বড়ো গল্পঃ টান - সত্যম ভট্টাচার্য


টান


সত্যম ভট্টাচার্য


এক


জীবন যে কখন কাকে কোন বাঁকে নিয়ে দাঁড় করাবে তা মনে হয় স্বয়ং বিধাতা ভগবানও আগে থেকে জানতে পারেন না। না হলে আজ যখন অতনু আর কল্যাণের বাড়ি পৌঁছে আরামের বিছানায় খেয়েদেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম দেবার কথা, সেখানে অতনু শুয়ে আছে বেনারস স্টেট জেনারেল হাসপাতালের বিছানায় আর কল্যাণ বসে আছে ওর মাথার পাশে। চারদিকে গিজগিজ করছে রোগীর ভিড়। এমনই ভিড় যে অতনুকে যে একটু বাথরুমে নিয়ে যাবে কল্যাণ, তাও সাহস পাচ্ছে না। অতনুর স্যালাইন চলছে। একটা কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব সবসময়। মাঝে মাঝে জেগে উঠে জড়ানো গলায় একটা দুটো কথা বলছে, আবার ঘুমিয়ে পড়ছে।

অতনুর মনে হয় অফিসে কোনো দরকারি অ্যাসাইনমেন্ট আছে। বেশ কয়েকবার সন্ধে নাগাদ ফোন এসেছে। কিন্তু কল্যাণ যে ওকে ডেকে কথাটা বলবে, তাই পারছে না। ডাকলে অতনু অল্প চোখ খুলে দেখতে দেখতেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলছে। নার্সদের জিজ্ঞেস করলে একটাই কথা বলছে তারা যে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে আর ছত্রিশ ঘণ্টা অবসার্ভেশনে থাকতে হবে এখন। বেশি তাদেরকে কিছু জিজ্ঞেসও করা যাচ্ছে না। কারণ, এইরকম ভয়ানক ভিড়ের মধ্যে সব পেশেন্টকেই দেখতে হচ্ছে তাদের। তাছাড়া মুখার্জীদার জন্য অতনুর এই সিঙ্গল বেড পাবার বিষয়টিকেও সবাই ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। আর তাতে যে খুব একটা ভুল আছে তাও নয়। যা ভিড় চারদিকে, এক-এক বেডে দু’জন তিনজন করে আছে।

এই হাঁকডাক ভিড়-ভাড় চিৎকার, এর মধ্যেও চোখটা একটু লেগে এসেছিল কল্যাণের। কাল রাত থেকে ঘুম বা বিশ্রাম তো দূরের কথা, একবার শুতে অবধি পারেনি ও। আর আজ সারাদিন তো এভাবেই টুলে বসে থাকতে হয়েছে অতনুর পাশে। এক-দু-বার যদিও বাইরে গিয়েছে ভাত বা চা খাবার জন্যে। ওদিকে সারাদিনে অতনুকে সেরকম কিছু খেতে না দিলেও সন্ধে নাগাদ যখন লাল চা আর বিস্কুট দিতে বলেছে হাসপাতাল থেকে, বাইরে থেকে তা কিনে নিয়ে এনে খাইয়েছে কল্যাণ।

গতকাল রাতে ওদের ফেরার ট্রেন ছিল। তা তো গেছেই। কবে যে এখান থেকে অতনুকে নিয়ে বেরোতে পারবে, তাই বসে বসে ভাবতেই ঝিমোচ্ছিল কল্যাণ। কিছুই ভেবে পাচ্ছে না ও। আর বেশি ভাবতে গেলেই সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে যে হয়ে গেল এইসব! এত ভালো ট্যুরটার শেষমেশ এই পরিণতি হবে কে জানত। হঠাৎ ‘আপকো বাহার বুলা রাহা হ্যায়’ কথাটায় তন্দ্রাটা কেটে কল্যাণ দেখল সামনে ওয়ার্ড বয় দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে রাত সাড়ে সাতটা বাজে তখন।


দুই


বেনারস বা বারানসি বা কাশী এক অদ্ভূত শহর। আপাতদৃষ্টিতে অন্য যে-কোনো বড়ো শহরের সঙ্গে এর তেমন পার্থক্য না থাকলেও মনে রাখতে হবে বারানসিকে বলা হয় পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীন জীবন্ত শহর। আর সেসব প্রাচীন জায়গা দেখবার জন্য ঢুকে পড়তে হবে কাশীর অলিগলিতে অথবা নেমে যেতে হবে পুণ্যসলিলা গঙ্গার পাশের বাঁধানো সিঁড়িতে। সেখানে কোথাও চলছে কথকতা, কোথাও পূজার্চনা। আর  সময় যেন এক ধাক্কায় পিছিয়ে যাচ্ছে বেশ কয়েকশো বছর। ওদিকে মণিকর্ণিকা থেক শুরু করে মাঝখানে দশাশ্বমেধকে রেখে এদিকে হরিশচন্দ্র ঘাট টানা হাঁটলে মনে হয় সময় যেন থমকে আছে এখানে। অলিগলি থেকে খাড়া সিঁড়িগুলো একের পর এক নেমে এসেছে নীচের গঙ্গার ঘাটে। সেখানে বাঁধা আছে অজস্র নৌকো। সন্ধ্যায় গঙ্গারতির সময় গিজগিজ করে সেগুলোতে ভিড়। নৌকোতে বসে দেখা যায় দূরে মণিকর্ণিকা আর হরিশচন্দ্র ঘাটে জ্বলছে সার সার চিতা।

ঘাটগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে অতনু আর কল্যাণ বুঝতে পারছিল কেন একে বলে প্রাচীন জীবন্ত শহর। আর বাঙালিটোলার গলিতে ঢুকলে তো কথাই নেই। সরু সরু অন্ধকার ছায়াচ্ছন্ন গলি, দু-দিকে মাথা উঁচু করা বাড়ি, তার সামনে দরজা, কতগুলো আবার ভেঙে পড়েছে। অথচ তার মধ্যেই লোক থাকে। সেসব গলিতেই রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে প্রকাণ্ড ষাঁড়। বাড়ির রোয়াকে বসে থাকেন লোলচর্মসার কঙ্কালপ্রায় বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা। তাঁদের দৃষ্টি স্থির, দেখলেই বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে ওঠে। আবার কখনো গলির ভেতর থেকে ভেসে আসে ঠুমরী গজলের আওয়াজ। এই পুরো ব্যাপারটাই যেন অতনু আর কল্যাণকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। দুপুরবেলা ছায়া খুঁজে নিয়ে ওরা বসে থাকত শুনশান ঘাটে অথবা ঘুরে বেড়াত বাঙালিটোলার সেইসব অলিগলিতে।

দিন পাঁচেক আগে ওরা যখন ক’দিন ছুটি কাটাতে কাশীতে এসে পৌঁছোয়, প্রথমদিনই বুঝে গিয়েছিল যে আমজনতার আকর্ষণ সেই সন্ধ্যাবেলার গঙ্গারতি হলেও শহরটার মূল আকর্ষণ ওই ঘিঞ্জি গলি, ভেঙে পড়া বাড়িঘর-হাভেলি আর ভেসে আসা ঠুমরী-গজলের সুর। তাই দ্বিতীয়দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাই অতনু নেট ঘেঁটে একটা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলেছিল যারা শহরটার পুরোনো ব্যাপার-স্যাপার হেঁটে ঘুরিয়ে দেখায়। অদ্ভূত ভালো লেগেছিল ওদের হেঁটে ঘুরতে। গাইডও ছিল দারুণ। আর সময়টাও ছিল অদ্ভুত ট্যুরটার।

যেখানে সব ট্যুর শুরু হয় সকাল সকাল, এই ট্যুরটা শুরু হয়েছিল পড়ন্ত বিকেলে। বিকেলের পড়ে আসা হলদে আলোতে ওরা ঘুরে ঘুরে দেখছিল সব নোনাধরা পুরোনো হাভেলি, সেখানে পৌঁছোনোর ঘিঞ্জি অলিগলি, ভেসে আসা কাবাবের ঝলসানো মাংসের সুঘ্রাণ আর ঠুমরী-গজলের সুর। সব দেখে শুনে অতনু আর কল্যাণ যেন বুঁদ হয়ে গিয়েছিল ওইরকম একটা দেড়-দুশো বছরের আগের সময়ে।


তিন


“ক্যায়সা আভি, বড়ে ভাইয়া?” কল্যাণ বাইরে আসতেই মুখার্জীদার প্রশ্ন।

মুখার্জীদা এমনি বাংলাটা খারাপ বলেন না, যদিও একটা হিন্দি টান আছে কথায়। চার পুরুষের বাস ওঁদের এই বেনারসে, তাই উত্তেজনার সময় তাড়াতাড়ি কথা বললেই হিন্দি বেরিয়ে আসে। দশাশ্বমেধ ঘাটের পাশেই বাঙালিটোলাতে ওঁদের বিশাল বাড়ি, যার ওপরতলাটা এখন ভাড়া দেওয়া হয়। এই পুরোনো শহর, তার ওপর ওরকম বাড়ি যেখানে লোহার ঘোরানো সিঁড়ি, জাফরি কাটা রেলিং, শ্বেত পাথরের টেবিল—পুরো ভিন্টেজ একটা ব্যাপার। তাই দর একটু বেশি হলেও ঘর দেখে অতনু আর কল্যাণ ফিরে যেতে পারেনি। আর ভালোও লেগে গিয়েছিল ওদের এই মুখার্জীদা লোকটাকে। পায়জামা-পাঞ্জাবির অভিজাত চেহারা, সবসময়ই একটা সুর গুনগুন করছেন আর পছন্দের মানুষ পেলেই জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন, কথায় কথায় তুলে আনছেন পুরোনো বেনারসের কথা। ভালোই জমে গিয়েছিল কল্যাণদের সঙ্গে। তাই সে রাতে অতনুকে ওই অবস্থায় পাওয়ার পর কল্যাণের আর কারুর কথা মনে হয়নি। সোজা ফোন করেছিল মুখার্জীদাকে। আর আধঘণ্টার মধ্যেই মুখার্জীদা হাজির। তারপর তো এই হাসপাতালে।

“জ্ঞান আসেনি এখনো ভালোমতো, মাঝেমাঝে কথা বলছে আর ঘুমোচ্ছে।” বলল কল্যাণ।

“তা তো হবেই। এখন শুধু ঘুমের ওষুধই চলবে বড়ে ভাইয়ার। যা অবস্থা হয়েছিল তোমার দাদার! কী করতে যে ওখানে ঢুকেছিল! এই পুরোনো শহর, কোথায় কী আছে কে জানে?”

খানিক চুপ থেকে আবার মুখার্জীদা বললেন, “ঠিক আছে, চিন্তা নেই। বেশি কিছু তো হয়নি শেষ অবধি। সুস্থ হয়ে ছাড়া পাক তোমার দাদা, দরকার হলে তোমরা আমার ওখানে আরো দু-দিন থেকে তারপর ফিরবে। ঠিক আছে, চলি তাহলে, গিয়ে আবার ওদিকে সব দেখতে হবে।”

মুখার্জীদা স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে আবার বললেন, “টাকাপয়সা আছে তো? কোনো ফিকর করবে না। কোনো দরকার পড়লেই আমাকে ফোন করবে। আর ছুটি হলে তো করবেই, আমি চলে আসব।”

বের হয়ে গেলেন মুখার্জীদা। আরো কিছু লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। অনেক লোকের সঙ্গে চেনাশোনা ওঁর। কল্যাণ একা একা দাঁড়িয়ে থাকল খানিকক্ষণ। দূর থেকে স্টেশনে ট্রেনের আওয়াজ ভেসে আসছে। আর হলুদ সোডিয়াম আলোয় দেখা যাচ্ছে কিছু পুরোনো হাভেলির মাথা। এর মধ্যের কোনো একটা থেকেই কাল রাতে কল্যাণ অতনুকে বের করে এনেছিল।


চার


“কেসটা ঠিক কী হয়েছিল বলো তো অতনুদা?” কল্যাণ জিজ্ঞেস করল অতনুকে।

অতনু তখন ট্রেনের খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। কল্যাণের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “সত্যিই রে, কেসটা যে ঠিক কী হয়েছিল তা আমিও এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। আস্তে আস্তে অনেক কিছু মনে পড়ছে দেখছি, আর পুরোটাই যেন একটা ঘোরের মধ্যে হয়েছিল।”

বাড়ি ফেরার ট্রেনে উঠে পড়েছে অতনু আর কল্যাণ। কপালটা ভালোই বলতে হবে ওদের। আজ সকালেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে অতনু। তারপর মুখার্জীদা তো নিয়ে যাবেনই ওদেরকে ওঁর ওখানে। কোনোমতে ওঁকে নিরস্ত করে কল্যাণ অতনুকে হাসপাতালেই বসিয়ে রেখে মুখার্জীদাকে নিয়ে গিয়েছিল স্টেশনে আর অদ্ভুতভাবে টিকিটও পেয়ে গিয়েছিল আজকের বিকেলের ট্রেনেই। তারপর তো তাড়াহুড়ো করে একটা টাঙ্গা নিয়ে হাসপাতাল থেকে স্টেশন এসে, সেখানে ওয়েটিং রুমে একটু ফ্রেশ হয়ে, লাঞ্চ খেয়ে সামান্য বিশ্রামের পর ট্রেনে চেপে বসেছিল ওরা।

অতনু এখনো কেমন যেন একটা তন্দ্রার মধ্যেই আছে। বাইরে গেহু-বাজরার ক্ষেত পেরিয়ে দূরের অস্তগামী সূর্যটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ও। এখন কল্যাণের কথায় ওর দিকে ঘুরে বসে বলল, “তোর মনে পড়ে আমরা যেদিন হাঁটা ট্যুরটা করেছিলাম, ওই স্টেশনের পাশ দিয়েও আমরা গিয়েছিলাম?”

কল্যাণ বলল, “হবে হয়তো। কেন বলো তো?”

“না, সেরকম কিছু নয়, কিন্তু তোর মনে আছে কি না আমাদের গাইড হাঁটতে হাঁটতে বলেছিল যে সমস্ত গানবাজনা করা লোকেরা নবাবের সঙ্গে লক্ষ্ণৌ থেকে কলকাতা যেতে পারেনি, তারা পরে বেনারসে এ জায়গাতে থাকতে শুরু করে।” অতনু একদৃষ্টে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলছে। “জানিস, সেদিন থেকেই জায়গাটা আমাকে খুব টানতে শুরু করেছিল। শুধু মনে হত এ জায়গাটা একটু ঘোরা দরকার, যতই হোক, নবাবের আমলের গানবাজনার লোকেদের ঘাঁটি এটি।”

কল্যাণ অধৈর্য হয়ে বলল, “আরে সেদিন কী হল বলো না!”

অতনু একটু হেসে কল্যাণের দিকে তাকিয়ে বলল, “ধীরে রজনী, ধীরে।” তারপর গায়ের চাদরটাকে ভালোমতো জড়িয়ে পা-টা টানটান করে দিয়ে একটু আয়েশ করে বসে বলল, “শোন তাহলে। সেদিন তো ট্রেন ধরার জন্য আমরা অনেকটা আগেই স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। তুই মোবাইল খোঁচাচ্ছিস দেখে আমি তোকে লাগেজগুলো দেখতে বলে ক্যামেরার ব্যাগটা নিয়ে বেরোলাম।”

কল্যাণ বলল, “সেই যে তুমি বেরোলে, আর তো ফিরলে না।”


পাঁচ


ঝমঝম শব্দে দুরন্ত গতিতে রাতের তুফান মেল ছুটে চলেছে। ঠান্ডা হাওয়া আসছে বলে জানালার কাচ নামানো। অতনু এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। সব মনে করে করে বলতে শুরু করেছে কল্যাণকে। সেদিন ওদের ট্রেন রাত আটটায় বেনারস স্টেশন থেকে থাকলেও স্টেশনে ওরা পৌঁছে গিয়েছিল অনেক আগেই। আর জায়গা নিয়েছিল ওয়েটিং রুমে।

অতনু কল্যাণকে বলল, “জানিস, স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখলাম সন্ধে হয়ে গিয়েছে। আলো জ্বলতে শুরু করেছে চারদিকের দোকানগুলোতে। ভাবলাম ট্রেনের টাইমের তো অনেক দেরি আছে, আর লেটও আছে ট্রেনটা ঘণ্টা খানেক। সেই বাড়িটা তো এখান থেকে হাঁটা পথে মাত্র মিনিট পাঁচেক, দেখি কিছু যদি দেখা যায়। সত্যি কথা বলতে, অদ্ভুতভাবে ওই জায়গাটা আমাকে প্রচণ্ডরকম টানছিল। এমনকি হোটেল থেকে বের হবার আগে ভেবেছিলাম যদি যাওয়া যায় ওই জায়গাতে।”

আর সত্যি হলও তাই। এক অমোঘ আকর্ষণ অতনুকে নিয়ে গেল ঠিক সে জায়গাতেই। জায়গাটায় পৌঁছে অতনু দেখল, সেখানে তেমন লোকজন বা দোকানপাট কিছুই নেই। বড়ো হাভেলিটার প্রাচীর ভেঙে তার সামনে অন্ধকারে একটা বটগাছ। তার নীচে একটা ছোট্ট দোকানে একজন বয়স্ক লোক বসে একমনে একটা পুরোনো হারমোনিয়াম ঠিক করে যাচ্ছেন। তার সামনে টিমটিম করে একটা লন্ঠন জ্বলছে।

শীত বেশ ভালোই পড়ে গিয়েছে আপাতত। তাই লোকটার গায়ে মাথায় চাদর জড়ানো। পেছনের হাভেলি থেকে ভেসে আসছে ঠুমরীর সুর। দোকানটার সামনে একটা টুল রাখা আছে। অতনু গিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, “হাভেলি যানেকা রাস্তা কিধার হ্যায়?”

লোকটা কিছু বুঝল বা শুনল কি না কে জানে, অতনুর মুখের দিকে তাকিয়ে ওকে টুলটায় বসতে ইশারা করল। অতনু বসল। বৃদ্ধ একমনে নিজের কাজ করে চলেছে। অতনুর কানে ভেসে আসছে পাগল করা ঠুমরীর সুর। কতক্ষণ যে এভাবে কেটে গিয়েছে কে জানে। অতনু এবারে অধৈর্য হয়ে লোকটাকে বলল, “ইয়ে ঠুমরীকা আওয়াজ কাঁহাসে আ রাহা হ্যায়? পিছেকা হাভেলি সে? মুঝে যানা হ্যায় উধার। আপকো পাতা হ্যায় রাস্তা?”

লোকটা এবারে খানিকক্ষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল অতনুর দিকে। তারপর কেমন একটা ঘরঘরে গলায় ওর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “ক্যায়া, ইয়ে ঠুমরী? কুছ মালুম হ্যায় আপকো ইয়ে সব?”

অতনু নিজে গান না করলেও সে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একজন সমঝদার শ্রোতা। বিশেষত লক্ষ্ণৌ-এলাহাবাদ আর বারানসি ঘরানার। এরকম তাচ্ছিল্যের যোগ্য জবাব দিতে ও বলে উঠল, “ইয়ে অবধি ঘরানেকা পিলু রাগকা ঠুমরী হ্যায় অউর যো গা রাহা হ্যায় ইসমে বানারসকা বলবন্তভি মিলা হুয়া হ্যায়।”

এটুকু কথাতেই বৃদ্ধের যে কী হল কে জানে, ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ অতনুর দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর হাতের কাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কাঁহাসে হ্যায় আপ জনাব?”

অতনু জানাল সে বাঙালি। লোকটা এবারে অতনুর কাছে এসে ওর হাত ধরে বলল, “গলতি হো গ্যায়ে হামসে বাবুজি। মেহেরবানি করকে অন্দর আইয়ে।”


ছয়


“জানিস, কীভাবে যে দোকানটার ভেতর দিয়ে হাভেলিতে পৌঁছে গিয়েছিলাম তা আমি এখনো বলে উঠতে পারব না। কিন্তু গেলাম। মাঝখানে বিশাল বড়ো উঠোন আর তার চারদিক জুড়ে একটা বিশাল বড়ো দোতলা বাড়ি। ফুল-কাগজ দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজানো, তবে আলো একটু কমই। আর সেজন্যই মনে হয় দেখতে আরো বেশি সুন্দর লাগছিল। বারান্দা সিঁড়িতে প্রদীপ বসানো। ঘরগুলির দরজা খোলা, তার ভেতর থেকে মাঝেমাঝেই ভেসে আসছে মেয়েদের কথা, গান আর হাসির আওয়াজ। কখনো এক-দু’জন মেয়ে দৌড়ে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাচ্ছে। তাদের মুখ ঠিক দেখা না গেলেও তাদের ঝলমলে পোশাকআশাকে মনে হচ্ছে তারা যেন অন্য জগতের। জানিস, আমি যেন তখন চেনা দুনিয়ার বাইরে অন্য কোথাও চলে এসেছি। নীচ থেকে দোতলায় উঠে গিয়েছে ঘোরানো সিঁড়ি। আর দোতলারই একটা ঘর থেকে ভেসে আসছে সেই পাগল করা ঠুমরীর সুর।”

“তুমি তখন নীচে দাঁড়িয়ে?” কল্যাণ জিজ্ঞেস করল অতনুকে।

“হ্যাঁ।”

“আর যে লোকটা তোমাকে নিয়ে এল?”

“আর বলিস না। লোকটাকে হঠাৎ দেখতে পাচ্ছিলাম না। কোথায় যে চলে গিয়েছিল! তারপর যখন এল, দেখি পুরোনো পোশাক পালটে ওর গায়ে একটা ঝকমকে পোশাক। একহাতে একটা আতরদান আর আরেক হাতে একটা জলের পাত্র নিয়ে এসেছে। আমার হাতে জলের পাত্রটা দিয়ে পাশে একটা জায়গা ইশারা করে দেখাল মুখ-হাত ধুয়ে নেবার জন্য। জানিস, মুখ-হাত ধুলাম যে জলটা দিয়ে তার মধ্যে কী সুন্দর যে একটা গন্ধ! দেখি জলটার মধ্যে গোলাপের পাপড়িও দেওয়া আছে। একটু খেলামও, তেষ্টা পাচ্ছিল। তারপর লোকটা আমার হাতে একটা ঝলমলে লম্বা আলোয়ানমতো তুলে দিয়ে বলল পরে নিতে। আমি বললাম, ‘নহি চাহিয়ে।’ লোকটা একদৃষ্টে খানিকক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সেই ঘরঘরে গলায় বলল, ‘ক্যায়া বাবুজী, ইয়ে উস জামানেকা বাত হ্যায়।’ পরে নিলাম আর বেশ ভালোও লাগছিল ওটা পরে।”

“তোমার তখন আমার কথা, ট্রেনের কথা কিছু মনে পড়েনি?” কল্যাণ বলল।

“না রে, কিছুই মনে পড়েনি।” অতনু মুচকি হেসে বলল।

তারপর সিঁড়ি দিয়ে লোকটা অতনুকে নিয়ে গেল দোতলায়। ওকে দেখে সেলামের মতো করে সামনে ঝুঁকে একজন বলল, “অন্দর আইয়ে বাবুজী, তশরিফ লাইয়ে।”

লোকটা অতনুকে নিয়ে একটা ঘরে ঢুকল। সেখানে মাঝখান ফাঁকা একটা ঘরের চারদিক জুড়ে সুন্দর সাদা ফরাস পাতা। আর মাঝখানে বীণা, সেতার, তবলা—সব রাখা আছে।

“জানিস কল্যাণ,” অতনু বলল, “লোকটা সেখানে আমাকে বসার ইশারা করে চলে গেল ভেতরে। শুনতে পেলাম জোরে কাউকে বলছে, ‘আম্মিজী, মেহমান হ্যায়, বঙ্গাল সে।’ ঘরটা ফুল প্রদীপ দিয়ে কী সুন্দর করে সাজানো, অদ্ভুত একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। চার কোনায় চারটা ঢাউস বাতিদান জ্বলছে। দু-তিনজন আগে থেকেই সেই ফরাসে বসেছিল। আমি বসে তাদের একজনকে নীচু গলায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক্যায়া হোগা আভি?’ সেও নীচু গলায় কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘খুশনসিব হ্যায় আপ, আজ নয়না বাই গায়েঙ্গে।”


সাত


“আর তুই কী করছিলি এতক্ষণ ধরে বল তো?” এবারে অতনু জিজ্ঞেস করল কল্যাণকে।

“আরে তুমি তো আসছই না। এদিকে ট্রেনের টাইম হয়ে গেল। ফোন করে যাচ্ছি তোমাকে, নট রিচেবল বলছে। ট্রেন অ্যানাউন্স হল, আমি লাগেজ নিয়ে প্ল্যাটফর্মে চলে গেলাম এই ভেবে যে তুমি হয়তো কোথাও আটকে গিয়েছ, সোজা প্ল্যাটফর্মেই আসবে। ট্রেন এল। কোচ খুঁজে নিয়ে তার সামনে গিয়ে বসলাম। চারদিক দেখছি আর ভাবছি এই মনে হয় তুমি দৌড়তে দৌড়তে এলে। কিন্তু তুমি এলে না, একটা সময় ট্রেন ছেড়ে চলে গেল। এবারে আমার ভয় লাগতে শুরু করল। আর.পি.এফ-কে বলতেই ওরা হেল্প করল। ডায়েরি নিল। ওদের কাছেই লাগেজ জমা রেখে তোমাকে খুঁজতে বেরোলাম। সঙ্গে দু’জন পুলিশ দিল থানা থেকে।”

ওদিকে তখন গান শুরু হয়ে গিয়েছে। অপূর্ব সুরমাধুরীতে ভেসে যাচ্ছে জগৎসংসার। নয়না বাই গাইছেন সামনে বসে। অল্প আলোতে স্পষ্ট দেখা না গেলেও বোঝা যাচ্ছে কী আশ্চর্য তন্ময় হয়ে তিনি গাইছেন। যেন স্বয়ং ঈশ্বর সেই মুহূর্তে তাঁকে ঘিরে আছেন।

একটা তানপুরা নিয়ে গাইছিলেন। খানিকক্ষণ ধরে গেয়ে একটা রাগ শেষ করে তানপুরাটা নামিয়ে রেখে সকলের দিকে হাতজোড় করে বললেন, “আজ রহনে দিজিয়ে, ফির কভি।”

কেউ একটা কথাও না বলে উঠে গেল। অতনুও বেরোচ্ছিল। নয়না বাইয়ের সামনে গিয়ে নমস্কার জানাতেই উনি নীচু গলায় ওকে বললেন, “আপ থোড়া বৈঠিয়ে।”

দুটি বাচ্চামতো মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নয়না বাই তাদের দিকে ঘুরে বললেন, “শরবত নাস্তা লাও মেহমানকে লিয়ে।”

“আমি না করিনি।” অতনু কল্যাণকে বলল। “সে শরবতের যা স্বাদ ছিল, একদম সাক্ষাৎ অমৃতসুধা যেন, স্বর্গীয়, অতুলনীয়।”

কল্যাণ বিরক্ত হয়ে বলল, “আরে খাওয়ার গল্প ছেড়ে তারপর কী হল বলো না!”

“নয়না বাই এবারে আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘ক্যায়সে হ্যায় আভি সব?’

“আমি না বুঝেই বললাম, ‘ব্যস, ঠিক হ্যায়।’

“নয়না বাই কেমন যেন উদাস হয়ে গেলেন। আপনমনেই বলতে লাগলেন, ‘সব কুছ ছোড়কে নবাব তো চলে গ্যায়ে লক্ষ্ণৌ সে কলকাত্তা। লেকিন হম নেহি গ্যায়ে। বাদমে চলে আয়ে লক্ষ্ণৌ সে ইধার বেনারস মে। ক্যায়া জামানা থা ও। আভি কুছ আচ্ছা নহি লাগতা। ইস গানে কে লিয়ে সব কুছ ছোড়ে। ইস লিয়ে গাতে হ্যায় কভি কভি।’

“জানিস কল্যাণ, আমার তখন মনে হচ্ছে ইনিই কি তাহলে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের সময়কার বিখ্যাত ঠুমরী গায়িকা নয়না বাই, যিনি নিজে ঠুমরী গাইবেন বলে রাজপরিবার অবধি ছেড়েছিলেন? কিন্তু আমি এখানে এলাম কী করে? ভাবছি আর ইতিমধ্যেই শরবত আর নাস্তা চলে এসেছে। চিন্তা করছি, খাচ্ছি আর ওদিকে সামনে বসে নয়না বাই বলে চলেছেন, ‘নবাব হরদিন আতে থে গানা শুননে মেরে পাস। আজ হীরা তো কাল জহরত মিলতি থি উনসে। সব চলে গ্যায়ে।’ চোখের কোনায় চিকচিক করছে জল। ‘আভি কভি কভি মন করতা হ্যায় কি কলকাত্তা যাকে উনে গানা সুনাকে আয়ে। লেকিন যায়ে ক্যায়সে।’

“জানিস, আমার মুখ দিয়ে কীভাবে যেন বেরিয়ে গেল কথাটা, ‘তো চলিয়ে মেরে সাথ।’

“ঝলক দিয়ে উঠল নয়না বাইয়ের চোখ। বললেন, ‘লে যায়েঙ্গে আপ হামে?’

“বললাম, ‘জরুর! কিউ নেহি?’

“কী যেন ভাবলেন উনি এক মুহূর্ত। তারপর হাঁক দিয়ে ডাকলেন, “কিশোরী!’

“দেখলাম সেই প্রথমের লোকটি এল। তাকে নয়না বাই বললেন, ‘ম্যায় যায়ুঙ্গি ইনকে সাথ কলকাত্তা। তৈয়ারি করো। অউর তব তক ইনে থোড়া আরাম কি বন্দোবস্ত করদো।’

“দেখলাম কিশোরী যেন কেমন ইতস্তত করছে। একবার বলল, “জী মালকিন।’ তারপর আবার ঘুরে অস্ফুটে বলল, ‘লেকিন...’

“নয়না বাইয়ের চোখ ঝলক দিয়ে উঠল। প্রায় চিৎকার করে বললেন, ‘ক্যায়া লেকিন? বোলা না যাও আভি, তৈয়ারি করো!’

“এবারে কিশোরী আমাকে বলল, ‘আইয়ে বাবুজী।’ উঠে এলাম।”


আট


আর অদ্ভুতভাবে তখনই অতনুর চোখের পাতা যেন ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছিল। তার মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ও শুনল ঠুমরী গান হচ্ছে ঘরে ঘরে, চারদিকে খুব সুন্দর আতর আর ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। কিশোরী ওকে নিয়ে এসে একটা ফাঁকা ঘরের দরজা খুলে বিছানা দেখিয়ে বলল, “আপ ইধার থোড়া আরাম কর লিজিয়ে।”

ঘরের কোণে একটা মোমবাতি জ্বলছে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসা অতনু যখন এগিয়ে যাচ্ছে বিছানার দিকে, শুনল কিশোরী বলছে, “মুঝে তো সমঝ মে নেহি আ রাহা হ্যায় কি ক্যায়সে ও যায়েঙ্গে আপকে সাথ।”

অতনু বললো, “তারপর তো বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আর কিছু আমার মনে নেই। এবারে তুই বল।”

“আরে আমরা তো তিনজন এদিক ওদিক দেখতে দেখতে সামনের রাস্তাটায় পৌঁছে দেখি বড়ো বাড়িটার সামনের গাছটার নিচে তোমার ক্যামেরার ব্যাগটা রাখা। আমার সঙ্গের লোকদুটো দেখি বলে উঠল, ‘ফির ইধার।’ যাই হোক, ওদের কাছে টর্চ ছিল, একটা ভাঙাচোরা দোকানের মতো জায়গা দিয়ে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। কী অসম্ভব অন্ধকার জায়গাটা! দেখি একটা বারান্দার পাশে খোলা ঘরের ভেতরে তুমি অঘোরে ঘুমোচ্ছ। কেমন ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে তোমার হাত-পা। আমি যদিও ভেবেছিলাম তুমি ঘুমোচ্ছ, কিন্তু পুলিশের লোকেরা বলল যে তোমার জ্ঞান নেই, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিতে হবে। ওরা দেখে বলল তোমার কখনো পালস দিচ্ছে, কখনো দিচ্ছে না। তো ওইভাবে তোমাকে ওখান থেকে বাইরে নিয়ে এলাম। আর.পি.এফ-এর অ্যাম্বুলেন্স এল, তোমাকে নিয়ে এলাম হাসপাতালে। ফোন করলাম মুখার্জীদাকে। আর তোমার তো জ্ঞান আসতে প্রায় বারো ঘণ্টা লাগল।”

ট্রেনটা তখন কোন একটা স্টেশনে দাঁড়ানো। চা চা শব্দে জানালা তুলে কল্যাণ দেখল বাইরে ভোর হচ্ছে। বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে ওরা। সারা রাত্রি কথা বলবার পর অতনু তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে।

___


অঙ্কনশিল্পীঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

No comments:

Post a Comment