প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র

 


কচিপাতা
আঁকিবুঁকি নয়নদীপ
গল্প

মজার খেলা
বলো তো দেখি সুজাতা চ্যাটার্জী

গল্প
একটি ভূতুড়ে গল্প অমিতাভ সাহা
পাস্টোস্কোপ আশিস কর্মকার
ছেলেটা বনবীথি পাত্র
ফুটকি বিজয় বোস
একদিন কবরখানায় বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য
পরজীবী বুদ্ধদেব চক্রবর্তী
কিং কাকাই দেবানন্দ সেনগুপ্ত
রাধারানির আচার দেবলীনা দে
টিকলির রূপকথারা গীর্বাণী চক্রবর্তী
প্রাণ মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়
চোর নন্দ পাটারি এবং আমরা মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ
ভাঙা ডিমের রহস্য নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য
গিলি গিলি ফুঁ রক্তিম লস্কর
স্বর্গের সিঁড়ি সায়নদীপা পলমল
স্বপ্নের আড়ালে অনুবাদ: শ্যামাপ্রসাদ সরকার
নৈনিতালে তিতলি শ্রীপর্ণা ভট্টাচার্য
অভাব পূরণ সুস্মিতা রায়চৌধুরী
ধনপতির স্কুল যাত্রা তরুণকুমার সরখেল
কেউ ফেরেনি উপাসনা পুরকায়স্থ
ফুচকা বিভ্রাট উৎস ভট্টাচার্য

ধারাবাহিক
রাক্ষসের যম জ্যাক অনুবাদ: পুণ্ডরীক গুপ্ত

ছড়া
বিদ্যাবুদ্ধি সুব্রত দেব
আগডুম বাগডুম সুদীপ্ত বিশ্বাস
মজার স্কুল শ্যামলশুভা ভঞ্জ পণ্ডিত
খুনসুটি মীনা সাহা
ভয় ভগীরথ সর্দার
দীপ হয়ে ফুটে ওঠো বসন্ত পরামাণিক
কার ব্যামো বনশ্রী মিত্র
ফড়িং নাকি বড্ড বোরিং তুহিনকুমার চন্দ
থাকব মায়ের পাশে তনুজা চক্রবর্তী
বৃষ্টি আমার জয়শ্রী কুন্ডু পাল

লোককাহিনি
কিকু সিনের ঢোল অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

না-মানুষের পাঁচালি
মিলেমিশে করে কাজ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিজ্ঞানের পাঠশালা
যা দেখি, যা শুনি (৯ম) কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

কচিপাতা: আঁকিবুঁকি: নয়নদীপ

 



অঙ্কনশিল্পী
নয়নদীপ (১০)



কচিপাতা: গল্প: টুনটুনি আর সাপের গল্প: অর্কদ্যুতি


একটা গাছ ছিল। ওটার ওপর দুটো টুনটুনি বাসা করেছিল। গাছটার নীচে একটা সাপ থাকত। যখনই টুনটুনিরা খাবার খেতে যায় তখনই সাপটা গাছের উপরে উঠে অমনি ডিমগুলো খেয়ে নেয়। যখন মা টুনটুনি এসে দেখল যে ডিম নেই, ও তো খুব কান্না করল। বাবা টুনটুনি রাগ হয়ে গেল। সে বলল, “আমরা আবার ডিম পেড়ে সবাই গাছের আরো ওপরে উঠে যাব। সাপটা যখন আসবে তখনই সবাই ঠোঁট দিয়ে ঠোকর মারব।”

তারপরে একদিন সাপটা এল ডিম খেতে। অমনি সবাই ঠোঁট দিয়ে ঠোকর মারল তার মাথায়। ঠোকর খেয়ে সাপটা মরে গেল। তারপর সবাই সে গাছে শান্তিতে থাকতে লাগল।


___


কচিপাতা: গল্প: খরগোশের বুদ্ধি: অহনা


একটা কচ্ছপ দিনেরবেলায় ঘুমোত। আর একটা খরগোশ তার পাহারাদার ছিল। এবার একদিন হল কী, একটা শেয়াল কচ্ছপকে মেরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এবার শেয়ালটা তো আগে থেকেই জানত যে খরগোশটা তার পাহারাদার। এবার তো শেয়ালের মাথায় কিছু বুদ্ধি আসে না। একদিন শেয়াল একটা বুদ্ধি বের করল। যখন খরগোশ রাতেরবেলা ঘুমোচ্ছিল তখন শেয়াল চুপিচুপি এসে কচ্ছপকে ধরে নিয়ে গেল তার গুহায়। কিন্তু শেয়াল জানত না যে কচ্ছপটা রাজা, আর এই খরগোশ তার সেপাই। সে রাতে পাহারা দেয়, আর ঘণ্টা বাজলেও ঘুমোয় না। তারপর খরগোশটা একটা বুদ্ধি বের করল শেয়ালটাকে মজা দেখানোর জন্য। পরদিন যখন শেয়াল জঙ্গলে একটা পশু মারার জন্য যাচ্ছিল তখন খরগোশটা রাস্তাতে পড়ে রইল। শেয়াল ভাবল এই খরগোশটা তো মরে গেছে, আমি একটা পশু মেরে এসে তারপর খরগোশটাকে খাব। এরপর যখন একটা পশু ধরার জন্য চলে গেল শেয়াল তখন খরগোশটা চুপিচুপি শেয়ালের গুহায় ঢুকে কচ্ছপকে বলল, “মহারাজ, আপনি এখান থেকে বের হয়ে বাড়ি যান। আর যেন শিয়ালটা টের না পায়।”

কচ্ছপ তাড়াতাড়ি গুহা থেকে বের হয়ে বাড়ি গেল। খরগোশটা একটা বুদ্ধি বের করল। তার বাড়ি থেকে ছোটোবড়ো কয়েকটা কাঠের টুকরো নিয়ে এল আর তা দিয়ে একটা মূর্তি বানিয়ে শেয়ালের গুহার মুখে রেখে দিল। অন্ধকারে শেয়াল ফিরে এসে ওই মূর্তি দেখে ভয়ে লেজ তুলে ছুটে পালাল। আর কোনোদিন সে বনে ফিরে এল না।


___


মজার খেলা: বলো তো দেখি: সুজাতা চ্যাটার্জী

ছোট্ট বন্ধুরা,

নিজের আঁকায় ও ছড়ায় দারুণ মজার এই খেলাটি সুজাতা-আন্টি‌ পাঠিয়েছেন তোমাদের জন্যে। পুরো ভিডিওটা দেখতে ভুলো কিন্তু।


গল্প: নন্নন, চেম্মল আর সেলভানের গল্প: অদিতি ভট্টাচার্য

 

নন্নন, চেম্মল আর সেলভানের গল্প


অদিতি ভট্টাচার্য



হাতের পুঁটলিটা আগে মাটিতে রেখে মাথা থেকেও পুঁটলিটা নামিয়ে রাখল নন্নন। রেখে সেখানেই ধপ করে বসে পড়ল। হাঁফিয়ে গেছে। সেই কোন ভোর থেকে বাগান থেকে একের পর এক গোলমরিচ ভর্তি পুঁটলি হাতে, মাথায় করে নদীর ঘাটে এনেই যাচ্ছে ও আর চেম্মল। সেন্নি ঘাটের ওপরে বসে বসেই নৌকো তৈরি করছিলেন। নন্ননকে বসে পড়তে দেখে মুখ তুলে তাকালেন। নৌকো মানে বড়োসড়ো কিছু একেবারেই নয়। নারকোলগাছের গুঁড়ি ফাঁপা করে করে তৈরি ডিঙি। ওই ফাঁপা খোলের মধ্যে গোলমরিচ পুরে মুচিরির বন্দরে নিয়ে যাবে নন্নন। সেখানে কুঞ্জাপ্পান আছেন। তিনি গুনে গুনে হিসেব করে গোলমরিচের বস্তা যবনদের জাহাজে তুলে দেবেন। আর তার মূল্য হিসেবে পাবেন দিনারি। স্বর্ণ দিনারি। একটা আধটা নয়, এই এত এত। নন্নন দেখেছে।

“চেম্মল কোথায়?” সেন্নি জিজ্ঞেস করলেন।

“আসছে।” ছোটো, ছেঁড়া গামছাটায় কপালের ঘাম মুছে উত্তর দিল নন্নন। কাঁধ, হাতদুটো টনটন করছে। কিন্তু উপায় কী? কাজ না করলে দু-বেলা দু-মুঠো জুটবে কী করে? সবে চোদ্দ বছর বয়স ওর। কিন্তু ভাইবোনেদের মধ্যে বড়ো, তাই কাজ ওকেই করতে হয়। বাবা মারা গিয়ে অবধি ওদের এই অবস্থা।

“সব নিয়ে আসা হয়ে গেছে, না আরো আছে?” সেন্নি আবার জিজ্ঞেস করলেন। ততক্ষণে তাঁর হাতের কাজ শেষ। আগেকার নৌকোগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, আজ তাই সেই সূর্য ওঠার আগে থেকেই কাজে লেগেছেন সেন্নি। গতকাল একটা নৌকো তৈরি করেছেন, আজ এটাকে করলেন। দাঁড় আছে। আজ চেম্মলকেও ছাড়তে হবে। কাল কুঞ্জাপ্পান এসে অনেক কথা শুনিয়ে গেছেন। কাজকর্ম নাকি ঠিকমতো হচ্ছে না, তাঁর ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। এরকম চললে তিনি সেন্নি, চেম্মলকে তো বটেই, নন্ননকেও কাজ থেকে তাড়িয়ে দেবেন।

“দেখতে দেখতে বেশ ডাগরডোগর হয়ে উঠেছে তোমার সুপুত্তুর। নন্ননের থেকে এমন কিছু তো ছোটো নয়, আর কতদিন তাকে আতুপুতু করে আগলে রাখবে? কাল সকালে গোলমরিচ নিয়ে বন্দরে ও-ও যাবে নন্ননের সঙ্গে। যদি না যায় তাহলে ধরে রেখো আমার এখানে তোমার কাজের ওই শেষদিন। তারপর আমি দেখব কে তোমাকে কাজ দেয় আর তোমার সংসারই বা চলে কী করে। যদি নিজের ভালো চাও, স্ত্রী-ছেলেপুলে নিয়ে না খেতে পেয়ে মরতে না চাও তাহলে আমার কথাখানা মনে রেখো।” সবার সামনেই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিলেন কুঞ্জাপ্পান। 

মাথা নীচু করে চুপচাপ শোনা ছাড়া গতি ছিল না সেন্নির। কী করবেন তিনি? গরিব মানুষ, সংসারে লোকের সংখ্যা কিছু কম নয়। বাবা-মা আছেন, একটা ছোটো বোন আছে, নিজের স্ত্রী ছেলেমেয়েরা তো আছেই। এতগুলো প্রাণীর মুখের অন্ন জোগাড় করা কি চাট্টিখানি কথা? মালিকের ধমক-ধামক, অপমান তাই গরিব লোকেদের সহ্য করতেই হয়। কুঞ্জাপ্পানের বিরাট মশলার বাগানে কাজ করেন তিনি। এই কিছুদিন হল সঙ্গে চেম্মলও আসছে। এ কাজখানা হাতছাড়া হলে যে পথে বসতে হবে। অন্য কোথাও কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কুঞ্জাপ্পান এ অঞ্চলে প্রভাবশালী লোক। শুধু যে একখানা বিশাল মশলার বাগান আছে তা তো নয়, যবনদের সঙ্গে তাঁর কারবারও ভালো। রাজা কুট্টুভানের কোন অমাত্যের সঙ্গে নাকি তাঁর ইদানীং বেশ আলাপ পরিচয় হয়েছে। দুজনকে একসঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা যাচ্ছে, একদিন এ-বাগানেও এসেছিলেন।

এত কথা বলে চলেই যাচ্ছিলেন কুঞ্জাপ্পান, হঠাৎ নন্ননের দিকে নজর পড়তে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সেও তখন সেখানেই ছিল। তার দিকে রোষকষায়িত চোখে তাকিয়ে বললেন, “আমি যা বলেছি তা না হলে কাল তোরও এখানে শেষ দিন জানবি। যতসব কুঁড়ের বাদশা জুটেছে আমার কাছে! ঠিকমতো কাজ না করলে দেব সবক’টাকে তাড়িয়ে।”

একটা বিচ্ছিরি গাল দিয়ে কুঞ্জাপ্পান হনহন করে চলে গেলেন।

নন্ননের দু-হাতের মুঠো শক্ত হল, চোখগুলো দপ করে জ্বলে উঠল। কিন্তু সবই ওই ক্ষণিকের জন্যেই। নিজের অসহায় অবস্থার কথা কি আর ও জানে না? তাই আবার মাথা নীচু করে কাজে লেগে গেল।

চেম্মল বাবার কাছে এসে বলল, “আমি তো নৌকো বাইতে পারি। কাল আমিও বন্দরে যাব নন্ননের সঙ্গে।” কান্নায় গলা বুজে এসেছে ওর।

সেন্নি কিছু বললেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনিও কাজে মন দিলেন। না যেতে দিয়ে কোনো উপায় নেই, জানেন তিনি। ভয় শুধু একটাই, চেম্মল ঠিকমতো ডিঙি বেয়ে বন্দরে পৌঁছতে পারবে তো? ডিঙি নিয়ে বেসামাল হয়ে পড়বে না তো? ভাবলেও বুক কেঁপে ওঠে। নন্নন অনেকদিন থেকেই নৌকো বাইতে অভ্যস্ত, কিন্তু চেম্মল অত নয়। ভাবনা সেই জন্যেই। এদিকে তিনি যে যাবেন সে উপায় নেই। কুঞ্জাপ্পান তা কখনোই হতে দেবেন না। এ-বাগান ছেড়ে সেন্নির নড়ার উপায় নেই। তাছাড়া নজর যখন চেম্মলের ওপর পড়েছে তখন আর ছাড়ান-ছোড়ান নেই।

“চেম্মল এল না কেন এখনো? দেখি গিয়ে।” সেন্নি উঠে পড়লেন। এখনও ডিঙির খোলে গোলমরিচ ভরা বাকি। বন্দরে ঠিক সময়মতো না পৌঁছলে কপালে দুঃখ আছে।

নন্নন দু-হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে তখনো বসে। গত দু-বছর ধরে তাদের এই দুরবস্থা। এ মশলার বাগান তো তার বাবার ছিল। এত বড়ো বাগান এ অঞ্চলে খুব কম লোকেরই আছে। কতরকম মশলার গাছ যে আছে সেখানে তার ঠিক নেই। তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আছে গোলমরিচের গাছ। আর এখানকার গোলমরিচের বিদেশে খুব কদর। যবনরা আসে বড়ো বড়ো জাহাজ নিয়ে, তাদের দেশের রকমারি জিনিসে সেসব জাহাজ ভরা থাকে। কত কিছু যে তারা আনে—নানানরকম কাচের জিনিস, মোমবাতিদানি, ধাতুর অদ্ভুত অদ্ভুত মূর্তি, প্রবাল, সুরা, নানান আকৃতির পাত্র—আরো কত কিছু। সেসব তারা এখানের লোকেদের কাছে বিক্রি করে আর ফিরে যাওয়ার সময় এখান থেকে নানান মশলাপাতি, পান্না, মুক্তো, রেশম বস্ত্র কিনে নিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি কেনে গোলমরিচ। নন্ননের বাবা ছিলেন বড়ো সাদাসিধে, সরল মানুষ। যবনদের সঙ্গে ব্যাবসা-বাণিজ্য ঠিকমতো করে উঠতে পারতেন না, যত ভালো পারতেন রাত-দিন এক করে পরিশ্রম করে এ বাগানে ফসল ফলাতে।

বছর তিনেক আগে একদিন কুঞ্জাপ্পানই এসেছিলেন নন্ননের বাবার কাছে। সম্পর্কে তিনি নন্ননের জ্যাঠামশাই হন।

“এত বড়ো বাগান তোর, এত মশলাপাতির গাছ আর গোলমরিচের তো কথাই নেই! এত ভালো গোলমরিচ এখানে আর কারুর বাগানে হয় না। কিন্তু তুই সেই বোকা-হাবাই রয়ে গেলি, ভালো করে ব্যাবসাটাও বুঝলি না।” ঘুরে ঘুরে বাগান দেখেশুনে কুঞ্জাপ্পান বলেছিলেন।

“এই বাগান দেখেই আর সময় পাই না। তাছাড়া বন্দরে গিয়ে ওসব ভিনদেশি লোকেদের সঙ্গে কারবার করা আমার পোষায় না। কী যে বলে বুঝতেই পারি না!” নন্ননের বাবা বলেছিলেন।

“এ ও সে যবনদের সঙ্গে কারবার করে বড়োলোক হয়ে গেল আর এই এক তুই! বলছিস পোষায় না। ওরে, নিজের ভালো মূর্খও বোঝে রে!” কুঞ্জাপ্পান খুব বিরক্ত হয়েছিলেন নন্ননের বাবার কথা শুনে।

“আমার অসুবিধে তো আর কিছু হচ্ছে না। ওই তো দেখলে অচুকে। ওই অচু এসে বস্তা ভরে গোলমরিচ নিয়ে যায়; ও-ই বন্দরে গিয়ে বিক্রি করে যবন ব্যবসায়ীদের কাছে। আমাকে মন্দ দেয় না। সব মিলিয়ে যা আয় হয় তাতে আমার সংসার চলে যায়। আর কী দরকার?”

“থাক, অচুর কথা আর আমাকে বোঝাতে আসিস না। আমার কথাও তো তুই বিশ্বাস করবি না। তার চেয়ে বরং এক কাজ কর। আমার সঙ্গে কাল বন্দরে চল। দেখবি যবনদের জাহাজে কীরকম সব জিনিসপত্র তোলা হচ্ছে আর গোলমরিচের দাম ওরা কত দিচ্ছে। নিজের চোখেই দেখে আসবি চল, আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না।” কুঞ্জাপ্পান বলেছিলেন।

নন্ননের বাবার শরীরটা তখন ঠিক জুতের যাচ্ছিল না। বাগানের কাজে তিনি উদয়াস্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেন। তারই ফল। ওদিকে কুঞ্জাপ্পানও নাছোড়বান্দা। এত ভালো গোলমরিচের দাম যে তিনি কিছুই পাচ্ছেন না, সরাসরি যবনদের কাছে নিয়ে গেলে যে আরো অনেক বেশি দাম পাবেন, একথা ক্রমাগত কয়েকদিন ধরে নন্ননের বাবাকে বুঝিয়ে গেলেন। আশ্বস্তও করলেন যে তিনি তো আছেন, নন্ননের বাবার অত চিন্তা করার কী আছে। তাঁরও একটা ছোটো বাগান আছে, এবার দু-ভাই মিলে একসঙ্গে দুটো বাগানে কাজ করবেন, একসঙ্গে গোলমরিচ নিয়ে বন্দরে যাবেন। আয় বেশি হলে নন্ননের বাবাকে আর এত পরিশ্রম করতে হবে না। তখন তিনি কয়েকজন মজুর রাখতে পারবেন। তাঁকে শুধু কাজকর্ম দেখাশোনা করলেই চলবে। ব্যাবসার দিকটা না হয় কুঞ্জাপ্পানই সামলাবেন।

একসময় নন্ননের বাবা রাজি হলেন। কুঞ্জাপ্পান তাঁকে নিয়ে গেলেন বন্দরে। দু-তিনজন যবন বণিকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিলেন। যবনরা গোলমরিচের যা দাম দেবে তা শুনে নন্ননের বাবার চোখ কপালে উঠল। তিনি অবিলম্বে কুঞ্জাপ্পানের কথায় রাজি হয়ে গেলেন।

তারপর বেশ কিছু দিন ভালোই চলছিল। বিদেশি বণিকদের কাছে গোলমরিচ আর অন্যান্য মশলাপাতি বিক্রি করে নন্ননের বাবার আয় সত্যিই অনেক বেড়েছিল। কিন্তু সে সুখ কপালে টিকল না। ধুম জ্বরে পড়লেন নন্ননের বাবা। বৈদ্য এলেন, দেখলেন, অনেক ওষুধও দিলেন কিন্তু তিনি আর সুস্থ হলেন না। প্রায় মাস খানেক ভুগে ভুগে একদিন চোখ বুজলেন। নন্ননদের দুরবস্থাও সেই তখন থেকেই শুরু হল।

কুঞ্জাপ্পান একদিন এসে বললেন ও-বাগান তাঁর। নন্ননের বাবা অনেক টাকা ধার করেছিলেন তাঁর কাছে ও-বাগান বন্ধক রেখে। টাকা তো একপয়সাও শোধ করতে পারেননি, তাই এখন থেকে ও-বাগান তাঁরই। নন্ননের বাবা কেন এত টাকাপয়সা ধার করেছিলেন, কোথায় সেসব টাকা, কী করেছিলেন তা দিয়ে—এসব প্রশ্নের সদুত্তর কারুর কাছে ছিল না। নন্ননের মার কাছেও নয়।

তিনি শুধু নন্ননকে বললেন, “বাগান কি আর এত বড়ো আগে ছিল? একটুখানি তো ছিল তোর বাবার। একটু একটু করে পয়সাকড়ি জমিয়ে এত বড়ো করেছিল। তবে আশেপাশের জমি যাঁর ছিল তিনি বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন। দাম কমই নিয়েছিলেন তোর বাবার কাছ থেকে। আর সেসব লেখাজোকা করে তোর বাবাকে দিয়েছিলেন। ছিল তো একখানা ভূর্জপত্র। তোর বাবা আমাকে বলেছিল। ভালো করে ওই তোরঙ্গখানা খুঁজে দেখ তো, ওখানেই আছে। এই বাগান তোর বাবার প্রাণ ছিল। এত খেটেখুটে, এত যত্ন করে এরকম বাগান তৈরি করেছিল, সেইজন্যেই তো আমাদের বাড়িখানা আর বড়ো হল না, সারাই করাও হল না। বললে বলত, ‘আর ক’টা দিন সবুর করো। এখন রোজগার ভালো হচ্ছে, এবার বাড়িতে হাত দেব।’ সে আর হল কই?” নন্ননের মার দু-চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল।

না, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সে নথিখানা পাওয়া যায়নি। নন্নন তখন ছোটো, কিন্তু তাও বুঝেছিল যে সেটা খুব দরকারি কিছু আর সেটা পেলে তাদের বাগান বেহাত হবে না। কিন্তু তা হল না। কুঞ্জাপ্পান বাগান দখল করে নিলেন। নন্ননকে নিজেদের বাগানেই মজুরের কাজ করতে শুরু করতে হল। দেখতে দেখতে দু-বছর হয়ে গেল। এই দু-বছরে গোলমরিচ আর মশলা বিক্রি করে কুঞ্জাপ্পান ধনী হয়ে গেছেন। শহরের গণ্যমান্য লোকেদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা। মুচিরিতে একখানা দোকানও খুলেছেন। চেম্মল গেছে সেখানে, কুঞ্জাপ্পানই যেতে বলেছিলেন কাজের জন্যে। ঘুরে এসে খুব উত্তেজিত হয়ে নন্ননকে বলেছিল, “জানিস নন্নন, কত সুন্দর সুন্দর জিনিস সে দোকানে! দোকানের পেছনে আবার গুদামঘর, সেখানেও গাদা জিনিস।”

নন্নন চুপ করে শুনেছে শুধু। কিছু বলেনি। কী করবেই-বা ও এসব শুনে?


“নন্নন।”

সেন্নির গলার আওয়াজে চমকে উঠল নন্নন। তাকিয়ে দেখল চেম্মলও এসে গেছে। সেন্নি আর চেম্মল মিলে বাদবাকি গোলমরিচ নিয়ে এসেছেন। এবার ডিঙির খোলে সেগুলো ভরতে হবে। নন্নন উঠে পড়ল। নারকোলগাছের ফাঁপা কাণ্ডের ডিঙি জলে নামাল, ওর দেখাদেখি চেম্মলও। সেন্নি আস্তে আস্তে গোলমরিচ ভর্তি পুঁটলিগুলো ডিঙিদুটোতে বোঝাই করে দিলেন। একবারে হবে না, এগুলো নামিয়ে ওদের দুজনকে আবার এই ঘাটে ফিরে আসতে হবে। এসে আবার নৌকো বোঝাই করে নিয়ে যেতে হবে। নন্নন আর চেম্মল দাঁড় টানতে লাগল, ডিঙি জলে ভাসতে শুরু করল।

সেন্নি দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানালেন, ছেলেটা যেন সাবধানে ডিঙি নিয়ে বন্দরে পৌঁছে যায়, কোনো বিপদ-আপদ যেন না হয়।


মুচিরি বন্দরে ব্যস্ততা লেগেই আছে। চওড়া ঘাট পাথর দিয়ে বাঁধানো। যবনদের বড়ো বড়ো বাণিজ্যতরী এসে এই বন্দরে ভিড়েছে। ঘাটের পাথরে আটকানো শক্তপোক্ত লোহার কড়ায় সেসব জাহাজ এখন আটকানো। যবন বণিকরা তাদের দেশ থেকে জাহাজ বোঝাই করে নিয়ে আসা পণ্যসামগ্রী প্রথমে এখানেই নামায়। এখান থেকেই অনেকে কিনে নিয়ে যায়। আবার এখান থেকেই এদেশের জিনিসপত্র কিনে জাহাজ ভর্তি করে ভিনদেশি বণিকরা তাদের দেশে ফিরে যায়। সারাদিন তাই এখানে বেচা-কেনা, হাঁকডাক, লোক চলাচলের কমতি নেই।

“ওদিকে যাস না চেম্মল, আমার পেছন পেছন আয়। এখানটা ফাঁকা আছে, এখানে ডিঙি ভেড়া। দেখছিস না ওদিকে বড়ো বড়ো জাহাজ বাঁধা, একটু বেসামাল হলেই জাহাজের গায়ে ধাক্কা খাবি।”

নন্নন চেম্মলকে দেখিয়ে শুনিয়ে ডিঙি ভেড়াল। ডিঙিদুটোকে ভালো করে বাঁধল। তারপর চেম্মলকে বলল, “তুই এখানেই থাক। আমি দেখি মালিক কোথায়। তারপর যেখানে বলবে সেখানে নিয়ে যাব। কখনো কখনো তো একেবারে জাহাজে দিয়ে আসতে হয়।”

চারদিকে সন্ধানী দৃষ্টি ফেলতে ফেলতে নন্নন ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। ওইদিকে অনেক লোক, ওদিকেই কুঞ্জাপ্পান থাকবেন। নন্নন এর আগে অনেকবার এই বন্দরে এসেছে, এখানকার কর্মব্যস্ততা দেখে দেখে অভ্যস্ত সে। কিন্তু আজ যেন মনে হল এ শুধু কাজের হাঁকডাক নয়, যেন কিছু গোলমাল বেধেছে। দু-তিনজন যবন বণিক খুব উত্তেজিত হয়ে হাত-টাত নেড়ে উঁচু স্বরে কীসব বলছে। নন্নন তার বিন্দুবিসর্গও বুঝল না। কিন্তু কিছু গোলমাল যে সে বিষয়ে নিশ্চিত হল। এর মধ্যেও জাহাজে পণ্য বোঝাই করা আর জাহাজ থেকে পণ্য নামানো—দুইই চলছে পুরো দমে। যারা এসব কাজ করছে, তাদের কয়েকজন নন্ননের পূর্বপরিচিত, এখানে আসতে আসতেই চেনা পরিচয় হয়েছে। এমনই একজন মাথার বোঝা জাহাজে নামিয়ে ফিরছিল। নন্নন তার কাছে গেল। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? কিছু যেন গোলমাল হয়েছে মনে হচ্ছে?”

লোকটা সতর্ক দৃষ্টিতে একবার চারপাশ দেখল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, “গোলমাল বলে গোলমাল? খুব গোলমাল লেগেছে। ওই যে ওই বণিককে দেখছ, মার্কোস না কী যেন নাম, ওর অনেক জিনিস উথিয়ান কিনেছিলেন। তিনিও তো মস্ত বড়ো ব্যবসায়ী, না হলে ওইসব জিনিস অত অত কেউ কিনতে পারে? তবে সব কেনেননি, বাকি জিনিসগুলো উথিয়ানের বাড়ির গুদাম ঘরেই ছিল। মার্কোস সে-ঘর ভাড়া নিয়েছিল জিনিস রাখার জন্যে। তা কাল নাকি সেসব চুরি হয়ে গেছে। মার্কোস ছাড়বে কেন? সে সব জিনিসের দাম চাইছে। ওদিকে উথিয়ানের মাথাতেও হাত, চোর নাকি তাঁর কেনা জিনিসগুলোও নিয়ে গেছে। বড়ো লোকসান হয়েছে তাঁর। এই নিয়ে গোলমাল। এমন কাণ্ড মুচিরিতে কেউ কক্ষনো শোনেনি। বুঝলে?”

নন্নন কিছু বলার উপক্রম করেছিল, এমন সময় কুঞ্জাপ্পানের চিৎকার ভেসে এল, “বলি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়য়ে গল্পগাছা করার জন্যে কি আমি তোকে মাসে মাসে মাইনে দিই? জিনিসপত্র কোথায় ফেলে এলি? কোথায় বেঁধেছিস নৌকো? কার ভরসায় সেসব রেখে এখানে এসে গল্প জুড়লি তুই?”

চেঁচাতে চেঁচাতে কুঞ্জাপ্পান এদিকেই এগিয়ে এসছেন। বেগতিক বুঝে লোকটা সরে পড়ল। নন্নন কোনোরকমে আমতা আমতা করে বলল, “আপনাকেই তো খুঁজতে এসেছি মালিক। আমি আর চেম্মল দু-ডিঙি ভর্তি করে গোলমরিচ নিয়ে এসেছি। চেম্মল ঘাটেই বসে আছে। আপনি নিয়ে আসতে বললেই নিয়ে আসব।”

“নিয়ে আসতে বললেই নিয়ে আসব!” কুঞ্জাপ্পান বিকট মুখভঙ্গি করে ভেংচিয়ে উঠলেন, “এখানে দাঁড়িয়ে ছিলি কেন? আমাকে এখন তোকে খুঁজে বেড়াতে হবে নাকি? আর যদি একবার দেখেছি এখানে এসে এরকম গল্প জুড়তে, একেবারে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব। তখন মজাটি টের পাবে। যা নিয়ে আয়, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ওই যে ওই জাহাজটার কাছে নিয়ে আয়।” কুঞ্জাপ্পান অঙ্গুলিনির্দেশ করলেন।

নন্নন আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দৌড়ে ডিঙির কাছে গেল। কুঞ্জাপ্পান এত বিচ্ছিরি করে কথা বলেন যে একেক সময় নন্ননের মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, মনে হয় কাজ ছেড়ে দিয়ে পালায়। কিন্তু মা আর ছোটো ভাইবোনেদের মুখগুলো মনে পড়লেই সব কীরকম যেন ওলটপালট হয়ে যায়।

নন্নন ডিঙির কাছে এল। চেম্মল আর ও মিলে এক এক করে ডিঙি থেকে গোলমরিচের পুঁটলি বার করল। চেম্মল এই প্রথম বন্দরে এসেছে। সে হাঁ করে চারদিক দেখছে।

“ওরকম করে দেখিস না।” নন্নন না বলে পারল না, “জিনিসপত্রর দিকে খেয়াল রাখিস। শেঠ যদি তোকে এরকম করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাহলে আর রক্ষে নেই!”

তবে সেকথা চেম্মলের কানে ঢুকল কি না সন্দেহ। সে বলল, “বাবা, কী হট্টগোল এখানে! আর কত বড়ো বড়ো জাহাজ! ওই জাহাজে করেই যবনরা আসে না অনেক জিনিসপত্র নিয়ে?”

“হুঁ। তবে আজ এখানে অন্য গোলমাল বেধেছে।”

“কী গোলমাল, বল না।” চেম্মলের হাতের কাজ থেমে গেল।

“এখন না। পরে বলব, ডিঙিতে যেতে যেতে। আমি নিয়ে যাই এগুলো। তুই থাক এখানে, খেয়াল রাখিস।” নন্নন গোলমরিচের পুঁটলি নিয়ে চলল।

পুঁটলি নামাতে না নামাতেই এক যবন বণিক এগিয়ে এল। একেই বোধ হয় এবার গোলমরিচ বিক্রি করেছেন কুঞ্জাপ্পান। সে নন্ননকে ইশারায় পুঁটলি খুলতে বলল। নন্নন কী করবে বুঝতে না পেরে কুঞ্জাপ্পানের দিকে চাইল।

কুঞ্জাপ্পান বিগলিত হেসে বললেন, “ঘাবড়াচ্ছেন কেন? যে গোলমরিচ আমি দেখিয়েছিলাম সেই একইরকম জিনিস যাচ্ছে। আমার বাগানের গোলমরিচ অতি উৎকৃষ্ট। এবার ক্যাসিয়াস আসেননি, তাই আপনার সঙ্গে কারবার করলাম। না হলে উনি তো আমার কাছে ছাড়া আর অন্য কোথা থেকেও গোলমরিচ কেনেন না। আপনি এই একবার কিনে নিয়ে যান, দেখবেন পরের বার এসে আপনিও আমাকেই খুঁজবেন। হেঁ হেঁ হেঁ... ওরে, হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলি কেন? পুঁটলি খুলে শেঠকে গোলমরিচ দেখা।”

নন্নন পুঁটলি খুলল। কুঞ্জাপ্পান নিজে তার থেকে একমুঠো তুলে নিয়ে যবন বণিকের সামনে মেলে ধরলেন। বণিকটি নিজের হাতেও নিয়ে দেখল; গন্ধ শুঁকল, তারপর জাহাজের দিকে মুখ ফিরিয়ে কাকে যেন ডাকল। একটা বেশ ষন্ডামতো লোক বেরিয়ে এল জাহাজ থেকে। এও ভিনদেশি। বণিক তার সোনালি চুলে হাত বুলিয়ে কী যেন বলল তাকে। সে পুঁটলি দুটো হেলায় তুলে নিল। নন্নন বুঝল, গোলমরিচ পছন্দ হয়েছে বণিকের। অবশ্য কেনার আগে বণিক ওজন যাচাই করবে।

কুঞ্জাপ্পান হাসি হাসি মুখে বললেন, “আমি তো আগেই বলেছিলাম, সন্দেহের কোনো কারণ নেই। এই নন্নন, যা যা দৌড়ে যা, সব পুঁটলি, বস্তা যা আছে নিয়ে আয়, তাড়াতাড়ি যা।”

ডিঙিতে ফিরে যেতে যেতে নন্নন বন্দরে যা শুনেছিল সব বলল চেম্মলকে।

“তার মানে তো অনেক জিনিস চুরি হয়ে গেছে! যবন বণিক খুব চেঁচামেচি করছিল, তাই না?” চেম্মল জিজ্ঞেস করল।

“করবে না? তার কত লোকসান হল বল তো?” দাঁড় টানতে টানতেই নন্নন উত্তর দিল।

“কী জিনিস চুরি গেছে রে?”

“তা আমি কী করে জানব?”

“ওই যবন বণিকরা জাহাজে করে কী জিনিস আনে?” চেম্মলের প্রশ্নের যেন শেষ নেই।

“অনেক কিছু আনে। কাচের জিনিস আনে, কতরকম পাত্র, অনেক কিছু। আমি আর বেশি দেখেছি কোথায়? শেঠ এক মুহূর্তও দাঁড়াতে দেয় নাকি?”

কুঞ্জাপ্পান নন্ননের আত্মীয়। কিন্তু কুঞ্জাপ্পনানের নির্দেশমতো তাঁকে অন্য মজুরদের মতো নন্ননকেও শেঠ বলেই ডাকতে হয়।

“জানিস, শেঠের দোকানে ওরকম অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস আছে, আমি দেখেছি।”

“যবনরা যেসব জিনিস নিয়ে আসে তা তো শেঠরাই কেনে। ওদের দেশের জিনিস আমাদের দেশের শেঠরা কেনে আর আমাদের দেশের জিনিস ওরা। এরকম করে ব্যাবসা-বাণিজ্য চলে।” বেশ বিজ্ঞ বিজ্ঞভাবে বলল নন্নন, “এই যবনরা অনেক দূর থেকে আসে এখানে। অনেকদিন লেগে যায় আসতে। আমাকে সেলভানদাদা বলেছে। সে নিজেই তো একবার কোন জাহাজে করে অনেক দূর গেছিল।”

“সেলভানদাদা অনেকদিন আসে না তো!”

“দেখ আবার কোথাও গেছে। সেলভানদাদা আবার কবে বেশি দিন একজায়গায় থাকে! ওকে তো আর আমাদের মতো সারাদিন কাজ করতে হয় না, ওর তাই খুব মজা। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। ওকে কেউ কিচ্ছু বলে না।” নন্নন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

“ওরা যে অনেক বড়োলোক। কত বড়ো বাড়ি ওদের! দেখিসনি?”

ঘাটে পৌঁছে গেছে ওরা। নন্নন তাই উত্তর দিল না। এক লাফে ঘাটের পৈঠায় নেমে ডিঙিটাকে বাঁধল। এখনো আরো অনেক গোলমরিচ নিয়ে যেতে হবে। গল্প করার সময় নেই।


সন্ধেয় কাজের শেষে যখন নন্নন আর চেম্মল বাড়ি ফিরে জিরোচ্ছিল, তখন সেখানে সেলভান এসে হাজির। দুজনের বাড়ি কাছাকাছি, নদীর ধারে। কাজের শেষে প্রায় রোজই দুজনে খানিক গল্প করে, বর্তমানের দুঃখকষ্টকে উপেক্ষা করে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখে। একদিন তাদেরও এরকম মশলার বাগান হবে, তাতে নানান মশলাপাতি হবে, তারাও এরকম মুচিরি বন্দরে নিয়ে গিয়ে যবন বণিকদের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, অনেক অনেক না হলেও তারাও কিছু স্বর্ণমুদ্রা পাবে আর সত্যিই যদি কখনো অনেক অর্থ রোজগার করতে পারে তাহলে একটা জাহাজ তৈরি করাবে, তারপর তাতে হরেক জিনিস পুরে, অনেক মাঝিমাল্লা নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়বে, দূরদূরান্তের দেশে যাবে, কত কিছু দেখবে, জানবে... তবে যা করবে দুজনে একসঙ্গে।

“এই যে, দুই মূর্তি বসে বসে কীসের এত আলোচনা হচ্ছে?”

চেনা গলার আওয়াজ। দুজনেই সেদিকে তাকাল। তারপরে দুজনেই উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল, “সেলভানদাদা!”

“আমি ছাড়া এই সময়ে কে আর তোদের সঙ্গে দেখা করতে আসবে বল দেখি?” হাসি মুখে সেলভান বলল। তারপর একটা ঢাকা দেওয়া বড়ো ঝুড়ি বাড়িয়ে ধরে বলল, “নে, তোদের জন্যে এনেছি, খাস।”

সেলভান যখনই আসে, কিছু না কিছু নিয়ে আসে ওদের জন্যে। বেশিরভাগ সময় খাবারদাবারই।

ঝুড়িটা পাশে নামিয়ে রেখে নন্নন বলল, “এতদিন আসোনি কেন সেলভানদাদা? কোথায় গেছিলে?”

“এবার অনেক দূরে গেছিলাম রে, এক বণিকের সঙ্গে জাহাজে চড়ে ভেসে পড়েছিলাম। দূর দেশে গেছিলাম। ওরে, সেখানে কী দেখলাম জানিস?”

“কী দেখলে? বলো না, ও সেলভানদাদা!” নন্নন আর চেম্মল একসঙ্গে বলে উঠল। বাইরের জগতের হাজার খবর এই সেলভানই তো বয়ে আনে ওদের কাছে।

“গেছিলাম সেই অনেক দূর দেশের এক নগরে। নাম তার আলেকজেন্দ্রিয়া। কী খটমট নাম বাবা! কতবার বলতে বলতে তবে গিয়ে মুখস্থ হয়েছে।” সেলভান বলল, “এদেশের গোলমরিচের ওখানে কী কদর রে! আর এই যবন বণিকরা কী করে জানিস? গোলমরিচের ভেতর খানিক খানিক ওখানকার কালো সর্ষে মিশিয়ে দেয়। বোঝ। খালি আরো বেশি লাভের ফিকির।”

“এখানেও কী হয়েছে জানো?” চেম্মল বলল, “এখানেও খুব গোলমাল। একজন বণিকের, মার্কোস নাম তার, তাই না রে নন্নন? তার সব জিনিস চুরি হয়ে গেছে? সে আজ খুব চেঁচামেচি করছিল বন্দরে।”

“বলিস কী রে? এ খবরখানা তো পাইনি। পাব কী করে? এই তো সবে ফিরলাম। আর ফিরে দু-দিন মোটে বাড়ি থেকে বেরোইনি। খালি খেয়েছি আর ঘুমিয়েছি। কী বললি তুই চেম্মল? চুরি হয়ে গেছে? কোথা থেকে হল? এরকম তো আগে কখনো শুনিনি।”

নন্নন বলল যা শুনেছে আজ।

সেলভানের মুখ গম্ভীর হল। “এরকম হলে তো খুব চিন্তার কথা। আমাদের মুচিরির বদনাম হবে। আর কোনো বিদেশি বণিক এখানে বাণিজ্য করতে আসতে চাইবে না।”

“তুমি বন্দরে গেলেই জানতে পারবে, হয়তো মার্কোসের সঙ্গে তোমার দেখাও হয়ে যাবে। তুমি তো ওদের সঙ্গে কথাও বলতে পারো। তুমি ঠিক খবর জানতে পারবে। আমি তো শোনা কথা বললাম।” বলল নন্নন।

“হ্যাঁ, কালই একবার ওদিকে যেতে হবে দেখছি। তোদের আর কী খবর বল।”

“আমাদের আর কী খবর হবে সেলভানদাদা? সারাদিন মালিকের বাগানে খাটা আর আজ থেকে তো আমিও ডিঙিতে করে গোলমরিচ নিয়ে বন্দরে যাচ্ছি নন্ননের সঙ্গে।” চেম্মল বলল।

“তাতেও আর কী হবে? আমাদের মজুরি তো আর বাড়ে না, মালিকের গালমন্দ শুনি খালি।” বলল নন্নন।

সেলভান অন্যমনস্ক হয়ে গেল। সত্যি বেচারা ছেলেদুটোর বড়ো কষ্ট। কতবার ভেবেছে ও যে ওদের জন্যে কিছু করবে, যাতে এই অমানুষিক খাটুনির হাত থেকে ছেলেদুটো মুক্তি পায়। চেষ্টা করলে কি করতেও পারত না? নিশ্চয়ই পারত। কিন্তু ওর এই ভাবাই সার। যা উড়নচণ্ডী ছেলে ও! একজায়গায় স্থির থাকতে পারে? তার ওপর মাথায় দেশবিদেশ দেখার নেশা। এত দিন তবু নিজের দেশের ভেতরেই ঘুরছিল, কিন্তু এবার তো এক বণিকের সঙ্গে জাহাজে করে বেরিয়ে পড়ল। বাবা-দাদাদের বকুনি, মার কান্না, কাকুতি মিনতি—কোনো কিছুই ওকে ঘরে আটকাতে পারে না। আজ নন্নন আর চেম্মলের কথা শুনে খুব খারাপ লাগল ওর, অপরাধবোধের দংশন অনুভব করল মনে। নাহ্‌, এবার একটা কিছু করতেই হবে। হয় বাবা-দাদাদের কারবারে যোগ দিতে হবে, না হলে নিজের মতো কিছু করতে হবে। তাতেও তো কারুর আপত্তি নেই। যবন বণিকদের আনা বিদেশি জিনিসপত্রের নকল তৈরি করেই এ দেশের কত লোকে কত লাভ করে ফেলল! সবাই কি আর অত অত মূল্য দিয়ে বিদেশি জিনিস কিনতে পারে? তাদের তো ওই নকলই ভরসা।

আরো কিছুক্ষণ নন্নন আর চেম্মলের সঙ্গে গল্প করে সেলভান চলে গেল।


সময় গড়িয়ে চলে নিজের নিয়মে। কুঞ্জাপ্পানের বাগানে কাজ করে নন্নন আর চেম্মলের দিন আগের মতোই কাটতে লাগল। ডিঙিভর্তি গোলমরিচ নিয়ে বন্দরেও যেতে হয়। তবে আজকাল চারপাশ যেন কীরকম থমথমে, সকলের চোখের দৃষ্টিতে সন্দেহ। কেউ যেন আর কাউকে পুরো বিশ্বাস করতে পারছে না। মার্কোস আর উথিয়ানের একদিন নাকি হাতাহাতির উপক্রম অবধি হয়েছিল। মার্কোসের ধারণা, এসবই উথিয়ানের চালাকি। মার্কোস নাকি কোতয়ালের কাছে নালিশও জানিয়েছে।

বাগানে কুঞ্জাপ্পানের বিশ্রাম, আহারের জন্যে খাস একখানা ঘর আছে। তিনি বাগানে এলে খানিক ঘুরে দেখে-টেখে সেখানেই যান। অনেক সময় বন্ধুবান্ধবদেরও সঙ্গে নিয়ে আসেন। পান-ভোজনের আসর বসে। চেম্মল-নন্ননের মতো মজুরদের সেখানে প্রবেশ নিষেধ, বলাই বাহুল্য। আজ সেখানে খুব ব্যস্ততা। কে নাকি আসবে। ঘর পরিষ্কার করার জন্যে একবার চেম্মলেরও ডাক পড়েছিল সেখানে।

“কে নাকি খুব বড়ো শেঠ আসবে এখানে, অনেক জিনিস কিনবে, তাই মালিক এত ব্যস্ত। কত খাবারদাবার এসেছে রে নন্নন!” চেম্মল কাজের ফাঁকে নন্ননকে বলল।

নন্নন এমনিতেই কথা কম বলে, তার ওপরে এসব কথার তো কোনো জবাবই দেয় না। চুপচাপ শোনে শুধু। এসব কথার কোনো উত্তর বোধ হয় হয়ও না। তবে তাতে চেম্মলের কোনো হেলদোল নেই। সে নতুন কিছু শুনলেই এসে নন্ননকে বলে যায়।

“গৌড় কোথায় জানিস, নন্নন?” চেম্মল জিজ্ঞেস করল।

নন্নন মাথা নাড়ল।

“সেখান থেকে বড়ো শেঠ এসেছে। সে নাকি তার বুড়ো বাবা, মা আর আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে তীর্থ করতে বেরিয়েছে। তারা অন্য কোথায় আছে। মুচিরির কথা শেঠ শুনেছে, এখানে যে যবনরা আসে অনেক জিনিস নিয়ে তাও। তাই সে এসেছে জিনিস কিনতে।”

“তীর্থ করতে বেরিয়েছে? তার মানে মনে হয় এদেশের লোকই। কে জানে গৌড় কোনদিকে!”

“অনেক দূরের পথ নাকি! আমি উঁকি দিয়ে দেখে এসেছি। বাবা, মালিক কত কত জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে রে! একখানা কী সুন্দর বাক্স থেকে লাল রঙের পাথর বার করে করে দেখাচ্ছে। আরো কত কিছু। বেশি তো আর দেখতে পেলাম না, একবার উঁকি দিয়েই চলে এসেছি।”

“একবারই-বা তোর উঁকি মারার কী ছিল? মালিক জানতে পারলে বা একথা কেউ মালিকের কানে তুললে তোর কী হাল হবে ভেবে দেখেছিস? কেন যে এসব করতে যাস! কী হবে আমাদের ওসব দেখে? আমাদের অবস্থা তো আর পালটাবে না।” মনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, দুঃখকষ্ট সব ঝরে পড়ল নন্ননের কথায়।

চেম্মলও এবার চুপ করে গেল। ভুল কিছু তো আর বলেনি নন্নন। সেন্নি জানতে পারলেও বকবেন ওকে।


দাওয়ায় শুয়ে ঘুমোচ্ছিল নন্নন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে, রাতে খেয়েদেয়ে একবার শুলেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ে। চট করে সে ঘুম ভাঙতে চায় না। কিন্তু আজ কানের কাছে ক্রমাগত নীচু স্বরে ‘নন্নন, নন্নন’ শুনে আর গায়ে ঠেলা খেয়ে ঘুম ভেঙে গেল নন্ননের। ধড়মড় করে উঠে বসে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই শুনল, “চুপ, চেঁচাস না।”

কণ্ঠস্বর খুবই চেনা। হাতে ধরা একখানা প্রদীপের স্বল্প আলোতেও সে কণ্ঠস্বরের মালিককে চিনতে পারল নন্নন। সেলভান। সঙ্গে চেম্মলও আছে। এত রাতে কী করছে এরা দুজনে?

“উঠে আয়।” সেলভান বলল।

বাড়ির পেছনে নদীর ধারে গেল ওরা। এখানেই রোজ সন্ধেবেলা ওরা দুজনে গল্প করে।

“এক্ষুনি আমার সঙ্গে চল। মুচিরিতে। কুঞ্জাপ্পানের দোকানে।” বিনা ভূমিকায় সেলভান বলল।

বিনা মেঘে বাজ পড়লেও বোধ হয় নন্নন এত চমকাত না। ও ফ্যাল ফ্যাল করে সেলভানের দিকে তাকিয়ে রইল।

“যা বুঝছি তা হল, মার্কোস আর উথিয়ানের জিনিসপত্র চুরি করিয়েছে কুঞ্জাপ্পানই। আর সেসব এখনো আছে ওর দোকানের লাগোয়া গুদামঘরেই। তবে বেশি দিন ওখানে থাকবে কি না সেও সন্দেহ। কুঞ্জাপ্পান বড়ো চতুর লোক। নেহাত আজ লোভে পড়ে আমার ফাঁদে পা দিয়েছে, তাই...” বলল সেলভান।

নন্ননের অবস্থা আরো করুণ হল। ও এর বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারল না। কুঞ্জাপ্পান চুরি করেছেন? সেলভানের ফাঁদই বা কী?

“কিছুই বুঝতে পারলি না, তাই তো? বেশি কিছু বলার সময় এখন নেই, যা করতে হবে তা বলছি শোন। আমাদের এখনই ওই দোকানে ঢুকতে হবে। তবে ক’দিন হল, মানে যবে থেকে চুরিটা হয়েছে তবে থেকে পাহারা দেওয়ার জন্যে দুজন রক্ষী নিয়োগ করেছে কুঞ্জাপ্পান। মুখে বলে, ‘চুরিচামারি হচ্ছে। আমার দোকানে, গুদামেও তো কম জিনিস নেই। এটুকু পাহারা তো রাখতেই হয়।’ কিন্তু আসল কথা অন্য। ওর গুদামে চোরাই জিনিস আছে। মার্কোস নালিশ জানানোর পর থেকে কোতয়াল খোঁজখবর শুরু করেছে তো। ওর গুদামে জিনিস ছাড়াও আরো কিছু আছে। তাকে ধরে নিয়ে কোতয়ালের হাতে তুলে দিতে পারলেও আমাদের কাজ হয়ে যাবে।”

“কে আছে? কাকে ধরবে?” চেম্মল খুব অবাক হয়ে বলল। মুচিরিতে যাওয়ার কথা জানলেও সবকিছু যে ওকেও বলেনি সেলভান তা বোঝা গেল।

“কেন, তুইই যে বললি সেদিন!” সেলভান বলল, “এর মধ্যেই ভুলে গেলি? একটা সিড়িঙ্গে লম্বামতো লোক থাকে না ওখানে? যে গুদোম ঘরে শুয়ে ছিল?”

“হ্যাঁ, তা তো ছিল। কিন্তু ও কে? ওকে ধরবে কেন?” আবার প্রশ্ন চেম্মলের।

“ও এক চোর। খুব ওস্তাদ। কিছুদিন আগে ধরা পড়েছিল, কিন্তু কারাগার থেকে কী করে যেন পালিয়েছে।” সেলভান উত্তর দিল, “সে কুঞ্জাপ্পানের গুদোমে কী করছে বল দেখি? তার ওখানে কী কাজ? আমার ধারণা, ওকে দিয়েই কুঞ্জাপ্পান মার্কোস আর উথিয়ানের জিনিসপত্র চুরি করিয়েছে।”

“কিন্তু তুমি এত কথা জানলে কী করে? আর আমরা ওখানে গিয়েই বা কী করব?” নন্নন বলল।

“বলছি তো সবকথা খুলে বলার সময় এখন নেই, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আগে কাজ উদ্ধার হোক, তারপর সব বলব। কিচ্ছু বাদ দেব না।” বলল সেলভান, “আমি জানি তোরা যেতে ভয় পাচ্ছিস, তোদের যাওয়াটা খুব একটা নিরাপদও নয়, ভাবছিস ধরা পড়ে গেলে কী হবে। কিন্তু নন্নন, এই এক সুযোগ। এরকম সুযোগ আর কোনোদিন আসবে কি না জানি না। যেরকম ভেবেছি সেরকম যদি আজ সব ঠিকঠাক করতে পারি তাহলে শুধু যে মার্কোস আর উথিয়ানের চুরি যাওয়া জিনিসপত্র ফেরত পাওয়া যাবে তা নয়, তোদের দুঃখের দিনও শেষ হবে। আমি ইচ্ছে করে, জেনেশুনে তোদের কোনো বিপদে ফেলব না—এটুকু বিশ্বাস তো করিস তোরা তোদের সেলভানদাদাকে?”

“ও কী কথা সেলভানদাদা? ওরকম বলছ কেন?” নন্নন বলল।

“তাহলে আর দেরি করিস না, চল আমার সঙ্গে। আমি একা পারব না, তাই তোদের সঙ্গে নিচ্ছি। তাছাড়া খুব বিশ্বস্ত ছাড়া একাজে আমি আর কাউকে ভরসাও করি না। তাতে যে শুধু কাজ পণ্ড হবে তা নয়, বিপদও বাড়বে। আমার এক বন্ধু আছে, সে আগেই ওখানে পৌঁছে গেছে। চল, ডিঙি নে। নদী দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি পৌঁছব।”

দু-খানা ডিঙিতে তিনজন মিলে উঠে বসল। সেলভান আর নন্নন দ্রুত হাতে দাঁড় বাইতে লাগল।

কুঞ্জাপ্পানের দোকানের সামনে সত্যিই দুজন রক্ষী রয়েছে। তবে তারা টহল দিচ্ছে না, বসে রয়েছে। একজন তো বসে বসে ঢুলছে মনে হচ্ছে। সেলভানের বন্ধু নদীর ঘাটেই অপেক্ষা করছিল, ওখান থেকে চারজনে একসঙ্গে এসেছে। ঘাট থেকে দোকানের দূরত্ব তেমন নয়।

“তোরা এখানেই থাক। আমরা আগে যাই।” সেলভান বলল।

সেলভানের কাঁধে একখানা ঝোলা ছিল। তার থেকে দুটো ছোটো পাত্র বার করে তাতে গুঁড়ো গুঁড়ো কীসব ঢালল। তারপর সে আর তার বন্ধু ভালো করে নাকমুখ ঢেকে মুহূর্তের মধ্যে কোথায় উধাও হয়ে গেল। দুরুদুরু বুকে নন্নন আর চেম্মল অপেক্ষা করছে। এখান থেকে দোকানটা পরিষ্কার দেখা যায়। হঠাৎ দেখল দোকানের দু-পাশ থেকে পা টিপে টিপে সামনে বেরিয়ে এল ওরা। পাত্রদুটোয় যেন আগুন জ্বলছে মনে হচ্ছে, তবে তা নিভু নিভু প্রায়। রক্ষীরা এখন দুজনেই ঢুলছে। কেউই ওদের খেয়াল করল না। সেলভান আর তার বন্ধু রক্ষীদের খুব কাছে চলে এসেছে। কাঠি দিয়ে পাত্রের আগুন খুঁচিয়ে দিল, আগুল দপ করে জ্বলে উঠল। পাত্রদুটো দুজনে রক্ষীদের মুখের কাছে নিয়ে গেল। রক্ষীরা চমকে উঠল। কিছু একটা বোধ হয় বললও, কিন্তু তারপরেই পরেই মাটিতে পড়ে গেল।

সেলভান হাত নেড়ে নন্ননদের ডাকল।

“ওদের কী হল? ওরকম করে পড়ে গেল কেন?” চেম্মল জিজ্ঞেস করল। ও ভয় পেয়েছে।

“কিছুই হয়নি, অজ্ঞান হয়ে গেছে। যতক্ষণ ওরা এরকম জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকে তার মধ্যেই আমাদের কাজ শেষ করতে হবে।” নীচু স্বরে সেলভান বলল।

সেলভানের বন্ধুও বেশ কাজের। সে ইতিমধ্যে ঝোলা থেকে একটা কাঁটা বার করে দরজার তালা খুলে ফেলেছে।

“কেমন কায়দা দেখেছিস? সামনে দিক থেকে দরজায় বড়ো তালা ঝোলানো। লোকে দেখে ভাববে দোকানদার তালা বন্ধ করে বাইরে পাহারা রেখে গেছে। এদিকে ভেতরে লোক আছে। ওদিকে একটা ছোটো দরজাও আছে। চোরটার জন্যে এখন জোর তল্লাশি শুরু হয়েছে তো, তাই ওর পক্ষেও এখানে লুকিয়ে থাকা সুবিধে। কে আর কল্পনা করতে পারবে যে কুঞ্জাপ্পানের এই কীর্তি!” বলল সেলভান।

দোকানের ভেতরে ঢুকে চেম্মল ফিসফিস করে নন্ননকে বলল, “দেখেছিস কেমন সুন্দর সুন্দর সব জিনিস? বলেছিলাম না তোকে?”

“এসব নকল। আমাদের আসল জিনিস খুঁজতে হবে। সে বোধ হয় ওই গুদামে আছে।” সেলভানের বন্ধুও তেমন ফিসফিস করেই বলল।

“নকল!” নন্নন আর চেম্মল আকাশ থেকে পড়ল।

“হুঁ। কত কারিগর আজকাল এরকম বিদেশি জিনিসের নকল বানায়। এর বাজারও তো মন্দ নয়।”

গুদাম ঘরে সেই সিড়িঙ্গে লোকটা শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল। তাকে কবজা করতে বিশেষ অসুবিধে কিছু হল না ওদের। সেলভানের বন্ধু একছুটে ওখান থেকে বেরিয়ে গেল। নন্ননরা আশ্চর্য হয়ে দেখল কিছুক্ষণের মধ্যেই নগরপাল এলেন। তাঁর সঙ্গে বেশ কিছু প্রহরী এল। তারা সেই চোরকে তাদের সঙ্গে নিয়ে চলে গেল। কুঞ্জাপ্পানের বাড়িতেও নাকি প্রহরী যাবে, তাকেও গ্রেপ্তার করা হবে।

চোর তো এখনই সব বলে দিয়েছে, কুঞ্জাপ্পান তাকে আশ্রয় দেওয়ার বিনিময়ে তাকে দিয়ে কী কী করিয়েছে। উথিয়ানের দোকান থেকে সব জিনিসপত্র চুরি করিয়েছে। নন্নন আর সেলভানের বুঝতে বাকি রইল না যে সেলভান সব জেনেশুনেই এগিয়েছিল। নগরপাল তো যাওয়ার আগে সেলভানের খুব প্রশংসা করে গেলেন, “কাজ তুমি ভালোই করেছ, তবে নিজে না করে আগে থেকে আমাদের জানালেই পারতে। তোমাদের এই বয়সের এই এক দোষ, অকারণ বিপদ নিজের ঘাড়ে নিতে ভালোবাসো!”

সেলভান তাঁর সামনে কিছু বলল না। তবে তিনি দলবল নিয়ে চোখে আড়াল হতেই বলল, “হুঁ, আগে থেকে তোমাদের বলি আর সে খবর পাঁচকান হয়ে কাজটাই পণ্ড হোক আর কী! তাছাড়া নিজে করাতে যা উত্তেজনা, যা মজা, তা কি তোমাদের বললে হত?”

সেলভানের বন্ধু উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠল।


বিচারগৃহে কুঞ্জাপ্পান তাঁর সব অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর গুদাম ঘর থেকে চুরি যাওয়া সমস্ত জিনিসই প্রায় উদ্ধার হয়েছে, শুধু কিছু প্রবাল বাদে। সেগুলো যে ওই গৌড়ের বণিক কিনে নিয়েছিল। তবে সে বণিকও বিচারগৃহে এসেছিল আর প্রবালের মূল্য কুঞ্জাপ্পানের থেকে নিয়ে মার্কোসকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে বিচারকের নির্দেশে। কারণ, বণিক যে ওই প্রবাল হাতছাড়া করতে চায়নি। তার নাকি ও-জিনিস খুব দরকার তার ঠাকুমার জন্যে। শুধু এই নয়, ও-বাগানও কুঞ্জাপ্পানের হাতছাড়া হয়েছে। তিনি যে তা অন্যায়ভাবে দখল করেছিলেন নন্ননের বাবার মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে, তাও প্রমাণিত হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া সেই নথি তাঁর বাড়িতেই পাওয়া গেছে, তিনিই সেটা চুরি করেছিলেন।

নন্নন তার মাকে নিয়ে একবার মুচিরিতে গেছিল সেই নথি নিয়ে আসতে। এখন থেকে ও মশলার বাগান তাদের। আর সেখানে গিয়ে শুনেছে ওই গৌড়ের বণিকের জন্যেই নাকি এত কিছু সম্ভব হয়েছে। তার সঙ্গে নাকি মার্কোসের ভালো পরিচয় ছিল। কী কী চুরি গেছে সেসব নাকি মার্কোস তাকে বলেছিল। এও বলেছিল যে সে প্রবাল রাখত খুব সুন্দর নকশা করা এক ধাতব বাক্সে। সেটা নাকি তার খুব প্রিয় জিনিস, তার মা তাকে দিয়েছিলেন। সে বাক্স দেখতে কীরকম, কীরকম নকশা করা তাতে, সে সবই তাকে নাকি মার্কোস ভালো করে বুঝিয়ে বলেছিল। তারপর সেই বণিক যখন কুঞ্জাপ্পানের কাছে প্রবাল কিনতে গেল, কুঞ্জাপ্পান সেই বাক্স থেকে প্রবাল বার করে করে দেখাচ্ছিলেন। বণিক যা বোঝার বুঝে গেল। তবে নন্নন আর চেম্মল একেবারে হতবাক হয়েছে গৌড়ের বণিকের প্রকৃত পরিচয় জেনে। শুনে দুজনে খালি দুজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছে, একটা কথাও বলতে পারেনি।

কিন্তু যে সবকিছু খোলসা করে বলতে পারত তার তো আবার দেখা নেই। চেম্মল একদিন তার বাড়িতে গিয়েও ফিরে এসেছে, দেখা নেই। ওদিকে এত বড়ো একটা বাগানের ভার নন্ননের ওপর এসে পড়েছে। সে যেমন অনভিজ্ঞ, তেমন তার মাও। এসব সামলাতেন তো তার বাবা। এখন অবশ্য সেন্নি দেখাশোনা করছেন। তবে মশলাপাতি বিক্রি করার জন্যে একজন ভালো লোক চাই। নাহলে খুব মুশকিল। তবে হুটহাট করে কারুর অপর ভার দেওয়ার ইচ্ছে নেই নন্ননের মার। একবার যা হল!

সন্ধেবেলা বসে বসে নন্নন আর চেম্মল কথা বলছিল। আজ আর গল্প নয়, বাগানের কথাই বলছিল দুজনে। সেন্নিও ছিলেন এতক্ষণ, তিনি এই একটু আগে উঠে গেলেন।

“যাক বাবা, আজও এখানেই দেখা পেলাম। আমি তো আবার ভাবছি, কী জানি যদি এখন আর নদীর ঘাটে বসে আগের মতো গল্প না করে।” সেলভান হঠাৎ হাজির সেখানে।

“তোমার সঙ্গে কথা বলব না সেলভানদাদা। এত কিছু করলে কিন্তু তারপর একবারও দেখা করলে না। চেম্মল তোমার বাড়িতে গেল, সেখানেও তুমি নেই।” নন্নন মুখ ঘুরিয়ে নিল। জলভর্তি চোখদুটোকে আড়াল করতেই কি? কী যে হল সেলভানকে দেখে!

“বাবা, একেবারে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিস যে! এত অভিমান! বেশ অমন করেই বসে থাক তাহলে, আমিও চলে যাই। ভাবলাম যাই, দুজনের সঙ্গে গল্প করে আসি, সব খুলে বলি, কিন্তু মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকলে আর কাকে বলব? বেশ, এই আমি চললাম।” সেলভান ফিরে যাওয়ার উপক্রম করল।

কাজ হল এতে। নন্নন মুখ ফিরিয়ে সেলভানের দিকে তাকাল।

“ওরকম মুখ গোমড়া করে আর থাকতে হবে না, একটু হাস দিকিনি।” সেলভান বলল। তারপর চেম্মলের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই সেদিন ওরকম উঁকি মারছিলি কেন? আমি তো তোকে এক ঝলক দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ভয় করছিল, কী জানি তুই যদি চিনে ফেলিস!”

“কিন্তু তুমি গৌড়ের বণিক সাজতে গেলে কেন সেলভানদাদা?” নন্নন জিজ্ঞেস করল।

“এসব না করলে কিছু হত নাকি? কী ভাগ্যি, কুঞ্জাপ্পান চিনতে পারেনি আমাকে। যখনই চেম্মল আমাকে বলল যে কুঞ্জাপ্পানের গুদাম ঘরে একটা সিড়িঙ্গেমতো লোক থাকে, যে চট করে কারুর সামনে আসতে চায় না, নেহাত চেম্মল ভেতরে ঢুকে গেছিল তাই দেখতে পেয়েছে, তাও নাকি ওকে গুদাম ঘরে থাকতেই দেয়নি, প্রায় তাড়িয়ে দিয়েছিল ওখান থেকে, তখনই আমার কীরকম সন্দেহ হল। তারপর আরো একটা খবর শুনলাম। আমার এক বন্ধু কাজ করে নগরপালের দপ্তরে। সে বলল, এক চোর নাকি পালিয়েছে কারাগার থেকে, তার খোঁজে জোর তল্লাশি শুরু হয়েছে। সে চোর কেমন দেখতে-টেখতে এসব তার কাছ থেকেই আমি জেনে নিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল এ সেই চোরের কাজ নয় তো? সে তো শুনি বড়ো ওস্তাদ চোর! তারপর মার্কোসের জিনিসপত্র চুরির খবর শুনে বন্দরে গিয়ে তার সঙ্গেও দেখা করলাম। মার্কোসের সঙ্গে আমার আগে থেকেই চেনা ছিল। সে সব বলল। সেসব তো তোরা জানিস। তখনই আমার মাথায় বণিক সাজার বুদ্ধি এল। এমনি আমি গেলে কি আর কুঞ্জাপ্পান দেখাত! পরিষ্কার বললাম তাকে যে বেশি মূল্য দিতে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু আমাকে ভালো জিনিস এনে দিতে হবে। আমার দেশের লোকের খানিক বেশি অর্থ লাভ হলে আমার কোনো আপত্তি নেই। স্বর্ণমুদ্রা যে আমার কাছেও কিছু কম নেই তা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। সে যে কী লোভী মানুষ সে তো আর জানতে বাকি ছিল না, তাই এই টোপ দিলাম। তা সে টোপ খেলও। একেবারে বাক্সসুদ্ধ প্রবাল নিয়ে হাজির হল আর আমিও যা বোঝার বুঝে গেলাম। সে তো অত অর্থ পেয়ে সে-রাতে খুব ফূর্তি করল বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আর ওদিকে আমরা কাজ সেরে ফেললাম। যাক বাবা, সব ভালোয় ভালোয় মিটে গেছে এই ঢের।” সেলভান একেবারে নিশ্চিন্তে মাটিতে শুয়েই পড়ল।

“তুমি পারোও বটে সেলভানদাদা! এত কিছু তোমার মাথায় আসে!” চেম্মল বলল। নন্নন কিন্তু চুপ, একটা কথাও বলল না।

“কী রে, কিছু বলছিস না যে?” সেলভান জিজ্ঞেস করল।

“আমি তো বলেইছি তোমার সঙ্গে কথা বলব না।” নন্নন বলল।

“আবার কী হল?” সেলভান উঠে বসল, “এতক্ষণ যে মুখব্যথা করে সব বললাম, সে বুঝি কিছু নয়?”

নন্নন চুপ।

“কী রে?”

“আমার কথা শুনলে তবেই কথা বলব।” গম্ভীর মুখে বলল নন্নন।

“তোর কথা শুনতে হবে? কী কথা শুনি?” সেলভান জিজ্ঞেস করল।

“আগে বলো যে তুমি আমার কথা ফেলবে না।” নন্নন কড়ার করিয়ে নিয়ে চায়।

“তার থেকে বল না বাপু যে একেবারে পিতিজ্ঞে করতে হবে যে আমি তোর কথা শুনব! নে বাবা, বলছি তো আমি তোর কথা শুনব। এবার বল দেখি কী এমন কথা।”

নন্নন সেলভানের কাছে সরে এসে ওর হাতদুটো ধরল। বলল, “এত বড়ো বাগান, এত কিছু কি আমি সামলাতে পারি? তার ওপর এইসব মশলাপাতি বিক্রি করা, গোলমরিচই তো কত কত হয়। তুমি ভিনদেশি বণিকদের চেনো, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারো, এসবের দায়িত্ব তুমি নাও না সেলভানদাদা। নাহলে আর কাকে বলব বলো? বাবা একবার বিশ্বাস করে কীরকম ঠকেছিল সে তো জানোই। এত কিছু যখন করলে আমাদের জন্যে, এইটুকুও করো।” অনুনয় ঝরে পড়ল নন্ননের কণ্ঠস্বরে।

সেলভান কয়েক মুহূর্ত নন্নন আর চেম্মলের মুখের ওপর দৃষ্টি বোলাল। তারপর বলল, “তুই তখন কী বললি চেম্মল? আমার মাথায় নাকি অনেক কিছু আসে? তা তোর এই নন্ননের মাথায়ও তো দেখছি কম কিছু আসে না! সুযোগ বুঝে এমন একখানা কথা বলল! আমার সর্বনাশ হল রে! আমার ঠাকুরদা, ঠাকুমা, বাবা, মা, দাদারা কেউ আমাকে বাঁধতে পারেনি, এ ছেলে আমাকে বেঁধে ফেলল! শুধু কি বেঁধে ফেলা, একেবারে আটকেই ফেললে দেখছি।” হতাশ স্বরে কথাগুলো বলে আবার শুয়ে পড়ল সেলভান।


---

অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ


গল্প: একটি ভূতুড়ে গল্প: অমিতাভ সাহা

 

একটি ভূতুড়ে গল্প


অমিতাভ সাহা



সেবার গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন সেভেন কি এইটে পড়ি। ওখানে আমার সমবয়সী কয়েকজন বন্ধু জোগাড় হয়ে গেল। ওদের সঙ্গে টইটই করে সারাদিন কেটে যেত। কখনো গুলি (মার্বেল) খেলতাম, কখনো ডাংগুলি, কখনো-বা ক্রিকেট। মামাবাড়ি ছিল গ্রামে নদীর ধারে। চারধারে প্রচুর গাছগাছালি। আর নদীর ধারে বাড়ি হওয়াতে কী সুন্দর ঠান্ডা হাওয়া! সেই সময় এখনকার মতো খেলার জায়গার অভাব ছিল না। মামাবাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে সবুজের গালিচা মোড়া একটা বিশাল ফাঁকা মাঠ ছিল। আমরা বন্ধুরা মিলে ওই মাঠে ক্রিকেট খেলতে যেতাম। মাঠটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে জঙ্গলের শুরু।

একদিন বিকেলবেলা আমরা ওই মাঠে ক্রিকেট খেলছিলাম। পল্টু ছিল আমাদের সেরা ব্যাটসম্যান। ও কেতা দেখাতে গিয়ে এত জোরে একটা ছক্কা হাঁকাল যে বল গিয়ে পড়ল জঙ্গলের কাছে একটা ঝোপে। আমরা সবাই মিলে ওই ঝোপের মধ্যে বল খুঁজতে শুরু করে দিলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও বল পেলাম না। ওইদিন আর খেলাও হল না। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে ক্ষান্ত দেব ভাবছিলাম, এমন সময় ঝোপের মধ্যে হঠাৎ পায়ে একটা তারকাটার মতো ফুটল। অসহ্য যন্ত্রণা বোধ হচ্ছিল। একপায়ে দাঁড়িয়ে আরেক পা তুলে কাঁটাটা উপড়ে ফেলে দিলাম। পাশেই দেখি চটের বস্তা কাপড়ের তৈরি একটা জরাজীর্ণ পুতুল ঝোপের মধ্যে পড়ে। হাতে নিয়ে মনে হল, বহুদিনের পুরোনো আর ভেতরে ন্যাকড়া জাতীয় কাপড় ঠুসে দেওয়া হয়েছে। পুতুলের হাত-পা বস্তা কাপড় কেটে চটের সুতো দিয়ে সেলাই করে বানানো। জামার বোতাম দিয়ে বসানো হয়েছে চোখ। মুখটা কালো সুতো দিয়ে সেলাই করা। বিচ্ছিরি দেখতে। কে-বা ফেলে দিয়ে গেছে, আমিও ফেলে দিলাম। সেদিনের মতো খেলার পালা সাঙ্গ করে বাড়ি ফিরে এলাম।

আমার মামাবাড়িতে অনেকগুলো ঘর ছিল, যদিও লোকজন বেশি ছিল না। দাদু-দিদিমা, মামা-মামি, আর আমার ছোট্ট ভাই। আত্মীয়স্বজনেরা যাতে মাঝে মাঝে এসে থাকতে পারে, সেজন্য অনেক বাড়তি ঘর ছিল। আর হ্যাঁ, কাজের লোক রমেশ ছিল। আমি যখন গেছিলাম, তখন দাদু-দিদিমা ছিলেন না, তীর্থ করতে কাশী গিয়েছিলেন। মামা কাপড়ের ব্যাবসা করতেন, সঙ্গে কিছু চাষাবাদও করতেন। সকাল থেকেই কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকতেন। মামি ভাইকে পড়াতেন আর সেই সঙ্গে রান্নাবান্না করতেন। আমার জন্য ভালো ভালো খাবারও বানিয়ে দিতেন। আমি খেয়েদেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে বেরিয়ে পড়তাম। সারাদিন টইটই করে খাবার সময় আবার হাজির হতাম। মামি অনেকসময় বকুনি দিতেন। বলতেন, “এসব বাঁদর ছেলেদের সাথে বেশি মিশো না। তোমার মা বলেছেন দু-বেলা মন দিয়ে পড়াশোনা করতে। তুমি তো দিব্যি ফাঁকি দিয়ে বেড়াচ্ছ।”

আমি শুনতাম ঠিকই, কিন্তু বন্ধুরা ডাকতে এলে আর থাকতে পারতাম না। ‘ক’দিনের জন্যই তো ঘুরতে এসেছি!’ ‘স্কুল খুলে গেলে তো আর হইহই করতে পারব না।’ এসব টুপি-টাপা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে বেরিয়ে যেতাম। দু-একদিনের মধ্যে ভাইয়ের স্কুল ছুটি হয়ে গেল। মামি ভাইকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেলেন। বাড়িতে রইল শুধু কাজের লোক রমেশ। মামা তো সারাদিন বাড়িতে থাকতেনই না, শুধু রাতে আসতেন ঘুমোতে। আমাকে আর উপদেশ দেওয়ার কেউ রইল না। আনন্দে আহ্লাদিত হয়ে উঠলাম। যেমন খুশি বনের পাখি মনের আনন্দে।

যাই হোক, যে কথা বলছিলাম। সেদিনের ক্রিকেট খেলা অসম্পূর্ণ রেখে বাড়ি ফিরে এলাম। রাত্রিবেলা শুয়ে আছি। কাঁটা ফোটার যন্ত্রণায় অনেক রাত অবধি ঘুম আসছিল না। রাত একটা নাগাদ একটু তন্দ্রামতো এসেছে, হঠাৎ মনে হল একটা হাসির রোল এ-কান থেকে ও-কান পর্যন্ত তরঙ্গের মতো বয়ে গেল। কী হল ঠিক বুঝতে পারলাম না। হাসিটা ঠিক নির্মল হাসি নয়। মনে হল, কানের কাছে কেউ এসে একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে গেল। সেই সঙ্গে আমার হৃৎকম্পন বাড়িয়ে দিয়ে গেল। বিছানা ছেড়ে উঠে আলো জ্বাললাম। ঘরে কেউ ছিল না। ভয় ভয় করছিল। দরজা খুলে রান্নাঘরে গিয়ে রমেশকে ডাকলাম। ও সারাদিন পরিশ্রমের পর রান্নাঘরেই ঘুমাত। ও নাক ডেকে সে কী গভীর ঘুম! অনেক ডেকেও ঘুম ভাঙাতে পারলাম না। ফিরে এসে ঘরে আলো জ্বালিয়ে রেখে ঘুমালাম।

পরদিন আবার বন্ধুবান্ধব নিয়ে খেলায় মেতে উঠলাম। আগের রাতের কথা মনে রইল না। খেলা করে ফিরে সন্ধেবেলা পড়তে বসলাম। পড়া শেষে খাওয়াদাওয়া করে বিছানায় শুতে গেলাম। সেদিন জ্যোৎস্না রাত ছিল। খোলা জানালা দিয়ে নদীর সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। ঘরের পাশ দিয়ে একটা মেঠো পথ আড়াআড়িভাবে চলে গেছে। তারপর থেকেই নদীর চর শুরু। চরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। সুন্দর ঠান্ডা হাওয়া আসছিল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। মাঝরাতে প্রচণ্ড গরম লাগছিল। মনে হল হাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। চোখ মেলে জানালার দিকে তাকিয়েছি। মনে হল, জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছায়া হুট করে সরে গেল। একটা আতঙ্ক বুকে বাসা বাঁধল। জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। আবার এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। কিন্তু মনের মধ্যে খুঁত খুঁত করতে লাগল, জানালায় বুঝি কোন অশরীরী দাঁড়িয়ে আছে। যতই ভাবি ওদিকে তাকাব না, তবু মন মানতে চাইল না। মন বলতে লাগল, একবার দেখ না তাকিয়ে কে আছে ওখানে দাঁড়িয়ে।

কৌতূহলটা শান্তিতে থাকতে দিল না। মাথা তুলে আবার যেই জানালার দিকে তাকিয়েছি, আবার মনে হল কোনো ছায়া হঠাৎ করে সরে গেল। আতঙ্ক মনের মধ্যে গেড়ে বসল। সেদিন রাতে আর একা ঘুমানোর সাহস হল না। রান্নাঘরের দরজায় জোরে ধাক্কা দিয়ে রমেশের ঘুম ভাঙিয়ে ওকে আমার ঘরে নিয়ে এসে ঘুমালাম।

পরদিন আর আগের রাতের কথা ভুলতে পারলাম না। সারাদিন ঘুরেফিরে আগের রাতের কথাই মনে পড়তে লাগল। শরীরটা ভালো লাগছিল না। বন্ধুরা ডাকতে এলেও সেদিন আর খেলতে যেতে ইচ্ছে করল না। সারাদিন বাড়িতেই বসে রইলাম। ভাবলাম, বাড়িতে বসে পড়াশোনা করি। কিন্তু পড়াতেও মন বসল না। খুব মনখারাপ করতে লাগল। সারাদিন শুয়ে বসেই কাটালাম। সেদিন রাতেও রমেশকে নিয়েই ঘুমালাম। ও-ব্যাটা সারাদিন পরিশ্রম করে রাতের বেলা মোষের মতো ঘুমোত। আমি খাটে শুয়েছিলাম, ও নীচে বিছানা করে ঘুমিয়েছিল।

অনেক রাতে ঘুমের মধ্যে কীসের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে। প্রথমে ভাবলাম, এত রাতে রমেশ আবার কার সঙ্গে কথা বলছে? পাশ ফিরে দেখি, রমেশ দিব্যি ঘোড়া বেচে ঘুমোচ্ছে। ভালো করে খেয়াল করলাম, ফিসফিসানি আওয়াজটা আমার খাটের নীচ থেকে আসছে। ভীষণ ভয় পেলাম। খাটের নীচে যে উঁকি দিয়ে দেখব, সে সাহস হল না। কিছুক্ষণ পর ফিসফিস শব্দটা আস্তে আস্তে কমতে কমতে একেবারে মিলিয়ে গেল। এসব আমার সঙ্গে কী হচ্ছিল, কিছু বুঝতে পারছিলাম না। একটা অশুভ কিছু যেন প্রত্যেক রাতে বিভিন্নরকমভাবে তার উপস্থিতি প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। আমাকে ভয় দেখাচ্ছিল।

পরপর ক’দিন রাতে আমার ভালো ঘুম হল না। শরীর ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়তে লাগল। উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনাও কমে গেল। একটা ভয় আমাকে সবসময় তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। মনের শান্তি কেড়ে নিয়েছিল। একটা অবসাদ এসে ক্রমশ আমাকে গ্রাস করছিল। খেলাধুলা করার এনার্জিও পাচ্ছিলাম না। কেমন যেন ঝিমিয়ে গেলাম। বন্ধুরা আমাকে খেলার জন্য ডাকতে এসে ফিরে যেত।

রমেশ আমাকে একদিন বলল, “দাদাবাবু, এই ক’দিনে তুমি কেমন যেন ঝিম মেরে গেলে? তোমার কি শরীর খারাপ?”

আমি ওকে ক’দিন ধরে রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো খুলে বললাম। ও বলল, “চলো এক কাজ করি। এখানে বটতলায় এক সন্ন্যাসী বাবা বসেন। ওখানেই বাবার ধাম। উনি মানুষের অনেক ভালোমন্দ বিচার করে থাকেন। ওঁর কাছে গিয়ে তোমাকে একবার দেখিয়ে নিয়ে আসি।”

রমেশকে সঙ্গে নিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। উনি যে বটতলায় বসতেন, সে জায়গাটা বেশি দূরে নয়। পায়ে হেঁটে মিনিট দশেকের পথ। ওখানে যাবার পর বাবার বৃত্তান্ত শুনে বুঝতে পারলাম, উনি একজন সিদ্ধপুরুষ। ওঁর তিনকুলে কেউ নেই। গাছতলায় বসে ঈশ্বরের সাধনা করেন। ভক্তবৃন্দ এসে ফলফলাদি, বিভিন্ন সামগ্রী রেখে যায়। উনি সেসবই আহার করেন। কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে এলে উনি প্রথমে তা শোনেন, তারপর সমস্যা সমাধানের জন্য নানারকম উপায় বাতলে দেন।

আমি ওঁকে বললাম, “আমার শরীর-মন কোনোটাই ভালো নেই। কেমন যেন একটা অবসাদ আমাকে ঘিরে ধরেছে।”

উনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে?”

আমি ওঁকে কয়েক রাত্রি থেকে যেসব ভূতুড়ে কারবার ঘটছিল, সেসব খুলে বললাম।

উনি বললেন, “কবে থেকে এধরনের ঘটনা ঘটছে?”

আমি সেদিন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পায়ে তারকাটা ফোটার কথা বললাম। উনি তখন আমার ডানহাতটা ওঁর হাতের তালুতে ধরে কিছুক্ষণ ধ্যানস্থ হয়ে রইলেন। ওঁর হাতের স্পর্শ পাওয়ামাত্র আমার শরীরে এক অপূর্ব শিহরন খেলে গেল। এক অশুভ শক্তির প্রভাব আমার উপর থেকে কেটে গেল মনে হল। শরীরে যেন এক নতুন স্ফূর্তি ফিরে পেলাম। মনেও অপূর্ব প্রশান্তি এল।

উনি কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে বললেন, “যে স্থানে তোমার পায়ে তারকাটা ফুটেছিল, তার আশেপাশে নিশ্চয়ই কোনো পুতুল পড়ে ছিল?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, ছিল তো।”

তখন উনি বললেন, “ওই পুতুলটিতে ভুডুবিদ্যা প্রয়োগ করা হয়েছিল।”

আমি বললাম, “ভুডুবিদ্যা আবার কী?”

উনি বললেন, “অতীতকালে সমাজে কিছু লোক ছিলেন যারা ব্ল্যাক ম্যাজিক জানতেন। এদের রোজা বলা হত। রোজাদের এমন কিছু ক্ষমতা ছিল, যার দ্বারা তাঁরা প্রেতাত্মাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। প্রেতাত্মাদের দিয়ে তাঁরা অনেক অসম্ভব কাজ করিয়ে নিতেন। আমার যতদূর বিশ্বাস, কোনো রোজা একটি প্রেতাত্মাকে ওই পুতুলের মধ্যে কাঁটা দিয়ে বন্দি করে রেখেছিলেন। কারণ, প্রেতাত্মাটি রোজার দেয়া কোনো কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। তোমার পায়ে কাঁটা ফুটে কাঁটাটি পুতুল থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ায় প্রেতাত্মাটি মুক্তি পেয়েছে। তোমার আশেপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। এজন্যই তুমি রাত্রিবেলা বিভিন্নরকম অতিলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছ।”

আমি বললাম, “এখন আমার করণীয় কী?”

উনি বললেন, “তুমি সঠিক সময়ে আমার কাছে এসেছ। ক’দিন পরেই অমাবস্যা। প্রত্যেক অমাবস্যায় প্রেতাত্মাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তখন ওরা চাইলে মানুষের অনেকরকম ক্ষতিসাধন করতে পারে। এখন আমি তোমাকে একটি রক্ষাকবচ প্রদান করব।”

উনি কিছু গাছের শিকড়বাকড় একটা তাবিজের মধ্যে ভরে আমাকে দিলেন। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সূর্য নমস্কার করে কবচটি ধারণ করতে বললেন। বললেন, “এটি ধারণ করে থাকলে প্রেতাত্মা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।” আরেকটি কথা বললেন, “আমার মনে হয়, তুমি একবার ঐ প্রেতাত্মাটির সম্মুখীন হবে। কিন্তু ভয় পেয়ো না। সেরকম হলে মা দশভুজার মন্ত্র জপ কোরো, সমস্ত বিপদ কেটে যাবে।”

আমি পরদিন সকালেই রক্ষাকবচটি ধারণ করলাম। সেদিন রাত্রি থেকে পরপর তিন-চার দিন আর কোনো ব্যাপার-স্যাপার ঘটল না।

মনে অনেকটা সাহস পেলাম। তারপরই একদিন রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি, গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢিলে সাদা আলখাল্লা পরা একটা একটা আবছা মূর্তি ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। মুখের জায়গাটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। ভয়ে আমার বেহুঁশ হবার অবস্থা। বুকের মধ্যে সমানে হাতুড়ি পিটছিল। তার মধ্যেই আমার সন্ন্যাসী বাবার কথা মনে পড়ল। ওঁর কথামতো চোখ বন্ধ করে একাগ্র চিত্তে মা দশভুজার মন্ত্র জপ করতে শুরু করলাম।

‘ওম সার্বা স্বরূপা সার্বেশা, সর্ব শক্তি সমনভিতা

ভায়াভায়াসত্রাহি নো দেবী, 

দুর্গাদেবী নমোহস্তুতে…’

মন্ত্রোচ্চারণ করার পর চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি মূর্তিটা অদৃশ্য হয়ে গেছে।

ক’দিন পরেই আমার স্কুল খুলে গেল। বাড়ি চলে এলাম। কিন্তু সেই মূর্তি আর কখনো চোখের সামনে আসেনি। সেবার মামাবাড়ি গিয়ে সেই ভূতুড়ে অভিজ্ঞতার কথা আজও ভুলতে পারিনি। 


___

অঙ্কনশিল্পীঃ পল্লবী বর্ধন