ছোটো গল্পঃ ক্যাটরিনা - প্রান্তিক বিশ্বাস



ক্যাটরিনা


প্রান্তিক বিশ্বাস


“মুসুন, এখনও মুখে খাবার নিয়ে বসে আছ?” মিষ্টিমাসি ওর মাথার এলোমেলো চুলের মধ্যে হাত বোলাতে বোলাতে বলল।

মুখভর্তি মায়ের ঠেসে দেওয়া দুধ-কর্নফ্লেক্সে কথা বলার উপায় নেই। তাই মুসুন ওপরে নিচে ঘাড় নাড়ল।

“আর বলিস না। তিতিবিরক্ত হয়ে গেলাম একে নিয়ে! খেতে বসে এই এক মুশকিল। মুখে খাবার নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকবেন। গিলবেন না, টিভিতে কার্টুন এপিসোড সব শেষ হয়ে যাবে কিন্তু তেনার খাওয়া শেষ হবে না।” মা এক নিঃশ্বাসে বলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল।

মিষ্টিমাসি পেছন পেছন গিয়ে বলল, “রাগ করিস না। আমাকে চামচটা দে। আমি দেখছি।”

“রাগ কি আর সাধে করি রে? হাড়মাস জ্বালিয়ে খেল। শোয়ার সময়েও একই ঝামেলা, কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করবে না! থাবড়িয়ে থাবড়িয়ে ঘুম পাড়াতে হাত ব্যথা হয়ে যায়।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চামচটা দিল মা।

মিষ্টিমাসি ওটা নিয়ে মুসুনের সামনে এসে বসল। রিমোট দিয়ে টিভিটা অফ করে দিতেই মুসুন ‘উঁ উঁ’ করে উঠল।

“কার্টুন তো সবসময় দেখছ। এখন আমি আর তুমি গল্প করব, কেমন?”

গালভরা খাবার আঙুল দিয়ে দেখাল ও। ভাবখানা এমন যে, মুখে খাবার নিয়ে কী করে গল্প করবে!

মিষ্টিমাসি হেসে ঘাড় নাড়ল। “ঠিক বলেছ। তুমি চটপট খেয়ে নিলে তবেই তো গল্প করতে পারবে, তাই না?”

মুসুন ঘাড় নাড়ল আবার।

“লক্ষ্মী মেয়ে। এবার মুখের খাবারটা গিলে নিয়ে বলো তো আমায় কীসের গল্প শুনবে।”

“বেবিদের।”

“ঠিক আছে। তাহলে তোমাকে আজ একটা বেবিজ ডে-আউটের গল্প বলি শোনো।”

“সে তো দেখেছি!”

“না না, ওটা নয়। একটা অ্যানিম্যাল বেবির ডে-আউট। কী অ্যানিম্যাল বলো তো?”

“ডগি।” কোনোরকমে কোঁক করে খাবারটা গিলে নিয়ে বলল মুসুন।

“ডগি বা ক্যাটু তো সবসময় চারদিকে দেখছ। তোমাকে তো অন্য পশুপাখিদের কথাও জানতে হবে, তাই না?”

“কেন?” এবার মুসুনের মুখ খালি।

মিষ্টিমাসি চামচের আদ্ধেকটায় খাবার ভরে ওর মুখে দিল। “না হলে তো ওরা কষ্ট পাবে সোনা। তোমার স্কুলের নাম তো ক্ষিতিকা। তার মানে কী জানো তো?”

“দ্য আর্থ।” চট করে গিলে ফেলে বলল ও।

“তাহলে এই পৃথিবীতে আর কারা তোমার মতন মিত্তি সেটাও তো জানতে হবে, তাই না? না হলে বড়ো হলে তারা তোমার সঙ্গে খেলবে কেন বলো?”

“হুঁ। তাহলে কীসের গল্প বলবে?”

“মিরক্যাট।”

“এই তো বললে ক্যাটু নয়!”

“নাম মিরক্যাট হলেও এরা কিন্তু কোনও ক্যাট নয়।”

“তাহলে?”

“এরা কিছুটা মনগুজ বা বেজির মতন। থাকে সাউথ আফ্রিকায়। এদের পাওয়া যায় খালি তিনটে দেশে一বোৎসওয়ানা, নামিবিয়া আর সাউথ আফ্রিকাতে, যেখানে কিছুটা মরুভূমি বা ডেজার্ট আছে।”

“ডেজার্ট তো খায়!”

“সেটাকে ডেসার্ট বলে। ডেজার্ট বা মরুভূমি এমন একটা জায়গা যেখানে মাটির বদলে বালি বেশি থাকে। গাছপালাও ওই কারণে কম হয়।”

“সি-বিচের মতন?”

“ঠিক। তো এই মিরক্যাটরা ওখানেই থাকে। এবার সাউথ আফ্রিকায় গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা হল।”

“ছবি তুলেছ?”

“হুঁ, দেখাব।” মিষ্টিমাসি এরই মধ্যে তিন চামচ খাইয়ে দিয়েছে ওকে। “মুসুন, তোমাকে এখন যে বেবিটার গল্প বলব, সেটা একটা বেবি মিরক্যাট। তার নাম ক্যাটরিনা।”

“সুইট নাম।”

“হ্যাঁ, দেখতেও খুব সুইট। আমার হাতের তালুর মধ্যে এঁটে যাবে। ল্যাজটা যদিও একটু বড়ো।”

“ওর মা-বাবা কত বড়ো?”

“ওর থেকে অনেকটাই বড়ো। তোমার আঙুলের নখ থেকে কনুই অবধি। দশ থেকে বারো ইঞ্চি লম্বা।”

“আর ল্যাজটা?”

মিষ্টিমাসি একটু হেসে ওর মুখে শেষ চামচটা তুলে দিয়ে বলল, “ল্যাজ আরও সাত ইঞ্চি। গায়ের রঙ হালকা ছাই ছাই আর বাদামি মেশানো। মুখটা ইঁদুরদের মতন ছুঁচলো। চোখের চারপাশটা কালো।”

“কেন, ও কি কাজল পরে?”

“ঠিক বলেছ! তবে তোমার মা যেমন তোমাকে কাজল পরায়, তেমনি মাদার নেচার ওদের সবার বড়ো বড়ো গোল চোখের চারপাশে কাজল পরিয়ে দিয়েছে। মরুভূমিতে সূর্যের আলো তো খুব কড়া, এতে ওদের চোখের মণিতে বেশি আলো যায় না।”

“কেন?”

“কালো জিনিস সবসময় আলো টেনে নেয়।”

“আচ্ছা, ক্যাটরিনার চোখেও কাজল আছে?”

“আছে। তবে এখন ছোটো তো, তাই হালকা। যত বড়ো হবে, তত গাঢ় হবে। এবার চলো, চান করে নেবে।”

“আমি তো খালি মা আর বাবার কাছে চান করি।”

“তাই? তাহলে তুমি এখনও ক্যাটরিনার মতন লিটল বেবি!”

“না। আমার ফাইভ হবে থার্ড জুলাইতে!”

“বাহ্‌। ক্যাটরিনা যখন এরকম বড়ো হবে, তখন ও খালি মা আর বাবার কাছে থাকবে না। ওর কাকু, জেঠু, মামা, মাসি, পিসি আর ভাইবোন সব্বাইয়ের সঙ্গে থাকবে সারাক্ষণ।”

“জয়েন্ট ফ্যামিলি?”

“একদম। ওদের এই জয়েন্ট ফ্যামিলিকে বলে ‘গ্যাং’ বা ‘মব’। একেকটা গ্যাং-এ কুড়ি থেকে পঞ্চাশটা মিরক্যাট থাকে।”

“এত্ত জন মিলে একটা বাড়িতে থাকে!”

“হ্যাঁ, সে এক বিশাল তিন-চারতলা বাড়ি। তবে সবটাই মাটির নিচে।”

“মেট্রো রেলের মতন?”

“ঠিক বলেছ। ওদের বাড়িকে ইংরিজিতে বলে ‘বারোও’।”

“আমাদের বাড়ির থেকেও বড়ো?”

“এত বড়ো বাড়ি নিয়ে ওরা কী করবে? ওরা তো মাত্র এক থেকে দেড় ফুট সাইজের। ওরা এই বাড়ি বানায় দুটো কারণে। মরুভূমিতে সকালে ভীষণ গরম, রাতে খুব শীত। এই বাড়িগুলো যেন এসি বসানো। না ঠাণ্ডা, না গরম। আরেকটা কারণ হল, ওদের যারা শত্রু, যেমন সাপ, ঈগল এসবের হাত থেকে বাঁচার জন্যে। ওরা নিজেদের সামনের দু’পায়ের নখ দিয়ে মাটি বা বালি খুঁড়ে টানেল বা সুড়ঙ্গ বানায়। এই সুড়ঙ্গগুলো বিভিন্ন জায়গায় জোড়া থাকে, ওপরে নিচে, ডাইনে বাঁয়ে রাস্তা করা থাকে। এই সুড়ঙ্গের মধ্যেই থাকে ওরা। একেক তলায় বেশ কয়েকজন করে। সবচেয়ে যারা ছোটো, তারা থাকে একদম তলার ফ্লোর বা লেভেলে।”

“কেন?”

“কারণ ওটাই সবথেকে সেফ বেবিদের বা ছোটোদের জন্যে। চট করে কোনও শত্রু ওদের খোঁজ পায় না। চলো, এবার চান করিয়ে দিই।”

“চান করাতে করাতে ক্যাটরিনার গল্প বলবে তো?”

“নিশ্চয়ই।”

মিষ্টিমাসি মুসুনের গায়ে সাবান মাখাতে মাখাতে বলল, “এই যে তোমায় সাবান মাখাচ্ছি, সাবান দিয়ে তোমার গা পরিষ্কার করে দিচ্ছি, এটা অন্য কোনও প্রাণী করে না কিন্তু। ওরা যেটা করে সেটা হল গ্রুমিং। ওদের গায়ের লোম বা পালকের মধ্যে যে নোংরা জমে বা পোকা হয়, সেটা ওরা দাঁত দিয়ে বা নখ দিয়ে পরিষ্কার করে। নিজেরা নিজেদের গ্রুমিং করে, আবার অন্যরাও করে দেয়। বেবিদের বেশিরভাগ গ্রুমিং যেমন মা করে দেয়।”

“জানো, সাবান মাখতে আমার একদম ভালো লাগে না।”

“হুম। অনেকেই পছন্দ করে না। ক্যাটরিনার এক কাকু আছে, তার নাম রিকি। সে যেমন ওই গ্রুমিং করা পছন্দ করে না। না নিজের, না অন্য কারুর। তাই ওর গায়ে পোকা। একটু বাজে গন্ধও বেরোয় ওর গা দিয়ে। ওদের গ্যাং-এর কেউ চট করে ওর কাছে ঘেঁষে না।”

“ক্যাটরিনার ভাইবোন আছে?”

“আছে, সব বলছি। কালাহারি মরুভূমিতে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল অবধি বর্ষাকাল। সেদিনটা ছিল বাইশে ফেব্রুয়ারি। বৃষ্টি নেমেছে সকাল থেকে। রিনার গ্যাং-এর সবাই তাই মাটির তলায় ওদের বাড়িতে।”

“রিনা কে?”

“রিনা হল এই গ্যাং-এর রানি। প্রত্যেকটা গ্যাং-এ একজন রানি থাকে। সব্বাই তার কথা শোনে। তার অনেক দায়িত্ব। কোথায় গেলে বেশি খাবার পাওয়া যাবে, কোথায় ওরা বাড়ি বানাবে, সেই বাড়ি কেমন দেখতে হবে, কে কখন কী কাজ করবে, সবকিছুই রিনা ঠিক করে। তারপর বাকিদের বলে দেয়। তবে রিনা খুব রাগী। গ্যাং-এর কেউ ওর কথা না শুনলে তাকে তাড়িয়েও দিতে পারে। তো বাইরে যখন এরকম বৃষ্টি হচ্ছে, রিনার পেট থেকে পরপর বেরোল ওর তিনজন বেবি। মিরক্যাট বেবিদের ‘পাপ’ বলে, বেবি ডগিদের যেমন আমরা ‘পাপ্পি’ বলি। প্রথম পাপ বেশ বড়সড় এক মেয়ে, তারপর এক ছেলে আর সবশেষে একটা ছোট্ট মেয়ে一দিদি আর দাদার চেয়ে অনেকটাই দুর্বল।”

“একসাথে তিনটে পাপ?”

“হুঁ। সাধারণত ওদের একসঙ্গে তিন থেকে পাঁচজন বেবি হয়। এদিকে কয়েকটা সুড়ঙ্গ দিয়ে জল ঢুকছে বলে রিনার ভাই টিটো, দু’বোন মিনা আর টিনা মিলে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে সেইসব সুড়ঙ্গ বন্ধ করে দেবার জন্যে। নইলে সারা বাড়ি তো জলে ভরে যাবে। তিনজন পাপকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে যাবে।”

“কী করে সুড়ঙ্গ বন্ধ করল?”

“কী করে আবার, মাটি চাপা দিয়ে! যে জায়গাটা বন্ধ করতে হবে, তার দিকে পেছন ফিরে ওরা সামনের মাটি আঁচড়াতে লাগল সামনের দু’পা দিয়ে। সেই মাটি ওদের শরীরের তলা দিয়ে গিয়ে জড়ো হল পেছনে। তাতে সামনে গর্ত হল, পেছনে মাটি ভরে উঁচু দেওয়াল উঠে গেল। ওদের পায়ে চারটে আঙুল। আর সামনের পায়ের নখগুলো বড়ো আর বাঁকানো। সেজন্যে মাটি খুঁড়তে সুবিধে হয়, আর তাড়াতাড়ি খোঁড়াও যায়।”

“তারপর? পাপগুলোর কী হল?”

“জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে রিনা ওদের গা চেটে দিল ভালো করে। ওদের জীবনের প্রথম গ্রুমিং। জানো তো, ওদের জন্মের পরে অনেকদিন ওদের গায়ে কোনও লোম থাকে না, কানে শুনতে পায় না, চোখেও দেখতে পায় না। তাই এইসময় ওরা পুরোপুরি অসহায়। কোনও শত্রু যদি ওদের দিকে আসে বা ওদেরকে মারার চেষ্টা করে, ওরা কোনোভাবেই টের পাবে না। সেজন্যে রিনা ওদের একদম আগলে রাখবে কয়েকদিন। বেরোবেও না বাড়ি থেকে। বেরোলেও যে ওর সবথেকে ভালো বেবি-সিটার, ওর বোন টিনা, তাকে পাপদের কাছে পাহারায় রেখে যাবে।”

“ওদের বাবার নাম কী, বললে না তো?”

“বাবার নাম ভিকি। বেবিদের জন্মের সময় সে পাহারা দিচ্ছিল ওদের বাড়ির সবচেয়ে বড়ো সুড়ঙ্গটার মুখে। ওখান থেকেই শত্রুর ঢুকে পড়ার সবথেকে বেশি চান্স। সারাদিন বৃষ্টির পর যখন ভিকি তলায় নেমে এল, ওর মুখে তখন দুটো বড়ো বড়ো কেঁচো।”

“ইস! কেন?”

“রিনার ডিনার।”

“ওরা কেঁচো খায়? এমা!”

“তুমি যেমন নুডলস বা চাউমিন ভালোবাসো…”

“তারপর, তারপর কী হল?”

“ভিকি এসে দেখল ওর পাপ তিনজনকে। রিনাকে কানে কানে জিজ্ঞেস করল ওদের কোনও নাম রেখেছে কি না। তিনজনই তখন চুকচুক করে দুদু খাচ্ছে মায়ের বুক থেকে। ওদের গ্রুমিং আর ফিডিং করতেই রিনা ব্যস্ত। তাই নাম আর ঠিক করা হয়নি। ভিকি শুনে বলল, ‘কুছ পরোয়া নেহি।’ একটু ভেবে দু’জনে মিলে নামও ঠিক করে ফেলল। বড়ো মেয়ের নাম ক্যাসুরিনা, ছেলের নাম রিনাক আর ছোটো মেয়ের নাম ক্যাটরিনা।”

“ও মা, কী ভালো, সবার নামেই মায়ের নাম আছে!”

“বললাম না, রিনা ওদের রানি, তাই সবকিছুই ওরা করে রিনাকে খুশি রাখতে।”

“রিনা খুশি হল?”

“খুউব। বাকিরাও এসে তখন ভিকির পেছনে দাঁড়িয়ে গেছে। বাচ্চাদেরকে দেখানোর জন্যে একটা একটা করে তিনটেকেই মুখে করে তুলে ধরল রিনা। ক্যাসুরিনা ওর বড়ো মেয়ে, সব ঠিক থাকলে রিনার পরে ও-ই হবে ওদের রানি। সবাই অনেকক্ষণ ধরে দেখল ক্যাসুরিনাকে। মায়ের মতনই বড়সড় চেহারা।”

“মাসিমণি, এখানেও বৃষ্টি শুরু হল। জানালা বন্ধ করতে হবে।”

“চলো।”


মিষ্টি চান করে এসে দেখল মুসুন দুপুরের খাবার খেতে বসেছে। যথারীতি মুখে একগাল ভাত আর মাছ নিয়ে বসে আছে। ওর মা ঘি-ভাত, আলুসেদ্ধ আর কাতলা মাছ ভাজা একটু করে নিয়ে গোল্লা পাকিয়ে পাকিয়ে রাখছে।

“চটপট খেয়ে নাও। দুপুরে শুয়ে শুয়ে তো বাকি গল্পটা শুনতে হবে, তাই না?”

মুসুন এটা শুনে তাড়াতাড়ি মুখের খাবারটা গিলে নিয়ে বলল, “এক্ষুনি বলো।”

“আচ্ছা।”

চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে মিষ্টিমাসি একটা চেয়ার টেনে বসল ডাইনিং টেবিলের পাশে।

“মুসুন, তুমি টেবিলের ওপর বসে খেতে ভালোবাসো?”

“হ্যাঁ, চেয়ারে বসলে আমার টিভি দেখতে অসুবিধে হয়।”

“আচ্ছা। এবার মায়ের ছুটি, আমি গল্প বলতে বলতে তোমাকে খাইয়ে দিই।”

“ওকে। এবার বলো, রিনা কেঁচো খেল?”

“খেল তো বটেই। ও তো এখন নিজে বেরিয়ে নিজের খাবার যোগাড় করতে পারবে না। বেবিদের কান খুলতে দশ দিন, চোখ ফুটতে দশ থেকে চোদ্দ দিন। এই ক’দিন ও যদিও বা কখনও বেরোয়, ওর জায়গায় বেবি সিটিং করবে টিনা। কিন্তু রিনা চট করে কাউকে বিশ্বাস করে না। তাই কয়েকদিন ওর ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার সবকিছুই দিয়ে যাচ্ছে অন্যেরা। তারা এসে ওকে খাবার দিয়ে আবার গ্রুমিংও করে দিয়ে যায়। এইসময় যেহেতু রিনা বাইরে সূর্যের আলোয় যাচ্ছে না, ওর গায়ে ছোটো ছোটো পোকা গজাচ্ছে। টিনা, মিনা বা ভিকি ওর খাবার নিয়ে এসে ওর পিঠ কামড়াতে থাকে, চুলকে দেওয়ার মতন, তাতে সেই পোকারা ঝরে যায় ওর গা থেকে। এতে রিনা খুশি হয়, আরামও পায়।”

“আমিও বাবাকে বলি সুড়সুড়ি দিতে বা পিঠে চুলকু চুলকু করে দিতে।”

“আমি তো জানি সেটা।” মিষ্টিমাসি একটু হেসে আবার শুরু করল। “এরকমভাবেই প্রায় দশ দিন কেটে গেল, বুঝলে? তখনও মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। ক্যাসুরিনা, ক্যাটরিনা আর রিনাক, তিনজনেরই কান খুলেছে–এখন শুনতে পায় ওরা। চোখ খুলেছে খালি ক্যাসুরিনার। রিনা খুব খুশি, বড়ো হয়ে ও-ই তো রিনার জায়গায় রানি হবে এই গ্যাং-এর। তিন ভাইবোনই বেশিরভাগ সময় ঘুমোয়। ঘুম থেকে উঠেই মায়ের দুদু খাওয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ওরা। মা ওদের সবসময় গা চেটে দেয়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখে চারদিক। ওদের যখন হিসি, পটি করার দরকার পড়ে তখন তিন ভাইবোনকে মুখে করে নিয়ে বাড়ির মধ্যে অন্য এক জায়গায় নিয়ে যায় ওদের মা। গ্যাং-এর বাকিরা পরে ওখানে এসে মাটি চাপা দেয় পটির ওপর।”

“ওরা টয়লেটে যায় না?”

“তুমিও তো ছোটোবেলায় ন্যাপিতে হিসি, পটি করতে। তাই না?”

হি হি করে হেসে উঠল মুসুন।

“এগারো দিনের দিন ক্যাসুরিনা সুড়ঙ্গের মধ্যে একটু হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। ক্যাটরিনা আর রিনাক একে অন্যের গায়ে গা লাগিয়ে ঘুমোচ্ছে। তখন বিকেল হতে চলেছে। সকাল থেকে গ্যাং-এর সবাই বেরিয়ে গেছে খাবার যোগাড় করতে। কেউ তখনও ফিরে আসেনি রিনার খাবার নিয়ে। রিনার পেটে খুব খিদে, কিন্তু বাচ্চাদের একলা ছেড়ে বেরোতেও পারছে না। সন্ধে যখন হব হব, তখন রিনা আর থাকতে পারল না। খিদের জ্বালায় বেরিয়ে পড়ল ওদের বারোও ছেড়ে। বেরিয়ে ওদের গ্যাং-এর কাউকে দেখতে পেল না। একটু চিন্তা হচ্ছে। বৃষ্টি আজ হয়নি। রোদের তাপ কম। ও একবার পেছনের দু’পা আর ল্যাজের ওপর ভর করে গলা উঁচিয়ে দেখল কাউকে যদি দেখা যায়। কেউ কোত্থাও নেই। ভাবল একবার একটা গাছের মাথায় চড়ে দেখে। কিন্তু জোর খিদে পেয়েছে, তার ওপরে বাচ্চাগুলোর কাছেও কেউ নেই। এবারে ও নিজের খাবার যোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আশেপাশে ঘুরল খানিকক্ষণ। মাটি শুঁকে শুঁকে দেখল, কোথাও কোনও কেঁচো, বিছে বা অন্যান্য ছোটোখাটো পোকা, টিকটিকি কিচ্ছুটি নেই। হয়তো এখানে কোনও খাবার পায়নি বলেই ওর গ্যাং দূরে কোথাও গেছে।

“হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল ওর। মাথাভাঙা বিশাল বাওবাব গাছটার শেকড়ের একটা জায়গা অনেকক্ষণ ধরে শুঁকল। তারপর একমনে খুঁড়তে শুরু করল। বৃষ্টির জন্যে মাটি একটু কাদা কাদা। শুকনো মাটি ঝুরঝুরে হয়, সহজে খোঁড়া যায়। প্রায় ঘাম বেরিয়ে গেল ওর। কিন্তু তারপর যা খুঁজছিল পেয়েও গেলーকেঁচোদের ডেরা। মুখ একটু ভেতরে ঢুকিয়েই দুটো মোটাসোটা কেঁচো পেয়ে গেল। দুটোকে রসিয়ে রসিয়ে খাবে বলে পাশে রেখে আবার মুখ ঢোকাল আরও কিছু পাওয়ার আশায়। কিন্তু তারপরেই একটা চিন্তা ওর মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। বাচ্চাগুলো একা। এখন যদি কিছু…”

“কী কিছু?”

“বলছি সোনা। রিনা কেঁচোদুটো মুখে করে ল্যাজ আকাশের দিকে তুলে পড়িমরি করে ছুটল। বারোওতে ঢুকে সোজা দৌড়ল একদম নিচের তলায়। গিয়ে দেখল ক্যাটরিনা আর রিনাক দেওয়ালের ধারে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। দু’জনেরই চোখ ফোটেনি। কিছু একটা শুনেছে বা বুঝেছে ওরা, যা ভয় পাওয়ার মতন। কিন্তু ক্যাসুরিনা কোথায়, ওর আদরের বড়ো মেয়ে, ভবিষ্যতের রানি?”

মুসুন হাঁ করে আছে, মুখে ওর শেষ গ্রাস।

“গিলে নাও, গিলে নাও। বাকিটা শুনতে হবে তো!”

মুসুন চোখ গোল গোল করে গিলে নিয়ে বলল, “এবার বলো।”

“রিনা এবার চিৎকার করে ডাকল ক্যাসুরিনাকে। তাতে কোনও সাড়া পেল না। খালি ক্যাটরিনা আর রিনাক আরও কাঁপতে থাকল। রিনা ওদের কাছে গিয়ে চট করে গা চেটে দিল। তারপর বারোওতে সব তলা, অলিগলি আতিপাতি খুঁজে দেখতে লাগল। পেছন দিকের একটা সুড়ঙ্গের সামনে মাটিটা দেখে ওর মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ হল। বোঝা যাচ্ছে এখানে ধস্তাধস্তি হয়েছে একটু আগেই। থমকে গেল। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল ওই সুড়ঙ্গের মুখের দিকে। মাটিতে এবার স্পষ্ট দাগ।”

“কীসের দাগ মাসিমণি?”

মুসুন ভয়ে জড়োসড়ো। ওর এঁটো মুখটা মা জল দিয়ে মুছিয়ে দিয়েছে এর মধ্যে।

“কেপ কোবরার। বাংলায় যাকে কেউটে সাপ বলে। যেমন বিশাল তেমন বিষাক্ত! এক মুহূর্ত ভাবল রিনা। সাপকে, এমনকি কেপ কোবরাকেও ও ভয় পায় না। এই কোবরার পেটেই নির্ঘাত গেছে ওর আদরের মেয়ে ক্যাসুরিনা, যে বেঁচে থাকলে রানি হত ওর পরে। ক্যাসুরিনার সবে চোখ ফুটেছিল। তাই মাকে কাছে না দেখে কৌতূহলের বশে হয়তো এদিক সেদিক মাকে খুঁজছিল। কোবরাটাও রিনাকে বাইরে বেরোতে দেখে ভেবেছিল ভেতরে গিয়ে দেখবে কোনও ছানাপোনা আছে কি না। থাকলে তারা কিছুই করতে পারবে না, সোজা ওর পেটে যাবে।”

“তারপর?” মুসুনের ডান চোখের কোলে জল।

“রিনার ততক্ষণে সব জানা হয়ে গেছে। সে ভাবল, যে গেছে সে তো আর ফিরবে না। বরঞ্চ বাঁচাতে হবে এখন যে ভবিষ্যতের রানি, তাকে।”

“ক্যাটরিনাকে?”

“ইউ আর কারেক্ট। চলো, এবার একটু ঘুমু ঘুমু করবে চলো।”

“বাকিটা?”

“বলছি।”

বিছানায় মুসুন পাশবালিশ নিয়ে মিষ্টিমাসির দিকে ফিরে শুল। “তুমি খুব ভালো গল্প বলো মিষ্টিমাসি।”

“থ্যাঙ্ক ইউ! তুমি কিন্তু বন্ধুদের সবাইকে এই গল্পটা বলবে। তাহলে আমিও তোমাকে শিগগিরই আরেকটা গল্প শোনাব।

“পরের দু’দিন খুব বাজে কাটল রিনার গ্যাং-এর সবার। ওরা সেদিন রাতে বারোওতে ফিরে এসে এই কাণ্ড দেখল। রিনা দু’দিন রাগে, দুঃখে কারোর সঙ্গেই কোনও কথা বলল না। গ্যাং-এর অনেকেই ওর কাছে এসে ওকে সরি বলে গেল, ক্ষমা চাইল সবাই মিলে একসঙ্গে দূরে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু ও কারোর কথাই শুনল না বা শুনলেও উত্তর দিল না।

“কয়েকদিনের মধ্যে ক্যাটরিনা আর রিনাকের চোখ ফুটল। একদিন সকালে যখন সবাই ব্রেকফাস্টের জন্যে বারোও থেকে বাইরে পা রাখবে, রিনা সবাইকে বলল সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়াতে। ক্যাটরিনাকে মুখে করে ও বেরিয়ে এল, পেছনে টিনার মুখে রিনাক।

“ক্যাটরিনা ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ গ্যাং-এর সবার ফিসফিসানিতে ওর ঘুম ভেঙে গেল। সেদিন বৃষ্টি নেই। নীল আকাশ, জোরালো হাওয়া অল্প মেঘগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অত আলোতে ওর চোখ কুঁচকে গেল। রিনা বলল, ‘আজ আমার দুটো জিনিস বলার আছে তোমাদের সবাইকে। এক, আমার পরে রানি হবে আমার মেয়ে ক্যাটরিনা।’ সবাই হৈ হৈ করে উঠল আনন্দে। এরপরেই রিনা বলল, ‘আরও একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।”

“সিদ্ধান্ত কী?”

“কোনও নতুন কিছু ঠিক করা।”

“আচ্ছা, কী ঠিক করল ক্যাটরিনার মা?”

“ওরা এই বারোও ছেড়ে পুবদিকের একটা ছোটো টিলাতে চলে যাবে। সেখানে একটা অনেক পুরনো বারোও আছে, রিনার দিদিমার আমলের। সবাই সেটা শুনে একটু চিন্তায় পড়ে গেল। হৈ হৈ করে উঠল সবাই। রিনা এটুকু বলেই আর দাঁড়াল না। হাঁটতে শুরু করল, ওর পিছু নিল প্রথমে ক্যাটরিনা। সেই তো ভবিষ্যতের রানি।”

“গল্প শেষ?”

“না না। এ তো ক্যাটরিনার প্রথম ডে-আউট। এরপর ও কত কিছু করবে। সেসব আরেকদিন।”

“ক্যাটরিনার ছবি?”

“এখন ঘুমিয়ে নাও লক্ষ্মীটি। আমার ল্যাপটপে রাখা আছে, বিকেলে দেখবে।”


___


অঙ্কনশিল্পীঃ স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়


No comments:

Post a Comment