ছোটো গল্পঃ প্রাচীন গুপ্তধনের সন্ধানে - রণিত ভৌমিক



রবিবার ছুটির দিন, কিন্তু সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে আকাশটা যেন ভেঙে পড়বে। সঙ্গে তেমনই এলোপাথাড়ি ঝড়ো হাওয়া। এদিকে রাস্তায় বেরিয়ে চারদিকটা যেভাবে পুকুরের মতো হয়ে উঠেছে দেখলাম, তাতে জলে নামার লোভটা সামলাতে না পেরে বিল্টু আর জোনাকি গিয়ে নামল জলে। আর ওদের সঙ্গে রাজা এবং আমিও মজা করতে করতে এসে পৌঁছলাম মাস্টারদার বাড়ি। বইখাতার বাইরে গিয়ে সেদিন মাস্টারদার সঙ্গে অন্য বিষয় নিয়ে আড্ডা দিতেই তাঁর বাড়িতে আসা।

এখানে বলে রাখা ভালো, মাস্টারদা অর্থাৎ আমাদের স্কুলের ভূগোলের শিক্ষক, যিনি আমাদের একজন প্রিয় মানুষও বটে, তাঁর ভালো নাম, হিমাদ্রিশেখর দাশগুপ্ত। মাস্টারদা আগাগোড়াই অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন আর তাই পি.এইচ.ডি করার সময়কাল থেকেই নানা অ্যাডভেঞ্চার জড়িত রিসার্চের সঙ্গে নিজেকে তিনি জড়াতে ভালোবাসেন।

মাস্টারদার বাড়িতে ঢুকতেই জেঠিমা আমাদের সকলকে তাঁর ঘরে পাঠিয়ে দিলেন এবং সেখানে গিয়ে দেখি মাস্টারদা কিছু কাগজের টুকরো আর একটা ফাইল হাতে নিয়ে কী যেন ভেবে চলেছেন। সেই দেখে আমি বলে উঠলাম, “মাস্টারদা, আপনি কি ব্যস্ত আছেন?”

মাস্টারদা আমার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলেন, “খুব একটা নয় রে রজত। তবে পরবর্তী রিসার্চটা নিয়ে একটু পড়াশোনা করছিলাম।”

রিসার্চ কথাটা শোনামাত্র বিল্টু বলে উঠল, “তা এবারের রিসার্চ কী নিয়ে?”

মাস্টারদাকে লক্ষ করলাম কাগজপত্রগুলো টেবিলের একপাশে রেখে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বিল্টুর উদ্দেশ্যে বললেন, “গতবারের চন্দ্রশিলার রিসার্চটার তুলনায় এবারের রিসার্চটা একটু আলাদা। প্রাক স্বাধীনতার যুগের এক ঐতিহাসিক রহস্য নিয়ে বলতে পারিস।”

“কী রহস্য?” জিজ্ঞেস করল বিল্টু।

একটু থেমে মাস্টারদা বললেন, “আমাদের দেশে ফ্রেঞ্চ এক্সপিডিশনের বিষয় ইতিহাসে নিশ্চয়ই পড়েছিস? আচ্ছা, তোরা কেউ বলতে পারবি, ফরাসিরা বাণিজ্যিক কারণে কত সালে ভারতে এসেছিল?”

আমরা একসঙ্গে বলে উঠলাম, “ফরাসিরা সতেরো শতকের দিকে ভারতে এসেছিল।”

এবার একটু গম্ভীর গলায় মাস্টারদাকে বলতে শুনলাম, “তোরা ওইটুকুই জানিস কারণ, ফরাসিদের সফল এক্সপিডিশন বলতে গেলে ওই সময়টাই একমাত্র উল্লেখ করা আছে। অথচ প্রথম ফ্রেঞ্চ এক্সপিডিশন কিন্তু ষোলো শতকের একদম গোড়ার দিকেই ঘটেছিল। ফ্রান্সের তখনকার রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের রাজত্বকালে বেশ কিছু নামী ফরাসি বণিক ইংরেজ এবং ডাচদের দেখাদেখি এদেশে বাণিজ্য করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে আর কিছুদিনের মধ্যে রাজার থেকে ফরমান নিয়ে তারা জাহাজে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তারপর বেশ কিছু বছর কেটে গেলেও তাদের বিষয়ে আর কোনও খবরই মেলেনি। এরপর আবারও কিছু বণিক দুটো জাহাজে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, যার মধ্যে কেবল একটামাত্র জাহাজই পেরেছিল সফলভাবে ফিরতে।”

“মাস্টারদা, প্রথম এবং পরের দিকে আরেকটা জাহাজ নিখোঁজ হওয়ার কী কারণ?” তাঁর কথার মাঝেই জিজ্ঞেস করল জোনাকি।

মাস্টারদার জবাব, “অনেক রিসার্চ করেও প্রথম জাহাজ বা তাতে থাকা বণিকদের বিষয় কিছুই খোঁজ পাওয়া যায়নি রে। তবে শেষের নিখোঁজ হওয়া জাহাজটি নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ আছে।”

“তাহলে সেই বণিকের দল কি সমুদ্রেই মারা গিয়েছিল, নাকি ব্রিটিশ সৈন্যর হাতে?” আমি মাস্টারদাকে প্রশ্ন করলাম।

সেই প্রশ্নের উত্তরে মাস্টারদা মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “দুটোর মধ্যে কোনোটাই ঘটেনি রজত।”

“তাহলে?” উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল রাজা।

মুচকি হেসে মাস্টারদা বললেন, “জলদস্যুদের নাম শুনেছিস তো? আরব সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে ওই দুই জাহাজ একে অপরের থেকে যায় আলাদা হয়ে এবং একদল জলদস্যুর হাতে পড়ে তাদের সব ধনসম্পত্তি লুট হয়ে গিয়েছিল বলেই অনেক ইতিহাসবিদদের ধারণা। পরে অবশ্য এর প্রমাণ সেইভাবে মেলেনি, তবে মনে করা হয় যে ওই জলদস্যুরা সেই সমস্ত লুট করা ধনসম্পত্তি গুজরাটের কোনও এক জঙ্গলের গুহায় লুকিয়ে রেখেছিল, যা সময়কালে রহস্যই থেকে গেছে।”

একটা কাগজ হাতে নিয়ে মাস্টারদা আমাদের উদ্দেশ্যে আবার বললেন, “অনেক পরিশ্রমের পর এই সূত্রটা পেয়েছি। এই দেখ, এই কাগজে লেখা খবর অনুযায়ী কিছু বছর আগে এক সরকারি দল পুরনো ইতিহাসের সন্ধানে গির জঙ্গলে ঢোকে এবং তারা কিছু ছেঁড়া জামাকাপড় আর হাড়গোড় খুঁজে পায়। সেই সকল জিনিস তারা পরীক্ষা করার জন্য শহরে নিয়ে আসে এবং অনেকদিন ধরে গবেষণা করার পর তারা বুঝতে পারে যে সেই ছেঁড়া জামাকাপড় বহুদিনের পুরনো হলেও এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনও যোগ নেই। সেই হাড়গোড় থেকে বোন ম্যারো নিয়ে তা পরীক্ষা করার পর তারা আরও জোর গলায় দাবি করতে সক্ষম হয় যে ওই হাড়গোড় বা জামাকাপড় একমাত্র জলদস্যুদেরই হতে পারে। কারণ, সেই সময় গির জঙ্গলে কিছু সাঁওতাল আর জলদস্যু ছাড়া কারোরই আনাগোনা ছিল না। ফলে, এটা অনুমান করাই যায় যে ওই জঙ্গলে সেই ধনসম্পত্তি রাখা হয়েছিল আর হয়তো এখনও রাখা রয়েছে, যার জন্য জলদস্যুদের আনাগোনাও ছিল তখন এবং হতে পারে সেখানে থাকা হিংস্র পশুর কবলে পড়েই সেই জলদস্যুরা প্রাণ হারিয়েছে।”

সব শুনে আমি মাস্টারদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, এই পুরো ব্যাপারটাই তো অনুমান করা হচ্ছে। তাহলে সরকার কেন ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করছে না?”

মাস্টারদার উত্তর, “আজ অবধি কোনও গুহারই সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে এটাও ঠিক যে সরকারের পক্ষ থেকে গোটা জঙ্গল কোনোদিনই সেইভাবে অনুসন্ধান করে দেখা হয়নি। এদিকে জঙ্গলের মধ্যে আবার চোরাশিকার বেড়ে যাওয়ায় ওইসব গুপ্তধন-টুপ্তধনের চিন্তা সরিয়ে সরকার এখন জঙ্গল সংরক্ষণের দিকেই মন দিয়েছে। সুতরাং যা হওয়ার, তাই হয়েছে। ওই প্রাচীন গুপ্তধনের সন্ধান আজও রহস্যই থেকে গেছে।”

মাস্টারদার প্রত্যেকটা কথার মধ্যেই আমরা অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পাচ্ছিলাম। এদিকে জেঠিমা আবার আমাদের সকলের জন্য সামনের কচুরির দোকান থেকে কচুরি আনিয়েছিলেন। সুতরাং শালপাতায় মোড়া কচুরি আর তরকারি খেতে খেতে মাস্টারদার এই রিসার্চ সম্বন্ধে আমরা তাঁর পরবর্তী পরিকল্পনার বিষয় জানতে চাইলাম।

আর মাস্টারদাও আমাদের জানালেন, “এখন আরও অনেক তথ্যের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সবার আগে যেটা দরকার সেটা হল, সরকার এবং ইউনিভার্সিটি থেকে অনুমোদন পাওয়া। কারণ, বিনা অনুমতিতে জঙ্গলে ঢোকা দণ্ডনীয় অপরাধ।”

সেই শুনে জোনাকি বলে উঠল, “মাস্টারদা, আপনি কি এবার একা যাবেন?”

জানালার পর্দাটা সরাতে সরাতে মাস্টারদার উত্তর, “রিসার্চ যখন আমার, তখন আমাকেই তো যেতে হবে। কিন্তু আশা করছি পুলিশি সহযোগিতা সেখানে মিলবে।”

“আচ্ছা, আমরা কি আপনার সঙ্গে যেতে পারি না?” রাজা হঠাৎ করে বলে উঠল।

শুনে মাস্টারদা হাসতে হাসতে বলল, “এটা কি ময়দানে ভুট্টা ভাজা খেতে যাওয়ার মতো ব্যাপার রে! ওখানে পুরোটাই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, আর সরকার এত সহজে আমায় অনুমোদন নাও দিতে পারে। সুতরাং যাওয়ার ব্যাপারটা আমারও কিন্তু খুব একটা নিশ্চিত নয়।”

আমরা মাস্টারদার শেষ কথাটা শুনে খুবই মুষড়ে পড়েছিলাম কারণ, তার মুখ থেকে শোনা এই ঐতিহাসিক গুপ্তধনের সমস্ত ঘটনাটাই আমাদের সমানভাবে উত্তেজিত করে তুলেছিল। যার ফলস্বরূপ আমরা সকলেই মাস্টারদার সঙ্গে ওখানে যাওয়ার ব্যাপারে সমান আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম।

আমাদের মুখগুলো দেখে মাস্টারদা আমাদের মনের কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন। সুতরাং কিছুক্ষণ বাদে তিনি আমাদের বললেন, “আগে আমার যাওয়াটা নিশ্চিত হোক, তারপর তোদের ব্যাপারটা দেখছি। তবে কেউ কিন্তু আগে থেকে যাওয়া হচ্ছেই, সেটা ভেবে ফেলিস না।”

ব্যস! মাস্টারদা একবার দেখছেন বলা মানেই হল কাজটা তিনি করেই ছাড়বেন। সুতরাং এক ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার জন্য ওই মুহূর্ত থেকেই আমরা নিজেদের মনকে প্রস্তুত করতে শুরু করলাম।

সেদিন মাস্টারদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমাদের সকলের মন ছিল বেশ ফুরফুরে। তবে এখানে বিশেষ করে বলতে হচ্ছে বিল্টুর কথা কারণ, মাস্টারদার পোষা বছর আড়াইয়ের ডিম্ব, জাতে ল্যাব্রাডর, সে কিন্তু ওইদিন ছাদের ঘরেই বাঁধা ছিল। সুতরাং বিল্টুকে দেখামাত্রই ডিম্বর ওই গায়ে উঠে পড়ার বিষয়টা সেদিন একদমই ছিল না।


মাস্টারদার বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর প্রায় দু’দিন কেটে গেল কিন্তু ওই বিষয়ে আর কোনও খবরই পেলাম না। সুতরাং যেদিন আমরা আবার মাস্টারদার কাছে পড়তে গেলাম, ওইদিন তাঁর মুখ থেকেই শুনলাম যে সেই অনুমতি আদায় করতে মাস্টারদাকে দিল্লির সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মীদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দিতে হয়েছিল এবং তাঁরা সকলেই প্রথম থেকে মাস্টারদাকে সেখানকার নানা বিপদ-আপদের কথা শুনিয়ে তাঁকে না যাওয়ারই পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ, ওই অঞ্চলের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গুজরাটের ওই জঙ্গল এলাকার আশেপাশে নাকি দৈনন্দিন আভ্যন্তরীণ কোন্দল লেগেই থাকে, বিশেষ করে জুনাগড়ের দিকে। এছাড়াও রয়েছে জঙ্গলের মধ্যে অবৈধ শিকার নিয়ে নানা সময় গণ্ডগোল, যার জন্য সরকার এবং বন দফতর মিলে জঙ্গলে মানুষের গতিবিধি সীমাবদ্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে এবং এর ফলে জঙ্গলের অনেকটা অংশই এখন প্রায় বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। সেখানে যেমন হিংস্র পশুর হাতে প্রাণনাশের একটা ভয় আছে, ঠিক তেমনই রয়েছে আরও অনেক বিপদের আশঙ্কা। সরকারি কর্মীরা তাই মাস্টারদা সহ আমাদের কথা মাথায় রেখে তাঁরা কিছুতেই মাস্টারদাকে এই বিপজ্জনক কাজের অনুমতি দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। এমনকি তাঁরা মনে করেন যে ইতিহাসবিদরা যে বিষয়ে সঠিক কোনও তথ্য দিতে পারেননি, তা নিয়ে না এগোনোটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সেই গুপ্তধন বা ওই ধরনের কোনও জিনিস আদৌ আছে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট তাঁদের মনে সংশয় রয়েছে। সুতরাং এত অনিশ্চয়তার মধ্যে মাস্টারদার এই এক্সপিডিশনে না যাওয়াটাই তাঁরা শ্রেয় মনে করেন।

ওই বৈঠকে এই মূল বিষয়গুলো ছাড়া আরও বেশ কিছু কথা উঠে এল এবং সেইদিক থেকে দেখতে গেলে মাস্টারদার জায়গায় যদি অন্য কেউ হত, তাহলে সে নিশ্চয়ই হাল ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকত। কিন্তু মাস্টারদা একটু আলাদা এবং আলাদা বলেই তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি ক্রমাগত ওই সকল উপস্থিত কর্মীদের নানাভাবে বুঝিয়েছিলেন যে সেই রিসার্চ কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটি সফল হলে এই দেশ কীভাবে তা থেকে উপকৃত হবে। ফলে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর মাস্টারদা অবশেষে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁদের না কে হ্যাঁ-এ পরিবর্তন করতে।

সেই রাতে আমরা উত্তেজনার কারণে কেউই ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। পরদিন মাস্টারদার সঙ্গে আমরা দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম এবং ওখানে পৌঁছে জানতে পারলাম যে মাস্টারদার ছোটবেলার এক বন্ধু অর্থাৎ রাজেনদাও আমাদের সঙ্গে এই রিসার্চে সামিল হবেন। রাজেনদার আইবি-তে চাকরি করার সুবাদে আমরা যে বেশ কিছু সরকারি সুযোগ সুবিধা পাব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এরপর আর কোনোদিকে না তাকিয়ে আমরা দিল্লি থেকে পাড়ি দিলাম গুজরাটের সেই গির ফরেস্টের অজানা রহস্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে।

জুনাগড় পৌঁছে আমরা প্রথমে সবাই সরকারি গেস্ট হাউসে গিয়ে উঠলাম এবং তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে মাস্টারদা আর রাজেনদা বেরিয়ে পড়লেন ওখানকার বন দফতরের কর্মীদের সঙ্গে কিছু দরকারি কথাবার্তা আগে থেকে সেরে রাখতে। আর এদিকে গেস্ট হাউসে বন্দি থাকতে আমাদের কিছুতেই মন চাইছিল না বলে ডিম্বকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সামনের একটা পার্কে ঘুরতে গেলাম। নতুন জায়গা, সঙ্গে নতুন পরিবেশ, বেশ মজাই লাগছিল। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে পার্কে ঢোকার পর আমাদের সঙ্গে কিছু লোকের আলাপ হয় এবং তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম যে তাঁরা ওই পার্কে রোজই সান্ধ্যভ্রমণে আসেন। আমরাও কথায় কথায় তাঁদের মাস্টারদার রিসার্চ সম্বন্ধে বলে ফেলেছিলাম, যা শুনে তাঁরা কেমন যেন অবাক হওয়ার মতো একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং নিজেদের মধ্যে কিছু শলাপরামর্শ সেরে ঝটপট সেখান থেকে কেটে পড়লেন।

এই বিষয়টা আমাদের কাছে অদ্ভুত ঠেকলেও সন্ধ্যাবেলা মাস্টারদা আর রাজেনদা ফিরতেই তাঁদের কাছ থেকে আমাদের পরদিন সকালে জঙ্গল পরিদর্শনে যাওয়ার খবরটা পেয়ে আমরা বেমালুম ওই পার্ক এবং সেই লোকগুলোর কথা মাস্টারদাকে জানাতে ভুলে গেলাম।

পরদিন সকাল হতেই আমরা জুনাগড় থেকে পাড়ি দিলাম চল্লিশ মাইল দূরত্বে অবস্থিত গির ফরেস্টের উদ্দেশ্যে। গির ফরেস্টে প্রবেশ করার মুখে দেখলাম বন দফতরের দু’জন কর্মী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ফলে তাদের সঙ্গেই আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকা সেই জঙ্গলে প্রবেশ করলাম।

সেদিন আমরা দেবালিয়ার গির ইন্টারপ্রেটেশন জোনেই পুরোটা সময় ব্যয় করলাম। নানানভাবে অনুসন্ধান করা সত্ত্বেও কোনও গুহা বা সূত্রের সন্ধান মাস্টারদা সহ আমরা কেউই পেলাম না। এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে দেখে আমরা ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। কিন্তু সেদিন লায়ন সাফারি করার সুযোগটা আমাদের ভাগ্যে জুটেছিল। আর ওই সুযোগে এখানকার বিশ্ববিখ্যাত এশিয়াটিক সিংহদের নিজেদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াতে দেখে আমরা ছোটোরা বড়ো আপ্লুত হয়েছিলাম। যদিও বা চোরা শিকারিদের জন্য সেই সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচশোতে এসে ঠেকেছে। তবুও বলতেই হচ্ছে, তাদের সাম্রাজ্য আজও ওই এলাকায় অটুট রয়েছে।

ফিরে আসা যাক গল্পে।

সেদিন আমাদের খালি হাতেই গির থেকে ফিরতে হয়েছিল। কিন্তু দু’দিনের মধ্যে অবশ্য আমরা আবারও গির ফরেস্টে গেলাম। তবে ওইদিন জোনাকির সাময়িক শরীর খারাপ হয়েছিল বলে রাজেনদাও ওর সঙ্গে গেস্ট হাউসে থেকে গিয়েছিলেন। সেদিনের আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আগের দিনের দুই কর্মীর বদলে ওইদিন অন্য দু’জন কর্মী এসেছিল এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হল যে তারা মাস্টারদার এই রিসার্চ সম্বন্ধে একেবারেই ওয়াকিবহাল নয়। কিন্তু বন দফতর থেকে তাদের পাঠিয়েছে বলে ওইদিন আমাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারাও জুড়ে গিয়েছিল।

ওদের কথামতো আমরা জঙ্গলের পথ দিয়ে এগোতে লাগলাম, কিন্তু যত ভিতরের দিকে ঢুকছি, ততই যেন চারপাশের নিস্তব্ধতা বাড়ছে। আর ওই পরিবেশ যেন ক্রমশই আমাদের কাছে সন্দেহজনক হয়ে উঠছিল। অনেকক্ষণ নিজের মনের মধ্যে প্রশ্নটা চেপে রাখার পর মাস্টারদা শেষমেশ ওই দুই কর্মীর মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, আপ লোগ হমে কাহাঁ লে যা রহে হো? ইয়ে রাস্তা তো মেরে খয়াল সে অলগ লগ রহা হ্যায়।”

মাস্টারদার কথা শেষ হতে না হতেই ওই কর্মীর উত্তর, “আপ চুপচাপ হম দোনো কে সাথ চালিয়ে। মালিক নে যাঁহা লে জানে কো কাহাঁ হ্যায়, হম আপকো উধার হি লে যা রহে হ্যায়।”

মালিক কথাটা শুনে আমরা রাস্তার মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। মাস্টারদা বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা কেউই বন দপ্তরের কর্মী নয়, আমরা নিশ্চয়ই কোনও বাজে লোকের খপ্পরে পড়েছি। কিন্তু আমাদের ধরে আনার আসল উদ্দেশ্যটাই তখনও বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওদের দু’জনের সঙ্গে তাই মাস্টারদা ওখানে দাঁড়িয়েই তর্ক জুড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে আরও তিনজন লোক একই বেশভূষায় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ানোয় আমরা চারদিক থেকে তখন ঘেরাও হয়ে গিয়েছিলাম। ফলে ওই মুহূর্তে ওদের সঙ্গে ওদের মালিকের নিকট যাওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনও উপায় রইল না।

তারপর জঙ্গলের একটা এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পর আমরা এক সুবিশাল বটবৃক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আর সেই লোকগুলোর উল্লেখ করা ওদের মালিকের সঙ্গে আমাদের ওখানেই সাক্ষাৎ ঘটল। লম্বা ও স্বাস্থ্যবান সেই ব্যক্তি তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে। ওই মুহূর্তে সেখানে দাঁড়িয়ে বার বার মনে হচ্ছিল যেন আমরা জঙ্গলে ঢুকে কোনও ভুল কাজ করেছি, আর তাই কঠিন শাস্তি পাওয়ার অপেক্ষায় আমরা ওঁর সামনে দাঁড়িয়ে।

চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে সেই ব্যক্তি মাস্টারদার উদ্দেশ্যে বললেন, “আমরা জানি মাস্টার, আপনারা এখানে গুপ্তধনের নামে সিংহ শিকার করতে এসেছেন। কিন্তু আমরা আপনাকে সেটা করতে দেব না।”

ওঁকে স্পষ্ট বাংলা বলতে দেখে আমরা একটু অবাক হয়েছিলাম। আর তাই মাস্টারদা ওঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি বাঙালি?”

উত্তরে উনি বললেন, “হ্যাঁ, বাঙালি। আমার আসল নাম অভিমন্যু পাত্র। তবে সেই নাম আর এখন ব্যবহার করা হয় না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি সম্পূর্ণ করার সময় শেষবার এই নামটা শুনেছিলাম।”

কথাটা শোনামাত্র চমকে উঠলেন মাস্টারদা। সেই সঙ্গে তাঁকে প্রশ্ন করতে শুনলাম, “অভিমন্যু, তুই এখানে?”

মাস্টারদার কথা শুনে ওঁকেও ঠিক একইভাবে অবাক হতে দেখলাম। ওঁকে তাই মাস্টারদার উদ্দেশ্যে বলতে শুনলাম, “আপনি আমাকে চেনেন?”

“হ্যাঁ। আমি হিমাদ্রি রে, হিমাদ্রিশেখর দাশগুপ্ত। এবার চিনতে পারলি?” উত্তেজনায় বলে উঠলেন মাস্টারদা।

শুনে উনিও বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ! চিনতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট বয় যে এইভাবে চোরাশিকারের সঙ্গে যুক্ত থাকবে সেটা ভাবিনি।”

“কী যা তা বলছিস? আমি কেন চোরাশিকারের সঙ্গে জড়িত থাকব? আমি তো আমার রিসার্চের কারণে এখানে সেই গুপ্তধনের সন্ধানে এসেছি।”

এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা দুই বন্ধুর কথাবার্তার ফাঁকে আমরা যতটুকু জানতে পারলাম তা হল, এই জঙ্গলে গুপ্তধন রাখা আছে বলে যে সবাই অনুমান করে, সেটা আদতে একটা মিথ ছাড়া আর কিছু নয়। এর প্রমাণ যেমন কখনোই পাওয়া যায়নি, তেমনি এই মিথকে কাজে লাগিয়ে বহু লোক বিভিন্ন সময় এই জঙ্গলে ঢুকে এখানকার মূল আকর্ষণ তথা এশিয়াটিক সিংহদের শিকার করেছে। কিন্তু ওঁর এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য বা এখানকার এক শ্রেণীর লোকেদের কাছে ওঁর মালিক হয়ে ওঠার বিষয়টা আমাদের কাছে তখনও অজানা ছিল।

সেই বিষয়ে ওঁকে জিজ্ঞেস করতেই উনি আমাদের বললেন, “আমার বাবা সরকারি ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন এবং চাকরিসূত্রে তিনি এই গির ফরেস্টের মধ্যে ক্রমাগত ঘটে চলা চোরাশিকারের বিষয় তদন্ত করতে আসেন। কলকাতায় থাকাকালীন হঠাৎ একদিন বাবার মৃত্যুর খবর পাই। এই জঙ্গলে কারা যেন তাঁকে খুন করেছে শুধুমাত্র তাদের তিনি অবৈধভাবে পশুশিকার করা থেকে রোধ করতে চেয়েছিলেন বলে। মৃত্যুর আগে বাবার মুখে শুনেছিলাম, এখানে নাকি গুপ্তধন আছে বলে একটা উড়ো খবর চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র এর আড়ালে পশুশিকার চালিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে। তাই বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ এবং এই পশুশিকার আটকাতে আমি সবকিছু ছেড়ে এখানে চলে এলাম। আর সেই থেকে আমি এদের সঙ্গে মিলে এই জঙ্গলে ঢোকা প্রত্যেক চোরাশিকারিদের সরকার শাস্তি দেওয়ার আগেই উচিত শিক্ষা দিয়ে থাকি।”

সব শোনার পর মাস্টারদা ওঁকে বললেন, “অভিমন্যু, তোর কলকাতায় ফিরতে ইচ্ছা করে না?”

উনি হেসে বললেন, “একটা সময় অবধি করত, তবে এখন আর করে না। এই জঙ্গল আর এখানকার আদিবাসীরাই এখন আমার কাছে ঘর-পরিবার, সবকিছু।”

কথাটা শুনে মনটা যেন ভরে গেল। সত্যি, আজকালকার দিনে যখন মানবিকতা হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন ভাবলেও অবাক লাগে যে আজও সমাজে এইরকম মানুষ আছেন, যাঁর কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

ওঁর সঙ্গে যখন আমরা জঙ্গলের ওই এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে হেঁটে ফেরত আসছিলাম, তখনই দূর থেকে রাজেনদাকে বেশ কিছু পুলিশ কর্মী ও বন দফতরের অধিকর্তাদের সঙ্গে একই রাস্তা দিয়ে আমাদের দিকে হেঁটে আসতে দেখলাম। আর দেখামাত্রই লক্ষ করলাম, মালিক তথা অভিমন্যুবাবুর দলের সেই আদিবাসী লোকগুলো জঙ্গলের ভিতর ছুট লাগাল আর অভিমন্যুবাবুকেও ফিরে যাওয়ার আগে মাস্টারদার উদ্দেশ্যে বলতে শুনলাম, “হিমাদ্রি, আমি দুঃখিত যে সময়ের অভাবে আমাদের রিইউনিয়নটা এখানেই সমাপ্তি ঘটাতে হচ্ছে। তবে যাওয়ার আগে তোকে শুধু এইটুকুই বলে যেতে চাই যে জুনাগড় বা এই জঙ্গল এলাকায় আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে দাঙ্গা বাধাই না, যদি না কেউ জঙ্গলে ঢুকে আমাদের মানবিকতায় আঘাত করে। তোদের সরকারকে তাই বলে দিবি, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলেও আমরা সর্বদা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাব এবং সেটা মেরে হোক বা মরে।”

ওঁদের চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজেনদা সহ তাঁর সঙ্গে আসা পুলিশ আর বন দফতরের অধিকর্তারা আমাদের সামনে এসে হাজির হলেন এবং তাঁর মুখেই শুনলাম যে জোনাকি তাঁকে পার্কের সেই সন্দেহজনক লোকগুলোর বিষয়ে সমস্তটাই খুলে বলেছে এবং তারপর বন দফতর থেকে পাঠানো আগের দিনের দুই কর্মীকে বাঁধা অবস্থায় পরে থাকতে দেখে পুরো চিত্রটাই তাঁদের কাছে তখন পরিষ্কার হয়ে যায়। আর তাই আমাদের বিপদ বুঝে তাঁরা আমাদের সাহায্য করতে এখানে ছুটে আসেন।

কিন্তু এখানে বলে রাখা ভালো যে তাঁরাও একইভাবে মাস্টারদার কাছে একটু আগে অবধি আমাদের মধ্যে উপস্থিত থাকা অভিমন্যুবাবু ও ওঁর দলের লোকগুলোর বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তবে বলতে দ্বিধা নেই যে মাস্টারদা এই বিষয়টা সম্পূর্ণভাবে নিজের একার কৃতিত্বেই সামলে নিয়েছিলেন। অভিমন্যুবাবু ও সেই আদিবাসীদের ব্যাপারে একটা কথাও তাঁকে বলতে শুনলাম না। যদিও বা সেই বিষয়ে রাজেনদার একটু হলেও সন্দেহ হয়েছিল, যার ফলে দিল্লি ফেরার সময় একমাত্র রাজেনদাকেই মাস্টারদা পুরো ঘটনাটা খুলে বলেছিলেন এবং তাঁকেও আমাদের মতো বাকরুদ্ধ হতে দেখেছিলাম। সত্যি, এখনকার দিনে শুধুমাত্র সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করার তাগিদে কতজনই বা পারে নিজের জীবন এইভাবে সমর্পিত করতে!

তাই গল্পের শেষে বলতেই হচ্ছে, আমরা যেই গুপ্তধনের সন্ধানে ওখানে গিয়েছিলাম তার হদিশ হয়তো পাইনি, কিন্তু মানব সভ্যতার প্রকৃত গুপ্তধনের সন্ধান করতে আমরা সফল হয়েছি। আরও স্পষ্ট করে বললে, মানবজাতির মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে আমরা অনেক কিছুই সেবার উপলব্ধি করেছিলাম, যা এখন সময়ের নিয়মে স্রেফ বিলুপ্ত হতে বসেছে। আজকালকার দিনে সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যমের দিকে একটু নজর রাখলেই চোখে পড়বে, কীভাবে মানুষ গাছ ও পশুপাখিদের উপর নানাভাবে অত্যাচার করে বারবার অমানবিকতার পরিচয় দিচ্ছে। মানবতা তো দূরে থাক, মনুষ্যত্ববোধটাও আজকাল মানুষের মধ্যে থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের বিলুপ্ত হতে চলা মানবজাতির প্রাচীন শিক্ষাগুলোর বিষয়ে আমরা যদি এখনও সচেতন না হই, তাহলে আগামী দিনে হয়তো সবচেয়ে হিংস্র প্রাণীর নামটা মানুষ হতে চলেছে।

___


অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

No comments:

Post a Comment