আলোর দিশারিঃ লিয়ার মানেই লিমেরিক - শেখর বসু

লিয়ার মানেই লিমেরিক


শেখর বসু



এ যেন এক আজব দেশ! এখানে সবকিছুই কেমন যেন অন্যধরনের। মানুষজনের চেহারাও অদ্ভুত। কারো নাক দারুণ লম্বা। কারো বা শরীরের তুলনায় পা-দুটো বেজায় ঢ্যাঙা। পোশাকআশাকের ছিরিছাঁদও নেই। মানুষই এরা, তবে কারো কারো চেহারার সঙ্গে জন্তুজানোয়ারের মিলও আছে খানিকটা। খেতে ভালোবাসে সকলেই, তবে এদের খাবারদাবার কেমন যেন সৃষ্টিছাড়া গোছের।

গবগবিয়ে খেতে গিয়ে কারো খাবার আটকে যায় গলায়। এদের কাণ্ডকারখানাও বেয়াড়া। যা করার নয়, তাই করে থাকে মনের আনন্দে। যা বলার নয়, চড়া গলায় তাই বলে থাকে। বিচিত্র এক সংসারের বিচিত্র প্রাণী সব। তবে চেষ্টা করলেও এড়ানো যায় না এদের। কখনো-কখনো আবার এদের ওপর মায়াও পড়ে যায় বেশ। এদের সব কাণ্ডই ধরা আছে লাগসই এক ছড়ার বইতে। বইটির নাম ‘আ বুক অব ননসেন্স’। লেখক এডওয়ার্ড লিয়ার। বইটির প্রথম প্রকাশ ১৮৪৬ সালে।

বইটি বার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হইহই পড়ে গিয়েছিল চারদিকে। কী মজার বই! যেমন ছবি  তেমনি ছড়া। অল্প সময়ের মধ্যে বইটির তিন-তিনটি সংস্করণ বার হয়। অনেকেই খোঁজ নেন লেখকের, বেশ কয়েকজন আলাপও করতে চেয়েছিলেন লেখকের সঙ্গে। কিন্ত লেখক সবার সামনে আসতে চান না।

না আসার একটাই কারণ, তাঁর শরীর ভালো থাকে না প্রায়ই। মৃগী রোগ তাঁকে কাবু করে ফেলেছিল ছেলেবেলা থেকেই। বেয়াড়া রোগ, কখন যে মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়বেন, তার ঠিক নেই। ওই রোগটির পাশে অন্যান্য আধিব্যাধিও জুটেছিল। ব্রঙ্কাইটিস আর হাঁপানিতে ভুগতেন প্রায়ই।

১৮১২ সালে ইংল্যান্ডের একট মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল এডওয়ার্ড লিয়ারের। বাড়ি ছিল উত্তর লন্ডনের হলোওয়েতে। লিয়ারের ভাইবোনের সংখ্যা ছিল একুশ। পরিবারের সামান্য রোজগারে মস্ত বড়ো সংসারের বোঝা টানা ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়ছিল। তার ফলে ভাঙতে লাগল সংসার। বড়ো দিদি আন তাঁর চার বছর বয়সী ছোটো ভাই এডওয়ার্ড লিয়ারকে নিয়ে অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করলেন।

দিদি ছিলেন লিয়ারের চাইতে একুশ বছরের বড়ো। সন্তানস্নেহেই তিনি বড়ো করে তুলেছিলেন ছোটো ভাইকে। কিন্তু স্কুলের পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি ভাইটির। ওর ঝোঁক ছিল ছবি আঁকায়। ধরতে গেলে সবসময়ই ছবি আঁকত। এই ছবি আঁকাই পরে তার রোজগারের পথ খুলে দিয়েছিল। রোজগার শুরু হয়েছিল মাত্র ষোলো বছর বয়স থেকেই। ওই টাকায় দিদির সংসারের সুরাহা হয়েছিল খানিকটা।

ছবি আঁকার বিদ্যের জোরেই কিছুদিন বাদে প্রাণিবিদ্যাবিষয়ক দফতরে ড্রাফটস ম্যানের চাকরি পান তিনি। প্রধানত পাখির ছবি আঁকতে হত তাঁকে। পরে ডার্বির এক আর্লের জমিদারিতে একইধরনের কাজ করেছিলেন কিছুকাল।

উনিশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম বই বার হয়। পাখিদের নিয়ে লেখা বিজ্ঞানের বই। এই বইতে তোতাপাখি পরিবারের অনেকগুলি ছবি এঁকেছিলেন তিনি। তাঁর কাজের খুব প্রশংসা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

কাজের সূত্রে নানা দেশে বিস্তর ঘোরাঘুরি করেছেন লিয়ার। তাঁর এইসব সফরের মধ্যে ছিল গ্রিস, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, মিশর ইত্যাদি দেশ। ভারত ও সিংহলেও এসেছিলেন তিনি। বিস্তর ছবি এঁকেছিলেন ওই সব সফরে।

শুধুমাত্র যে কাজের ছবি আঁকতেন, তা নয়; নিজের খেয়ালে আঁকা ছবির সংখ্যাও ছিল বিস্তর। এগুলির মধ্যে ল্যান্ডস্কেপ ছিল বেশ কয়েকটি। ফিরে আসার পরে নিজের স্টুডিওতে বসে ওইসব ছবি নিয়ে বিস্তর ঘষামাজা করেছিলেন। কিছু ছবি জল ও তেলরঙেও এঁকেছিলেন।

খুব ইচ্ছে ছিল অন্যসব কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে চিত্রকরের পেশা নেবেন। কিন্তু নিয়মিত রোজগারের পথ থেকে সরে এসে ছবি আঁকার তালিম নেওয়া বেশ কঠিন। শেষপর্যন্ত ওই কঠিন কাজটিই শুরু করেছিলেন। ইংল্যান্ডের রয়াল আকাডেমি স্কুলে ভর্তি হলেন। দশ বছরের  পাঠক্রম। ইচ্ছে ছিল, এখানে তেলরঙের ছবি ও ফিগার ড্রয়িংয়ের প্রচলিত অঙ্কনপদ্ধতি শিখে নেবেন। কিন্তু শেখার মুখেই সমস্যা তৈরি হল অন্যদিক থেকে। ইংল্যাণ্ডের জোলো হাওয়ায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন বারবার। এইভাবে সাড়ে তিন বছর কোনোমতে টানার পরে আর পারলেন না। আকাডেমি ছাড়তে বাধ্য হলেন। পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেলেন ভূমধ্যসাগরের উপকূলে। এই এলাকাটি বেশ রোদ-ঝলমলে। এই আবহাওয়ায় তাঁর শরীর সেরে উঠেছিল আস্তে আস্তে।

পূর্ণ সময়ের জন্যে চিত্রকর হওয়া আর হয়ে ওঠেনি লিয়ারের। তার বদলে হলেন লেখক আর  ইলাস্ট্রেটর। গম্ভীর বিষয়ের দিকে খুব একটা যেতেন না, মজার বিষয় তাঁকে খুব টানত বলে মজাদার বিষয় নিয়েই লেখালেখি চালাতেন। ছবির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত আঁকার কাজ। উদ্ভট, আজগুবি বিষয় নিয়ে লেখা আর আঁকা। এইসব লেখা আর ছবির সুবাদে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন লিয়ার।

গানবাজনাতেও বেশ পটু ছিলেন মানুষটি। চমত্কার আকর্ডিয়ান বাজাতেন। বাজাতেন বাঁশি ও গিটার। রোমান্টিক ও ভিক্টোরিয় যুগের অনেক কবিতায় সুর বসিয়েছেন তিনি। টেনিসনের কবিতার খুব অনুরাগী ছিলেন। কবির অনেক কবিতায় সুরারোপ করেছেন। টেনিসনকে নিয়ে  তাঁর বেশ কয়েকটি মিউজিক্যাল সেটিংও প্রকাশিত হয়েছিল।

তাঁর ‘ননসেন্স সং’-এর সংখ্যাও কম নয়। ‘‘ইয়াংগি-বঙ্গি-বো’র পূর্বরাগ’, ‘পেলিক্যান কোরাস’  এবং  ‘প্যাঁচা ও পুষিবেড়াল’ এই বিভাগের মনমাতানো কাজের কয়েকটি।

প্যাঁচার চোখ, নাক আর পাখার খুব বাহার। দুর্দান্ত গিটার বাজায় প্যাঁচা। গলায় ঝোলানো গিটারে সুর তোলে যখন তখন, আর তালে তালে নাচে আদুরে চেহারার বেড়াল। বেড়ালের চোখদুটো খুব বড়ো বড়ো, গায়ে আর লেজে ডোরাকাটা দাগ। দু’জনে মিলে মটরশুঁটি-সবুজ  নৌকোয় চেপে ভেসে পড়ে সাগরে। এক-আধটা দিনের জন্যে নয়, লম্বা সফর। তাদের এই সফরের প্রধান লক্ষ সেই দ্বীপ খুঁজে বার করা যেখানে ‘বং ট্রি’ গজায়। তবে এ সফর মুখ শুকনো করে দ্বীপ খুঁজে বেড়াবার সফর নয়। নৌকোয় এন্তার নাচগান হয়, আর চাঁদনি রাত পেলে তো কথাই নেই—নাচগানের মাত্রা বেড়ে যায় অনেকটাই।

এডওয়ার্ড লিয়র শুধু নিজের নামেই নয়, তিন-তিনটি ছদ্মনামেও লেখালেখি করেছেন। প্রথম ছদ্মনামটি ‘ডেরি ডাউন ডেরি’। বাকি দুটি নাম পেল্লায় আর মজাদার। একটি হল ‘মিঃ আবেবিকা ক্রারোপোলোকো প্রিজিকালো আবলেগোরাবালুস ফ্যাসিফপ’। অন্য নামটি আরও খানিকটা বড়ো।

শব্দ নিয়ে নানারকম খেলায় মাততেন লিয়ার। কিছু কিছু শব্দ নিজেও বানিয়েছেন। তাঁর লেখায় ‘স্টাফ্‌ড রাইনোসেরাস’ হয়ে উঠেছে ‘ডায়াফানাস ডোরস্ক্রেপার’। ছড়া-গল্প-গানের নায়ক-নায়িকাদের নামগুলোও বিচিত্র। এই যেমন ‘কোয়াংগেল-ওয়াংগেলস, ‘পোবলস’, ‘জাম্বলিস’ ইত্যাদি। তাঁর তৈরি বিদঘুটে কিছু শব্দ ঢুকে গেছে ইংরেজি অভিধানে। বিশেষ অর্থ প্রকাশের ব্যাপারে সেগুলির প্রয়োগ মোক্ষম।

লিয়ারের মজাদার গান ও গল্পের ভক্তসংখ্যা কম নয়, তবে তাঁর খ্যাতি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ছড়া রচনায়। লিমেরিকে তিনি সিদ্ধহস্ত। তাঁর লিমেরিকগুলি সাধারণত কোনো একটি মানুষকে নিয়ে গড়ে উঠেছে। এই মানুষটি হয়তো বুড়ো বা ছোকরা, তরুণী বা সম্ভ্রান্ত মহিলা কিংবা নিতান্তই একজন খ্যাপাটে মানুষ। অথবা এমন একজন যে শুধুমাত্র ‘সে’ সর্বনামেই ধরা পড়ে। বাকি সবাই ‘তারা’। এই ‘তারা’রা স্বভাবের দিক থেকে একটু গোঁড়া প্রকৃতির। তবে একট ব্যাপারে এদের মধ্যে বেশ মিল আছে, তা হল প্রত্যেকেই বেয়াড়া সব ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে।

সাধারণ লিমেরিকের গঠনগত একটি বৈশিষ্ট্য আছে। এটি পাঁচ লাইনের। প্রথম লাইনের শেষ শব্দটি ফিরে আসে আবার পঞ্চম লাইনের শেষে। বেশিরভাগ বিষয়ের আবার মাথামুণ্ডু নেই। উদ্ভট গোছের। শেষে বাড়তি কোনো ধাক্কাও নেই। তবে লিয়ার সবসময় প্রচলিত লিমেরিকের ধাঁচ মেনে চলেননি। লাইনের সংখ্যা নানা জায়গায় নানারকম। কখনো-কখনো ছবির নীচের ফাঁকা জায়গার পুরোটাই ভরাট করেছেন ছড়ায়।

লিমেরিকের নিয়ম তিনি মানুন আর নাই মানুন, তাঁর লিমেরিকের মজা একেবারে অন্য ধাঁচের। দুটি অনুবাদ করা যেতে পারে এখানে।

প্রথম লিমেরিকটি পাঁচ লাইনের।

সেই বুড়োটার গাঁয়ের নাম আস্তা,

তার ছিল এক মস্ত গরু, তাকে সে হারায়,

খোঁজ লাগাতে সবাই বলে, ‘দেখছ না,

গরু উঠেছে গাছের মাথায়?

খ্যাপা বুড়োর গাঁয়ের নাম আস্তা।’


এটি চার লাইনের।

নরওয়ের সেই কমবয়সী মহিলা,

ছিল বসে আপনমনে দোরগোড়ায়;

দরজা তাকে চেপটে দিতেই চমকে বলে সে, ‘হচ্ছেটা কী রে?’

নরওয়ের সেই কমবয়সী সাহসী মহিলা।


উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে লিমেরিক লেখার একটা ঝড় উঠেছিল। অনেকেই তখন লিমেরিক লিখেছেন। সব লিমেরিকেরই বিষয়বস্তু ছিল আজগুবি। যুক্তি-বুদ্ধির ধার ধারতেন না কেউ।

বিচিত্র ওই জগতে দুই আর দুইয়ের যোগফল কখনোই চার হত না। তখনকার বিখ্যাত লিমেরিক-লিখিয়েদের মধ্যে ছিলেন লুইস ক্যারল, টমাস হুড, ডবলিউ এস গিলবার্ট প্রমুখ। তবে লিয়ারই ছিলেন সবার ওপরে। লিয়ার মানেই লিমেরিক।

এইসব উদ্ভট লেখার প্রভাব পড়েছিল বিশ শতকের বড়ো দুটি আন্দোলনের ওপর। সে দুটি হল স্যুররিয়েলিজম আর থিয়েটার অব দ্য আবসার্ড।

আগাগোড়া মজায় ঠাসা ছিলেন লিয়ার, কিন্তু একটা চাপা দুঃখ থেকে গিয়েছিল চিরকাল। সেই দুঃখের কথা অবশ্য বাইরের লোক খুব একটা জানতে পারেনি। অসুখবিসুখ আর দারিদ্র্য তাঁকে কাহিল করে ফেলত প্রায়ই। দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হতে শুরু করেছিল মাঝবয়স থেকে। একটি মেয়েকে ভালো লাগত তাঁর, কিন্তু সেই ভালো লাগা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি শেষপর্যন্ত। শেষ জীবনে বড়ো একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

এডওয়ার্ড লিয়ার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৭৬ বছর বয়সে, ১৮৮৮ সালে। তাঁর  শেষযাত্রায় সঙ্গী হওয়ার মতো বিশেষ কাউকে পাওয়া যায়নি। শেষকৃত্যের আয়োজন করেছিলেন তাঁর এক চিকিত্সকের স্ত্রী।


___


No comments:

Post a Comment