ছোটো গল্পঃ বুদ্ধির দাম - সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী


তোমরা জানো তো, মধ্য ইউরোপের একটি দেশ আছে যার নাম পোল্যান্ড। সেই অঞ্চল পশ্চিমি পোলান উপজাতিদের আদি বাসভূমি। তাদের নামের সূত্রেই দেশের এই নাম। একদিকে বাল্টিক সাগর, অন্যদিকে রাশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড। তার মাঝে সে দেশ। প্রাচীন উপজাতীয় ধর্ম থেকে ধীরে ধীরে তারা ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী হয়ে ওঠে। ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে পোল্যান্ডে রাজতন্ত্রের সূচনা হয়। সেই যুগেরই এক গল্প বলি এবার।

অনেক কাল আগের একদিন। বেলা পড়ে আসছিল। দীপ্তিমান সূর্য ক্রমেই সোনালি জৌলুস হারিয়ে শ্রান্তিতে ঢলে পড়ছিল দিগন্ত-ছোঁয়া পাহাড়ের কোলে। বৃদ্ধ ম্যাথিউজের তবুও যেন ক্লান্তি নেই। নগরের এক প্রান্তে আপন ছোট্ট কুঁড়েটির সামনে এক ফালি জমিতে কাজ করেই চলেছিল সে। মাজা টনটন করছে। একবার কোমরে হাত দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করল সে। এখন বয়স হয়েছে। আগের মতো টানটান ঋজু শরীর আর নেই। তবুও সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি। চোখেমুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে ওঠে তার। এবার ঘরে ফিরতেই হবে। তখনই দূরের পথের দিকে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়াল ম্যাথিউজ। দিগন্তে ও কি ধুলোর ঝড় উঠল? মেঘের মতো ছেয়ে আসছে ওটা কী? পরক্ষণেই বোঝা যায়, মেঘ নয়, ঝড় নয়, কয়েকজন অশ্বারোহী। শহরের পানে ছুটে আসছে তারা। দস্যু নয় তো? নিমেষের মধ্যে তাদের অগ্রভাগের তেজি ঘোড়ার পিঠে আসীন দলপতিকে দেখে চমকে উঠল ম্যাথিউজ। আরে, এ তো আমাদের রাজামশাই স্বয়ং! উজ্জ্বল সোনার মুকুট, ঝলমলে রঙিন দুর্মূল্য পোশাক আর নায়কোচিত সুঠাম চেহারা দেখে তাঁকে যে কেউই অবশ্য দেশের অধিপতি বলে চিনতে পারবে। তাঁর উষ্ণীষে গোধূলির তরল কাঞ্চনরেখা পিছলে যাচ্ছিল। কোমরবন্ধে রাখা তরবারির খাপে বসানো মণিমাণিক্য ঝিকিয়ে উঠছিল দৃপ্ত ভঙ্গিমায়।

ম্যাথিউজের অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল। রাজামশাই সমেত গোটা দলটা কিনা ঘোড়া থামিয়ে তারই কুঁড়ের সামনে এসে দাঁড়াল! সেই দল থেকে রাজা ছাড়া আরও তিনজন এগিয়ে এল সামনে। সবাই সশস্ত্র। অজান্তে আবার কোনও অপরাধ করে ফেলিনি তো! মনটা কু গেয়ে ওঠে। তড়িঘড়ি হাঁটু মুড়ে আভূমি নত হয় রাজার সামনে। আবার ভাবে, আমি একা বুড়ো মানুষ, কারও সাতে-পাঁচেও থাকি না। সময়ে রাজকরও জমা করি রাজকর্মচারীদের কাছে, আমার কী দোষ থাকতে পারে আর? রাজামশাই খামখেয়ালি, নিষ্ঠুর, অত্যাচারী–এমন দুর্নামও তো কই শুনিনি। তবে? মাথা নিচু করে সাত-পাঁচ ভাবতে-ভাবতেই ম্যাথিউজের কানে আসে রাজার জলদগম্ভীর কণ্ঠ, “উঠে দাঁড়াও, প্রবীণ বন্ধু।”

বন্ধু? রাজা তাঁকে বন্ধু সম্বোধন করছেন? সামান্য এক দরিদ্র প্রজাকে! ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে। বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। রাজা ফের বলে ওঠেন, “এবার আমাকে বলো, এই যে এত দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে চলেছ, তুমি তো একটু সকাল সকাল উঠে পড়তে পারতে হে। তাহলে এতক্ষণে তোমার কাজ-টাজ সারা হয়ে যেত।”

ম্যাথিউজ এখন ধাতস্থ হয়েছে। স্মিত হেসে সে জবাব দেয়, “ভোরেই উঠেছিলাম আজ্ঞে, জাহাঁপনা। কিন্তু কী করি বলুন, ঈশ্বর আমায় জলদি কাজ সারার অনুমতি দিলেন না যে।”

রাজা শুনে আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন। তারপর ফের শুধালেন, “ওই প্রাচীন পাহাড়চূড়ায় তুষারশুভ্র থোকা থোকা সাদা ফুল কতদিন ধরে ফুটে আছে?”

ম্যাথিউজ হেসে বলল, “তা প্রায় চল্লিশ বছর কেটে গেল মহারাজ।”

রাজা এমনভাবে মাথা নাড়লেন যেন বুড়োর প্রতিটা শব্দ তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারছেন।

“আচ্ছা এবার বলো, ওই পাহাড় থেকে উচ্ছ্বল তরঙ্গিণী ঝরনা কবে থেকে এমন ঝরঝরিয়ে বয়ে চলেছে?”

“ঝরনা? তা মহারাজ, অন্তত পনেরো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে ওই পাহাড় বেয়ে অবারিত জলধারা বয়ে চলেছে তো চলেছেই।”

“বেশ, বেশ। বুঝলাম বন্ধু। এবার আর একটা মাত্র প্রশ্ন করি। যখন পুবদিক থেকে তিনটে ধেড়ে রাজহাঁস আসবে, তুমি তাদের দিব্যি ঠকিয়ে নিতে পারবে তো?”

বৃদ্ধ চাষি রাজার চোখে তার চোখ রেখে স্থিরভাবে তাকিয়ে বলল, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মহামান্য, তাদের আচ্ছা করে ঘোল খাওয়ানোর জন্য এই বান্দা প্রস্তুত থাকবে।”

রাজা স্মিত হেসে প্রত্যুত্তরে নিজের কোমর থেকে ঝোলানো অপূর্ব কারুকাজ করা সোনার কটিবন্ধটি খুলে ম্যাথিউজকে উপহার দিলেন। “তোমার এমন সুন্দর জবাবের জন্য অভিনন্দন। আশা করি তোমার প্রতি ঈশ্বরের অপার করুণা বর্ষিত হবে।”

এই কথা বলে রাজা ও তাঁর তিন অনুচর অশ্বারোহী ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে অদূরে অপেক্ষমান বাকি দলটিকে সঙ্গে নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে রওনা দিলেন। ফের ধুলোর ঝড় উঠে মিলিয়ে যেতে লাগল দিগন্তের পানে।


সেদিন সন্ধ্যায় রাজামশাই তাঁর সেই তিন অনুচরকে প্রাসাদে তলব করলেন। তিনজন তড়িঘড়ি এসে হাজির হল। সবার দিকে একবার করে চোখ বুলিয়ে রাজা বললেন, “তোমরা হলে রাজ উপদেষ্টা। তোমাদের সঙ্গে রাজকার্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। আজ তোমরা আমার সঙ্গে ওই বৃদ্ধের কুটিরেও গেছিলে। আমাদের মধ্যে যাবতীয় কথোপকথন তোমরাই একমাত্র স্বকর্ণে শুনেছ। এবার আমি তোমাদের একটা কাজ দেব। আমি ওই বৃদ্ধকে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত যা যা প্রশ্ন করেছিলাম, আর সে তার যা জবাব দিয়েছিল, সবটুকুর অর্থ বিশ্লেষণ করে শোনাও দেখি, কেমন পারো। মনে রাখবে, প্রতিটা প্রশ্ন আর প্রতিটা উত্তরের অর্থ বলা চাই।”

এই রাজা মাঝেমাঝেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে বেরতেন। আরব্য রজনীর গল্পের সেই বিখ্যাত হারুণ অল রশিদের মতো ছদ্মবেশে না হলেও, প্রজাদের সুখদুঃখের খবর রাখার পাশাপাশি তিনি আপন রাজত্বের জ্ঞানী ও গুণী মানুষদের সন্ধান করতেন। একথা সর্বজনবিদিত, যে দেশে জ্ঞানীর কদর আছে, সেখানে প্রজাদের সুখ-সমৃদ্ধিও বেশি। জ্ঞান মানে কিন্তু শুধুই পুথিগতবিদ্যা নয়। সমাজে চলার পথে মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশ দেয় যা, মানুষের কাজে লাগে যা, সেই হল প্রকৃত জ্ঞান।

রাজার নির্দেশ শুনে তিনজন পারিষদ তো শুনেই মহা উৎসাহে ভাবতে আরম্ভ করে দিল। এইজন্যই তাহলে কথাগুলো অমন হেঁয়ালির মতো লাগছিল! সবক’টা আসলে একেকটা ধাঁধা! কুছ পরোয়া নেই। আমরা রাজার খাস পারিষদ। আমরা ঠিক সমাধান বের করতে পারব। একবার ভাবল, দু’বার ভাবল, তিনবার ভাবল। তবুও কিছুই মিলল না। তাদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে দেখে মুচকি হেসে রাজা বললেন, “আচ্ছা আচ্ছা, এখনই এত বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। আমি তিরিশ দিন সময় দিলাম। তার মধ্যে গোটা কথোপকথনের অর্থ ব্যাখ্যা করা চাই। কিন্তু মনে রেখো, তার মধ্যে যদি উপযুক্ত জবাব না পাই, জেনে রাখবে তোমাদের রাজ পারিষদ হওয়ার দিন ফুরিয়েছে। এই দেশে তোমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান অনুচর খুঁজে নিতে আমার এক মুহূর্ত সময় লাগবে না। এখন যাও।”

অনুচরদের তো মাথায় হাত। এ কী ফতোয়া! আবার ভাবে, যাক, তিরিশ দিন তো কম নয়। তার মধ্যে কি আর উত্তর খুঁজে পাব না ধাঁধাগুলোর?

দিনের পর দিন কাটে। রাতের পর রাত। তিনজন সমানে নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে চলে। স্মৃতি থেকে খাতায় লিখে রাখা প্রশ্ন আর উত্তরগুলোর প্রতি বারবার মনোযোগী হয়। কিন্তু সব চেষ্টাই বৃথা। সমাধান তো দুরস্থান, তার কাছাকাছি পৌঁছনোও হয়ে ওঠে না কারও। একটা সূত্রও মেলে না। মাথার উপর চাকরি হারানোর ভয়, এদিকে তিরিশ দিন প্রায় অতিক্রান্ত। অবশেষে তারা যুক্তি করে সিদ্ধান্ত নিল যে, মাত্র একজনই আছে যে তাদের এই বিষয়ে সাহায্য করতে পারে। সে হল বৃদ্ধ ম্যাথিউজ স্বয়ং। যদিও ব্যপারটা ফাঁকিবাজি হচ্ছে, তবুও উপায়ান্তর না দেখে তারা ম্যাথিউজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার বাড়ির দিকে চুপিচুপি রওনা হল।

রাজার অনুচরদের দেখে বুড়ো তো সসম্মানে সমাদরে তাদের অভ্যর্থনা করল। কিন্তু তিনজনের চিন্তান্বিত মুখ দেখে বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনাদের দেখে সবিশেষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছে। কী হেতু এই গরিবের কুটিরে আগমন, অনুগ্রহ করে জানান মাননীয়রা।”

অল্প গলা খাঁকারি দিয়ে প্রথমজন বলেন, “ইয়ে মানে, ভাই ম্যাথিউজ, আমরা তোমার কাছে এসেছি একটা সাহায্য চাইতে।”

দ্বিতীয়জন বলে, “আসলে সেদিন তোমার আর মহারাজের মধ্যে যে কয়েকটা কথাবার্তা হয়েছিল না, সেগুলো তোমার মনে আছে আশা করি? তাই সেগুলো, মানে...”

প্রথম দু’জন আমতা আমতা করছে দেখে তৃতীয়জন তড়িঘড়ি বলে ওঠে, “তাই সেই প্রশ্ন আর উত্তরগুলোর আসল মানে কী, যদি একটু বলে দাও, খুব উপকার হয় ভাই। নাহলে রাজার কাছে আমাদের আর মান থাকে না।”

এবার বাকি দু’জনও সমস্বরে বলতে থাকে, “হ্যাঁ ভাই, বলে দাও না!”

শুনেই ম্যাথিউজের ভ্রূ দুটো কোঁচকাল। গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু। তা তো সম্ভব নয় মান্যবর। কথা তো যা হওয়ার হয়েছে রাজামশাইয়ের সঙ্গে। আপনাদের কাছে তার অর্থ কী করে বলি?”

প্রথমজন গর্জে ওঠে, “তার মানে? আমরা কে জানো না? আমরা ইচ্ছে করলে পেয়াদা ডেকে তোমার এই জীর্ণ কুটির ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারি।”

দ্বিতীয়জন সুর মিলিয়ে বলে, “তোমার এই সাধের বাগানে ঘোড়া ছুটিয়ে সব ফসল তছনছ করে দিতে পারি।”

তৃতীয়জন হিসহিসিয়ে বলে, “চাইলে তোমার মুণ্ডুটাও কচাৎ করে কেটে নিতে পারি।”

ম্যাথিউজ শান্ত অথচ দৃঢ়স্বরে বলে, “তা পারেন আজ্ঞে। কিন্তু তাতে কি আর আপনারা উত্তরগুলো জানতে পারবেন?”

একথা শুনে তিনজনই থতমত খেয়ে গেল। এবার একটু নরম গলায় তারা বলে, “আহা আহা, আমরা কি আর সত্যি অমন করতে পারি নাকি? বুঝতেই তো পারছ ভাই, বেকায়দায় পড়েছি বলেই তোমার কাছে আসতে হয়েছে। মাথার ঠিক নেই, কী বলতে কী বলে ফেলেছি। ও-কথায় কিছু মনে করো না আবার। তুমি ভাই দয়া করে বলে দাও না।”

ম্যাথিউজ কৌতুকভরা মুখে বলে, “গরিব লোকের দয়ামায়া দেখানোর ক্ষমতাও কম হুজুর। নিজেরই অবস্থা দেখে দয়া হয় মাঝেমাঝে, বাড়িঘরের হালত তো দেখছেন। আমি নিরুপায়।”

তিনজন এবার বুড়োর কথার ইঙ্গিতটা ধরতে পারে। পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ট্যাঁক থেকে মোহরের ঝুলি বের করে প্রত্যেকে একটা করে সোনার টাকা বের করে ম্যাথিউজের সামনে টেবিলে রাখে। বুড়োর মুখের হাসি একটু চওড়া হয়। মুখে বলে, “এইবার আপনাদের অবস্থা দেখে আমার একটু একটু মায়া হচ্ছে।”

প্রথম অনুচর আগ্রহভরে শুধায়, “এবার তাহলে বলো!”

ম্যাথিউজ নির্বিকারভাবে বলে, “আচ্ছা, এই সামান্য কথার মানে জেনে আপনাদের কী এমন লাভ হবে বলুন তো?”

দ্বিতীয়জন উত্তেজিত হয়ে বলে, “আরে, বুঝতে পারছ না, আমাদের চাকরি চলে যাবে! পরিবার নিয়ে না খেতে পেয়ে পথে বসতে হবে যদি মহারাজকে কালকের মধ্যে এই কথার হেঁয়ালির সমাধান না বাতলে দিতে পারি।”

ম্যাথিউজ বলল, “অ! এইবার বুঝলাম। তাহলে তো ভারি মুশকিল বলতে হবে। কিন্তু...”

“কিন্তু কী?”

“ভাবছিলাম, আপনাদের মতো তিনজন গণ্যমান্য মানুষের সরকারি চাকরি রক্ষার দাম মোটে এই তিনটে মোহর?”

আর বলতে হয় না। এবার তিনজনই তাদের ঝুলি উপুড় করে শ’খানেক করে মোহর ঢেলে দেয় ম্যাথিউজের সামনে। ছোট্ট টেবিল উপচে পড়ে তাতে। ম্যাথিউজ বিনা বাক্যব্যয়ে সব মোহর সযত্নে কুড়িয়ে নিয়ে ঘরের কোণে রাখা একটা বস্তার মধ্যে পুরে তার মুখ বন্ধ করে। তারপর তিনজনের সামনে এসে ধীরেসুস্থে বসে মুখ খুলল, “রাজামশাই আমাকে প্রথম জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই যে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ আমি কাজ করি, আমি তো একটু সকাল সকাল উঠে পড়লেই দ্রুত সব কাজ সম্পন্ন করতে পারতাম। এর আসল মানে, আমি কেন বিবাহ করিনি বা আমার ছেলেপুলে নেই কেন। আজ তারা থাকলে তো আমায় ক্ষেতে একা কাজ করতে হত না। বুড়ো হওয়ার আগেই সব পরিশ্রমের কাজকর্ম সেরে আগেই আমি আরামের জীবন কাটাতে পারতাম। আমি তখন বলেছিলাম, আমি ভোরেই উঠেছিলাম, কিন্তু ঈশ্বর আমায় জলদি কাজ সারার অনুমতি দেননি। অর্থাৎ আমার পরিবার, সন্তানাদি সবই ছিল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তারা সবাই অনেক অল্পবয়সে আমার আগেই পরপারে চলে গেছে।

“তারপর দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল ওই প্রাচীন পাহাড়চূড়ায় তুষারশুভ্র থোকা থোকা সাদা ফুল কতদিন ধরে ফুটে আছে? তার মানে, আমার মাথার চুল পেকেছে কদ্দিন আগে? তো, আমি যা সত্যি তাই বলেছিলাম। প্রায় চল্লিশ বছর আগে থেকেই আমার চুল পাকতে শুরু করেছিল।

“এইবার তিন নম্বর প্রশ্ন। মনে আছে তো কী বলেছিলেন মহারাজ? ওই পাহাড় থেকে উচ্ছ্বল তরঙ্গিণী ঝরনা কবে থেকে এমন ঝরঝরিয়ে বয়ে চলেছে? অর্থাৎ আমার জীবনসঙ্গিনী, আমার স্ত্রী মারা গেছেন কবে? কবে থেকে তাঁর শোকে কাতর হয়ে আমার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইছে? আমি বলেছিলাম, পনেরো বছর। এই উত্তরও বুঝতে পারলেন আশা করি? নিন, সবই বললাম আপনাদের।” এইটুকু একটানা বলে ম্যাথিউজ চুপ করল।

তিন হতবাক শ্রোতার হাঁ করা অবাক মুখের পানে তাকিয়ে তার ভারি আমোদ হল। সে বুঝল, ধাঁধার ব্যাখ্যার ঠেলা হজম করতে গিয়ে বেচারারা শেষ আরেকটা প্রশ্ন যে বাকি রয়ে গেছে, সেটা খেয়ালই করেনি। কারণ, ততক্ষণে তারা আসন থেকে উঠে দরজার দিকে পা বাড়াতে উদ্যত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে নিজে থেকেই বলে উঠল ম্যাথিউজ, “আর, শেষে মহারাজ আরেকটা প্রশ্ন করেছিলেন অবশ্য।”

তিনজন ঘুরে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে। চোখেমুখে জিজ্ঞাসা। বুড়ো একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলল, “যখন পুবদিক থেকে তিনটে ধেড়ে রাজহাঁস আসবে, আমি তাদের ঠকাতে পারব কি না জানতে চেয়েছিলেন রাজামশাই।” একটু থেমে সে ফের বলে, “সেই তিনটি রাজহাঁস আর কেউ নন, আপনারাই মান্যবর।”

স্তম্ভিত, লজ্জিত তিন অনুচরের বুঝতে আর বাকি রইল না এর অর্থটা। সামান্য ক’টা প্রশ্নের উত্তর জানতে এসে এত সোনার মোহর খুইয়ে তারা যথেষ্টই বেকুব বনেছে, এতে আর সন্দেহ কী! ধীর পায়ে তারা মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসে কুটির থেকে। মানতে বাধ্য হয়, এই গরিব চাষির বুদ্ধির জোর সত্যিই প্রবল। অর্থের দিক থেকে দরিদ্রতর হলেও জ্ঞানে আর বিচক্ষণতায় অনেকটা সমৃদ্ধ হয়ে তারা তিনজন ফিরে চলে রাজপ্রাসাদের দিকে।

___


অঙ্কনশিল্পীঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী


No comments:

Post a Comment