়ং গৌতম বুদ্ধের অনুগামী। সে আছড়ে পড়ল সেই সন্ন্যাসীর পায়ে। তার দু’চোখ উপচে অঝোরে পড়তে লাগল জলের ধারা। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমায় ক্ষমা করুন প্রভু। অনেক বড়ো পাপ করেছি আমি। তবে বিশ্বাস করুন, যা করেছি না জেনে বুঝে করেছি।”

স্মিত হাসি হেসে সন্ন্যাসী বললেন, “তাঁকে দেখতে চাও? তবে এসো আমার সঙ্গে।”

এই বলে সন্ন্যাসী তাঁর ডানহাতটি আকাশের দিকে তুলে ধরলেন। আর কী আশ্চর্য! এ কী দেখছে তারা? কোসিয়ের ছাদ থেকে একটা কুয়াশায় ঘেরা সিঁড়ি নেমে গিয়েছে বহুদূর। কোসিয় আর তার স্ত্রী সেই স্বর্গীয় সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। এদিকে কোসিয়ের মাথার ওপর ধরা রইল সেই পিঠেভর্তি পাত্রখানি।

অবশেষে তারা এসে পৌঁছল এক বিশাল জনসমাবেশের ধারে। অতি প্রাচীন এক অশ্বত্থ বৃক্ষকে ঘিরে সেই সমাবেশ। সেই বৃক্ষের নিচে পদ্মাসনে বসে রয়েছেন স্বয়ং তথাগত বুদ্ধ। তাঁর সারা শরীর জুড়ে বৃক্ষপত্রের ফাঁক দিয়ে গলে আসা সোনালি সূর্যালোকের ঝিকিমিকি। অপূর্ব দিব্যজ্যোতি ঠিকরে বেরোচ্ছে তার সারা শরীর থেকে। তাঁকে ঘিরে বসে রয়েছেন কত শত শিষ্য। আকাশে বাতাসে ভাসছে সেই পবিত্র মন্ত্র-ধ্বনি, ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি…’

কোসিয় আর তার স্ত্রী ধীরগতিতে এসে দাঁড়াল ভগবান বুদ্ধের সামনে। নতজানু হয়ে তথাগতের পাদপদ্মে মাথা ঠেকাল তারা দু’জন। তারপর তাঁর সামনে রাখল সেই পিঠেভর্তি পাত্র। ভগবান বুদ্ধ একটি পিঠে গ্রহণ করলেন। তাঁর মুখে লেগে আছে অপার শান্তির হাসি।

এবার শিষ্যদের মধ্যে থেকে এগিয়ে এলেন একজন। তিনি পিঠের পাত্রটি হাতে নিয়ে বাকি শিষ্যদের মধ্যে পিঠে বিতরণ করতে শুরু করলেন। কোসিয় আর তার স্ত্রীও অন্য শিষ্যদের পাশে জায়গা করে নিয়ে বসে পড়ল। তারাও পেল পিঠের ভাগ।

কোসিয়ের মনে যেন আর আনন্দ ধরে না। খুশির চোটে সে তার স্ত্রীকে বলল, “জানো গিন্নি, জীবনে এই প্রথম আমি অচেনা মানুষের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাচ্ছি। তবে খুব অবাক হচ্ছি, আমার দুঃখ তো হচ্ছেই না, বরং মনে ভেতর আমার বাঁধভাঙা আনন্দ!”

বলতে বলতে কোসিয় খেয়াল করল, তার স্ত্রী অবাক চোখে আরেকদিকে তাকিয়ে রয়েছে।

“কী দেখছ এমন করে?” কোসিয় জানতে চাইল।

উত্তরে তার স্ত্রী বলল, “খেয়াল করেছ? প্রায় সবাইকেই তো পিঠে দেওয়া হয়ে গিয়েছে। অথচ পিঠের পাত্র আগের মতোই ভর্তি রয়েছে। কী অদ্ভুত ব্যাপার!”

“সত্যি, কী অদ্ভুত কাণ্ড! আজ সত্যিই আমার জীবনটা সার্থক হল। মনে হচ্ছে, এই দিনটা দেখব বলেই যেন বেঁচে রয়েছি আমরা দু’জন।” কোসিয়ের মনের আনন্দ যেন দু’চোখ বেয়ে জলের ধারা হয়ে গড়িয়ে পড়ল।

একসময় কোসিয় আর তার স্ত্রী বাড়িতে ফিরে এল। তবে যে মানুষটি ফিরে এল সে কিন্তু সেই আগের কোসিয় নয়, একেবারেই আনকোরা নতুন একটি মানুষ। বাড়ি ফিরে এসেই সে স্ত্রীকে হেঁকে বলল, “কই গো, শুনছ? খুব তো বলেছিলে, গোটা পাড়াকে পিঠে বানিয়ে খাওয়াবার ক্ষমতা রাখো। এবার তবে হয়েই যাক! কালই গোটা পাড়াকে নেমন্তন্ন করে খাইয়ে দাও না কেন?”

(জাতক কাহিনি অবলম্বনে লেখা)


___


অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ


No comments:

Post a Comment