লোককাহিনিঃ কুম্ভীরাশ্রু - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

 আফ্রিকার লোককাহিনি ৩


কুম্ভীরাশ্রু

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়



গভীর এক জঙ্গলে ছিল এক অতি মনোরম জলাশয়। একটা সময় ছিল, যখন সেই জলাশয়ে জল ধরে রাখা যেত না। বৃষ্টির জল জলাশয় উপচে জঙ্গল-টঙ্গল সব ভাসিয়ে নিয়ে যেত। জলাশয়ের জলে খেলে বেড়াত অনেক রকমের রঙিন মাছ, কচ্ছপ, ব্যাঙ; আর ছিল মস্ত মস্ত সব কুমির। মাছরাঙা পাখি জঙ্গল থেকে উড়ে এসে টুক করে তার লম্বা ঠোঁট দিয়ে জলের উপর সাঁতরাতে থাকা মাছ তুলে নিয়ে গিয়ে গাছের ডালে বসে আয়েশ করে খেত। জঙ্গলের পশুরা জলাশয়ে আসত তৃষ্ণা মেটাতে, গা ভেজাতে। গরম যখন অসহ্য হয়ে উঠত, তখন জঙ্গলের যত সিংহ, হাতি, মোষের দলও জলাশয়ে গা ডুবিয়ে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

জলে আর জঙ্গলে পশুদের সেই সুখকর জীবনে ছেদ পড়ে গেল যেদিন একদল মানুষ হঠাৎ কোথা থেকে এসে জঙ্গল কেটে বসবাস শুরু করে দিল। বাঁশ আর পাতা দিয়ে তারা বানাল সার সার ঘর। ধারালো কাটারি দিয়ে একের পর এক গাছের গায়ে কোপ বসিয়ে শয়ে শয়ে গাছ ধরাশায়ী করে দিল মানুষের দল। তাই দেখে করুণ সুরে কাঁদতে থাকল নানা জাতের পাখি আর বাঁদর আর বেবুনেরা। গাছগুলো তাদের রাতের আশ্রয় দিত, ফল যোগাত। লোকগুলোর অস্ত্র ছিল ধারালো বর্শা আর তির-ধনুক। তাই দিয়ে তারা জঙ্গলের পাখি, মোষ, আরও অনেক প্রাণী মেরে রাতের বেলায় আগুন জ্বালিয়ে মাংস পুড়িয়ে খেত। তারপর একদিন তারা তাদের বাসস্থানগুলো বাঁশ আর লতাপাতা দিয়ে বেড়া বেঁধে ঘিরে দিল।

লোকালয়ের বাসিন্দারা জলাশয়ের জল যথেচ্ছ ব্যবহার করতে থাকায় জলাশয়ের জল গেল কমে। জলের প্রাণীদের সেখানে জীবনধারণ করা কষ্টকর হয়ে উঠল। জলাশয়ের জল খেতে আর স্নান করতে আসা জঙ্গলের প্রাণীরা মানুষের হাতে মারা যেতে লাগল ঝাঁকে ঝাঁকে। বিহিত চাইতে জঙ্গলের প্রাণীরা একদিন দল বেঁধে গেল জঙ্গলের রাজা পশুরাজ সিংহের দরবারে। গায়ের জোরে সিংহ ছিল জঙ্গলের সবচাইতে সক্ষম প্রাণী, তাই একজোটে সবাই তাকে রাজা বলে মেনে নিয়েছিল।

পশুরাজ সব শুনে বলল, “আমার বাপ-ঠাকুরদার কাছেও কোনোদিন শুনিনি এমন আজব প্রাণীর কথা। তবে খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা কোরো না আমার কাছে। প্রাণের ভয় আমারও আছে। ব্যাটারা সব দল বেঁধে থাকে। ওদের অস্ত্রশস্ত্র সব রোদের আলোয় ঝলসে ওঠে। ওদের কাছে আছে হিংস্র একপাল কুকুর। তাদের দাঁত প্রচণ্ড ধারালো। আমার চাইতেও জোরে দৌড়ায় তারা। তাই যতদূর সম্ভব লোকগুলোকে সবাই এড়িয়ে চলো।”

পশুরাজের কথায় হতাশ হল সবাই। তারা জানত, জঙ্গলে উড়ে এসে জুড়ে বসা লোকগুলো আর যাই হোক, সিংহ মেরে খাওয়ার কথা খুব সম্ভব ভাবে না। তাদের যত নজর সব নিরীহ প্রাণীদের দিকে, যাদের শিকার করা অনেক সহজ। মনমরা হয়ে সিংহের আস্তানা থেকে বেরিয়ে পড়ল পশুরা।

মানুষগুলো কিন্তু এমনি এমনি জঙ্গলের এলাকায় আস্তানা গাড়েনি। জল ছাড়া মানুষেরও চলে না এক মুহূর্ত। জলাশয়ে তারা স্নান করত, সাঁতার কাটত, তারপর বড়ো বড়ো পাত্রে জল ভরে ঘরে নিয়ে যেত। জঙ্গলের পশুদের তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি ছিল না। তারা জানত, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে গেলে সব প্রাণীদের প্রয়োজন জল। কিন্তু হঠাৎ একদিন বাঁদরেরা খবর পাঠিয়ে দিল চতুর্দিকে—মানুষ নাকি জঙ্গলের ঝোপঝাড়, আগাছা পরিষ্কার করতে শুরু করছে। কাঠবিড়ালি আর খরগোশেরা কান খাড়া করে, ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে সব দেখে-টেখে এসে সব প্রাণীদের ডেকে ডেকে বলতে লাগল মানুষের বিচিত্র সব কাণ্ডকারখানার কথা। মাটি খুঁড়ে মানুষ লাগাল বাজরার বীজ। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এল না সেবার। মানুষের লাগানো বীজ থেকে সবুজ যে চারাগাছগুলো উঁকি দিচ্ছিল, সূর্যের প্রখর তাপে সব শুকিয়ে যেতে লাগল। কাকেরা খবর আনল, মানুষেরা নাকি সব চারাগাছ শুকিয়ে যাওয়ার দুঃখে মনখারাপ করে গালে হাত দিয়ে বসে আছে, আর আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্য দেবতাকে অভিশাপ দিচ্ছে। মানুষের দুঃখে পশুরাজ সিংহ পর্যন্ত মনখারাপ করে দূরে পায়চারি করতে করতে মনে মনে চাইল বৃষ্টি নামুক। কিন্তু বৃষ্টির দেবতা সে বছর কার উপরে রাগ করে যেন একেবারেই মুখ ফেরালেন। চাষের জমিতে জলাশয় থেকে পাত্র ভরে ভরে জল এনে ঢালতে লাগল মানুষ। কিন্তু অত বড়ো ক্ষেতে কি আর জল ঢেলে ঢেলে মাটি নরম করা সোজা কাজ?

জলাশয়ের প্রাণীরা একদিন দেখল জলাশয়ের ধারে অনেক মানুষ ভিড় করেছে। প্রথমে তারা ভেবেছিল মানুষ বুঝি অন্যদিনের মতো স্নান করতে বা জল ভরতে জড়ো হয়েছে। কিন্তু তাদের ভুল ভাঙল যখন মানুষ কোদাল দিয়ে খাল কাটতে শুরু করল। দিনের পর দিন প্রখর সূর্যের তাপে গলদঘর্ম হয়েও মানুষের দল মাটি কেটেই চলল। জলাশয় থেকে লম্বা খাল চলে গেল চাষের জমি পর্যন্ত। ওদের কাজ থামাবার জন্য পশুরাজ দূর থেকে তর্জন গর্জন করলেও সামনে এসে দাঁড়াবার সাহস করল না। খাল কাটতে থাকা মানুষদের পাহারা দেবার জন্য বল্লম আর তির-ধনুক নিয়ে যারা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের অনেকের জীবন গেল বিষধর সাপের কামড়ে। মানুষ তবুও দমল না। একদিন তারা খাল কাটা শেষ করল। খাল দিয়ে জলাশয়ের জল চলে যেতে লাগল চাষের ক্ষেতে। মানুষদের গ্রামে আনন্দ উৎসবের ঢেউ উঠল। জল-জঙ্গল পেরিয়ে সেই উৎসবের গানবাজনা বহুদূরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। পশুরাজ ভীষণ গর্জন করে উঠে বলল, “নাহ্‌, এই জঙ্গলটা আর সিংহের থাকবার উপযুক্ত রইল না। কিছু একটা বিহিত না করলেই চলছে না দেখছি।”

খাল কাটার ফলে জলাশয়ের জলের ভাঁড়ারে আরও টান পড়ল। জলের প্রাণীরা পড়ল মহা চিন্তায়। জলের রাজত্ব ছিল কুমিরের হাতে। ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ মারা যেতে তারও খাবারে কমে আসছিল। ব্যাঙেদের পরিবারে অনেক সদস্য মারা যেতে সাপের পেটেও টান পড়ল। সবাই বুঝতে পারল এইভাবে জলাশয়ের জল শেষ হয়ে গেলে একদিন জলের সব প্রাণী মারা যাবে। কুমিরের সভাপতিত্বে জলাশয়ে এক মহাসভা ডাকা হল।

কুমিরের মাথায় বেজায় বুদ্ধি। সে সবার কথা শুনে সুচিন্তিত মতামত দিল, “আমাদের বাসস্থান বদলে ফেলতে হবে। মানুষের অস্ত্রের সামনে আমরা অসহায়। কিন্তু কাজটা খুব সহজ হবে না। কাকেরা আমার পিঠে বসে পোকা খুঁটে খায়। তারা আমাকে খবর দিয়েছে, এখান থেকে সামান্য দূরে আছে একটা বিশাল নদী। কোনোমতে যদি একবার সেখানে আমরা চলে যেতে পারি, তবে সবার প্রাণ বেঁচে যেতে পারে। এক আমি আর ব্যাঙেরা ডাঙায় চলেফিরে বেড়াতে পারি, তাও কিছুক্ষণের জন্য। ডাঙায় বেশিক্ষণ থাকলে আমাদের দম বন্ধ হয়ে যাবে। রাতের বেলায় কাজটা সেরে ফেলতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। সমস্যা হচ্ছে, যাবার রাস্তায় পড়ে ওই বদমাইশ মানুষদের গ্রাম। একবার যদি আমাদের দেখে ফেলে, তবে আর আস্ত রাখবে না একজনকেও।”

কুমিরের কথা শুনে ব্যাঙেদের সর্দার কোলা ব্যাঙ বলে উঠল, “কিন্তু কুমিরভায়া, মাছেদের কী হবে? তারা তো আর ডাঙায় চলতে পারবে না।”

কুমির মুখ ঘুরিয়ে হাসি লুকিয়ে বলল, “মাছেদের সমস্যাটা আলাদা। এর সমাধান বাপু আমার হাতে নেই। মাছেরা এই জলাশয়ে থেকে গেলে এমনিও মরবে, অমনিও মরবে। তাছাড়া যেদিন থেকে খাল কাটা হয়েছে, সেদিন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ খাল দিয়েই বয়ে চলে গেছে। আগে নিজেদের প্রাণ বাঁচাই, তারপর অন্যের কথা ভাবা যাবে।”

আসলে কুমির ছিল ভীষণ চালাক। জলাশয়ে মাছ কমে যাওয়ায় তার খাবার গিয়েছিল কমে। নতুন জলাশয় খুঁজে না নিলে সে বাঁচত না। আর নদীতে একবার পৌঁছতে পারলে তার খাবারের কোনও অভাব হবে না, সেটা তার জানা ছিল। নদীতে যত খুশি খাল কাটুক মানুষ, জল কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বড়োই কম, ধূর্ত কুমিরের সেকথা অজানা ছিল না।

সভা শেষ হতে কুমির বাঁদরকে ডেকে পাঠাল। বাঁদরের সঙ্গে অম্লমধুর সম্পর্ক ছিল কুমিরের। রোজ দুপুরের খাবার শেষ করে দু’জনে রঙ্গরসিকতা করে সময় কাটায়। বাঁদর গাছের ডালে দোল খেতে খেতে এক লাফে কুমিরের মস্ত পিঠে চড়ে বসে বলল, “বলো খুড়ো, এই অসময়ে ডাক পাঠালে যে বড়ো?”

কুমির বলল, “এখনই জঙ্গলের পশুরাজ সিংহের কাছে যাও। তার সঙ্গে তো শুনি তোমার কিছুটা ভাব-ভালবাসা আছে। গিয়ে বকো, আমি তার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসতে চাই। এই জলাশয় ছেড়ে আমরা সব জলের প্রাণী চলে যাব বড়ো নদীতে। কিন্তু জঙ্গলের প্রাণীদের হাতে না রাখলে তারা আমাদের নিরাপদে যাওয়ার রাস্তা করে দেবে না। তাই ওদের সাহায্য আমাদের বিশেষ প্রয়োজন।”

বাঁদরদের ভারি মজা। তারা জলে কুমির আর ডাঙায় সিংহের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক রেখে চলতে পারে। দুই হাতে যেমন তারা গাছের ডালে ঝুলতে পারে, তেমনি এক লাফে জমি থেকে মাটিতে, কুমিরের পিঠ থেকে গাছেーসবটাই খুব তাড়াতাড়ি করে ফেলতে পারে। তাই বাঁদর চলল কুমিরের সন্দেশ নিয়ে সিংহের কাছে। সিংহ সব শুনে বলল, “একটাই শর্তে আমরা জলের প্রাণীদের সাহায্য করতে পারি, যদি তারা আমাদের ভরসা দেয় যে জল খেতে গেলে কুমির আর কারও পা টেনে জলের নিচে ডুবিয়ে মারবে না, খেয়েও ফেলবে না।”

বাঁদর বুঝল, তার কথায় সিংহের মন ভিজেছে। সে তাই দুই কান নেড়ে বলল, “তোমার যা বলার আছে, তা বাপু ওই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বলে দিও নাহয়। আমি আর দুই রাজার মধ্যে পড়ি কেন? সন্ধেবেলা তাহলে সবাইকে নিয়ে সভায় চলে এসো।”

সন্ধেবেলা সুয্যি ডুবে যেতেই যেই না জলাশয়ের জল কালো হয়ে উঠল, অমনি সিংহের নেতৃত্বে হাতি, খরগোশ, জিরাফ, হরিণ সব এসে জড়ো হল জলের ধারে। কুমির আগে থেকেই জলের ধারে ডাঙায় উদগ্রীব হয়ে শুয়ে ছিল। হাতির দলকে সিংহের সঙ্গে আসতে দেখে ভয়ে তার কলজে কেঁপে উঠল। এই হাতিগুলো বড়ো সাংঘাতিক। একবার কুমিরদের বাগে পেলে শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে আছড়ে মাটিতে ফেলে, পা দিয়ে পিষে মেরে ফেলে। সে বড়ো ভয়ানক মৃত্যু। কিন্তু হাতি এমনি এমনি শিকার করে না, কারণ মাংসে তার রুচি নেই। যদি কুমির হাতির বাচ্চাদের আক্রমণ করে, তবেই তারা এমন আচরণ করে থাকে। তবে জঙ্গলের প্রাণীদের মতিগতি মাঝে-মাঝেই বোঝা দায় হয়ে ওঠে জলের প্রাণীদের।

সিংহকে জলাশয়ের ধারে আসতে দেখে শশব্যস্তে কুমির তার বিরাট চোয়াল ফাঁক করে, ধারালো দাঁতের পাটি দেখিয়ে পশুরাজকে অভিবাদন জানায়। “রাজামশাইয়ের জয় হোক। সবাইকে নিয়ে সভায় আসার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আগে কিছু মুখে দিন। ওই যে বড়ো ঢিপিটার উপর অনেক মাছ মেরে রেখেছি। সুস্বাদু সব মাছ, আপনাদের পছন্দ হবে। আর হাতি মশাইদের জন্য ওই কলাগাছ উপড়ে রেখেছি। খাওয়াদাওয়া না হলে কি আর সভা জমে?”

কুমিরের কুটিল চরিত্রের কথা সিংহের ভালোই জানা আছে। তবে কিনা পরোপকারের ভূত মাঝে মাঝে তাকেও চেপে ধরে। তাই জলদগম্ভীর স্বরে সে বলল, “খাওয়াদাওয়ার কথা থাক। বরং কাজের কথা হোক। হ্যাঁ, রাতে তাহলে তোমরা সবাই রওনা হও নদীর দিকে। তবে কথা দিতে হবে তোমরা ডাঙার সব প্রাণীদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। জলে যা পাওয়া যায়, তাই খেয়ে পেট ভরাও, জল খেতে আসা প্রাণীদের যদি কোনোদিন ক্ষতি করেছ, তবে আমারা সবাই মিলে তোমাদের জীবন নরক বানিয়ে ছেড়ে দেব।”

সিংহের কথা শেষ হতে না হতেই কুমির তাঁর লম্বা জিভ কেটে বলল, “কী যে বলেন রাজাসাহেব! তাই কখনও হয়? জল যে সবার চাই, সেটা তো আমরা যথেষ্ট বুঝি। মাঝেমধ্যে দুষ্টুমি করে একটু আধটু জঙ্গলের প্রাণীদের ঠ্যাং ধরে টান দিই, ওটা বদ অভ্যেসーআর হবে না।”

সভা ভঙ্গ হয়। জঙ্গলে নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। অন্ধকার হতেই মানুষদের গ্রাম থেকে দ্রিমি দ্রিমি বাজনা শুরু হয়ে যায়। ওরা সব গোল হয়ে আগুন ঘিরে নাচে এখন। আগুনে ঝলসায় শিকার করা প্রাণীদের মৃতদেহ। নেকড়ের দল ভাবে, এই হচ্ছে চুপিসারে মানুষ মারার উপযুক্ত সময়। কিন্তু আজ মানুষ শিকারের উপযুক্ত দিন নয়। আজ তারা দল বেঁধে চলেছে আগে আগে সিংহের সঙ্গে। পিছনে চলেছে জলের প্রাণী কুমির আর ঘড়িয়ালের দল। তাদের পিঠে চেপেছে কচ্ছপেরা। তারা আবার জোরে হাঁটতে পারে না। মাছেরা সব জলাশয়েই থেকে গেছে। খোলা বাতাসে তারা এক মুহূর্ত বাঁচতে পারে না। ব্যাঙেরা চলেছে লাফিয়ে লাফিয়ে। মাছেদের জন্য তাদের মনখারাপ করছে। একেকবার তাদের মনে হচ্ছে জলাশয়ে থেকে গেলেই হত। বাস্তুহারা হয়ে সামনে যে জীবন আসছে, যে নতুন জলের সন্ধানে তারা চলেছে, তার প্রকৃতি অজানা, তাই শঙ্কা হচ্ছে।

কুমির চলেছে সিংহের একটু পিছনে। দুই পাশে পাহারা দিতে দিতে হেঁটে চলছে হায়না আর নেকড়ের দল। মানুষকে বিশ্বাস নেই। যদি জানতে পারে জলের প্রাণীরা সব নদীতে চলছে নৈশ অভিযানে, কী হবে বলা যায় না। মানুষের কাছে আছে ভয়ানক সব পোষা কুকুর, যারা এক ইশারায় জঙ্গলের প্রাণীর নাড়িভুঁড়ি ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। সবার শেষে চলেছে হাতির পাল। তাদের পায়ের তলায় পড়ে গাছের শুকনো ডাল মড়মড় শব্দে ভেঙে যাচ্ছে। কুমির আর ঘড়িয়ালদের বুকে হেঁটে যাওয়ার ছড়ছড় শব্দ হাতির চলার শব্দে মিলিয়ে যাচ্ছে।

নেকড়ে এসে সিংহের কানে কানে বলে, “রাজামশাই কাজটা কি ঠিক হল? কুমিরকে বিশ্বাস করে ঠকতে না হয় শেষে। ওর পেটে পেটে কী আছে বোঝা যায় না।”

সিংহ ধমক দেয় নেকড়েকে, “থামো তো বাপু! তোমার লাগানি-ভাঙানি স্বভাব আর গেল না দেখছি! কুমির আমাকে কথা দিয়েছে জঙ্গলের কোনও প্রাণীর ক্ষতি সে আর করবে না।”

সিংহরাজের কথা শুনে হায়না হা হা করে হেসে উঠল। সিংহ গর্জন করে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। আজ রাতটা সবার মঙ্গলের জন্য চুপ থাকাই শ্রেয়। কিন্তু ততক্ষণে কুমিরের পাশে বুকে হেঁটে চলা সর্পরাজ অজগরকে ফিসফিস করে কুমির জিজ্ঞেস করে, “আশেপাশে ডাঙার প্রাণী কেউ নেই তো? একটু কাছে এসো বাপু, দুটো কথা আছে।”

সাপে কুমিরে খুব বেশি লড়াই না থাকলেও সদ্ভাব বিশেষ নেই। অজগর একটু মুখ তুলে আগ্রহ দেখাতে কুমির আবার মুখ খোলে, “জঙ্গলে যেসব প্রাণী থাকে, তাদের আমি একটুও বিশ্বাস করি না। কখন যে তারা জলের বাসিন্দাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, বুঝতেও পারি না। তুমি আর তোমার সর্প পরিবারের ডাঙায় আর জলে সমান যাতায়াত। জানোই তো জলের প্রাণীদের কোনও কাজে আসে না ডাঙার প্রাণী। এদিকে জল ছাড়া তাদের চলেও না। নদীর রাস্তা দেখে নিলে নদীর জল সব তারা খেয়ে শেষ করে দেবে। তখন আমরা আবার বাস্তুহারা হয়ে যাব। তাই বলছি, যেই আমরা সব জলের প্রাণীরা নদীর ধারে পোঁছে যাব, অমনি আমি এক বিরাট আওয়াজ করব। তোমার সাপ পরিবারের সান্ত্রীদের বলো, ওরা যেন মানুষের পাড়ায় গিয়ে ঠিক তখুনি কুকুরগুলোকে জাগিয়ে দেয়। ব্যস, তাহলেই কেল্লা ফতে! বোকা জঙ্গলের প্রাণীগুলো সব কুকুরের ভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটে বেড়াবে, নদীর রাস্তা যাবে হারিয়ে। বোঝই তো, ডাঙার প্রাণীরা তোমাদের শত্রু, আমরা হলাম গিয়ে পরম বন্ধু।”

অজগরের চেহারাটা বিরাট হলেও ঘটে তার মোটে বুদ্ধি ধরে না। কুমিরের কথায় ভুলে সে তখুনি চতুর্দিকে গুপ্তচর সাপ পাঠিয়ে খবর পাঠায় মানুষের গ্রামের চারপাশে পাহারা দেওয়া সাপ-সান্ত্রীদের। বাতাসে নদীর জলের গন্ধ পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কুমির। সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় প্রাণীদের মিছিল। সিংহের কাছে এগিয়ে গিয়ে কুমির বলে, “আমরা এসে গিয়েছি রাজামশাই। আপনি না থাকলে আমাদের জীবন বাঁচত না। জলের সব প্রাণীদের হয়ে আমি আপনাকে পেন্নাম জানাই।” এই বলে যেই না কুমির সিংহের পায়ে মাথা ঠুকতে গেছে, অমনি সিংহ বিব্রত হয়ে এক লাফ দিয়ে পিছনে সরে গিয়ে বলে, “করো কী বন্ধু! তুমি না জলের রাজা! এমন কাজ তোমাকে শোভা দেয় না।”

“আপনাদের এই সহযোগিতার কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারব না। আজ আপনি ছিলেন, তাই জলের প্রাণীরা সব প্রাণে বেঁচে গেল।” এই কথা বলতে বলতে কুমিরের চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে বালিতে। বালি সেই অশ্রুজল শুষে নেয়। তারপর কুমির বিচিত্র কাঁদার ভঙ্গি করতে করতে অদ্ভুত এক আওয়াজ করে মুখে। সেই ডাক ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে। মোটা মোটা গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে সেই আওয়াজ প্রতিধ্বনি তোলে। মানুষদের গ্রাম থেকে দলে দলে হিংস্র কুকুর মুহূর্তে ছুটে আসে। তাদের গলার আওয়াজ শুনে সিংহ, হায়না, নেকড়ে আর হাতির দল গলা ফাটিয়ে রণহুংকার দেয়। শুরু হয়ে যায় কুকুরদের সঙ্গে জঙ্গলের প্রাণীদের ভয়ানক যুদ্ধ। কিন্তু যেহেতু সব প্রাণীরা সেদিন গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ছিল, তাই কুকুরেরা একসময়ে যুদ্ধে হার মেনে পালাতে বাধ্য হল। তাদের আঁচড় আর কামড়ের দাগ লেগে থাকল নিরীহ প্রাণীর শরীরে।

কুমিরের মতলব ফাঁস হয়ে গিয়েছিল সবার কাছে। যুদ্ধ থেমে যেতে দেখা গেল কোন ফাঁকে জলের সব প্রাণী নদীতে মিলিয়ে গেছে। সেদিন থেকে জলে আর জঙ্গলের প্রাণীদের ভাব-ভালবাসার চিহ্নমাত্র দেখতে পাওয়া যায় না। কুমিরের কান্নায় কেউ আর কক্ষনও ভোলে না।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়


No comments:

Post a Comment