জীবনের গল্পঃ রাজবন্দী - দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী



(১)


পুলিশ ট্রেনিং শেষ করে জেলায় আসার কয়েকদিনের মধ্যে আমার পোস্টিং হল ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার অধীন কুলিয়ার চর থানায়। মেঘনা নদীর তীরে খুবই মনোরম স্থান, মাছের জন্য বিখ্যাত। দেশ বিভাগের পূর্বে এখান থেকে ওয়াগনভর্তি মাছ রেলযোগে কলকাতায় চালান যেত। জানি না সে সমস্ত মাছ এখন কোথায় যায় বা আদৌ ধরা হয় কি না। যা হোক, আমি আদেশ অনুসারে একটি ট্রাঙ্ক ও বেডিং নিয়ে রেলযোগে একদিন সকালের দিকে কুলিয়ার চর থানায় পৌঁছলাম। অচেনা জায়গা, অজানা পরিবেশে চলতে পারব কি না বা আদৌ নিজেকে মানিয়ে নিতে পারব কি না ইত্যাদি ভাবনায় মনটা ছিল খুবই ভারাক্রান্ত। এসে দেখি থানার অফিসের বারান্দায় দুই ভদ্রলোক বসা। ভদ্রলোকই বলব, কারণ তাদের কোনো ইউনিফর্ম ছিল না। দু’জনেই যুবক, রঙ ফর্সা, বেশ স্বাস্থ্যবান, বয়স তেইশ-চব্বিশের বেশি হবে না। একজন অন্যজন থেকে একটু মোটা। দেখেই মনে মনে ঠিক করলাম থানা ঘরের বারান্দায় চেয়ারে যখন বসা তখন পুলিশ কর্মচারী হবেন সন্দেহ নেই।

আমার বিশ্বাস আরো দৃঢ় হল যখন তাঁদের একজন আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, “আসুন, আপনি নিশ্চয়ই এখানে বদলি হয়ে এলেন?”

আমি তাঁদেরকে ঊর্ধ্বতন কর্মচারী মনে করে সদ্য ট্রেনিংয়ের শিক্ষা অনুযায়ী বুট ঠুকে স্যালিউট করলাম। সঙ্গে সঙ্গে মোটা ভদ্রলোকটি হেসে বলে উঠলেন, “আরে না না, প্রথমেই তো ভুল করলেন। আমরা আপনাদের পুলিশ বিভাগের কেউ নই।”

আমি বিস্ময়ে বললাম, “তাহলে আপনারা...”

উনি আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, “আমরা রাজবন্দী। আজ কয়েকমাস যাবৎ এই থানায় আপনাদের সরকার অন্তরীণ করে রেখেছেন। ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্কে আরো জানতে পারবেন। এখন এই ধড়াচূড়া ছেড়ে বিশ্রাম করুন।”

এই রাজবন্দীদের সম্বন্ধে ওঁদের মুখ থেকে এবং অন্যান্য সূত্রে পরে অনেক কথাই জানতে পেরেছিলাম। এঁরা দু’জনেই চট্টগ্রাম শহরে থেকে কলেজে পড়াশুনা করছিলেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন সন্দেহে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তারপর বিভিন্ন জেলে আটক থাকেন। এখন এঁদের থানায় অন্তরীণ বাস আরম্ভ হয়েছে। তাই এঁদের সবাই ‘ডেটিনিউ’-বাবু বলত। এঁরা কিন্তু নিজেদের ইচ্ছে মতন চলাফেরা করতে পারতেন না। থানার আশেপাশেই একটা গণ্ডি নির্দেশ করা ছিল। বেশিরভাগ সময়ে এঁরা বই পড়ে কাটাতেন। তারপর যখন হাঁপিয়ে উঠতেন, থানার অফিসের সামনে সাধারণত বিকেলের দিকে দু-খানা চেয়ারে দু’জনে বসে থাকতেন। কোনো কোনো সময়ে আমাদের সঙ্গে গল্পগুজব করতেন। সবসময়ে হাসি যেন এঁদের মুখে লেগেই থাকত।

আজ বেশ কয়েকদিন হল এখানে এসেছি। তবুও থানার অন্যান্য কর্মচারীদের সঙ্গে কিন্তু নিজেকে কিছুতেই যেন মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। বিশেষ করে যে-সমস্ত গ্রামবাসী থানায় কোনো সংবাদ জানাতে আসত তাদের সঙ্গে এদের ব্যবহার সময় সময় আমার নিকট খুবই আপত্তিজনক বলে মনে হত। কিন্তু কিছু বলার উপায় ছিল না। কারণ, এঁরা সকলেই আমার সিনিয়র। একদিন আমার একজন সিনিয়র সহকর্মী একজন লোকের সঙ্গে এরূপ দুর্ব্যবহার করতে আরম্ভ করলেন যে আমি তা সহ্য করতে না পেরে বাইরে এসে মোটা মতন রাজবন্দী ভদ্রলোকের পাশে এসে বসে পড়লাম। উনি আমার দিকে তাকিয়ে থেকে একটু হেসে বললেন, “মিঃ ব্যানার্জ্জী, আপনি নতুন, মানিয়ে নিতে পারছেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখবেন। সত্যি কথা বলতে কী প্রথম প্রথম এসব শুনে আমাদেরও খুব খারাপ লাগত, কিন্তু এখন আর সেরূপ মনে হয় না। তাছাড়া এর আরেকটা দিক আছে। যে-সমস্ত লোক থানায় সংবাদ লেখাতে আসে তাদের বেশিরভাগই গ্রামীণ শত্রুতা সাধনের জন্য কারোর বিরুদ্ধে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত সংবাদ লেখাবার চেষ্টা করে। তাই একটু ভীতি সঞ্চার বা পরীক্ষানিরীক্ষা করে না নিলে থানা রেকর্ডে মিথ্যার বোঝা যে বেড়ে যায়। একথা তো জানেন যে নেহাত কোনো বিপদে না পড়লে কোনো ভদ্রলোক থানার শরণাপন্ন হন না। সেরূপ লোককেও আপনাদের পুলিশের লোকের চিনে নিতে অসুবিধা হয় না। সে যা হোক, আপনার দেশ কোথায়?”

উত্তরে আমি বললাম, “ঢাকা জেলা।”

শুনে হাতদুটি নমস্কারের ভঙ্গিতে রেখে বললেন, “ঢাকার যুবক তো সবই রেভোলিউশনারিস। পুলিশে আপনাকে নিলে?”

আমি চুপ করে রইলাম। তারপর যে কয়েকমাস এই থানায় ছিলাম এঁদের উভয়ের সাহচর্যে আমার মানসিক চাঞ্চল্য অনেক পরিমাণে শান্ত হয়েছিল। আজ তাঁরা কোথায় আছেন বা আদৌ বেঁচে আছেন কি না জানি না, কিন্তু তাঁদের মধুর সঙ্গ একদিন যে আমাকে আনন্দ দান করেছিল তা কিছুতেই মন থেকে মুছে যাবার নয়। আমি তখন শিক্ষানবীশ, হাতেকলমে কাজ শিখতে হবে। তাই অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাইরের কাজ করতে যেতে হত। প্রত্যেক থানাতেই এমন কতকগুলি গ্রাম আছে যেখানে কুখ্যাত অর্থাৎ দাগীদের ও সন্দিগ্ধ চরিত্রের লোকেদের বাস। সে গ্রামে বা পাশের গ্রামগুলিতে বিত্তশালী লোকও থাকেন। কাজেই এই সমস্ত গ্রামে ধনসম্পত্তি রক্ষার জন্য প্রায়ই ছোটো একটি পুলিশের দলকে রাত্রে পাঠানো হত এইসব সন্দিগ্ধ চরিত্রের লোকদের গতিবিধি লক্ষ করার জন্য। দিনের কাজের চেয়ে রাত্রের এই কাজগুলি কিন্তু সত্যিই কষ্টদায়ক ও একঘেয়ে। তাই সুবিধা পেলেই বা কোনো তত্ত্বাবধায়ক না থাকলে এই দলগুলি প্রকৃতভাবে কাজ করত কি না সন্দেহ থেকে যেত। তাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী মাঝে মাঝে কোনো না কোনো দলের সঙ্গে আমাকে যেতে বলতেন। একে পুলিশের ভাষায় ‘নাইট রাউন্ড’ বলা হয়। এই কাজ পুলিশের একটা প্রধান কর্তব্য হলেও সঠিকভাবে করায় অনেক অন্তরায় ছিল এবং বিপজ্জনকও বটে।

বৈশাখের এক অন্ধকার রাত্রে আমাদের রাউন্ড শেষ করে রাত্রি প্রায় চারটায় থানার দিকে রওনা হতে হয়, কারণ পরদিন আবার কোর্টে কাজ আছে। ফেরার পথে আমাদের প্রায় তিন মাইল প্রস্থ একটি নির্জন প্রান্তর অতিক্রম করতে হবে। মঝে মাঝে ঝোপঝাড়, খাল ও জল নিকাশের নালা। খাল ও নালার ওপর একটি করে বাঁশ দিয়ে অভিনব সাঁকো তৈরি। দিনের বেলায় পথচারীগণ কোনোমতে ব্যালেন্সের খেলায় উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু এই রাত্রে ভেবে দেখুন ব্যালেন্সের পরীক্ষায় পাশ না হলে পরিণতি কোথায়। দফাদারের হাতে একটিমাত্র লন্ঠন। তার ক্ষীণ আলোতে এই সূচিভেদ্য অন্ধকারের ভিতর আমরা আমাদের চোখের তীব্র শক্তি সহযোগে কোনোমতে পথ দেখে চলছিলাম। এভাবে চললে হয়তো ভোরের দিকে থানায় পৌঁছানো যেত। কিন্তু ভগবানের ইচ্ছা ছিল অন্যরূপ। এই বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝখানে আসতেই সমস্ত আকাশ মেঘে ছেয়ে গেল। তারপর আরম্ভ হল ঘন ঘন বজ্রপাত। শীঘ্রই বৃষ্টিপাত আরম্ভ হবে বুঝে আমাদের গতি বাড়াতে হল। তাও সম্ভব হল না কারণ আশেপাশেই বাজ পড়ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ভীষণভাবে বর্ষণ আরম্ভ হল। পরিস্থিতি আরো খারাপ হল যখন নিকটে কোথাও বাজ পড়ায় দফাদার গফুরের হাত হতে বাতিটি পড়ে গিয়ে নিভে গেল। তখনকার আমাদের মানসিক অবস্থা বুঝে নিন। সেই ভীষণ অন্ধকারে আমরা দিশেহারা হয়ে ছুটছি, কিন্তু ঝড়ের বেগ এত বেড়ে গেল যে আমাদের পক্ষে চলা আর সম্ভব হল না। ভীষণ এই রুদ্র প্রকৃতির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে বর্ষাতি দিয়ে সমস্ত শরীর আবৃত করে মাঠের মধ্যে শুয়ে পড়লাম।

ভোরের দিকে ঝড়ের দাপট কমে গেল এবং ধীরে ধীরে প্রকৃতি শান্তমূর্তি ধারণ করল। কে বলবে যে কিছুক্ষণ পূর্বেই প্রকৃতি রুদ্রদেবের হাত ধরে তাণ্ডব নৃত্যে নেমেছিলেন। রাস্তায় দেখলাম বড়ো বড়ো গাছ যেন কোনো দানব সমূলে উৎপাটিত করে দিয়েছে। কত যে মোটা ডাল ভেঙেছে তার হিসাব নেই। খালের উপর বাঁশের সাঁকোর কোনো চিহ্ন নেই। তাই সিক্ত পোশাকে বেলা প্রায় দশটায় থানায় এসে পৌঁছলাম। সেদিন হতে আমি আমার সহকর্মীদের কাছে অপ্রিয় হয়ে উঠলাম। কারণ তারা আমাকে এধরনের কাজ সম্পাদন করার অনেক সহজ উপায় বলে দিয়েছিল কিন্তু তাদের এই পন্থা আমি নিতে পারিনি। এখন থেকে আমি লক্ষ করেছি অনেকেই যেন আমাকে এড়িয়ে চলতে চায়। মাস চারেকের বেশি আমাকে এখানে থাকতে হয়নি। আমার জেলা সদরে বদলি হয়ে গেল। আমি ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চে যোগদান করলাম। তখন ইংরেজি ১৯৩৭ সালের মে মাস হবে।


(২)


ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের কাজ আমার মনের মতন না হলেও মোটামুটি ভালোই লাগত কারণ কার্য উপলক্ষ্যে এখানে যাঁদের সঙ্গে মেলামেশা করতে হত তাঁরা সবাই বুদ্ধিমান এবং ভদ্র বংশ সম্ভূত। মেলামেশা করে ক্রমে বুঝতে পেরেছিলাম যে এদের বেশিরভাগই যেন ছাইচাপা আগুন। ভদ্র, বিনয়ী কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আর এটা লক্ষ করতাম যখন এঁরা ঊর্ধ্বতন কর্মচারীরদের সঙ্গে কথা বলতেন। তখন কিন্তু জানতে বা বুঝতে পারিনি রাজনীতির কোন অগ্নিমন্ত্রে এঁরা দীক্ষিত ছিলেন। এঁরা যে সবই একদলের ছিলেন তা নয়। কেহ যুগান্তর বা অনুশীলন পার্টির বা অন্য কোনো পার্টির। কিন্তু লক্ষ্য ছিল সবারই এক—দেশকে ভালোবাসা, দেশকে বিদেশি শাসকদের হাত থেকে মুক্ত করা। কিন্তু উপায় ছিল হিংসাত্মক। এঁদের মধ্যে যাঁরা তরুণ অর্থাৎ ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে পড়তে পড়তে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগই জেলের মধ্যে পড়াশুনা করে এম.এ পাশ পর্যন্ত করেছিলেন।

আমি যখন এই ব্রাঞ্চে কাজ করছিলাম তখন এরূপ আন্দোলনের বেগ অনেক কমে এসেছে। কিছু সংখ্যক রাজবন্দীদের তখন জেল থেকে খালাস দিয়ে গৃহ-অন্তরীণ করা হচ্ছিল। কোনো এক সময়ে এরূপ একটি রাজবন্দী যুবককে নৈহাটি স্টেশন থেকে সঙ্গে করে নিয়ে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কাজ আমাকে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের কলকাতার প্রধান কার্যালয় থেকে আমারই মতন একজন কর্মচারী কলকাতা হতে নৈহাটি স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। এঁদের পথে যা কিছু সুখ-সুবিধা আমাদের ওপর থাকত।

ময়মনসিংহ থেকে বিকালে ট্রেনে চেপে পরদিন আটটার সময় নৈহাটি স্টেশনে পৌঁছালাম। আমাদেরও সবারই সাদা পোশাক। নৈহাটির মতন বড়ো জংশন স্টেশন থেকে এঁদের চিনে নিতে পারব কি না খুবই সন্দেহ হতে লাগল। যা হোক, ট্রেন থেকে নেমে ইন্টার-ক্লাশ ওয়েটিং রুমে এসে দেখি বড়ো বড়ো দুটি লেদার সুটকেসের কাছে একটি চেয়ারে এক ভদ্রলোক বসা। চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। পাশে আরো কয়েকজন লোক একটি লম্বা বেঞ্চে বসা।

আমি ঢুকে তাঁদের দিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাতেই একজন লম্বা ধরনের ফর্সা লোক আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে ইঙ্গিতে বাইরে ডেকে নিয়ে বললেন, “কিছু মনে করবেন না। আপনি কি ময়মনসিংহ থেকে এসেছেন?”

আমি বললাম, “আপনি কি আই.বি-র লোক?”

দুইজনের পরিচয় হয়ে গেলে উনি আমাকে সেই মোটা ফ্রেমের চশমা পরা ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, “উনিই মিঃ চক্রবর্ত্তী। আপনি এঁকে নিয়েই আপনাদের জেলা অফিস হয়ে এঁকে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেবেন।”

এই বলে আমার সহকর্মী আমাকে কাগজপত্র দিয়ে পরের ট্রেনে কলকাতা চলে গেলেন।

আমি মিঃ চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে আলাপ করে পরের গাড়িতে সিরাজগঞ্জ হয়ে ময়মনসিংহ রওনা হলাম। আমি প্রথমে মনে করলাম যে আমাদের মধ্যে যে সম্পর্ক তাতে মিঃ চক্রবর্ত্তী হয়তো বিশেষ কথাই বলবেন না আমার সঙ্গে। কিন্তু ট্রেন চলার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের দু’জনের খুব ভাব হয়ে গেল। কে মনে করবে আমরা দু’জন বন্ধু নই? আমার আশঙ্কা ছিল যে মিঃ চক্রবর্ত্তী হয়তো আমাকে আমার কাজ সম্বন্ধে জানতে চাইবেন। কিন্তু এতটা দীর্ঘ পথ আমরা এলাম উনি সে সম্বন্ধে আমাকে কোনো কথা জিজ্ঞাসা করেন নাই। আমিই বরং তাঁকে প্রশ্ন করলাম, “মিঃ চক্রবর্ত্তী, আপনার ওই বিশাল সুটকেসে কি আপনার জামাকাপড়?”

উত্তরে বললেন, “সামান্য কিছু জামাকাপড় আছে বটে, কিন্তু বেশিরভাগই বই।”

এই বলে একটি সুটকেস খুলে আমাকে একখানা বই পড়তে দিলেন। কী বই তা আজ আমার মনে নেই। নিজেও সারা রাস্তা বই পড়ে কাটালেন। একসময়ে নিজেই বললেন, “মিঃ ব্যানার্জ্জী, জানেন কতদিন পর বাড়ি যাচ্ছি?”

আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “বিভিন্ন জেল ও শেষে দমদম ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে আজ পাঁচ বছর পরে বাড়ি যাচ্ছি। আমার একমাত্র আপন ছোটো বোন ও বৃদ্ধ মা-বাবা যে কত আনন্দিত হবেন তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আপনিও উপলক্ষ্য হওয়ার দরুন আমার এই সুদীর্ঘ আবদ্ধ প্রবাস জীবনের পর মিলনের আনন্দ থেকে বাদ যাবেন না।”

সুরমা মেল তীব্র গতিতে চলছে। আমি কী বলব বুঝতে না পেরে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম, কিন্তু বাস্তব কিছুই দেখছিলাম না। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল দু-খানা ছবি। একখানা মিঃ চক্রবর্ত্তীর পরিজনের সঙ্গে আসন্ন মিলনোৎসব। আর একখানা আমার ব্যক্তিগত জীবনের। আমারও ছোটো ছোটো ভাইবোন আছে। শৈশবে পিতৃবিয়োগের পর আমার মা কত আর্থিক কষ্ট সহ্য করে আমাকে মানুষ করতে না পারলেও এতটা বড়ো করেছেন। কিন্তু আমার প্রবাস জীবন ব্যক্তিগত আর্থিক সমাধানের চেষ্টার কারণে। আমিও গৃহে ফিরলে মা ও ভাইবোনের মনে আনন্দের সৃষ্টি হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দুইয়ের ভেতর থেকে যাচ্ছে পর্বতপ্রমাণ ব্যবধান। আমাদের দু’জনের আদর্শ সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন দেশকে ভালোবেসে বরণ করে নিয়েছেন সুদীর্ঘ কারা-জীবন। আর আমি হয়তো নিঃসন্দেহে নিজেকে, মাকে, ভাইবোনকে ভালোবেসে নিয়েছি এই জীবন। আমার এইধরনের কাজের ভিতর মিঃ চক্রবর্ত্তীর মতন আরো অনেকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের সুযোগ হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগের মধ্যে আমি দেখেছি এঁদের মহৎ আদর্শ। এঁদের সম্বন্ধে অন্তরে শ্রদ্ধা থাকলেও তার বহিঃপ্রকাশ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

সে যা হোক, পথে আর কোনো বিশেষ আলাপ হয়নি। ট্রেন আমাদের ময়মনসিংহ স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে তার গন্তব্যস্থানে চলে গেল। আমরাও একটি ঘোড়ার গাড়ি করে অফিসে এসে কিছু কাজ সেরে মিঃ চক্রবর্ত্তীর বাড়ি পৌঁছে গেলাম। ওঁর বাবা প্রায় সত্তর বছরের বৃদ্ধ। আমরা গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই উনি এগিয়ে এলেন এবং ছেলেকে কুশল জিজ্ঞাসা করে আমার দিকে তাকালেন। তখন মিঃ চক্রবর্ত্তী আমাকে তাঁর বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাকে তিনি বিনয়ের সহিত একটি ঘরে বসালেন। ততক্ষণে ওঁর মা-বোন সব এসে গেছেন। আমি খুব বিব্রত বোধ করছিলাম। ওঁর এই দীর্ঘ কারাজীবনের জন্য যেন আমিই দায়ী। মিঃ চক্রবর্ত্তীর মা ও বাবা কিন্তু তাঁদের ছেলের সঙ্গে সামান্য আলাপ করেই আমার কাছে এসে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। আমি তাঁদের কথাবার্তায় এবং মধুর ব্যবহারে অভিভূত হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে আমি তাঁদের নিকট বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম।


(৩)


ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার মধুপুর থানায় দিলীপ সরকার নামে এক রাজবন্দী অন্তরীণ ছিলেন। ময়মনসিংহ সদর থেকে একদিন আমিই তাঁকে সেখানে রেখে এসেছিলাম। রাজশাহী জেলার নাটোরের কোনো গ্রামে তাঁর বাড়ি। ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে পড়ছিলেন। প্রথম বৎসরেই রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন ও গ্রেপ্তার হন। বিভিন্ন জেলে থাকাকালিন এম.এ পাশ করেন। একদিন আমার ওপর আদেশ হল সদর হাসপাতালে একজন ভীষণ অসুস্থ রাজবন্দীর দেখাশোনা করার। আমি সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে এসে দেখি, দিলীপ সরকার। জ্বরের প্রকোপ খুব বেশি, মাঝে মাঝে ভুল বকছেন। ডাক্তার ও নার্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে যাতে কোনোরূপ সেবাযত্নের ত্রুটি না হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থা দৈনিক আমাকে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মচারীর নিকট জানাতে হত। শুধু দিলীপ সরকারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া আমার তাঁর সম্বন্ধে কিছু করার ছিল না। বিশেষ গুরুতর অপরাধে কত রাজদ্রোহীই তো মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু সে তো তাঁরা তাঁদের ধর্মরূপ মনে করতেন। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুর হস্তে একটি অমূল্য জীবন অকালে ঝরে পড়বে আমি ভিন্ন পন্থাবলম্বী গোষ্ঠীর একজন হয়েও কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। সবসময় অস্থির চিত্তে তাঁর বেডের বারান্দায় ঘুরে বেড়াতাম।

হাসপাতালের নার্স, ডাক্তার তাঁদের কর্তব্যের মধ্যে একটু বিশেষ সচেতন হতে পারেন, কিন্তু নিকট আত্মীয়ের সান্নিধ্যের শান্তি আপন পরিজন ছাড়া তো কেউ দিতে পারবে না। অবশ্য সরকারি তার যোগে দিলীপ সরকারের বাড়িতে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। আর কেই বা আসবে? শুনেছিলাম তাঁর এক বড়ো ভাই আছেন। একদিন হাসপাতালে বিকেলের দিকে গিয়ে দেখি একজন বড়ো ডাক্তার এসে পরীক্ষা করছেন। আর উপস্থিত সমস্ত ডাক্তার ও নার্সগণ অত্যন্ত ব্যস্তসমস্ত। আমি পৌঁছতেই একজন ডাক্তার আমাকে একপাশে নিয়ে বললেন যে একটি বিশেষ ইঞ্জেকশনের দরকার যা হাসপাতালে নেই। আমি সাইকেলে স্বদেশি বাজারে পপুলার ফার্মাসি থেকে ওষুধ নিয়ে এলাম। সে রাত্রে যমে মানুষে টানাটানি চলল। তারপর আস্তে আস্তে মিঃ সরকার আরোগ্যলাভ করতে লাগলেন।

তাঁর ভাই এসেছিলেন। দিন কয়েক থেকে চলে গেলেন। কীই বা করবেন! আর্থিক অবস্থার কথাও চিন্তা করতে হবে। একটা কথা ভেবে আমি খুব আশ্চর্য হতাম। এই সমস্ত রাজবন্দীদের সুখ-সুবিধার জন্য সরকারের কোনো সময়ে কোনো ত্রুটি হবার জো ছিল না। হাসপাতালে যেতে একটুও দেরি হবার উপায় ছিল না। অমনি মিঃ সরকার জিজ্ঞাসা করতেন, “দেরি হল কেন? আজ কি অন্য কোথাও গিয়েছিলেন?”

একদিন আমি বললাম, “এখন তো আপনি ভালো হয়ে গেছেন। আমি এখন থেকে খুব কম আসব, তারপর আর আসব না।”

কিন্তু পরেই নিজের ভুল বুঝলাম। একথা বলা উচিত হয়নি, কারণ দেখলাম মিঃ সরকার দুটি চোখেই কীরকম অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছেন।

কয়েকদিন পর শুনেছিলাম মিঃ সরকারকে বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আমাদেরই একজন সহকর্মী তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। যাবার সময়ে রেল স্টেশনে মিঃ সরকার আমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কিন্তু আমি বাইরে থাকায় তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়নি। একটা কথা আমার আজও মনে হয়। এই দুই ভিন্ন ভাবধারার লোকের সঙ্গে তখনকার দিনে কী করে অজ্ঞাতে এরূপ মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠত! জানি না আজও এরূপ হয় কি না। 

---


অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক


No comments:

Post a Comment