ছোটো গল্পঃ উলবোনা সুধাকর - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য



উলবোনা সুধাকর


দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য



সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই সুধাকর পাল বুঝে গেছিলেন দিনটা সুবিধের যাবে না। ধরাচুড়ো লাগিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে পা বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে বাঁ কাধের ওপর একটা টিকটিকি খসে পড়ে টকটক করে ডেকে উঠল। কোন কাঁধে টিকটিকি পড়লে ভালো আর কোন কাঁধে মন্দ, সেটা সুধাকরবাবুর চিরটা কাল গুলিয়ে এসেছে। গিন্নি জানেন। তিনি এধরনের যাবতীয় ব্যাপারে এলাকায় অথরিটি। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁকে ফোন করলে বিপদ আছে। কারণ সুধাকরবাবুর ছুটি এখনও স্যাংশন হয়নি।

এহেন সংকট মুহূর্তে লোকে ভালোর চেয়ে খারাপটাই ভাবে আগে। সুধাকরবাবুও ভাবলেন। ছুটি স্যাংশন হবে না নিশ্চয়। ঝাঁকিবাজারের জঙ্গলে ফের অপারেশনে দৌড়ুতে হবে রাত্তিরে—তারপর গিন্নি নবদ্বীপ থেকে তাঁকে ফোনে জিজ্ঞাসা করবেন—ওরে বাবা।

মলিন মুখে অফিসে পৌঁছে জিপ থেকে নামতেই বিহারী খবর দিল সাহেবের ঘরে ডাক পড়েছে। সুধাকরবাবু রুমালে ঘাম-টাম মুছে, মুখের পানটা ফেলে সাহেবের ঘরে গেলেন এবং বজ্রপাতটা ঘটল।

সাহেবের মুখ গম্ভীর। “আজ তো আপনার যাওয়া হতে পারে না সুধাকরবাবু। ইনফর্মেশন যা বলছে তাতে এ অপারেশনে আপনি নইলে টিম কানা হয়ে যাবে যে!”

সুধাকরবাবুর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কাল নবদ্বীপ পৌঁছে দুপুরবেলা গিন্নিকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে নেমন্তন্ন করতে যাবার কথা। তিনি একবার রেগে উঠলে—ওরে বাবা!

মিনমিন করে বললেন, “মানে...”

“মানে আবার কী? নাতির অন্নপ্রাশন তো? কার্ড দিয়েছেন। সে তো পনেরো দিন বাদে। এখন তার কী?”

আসল কারণটা বললে সাহেব বুঝবেন না। ছোকরা মানুষ। সবে পরীক্ষায় পাশ দিয়ে এসে বসেছেন। সংসারী মানুষের জ্বালা বোঝা তাঁর সাধ্য নয়। অতএব সুধাকরবাবুকে মিথ্যেকথাটা বলতেই হল। মিথ্যে বলতে গেলে ভয়ে তাঁর টাকরা শুকিয়ে ওঠে। হাত-পা কাঁপে। কাঁপতে কাঁপতে তিনি হাতজোড় করে বলে ফেললেন, “গিন্নির বড়ো অসুখ স্যার। পেটে পাথর গজিয়েছে। কাল ট্রেন থেকে বাড়ি গিয়েই তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে...” এই অবধি বলে সুধাকরবাবু আর এগোতে পারলেন না। নরম মনের মানুষ। এক নিঃশ্বাসে এতটা মিথ্যে বলে সামলানো তাঁর পক্ষে বেজায় কঠিন কাজ।

কিন্তু এতে দেখা গেল ফল বিপরীতে হিত হয়ে গেছে। সাহেব বেশ সিমপ্যাথি সিমপ্যাথি মুখ করে বললেন, “না না, ঠিক আছে। আমি তো জানতাম না! আপনি ভাববেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি ঈশানপুর থেকে খানকে ডাকিয়ে আনছি। ঝাঁকিবাজারের এলাকাটা ও ভালো চেনে। সামলে নেব। আপনি যান। ঘর সামলে আসুন আগে।”

বাইরে বেরিয়ে সুধাকরবাবু সুধীরকে বললেন, “একবার কোয়ার্টার হয়ে ক’টা টুকিটাকি জিনিস নিয়ে সিধে ইস্টিশানে নিয়ে চল।”

“এখন ইস্টিশানে গিয়ে কী করবেন স্যার?” সুধীর অবাক হল, “ট্রেন তো রাত্রে! একটু বিশ্রাম করে নিয়ে তারপর সন্ধে সন্ধে না হয়...”

সুধাকরবাবু ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন, “ওরে না রে, না! রাতের ট্রেন অবধি অপেক্ষা করা উচিত হবে না। কখন আবার সাহেবের মত বদলে যায়! সাড়ে বারোটার এক্সপ্রেসটা ধরিয়ে দে বাবা। ভোররাতে নবদ্বীপ পৌঁছে গিয়ে গিন্নির কাছে রিপোর্ট করতে পারলে সর্বরক্ষে।”

“আপনি ভোররাতের অন্ধকারে একলা একলা ট্রেন থেকে নেমে...” সুধীর একটু অবাক হয়ে বলল। অন্ধকারে একলা থাকলে সুধাকরবাবুর কিঞ্চিৎ অন্যলোকের বাসিন্দাদের ভয়ে কাতর থাকেন, একথা এলাকায় সবাই জানে।

সুধাকরবাবু হাসলেন। “ডোন্ট ওরি। ও-ট্রেন জীবনে টাইমে পৌঁছোয় না। ঘণ্টা দুয়েক লেট করবেই। ভোরের আলো ফুটলে নবদ্বীপ ঢুকবে দেখিস।”

ঘড়িতে পৌনে বারোটা। সেইদিকে একবার দেখে সুধীর মুচকি হেসে গাড়িতে স্টার্ট দিল। সুধাকরবাবু তাঁর গিন্নিকে যে কী প্রচণ্ড ভয় পান তা এ-অফিসের সবাই জানে।


***


ট্রেনে বেজায় ভিড়। রিজার্ভেশন আর এইটুকু সময়ে পাবেন কোথা? আনরিজার্ভড একটা কম্পার্টমেন্ট দেখে সুধাকরবাবু ‘জয় মা’ বলে তাতেই কাঁধ গলিয়ে দিলেন। আজকাল লোকজনও কেমন যেন হয়ে গেছে। খাকি ইউনিফর্ম দেখেও রেয়াত করে না। নিতান্ত তাঁর চেহারাটা বেজায় রোগাভোগা। তার কল্যাণেই ভেতরে ঢুকে আসতে তাই খুব একটা সমস্যা হল না।

ধাক্কাধুক্কি দিয়ে কোনোমতে ভেতরে এসে সুধাকরবাবুর চোখ কপালে উঠে গেল। ভেতরটা পুরো বাদুড়ঝোলা হয়ে আছে। এদিক ওদিক খানিক তাকিয়ে যখন ধরেই নিয়েছেন সারাটা রাত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হবে, ঠিক তখন খেয়াল হল, খানিক এগিয়ে প্যাসেজের ওপর লোকজনের একটা দল মিলে জটলা চলছে। বকাবকির শব্দও উঠছিল। কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখেন প্যাসেজের ওপরে একটা বড়ো ট্রাঙ্ক পড়ে আছে। লোকজনের তাতে বেজায় অসুবিধে। অতএব ট্রাঙ্কের মালিকের খোঁজ করে তড়পানি চলছে সবার। সুধাকরবাবু বুঝলেন, এই সুযোগ। ট্রাঙ্কটার কাছে এসে সেটাকে ঘুরে ঘুরে খানিক দেখে বেশ একটা গম্ভীর পুলিশি মুখ করে হাঁক দিলেন, “কার ট্রাঙ্ক?”

কেউ জবাব দিল না। প্রশ্নটা করেই চারদিকে একটা চোরা চাউনি ঘুরিয়ে নিলেন সুধাকরবাবু। ওপাশের সিট থেকে একটা গাঁট্টাগোট্টা গুঁফো লোক শুকনো মুখে এদিকেই তাকিয়ে দেখছে। তার মানে ট্রাঙ্কটা এর। তাঁর অঙ্গে খাকি দেখে ভয়ে জবাব দিচ্ছে না। সুধাকরবাবুও মনে মনে এইটাই চাইছিলেন। ট্রাঙ্কটা বেশ চৌরস। সিটের থেকে বেশি চওড়া। এইবার তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, “আমি এর ওপরে বসলাম। ছাড়িয়ে নিতে হলে মালিককে সামনে আসতে হবে।” বলতে বলতেই আড়চোখে ফের খেয়াল করলেন, গাঁট্টাগোট্টার মুখটা হঠাৎ কেন যেন বেশ হাসিখুশি হয়ে উঠেছে। হোক গে যাক। সুধাকরবাবু এখন অফ ডিউটি। কোনোমতে বাড়ি পৌঁছোতে পারলেই হল।

ট্রাঙ্কে পুলিশ বসেছে দেখে বাকি লোকজনও আর ও নিয়ে বিশেষ কিছু রা কাড়ল না। যে যার মতন তাস-পাশা-আড্ডায় জমে গেল।

হরিণবাড়ি পার হতে অন্ধকার হয়ে গেল। ট্রেনে সত্তর টাকায় ভেজিটেবল বিরিয়ানি বেচছিল। তাই একখানা কিনে নিয়ে খাওয়াটা সেরে নিয়েছিলেন সুধাকরবাবু। চিকেন আর এগ বিরিয়ানিও ছিল, তবে তাতে তাঁর কী? বৈষ্ণব মানুষ। ওসব ডিম-টিমে তাঁর ভক্তি নেই। খাওয়া শেষ করে জল খেতে গিয়ে মুশকিল হল। সুধাকরবাবু এতক্ষণে খেয়াল করলেন, তাড়াহুড়োয় জলের বোতলটাই আনা হয়নি। বিরিয়ানিওয়ালা দুটো প্লাস্টিকের পাউচে জল দিয়েছিল। আর একটা ছোটো পাউচে লঙ্কার সস। জিনিসগুলোকে দুঃখু দুঃখু মুখ করে একবার দেখলেন সুধাকরবাবু। তারপর সেগুলোকে ঝোলায় চালান দিলেন। পয়সার জিনিস ফেলে দেয়া ভালো কাজ নয়। লঙ্কার সস তাঁর পেটে একেবারে সয় না। আর, বাইরের না ফোটানো জল তো বিষ। খেয়ে মাঝরাস্তায় পেট ছেড়ে দিলে মুশকিল।

লোকজন ততক্ষণে খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমোবার বন্দোবস্ত করেছে। নাক ডাকবার সরু-মোটা শব্দ উঠছে এদিক ওদিক থেকে। ট্রেনের আলো একটু ঢিমে হয়ে এসেছে। গড়াম গড়াম শব্দ করে গাড়ি ছুটছে বাড়ির দিকে।

চোখ বুজে খানিক ঘুমোবার কসরত করে দেখলেন সুধাকরবাবু। নো রেজাল্ট। ট্রাঙ্কের ওপর পিঠ সিধে করে বসে আর যাই হোক ঘুমনো যায় না। কিন্তু সময় আর যেন কাটে না। গোটা ট্রেন চুপচাপ হয়ে গেছে। কাঁহাতক একলা একলা চুপচাপ বসে থাকা যায়? শেষমেশ একটা কথা খেয়াল পড়তে সুধাকরবাবুর মুখে হাসি ফুটল। নাতির জন্য একটা সোয়েটার বুনছিলেন। এই তালে সেইটে শেষ করে নিতে পারলে গিন্নিকে একটা সারপ্রাইজ দেয়া যাবে বাড়ি পৌঁছে।

এদিক ওদিকে তাকিয়ে দেখে নিলেন সুধাকরবাবু। সবাই ঘুমিয়ে গিয়েছে মোটামুটি। এবারে ঝোলা হাতড়ে উলের গোলা, দুটো কাঁটা আর একটা আধবোনা সোয়েটারের পিঠ বের করে এনে দ্রুত-হাতে কাজ চালু করে দিলেন। এই একটা কাজে তাঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। উলবোনার একশো মিটার দৌড় কমপিটিশন ওলিম্পিকে থাকলে সুধাকরবাবু নিঃসন্দেহে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতেন।

তবে শান্তিতে কাজ করবার জো কি থাকে আমাদের পোড়া দেশে? ঘণ্টা খানেক বাদেই বাধা পড়ল একটা। ডানদিকের চার নম্বর খোপের থেকে একটা ছোটো ছেলেকে নিয়ে তার বাবা এদিকে আসছিলেন টয়লেটে যাবেন বলে। ছেলেটা কাছাকাছি এসেই দাঁড়িয়ে পড়ে গোল গোল চোখ করে সুধাকরবাবুর উলবোনা দেখল খানিক, তারপর খিলখিল করে হেসে তার বাবাকে বলল, “ও বাবা, দ্যাখো, দ্যাখো, পুলিশে উল বুনছে।”

তার বাবাও সেদিকে খানিক দেখে ফিক করে হেসে দিয়ে ছেলের হাত ধরে বাথরুমের দিকে চলে গেলেন। যেতে যেতেই নিচু গলায় বলে গেলেন, “সাধে দেশের এই দশা! লাঠি-বন্দুক ছেড়ে পুলিশে উল-কাঁটা ধরে যে দেশে সে দেশে চোর-বদমাশের উপদ্রব হবে না তো হবে কোথা?”

সুধাকরবাবু কথাগুলো নীরবে হজম করে গেলেন। এ শিল্পের দাম কেউ দেয় না। আগে আগে রেগে যেতেন। এখন আর কেউ কিছু বললেও তাঁর কোনো হেলদোল হয় না। গায়ে সয়ে গেছে। তিনি একমনে লাল রঙের একটা গুলি থেকে উল টেনে নিয়ে হলদের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে একট জটিল কাঁটা মুভমেন্ট শুরু করলেন। সোয়েটারের পিঠের মাঝবরাবর একটা লাল বলের ডিজাইন হবে।

তবে সে কাজটাও নিশ্চিন্ত মনে করবার জো নেই। একটু বাদেই ওপাশের সিটের গুঁফো লোকটা উঠে এসে তাঁর পাশ দিয়ে যেতে যেতে একগাল হেসে বলে, “একাজে আপনার হাতটা তো বেজায় দক্ষ স্যার!”

তার গলার মধ্যে একটা টিটকিরির ছোঁয়া সুধাকরবাবু ঠিকই টের পেলেন, কিন্তু পাত্তা না দিয়ে একমনে হাতের কাজটা করে যেতে লাগলেন তিনি।

মিনিট পাঁচেক বাদে ফের বাধা। বাথরুমের দিক থেকে আচমকা একটা শোরগোল উঠল। বাচ্চা ছেলেটা চ্যাঁ চ্যাঁ করে চিৎকার জুড়েছে আর কে যেন ভারী গলায় হাঁক দিচ্ছে, “এইও, চোপ।”

তিতিবিরক্ত হয়ে সুধাকরবাবু হাতের কাজটা নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াতে যাবেন তখন হঠাৎ দুটো মোটা মোটা হাত অন্ধকারে ওপরের বাঙ্ক থেকে নেমে এসে তাঁর কাঁধ ধরে ঝোলা, উলকাঁটাসুদ্ধু বাঙ্কের ওপরে তুলে নিল। অন্ধকারে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “এইও, উলবোনা প্যাংলা পুলিশ। এইখানে চুপটি করে বসে থাক। নড়েছিস কি জান নিয়ে ফিরবি না আর এখান থেকে।”

সুধাকরবাবু এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ দাঁতকপাটি লেগে মূর্ছা গেলেন। হোঁতকা লোকটা তাঁকে সেইখানে রেখে একটা লাফ দিয়ে নিচে নেমে পড়ে ট্রাঙ্কটার গায়ের তালায় একটা চাবি লাগিয়ে ঘোরাতে লাগল। ওদিক বাথরুমের দিক থেকে ছোটো ছেলেটার চিৎকারও ততক্ষণে কাছে এগিয়ে এসেছে। দেখা গেল গুঁফোটা ছেলেটাকে প্রাণপণে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে এদিকেই এগিয়ে আসছে। পেছন পেছন ছেলেটার বাবা হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে কেড়ে নিতে যাচ্ছে আর তাইতে গুঁফো রেগে উঠে বলছে, “এই, ধরবি না, ধরবি না। ধরলেই একেবারে গলা টিপে...”

শব্দ শুনে কামরার বাকি লোকজনও ততক্ষণে জেগে উঠেছে। আলোও জ্বলে উঠেছে এদিক ওদিক। কিন্তু কেউ তখন টুঁ শব্দটি করছে না। কারণ ট্রাঙ্ক খুলে ততক্ষণে তার থেকে একটা ইয়াবড়ো রাম দা বের করে এনেছে হোঁতকা লোকটা।

গুঁফো তাই দেখে একগাল হেসে ছোটো ছেলেটার বাবাকে বলে, “এইবারে, ছেলেকে বাঁচাতে হলে একটু হেল্প করো দেখি বাবাজি! প্রথমে আলোগুলো নেভাও। তারপর আমি তোমার ছেলেটাকে পাহারা দিই আর তুমি গাড়ির সবার কাছ থেকে জিনিসপত্তরগুলো নিয়ে এস। আমার চ্যালা তোমার সঙ্গে রাম দা নিয়ে থাকছে। কেউ আপত্তি করলে তার মুণ্ডুটা... মানে বুঝতেই তো পারছ?”

এই বলে সে হোঁতকার দিকে ঘুরে বলে, “পুলিশটা কোথা?”

সে রাম দা ঘুরিয়ে বলে, “ওপরে ফেলে দিয়েছি। উলবোনা সেপাইয়ের দাঁতকপাটি লেগে গেছে। সহজে জাগবে বলে মনে হয় না।”

“বাব্বা! যা ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল ব্যাটা। ট্রেন ছাড়তে না ছাড়তে এসে হাজির। বাক্সটা যদি খুলে দেখতে চাইত, তাহলেই হয়েছিল আর কী! তারপর তো দেখি ব্যাটা উল বোনে বসে বসে।” বলতে বলতে গুঁফো হ্যা হ্যা করে হাসছিল।

ওদিকে রাম দা হাতে তার চ্যালা ছেলেটার বাবাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে লোকজনের কাছ থেকে জিনিসপত্তর এনে তখন জড়ো করছে একজায়গায়।

বাঙ্কের ওপর অন্ধকারে মরার মতন শুয়ে সুধাকরবাবুর তখন রাগে গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। কত আশা করে ভেবেছিলেন সোয়েটাররের ডিজাইনটা তুলে, গলা অবধি বুনে শেষ করে দেবেন আজ রাত্তিরে। বুকের দিকটা হয়ে আছে। জুড়ে দিতে পারলেই নাতির জন্য নতুন সোয়েটার রেডি। সকাল সকাল বাড়ি ফিরে গিন্নির হাতে ধরিয়ে দিলেই তাঁর মেজাজ শরিফ হয়ে যেত। বদমাশ দুটো তার জো রাখল না। কেন, একটু ভদ্রভাবে একটা পিস্তল-টিস্তল নিয়ে মিষ্টি করে লোকজনের কাছে গিয়ে গিয়ে বললেই তো হয়। তা নয়, বাচ্চা ছেলে জামিন নিয়ে ট্রেনের আলো নিভিয়ে রাম দা ঘুরিয়ে যাত্রাপালা জুড়েছে যতসব। একেবারে কাঁচা। সাহেবের ভাষায় ‘আনপ্রফেশনাল’ লোক এসে জোটে যত আজকাল। আর জুটবি তো জোট, তাঁর কপালেই এসব আপদ বালাই এসে জুটবে। এখন কিছু একটা প্রতিকার তো না করলেই নয়!

খুব সাবধানে, একটুও শব্দ না করে অন্ধকারের মধ্যেই ঝোলা থেকে জলের প্যাকেট দুটো বের করে এনে তার কোনা দুটো দাঁত দিয়ে একটু ফুটো করে নিলেন সুধাকরবাবু। লঙ্কার সসের পাউচটা আবার গেল কোথা? উফ্‌, এই অন্ধকারে—ধুস। হাতড়াতে হাতড়াতে খানিক বাদে সেটার নাগাল পাওয়া গেল। তার কোণে আরেকটা ফুটো করে, খুব সাবধানে জলের পাউচ দুটোর ফুটোর মধ্যে খানিক খানিক সস টিপে টিপে ঢুকিয়ে দিতেই সুধাকরবাবু তৈরি। তারপর উলের কাঁটা দুটো সোয়েটার থেকে খুলে এনে মুখে কামড়ে ধরে দু’হাতে পাউচ দুটো ধরে তিনি চুপ করে শুয়ে রইলেন অন্ধকারে। রাম-দাওয়ালা জিনিসপত্তর নিতে নিতে এদিকে এগিয়ে আসছে। আর একটু কাছে আসা দরকার। দুটোকে পাশাপাশি না পেলেই চিত্তির।

সে সময়টা আসতে অবশ্য দেরি হল না। খানিক বাদেই কামরার মাঝামাঝি সুধাকরবাবুর বাঙ্কের নীচে রাম-দাওয়ালা হোঁতকা এসে গুঁফোর পাশে হাজির। হাতের ভারী পুঁটুলিটা ট্রাঙ্কের মধ্যে খালি করে দিয়ে গুঁফোর কাছে গিয়ে সে বলে, “এইবার অন্যদিকটায় তুই যা, আমি বরং একটু খোকাবাবুর খেয়াল...”

তার কথাটা শেষ হল না অবশ্য। কারণ ততক্ষণে অন্ধকারের মধ্যে ওপরের বাঙ্কে উঠে বসেছেন উত্তরবঙ্গের পুলিশ দফতরের অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের ডাকসাইটে বড়োবাবু সুধাকর পাল। দু’হাতে ধরা লঙ্কার সস মেশানো জলের পাউচ দুটোর ফুটোগুলো তাদের দিকে ঘুরিয়ে ধরে দক্ষ হাতে চাপ দিয়েছেন তাতে। তীব্র জেটের মতন জ্বালা ধরানো জলের দুটো ছুঁচ যেন গিয়ে নিখুঁত লক্ষ্যে ঘা মেরেছে দুই মস্তানের চোখে। রাম দা, ছেলে সব ছেড়ে দিয়ে তারা চিল্লামিল্লি করতে করতে চোখ কচলাতে ব্যস্ত তখন। আর ঠিক সেই সময় দু’জনের পিঠেই এসে দুটো ছুরির ফলা ঠেকল। পেছন থেকে সুধাকরবাবুর খ্যানখ্যানে গলাটা বলছিল, “ইয়ে মানে, বলছিলাম, আমার হাত খুব কাঁপে কিনা, বেশি নড়াচড়া করলে পরে আবার...”

গাড়ির লোকজন ততক্ষণে হুড়মুড় করে নেমে এসে দুই মক্কেলকে ধরে ফেলেছে। এইবার তাদের পেছন থেকে সামনে বেরিয়ে এসে সুধাকরবাবু উলের কাঁটা দুটো ভালো করে মুছতে মুছতে দুঃখু দুঃখু মুখ করে বললেন, “তোদের জামায় কী বেজায় নোংরা রে! ডাকাত হলে জামা কাচতে নেই নাকি? উলের কাঁটাগুলো বাড়ি গিয়ে ধুতে হবে এবারে।”

বলতে বলতেই ট্রেনের গতি ঢিমে হয়ে আসছিল। লোকদুটোকে ততক্ষণে বেশ ভালো করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। রানাঘাটে নিয়ে জিআরপিতে দিয়ে ল্যাঠা চোকানো হবে। সেদিকে একনজর দেখে নিয়ে সুধাকরবাবু নিচের বাঙ্কে বসে থাকা একটা লোককে বললেন, “কোন স্টেশান আসছে বলুন তো দাদা?”

“নবদ্বীপ।” চাপা গলায় জবাব দিলেন ভদ্রলোক।

“অ্যাঁ? তার মানে গাড়ি আজ লেট করেনি? কী সর্বনাশ!”

“সর্বনাশের কী হল মশাই?”

সুধাকরবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, “না মানে আমার নবদ্বীপে নামবার কথা ছিল তো! ট্রেনটা সবসময় লেটে আসে। ভোর হয়ে যায় পৌঁছুতে। আজ যে কেন হঠাৎ...”

বলতে বলতেই নীচের বাঙ্কে শোয়া লোকটার পায়ের কাছে ঠেসেঠুসে বসে পড়লেন সুধাকরবাবু। “নাহ্‌ মশাই। তার চে’ বরং রানাঘাটেই চলে যাই। সেখান থেকে লোকাল ধরে সকালবেলা নবদ্বীপে ফিরে এলেই হবে। শেষ রাত্তিরে এ চত্বরটার বেশ দুর্নাম আছে, বুঝলেন না? মানে ওই যে কীসব বলে... ওই তেনারা… অন্ধকারে একলা একলা নেমে রোগা মানুষ, শেষমেশ আবার কোন বিপদে...”


___


অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ


6 comments:

  1. বেড়ে বেড়ে

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমি সত্যি সত্যি একটা উলবোনা পুলিশের সঙ্গে এক ট্রেনে একবার এসেছিলাম। হেবি ইন্টারেস্টিং দৃশ্য

      Delete
  2. আমি সত্যি সত্যি একটা উলবোনা পুলিশের সঙ্গে এক ট্রেনে একবার সারারাত এসেছিলাম। হেবি ইন্টারেস্টিং দৃশ্য। চোখের। সামনে একটা সোয়েটারের পিঠ বুনে ফেলেছিল কোলে রাইফেল নিয়ে বসে বসে

    ReplyDelete
  3. অনবদ্য কিশোরপাঠ্য গল্প।

    ReplyDelete
  4. বাহ্, খুব সুন্দর। 😊

    ReplyDelete
  5. উলবোনা, তাও আবার দক্ষ পুলিস। আহা জমে গিয়েছিল। সিরিজ হলে মন্দ হত না।

    ReplyDelete