বড়ো গল্পঃ পাতালঘরের মন্ত্রকূপ - অদিতি সরকার



জাদুকরী আনায়া তার গুহার সামনে বড়ো পাথুরে চাতালটায় বসে নিচের উপত্যকার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে এখনও গভীর অন্ধকার। তার পাহাড়চূড়ায় অবশ্য ভোরের গোলাপি আলোর ছোঁয়া অনেক আগেই এসে পড়েছে।

মাদলের দ্রিমদ্রিম আওয়াজ ক্রমশ জোরালো হচ্ছিল। সেই সঙ্গে এগিয়ে আসছিল মশালের কাঁপা কাঁপা লালচে হলুদ আলো। অনেক মানুষের কোলাহল।

আনায়ার বাঁহাতের তলায় রুহার মস্ত শরীরটা তিরতির করে কাঁপছিল। বোঝাই যাচ্ছিল তাদের এই নিভৃত আস্তানায় অচেনা লোকজনের এই আচমকা হানা পছন্দ হচ্ছে না তার একেবারেই। আনায়া স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল রুহার গলার গভীর থেকে একটা অস্ফুট বিরক্ত গর্জন ধীরে ধীরে শব্দের আকার নিচ্ছে। রুহাকে শান্ত করার জন্য আলতো চাপড় মারতে থাকে আনায়া তার পেশল চওড়া পিঠে। অপেক্ষা করে নিচের মানুষগুলোর। ক’দিন ধরেই সে মনে মনে টের পাচ্ছিল, ওরা আসবে। বাতাসের কাঁপন তাকে বলে যাচ্ছিল, কিছু একটা হচ্ছে, হতে চলেছে। খুব খারাপ, খুব অন্ধকার, অমঙ্গলময় কিছু একটা। অপেক্ষা করছিল সে।

“মহামান্যা জাদুকরী আনায়াকে রোহিতাক গ্রামের অধিবাসীদের তরফ থেকে অভিবাদন।” এক বয়স্ক দীর্ঘদেহী পুরুষ দলটি থেকে সামান্য এগিয়ে এসে নতজানু হয়। চুলে সামান্য পাক ধরলেও তার শরীর যথেষ্ট বলশালী। “আমি রোহিতাক গ্রামের গ্রামপ্রধান, আমার নাম তুরাগ।”

“ওঠো রোহিতাক গ্রামের তুরাগ, উঠে দাঁড়াও। কল্যাণ হোক তোমার, কল্যাণ হোক সকলের। বলো, কী বলতে এসেছ এই দুর্গম পাহাড়চূড়ায় জাদুকরী আনায়ার কাছে?” আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ডানহাত তোলে আনায়া।

তুরাগ জবাব দেওয়ার আগেই পেছন থেকে অনেকগুলো গলা একসঙ্গে চিৎকার করে কথা বলে ওঠে। কিছুই পরিষ্কার ধরা যায় না সেই কলরবের ভেতর থেকে। শুধু এটুকু বোঝা যায়, যারা এসেছে তার সকলেই কোনও একটা ব্যাপার নিয়ে খুবই উত্তেজিত।

চারদিক কাঁপিয়ে ক্রুদ্ধ গর্জনটা ফেটে পড়ার আগে অবধি রুহার উপস্থিতি সেভাবে কেউই খেয়াল করেনি। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘা খেয়ে তার প্রতিধ্বনি ফিরে আসছিল আরও গম্ভীর হয়ে।

এক লহমায় সমস্ত চিৎকার চ্যাঁচামেচি থেমে গেল। সবার চোখ আনায়ার বাঁ পাশে স্থির। বেঁটে বেঁটে, অথচ শক্তিশালী চার পায়ে দাঁড়িয়ে ওঠা বিশাল ড্রাগনটার সারা শরীর মোড়া ধাতুর মতো চকচকে বড়ো বড়ো আঁশে। সেই আঁশে আঁশে ছলকাচ্ছে গভীর ময়ূরকণ্ঠী নীল, তীব্র অপার্থিব বেগুনি। তীক্ষ্ণ শিস বেরিয়ে আসছে তার নাকের ফুটো দিয়ে, সঙ্গে আগুনের রেখা। দুই কাঁধ থেকে ছড়িয়ে খুলে গেছে বিশাল ডানা, শিরদাঁড়া বরাবর দাঁড়িয়ে উঠেছে ধারালো কাঁটার সারি। বিরক্ত খাঁজকাটা ল্যাজ আছড়াচ্ছে সে ডান থেকে বাঁয়ে, আবার বাঁ থেকে ডানে। বাতাসে ভারী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে গন্ধকের গন্ধ।

আতঙ্কিত তুরাগ আবার বসে পড়ে হাঁটু মুড়ে। “মার্জনা জাদুকরী আনায়া, মার্জনা। আপনার অনুচরকে শান্ত হতে বলুন।”

অবোধ্য ভাষায় কী যেন বিড়বিড় করে আনায়া, নরম হাত রাখে রুহার ঘাড়ে। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে রুহা, যদিও তার গনগনে কমলা চোখের লম্বাটে কালো তারায় সামনে জড়ো হওয়া মানুষগুলোর প্রতি সন্দেহ জমাট হয়েই থাকে।

“কী বলতে এসেছ বলো তুরাগ। সময় নষ্ট কোরো না। সকলের মুখপাত্র হয়ে তুমিই বলো।”

“বলি মহামান্যা, বলি। আমিই বলি।” চোখ মাটির দিকে রেখেই কথা বলে তুরাগ। ওই বিশাল ভয়ংকর প্রাণীটার দিকে তাকানোর আর সাহস জোগায় না তার। “রোহিতাক আমাদের ছোট্ট গ্রাম জাদুকরী, সকলে মিলে মিশে সুখে থাকি, আপনি তো জানেন। যবে থেকে আপনি এই পাহাড়চূড়াকে নিজের আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তবে থেকে আপনার আশীর্বাদে আমাদের এই শান্তির জীবন আরোই সুখময় হয়ে উঠেছে। কিছু কৃষিকাজ, কিছু পশুপালন, এতেই অনায়াস চলে যায় আমাদের দিন। কিন্তু আমাদের সেই নিশ্চিন্ত সুখেই বড়ো ব্যাঘাত ঘটছে আজ কয় মাস যাবত।”

“কী হয়েছে?”

“প্রথমে তেমন বড়সড় কিছু হয়নি, কিংবা হয়তো হয়েছিল, আমরাই বুঝিনি। মাঝেমধ্যেই একটি দুটি পশু চুরি যাচ্ছিল মহামান্যা আনায়া। কারও ছাগল, কারও গরু, কারও পোষা কুকুর। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো চরতে গিয়ে তারা হারিয়ে গিয়েছে, অথবা বনের কোনও হিংস্র প্রাণী শিকার করেছে তাদের। তত গুরুত্ব দিইনি কেউই। কিন্তু গতকাল যা হল…” গলা ভেঙে আসে হঠাৎই তুরাগের।

“কী হল কাল? বলো! থেমে গেলে কেন?” প্রশ্নে ধারালো হয়ে ওঠে আনায়ার চোখমুখ।

“কাল আমাদের গ্রামের একটি জলজ্যান্ত শিশু চুরি গিয়েছে, হে জাদুকরী।”

“শিশু? মানবশিশু? কী বলছ তুরাগ?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ, জাদুকরী আনায়া। সত্যি কথাই বলছি। অনেক খুঁজেছি তাকে, পাইনি। গ্রামের আশেপাশে, নিকটের অরণ্যে। কোথাও চিহ্নটুকু মেলেনি তার। এখন আপনিই আমাদের একমাত্র অবলম্বন। খুঁজে দিন তাকে, দোহাই আপনার।”

এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে আনায়া। জমায়েতটা থেকে ঝলকে ঝলকে না বোঝা ভয় আর হিমশীতল দুঃখের অনুভূতি উঠে আসছিল তার দিকে। মিথ্যে বলছে না ওরা।

“কার শিশু হারিয়েছে? সে আছে কি এখানে?” ভিড়ের ওপর দিয়ে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনে আনায়া।

“আমার। আমার ফুলের মতো মেয়ে জোনাকে নিয়ে গেছে। তাকে খুঁজে এনে দাও জাদুকরী, আমার কোলে ফিরিয়ে দাও। আমার জোনাকে ফিরিয়ে দাও।” ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসে এক আলুথালু নারী। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে কেঁদেছে অনেকক্ষণ। কান্নার চাপে গলা চিরে গিয়েছে তার, চোখমুখ ফোলা ফোলা, লাল।

“শান্ত হও। নাম কী তোমার?”

“জোইলা।”

“কখন দেখেছিলে তাকে শেষ জোইলা?”

“কুটিরের পেছনের মাঠে খেলছিল আমার মেয়ে। তখনও সূর্য ডোবেনি। এক পলকের জন্য তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে আমি রান্নাশালে গিয়েছিলাম জাদুকরী। জোনার পিতা ক্ষেতের কাজ সেরে ফিরবে, তার জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে রাখতে হবে। কতটুকু সময় হবে, বেশি নয় তো। তারই মধ্যে সে কোথায় হারিয়ে গেল!”

“কাছে এসো জোইলা। আমাকে স্পর্শ করো একবার।” খুব নরম স্বরে আদেশ করে আনায়া।

ভিড়টা দু’ভাগ হয়ে গিয়ে জোইলাকে পথ করে দেয়। নডবড়ে পায়ে আনায়ার কাছে উঠে আসে জোইলা। তার গাল বেয়ে এখনও জলের ধারা গড়িয়ে চলেছে।

“তোমার কাছে কি জোনার কোনও চিহ্ন আছে, জোইলা?”

“চিহ্ন?” ঠিক ধরতে পারে না জোইলা আনায়ার কথা। কেমন বোকার মতো তাকায় সে আনায়ার দিকে।

“হ্যাঁ, চিহ্ন। ধরো তার কোনও খেলনা বা তার জামা। ওইরকম কোনও কিছু যে আমার দরকার জোইলা।”

“আছে, আছে।” আবার ফুঁপিয়ে ওঠে জোইলা। হাতের মুঠো আলগা করে সে। একগাছা রঙিন পুঁতির মালা সে হাতে। “এটা পরশুই গেঁথে পরিয়েছিলাম মেয়েকে আমার। এত পছন্দ হয়েছিল, এক লহমার জন্যও গলা থেকে এ-মালা খুলছিল না জোনা।”

“কখন খুলে দিয়েছে তোমায়?”

“দেয়নি তো। দেয়নি, জাদুকরী আনায়া। কুড়িয়ে পেয়েছি। কুটিরের পেছনের খোলা মাঠে কুড়িয়ে পেয়েছি। ছেঁড়া মালাখানা। জোনা নেই, ছিল না সেখানে। তারপর তো কত খুঁজলাম আমরা সবাই। জোনা কোথাও নেই।” ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া কান্না গিলে নেয় জোইলা।

“আর কিছু পেয়েছিলে সেখানে?”

“এই কালো কাপড়ের ছেঁড়া টুকরোখানি। কিন্তু কালো জামা তো জোনার একখানাও নেই।”

“কই, দেখাও দেখি একবার।”

রেশমি কালো কাপড়ের একখানি টুকরো তুলে দেখায় জোইলা। ভ্রূকুটি করে তাকায় সেদিকে আনায়া, নিজের মনকে জড়ো করে আনতে চেষ্টা করে ওই টুকরোটিতে। কিন্তু শুধুই জমাট অন্ধকার ছাড়া কিছুই তার মনের চোখে ধরা দেয় না। মাথা ঝাঁকায় আনায়া। সরিয়ে নেয় ওখান থেকে নিজের মন।

“বেশ। কাপড়ের রহস্য পরে ভেদ করা যাবে। এসো তো, আরও কাছে এসো। ওই মালাধরা হাত দিয়ে আমার হাত স্পর্শ করো দেখি একবার জোনার মা।”

জোইলা এগোচ্ছিল আনায়ার দিকে, হঠাৎই এক কর্কশ কণ্ঠ তাকে থামিয়ে দেয়।

“দাঁড়াও। আমার কিছু প্রশ্ন আছে।”

“কে? কে ওখানে?”

মশালের আলোয় চারদিক লাল হয়ে আছে। তার পেছনের অন্ধকার থেকে ভেসে এসেছে কথাগুলো। আনায়া মুখ দেখতে পায় না কারও।

“আমি। আমি প্রশ্ন করছি আনায়া। কী প্রমাণ আছে যে তোমার ওই হিংস্র মাংসলোভী অনুচরই হরণ করেনি আমাদের পশুগুলিকে? কী প্রমাণ আছে যে তোমার জাদুবিদ্যার কোনও নৃশংস প্রয়োজনের জন্যই তুমি উঠিয়ে আনোনি জোনাকে?” পা থেকে মাথা পর্যন্ত রাতরঙা পোশাকে মোড়া একটা দীর্ঘ দেহ ছায়া থেকে সামান্য এগিয়ে এসে দাঁড়ায়।

একটা শিরশিরে ভয়ের ঠাণ্ডা ঢেউ ভিড়টার মধ্যে দিয়ে চারিয়ে যায়। লোকে বুঝি নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে যায়। জাদুকরী আনায়ার মুখের ওপর এভাবে কথা বলার স্পর্ধা! কে এই দুর্মুখ দুঃসাহসী?

আনায়া ভুরুতে হালকা ভাঁজ নিয়ে চেয়ে ছিল বক্তার দিকে। রুহার পিঠের কাঁটা আবার খাড়া হয়ে উঠেছে।

“তুমি? মা-জুম?”

“হ্যাঁ আনায়া। আমি। জবাব দাও। কী প্রমাণ আছে? তোমার ওই গুহার ভেতরে ঢুকে দেখতে চাই আমি কী লুকিয়ে রেখেছ তুমি ওখানে।” উদ্ধত ভঙ্গি মা-জুমের।

আনায়ার হাতের আঙুলগুলো শুধু সবার অলক্ষ্যে রুহার পিঠে আরও শক্ত হয়ে চেপে বসে। তা ছাড়া আর কিছু দেখেই বোঝা যায় না তার ভেতরে কী হচ্ছে। শান্তভাবেই জবাব দেয় সে। “বেশ তো, দেখবে। নিশ্চয়ই দেখবে মা-জুম। কিন্তু এখন নয়। আমার কাজটুকু আমায় আগে করতে দাও। হাত বাড়াও জোইলা। আমার হাতে হাত রাখো।” মা-জুমকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে জোইলার দিকে নিজেই এগোয় আনায়া।

মালাটা ছোঁয়ামাত্র আনায়ার মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঝলক দিয়ে যায় যেন। দু’চোখের সামনে ধোঁয়াটে কুয়াশার কুণ্ডলী। ভয় আর চরম আতঙ্কের অনুভূতি তাকে চারদিক থেকে দমবন্ধ করে আনে। অন্ধকার। কী গভীর অন্ধকার। মা কোথায়, আমার মা? আমি মার কাছে যাব। আমার ভয় করছে যে। দুষ্টু লোকটা আমায় এখানে নিয়ে এল কেন? ক্ষিদে পাচ্ছে। মা আসছে না কেন? আমার দম আটকে আসছে যে।

নরম দুটো গালে চোখের জল শুকিয়ে দাগ হয়ে গিয়েছে। পায়ের নিচে, চারপাশে এবড়োখেবড়ো পাথর। অন্ধকার। ভয়।

“আছে। বেঁচে আছে জোনা।” বুক ভরে একটা শ্বাস টেনে চোখ খোলে আনায়া। সে চোখের দৃষ্টি অনেক দূরে।

“বেঁচে আছে? সত্যি বেঁচে আছে?” জোইলা আকুল প্রশ্ন করে।

“আছে। কিন্তু সময় খুব অল্প। যা করার আজ রাত শেষ হয়ে আগামীকালের সূর্য ওঠার আগেই করতে হবে।”

“ধোঁকা দিচ্ছ তুমি জাদুকরী! মিথ্যে স্তোক দিচ্ছ। আমি বলছি ভাইসব, ঢুকে দেখো ওই গুহায়। ওখানেই পাবে জোনাকে।” আবারও চিৎকার করে ওঠে মা-জুম। “এই ভণ্ড জাদুকরী মিথ্যা বলছে তোমাদের। ওকে নামিয়ে আনো। গ্রামের মঙ্গল করার বদলে অমঙ্গল ডেকে এনেছে এই আনায়া। সরাও ওকে।”

“স্তব্ধ হও মা-জুম।” আনায়ার গলাতে ইস্পাতের কঠিন ধ্বনি বাজে এবার। “অন্ধকারের পূজারী হে মা-জুম, আমার জাদুবিদ্যায় এসবের কোনও স্থান নেই তুমি জানো। বারবার তুমি তবুও কেন বিরক্ত করো আমাকে? আমি জানি মা-জুম, তুমি আমাকে সরিয়ে নিজে ক্ষমতা পেতে চাও। যদি তা হওয়ার হয়, হবে। জোর করে এসব হয় না মা-জুম, জানো তুমি। তবুও প্রয়োজন হলে অবশ্যই তোমার প্রশ্নের উত্তর দেব আমি। তোমাদের সবার কৌতূহল আমি মেটাব। কিন্তু আগে জোনাকে খুঁজে আনতে দাও মা-জুম, সময় নষ্ট কোরো না।”

মা-জুম আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আনায়া তাকে মুখ খোলার আর সময় দেয় না। জটলা থেকে উঠে আসা মৃদু গুঞ্জনটাকেও কানে তোলে না সে।

“গ্রামপ্রধান তুরাগ, তোমাদের কার কার কাছে তীব্রগতির অশ্ব আছে? বা পক্ষীরাজ?”

“এ গ্রামে কেবল দু’জনেরই পক্ষীরাজ আছে জাদুকরীーআমার, আর জোনার পিতার। তবে বেশ কয়েকটি দ্রুতগামী অশ্ব আছে বটে।”

“বেশ। আমি রুহাকে নিয়ে আকাশপথে যাব। তুমি ও জোনার পিতা… কী নাম তার?”

“আজ্ঞে, মিহান।” এক দীর্ঘদেহী তাম্রবর্ণ তরুণ এগিয়ে আসে। দুশ্চিন্তার ভার তার দাঁতচাপা চোয়াল থেকে সংকল্পের দৃঢ়তাকে মুছতে পারেনি।

“তুরাগ, তুমি ও মিহান আমাকে অনুসরণ কোরো। বাকিরা স্থলপথে অশ্বের পিঠে আসুক। আর হ্যাঁ, মাটি খোঁড়ার কিছু যন্ত্রপাতি সঙ্গে এনো। কিছু অস্ত্রশস্ত্রও, যদি থাকে। নিতান্তই কিছু না থাকলে অন্তত কাঠ কাটার কুঠার, কিংবা পশু তাড়নের যষ্টি। অদেখা শত্রুর সামনে একেবারে নিরস্ত্র হয়ে যাওয়া সমীচীন হবে না।”

“মাটি খোঁড়া? মাটি খুঁড়তে হবে কেন? কী জানো তুমি জাদুকরী? আমার মেয়ে কি তবে মাটির তলায় চলে গেছে?” আর্তনাদ করে ওঠে জোইলা।

“আহ্, শান্ত হও জোইলা! বলেছি তো বেঁচে আছে জোনা।”

“পাওয়া যাবে তো জোনাকে, জাদুকরী আনায়া?” তুরাগ ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে।

“দেখা যাক।”

“কে হরণ করেছে আমার মেয়েকে জানো কি, মহামান্যা জাদুকরী?” জোইলা সাহস করে জানতে চায়।

উত্তর দেয় না আনায়া।


বিশাল দু’খানি ডানা মেলে ভোরের আকাশে ভেসে পড়ে রুহা। তার পিঠে বসা আনায়ার ঠোঁট চাপা, সবুজ দু’চোখ তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ। লালচে কালো চুলের গোছা উড়ছে শনশনে হাওয়ায়। কোমরবন্ধনীতে গোঁজা রেশমি কালো কাপড়ের ছিন্ন খণ্ডখানি। জোইলার গাঁথা পুঁতির মালাটি সে শক্ত মুঠিতে ধরে রয়েছে। ওইটিই তাকে জোনা পর্যন্ত পৌঁছনোর পথ দেখানোর একমাত্র আলো।

দ্রুত বাতাস কাটে রুহার সবল ডানা। পিছনে তুরাগ আর মিহান তাদের পক্ষীরাজ নিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করছে পাল্লা দেওয়ার। নিচে অশ্বের পিঠে ছুটছে গ্রামের পুরুষেরা। তাদেরও পেছনে পায়ে হেঁটে আসছে জোইলা এবং আরও কিছু মেয়ে। ওদের কথা ভেবেই ইচ্ছে না থাকলেও রুহার গতিবেগ কমিয়ে আনে আনায়া। যদিও তার ভেতরটা ছটফট করতে থাকে। পারবে তো বাঁচাতে ছোট্ট মেয়েটাকে?

বেশিদূর অবশ্য যেতে হয় না। মালা অল্প পথ গিয়েই বাঁদিকে টানতে থাকে। রুহা বাঁয়ে ঘোরে।

যতদূর চোখ যায় বন্ধুর নিষ্ফলা প্রান্তর বিছিয়ে আছে যোজনের পর যোজন। শনশনে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে মাঠের ওপর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে। একটা গাছ নেই, একটা গুল্ম নেই, একটা পাখির ডাক নেই। এক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতার চাদর ফেলা যেন পুরো এলাকাটা জুড়ে। তারই মধ্যে ঠিক সামনেই ধূসর কর্কশ একটা শৃঙ্গ উঠে গেছে খাড়া। অদ্ভুত রুক্ষ পাথরের স্তূপ একখানা। আনায়া অনুভব করতে পারছিল, এখানেই আছে কোথাও জোনা।

ছেঁড়া মালাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে আনায়া। রুহার কাঁধের কাছে ছুঁইয়ে আনে আবারও একবার। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করে রুহা।

কালচে পাহাড়টার গায়ে এক জায়গায় অন্ধকার যেন আরও একটু বেশি গাঢ় দেখাচ্ছিল। কী আছে ওখানে সেটা উঁচু থেকে ঠিক ঠাহর করতে পারছিল না আনায়া। একটা গুহা বা সুড়ঙ্গের মুখ হলেও হতে পারে হয়তো। তার মন বলছিল ওখানেই আছে প্রবেশপথ। ওখান দিয়েই উদ্ধার করতে হবে এই পাথরের স্তূপের ভেতরের রহস্য।

ধু ধু পাথুরে প্রান্তরে সাবধানে পা ঠেকায় রুহা। পাহাড়ের মুখোমুখি, তবে নিরাপদ দূরত্বে। সামান্য সময়ের ব্যবধানেই তাদের পেছনে পরপর নামে দুই পক্ষীরাজ। এতটা পথ অতি দ্রুত উড়ে এসে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল তেজীয়ান পশু দুটি। তাদের পিঠ ঘামে ভেজা, মুখে জমেছে ফেনা। তুরাগ আর মিহান লাফিয়ে নামে ঘোড়ার পিঠ থেকে।

“কোনও সন্ধান পেলেন আমার কন্যার, হে জাদুকরী?” মিহান আকুল চোখে আনায়ার দিকে তাকায়।

“এটুকু বুঝেছি যে এখানেই সে আছে কোথাও। কিন্তু যে অশুভ শক্তি তাকে হরণ করে এনেছে তার ক্ষমতার সম্পূর্ণ সীমা সম্বন্ধে কোনও আন্দাজ এখনও আমি করতে পারিনি। তবে সে যে শক্তিশালী, অতীব শক্তিশালী, তাতে সন্দেহ নেই কোনও। তাই তার মোকাবিলায় শুধুমাত্র তোমাদের দু’জনকে নিয়ে এগোনো আমার অনুচিত হবে। লোকবল প্রয়োজন আমাদের। ওরা পিছিয়ে পড়েছে, ওদের আসতে দাও।”

বাধ্য হয়েই বাকি দলটার পৌঁছানোর জন্য অপেক্ষা করে ওরা। যদিও মিহানের হাবেভাবে অস্থিরতা ফুটে বেরোচ্ছিল।

“পাহাড়ের গায়ে ওটা কী বলতে পারেন জাদুকরী? ধাতুর তৈরি বিশাল দরজার মতো লাগছে না?” তুরাগ চোখের ওপর হাত রেখে ভুরু কুঁচকে চেয়ে ছিল সামনের দিকে।

আনায়া দৃষ্টি ধারালো করে। ঠিকই বলেছে তুরাগ। মস্ত এক দরজা পাথরের সঙ্গে সমান করে বসানো। চকচকে কালচে কোনও ধাতু দিয়ে নির্মিত সেই দরজা। তার গায়ে খোদাই করা রয়েছে অসংখ্য জটিল নকশা। দরজার দু’পাশে সটান দাঁড়ানো দুটি কুচকুচে কালো কষ্টিপাথরের সশস্ত্র প্রহরীমূর্তি। মূর্তি দুটির নির্মাণ নৈপুণ্য দেখে বিস্মিত হতে হয়। স্পষ্ট পাথুরে আড়ষ্টতা এবং পা থেকে মাথা পর্যন্ত কষ্টিপাথরের নিকষ গাঢ় কালো রঙ না থাকলে জীবিত মানুষ বলে ভুল করা অসম্ভব ছিল না। বিশেষ করে একটি মূর্তি তো খুবই নিখুঁত। তার চোখের পল্লব থেকে হাতের নখ পর্যন্ত অপূর্ব যত্নে কুঁদে বার করেছে কোনও অসামান্য ভাস্কর। হাতে ধরা কুঠারটির হাতলের ফাটলখানি পর্যন্ত পরিষ্কার।

একবিন্দুতে নিজের মনকে গুটিয়ে আনছিল আনায়া, অনুভব করার চেষ্টা করছিল জোনার প্রাণের চিহ্ন। হঠাৎই কানের পাশে এক কর্কশ স্বর বেজে উঠে তার চিন্তার জাল ছিঁড়ে দেয়।

“চিন্তার ভান করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবার কী মতলব ভাঁজছ, ভণ্ড জাদুকরী? এখানে পুতুলের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলে কি মিহানের মেয়ে নিজে নিজে এসে তোমার কোলে পোষা বেড়ালটি হয়ে লাফিয়ে উঠবে?”

“তুমি? এখানেও আমাকে অনুসরণ করে এসেছ মা-জুম? কেন? কী চাও তুমি?” সত্যিই অবাক হয় আনায়া।

“তোমার ওই ভালো সাজা মুখোশটা সবার সামনে টেনে খুলে দিতে চাই আনায়াーএই সরল লোকগুলোকে তুমি কীভাবে ঠকাচ্ছ সেটাই দেখাতে চাই।

“এত ঈর্ষা? এত আঁধার পুষে রেখেছ মা-জুম? গুরুর কাছে জাদুবিদ্যা শিক্ষার সময় প্রতিটি পরীক্ষায় তোমাকে হারিয়ে দিতাম আমি, সেই রাগ এতদিন ধরে বহন করে চলেছ?”

“রাগ? তোমার ওপর রাগ? ছোঃ। তোমার থেকে জাদু-ক্ষমতা ঢের বেশি আমার। নিজেই প্রমাণ পাবে।”

কালো আলখাল্লার ঘেরকে ঘূর্ণির মতো ঘুরিয়ে পেছনে ফেরে মা-জুম। ঘন কালো ভ্রূর নিচে তার দু’চোখ শেয়ালের মতো জ্বলে। “ভাইসব, দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন এখনও? এগোও। চলো সবাই মিলে ভেঙে ফেলি ওই দরজা।”

“না। থামো। আমায় বুঝতে দাও। আমার মন বলছে ওখানে কোনও বিপদ লুকিয়ে আছে। জাদুকরী আজ্ঞা না দিলে এগিও না কেউ।” দু’হাত মাথার উপরে তুলে সবাইকে আটকানোর চেষ্টা করে তুরাগ।

তুরাগের কথা শেষ হয় না। হোওওও শব্দ করে পিছন থেকে একদল উত্তেজিত মানুষ তাদের পেরিয়ে ছুটে যায় সামনের দিকে। মিহানও তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পা বাড়িয়েছিল, কিন্তু এক অদ্ভুত ভয়ংকর দৃশ্য দেখে সে আর তুরাগ যেখানে ছিল সেখানেই জমে যায়।

পাথরের প্রহরী দু’জন নড়ে উঠেছে। অদ্ভুত আড়ষ্ট তালে ভারী পা ফেলে ফেলে ধপ ধপ করে এগিয়ে আসছে তারা। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠছে মাটি। একজন উঁচু করে তুলে ধরেছে তার পাথরের কুঠার, অন্যজনের মুঠোয় উদ্যত তরবারি।

কিছু বোঝার আগেই সবার আগে থাকা লোকটির মাথা পাথরের তরবারির আঘাতে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লুটিয়ে পড়ে। আরেকজনের কাঁধ থেকে বাহু আলাদা হয়ে যায় কুঠারের প্রচণ্ড কোপে। যন্ত্রণার আর্তনাদ আর অসংখ্য মানুষের আতঙ্কিত কোলাহল উপেক্ষা করে ভয়াবহ দুটি পাথরের মূর্তি এগোতেই থাকে।

“মা-জুম, তুমি চালনা করছ ওই নিষ্প্রাণ মূর্তি দুটিকে? থামাও ওদের, থামাও!” আনায়া ক্রোধে বিস্ময়ে পিছন ফেরে যেখানে মা-জুম দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে মা-জুম এইটুকু সময়ের মধ্যেই।

ততক্ষণে দুটি মূর্তিকেই আলাদা-আলাদাভাবে ঘিরে ফেলেছে রোহাতক গ্রামের লোকেরা। প্রথম আতঙ্কের ঢেউটা কেটে গিয়ে তাদের রক্তে এসেছে ক্রুদ্ধ সাহসের জোয়ার। তুরাগ ওদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। মিহানও মিশে ছিল সেই দলে।

একটু ভালো করে দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে পাথরের পুতুল দুটো খুব একটা তাড়াতাড়ি নড়াচড়া করতে পারে না। শরীর বাঁকানো-চোরানোর মতো নমনীয়তাও তাদের বিন্দুমাত্র নেই। একদম সরাসরি সামনে কেউ না থাকলে ওরা কিছুই করতে পারে না। এই দুর্বলতাটাই কাজে লাগাচ্ছিল তুরাগ। “পেছন থেকে মারো, ভাই সকল, পাশ থেকে মারো। নিচু হয়ে গোড়ালির জোড়ে মারো, কোপ বসাও হাঁটুতে। সাবধানে। অস্ত্র ধরা হাতের নাগাল বাঁচিয়ে।” হাঁফাতে হাঁফাতে চিৎকার করে আদেশ দিচ্ছিল সে। তার নিজের হাতে একটা লম্বা শাবল। সেটা দিয়েই মূর্তির গায়ে সর্বশক্তিতে আঘাত করছিল সে।

মিহান প্রাণপণে তার লাঠি দিয়ে ঘা মেরে চলেছিল অন্য মূর্তিটার গায়ে। হঠাৎই ওদের চমকে দিয়ে সেটা অজস্র খণ্ডে চুরমার হয়ে গেল। গুহার সামনে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কালো পাথরের টুকরো থেকে তাকে আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না।

নিখুঁত গঠনের দ্বিতীয় মূর্তিটা তখনও ভাঙেনি। অবিশ্রান্ত আঘাতে আঘাতে টলমল করছিল ঠিকই, কিন্তু তবুও পা ঘষটে ঘষটে অন্ধের মতো যান্ত্রিক এগোনো বন্ধ হয়নি সেটার। এবার সবাই একসঙ্গে ওইদিকে ফেরে। অনেকগুলো লাঠি কুঠার শাবল কুড়াল একযোগে আছড়ে পড়ে মূর্তিটার গায়ে। আর একটা অদ্ভুত কাণ্ড হয়।

ওদের হতভম্ব চোখের সামনে কষ্টিপাথরের মূর্তিটা ধীরে ধীরে একটা রক্তমাংসের মানুষের চেহারা নেয়। তার গায়ের রঙ বহুদিন রোদচাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাশে, তার চোখে অন্ধ চাহনি। খসে পড়া শিরস্ত্রাণের নিচে তার শুকনো খড়ের মতো খসখসে চুল। দাঁড়ানো অবস্থা থেকে সটান মাটিতে আছড়ে পড়ে সে।

“শীন! শীন, ভাই আমার!” স্তম্ভিত ভিড়টা থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে এক কৃশকায়া কিশোরী। এক নজরেই যে কেউ তার মুখের সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়া মানুষটির মুখের মিল খুঁজে পাবে। চোখের জলে ভেসে যেতে যেতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে সে। নিজের কোলে তুলে নেয় হেলে পড়া মাথাটি। “শীন, আমার শীন। এ কী অবস্থা হয়েছে তোমার? কে করল এরকম? ও শীন, কথা বলো, চুপ করে থেকো না।”

আনায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে মেয়েটির কাছে। নরম হাত ছোঁয়ায় তার কাঁধে। “চেনা মানুষ?”

“ভাই। আমার একমাত্র ছোটো ভাই। শীন। বলেছিল শহরে যাচ্ছে নতুন ঘোড়া কিনতে। সেও তিনমাস হয়ে গেল। ভাবছিলাম যে কোনোদিন ফিরবে বুঝি। কিন্তু এ কী হল?” মেয়েটি বিভ্রান্ত চোখ তুলে মুহূর্তের জন্য আনায়ার দিকে তাকায়।

আনায়াও বসে পড়ে ওই পাথুরে জমিতেই। ডান হাতের তর্জনীটি ঠেকায় শীন নামধারী প্রায় মৃত যুবকের কপালে, দুই ভ্রূর মাঝখানে। ধীরে ধীরে খুলে যায় চোখ। টকটকে লাল, রক্তজমা। ঘষা ঘষা স্বর বের হয় তার অসাড় দু’ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে। “পাতালঘরের মন্ত্রকূপ। মন্ত্রকূপ।”

আর কিছুই বলে না সে তারপর। চিরকালের মতো বুজে যায় তার চোখ দুটি, থেমে যায় অতিকষ্টে চলতে থাকা শ্বাস। হাহাকার করে কেঁদে ওঠে তার বোন। “আমাকে একেবারে একা করে কোথায় চলে গেলি শীন! কে তোকে করল এমন?”

কয়েকটি পল মাত্র কাঁদে সে। তারপরেই উঠে দাঁড়ায় সোজা। তার ভেজা পলকে ঘেরা দু চোখ দিয়ে আগুন ছুটছিল। “জাদুকরী, আজ এই মুহূর্তে তোমাদের সকলকে সাক্ষী রেখে শীনের নামে প্রতিজ্ঞা করলাম আমি শীনের দিদি শোরিনাーআমাদের গ্রামের মানুষদের, জোইলার সন্তানের, আমার ভাইয়ের ক্ষতি যে বা যারা করেছে, করছে তাকে আমি, আমরা কিছুতেই ছেড়ে দেব না। বাঁচি আর মরি।” শক্ত মুখে গুহার গায়ের ধাতব দরজার দিকে ঘোরে সে। “মাননীয় তুরাগ, মিহানভাই, এসো। এসো তোমরা আমার সঙ্গে। ভাঙতে হবে ওই দরজা।”

“দাঁড়াও শোরিনা। আমাকে একবার বুঝতে দাও পরিস্থিতি। হঠকারী আক্রমণের ফল তো দেখতেই পেয়েছি আমরা সবাই। এর মধ্যেই অকারণ মৃত্যুর সংখ্যা কতগুলি। কতজন মারাত্মক আহত। নিজেদের ভুলে আর কাউকে এভাবে হারাতে চাই না আমরা।”

সাবধানী হাতের পাতা ঠেকায় আনায়া দরজার গায়ে। ভেতর থেকে ঝলকে ঝলকে অসহ্য কষ্ট আর যন্ত্রণার অনুভূতি এসে বিঁধতে থাকে তার হাতে, কিন্তু সরাসরি দরজার কাছাকাছি কোনও বিপদের অস্তিত্ব টের পায় না সে। বন্ধ কপাটে বেশ জোর লাগিয়ে ধাক্কা দেয় আনায়া এবং দিয়েই বোঝে, এ তার একার কর্ম নয়। তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা উদগ্রীব মানুষগুলোকে ডাকলেই হয়ে যেত, তবুও কোনও ঝুঁকি নিতে চায় না সে।

অপেক্ষারত রুহাকে ইঙ্গিত করে আনায়া।


ভেতরে ঢুকে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল সবাই। বেশ কিছুক্ষণ লেগেছিল সেই বিস্ময়ের ঘোর কাটতে। বাইরে থেকে যত রুক্ষ, যত বন্ধুরই দেখাক না কেন, দরজার এ-পিঠে গুহার ভেতরটা কিন্তু একেবারেই অন্যরকম। সত্যি বলতে কী, আগে থেকে জানা না থাকলে জায়গাটাকে গুহা বলে ভাবাও প্রায় অসম্ভব। মনে হচ্ছিল যেন কোন বিশাল প্রাসাদ বা দুর্গের ভেতরে ঢুকে পড়েছে ওরা।

মস্ত ছড়ানো একটা চতুষ্কোণ ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল পাঁচ-ছ’জনের দলটা। সবাইকে ভেতরে আসতে দেয়নি আনায়া। এমনকি ব্যাকুল মিনতি কঠোরভাবে অগ্রাহ্য করে জোইলাকেও বাইরেই অপেক্ষায় রেখে এসেছিল সে, রুহার সতর্ক প্রহরায়।

প্রথম কথা বলল শোরিনা। “এ কোথায় এলাম আমরা জাদুকরী আনায়া?”

বহু উঁচু ছাদে ধাক্কা খেয়ে তার প্রশ্নের প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসছিল। এ প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। তাদের চারদিকে তেলতেলে মসৃণ পাথরের দেওয়াল, তাতে কোথাও এতটুকু ফাঁক বা ফাটল নেই। নেই কোনোদিকে যাওয়ার কোনও দরজা, কোনও পথ। এমনকি রুহার মস্ত মাথার ধাক্কায় যে বিশাল দরজা খুলিয়ে তারা ভিতরে ঢুকেছে সেই দরজারও কোনও অস্তিত্ব এইদিক থেকে বোঝা যাচ্ছে না। সবকটা দেওয়ালের গায়ে কিছুদূর পরে-পরেই আটকানো রয়েছে মশালদানি। আর তাতে গোঁজা সারি সারি জ্বলন্ত মশালের শিখা আলো করে রেখেছে পুরো জায়গাটা।

পায়ের নিচেও দুধের মতো সাদা পাথরের মেঝে, তাতে নানা রঙের পাথরের কুচি বসিয়ে অজস্র সাংকেতিক চিহ্ন আর নকশা আঁকা, ঠিক গুহামুখের বিশাল ধাতব দরজার পিঠে যেমন ছিল। দেখলেই বোঝা যায় সেই রঙিন পাথরের মহার্ঘতা।

শোরিনার কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় দলের প্রায় সবারই মুখে। লাল-চুলো বেঁটেখাটো এক পুরুষ ঠেলেঠুলে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় একেবারে সামনে। “কোথায় এলাম আমরা তুরাগ? কোথায় নিয়ে এলে আমাদের? বেরোব কী করে এই বন্ধ ঘর থেকে? এখানেই কি তাহলে তিলে তিলে পচে মরতে হবে আমাদের? ঘরে আমার ছোট্ট দুটো ছেলে আছে তুরাগ, তাদের মা আছে। ছেলেদুটো যে এখনও আমার কামারশালায় কাজ করার মতো বড়ো হয়নি।” আটকাতে চাইলেও তার গলা চাপা ভয়ে কেঁপে যাচ্ছিল।

“শান্ত হও আমুক, শান্ত হও। এখনই এত দুর্বল হয়ে পড়লে চলবে কী করে? বাচ্চা মেয়েটার কথা ভাবো। জোনা। আমরাই তো তার একমাত্র ভরসা।” তুরাগ শক্ত মুঠোয় হাত ধরে আমুকের।

বড়ো করে শ্বাস টানে আমুক। ঝাঁকড়া চুলের মধ্যে হাত চালায় কয়েকবার। তারপর সামান্য লজ্জিত একটা হাসি হাসে। সে চোখ মেলাচ্ছিল না কারও সঙ্গে।

মিহান এসব কথায় কান দিচ্ছিল না। ঘরে ঢুকে থেকেই তার দৃষ্টি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল চারদিক। বাকিদের কথাবার্তার মধ্যেই সে এগিয়ে গিয়েছিল দেওয়ালের কাছে। অনেকক্ষণ ধরে দেওয়ালে হাত দিয়ে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করছিল সে। “তুরাগ, একবার এসো এইদিকে। জাদুকরী আনায়া, আপনিও আসুন।”

“আসছি, কিন্তু প্রত্যেক কথায় ওই জাদুকরী সম্বোধনটা ত্যাগ করো দেখি এইবার। ওটাই আমার একমাত্র পরিচয় নয়। এই লড়াইয়ে আমি তোমাদেরই একজন সাথী। রোহাতক গ্রামের অধিবাসীরা আমাকে শুধুমাত্র আনায়া বলে ডাকলেই খুশি হব।” হাসি মুখে বললেও আনায়ার স্বরে লুকিয়ে থাকা ইস্পাত কারও কান এড়ায় না।

“আ-আজ্ঞে তাই হবে, হে জা-জাদুকরী। মানে আ-আনায়া।” মিহান অপ্রতিভ তোতলায়।

“বলো মিহান, কী দেখাতে ডাকছিলে?” তুরাগ দেওয়ালের দিকে চোখ রেখে প্রশ্ন করে। “কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না সেই এক নকশা আঁকা মসৃণ দেওয়াল ছাড়া।”

“দেখতে পাবে না। হাত দিলে বুঝতে পারবে। দেওয়ালের গায়ে একটা বিশেষ অংশের দিকে ইশারা করে মিহান।”

“এই জায়গাটা দেখছ? পায়ের নিচের নকশা আর এই দেওযালের নকশায় কোনও মিল বা গরমিল চোখে পড়ছে কি?”

“একই ছবি আঁকা নাকি দু’জায়গাতেই? নজর বটে তোমার। আমি তো অত খেয়ালও করিনি।” তুরাগ চোখ সরু করে দেওয়ালের গায়ে আঁকা ছবি দেখতে দেখতে মন্তব্য করে।

“নজর? হ্যাঁ, নজরই বটে। জোনা আমার একটি মাত্র মেয়ে তুরাগ। একমাত্র সন্তান। সে কেমন আছে, কোথায় আছে কিছুই জানি না। অন্ধের মতো কুটো হাতড়াচ্ছি শুধু। হয়তো কিছুই নয়, তবুও যেখানে যা দেখছি তারই মানে খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যদি অন্ধকারে একটু হলেও আলোর রেখা দেখতে পাই। আনায়াকে বিশ্বাস করি, ভরসা করি। তার কথাতেই এতদূর এসেছি। জোনাকে জীবিত, সুস্থ ফিরিয়ে না যেতে পারলে জোইলাকে কী জবাব দেব তুরাগ? নিজেই বা বাঁচব কী নিয়ে? এই অদ্ভুত জাদুঘরের কোথায় কী আছে খেয়াল করে না এগোলে আমাদের সকলের এই ছুটে আসাটাই যে বৃথা হয়ে যায়।” মিহানের নিচু, ভারী গলায় বলা কথাগুলো সবাইকে এক লহমার জন্য স্তব্ধ করে দেয়।

তুরাগকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, সে খুবই অপ্রস্তুত বোধ করছে। হয়তো এত কিছু ভেবে বলেইনি সে কথাটা।

আবহাওয়া আরও গম্ভীর হয়ে ওঠার আগেই আনায়া কথা বলে। “তুমি কি এই আট কোনা কালো পদ্মর মাঝের এই চোখটার কথা বলছ মিহান?”

সে এতক্ষণ ধরে দেওয়ালের নকশা খুঁটিয়ে দেখছিল। নকশাগুলো মূলত কিছু নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো কয়েকটি সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে তৈরি। ব্যবহৃত চিহ্নগুলোর বেশিরভাগই তার চেনা। যেকোনও জাদু শিক্ষার্থীকেই এগুলো শিখতে হয়। আরও শিখতে হয় এগুলো সাজানোর নিয়ম। একেকভাবে সাজানো চিহ্নে তৈরি হয় একেকরকম সংকেত, একেকরকম ফলাফল। এখানে চিহ্নগুলোকে যেভাবে সাজিয়ে নকশাটা গড়ে তোলা হয়েছে এবং তা থেকে যে অর্থ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা অতি ভয়ংকর।

“হ্যাঁ, ঠিক। ওটার কথাই বলছি। ভালো করে দেখুন, মা-মানে দ্যাখো আনায়া, মেঝেতে বা অন্য তিনটে দেওয়ালে যে নকশা আঁকা আছে, তার কোনোটাতেই পদ্মের মাঝখানে ওই চোখটা কিন্তু নেই। অথচ বাকি সবই হুবহু একরকম। এবার ওই চোখের মণিটায় হাত দিয়ে অনুভব করো।”

খুব সন্তর্পণে কালো পদ্মের ঠিক কেন্দ্রে আঙুলের ডগাটুকু ছোঁয়ায় আনায়া। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই এক বীভৎস অনুভূতি তার আঙুল বেয়ে উঠে আসতে থাকে। হিংস্র, নিষ্ঠুর কালো একটা অত্যাচারী অনুভব। অসহ্য হয়ে ওঠার আগেই দ্রুত আঙুল সরিয়ে নেয় সে। তবে মিহান যা বলতে চাইছিল সেটুকুও ওই অল্প সময়ের মধ্যেই তার বোঝা হয়ে গিয়েছিল। তার কবজিতে জড়ানো ছেঁড়া পুঁতির মালাটিও আগুনের মতো গরম হয়ে উঠেছিল ওই কয়েক লহমার মধ্যেই।

“ওই জায়গাটা দেওয়ালের বাকি অংশের তুলনায় সামান্য উঁচু, তাই না মিহান? তুরাগ, আমুক, তোমরাও দেখতে পারো হাত দিয়ে।” 

“তাতে কী? চোখের মণি বোঝাতে একটু উঁচু করে তৈরি করতেই পারে। কিংবা গড়ার সময় বেখেয়ালে অসমান হয়ে গেছে হয়তো। এটা নিয়ে এত ভাবার কী আছে? বরং ভাবো কী করলে এই ঘর থেকে বেরোনো যাবে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে রাত ভোর হয়ে গেলে জোনাকে যে আর ফিরে পাওয়া যাবে না সে তো তুমিই বলেছ জাদুকরী।” আমুক একটু বিরক্তভাবেই বলে।

“ঠিক অত সহজে অগ্রাহ্য করার বস্তু ওটি বোধহয় নয় আমুক। আমি হাত দিয়ে যা অনুভব করেছি তা খুব সুস্থ স্বাভাবিক কিছু নয়। দেওয়ালের অন্যত্র স্পর্শ করে কিন্তু ওই জিনিস টের পাইনি আমি। কোনও একটা রন্ধ্র বা ফাটল না থাকলে অতখানি বিষকালো ওখান দিয়ে বেরোতে পারত না। আমার মনে হচ্ছে ওটা হয়তো এই ঘর থেকে বেরোনোর কোনও পথের মুখ খোলবার কোনও কৌশল।” আনায়ার দৃষ্টি তখনও সাংকেতিক চিহ্নগুলো ছেড়ে সরেনি। সেইভাবেই উত্তর দেয় সে আমুকের কথার।

“তাই যদি হয় তো আমরা এখানে দাঁড়িয়ে বকবক করে সময় নষ্ট করছি কেন?” বিরক্তভাবে একরাশ উসকোখুসকো চুলে ভরা মাথাটাকে ঝাঁকিয়ে ছিটকে সামনে আসে শোরিনা। সে এতক্ষণ এদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে পড়েছিল। কোনোদিকে না তাকিয়ে তার ছিপছিপে কিন্তু সবল শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে চাপ দেয় দেওয়ালে আঁকা চোখের মণিতে। আর সবাইকে চমকে দিয়ে সত্যিই ধীরে ধীরে ফাঁক হতে থাকে দেওয়ালের ওই নির্দিষ্ট জায়গাটা। সবার হতভম্ব চোখের সামনে খুলে যেতে থাকে একটা অন্ধকার চৌকোণ।

“দাঁড়িয়ে আছ কেন সবাই বোকার মতো? দেখতে পাচ্ছ না সামনে গলিপথ? অত ভয় পেলে এসেছিলে কেন তখন নাচতে নাচতে? জোনাকে খোঁজার ইচ্ছে আছে আদৌ? আসতে হয় তো এসো আমার সঙ্গে।” রীতিমতো ঝাঁজিয়ে ওঠে শোরিনা। এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও হাসি চাপে আনায়া।

সত্যিই সামনে একটা লম্বা গলির মতো কিছু দেখা যাচ্ছিল। মোটামুটি তিনজন মানুষ পাশাপাশি যাওয়ার মতো চওড়া। ছাদ অনেকটা উঁচুতে, ছায়ায় ঢাকা। এর দেওয়াল পাথরের হলেও বিশেষ মসৃণ নয়, মেঝেও কিছুটা এবড়োখেবড়ো। মশাল এখানেও জ্বলছে তবে সংখ্যায় অনেক কম। আলোর তুলনায় অন্ধকারই বেশি। কারও অপেক্ষা না করেই শোরিনা পা বাড়ায়। তার ঠিক পিছনেই আনায়া।

“ও কী? ওরা কারা?”

ভয়ার্ত পুরুষকণ্ঠে প্রশ্ন শুনে ঘুরে তাকায় আনায়া। দলের একেবারে শেষের মানুষটি স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে ঠিক গলিপথে ঢোকবার মুখে। তার মুখ আতঙ্কে সাদা, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। আঙুলগুলো থাবার মতো শক্ত হয়ে চেপে বসেছে হাতে ধরা মোটা লাঠির মাথায়।

“কী হল শিলুম? কার কথা বলছ?” তুরাগ পিছিয়ে যায় কিছুটা।

“ওই দ্যাখো, ওই দ্যাখো তুরাগ। ওরা কারা এগিয়ে আসছে তুরাগ? ওরা কী?”

পাথরে বাঁধানো গলি ততক্ষণে ভরে গেছে পাকিয়ে ওঠা কালচে ধূসর ধোঁয়ায়। ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে সেই ধোঁয়া। তৈরি হচ্ছে মানুষের আকৃতির কিছু ছায়ামানুষ। তাদের চোখের জায়গায় খালি গহ্বর, মুখের জায়গায় অন্ধকার শূন্যতা। অন্তহীন মিছিলে দু’হাত বাড়িয়ে তারা এগিয়ে আসছে একের পর এক। সামনে, পেছনে, দু’পাশেーযেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই।

মিহানের মতো সাহসী লোকও এই নিঃশব্দ ছায়ামিছিল দেখে কেঁপে গিয়েছিল। তবুও সে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। “ভয় পেও না শিলুম। সাহস রাখো আমুক। এসো তুরাগ, অস্ত্র যে যা এনেছ তুলে ধরো। মরি তো মরব। কিন্তু মেরে মরব।”

লড়াইয়ের জন্য তৈরি হতে গিয়ে ওরা খেয়ালই করেনি, ছায়ামানুষেরা কিন্তু ওদের দিকে আর এগোচ্ছিল না। তাদের লক্ষ্য শুধুই আনায়া। আনায়ার পা বেয়ে কোমর বেয়ে পাক খাচ্ছিল, উঠে আসছিল কালচে ধূসর ছায়ার স্রোত। কনকনে হিমশীতল ছায়ার আঙুল, ছায়ার হাত।

“জাদুকরী আনায়া!” চিৎকারটা শোরিনার গলা চিরে বেরোয়।

ততক্ষণে ধোঁয়ার ঘূর্ণি প্রায় আনায়ার বুক পর্যন্ত উঠে এসেছে। অসহ্য ঠাণ্ডায় তার শরীর অসাড় হয়ে আসছিল। থেমে যেতে চাইছিল হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন।

নিজের ভেতরে থাকা সমস্ত শক্তিকে এক জায়গায় নিয়ে আসে আনায়া। অবশ হয়ে আসা আঙুলে মুঠো করে চেপে ধরে জোইলার গাঁথা পুঁতির মালার ছেঁড়া টুকরোটুকু।

খুব আস্তে আস্তে ধূসর ধোঁয়ার ঘূর্ণির মধ্যে ফুটে উঠতে থাকে নীল আগুনের একটা বিন্দু। বিন্দুটা ক্রমশ বড়ো হয়। ধীরে ধীরে অঞ্জলি করে পেতে রাখা আনায়ার দু’হাতের পাতার মধ্যে নীল আগুনের একটা পাপড়ি আকার নেয়। একটা থেকে আরও একটা। তারপর অসংখ্য। একের পর এক বিশাল নীলপদ্মরা ঝলমল করে ফুটে ওঠে আনায়ার হাতে, বুকে, মাথায়, পায়ের কাছে। উজ্জ্বল নীল আলোর শত শত ছোটোবড়ো পদ্মে ভরে যেতে থাকে গলি। ছায়ারা পিছোতে থাকে, পিছোতে থাকে। ভাঙে, ভেঙে যায়। পাতলা সুতোর মতো হয়ে গলে গলে মিলিয়ে যেতে থাকে। নিশ্চিহ্ন হয়ে মিশে যায় গলিপথের দেওয়ালে, ছাতে, মেঝেতে।

এতক্ষণে বিরাট একটা শ্বাস নেয় জাদুকরী আনায়া। শোরিনা লাফিয়ে এসে তার হাত ধরেছে। “আনায়া!”

শোরিনার মাথায় হালকা হাত ছোঁয়ায় আনায়া। তার আঙুলের ডগা দিয়ে তখনও অল্প অল্প নীল আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে একটা আধটা। “চলো। আর ভয় নেই। শুরুতেই এত যখন থামানোর চেষ্টা, বুঝে নাও ঠিক পথেই চলেছি।”

গোটা গলিপথটায় তাদের আর কোনও বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি।

বেশ কিছুদূর গিয়ে একটু থামতে হল ওদের। সামনে রাস্তা বন্ধ। সটান খাড়া কষ্টিপাথরের দেওয়াল উঠে গেছে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত।

“এবার?” প্রশ্ন করে আমুক।

সামনে হাত বাড়িয়ে দেয় আনায়া। একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে। বহুদূর থেকে বয়ে আসা হালকা, খুব হালকা বাতাসের আবছা ছোঁয়া লাগে যেন তার ছড়ানো আঙুলগুলিতে।

“ওইদিকে চলো।”

বাঁদিকে একটা বাঁক নিতেই পাহাড়ের ভেতরের এলোমেলো, এবড়োখেবড়ো পাথরখণ্ডে তৈরি একটা সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়ল দলটা। পথের ধরন পালটে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে। ঢালু হচ্ছিল। ক্রমশ সঙ্কীর্ণও হয়ে আসছিল। দেওয়ালের পাথর আর এখন স্থপতির হাতে বাঁধানো মূল্যবান টালি দিয়ে কৃত্রিমভাবে বসানো নয়। পায়ের নিচের মাটিও ঝুরঝুরে নরম।

প্রথমে তিনজন পাশাপাশি চলছিল তারা। কিন্তু এখন এই সুড়ঙ্গের ভেতরে একের পিছনে একজন ছাড়া চলার উপায় ছিল না। প্রায় নীরবেই এগোচ্ছিল ওরা, মাঝেমধ্যে নিজেদের মধ্যে দুটি একটি কথা ছাড়া।

আনায়া নিজের সবক’টি ইন্দ্রিয় সজাগ সচেতন রেখে এগোচ্ছিল। অপরিসীম যন্ত্রণার গন্ধ নাকে আসছিল তার, অসহ্য কষ্টের শব্দ ধাক্কা দিচ্ছিল তার কানে। সামনের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে বাড়ছিল গন্ধ, বাড়ছিল শব্দ। কল্পনার অতীত এক অশুভ অমঙ্গলের ওজন সুড়ঙ্গের বাতাসকে ভারী করে রেখেছিল, বহু চেষ্টায় সেই ভার ঠেলে ঠেলে এগোতে হচ্ছিল তাকে। তারই মধ্যে মনে মনে জোনার সঙ্গে অবিশ্রাম কথা বলে চলেছিল সে। ভয়ে, ক্লান্তিতে দুর্বল, অবসন্ন হয়ে পড়লেও এখনও জেগে আছে, বেঁচে আছে জোনা।  কিন্তু আর কতক্ষণ?

যথেষ্ট সতর্ক হয়ে পথ চললেও হঠাৎ একেবারে সামনে প্রায় মাটি ফুঁড়ে যে জেগে উঠল তাকে আনায়া একেবারেই আশা করেনি। আরেকটি নিখুঁত কষ্টিপাথরের সচল রক্ষীমূর্তি। দু’হাতে ধরা পাথরের খড়্গ তার এর মধ্যেই চরম আঘাত হানার জন্য মাথার উপরে উঠতে আরম্ভ করেছে।

দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় লাফিয়ে কিছুটা পিছিয়ে যায় আনায়া। কিছু বোঝার আগেই বিরাট এক ধাক্কায় তাকে ঠেলে সরিয়ে পিছন থেকে এগিয়ে আসে শিলুম। তার হাতের মোটা লাঠি আছড়ে পড়ে সরাসরি মূর্তির অরক্ষিত ঘাড়ের পাশে। এই অপ্রত্যাশিত অতর্কিত আক্রমণে কিছুটা নড়ে যায় মূর্তিটি। সেই সুযোগে তার পায়ের কাছে নিচু হয়ে দুই জানুসন্ধিতে একযোগে কুঠার চালায় তুরাগ ও মিহান।

শীনের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তীক্ষ্ণধার বল্লমটি শক্ত মুঠিতে ধরে রেখেছিল শোরিনা। এবার সেটিকে উঁচু করে তোলে সে। সর্বশক্তি দিয়ে বিঁধিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে মূর্তিটির বুকে।

এই শেষ আঘাত আর নিতে পারে না পাথরের মানুষটি। চিরচির শব্দে তার শরীর থেকে খসে খসে পড়তে থাকে কালো পাথরের ছোটোবড়ো খণ্ড। হাঁটু মুড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তার রক্তমাংসে গড়া ফ্যাকাশে মূর্তি। একটা ঘড়ঘড়ে শ্বাসের সঙ্গে বেরোয় দুটি জড়ানো কথা। “পাতালঘরের মন্ত্রকূপ।”

তারপরেই চিরকালের জন্য নিথর হয়ে যায় সেই মানুষের রূপে ফিরে আসা অভাগার দেহ।

তুরাগ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। সে বয়সের তুলনায় যথেষ্ট পরিশ্রমী এবং সবল হলেও এইসব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কসরতের মতো ব্যাপার জীবনে করেনি। সামান্য সময় লাগছিল তার নিজেকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে।

পড়ে থাকা মানুষটির মুখ সাবধানে তুলে ধরেছিল মিহান। দেখছিল মন দিয়ে।

“এও কি চেনা, মিহান?” আনায়া প্রশ্ন করে।

“নাহ্। আমাদের গ্রামের কেউ নয়। কিন্তু কোনও গ্রামের কোনও হারিয়ে যাওয়া কেউ তো নিশ্চয়ই। কে জানে কোন পল্লীর কোন মা, কোন বোন আজও তার পুত্র, তার ভাইয়ের পথ চেয়ে অপেক্ষায় আছে।

“এরা কারা আনায়া? মানুষ এমন পাথর হয়ে যায়?” শোরিনার চোখে ক্রোধ, বিস্ময় আর কষ্ট একসঙ্গে ছলছল করছিল। “শীনকে এরকমভাবে মরতে কেন হল আনায়া? এই অচেনা লোকটিই বা এভাবে কেন মরে যেতে হল? কেনই বা ও পাথরের মানুষ হয়ে আমাদের আক্রমণ করতে চাইছিল? এমনটাও হয়?”

“হয়। জাদুর শক্তিকে, জাদুর শিক্ষাকে ভুল লক্ষ্যে ভুল দিকে চালনা করলে শুধু এই কেন, আরও অবিশ্বাস্য রকমের খারাপ অনেক কিছুই হয়।” আনায়া নিচু গলায় উত্তর দেয়। তার স্মৃতিতে তখন ভাসছিল পেছনে ফেলে আসা নকশাগুলো।

“কে করছে এসব? কেনই বা করছে? ওই যে মা-জুম না কে, তারই কি কাজ এইসব?” তুরাগের শ্বাসপ্রশ্বাস এতক্ষণে স্বাভাবিক হয়েছে।

“বিশ্বাস হয় না আমার। এত বড়ো জাদুকর সে কোনোদিনই ছিল না। সে আমার সহপাঠী বলেই জানি। হ্যাঁ, অন্ধকারের দিকে বরাবরই তার আকর্ষণ আলোর তুলনায় বেশি, একথা অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু ক্ষমতা? নাহ্। এত ক্ষমতাধারী সে নয়। এ কোনও মহা শক্তিধর জাদুকরের কাজ। অতি অশুভ কোনও প্রাপ্তির সাধনা করছে সে। মূর্খ মা-জুম তার হাতের খেলনা ছাড়া আর কিছুই নয়। সে বুঝতেও পারছে না কীভাবে চালিত করা হচ্ছে তাকে।”

“ওই যে শেষ কথাক’টি বলল ও, শীনের মুখেও একই কথা আমরা শুনেছিলাম। কী অর্থ ওই কথা দুটির, কিছু কি বুঝেছ জাদুকরী?” মিহান প্রশ্নটা করেই জিভ কাটে।

আনায়া শেষ সম্ভাষণটি শুনেও না শোনার ভান করে। “এটুকু বুঝেছি যে এই পাতালঘর খুঁজে পেলে পাথর-মানুষদের রহস্য সমাধানের সূত্রও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু তার সঙ্গে জোনার অপহরণের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সে এখনও বলতে পারি না।”

“তুমি তো জাদুকরী আনায়া, জাদুবলেই তো সব করতে পারো। কেন তবে বলতে পারছ না কোথায় আছে ওই পাতালঘর? কোথায় বন্দী হয়ে আথে জোনা? মন্ত্র পড়ে উদ্ধার করে আনছ না কেন তবে জোনাকে? কেন তোমার জাদুর শক্তি দিয়ে উচিত শাস্তি দিচ্ছ না ওই অশুভ জাদুকরকে?” শিলুম বেশ জোর গলাতেই জানতে চায়।

“ভুল করছ শিলুম। আমি মন্ত্রতন্ত্রের জাদু জানি না। শিখিনি। বিশ্বাসও করি না।”

“তবে, তবে যে সবাই তোমায় বলে জাদুকরী আনায়া? সত্যিই তাহলে তুমি মিথ্যাবাদী? ওই মা-জুম যা বলছিল তাই? ভণ্ড জাদুকরী?” শিলুমের গলা ধাপে ধাপে চড়ে।

“আহ্, শিলুম! এখন কি এসব কথার সময়?” তুরাগ তিরস্কার করে ওঠে।

“না তুরাগ। ঠিকই তো বলেছে ও। মন্ত্র নেই, তন্ত্র নেই, তবে কীরকম জাদুকরী আমি?” ঝকঝকে হাসে আনায়া। “আমার জাদু মানুষের ভালোবাসা দিয়ে তৈরি শিলুম, পশুপাখি-ঘাস-ফুল সকলের মঙ্গল চিন্তাই আমার মন্ত্র, শুভকামনার শক্তিই আমার শক্তি। জেনো ভালোবাসার থেকে বড়ো জাদু হয় না, স্নেহের থেকে শক্তিশালী কোনও কবচ নেই। আর শাস্তি? শাস্তি দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই শিলুম, থাকে না। নিজের স্বার্থের জন্য কাউকে আঘাত করলে তার তিনগুণ আঘাত আমাদেরই ফিরে বাজে। আসলে যে যার পাপের শাস্তি, অন্যায়ের শাস্তি সময়মতো নিজেই পায়, আলাদা করে দিতে হয় না গো। এবার চলো। আমাকে ভণ্ড প্রমাণ করার দিন পড়ে আছে অনেক, আগে যে কাজ নিয়ে এসেছি তাকে সমাপ্ত করি।”

মৃতদেহটিকে পাশ কাটিয়ে আবার এগোয় তারা। তাড়াতাড়ি জোনাকে খুঁজে পেতে হবে তাদের। রাত পেরিয়ে একবার সূর্য উঠে গেলে এত চেষ্টার পুরোটাই অর্থহীন হয়ে যাবে।  কিন্তু পাহাড়ের এই গভীর গুহার অন্দরে দিনরাতের গতি কিছুই বুঝতে পারছিল না তারা। তাই ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক নিজেদের গতিই যতটা সম্ভব দ্রুত করে এগিয়ে চলেছিল প্রত্যেকে।

চলতে চলতে সুড়ঙ্গের পরিসর সামান্য চওড়া হয়ে এলেও পায়ের তলার মাটি ঢালু থেকে আরও ঢালু হচ্ছিল ক্রমেই। এতটাই যে, কোনও কোনও জায়গায় টাল সামলে চলাও সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। সেই সঙ্গে কমে আসছিল আলো। মশালের সেই জ্যোতি এখন অনেকটাই কম। খড়খড়ে দেওয়ালের গায়ে বেশ দূরে দূরে গাঁথা সামান্যই কয়েকটা মশালদান, তাতে টিমটিম করে জ্বলছে সরু সরু মশাল। তাদের শিখায় আগুনের চেয়ে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে বেশি, আলোর থেকে বেশি ছড়াচ্ছে ছায়া।

কিছুটা আগেপিছে হয়ে হাঁটছিল ওরা। শিলুম একটু দলছুট হয়ে এগিয়ে গিয়েছিল খানিকটা। তার মাথা নিচু, দৃষ্টি নিজের পায়ের দিকে। খুব নরম করে বলা হলেও আনায়ার তিরস্কারটাকে তিরস্কার বলে বুঝে নিতে তার আদৌ ভুল হয়নি। ভুল হয়নি তুরাগের চোখের অসন্তোষ পড়তে। অথচ কী ভুল সে করেছে কথাগুলো বলে সেটাও তার মাথায় ঢুকছিল না। সত্যি সত্যি জাদুকরীই যদি হয়, সে মন্ত্রের জোরেই সব করে ফেলতে পারে তো। পারে না?

অন্যমনস্কই হয়ে পড়েছিল বোধহয় শিলুম। সুড়ঙ্গপথের মাঝখানটুকু ছেড়ে একটু আলো-আঁধারিতে ছাওয়া ধারের দিকে সরে গিয়েছিল চলতে চলতে। পায়ের তলায় অতর্কিতে ওভাবে মাটি সরে যাবে সেটা পরবর্তী পা-টা ফেলার এক মুহূর্ত আগেও বোঝেনি সে। হুড়মুড় করে পড়ে যাওয়া আটকাতে প্রাণপণে দেওয়াল আঁকড়ে ধরতে চেয়েও লাভ হল না। কর্কশ পাথরের ঘষা খেয়ে দুটো হাতের তালু রক্তাক্ত হল শুধু। তার গলা থেকে বেরিয়ে আসা ভয়ার্ত চিৎকার ছাপিয়ে ভেসে আসে তার সঙ্গীদের কোলাহল।

“শিলুম! শিলুম, কী হল তোমার? কোথায় তুমি? সাড়া দাও শিলুম, সাড়া দাও।” অনেকগুলো গলা বারবার একই কথা বলতে থাকে।

 শিলুম যেখানে পড়েছিল সেই জায়গাটা খুব একটা শক্ত নয়। তবে যথেষ্ট গভীর। অতর্কিতে পড়ে যাওয়ার ঝাঁকুনিতে তার বুক ধকধক করছিল বটে, কিন্তু খুব জোর চোট কিছু লেগেছে বলে মনে হচ্ছিল না তার। পড়ার সময় একটা পা নিজের শরীরের তলায় মুড়ে গিয়েছিল শুধু। সেটাকে সোজা করতে গিয়ে সে দেখল বেশ ব্যথা লাগছে। বাকি সারা গায়ে ছালচামড়া উঠে যাওয়া দু’হাত দিয়ে চাপড়ে চাপড়ে দেখে সে বিশেষ কাটাছেঁড়া কিছু অনুভব করতে পারে না। চারপাশে গাঢ় অন্ধকার এবং একটা অদ্ভুত বন্য গন্ধ।

অনেকটা ওপর থেকে আনায়ার গলা ভেসে আসে আবার, “শিলুম, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”

“পাচ্ছি।” শুকনো গলা পরিষ্কার করে উত্তর দেয় শিলুম।

বন্য গন্ধটা জোরালো হচ্ছিল। সঙ্গে খসখস শব্দ। দীর্ঘ ধারালো নখ দিয়ে কিছু আঁচড়ালে যেমন হয়।

“আমাকে এখান থেকে তোলো, দোহাই।” কাতর অনুরোধ বেরিয়ে আসে শিলুমের গলা থেকে।

“ভরসা রাখো।”

দুটো জ্বলন্ত মশাল ওপর থেকে নিচে পড়ে ঝপ ঝপ করে। একটা পড়তে-পড়তেই নিভে গেল যদিও। অন্যটার আলোয় শিলুম এই প্রথমবার তার চারপাশটা দেখতে পায় এবং শিউরে ওঠে।

একটা শুকনো গভীর কুয়োর মতো জায়গার ঠিক মাঝখানে বসে ছিল সে। চারদিকে খাড়া দেওয়াল উঠে গেছে অনেক উঁচু পর্যন্ত। আর তার পায়ের নিচের মাটিটা ঢাকা পড়ে আছে অসংখ্য আধভাঙা হাড়গোড়ের টুকরোয় আর কঙ্কালে। যার বেশিরভাগটাই মানুষের।

বন্য গন্ধের উৎস খুঁজতেও বিশেষ দূরে তাকাতে হল না। শিলুমের হাত দুয়েক দূরেই একটা খাঁচা। মোটা মোটা লোহার গরাদওয়ালা খাঁচাটার ভেতর থেকে দুটো জ্বলজ্বলে হলুদ চোখ তার দিকেই তাকিয়ে আছে স্থির। এত বড়ো বাঘ শিলুম তার জীবনে দেখেনি। অজান্তেই তার গলা দিয়ে একটা আঁতকানো শব্দ বেরিয়ে আসে।

বাঘটার কান নড়ে। একটা থাবা বেরিয়ে আসে গরাদের ফাঁক দিয়ে। তীক্ষ্ণ ছুরির মতো ধারালো নখ খুলে যায়। লোহার গরাদে নখ ঘষার আওয়াজ হয় কর্কশ।

“আনায়া, তুরাগ, একটা অস্ত্র দাও আমাকে।”

ওপরে ততক্ষণে সবাই জড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে কুয়োর মুখে। শোরিনার কাঁচা ঝনঝনে গলা বেজে ওঠে। “অস্ত্র দিয়ে কী হবে? ছায়ার সঙ্গে লড়বে নাকি? আগে দেখো কীভাবে ওখান থেকে উঠে আসা যায়।”

“বাঘ! বাঘ একটা! অস্ত্র দাও, মারব।” শিলুম ঠিকঠাক গুছিয়ে কথা বলতে পারছিল না।

“কেন মারবে শিলুম? ও কি আক্রমণ করেছে তোমায়? ও-ও তো তোমারই মতো পরিস্থিতির শিকার। তোমারই মতো অনিচ্ছায় বন্দী এক প্রাণী। কেন হত্যা করবে ওকে অকারণ?” কুয়োর পাড় থেকে আনায়া ঝুঁকে আসে অনেকটা। “চারদিকে ভালো করে তাকাও শিলুম, দেখো কোনও রাস্তা পাও কি না।”

“কোন রাস্তা নেই, কিচ্ছু নেই। ওই বাঘের উদরে যাওয়ার আগে তোমার জাদু দিয়ে এখান থেকে তোলো আমায় আনায়া, দোহাই তোমার।”

আনায়া কোনও জবাব দেয় না। শুধু এক আশ্চর্য তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শিলুমের দিকে। তারপর সটান সোজা হয়ে দাঁড়ায় সে। এক হাতে ধরে শোরিনার হাত, অন্য হাতে নেয় মিহানের মুঠি। একে একে প্রত্যেকের হাতে হাতে ধরে ধরে তৈরি হয় এক আদি অন্তহীন চক্র। খুব ধীরে ধীরে, প্রায় দেখাই যায় না এমনভাবে দুলতে থাকে তারা এক অশ্রুত ছন্দে।

আস্তে আস্তে শিলুমের অস্থির ভাবটা কেটে যেতে থাকে। উষ্ণতার এক অনুভূতি মাথা থেকে পা অবধি আচ্ছাদিত করে ফেলতে থাকে তাকে। এক নজর তাকায় সে খাঁচার দিকে। সেখানে বন্দী মহাকায় শার্দূল এখন মাথা নামিয়ে নিয়েছে। দু’চোখ বোজা।

কমলা রঙের নরম আলোয় ভরে যেতে থাকে কূপের ভেতরটা। শিলুমকে ঘিরে থাকে সেই আলোর বলয়। শান্ত চোখে চারদিক দেখে শিলুম।

“উঠে এসো শিলুম। দেখো আলোর সিঁড়ি তৈরি হয়েছে তোমার সামনে ওই। বেয়ে বেয়ে উঠে এসো।” শিলুমের মাথার ভেতরে আনায়ার গলা রনরনিয়ে বাজে।

“কোথায় সিঁড়ি? আমি তো দেখছি না কোনও সিঁড়ি!” অবিশ্বাসের সুর চেষ্টা করেও লুকোতে পারে না শিলুম।

“আছে। ভরসা রাখো। বিশ্বাস করো। পা ফেলো। মনের চোখে দেখো।”

নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগছিল শিলুমের, তবুও সে এক পা তোলে। যেন সিঁড়ির ধাপেই পা রাখছে এবং সত্যিই টের পায় পায়ের নিচে কিছু একটা জিনিসের অস্তিত্ব। চোখ বন্ধ করে একটা ধাপ ওঠে সে। আরও একটা। উঠতেই থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সিঁড়ি ফুরোয়।

শেষ ধাপটার পরেই মুখ থুবড়ে পড়ছিল সে। আমুক না ধরলে আবার গড়িয়ে ওই কুয়োতেই গিয়ে পড়ত হয়তো। কিছুক্ষণ ওভাবেই শুয়ে শুয়ে হাঁফায় শিলুম। তাকে সামলে উঠতে সময় দেয় আনায়া।

“তবে নাকি তুমি মন্ত্র জানো না, জাদু জানো না? এটা কী ছিল তাহলে?” পায়ের ব্যথা সামলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে শিলুম।

“এটা? এটা ছিল তোমার বাঁচার প্রাণপণ ইচ্ছে আর আমাদের সব্বার শুভকামনার, ভালোবাসার জোর।” হাসে আনায়া।

শিলুমের আবারও সব গুলিয়ে যায়।


মিহান এরই মধ্যে কখন যেন একটু এগিয়ে গিয়েছিল সামনেটা দেখে আসতে। এখানে পথ অনেকটা চওড়া। কে জানে পথের বাঁকে আরও কিছু বিদঘুটে বিস্ময় লুকিয়ে আছে কি না তাদের জন্য। এখন সে প্রায় ছুটতে ছুটতে ফিরছিল। “আনায়া, আনায়া!” চাপা উত্তেজিত গলায় ফিসফিস করে মিহান।

“কী হল মিহান? অমন দেখাচ্ছে কেন তোমায়?” আনায়া অবাক হয়ে তাকায়।

“আস্তে কথা বলো। সামনেই।” একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তার সদ্য পেছনে ফেলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে নেয় মিহান।

“কী সামনে?”

“নিজেই দেখবে চলো। খুব সাবধানে, পা টিপে টিপে এসো কিন্তু। ওরা যদি একবার টের পেয়ে যায় আমাদের উপস্থিতি…” বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে যায় মিহান। বিষম হতাশায় তার কাঁধ ঝুলে যায়। “নাহ্। আর লাভ নেই। দেরি হয়ে গেছে বড্ড।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।

তারা কেউই টের পায়নি, চারদিক থেকে কখন তাদের ঘিরে ফেলেছে অসংখ্য পাথর-মানুষ। অত ভারী শরীর নিয়ে এত নিঃশব্দে এক লহমায় কী করে উদয় হল তারা, এও এক রহস্য। এতটুকু পা ফেলার শব্দ হয়নি, মাটি তিলমাত্র কাঁপেনি, অথচ তাদের যাত্রাপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে উঠেছে সারি সারি পাথর-সেনানী। আগে পিছে ডাইনে বাঁয়ে কোথাও এতটুকু ফাঁক রাখেনি তারা।

তুরাগ লাফিয়ে উঠে তার কোমরে ঝোলানো কুঠারের বাঁট চেপে ধরতে যাচ্ছিল, আনায়া খুব সামান্য মাথা নেড়ে নিষেধ করে তাকে। এক-দু’জনের হয়তো মহড়া নেওয়া যায়, কিন্তু এই অগণিত পাথর-মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামা আর আত্মহত্যা একই জিনিস।

তাদের পেছনের পাথর-মানুষদের সারি ক্রমশ ঘেঁষে আসছিল কাছে, উঠে আসছিল প্রায় ঘাড়ের উপর। সামনের দলটা ঠিক একই তালে একই দূরত্ব তৈরি করে এগিয়ে চলেছিল, শুধু ওদের পা রাখার জায়গাটুকু ছেড়ে। বাধ্য হয়েই তাদের পায়ে পায়ে এগোতে হচ্ছিল সামনের দিকে। বোঝা যাচ্ছিল এরা কোনও একটা নির্দিষ্ট জায়গায় তাদের নিয়ে যেতে চাইছে। রাখালের তাড়ায় এগোনো ভেড়ার পালের মতো ঢালু পথ ধরে তারা নিরুপায় নামতেই থাকে নিচ থেকে আরও নিচে।


আধো আলোছায়াতে সিংহাসনে বসা মানুষটির মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তার পরনের কালো জোব্বা আর আসনের কালো পাথর মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। হাঁটুতে কনুই রেখে, দু’হাতের জড়ো করা আঙুল চিবুকে ঠেকিয়ে সামান্য সামনে ঝুঁকে বসে ছিল সে। মোটা ভুরুর নিচে গভীরে ঢোকা দু’চোখে জ্বলজ্বল করছিল এক অস্বাভাবিক দ্যুতিーঝড়ের আগের মেঘজমা আকাশে যেমন আগুনের রেখা চমকে যায়।

দেওয়ালে মশালগুলো জ্বলছিল দাউদাউ। ছোটো ছোটো চৌকিতে প্রদীপও ছিল অগুনতি। তবুও যেন কী এক রক্তজমানো অন্ধকার ছেয়ে ছিল সারা ঘরে। ধূপদানি থেকে পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়ায় পোড়া মাংসের গন্ধ।

সিংহাসনের এক পাশে, সামান্য পিছিয়ে ছায়ায় মিশে দাঁড়িয়ে ছিল মা-জুম। তার পাতলা ঠোঁটে ক্রুর নিষ্ঠুর বিদ্রূপের হাসি। “সেই কখন থেকে প্রতীক্ষায় আছি, এতক্ষণ লাগল তোমাদের এসে পৌঁছতে? এর পরেও নিজেকে জাদুকরী বলে বড়াই করো, আনায়া? এসো, নতজানু হও, অভিবাদন করো আমার প্রভুকে। মেনে নাও তোমার পরাজয়, স্বীকার করো তাঁর দাসত্ব।”

“কেন?” একটিমাত্র কথা বলে এতক্ষণে আনায়া। সে অনুভব করছিল তার কবজিতে জড়ানো জোনার মালাটা ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠছে। হাতটাকে খুব সন্তর্পণে নিজের পোশাকের ভাঁজে আড়াল করে নেয় সে।

মা-জুম এই নির্বিকার শীতল প্রতিক্রিয়া সম্ভবত আশা করেনি। তার ঠোঁটে লেগে থাকা হাসিটা সামান্য টাল খেয়ে যায়। গলা ঈষৎ চড়ে। “কেন? এখনও জিজ্ঞাসা করছ, কেন?”

“হ্যাঁ। করছি। কীসের পরাজয়? কেন দাসত্ব স্বীকার করব তোমার প্রভুর, বুঝিয়ে বলো মা-জুম। কে এই অন্ধকারে বসে থাকা ব্যক্তি, যে নিজের মুখটুকুও দেখাতে ভয় পায়? কেন তাকে আশ্রয় নিতে হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে এক পর্বতের অগম্য অন্দরে? কেন তার রক্ষীদলে কোনও জীবিত মানুষ নেই, আছে শুধু ছলে বলে কৌশলে অসত্যে সংগৃহীত কিছু বিকৃত অর্ধমৃত পাথর-মানুষ? বুঝিয়ে বলো মা-জুম।”

সিংহাসনে বসে থাকা লোকটি এবার মুখ তোলে। চোখের মণিতে ঝলকানো আগুন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে তার। ঘষা ঘষা ঘড়ঘড়ে নুড়ি-গড়ানো আওয়াজে কথা বলে ওঠে সে, “অতিরিক্ত স্পর্ধা দেখিও না হে জাদুকরী। নভাক ঔদ্ধত্য সহ্য করে না। নিজের চারপাশে একবার নজর চালাও। পাথর-মানুষের কথা বলছিলে না? সাবধান না হলে কিন্তু তোমার সঙ্গীদেরও ওই অবস্থায় পৌঁছতে বেশি দেরি হবে না। দেখো ওইদিকে।”

তার বাড়ানো তর্জনী অনুসরণ করে তাকায় আনায়া। হলদেটে আগুনের দীর্ঘ শিখা দপ করে জ্বলে ওঠে নভাকের আঙুলের ডগায়। আলোকিত হয়ে ওঠে এতক্ষণ গভীর অন্ধকারের আড়ালে ঢেকে থাকা একটি কোণ।

একটি বিশাল জলাধার দেখতে পায় তারা সকলেই। ছোটো ছোটো ঢেউ খেলছিল তার ভেতরের কালো জলে। জল বা অন্য কোনও তরল। জল কি অত ঘন কালো, অমন তেলের মতো ভারী হয়? সেই তরলের উপরে থিরথির কাঁপছিল পাতলা নীলচে বাষ্পের স্তর।

“আমার পাতালঘরের মন্ত্রকূপ। ভালো করে দেখে নাও হে উদ্ধত জাদুকরী।” শব্দটা কানে আসতেই চকিত একটা দৃষ্টি বিনিময় হয় ওদের মধ্যে। নভাক তখনও কথা বলে চলেছিল, “এতদূর পথ এসেছ, ক্লান্ত যাত্রী তোমরা। স্নান করবে না? অবগাহন করে দেখোই না ওই জলে একবার।”

“কী আছে ওই জলে?” তুরাগ বন্ধ হয়ে আসতে চাওয়া গলা জোর করে পরিষ্কার করে।

নভাকের তীব্র দৃষ্টি তুরাগের দিকে ঘোরে। “তুমি? তুমি তুরাগ, না? ওই ক্ষুদ্র রোহাতক গ্রামের নির্বোধ গ্রামপ্রধান? নিজের গ্রামের মানুষের হিসাব রাখতে পারে না যে মূর্খ, সে নিজেকে প্রধান বলে কোন দম্ভে, অ্যাঁ? আমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করার সাহসই বা তার হয় কী করে?”

অপমানে তুরাগের মুখ লাল হয়ে উঠছিল। কিন্তু সে নিজের মাটি ছাড়ে না একচুলও। “প্রশ্ন যখন করেছি, জবাব দেওয়া আপনার কর্তব্য।”

“প্রভু, এই তুচ্ছ পোকামাকড়গুলোর আস্ফালন আপনি আর কতক্ষণ সহ্য করবেন? অনুমতি দিন, দেখিয়ে দিই কী আছে ওই কূপে।” মা-জুম প্রায় চিৎকার করে ওঠে।

একটা শীর্ণ ফ্যাকাশে হাত তুলে তাকে থামায় নভাক। “আর কয়েক প্রহর মাত্র। সূর্যোদয়ের ঠিক আগের মুহূর্তেই আমার এতদিনের সাধনার সমাপ্তি হবে। অসীম জাদুশক্তির একচ্ছত্র অধিকারী, অমর সম্রাট হব আমি। তুমি হবে আমার একনিষ্ঠ সেবক, আমার অনুচর। এই যে এদের নেত্রী, এই ভণ্ড জাদুকরী, এই আনায়ার সব শক্তি নিঃশেষে ফুরিয়ে যাওয়ার আগে এটুকু সময় এদের নিয়ে ক্রীড়া করে নিজেকে আমোদিত করতেই পারি।”

নভাকের মুখ থেকে চোখ সরাচ্ছিল না আনায়া। তার কবজি রীতিমতো জ্বালা করছিল মালার তাপে। জোনা এখানেই কোথাও রয়েছে, নিঃসন্দেহে।

“ওই কূপে কী আছে জানতে চাইছিলে, না? আছে অমর হওয়ার রহস্য। আছে এক বিশেষ মন্ত্রপূত তরল। একবার ডুব দিয়ে দেখতে পারো হে নির্বোধ তুরাগ। চিরকালের জন্য এই মানবজন্ম থেকে মুক্তি পেয়ে যেতে পারো। চলমান প্রস্তরমূর্তি হতে চাও?” বিশ্রী হাসে নভাক।

শিউরে উঠে দু’পা পিছিয়ে যায় তুরাগ।

“নাহ্, তুমি নও, তোমরা নও। আজ ওই তরলে স্নান করব আমি। আর কয়েকটি পল মাত্র।”

“মানে? আপনি পাথর হতে চান?” শিলুম নিজেকে আটকাতে পারে না।

“কে? কে এই মহামূর্খ যে এমন প্রশ্ন করে নভাককে?”

শিলুম নিজেকে গুটিয়ে যথাসাধ্য ছোটো করে ফেলার চেষ্টা করছিল। ক্রুদ্ধ নভাক অবশ্য উত্তরের অপেক্ষা করে না। “স্বীকার করতে লজ্জা হয়, কিন্তু হ্যাঁ, কখনও কখনও মহাশক্তিশালী নভাকেরও ভুল হয়। হয়েছিল। যে প্রাচীন অন্ধকার জাদুর পুথিতে ওই জলের মন্ত্র ছিল, তা ঠিকঠাক উদ্ধার ও প্রয়োগ করতে সামান্য ত্রুটি হয়েছিল। তাই পূর্ণ অমরত্ব লাভের পরিবর্তে ওই জলে স্নানের ফল হচ্ছিল জীবের সচল পাথরে রূপান্তর। কিন্তু সে ত্রুটি সংশোধন হয়েছে। প্রক্রিয়া পর্বের প্রকৃত অর্থ এতদিনে সঠিক বোধগম্য হয়েছে। আর কোনও ভুল হবে না। সব উপাদান, সব সরঞ্জাম সংগ্রহ হয়েছে। আজই সম্পূর্ণ হবে শেষ উৎসর্গ।”

আনায়ার কবজি জ্বলে যাচ্ছিল প্রায়। “জোনা? জোনাকে এইজন্য অপহরণ করেছ তুমি?”

“আমি অপহরণ করেছি?” আবারও কর্কশ হাসে নভাক।

“নভাককে যে কিছুই করতে হয় না, এখনও বোঝোনি সেকথা? অন্ধকারের অধিপতির সব ব্যবস্থা নিজে থেকেই হয়ে যায়। শিশু-রক্ত, শুধু শিশু-রক্তই একমাত্র উপাদান যা বাকি ছিল। আজ সেটিও জুটেছে পরম সৌভাগ্যে। তোমাদের ক্ষমতা নেই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও আমার এই আঁধারের রাজত্ব থেকে। কাল পুব আকাশে সূর্য উঠে সাক্ষী হবে নভাকের অমরত্বের।”

“আগে আমাদের পরাজিত করো নভাক, তারপরে অমরত্বের কথা ভেবো।” মিহান দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় আনায়ার পাশে।

“অন্ধকারে লুকিয়ে থেকে অমন বুলি খুব ঝাড়া যায়। ওই পাথুরে দানোগুলো না থাকলে বড়ো বড়ো কথা বেরিয়ে যেত। জাদুকর না আরও কিছু। পাগলের ঝাড়।” শোরিনার সতেজ সবুজ কিশোরী কণ্ঠ স্ফটিকের বাঁশির মতো ঝনঝন করে ওঠে। সেও আনায়ার অপর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের পেছনে সারি দিয়ে দাঁড়ায় তুরাগ, আমুক, শিলুম।

“জোনাকে হত্যা করে অমর হতে চাও তুমি, অন্ধকারের দাস? বেশ, দেখি কেমন করে পারো। আমাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার, স্নেহের যে রক্ষাকবচ রয়েছে তাকে ঘিরে, দেখি কেমন করে তাকে ছিন্ন করো তুমি।” আনায়া জোনার মালার টুকরোটাকে কবজি থেকে খুলে মুঠোয় নিয়ে আসে। জ্বলজ্বলে সাদা আলো ছড়াচ্ছিল পুঁতিগুলো।

মা-জুমের চোখমুখ বিস্মিত ক্রোধে বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল। “এত সাহস তোমাদের? এখনও এত সাহস? আমার প্রভু ইচ্ছে করলে তোমাদের পোকার মতো টিপে মেরে ফেলতে পারেন, জেনেও এত সাহস?”

“হ্যাঁ মা-জুম, জেনেও এত সাহস।” হাসে আনায়া।

“তোমার প্রভুর কারবার ভয় নিয়ে, আর আমরা বিশ্বাস করি ভালোবাসায়। তাই আমাদের শক্তি আলো, আমাদের মন্ত্র সত্য।”

হুঙ্কার দিয়ে সিংহাসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে ওঠে নভাক। “আর নয়। আর সহ্য করব না এই ঔদ্ধত্য।”

নভাকের ডান হাতে সরু কালো লাঠিটা এতক্ষণ লক্ষ করেনি কেউ। এইবার সেটাই আনায়ার দিকে সটান তাক করে নভাক। ঘন কালো একটা রেখা ছিটকে বেরোয় লাঠির মাথা থেকে।

আনায়া একটুও নড়ে না তার জায়গা থেকে। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি সে ধরে রেখেছে নিজের ঠোঁটে। ডান হাত সামান্য তোলে সেও। চোখ ধাঁধানো সাদা আলোর একটা গোলক তার হাতের পাতা থেকে ছুটে যায় কালো রেখাটার দিকে। শুষে নেয় সমস্ত কালো।

দাঁত দিয়ে ঠোঁট চাপে নভাক। এই জবাব সে আশা করেনি। আরও জোরালো প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতিতে সে দু’হাত ছড়ায় দু’পাশে। মাথা চিত করে ওপরের দিকে চায়। অবোধ্য কিছু শব্দের উচ্চারণ উঠে আসছিল তার ভেতর থেকে।

পাতালঘরের ভেতরে ক্রমশ অন্ধকার বাড়তে থাকে। ছায়াচ্ছন্ন কোণগুলো থেকে ঝটপট করে উড়ে আসতে থাকে অসংখ্য বিচিত্র প্রাণী। তারা বাদুড়ের মতো দেখতে হলেও বাদুড় নয়। বিশাল তাদের ডানার বিস্তার। তাদের ডানার আগায় বাঁকানো নখ, তাদের হাঁ করা মুখে ধারালো দাঁতের সারি। মাথার ওপর দিয়ে ঝাপটা মেরে মেরে উড়ছিল প্রাণীগুলো।

আমুকের গলা দিয়ে আপনিই ভয়ার্ত আওয়াজ বেরিয়ে আসে। তুরাগের শরীর অজানা আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল। কিন্তু নিজের জায়গা ছেড়ে এক পা নড়ে না তবুও তারা কেউ।

আনায়ার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। সে শক্ত করে দু’হাতে মিহান আর শোরিনার হাত ধরে। নিজের ভেতরের শক্তির শেষ কণিকাটুকুকে আকর্ষণ করে নিয়ে আসে, ছড়িয়ে দেয় তাদের তিনজনের আঙুলের ডগায়।

অন্ধকার পাতালঘরের ছাদ থেকে হঠাৎই বিরাট পাখা নেড়ে নেমে আসে এক প্রকাণ্ড আলোর ঈগল। তার চোখের মণিতে ঠিকরোচ্ছে আলো, তার ডানার প্রতিটি পালকের ডগায় ডগায় আগুনের ফুলকি। চারিদিক ভরে যায় এক অতি উজ্জ্বল সাদা আলোর ঝলকানিতে। বাদুড়ের মতো জীবগুলো সেই আগুনে পুড়ে কুঁকড়ে ছাই হয়ে টুপটাপ ঝরে পড়তে থাকে। আর্তনাদ করে চোখ ঢাকে নভাক। “সরাও ওকে, সরাও! এত আলো সহ্য হচ্ছে না আমার। চোখ জ্বলে যাচ্ছে, অন্ধ হয়ে যাচ্ছি আমি। ওহ্‌, কী যন্ত্রণা! অন্ধকার কোথায়, অন্ধকার? অন্ধকার চাই আমার।”

ছটফট করতে থাকে নভাক। দৃষ্টিহীন ছুটোছুটি করতে থাকে ঘর জুড়ে। আলোর তেজ ক্রমশ বাড়ে। সজোরে ডানা ঝাপটায় আলোর ঈগল।

আলো এড়াতে চোখে হাত চাপা দিয়ে ছুটছিল নভাক। সামনে কী আছে দেখার কোনও উপায়ই তার ছিল না। কিছু একটা পায়ে লাগে তার। সামলানো সম্ভব ছিল না। বিশাল শরীরটা উলটে পড়ে তরল ছলকানো কূপে।

“প্রভু!” মা-জুমের বুকফাটা আর্তনাদ পাতালঘরের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে যায়।

আনায়া শ্বাস নেয় একবার বুক ভর্তি করে। তারপর পুঁতির মালা ধরা মুঠিকে বাড়িয়ে ধরে মন্ত্রকূপের দিকে। “আলো হোক। ভালো হোক। কালো যাক।”

ওদের চোখের সামনে কূপের তরলের তেলতেলে থকথকে ভাব কেটে যেতে থাকে ক্রমশ। স্বচ্ছ টলটলে জলে ভরে ওঠে কূপ। নভাকের পাথর হয়ে যাওয়া বিশাল দেহটা ছোটো হতে থাকে, ভেঙে যেতে থাকে, সবশেষে ধুলোর মতো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মাটিতে মিশে যায়।

সহসা গুরুগুরু শব্দে কেঁপে ওঠে গুহা। ঝরঝর করে ছোটোবড়ো পাথরের খণ্ড ঝরতে থাকে চারদিক থেকে। তার সমস্ত রাজসিক সাজসজ্জা নিয়ে চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ে পাতালঘর।

পাহাড়ের ভেতরে কাঁপুনি শুরু হতেই বাহুর বেড়ে মাথা মুখ ঢেকে বসে পড়েছিল ওরা। পাথর পড়া বন্ধ হতে আস্তে আস্তে মাথা তোলে সবাই। সামনের দৃশ্যটা বিশ্বাস করতে পারছিল না কেউ। সেই নকশাকাটা সুড়ঙ্গ, সেই বিশাল সিংহাসন, সেই পাথরের কারুকার্য করা মেঝে, সেই সারিবদ্ধ পাথর-মানুষের দল সব কোথায় কোন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। কোনোদিন যে এখানে তাদের কোনও অস্তিত্ব ছিল তা কল্পনাতেও আনা যাচ্ছিল না। তাদের চারদিকে এখন বালি-মাটি-পাথরে গড়া প্রাকৃতিক গুহার দেওয়াল। এখানে ওখানে জমে আছে পাথরের স্তূপ। কোথাও একটা ফাটল দিয়ে সামান্য আলো আসছে, আসছে অল্প হাওয়াও।

“ওই আলো অনুসরণ করে চলো সবাই। মনে হয় ওখানেই আছে সুড়ঙ্গের মুখ।” আনায়া ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তার হাতের মালা এখনও ঠাণ্ডা হয়নি।

হঠাৎ কিছু একটা শুনে মাথা তোলে শোরিনা। “শুনতে পাচ্ছ, আনায়া?”

শুনেছে। আনায়াও শুনতে পেয়েছে। ক্ষীণ একটা কান্নার শব্দ। অনেক দূরে, কিন্তু পরিষ্কার মানবশিশুর কান্না।

একটা বিশাল পাথরের স্তূপের পেছন থেকে ভেসে আসছিল আওয়াজটা। এতটাই বিশাল যে পার হওয়া অসম্ভব।

শিলুম আবার কাঁচুমাচু মুখে আনায়ার দিকে তাকায়। “ইয়ে, জাদু দিয়ে সরানো যায় না পাথরগুলো? তোমার ওই ঈগলের মতো আর কেউ নেই, পাথর-খুঁড়িয়ে?”

আনায়া হেসে ফেলে। “যে কাজ হাতের জোর দিয়ে হয় সে কাজে জাদু ব্যবহার বারণ যে। এসো, সবাই মিলে হাত লাগাই বরং।”

সমস্ত শক্তি দিয়ে পাথর সরাচ্ছিল ওরা। আনায়া আর শোরানি ছাড়া কেউই কিছু শুনতে পায়নি যদিও, তবুও অবুঝ ভরসায় প্রাণপণে পাথর সরিয়ে চলেছিল সবাই। শেষ পাথরটা সরতেই একটা হো-ও আওয়াজ উঠল দলটার মধ্যে থেকে।

“এবার বলো জাদুকরী, কী করব?” তুরাগ জানতে চায়।

“হ্যাঁ, জাদুকরী, বলো। কী করবে এবার?” মা-জুমের গলা শুনে চমকে ওঠে সবাই। নভাকের ওই বীভৎস পরিণতির পর তাকে আর দেখতে পায়নি কেউ। সে যে আদৌ বেঁচে আছে এই ধারণাটাই ছিল না কারও।

মা-জুমকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। পাথর পড়ে গালের অনেকটা কেটে গেছে। রক্ত গড়াচ্ছিল সেখান থেকে।

“যা করতে এসেছি মা-জুম। যার জন্য একটা গোটা দিন গোটা রাত ধরে এত কষ্ট স্বীকার করেছি আমরা সবাই। যার জন্য এখনও জেগে অপেক্ষা করছে রোহাতক গ্রাম। এসো তুরাগ, এসো মিহান। তোমরা আমার সঙ্গে এসো। মা-জুম, অমন দাঁড়িয়ে রইলে কেন, এসো, তুমিও এসো। তুমিই তো শুরু করেছিলে এ খেলার, তাই না?”

অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতরে পা বাড়ায় আনায়া। বিশ্রী পচা গন্ধে বাতাস ভারী।

জোনার মালা থেকে বেরিয়ে আসা আলোয় পথ দেখতে অসুবিধে হচ্ছিল না ওদের। যদিও সে আলোয় গুহার পাথুরে দেওয়ালে অদ্ভুত ভয়াল ছায়া তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু সুড়ঙ্গ বেয়ে ক’পা এগিয়েই ওদের সামনে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তার তুলনায় সে ছায়া নেহাতই নিরামিষ।

“এ কী! এসব কী?”  তুরাগ শিউরে ওঠে।

কালো পাথরের চওড়া বেদিটার ওপর রক্ত জমে জমে মরচে রঙ ধরে গিয়েছে। গলাকাটা প্রাণীগুলোর পচে আসা দেহ এক দিকে স্তূপ হয়ে রয়েছে। ছিন্ন মুণ্ডগুলো বেদির ওপর সার দিয়ে সাজানো। একটা বিশাল সাপ, মাছ একটা, মুরগি, কুকুর। তা ছাড়াও আরও অনেক ছোটোবড়ো জন্তুর রক্তমাখা হাড়গোড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পাথরের মেঝে জুড়ে।

মশালটা উঁচু করে ধরে আনায়া।

“জোনা? ওটা জোনা?” মিহান চিৎকার করে ওঠে হঠাৎ।

ছোট্ট শরীরটার হাত-পা বাঁধা। হাড়িকাঠের ঠিক সামনে গুটিয়ে পড়ে রয়েছে বাচ্চাটা। দেহে প্রাণ আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।

পাগলের মতো মেয়ের দিকে ছুটে যায় মিহান।

“এসব কী জাদুকরী?” তুরাগ আতঙ্কিত চোখে তাকায় আনায়ার দিকে। “এ গুহা কার? এ কীসের পূজা? জোনার এ অবস্থা কে করল?”

“অন্ধকারের পূজা তুরাগ। মনের ভেতরের কালোর পূজা। নভাকের সাধনার শেষ ধাপ।” খুব আস্তে উত্তর দেয় আনায়া।

“মানে?”

তুরাগের প্রশ্নের জবাব দেয় না আনায়া। তার চোখ তখন অন্য কাউকে খুঁজছিল। “ও কী মা-জুম, তোমার জামার হাতাটা অমন করে ছিঁড়ল কী করে? পাথর লেগে নাকি?”

“জামা, মানে কই? না তো।” সুড়ঙ্গের মুখের কাছে দাঁড়ানো মা-জুম হঠাৎই তোতলা হয়ে যায়। 

“ওই যে, দেখতে পাচ্ছি পরিষ্কার। এই কালো কাপড়ের টুকরোটা যেন ওখান থেকেই ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে মনে হচ্ছে।” নিজের কোমরবন্ধে গুঁজে রাখা রেশমি কাপড়ের ছেঁড়া টুকরোটা হাতে তুলে আনে আনায়া।

“কীসব বলছ অবান্তর কথা জাদুকরী?” মা-জুমের গলায় আগের তেজ আর নেই। “আমার জামারই কাপড় হতে হবে এমন কোনও কথা আছে? কত লোকই তো কালো কাপড় পরে।”

“কালো রেশমের জামা তোমাদের গ্রামে আর কেউ পরে, তুরাগ?”

তুরাগ হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে ছিল। আনায়ার প্রশ্নে তার চমক ভাঙে। “না জাদুকরী, না। কালো রঙ করতে অনেক খরচ, অনেক পরিশ্রম। আমরা কালো পরি না তো কেউ। আর রেশমই বা পরব কী করে, সে যে বহুমূল্য। তবে কি মা-জুম, মা-জুমই?” কথা হারিয়ে ফেলে তুরাগ।

“তোমার অন্ধকারের দেবতার কাছে শেষ বলিটা তাহলে জোনাকেই দিতে, তাই তো, মা-জুম? বুকে হাঁটা প্রাণী দিয়ে শুরু, জলচর, আকাশে ওড়া, চতুষ্পদ, আর সবশেষে মানুষ, তাই না? এইভাবে শক্তি জড়ো করছিলে তোমরা শুধু আমার মতো তুচ্ছ এক ভণ্ড জাদুকরীকে সরাবে বলে? জাদু দুনিয়ার মালিক হওয়া অতই সহজ? এত বোকা তুমি মা-জুম?” ব্যঙ্গের হাসি হাসে আনায়া।

“তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্য আমরা সফল হতে হতেও হেরে গেলাম। আমার প্রভু, আমার সর্বশক্তিমান প্রভুকে তুমি অসম যুদ্ধে পরাজিত করেছ। জাদুকরী আনায়া, তোমার এই চাতুরীর শোধ আমি নেব। নেবই।” মা-জুমের কষ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছিল, চোখে উন্মাদ দৃষ্টি। চিৎকার করে সে, আনায়ার দিকে তর্জনী তুলে নাচায়।

ঠিক এই সময় মিহানের কোলে আবার শব্দ করে কেঁদে ওঠে জোনা। জ্ঞান ফিরে এসেছে তার। মুহূর্তের জন্য সবার চোখ তার দিকে ফেরে।

কয়েকটা মুহূর্ত শুধু। দূর থেকে ভেসে আসা পক্ষীরাজের তীক্ষ্ণ তীব্র চিঁ-হি হ্রেষা শব্দে সবাইকে আবার চমকে এদিকে ঘুরতে হল। এবার তার সঙ্গে যোগ হয় রুহার আকাশ কাঁপানো ক্রুদ্ধ হুঙ্কারের প্রতিধ্বনি, আর সেই সঙ্গে কার যেন মর্মান্তিক মরণ আর্তনাদ।

শব্দ আর আলোর উৎসমুখ লক্ষ করে প্রাণপণ ছোটে সবাই। পথ তাদের নিয়ে আসে গুহার বাইরে, যেখান দিয়ে একসময় তারা ঢুকেছিল পাহাড়ের গভীরে। এখান সেখানে সেই নকশা আঁকা পুরু ধাতব দরজার কোনও চিহ্নই আর নেই। পাহাড়ের গায়ে শুধু হাঁ করা উন্মুক্ত গহ্বর। বাইরে  এসেই সবাইকে আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়।

তুরাগের পক্ষীরাজ থরথর করে কাঁপছিল। তার সারা গায়ে ঘাম, মুখে ফেনা। ক্রুদ্ধ পা দাপাচ্ছিল সে। সম্ভবত তার পিঠে চড়েই পালাতে চেষ্টা করেছিল মা-জুম।

রুহার নাক দিয়ে তখনও ধোঁয়া বেরোচ্ছিল। পেটের ভেতর থেকে উঠে আসছিল ভয়ংকর গড়গড় শব্দ। কিন্তু তার সামনের পায়ের তলায় তালগোল পাকানো আধপোড়া ওটা কী? রুহার তীক্ষ্ণ বাঁকানো নখে আটকানো?

“অতৃপ্ত দেবতা শেষপর্যন্ত মা-জুমকেই বলি নিলেন তাহলে।” ক্লান্ত শ্বাস ফেলে আনায়া। “চলো, গ্রামে ফেরা যাক। ভোর হয়ে এল। জোইলা অপেক্ষা করে রয়েছে।”

মিহানের কোল থেকে জোনাকে নিজের কোলে নেয় আনায়া। নরম চুমো খায় তার ধুলোমাখা তুলতুলে গালে। “ভালো হোক। আলো হোক।”


___

অলঙ্করণঃ https://www.scorpydesign.com/


No comments:

Post a Comment