অনুবাদ গল্পঃ উপকূলের স্বর্ণ ঈগল - অনুবাদঃ অর্চন চক্রবর্তী


মূল গল্পঃ দি অ্যার্ন ফ্রম দি কোস্ট


লেখকঃ টি.ও.বিচক্রফট



“হ্যারি কোথায়? হ্যারি, হ্যারি!” করতে করতে মিস্টার থরবার্ন তাঁর সাজানো গোছানো খামারবাড়ির পেছনদিক থেকে বেরিয়ে এলেন। একটা লাঠির ওপর ভর দিয়ে হাতে একটা চিঠি নিয়ে খামারবাড়ির চারদিকটা দেখছিলেন।

মিঃ থরবার্ন একজন শক্তসমর্থ পুরুষ। তাঁর পরনে হাঁটু পর্যন্ত ব্রিচেস আর কালো চামড়ার গোড়ালি পট্টি। তাঁর দৃঢ় মুখমণ্ডল আর দশাসই চেহারা তোমায় বুঝিয়ে দেবে গত কুড়ি বছর ধরে তাঁর খামার খুব একটা খারাপ চলছে না।

সুন্দর একমাথা চুল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে হ্যারি উঠোন দিয়ে ছুটতে ছুটতে এল।

“শোনো হ্যারি,” তার বাবা বললেন, “মাইকেলের নামে একটা চিঠি এসেছে। তার অসুস্থ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাবার কথা লেখা আছে এই চিঠিতে। এখনই গিয়ে চিঠিটা তাকে পৌঁছে দিয়ে এস।”

“কোথায় আছে সে?” জিজ্ঞেস করল হ্যারি।

“পাহাড়ের ওপরে। তার ঘরে বা ভেড়াদের সঙ্গে আছে কোথাও। একটু মাথা খাটিয়ে খুঁজে বার করতে হবে। আজ পর্যন্ত কখনও ওটাকে ব্যবহার করেছ কি? যাও।”

“ঠিক আছে।” বলে হ্যারি চলে গেল।

“সারাদিনটা আবার যেন এই একটা কাজে লাগিয়ে দিও না।” মিস্টার থরবার্ন ছেলের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে বললেন। কাঁটাওয়ালা একটা লাঠির ওপর তিনি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেটা তাঁর হতে থাকত সবসময়।

হ্যারি খামারের নিচু ছাইরঙা দেওয়ালটা পেরিয়ে পাহাড়ে ওঠার চড়াইয়ের রাস্তা ধরল। থরবার্নের খামারটা উপত্যকার একেবারে শেষে অবস্থিত। খামারের সামনে সবুজ তৃণক্ষেত্র। একটা রাস্তা নেমে গেছে এক মাইল দূরের গ্রামের দিকে। আর একদিকে পাহাড়টা উঠে গেছে সোজা। পাহাড়টার ওপরে মিস্টার থরবার্নের আরেকটা ভেড়ার খামার আছে। তিন মাইল চড়াই ভেঙে যেতে হয় সেই খামারে। মাইকেল সেখানে একটা কুটিরে থাকে।

হ্যারির তেরো বছর বয়স। তার চুল খুব হলুদ আর চোখ দুটি নীল। রোগা-পাতলা ছেলে। একথা মেনে নিতে অসুবিধে হয় যে থরবার্নের মতো একজন হাট্টাকাট্টা লোকের ছেলে সে। তার বাবার ওজন কিছু না হলেও একশো কিলো হবে। এ ব্যাপারে খামারের সেই লোকরা ভালো বলতে পারবে যারা তার বাবার পা ভেঙে যাবার পরে তাঁকে বয়ে নিয়ে এসেছিল।

হ্যারি খুব তাড়াতাড়ি হাঁটছিল। খাড়াই যেখানে যেখানে কম সেখানে তো ছুটছিল প্রায়, ছোটো ঘোড়ার ছানার মতো। উত্তুঙ্গ চড়াই যখন শুরু হল, তার আগেই ওর দম শেষ। যাই হোক, এপ্রিল মাসের তাজা বাতাস আর ঠান্ডা আবহাওয়ার কল্যাণে সে চলতে পারছিল। ঝোপঝাড় আর গুল্মগুলো পাহাড়ে দোলনা খেলায় মেতেছে। আলোছায়ার মাঝে হালকা সূর্যকিরণ। আর তাতে পাশের পাহাড়ে মেঘের ছায়াদের ছুটোছুটি খেলা। কাঁটাগাছ আর আগাছা পেরিয়ে সে পাহাড়ের খোলামেলা দিকটায় চলে এল। এদিকটা একদম খালি, শুধু ছোটো ছোটো ঘাসের গুচ্ছ ছাড়া আর কিছু নেই। অনেকটা নিচে তাদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। সে তার মাকে দেখতে পেল, একটা কুকুর নিয়ে তিনি গ্রামে যাবার রাস্তা ধরে নেমে আসছেন আর গ্রাম থেকে রুটি-বিস্কুটের গাড়িটা তার মার কাছে আসছে। খামারবাড়ির চারপাশের মাঠগুলো কোথাও বাদামি লাগছে, কোথাও বা সবুজ। নিচু পাথরের দেওয়াল ঘেরা বাড়িগুলো ছাইরঙা।

সে বারকয়েক থেমে পিছন ফিরে অনেক দূরের তাদের খামারটা দেখছিল। একঘণ্টারও বেশি সময় লাগল তার সেই ছোটো কুটিরে পৌঁছতে, যেখানে মাইকেল দিনের বেলায় থাকে এবং রাতেও থাকতে হয় ভেড়া পালনের মরশুমে। সে তখন কুটিরে ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া গেল। মাইকেল নিশ্চল বসে ভেড়াদের লক্ষ করতে করতে সাদা আর ধূসররঙা কুকুরটার সঙ্গে কথা বলছিল। কাঁধে আড়াআড়িভাবে একটা বস্তা ঝোলানো, দেখে মনে হয় সেটা শ্যাওলাধরা একটা পাথর বুঝি।

হ্যারি মাইকেলকে চিঠিটা দিল। চিঠিটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে আস্তে সে চিঠিটা খুলল। বাদামি হাত দিয়ে চিঠিটা তার হাঁটুর ওপর রাখল। কয়েক মিনিট ধরে সে যখন চিঠিটা নীরবে পড়ছিল। হ্যারি তাকে নজর করে দেখছিল।

চিঠিটা পড়তে ওকে বেশ মেহনত করতে হল। তারপর বলল, “আমার ভাইকে নিয়ে লেখা। আমি ওকে দেখতে যাব।” হ্যারিকে চিঠিটা ফেরত দিয়ে বলল, “তুমি চিঠিটা পড়ো।” হ্যারি দু-বার চিঠিটা তাকে পড়ে শোনাল।

“তোমার বাবাকে বলে দিও, আমি কাল খামারে যাব। কাল সকালে যাব। দিন তিনেক আমি এখানে থাকতে পারব না। হ্যাঁ, আর বোলো, কাল রাতে একটা ভেড়ির বাচ্চা হয়েছে, কিন্তু রুগ্ন।”

হ্যারি দেখল, বাচ্চাটা একটা ছোটো সাদা পুঁটলির মতো ওর মার পাশে শুয়ে আছে।

সাদা আর ধূসর রঙের মাঝামাঝি গায়ের রং মাইকেলের, চুল একটু বড়ো। মাইকেলের পোশাক, মুখ আর চুল দেখে হ্যারির মনে হল, পাহাড়ে থেকে থেকে সে কেমন যেন পাঁশুটে হয়ে যাচ্ছে। গত বছরের ফসল ব্রাকেন (একপ্রকার ফার্নবিশেষ) আর পাহাড়ের ওপর পড়া বৃষ্টির রঙের সঙ্গে সে একাকার।

“একটু হাওয়াবদল হবে। বাড়িতে থাকব আর বিছানায় ঘুমোব।” মাইকেল বলল।

“বিদায়। কাল সকালে খামারে যাচ্ছ তাহলে?”

“ঠিক আছে।” বলল মাইকেল।

“ঠিক আছে।” বলল হ্যারি।

হ্যারি খামারে ফিরে যাবার পথ ধরল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গিয়ে এখন রোদ ঝলমল বিকেল। বাড়ি যখন ফিরল, দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে। হারি তার বাবাকে খবরটা দিয়ে ভেড়া ছানার কথাটা জানাল।

“অদ্ভুত কাণ্ড! মাইকেল পড়তে পর্যন্ত পারে না!” হ্যারি বলল।

“বেশি ওস্তাদি কোরো না।” বললেন মিঃ থরবার্ন, “মাইকেল এমন কিছু কাজ জানে তা তুমি জানো না। আমার চেনাজানার মধ্যে ওই সবচেয়ে ভালো মেষপালক।”

একথায় হ্যারি অপ্রস্তুত হল। ও দেখেছে, বাবা সবসময় ওকে হেয় করতে চান। বলেন যে তার কোনো বুদ্ধিশুদ্ধি নেই, বলেন, বয়সের তুলনায় সে মোটেই পরিণত নয়, তার বয়স তেরো নয় বরং সাত।

সে রান্নাঘরে গেল। তার মা তাকে রুটি, মাখন, হ্যাম আর চা খেতে দিলেন। চুপচাপ সে খাচ্ছিল আর অভ্যেসমতো খেলছিল বেড়ালটার সঙ্গে।


পরদিন সকাল ন’টা নাগাদ রান্নাঘরের দরজায় জোর খটখটানি। মাইকেল এসেছে।

“সুপ্রভাত, মিসেস থরবার্ন। মনিব আছেন?”

“ভেতরে এসো।” মিসেস থরবার্ন বললেন, “এক কাপ গরম গরম চা খাও। সকালে কিছু খেয়েছ?”

“হ্যাঁ। সকালে আমি খেয়ে বেরিয়েছি। তবে এক কাপ চা হলে বেশ ভালোই হয়।”

সে চা খেতে খেতেই মিঃ থরবার্ন হ্যারিকে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন। মাইকেল মিঃ থরবার্নের সঙ্গে ভেড়াদের নিয়ে কথা বলছিল, বলছিল নতুন ছানাটার কথা। তার ভাইপো ববের কথা বলছিল, যে ক’টা দিন সে থাকবে না সে অন্য একটা খামার থেকে এসে ভেড়াদের দেখাশুনা করবে।

“নতুন ছানাটাকে ভালো করে নজরে রাখতে বলবেন। ওটা একটু কমজোরি হয়েছে। একটা আলাদা ঘরে ওকে রেখেছি।” মাইকেল বলল। চা খেয়ে সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে সে তার গ্রামের রাস্তা ধরল।

সে চলে যাবার একটু পরেই বব এল। লম্বাটে গড়ন, মুখে ছুলির দাগ, লালচুলো। মোটা মোটা হাড়গুলো উঁচু হয়ে আছে। কথাবার্তায় চালচলনে অত্যন্ত বিনীতভাব। মিঃ থরবার্নের নির্দেশিকা শুনে সে বেরিয়ে পড়ল।

এদিকে ভেড়ার পালের রাখালদের নিয়ে মিস্টার থরবার্নের ঝামেলার শেষ নেই। পরদিন সন্ধেবেলা, সবে অন্ধকার তখন ঘনিয়ে এসেছে, বব খামারের রান্নাঘরে এসে হাজির হল। তার মুখ যন্ত্রণায় কাতর। ডানহাত দিয়ে সে তার বাঁহাতটা চেপে ধরে আছে। হ্যারি দেখল তার কব্জিটা বিশ্রীভাবে ফুলে আছে। পড়ে গিয়ে তার কব্জিটা ভেঙে গেছে, যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে ফিরে এসেছে।

“দুঃখিত, মিস্টার থরবার্ন। আজকের রাতের মতো ভেড়াগুলোর দেখাশুনা করার মতো কেউ রইল না।”

পরদিনটা এল আবার কনকনে ঠান্ডা আর শনশনে বাতাস নিয়ে। ঘন কালো মেঘের দল আকাশময় ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। থেকে থেকে সূর্য উঁকি মারছে, ইস্পাত নীল মায়াবী আলোয় তখন ভেসে যাচ্ছে গোটা উপত্যকা, সবুজ ঘাসগুলো লাগছে দারুণ চনমনে। মিস্টার থরবার্ন ঠিক করলেন হ্যারিকে ভেড়াদের খামারে পাঠাবেন আজকের দিন আর রাতটার জন্য।

“মাইকেল হয়তো কালকের মধ্যে এসে যাবে।” তিনি বললেন, “ভেড়াগুলোকে তুমি দেখাশুনা করবে। আর হ্যাঁ, রুগ্ন বাচ্চাটির দিকে বিশেষভাবে নজর রাখবে। নিজেকে প্রমাণ করার একটা ভালো সুযোগ পাচ্ছ।”

হ্যারি মাথা নাড়ল।

“রুগ্ন ভেড়াটাকে কিছু খেতে দিও। বব বলছিল ওটা মনে হয় মার দুধ ঠিকমতো টেনে খেতে পারছে না। যদি সেরকম কিছু ঘটে, আমাকে জানাবে। লক্ষ রাখবে, ভেড়াগুলো যেন খাদের কিনারায় না চলে যায়। রাতে কুকুরটাকে ছেড়ে রাখবে আর দেখবে ওরা যেন ওদের ঘরের কাছাকাছি থাকে।”

“কম্বল আর দরকারি সবকিছুই ওখানে পাবে। স্পিরিট ল্যাম্প জ্বালিয়ে চা করতে পারবে। অসুবিধে হবে না কিছু।” বললেন মিসেস থরবার্ন।

হ্যারি খামার থেকে বেরিয়ে পাহাড়ে ওঠা শুরু করল। পাহাড়ের ওপরটা খুব নির্জন, জোরে বাতাস বইছে। হঠাৎ হঠাৎ ক্ষ্যাপা বৃষ্টি ছুটে এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে সব। বেশিরভাগ সময় ভেড়াগুলো ওদের জন্যে তৈরি কাঠের ঘরের কাছাকাছিই থাকে। শৈলশিরার আড়ালে তৈরি করা হয়েছে এই কুটিরগুলো, কাছাকাছির মধ্যে এর চাইতে ভালো আস্তানা আর কিছুই হতে পারত না।

হ্যারি  রুগ্ন ভেড়াটিকে একবার দেখে নিয়ে স্পিরিট ল্যাম্পটা জ্বেলে চা তৈরি করল। তার সঙ্গে টাসি আছে, সাদা আর ধূসররঙা কুকুর, ওর সঙ্গ পাওয়া যাবে। এমন নয় যে সময় ওর ঘাড়ে চেপে বসেছে। সন্ধে নামলে সে একচক্কর দেখে নিল ভেড়াগুলোকে, তারপর মাইকেলের উপদেশ মেনে একজন পাক্কা রাখালের অভ্যেসমতো বুট জুতো পরেই ভালো করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।

খুব ভোরের দিকে কুকুরের ডাকে হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল। বেরিয়ে এসে ভোরের ম্লান আলোয় সে ভেড়াগুলোকে উত্তেজিত দেখল। টাসি দৌড়ে তার কাছে এসে আবার ভেড়াগুলোর কাছে চলে গেল। ব্যাপারটা কী বোঝার চেষ্টা করল হ্যারি। ওপরে তাকিয়ে দেখল, একটা পাখি ভেড়ার পালের ওপর গোল গোল করে ঘুরছে। ওই পাখিটাই এদের ভয়ের কারণ। কিন্তু এটা কী পাখি? বাজপাখির মতো দেখতে। কিন্তু বাজপাখির চেয়ে অনেক বড়ো। পাখিটা নীচে নেমে আসতে হ্যারি অবাক হয়ে গেল ওটার আকার দেখে। একবার কি দু-বার নীচে নেমে এসে আবার ওপরে উড়ে গেল। এত বড়ো পাখি সে জীবনে দেখেনি। বাদামি রং, মাথাটা ধূসর আর বাজপাখির মতো ঠোঁট।

হঠাৎ পাখিটা বাজপাখির মতোই সাঁ করে ধেয়ে এল নীচে। ভয়ে ভেড়াগুলো ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল এদিক ওদিক। টাসি দৌড়ে তাড়া করে গেল পাখিটাকে। ওর মাথাটা নীচু, খাড়া হয়ে আছে লেজটা। হ্যারিও গেল ওর পিছু পিছু। এটা নিশ্চয়ই একটা ঈগল হবে, সে ভাবল। এখন সে পাখিটাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে যতটা ভেবেছিল আসলে তার চেয়েও বড়ো। পাখিটা এখন ডানা মেলে একটা ভেড়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রাগে গরগর করতে করতে টাসি আক্রমণ করল পাখিটাকে। পাখিটা ওর শক্তিশালী পা আর ডানার প্রচণ্ড ঝাপটা দিয়ে ওকে আঘাত করল। হঠাৎ এই আক্রমণে টাসি পিছিয়ে এল। ও ভয় পেয়েছে, কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

ঈগলটা আবার ভেড়াটার কাছে গিয়ে ওর হুকের মতো বাঁকানো তীক্ষ্ম নখ দিয়ে অবলীলায় ওটাকে তুলে নিল। এবার সে ভেড়াটাকে নিয়ে ওড়ার চেষ্টা করছে। পাখিটা মাটির কাছে তেমন ক্ষিপ্র নয়। হ্যারি তেড়ে গেল পাখিটার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে পাখিটা ভেড়াটাকে একটা পাথরের ওপর রেখে ওর মুখ লক্ষ্য করে আক্রমণ করল। লৌহকঠিন থাবা আর ভয়ংকর ধারালো নখ উঁচিয়ে আছে তার মুখের সামনে, একটা ছোটো ঠোক্করেই তার চোখ খুবলে নেবে। ভয়ে হ্যারি মুখ ঢেকে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। মাথার ওপর পাখিটার হিংস্র ডানার ঝটপটানি সে টের পাচ্ছে। একটু পরে ঝটপটানি কমতে সে চোখ মেলে দেখল ঈগলটা আবার ভেড়াটার কাছে ফিরে গেছে। তার বিশাল ডানাদুটো মেলে ধীরে ধীরে ওড়ার চেষ্টা করছে। প্রথমটা ওটা সামান্যই উড়তে পারল, ভেড়াটাকে ঠোঁটে ধরে মাটি ঘেঁষে উড়ছে। চিৎকার করে উঠল হ্যারি। ছুটে গিয়ে একটা পাথর ছুড়ে মারল ওটাকে। তাড়া করে গেল টাসি। কিন্তু ঈগলটা খাদের দিকে উড়ে যাচ্ছিল। পর মুহূর্তেই পাখিটা ডানা মেলে উড়ে পালাল নাগালের বাইরে। উঁচু থেকে আরো উঁচুতে উঠে উপকূলের দিকে উড়ে গেল, যা এখন থেকে কয়েক মাইল দূরে।

হ্যারি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল যতক্ষণ না পাখিটা অদৃশ্য হয়। তারপর বিষন্ন মনে ধীর পায়ে তার ঘরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে হাওয়ার শন শন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। তার পাশে পাশেই হাঁটছে টাসি। চুপচাপ, মনমরা। ভেড়াগুলো আতঙ্কে এদিক ওদিক ছিটকে গিয়েছিল, তাদের সবাইকে একজায়গায় আনা হল, খামারটা একবার ঘুরে দেখে নিল। এইসব কাজে সময় গেল কিছুটা। একটা ছোটো জায়গায় রুগ্ন ভেড়াটাকে তার মার সঙ্গে রাখা হয়েছে। মা ভেড়াটা এখনও ভয়ে সিঁটিয়ে আছে।

ঘণ্টা খানেক পরে নীচের খামারে যাবার জন্যে সে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করল। টাসি তার দিকে সংশয়ী চোখে তাকাল। বারকয়েক দৌড়ে এসে তার পিছু নিল, কিন্তু হ্যারি তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিল।

বেলা দুপুরে হ্যারি খামারে পৌঁছল। তার বাবা খামারেই ছিলেন। হ্যারিকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কী খবর হ্যারি? সব ঠিক আছে তো? আমি ভেবেছিলাম মাইকেল না ফেরা পর্যন্ত তুমি ওইখানেই থাকবে।”

“আমাদের একটা ভেড়া খোয়া গেছে।” হাঁপাতে হাঁপাতে বলল হ্যারি। “একটা ঈগল ওকে  নিয়ে উড়ে গেছে। ওটা ঈগলই হবে নিশ্চয়ই।”

“ঈগল!” বিদ্রূপ করে হেসে উঠলেন মিঃ থরবার্ন। “ওটাকে আটকাওনি কেন?”

“চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমি...”

মিঃ থরবার্নের মেজাজ আগে থেকেই বিগড়ে ছিল। আগের দিনে কিছু বকনা (মাদি) বাছুর তাঁকে খুব কম দামে বিক্রি করতে হয়েছিল। খামারের কয়েকটা বাড়ি মেরামত করতে হবে, তার খরচ যোগানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। মাইকেলের অনুপস্থিতি তাঁকে স্বস্তি দিচ্ছিল না। সাতসাতেরো ঝামেলায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে তাঁর মনে হচ্ছিল সবাই মিলে বুঝি শুধু তাঁরই পিছনে লেগেছে।

হঠাৎ তিনি চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর লাল মুখটা আরও লাল হয়ে উঠেছে। “তুমি মিথ্যে বলছ! আমি জীবনে ওখানে কোনো ঈগল দেখিনি। সত্যি বলো কী হয়েছে, বলো বলো!”

হ্যারি বাবার দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।

“তুমি ভেড়াটাকে হারিয়ে ফেলেছ।” মিস্টার থরবার্ন বললেন। “একটা বাচ্চা ছেলেও একদিনের জন্য খামার দেখাশুনা করতে পারে। ভেড়াটাকে হারিয়ে ভয়ে তুমি মিথ্যে গপ্পো ফাঁদছ।”

হ্যারি তবুও কিছু বলল না।

“এদিকে এসো।” টানতে টানতে তিনি হ্যারিকে নিয়ে এলেন। “এমন শিক্ষা তোমায় দেব যাতে আর কখনো আমায় মিথ্যে বলার সাহস তোমার না হয়।”

এই বলে উনি লাঠি তুলে হ্যারির পিঠে প্রচণ্ড জোরে মারলেন। তারপর আবার, আবার।

“আমি সত্যি বলছি।” এতক্ষণে কথা বলল হ্যারি। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল সে। তৃতীয় বা চতুর্থ মারের পর সে নিজেকে হ্যাঁচকা টান মেরে ছাড়িয়ে নিল। থরবার্ন যেতে দিলেন তাকে। উঠোনের দরজা পেরিয়ে হ্যারি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে গেল।

“পরেরবার বুঝিয়ে দেব আসল মার কাকে বলে।” চিৎকার করে বললেন ওর বাবা। “ঈগলটাকে যদি নিয়ে আসতে পারো তবেই তোমাকে বিশ্বাস করব।”

কিছুটা গিয়ে হ্যারি তাদের খামারের একটা গোলাঘরের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।

থরথর করে কাঁপছিল হ্যারি। শক্ত হয়ে উঠেছিল তার মুঠোদুটো। সে খেয়াল করল তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। জোর করে সে চেষ্টা করল যাতে আর না সে কাঁদে। বাবার মারে লেগেছে ঠিকই, তবে তার জন্য সে মোটেও কাঁদছে না। আরেকজন লোকের সামনে বাবা তাকে মেরেছেন। লোকটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে তার এই অপমান। সে যখন পালিয়ে আসছিল তখন সে আর বাবা দু’জনে মিলে হাসাহাসি করছিল। তার মুঠোগুলো আবার শক্ত হয়ে উঠল। এখনো নিশ্চয়ই ওঁরা তাকে নিয়েই কথা বলছেন।

শুরুর দিকে হাঁটতে হাঁটতে উঠলেও পরে দৌড়ে পাহাড়ের ওপরে উঠতে থাকল তাদের কুটিরে যাবার জন্যে। পৌঁছল যখন একেবারে ক্লান্ত বিধ্বস্ত। ধপাস করে শুয়ে পড়ল সে বিছানায়। একটার পর একটা ঘুসি মারছে বিছানায়, কিড়মিড় করে উঠল দাঁতগুলো। দিনটা চলে গেল, নীচে থেকে কেউ এল না। এখন তার একটু ভালো লাগছে। একটা নতুন চিন্তা তার মাথায় এসেছে একটা নতুন আশা নিয়ে। প্রার্থনা করল সে আজ যেন মাইকেল না আসে। তাহলে একা আজ রাতটা সে এই কুটিরে কাটাতে পারবে। আর ইগলটা যেন কাল সকালে আবার এসে ভেড়াদের আক্রমণ করে, তাহলে আরেকটা সুযোগ সে পাবে।

বাইরে বেরিয়ে এসে সে আকাশটা পরীক্ষা করে দেখল। তারপর ঘাসে হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করল, ঈগলটা যেন আসে। টাসি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শিগগিরই অন্ধকার ঘনিয়ে এল। সে ভেড়াগুলোকে একবার গুনে নিল, দেখল সবকিছু ঠিকই আছে।

সে একটা অস্ত্র খুঁজছিল। এখানে বন্দুক নেই, কিন্তু একটা শক্তপোক্ত লাঠি পেল যার ছুঁচলো মাথাটা ধাতু দিয়ে বাঁধানো। কোনো যন্ত্রের ভাঙা অংশ হবে, যেটা ফেলে দেওয়া হয়েছিল। হাতে নিয়ে সে পরখ করল অস্ত্রটা। পাখিটাকে খতম করার পক্ষে এটা বেশ কাজের হবে। কোনো ভয় বা এলোমেলো চিন্তা না করে যদি এটা দিয়ে কষিয়ে পাখিটার মাথায় মারা যায় তবে ব্যাটা নির্ঘাত অক্কা পাবে। এসব নিয়ে খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে সে চা তৈরি করল, রুটি-মাখন আর কিছুটা ঠান্ডা মাংস খেল।

নীচের খামারে সন্ধেবেলায় থরবার্ন তাঁর স্ত্রীকে জানালেন ঘটনাটা। তিনি একেবারে নিশ্চিত যে ওখানে কোনো ঈগল নেই। মিসেস থরবার্ন বিশেষ কিছু বললেন না। শুধু বললেন, “হ্যারিকে মারধর না করলেই ভালো হত, ওখানে গিয়ে দেখা যেত সত্যিই কোনো বিপদ হয়েছে কি না।”

“তবে আমার মনে হয় তেমন কিছু ঘটেনি।” দার্শনিক মন্তব্য করলেন তিনি।

অস্থির রাত কাটছে হ্যারির। ঘুম নেই চোখে, এ-পাশ ও-পাশ করে সময় কাটছে। কখনো-বা চোখদুটো একটু লেগে যাচ্ছে। কিন্তু ঘুমে হোক বা জাগরণে, গতকালের ঘটনাটাই ওর চোখের সামনে ভিড় করে আসছে। সে দেখছে কীভাবে ঈগলটা প্রথমে উড়ে গেল আকাশে, কীভাবে ওটা আক্রমণ করেছিল তাদের, কেমন ভয় পেয়েছিল সে, টাসি আর তাকে ওটা তাড়া করলই বা কীভাবে। সে ভাবল নীচের খামারে ফিরে যাবার কথা, বাবার সঙ্গে তার...

এইসব ভেবেই কেটে গেল রাতটা। শুধু কালকের ব্যাপারটাই নয়, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সে অনেক ভুল করেছে। নিজেকে সে হাস্যকর করে তুলেছে। নিজেকে আর তার বাবাকে সে হতাশ করেছে সবসময়। বয়সের তুলনায় সে একবারেই অপরিণত। সে এখনো শিশু।

এইভাবে রাত কাটল। ভোরবেলা সে টাসির ডাক শুনতে পেল।

লাফিয়ে উঠল সে। পুরো পোশাক পরে সে কুটিরের বাইরে বেরিয়ে এল। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া কাঁপিয়ে দিল তাকে। দেখল তার প্রার্থনায় সাড়া মিলেছে। মাথার ওপরে ঈগলটা উড়ছে তার বিশাল ডানায় ভর দিয়ে, ইতিমধ্যেই ওটা নামতে শুরু করেছে ভেড়ার পাল লক্ষ্য করে। ভেড়াগুলো এতক্ষণ জড়ো হয়েছিল একজায়গায়, এখন ভয়ে যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। পাখিটা কিছুটা দুর্বল একটা ভেড়াকে বেছে তার ওপর হামলা করল। ভেড়াটাকে নিয়েই সঙ্গে সঙ্গে ওটা উড়ে যেতে চাইছিল, কিন্তু মাটিতে ও খুব একটা স্বচ্ছন্দ নয়, অত বড়ো চেহারার জন্যে উড়তেও একটু সময় লাগছে। বিদ্যুৎগতিতে টাসি তেড়ে গেল ওটার দিকে। ছুঁচলো আগায় ধাতু লাগানো লাঠিটা শক্ত করে বাগিয়ে ধরে হ্যারিও গেল টাসির পিছন পিছন।

টাসি ওটার কাছে যেতে ঈগলটা ভেড়াটার ওপর দাঁড়িয়ে টাসির মুখোমুখি হল।

ছুটে আসতে আসতে হ্যারি দেখল ভেড়াটার সাদা লোম লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আধখোলা ডানা নিয়ে ঈগলটা ধীরে চলাফেরা করছে। বিশাল পাখিটা ধূসর-বাদামি রঙের। হলুদ রঙের ঠোঁট। ল্যাজ আর মাথাটা সাদা। পা-দুটো হলুদ আর আঁশযুক্ত।

মাথা নীচু করে ওটা ভয়ংকর ভঙ্গিতে টাসির দিকে তেড়ে এল। টাসি এগিয়ে আসতে ওটা  পায়ে পায়ে আতঙ্ক-নৃত্য করতে করতে ঠোঁট খুলে হাড় হিম করা শব্দে ডেকে উঠল। একটু পিছিয়ে এল টাসি। তার কানদুটো মাথার সঙ্গে লেগে গিয়েছে। ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে যাচ্ছে টাসি ওটার দিকে। সে ভয় পেয়েছে। তাই বলে পিঠ দেখানোর বান্দা সে নয়। ঈগলটা এবার ভেড়াটাকে রেখে সাংঘাতিক ক্ষিপ্রতার সঙ্গে টাসিকে আক্রমণ করল। পাখিটা ওর মাথার ওপর ঘুরছে। টাসি শরীরটা টানটান করে খোলা চোয়ালে মুখটা ওপরের দিকে করে ওকে কামড়াবার সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু ঈগলটা ওপরে থাকায় ও অনেক সুবিধেজনক জায়গায় আছে। হঠাৎই ঈগলটা সাংঘাতিক ক্ষিপ্রতায় নীচে নেমে ওর তীক্ষ্ম নখের আঁচড়ে টাসির বুক আর পেটের মাঝামাঝি জায়গাটা ফালাফালা করে দিল। যন্ত্রণায় তীক্ষ্ম চিৎকার করে উঠল টাসি। ইস্পাতের মতো ঠোঁটের তিনটে নির্মম আঘাত নেমে এল টাসির মাথায়। প্রাণহীন দেহে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল টাসি। টাসির রক্তস্নাত দেহ থেকে চোখ ফেরাতেই হ্যারি দেখল ওটা আবার ভেড়াটার ওপর গিয়ে পড়েছে।

হ্যারি পায়ে পায়ে খুব সাবধানে পাখিটার দিকে এগোচ্ছে। শক্ত মুঠিতে অস্ত্রটা ধরা আছে। মাথাটা নিচু করেছে ঈগলটা। পা-দুটো শক্ত করে উড়ে যাবার চেষ্টা করছে। ইস্পাত দিয়ে তৈরি যেন ওটার ঠোঁট, মাথাটা প্রশস্ত আর চওড়া সাপের মাথার মতো, হালকা হলুদ রঙের পৈশাচিক দুটি চোখ। মাথা আর গলা দুলিয়ে যেভাবে ওটা এগিয়ে আসছে দেখলে রক্ত হিম হয়ে যায়। পাখিটা থেকে দু-এক পা দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল নিশ্চল। একটা মারাত্মক আঘাতে সে পাখিটার মাথা দু-ফালা করে দিতে পারে। একটা মারাত্মক আঘাত! তবেই সে টাসির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারবে আর পারবে তার বাবার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে।

কিন্তু সে বড্ড বেশি সময় নিল। পাখিটা উড়তে চাইছে। মাটিতে দৌড়ে সে উড়ান দেওয়ার চেষ্টায় রত। হ্যারি দৌড়চ্ছে কিন্তু এবড়োখেবড়ো ছুঁচলো পাথরে সে জোরে ছুটতে পারছে না। ওর মধ্যেই পাখিটাকে মারার সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু তার আগেই ওটা উড়ে তার মাথার ওপরে এসে গেল। ডানা মেলতেই ওটার মধ্যে আর কোনো জড়তা রইল না। মুহূর্তের জন্যে ওর নজরে পড়ল পাখিটার ক্ষুরধার তীক্ষ্ম নখর। দু-পায়ের মারাত্মক শক্তি দিয়ে ওর ভয়ংকর নখের তীব্র আঘাত হানছে হ্যারির মুখে। গরম লোহার তীক্ষ্ম শলাকা দিয়ে খোঁচানোর মতো যন্ত্রণায় কাতরে উঠল সে।

পিছিয়ে এল হ্যারি, আরো একটু। এই মারাত্মক ঝটিতি আক্রমণের পর পাখিটা হ্যারির মাথার ঠিক ওপরে ঘুরছে পাক দিয়ে। ওটা আবার ভেড়ার কাছে গেল। হ্যারি দেখল, তার কোটের হাতায় লাল ফিতে, সেই রক্ত তার আঙুল বেয়ে টপটপ করে মাটিতে এসে মিশছে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে হ্যারি। শূন্য আকাশে শুধু শন শন করে হাওয়া বইছে। কোথায় ছত্রখান হয়ে গেছে ভেড়ার পাল। টাসি কাছেই মরে পড়ে আছে। চারপাশের দমবন্ধ করা নির্জনতার মধ্যে সে একেবারে একা। সে কী করছে না করছে কেউ দেখছে না। ভেড়াটাকে ঠোঁটে তুলে ওটা উড়ে যাবার চেষ্টা করছে, গতকাল যেমন ওটা খাদের ধারে গিয়ে উড়ে পালিয়েছিল।

হ্যারি তাড়া করে গেল। কিন্তু এবড়োখেবড়ো জমি আর পাথরের জন্যে ও স্বাভাবিক ছন্দে ছুটতে পারছিল না। পালিয়ে যাবার আগেই মারতে হবে ওটাকে। তার এই নাছোড়বান্দা ভাব দেখে ঈগলটা একটু যেন থমকে গেছে। হঠাৎই ঈগলটা ঝটিতি একটা পাথরের ওপর উড়ে এল। হ্যারি এখন বেকায়দায়। ভেড়াটাকে পাশে নিয়ে ওটা যে পাথরটার ওপর উড়ে এল সেটা  হ্যারির কাঁধের উচ্চতার সমান। ওর বুকে নখ দিয়ে একটা সাংঘাতিক আঁচড় দিল, এর সঙ্গে জোরালো ডানার আঘাত তো আছেই। হ্যারি টের পেল ওর পোশাক ছিঁড়ে গেছে ওটার নখের আঁচড়ে। হ্যারি কিন্তু ভয় পেয়ে পালিয়ে না গিয়ে ওটাকে আবার মারল। সে শুধুমাত্র আর ওটাকে তাড়াতে চাইছে না, খতম করে দিতে চাইছে একেবারে। ঈগলটা শুরুর দিকে হ্যারিকে হটিয়ে দিতে চাইছিল, কিন্তু সে ভয় না পেয়ে লড়ে যাচ্ছে দেখে ভয়ংকর হয়ে উঠল এবার পাখিটা।

হ্যারি দেখল, একমাত্র উপায় হল ওটার খুব কাছাকাছি থেকে মারের পর মার দিয়ে ওটাকে মাটিতে পেড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু ইতিমধ্যেই ওটা ওর মুখের উচ্চতায়, সেখান থেকে ব্লেডের মতো ধরলো নখ দিয়ে হামলা চালাতে ওটার খুব সুবিধে হচ্ছে। ডানার জোরদার মার দিতে পারছে সহজে। তার চারপাশে একটার পর একটা আঘাতে নাজেহাল হয়ে গেল হ্যারি। আর ঠিক তখনই হ্যারির গলায় আর ঘাড়ে পাখিটার তীক্ষ্ম নখ বিদ্ধ করল তাকে। ক্ষতবিক্ষত হল হ্যারি। অন্ধের মতো এলোপাথাড়ি ওপরের দিকে লাঠি চালাচ্ছে সে। ঈগলটা যখনই ওর মাথায় ঠোঁটের মারণ আঘাত হানতে চাইছে ততবারই হ্যারির লাঠি ওটার ঠোঁটকে ঠেকিয়ে ওকে বাঁচিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু এইবার পাখিটা লাথিটাকে এড়িয়ে ওর ভ্রূতে একটা সাংঘাতিক ঠোক্কর দিল। গভীর ক্ষত তৈরি হল সেখানে।

ভয়ে অসাড় হয়ে হ্যারি ভাবল, ওর একটা চোখ বুঝি নষ্টই হয়ে গেল। প্রকাণ্ড ডানাদুটোর আঘাতে ঈগলটার শরীরের ভারে ও প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ও এখন ভুলে গেছে, যে ওর বাবাকে ওর কিছু প্রমাণ করার আছে। চোখটাকে বাঁচাতে ও ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তিন-তিনবার সে পাখিটার ঠোঁটের জোর হাতুড়ির আঘাত সে কোনোরকমে ঠেকাল। আর এই জড়াজড়ির লড়াইয়ের মধ্যেও তার লাঠির আঘাত কিন্তু ঠিক নিশানা খুঁজে নিচ্ছিল। প্রত্যেকবারই ঈগলটার মাথায় সে মারতে পেরেছিল, এই আঘাতে ঈগলটা প্রচণ্ড আহত হল। টলমল করতে করতে হ্যারি বুঝতে পারল ঈগলটার থাবার জোর যেন কমে এসেছে। তাকে অবাক করে দিয়ে ঈগলটা মাটিতে পড়ে গিয়ে ধড়ফড় করছে। নতুন শক্তিতে তেড়েফুঁড়ে উঠে হ্যারি। ওটার মাথা লক্ষ্য করে একের পর এক মারে নাস্তানাবুদ করে দিল ওটাকে। লড়ে যাচ্ছে তখনো পাখিটা। শেষমেশ বন্ধ হল ওর নড়াচড়া। হ্যারি দেখল পাখিটা মরে পড়ে আছে, মাথাটা ফেটে চৌচির।

হাঁপাতে হাঁপাতে অনেকক্ষণ সে দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। প্রচণ্ড মাতন তার শরীর মন জুড়ে। একটা পাথরের ওপর সে বসল। তার অজান্তেই এই ভয়ংকর লড়াইটা তাকে টাসির মৃতদেহ থেকে দূরে একটা গভীর খাদের কিনারায় এর নিয়ে এসেছে।

আঘাতগুলো যেন জ্বলছে এখন। আকাশ আর দিকচক্রবাল ঘুরছিল তার চারদিকে। কিন্তু সে জোর করে নিজেকে দৃঢ় রাখল। কিছুক্ষণ পরে সে ঈগলটাকে তুলে নিল তার কাঁধে। ডানাদুটো আলগা হয়ে ঝুলে পড়ল তার কাঁধের সামনে পিছনে। নীচের খামারের দিকে এগিয়ে চলল সে।

খামারে যখন সে পৌঁছল, নীচু ছাইরঙা দেওয়াল, চষা জমি আর সবুজ তৃণভূমি তার চোখের সামনে যেন ঢুলছে। সবে সকাল হয়েছে, কিন্তু জীবনের কোনো খামতি নেই। খামারে এটাই স্বাভাবিক।

কিছু গোরুকে চরানোর জন্যে মাঠে আনা হয়েছে। মালবাহী ঘোড়াদের মধ্যে একটা ঘোড়া সজ্জিত হয়ে তৈরি। বাবা কথা বলছেন গাড়োয়ানের সঙ্গে।

যখন তাঁরা দেখলেন হ্যারি তাঁদের কাছে আসছে, থমকে গেলেন তাঁরা। যেন তাঁরা বুঝতেই পারছেন না, এ কে এবং ব্যাপারটা কী!

হ্যারি বাবার কাছে এসে তাঁর পায়ের কাছে পাখিটাকে নামিয়ে রাখল। কোটটা নেই, রক্তমাখা ছেঁড়াখোঁড়া ন্যাকড়ার মতো ঝুলছিল জামাটা তার শরীরে। একটা হাতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। কপালের কাটা জায়গাটা থেকে আঠালো রক্ত তখনো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

মিস্টার থরবার্ন অস্ফুটে শুধু বললেন, “হায় ভগবান!” তক্ষুনি তিনি হ্যারিকে রান্নাঘরে নিয়ে গেলেন। সেখাকার লোকেরা এক গেলাস ব্র্যান্ডি দিল হ্যারিকে। স্পঞ্জ করে দিল গরম জল দিয়ে। বাঁহাতের কনুইয়ের নীচে অনেকটা জায়গায় গভীর ক্ষত ছিল। বুকে ক্ষতের কাটাকুটি। গলার ভয়ংকর আঘাতটা দেখে বোঝা যায় পাখিটার নখ ছিল কী ভীষণ ধারালো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তারবাবু এলেন। আঘাতগুলো তখন আগুনের মতো জ্বলছিল, কিন্তু হ্যারি কথা বলছিল উত্তেজিতভাবে। এত খুশি এর আগে সে কখনোই হয়নি। খামারের প্রত্যেকেই তাকে আর মৃত ঈগলটাকে দেখতে এসেছে।

সারাটা দিন বাবা তার কাছে কাছে রইলেন। প্রতি আধঘণ্টা অন্তর তিনি রান্নাঘরে আসছিলেন। কথা বেশি বলছিলেন না, তবে বার বারই তিনি হ্যারিকে জিজ্ঞেস করছিলেন, “তুমি ভালো আছ তো?” একবার নিজের হাতে এক কাপ চা বয়ে নিয়ে এসে হ্যারিকে দিলেন।

বেলার দিকে মাইকেল ফিরে এল। হ্যারি তাকে গোটা গল্পটা বলল। মাইকেল পাখিটাকে উলটে দিয়ে দেখল। সে বলল যে, এটা স্বর্ণ ঈগল, সাদা লেজওয়ালা সামুদ্রিক ঈগল। সে ওটার ডানা মেপে দেখল। দেখা গেল, ডানার মাপ সাড়ে সাত ফুট। মাইকেল যখন বালক ছিল তখন ও এইরকম দুটো তিনটে দেখেছে, কিন্তু এটা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড়ো।

তিনদিন পরে সন্ধেবেলায় হ্যারিকে নিয়ে গেলেন গ্রামের সরাইখানায়। তখনো শরীরে ব্যান্ডেজ বাঁধা, নড়াচড়ায় কষ্ট হচ্ছে। সেখানে তিনি হ্যারিকে জ্বলজ্বলে আগুনের সামনে বসিয়ে গ্রামের সমস্ত খামারের লোকজনদের কাছে তাঁর ছেলের প্রশংসা করলেন, আর ছেলেকে বললেন সবাইকে তার লড়াইয়ের গল্প বলতে।

তাঁর পাশে বসে হ্যারি যখন গল্পটা বলছিল তিনি মন দিয়ে শুনছিলেন, যখনই হ্যারি কিছু বলতে ভুলে যাচ্ছিল উনি ধরিয়ে দিচ্ছিলেন। গল্পের শেষে প্রত্যেকে হাততালি দিয়ে থরবার্নকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন এমন পুত্রের জন্য তাঁর গর্বিত হওয়া উচিত।

সরাইখানা থেকে খামারে ফিরে আসার সময় নির্জন অন্ধকার রাতে কারো মুখেই কোনো কথা সরছিল না। হ্যারি ভাবছিল, বাবা যেন আবার মারধোর করার জন্য ক্ষমা-টমা না চেয়ে বসেন। বাড়ি ফিরে উনি আলোটা উঁচু করে ধরে দোতলায় হ্যারিকে শোবার ঘিরে পৌঁছে দিলেন।

“শুভরাত্রি হ্যারি।” শেষমেশ তিনি এই কথা বলে হ্যারিকে বললেন, “তুমি ভালো আছ তো?”

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মিষ্টি হেসে হ্যারি বলল, “হ্যাঁ, আমি ভালো আছি।”


___


No comments:

Post a Comment