গল্প: কেউ ফেরেনি: উপাসনা পুরকায়স্থ

 

কেউ ফেরেনি


উপাসনা পুরকায়স্থ



বাবাকে নিয়ে এসেছিলাম কলকাতায় একজন ভালো ডাক্তার দেখাব বলে। বহুদিন হল বাবার খুসখুসে কাশি, গলাব্যথা, খাবার গিলতে গিয়ে কষ্ট, বুকে সময় সময় একটা চাপ চাপ অনুভূতি। বালুরঘাট মফস্বল শহরটিতে ভালো ডাক্তারের বড্ড অভাব, তাই এই কলকাতায় আসা। এক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কের উচ্চপদস্থ অফিসার হওয়ার সুবাদে অফিস অনুমোদিত একটি মেডিকেল ফ্ল্যাট পেয়েছি সল্ট লেকের বি-ডি ব্লকে। আমার বৃদ্ধ বাবার দীর্ঘ অসুস্থতার কারণ হিসেবে প্রদর্শিত ডাক্তারি কাগজপত্র যথার্থ বিবেচনায় অফিস আমার আবেদনে সাড়া দেয়।

হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে ট্যাক্সিতে মালপত্র চাপিয়ে বি-ডি ব্লকের সেই ফ্ল্যাট খুঁজেপেতে যখন বের করেছি, রাত তখন সাড়ে ন’টা। এই প্রথমবারই জরুরি ভিত্তিতে আমাকে কোথাও মেডিকেল ফ্ল্যাট নিতে হল। এক ঝলক দেখে মনে হল, এ তো আমাদের ব্যাঙ্কের বেশ বড়সড় একটি আবাসনই বটে! তাতে ক’টা ব্লক, গেইটে দারোয়ান, ঝলমলে নিয়ন আলো, গাছপালা-বাগান শোভিত সুদৃশ্য পরিবেশ। এখানে আসার আগে খবর নিয়ে জেনেছিলাম, কলকাতায় ব্যাঙ্ক আবাসনেরই ক’টা ফ্ল্যাটকে এখানে মেডিকেল ফ্ল্যাট হিসেবে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে আবাসনের কেয়ারটেকার এসে সঙ্গে আনা অফিসের কাগজপত্র মিলিয়ে, গেটের উলটোদিকের একটি ফ্ল্যাটের দরজা খুলে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। মালপত্র সব ঘরে ঢুকিয়ে ফেলার পর উজ্জ্বল আলোয় ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দুটো বেডরুম, সুন্দর আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো গোছানো একখানা ফ্ল্যাট। একপাশে বাথরুম কাম টয়লেট, রান্নাঘর, ডাইনিং, ড্রয়িং ও বসার জায়গা—সব মিলে থাকা-খাওয়ার ভালোই ব্যবস্থা।

এদিকে ফ্ল্যাটটাতে পা রাখতে না রাখতে ঘন মেঘে আবৃত ভারমুখো আকাশটা থেকে হঠাৎই বৃষ্টি নামল ঝমঝম। একে তো বৃষ্টিবাদলের রাত, তার উপর অত রাতে সব জোগাড়যন্ত্র করে নিজে রান্নাবান্না করে খাওয়াদাওয়া করা তো চাট্টিখানি কথা নয়, তাই গেটের দারোয়ান কমল সিংকে জিজ্ঞাসাবাদ করে একটি হোম ডেলিভারির ফোন নং জোগাড় করলাম। তারপর ওই নাম্বারে ফোন করতে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে একটি বাচ্চা ছেলে ছাতা মাথায় রুটি-সবজি এনে ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেল।

এখানকার কেয়ারটেকারের নাম লালাবাবু। উনি এসে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দেবার পর মনে হচ্ছিল, কে জানে কতদিন হয়তো এ ফ্ল্যাটের দরজাই খোলা হয়নি। কারণ, গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে ব্যাঙ্কের উচ্চপদস্থ কর্মচারী কেউ আবেদন করলেই কেবলমাত্র এই ফ্ল্যাট পাওয়া সম্ভব। এমনিতে যতটুকু চোখে দেখছি, যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দেওয়াল-মেঝে-বিছানাপত্র-আসবাব সবকিছু। তবু তো মেডিকেল ফ্ল্যাট বলে কথা—কত কী অসুস্থতা নিয়ে রোগীরা এখানে এসে থাকেন। কাল সকালে না হয় একজন সাফাই কর্মী ডেকে আরো একটু পরিষ্কার করিয়ে নেওয়া যাবে। আলো জ্বেলে চারদিক ঘুরে ঘুরে যা দেখলাম, তাতে মনে হল সব ব্যাবস্থাপনাই এখানে যথেষ্ট রাজকীয়। রয়েছে ঢাউস একখানা রান্নাঘরও। সেখানে রান্না করার মতো প্রয়োজনীয় বাসনপত্র, খাবার টেবিল। একজন অসুস্থ মানুষ ক’টা দিন নিয়ম মেনে এখানে যথেষ্ট ভালোভাবেই কাটিয়ে যেতে পারেন।

ভাবছিলাম, কেবলমাত্র এই এক অফিসে চাকরি করার সুবাদে কলকাতার মতো জায়গায় অত সুযোগ-সুবিধা—এ তো যথেষ্ট ভাগ্যের ব্যাপার। তাছাড়া কলকাতা শহর বলে এখানে ফোন করলেই হোম ডেলিভারি অত রাতে অমন ঝড়বৃষ্টিতেও ঘরে এনে খাবার পৌঁছে দিয়ে যায়—এও তো বড়ো কম কথা নয়!

হাওড়া স্টেশনে নামার পর থেকে এই মেঘলা আকাশ, সঙ্গে গুমোট গরম—শরীর ঘেমে-নেয়ে, জামাকাপড় গায়ে সেঁটে গিয়ে বড়ো অস্বস্তি অনুভব করছিলাম। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামাতে বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি এখন যথেষ্ট উপভোগ্য বলেই মনে হচ্ছে। ভাবছিলাম, ভালো করে একচোট ঘুমিয়ে নেব আগে, তারপর কাল ঘুম ভাঙলে বাবার চিকিৎসার ব্যাপারে সঠিক চিন্তাভাবনা করে এগোনো যাবে। যাই হোক, হাত-পা ধুয়ে, জামাকাপড় পালটে, খাবার খেয়ে নিতে হবে আগে, বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে এখন।

আমার পোশাকি নাম গণপতি—গণপতি দত্ত। বাড়ির সকলে আদর করে আমায় গণেশ বলে ডাকে। বোধ করি কেয়ারটেকার ভদ্রলোকের নির্দেশেই একটি ছেলে, ময়লা গায়ের রঙ, ছিপছিপে গড়ন, আন্দাজ বছর উনিশ-কুড়ি হবে বয়স, জগে করে খাবার জল আর দুটো কাচের গ্লাস নিয়ে এল। ও এসে ঘরে ঢুকতে জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমার নাম কী?”

ছেলেটি বলল, “ভোলা। আমি এখানে ফাইফরমাশ খাটার কাজ করি বাবু। কিছু দরকার তো আমাকে বলবেন।”

বললাম, “ঠিক আছে। কাল একজন সাফাই কর্মী পাঠিয়ে দিও, কেমন? ঘরটাকে একটু সাফ করিয়ে নেব। এখানে তো এখন কিছুদিন থাকব আমরা, মানে আমি ও আমার বাবা। তা এখন আর কিছু কাজ নেই, কাল এসো।”

ভোলা তবু নড়ে না, দাঁড়িয়েই থাকে। মাথা নীচু করে মেঝেতে পায়ের আঙুল ঘষতে থাকে কেবল। তারপর বলে, “কাল সকাল সাতটায় কি চা দিয়ে যাব বাবু? আপনি বললে বানিয়ে নিয়ে আসব। অবশ্য সে আপনার ইচ্ছে। এখানে আমারাও খাবার বানাই, আমি আর গোপাল যাদব। মাঠের ও-পাশে রান্নাঘর আছে। সেক্ষেত্রে আমরা কেবল খাবারের দামটা ধরে নিই শুধু। সকাল সাতটায় চা, বারোটায় দুপুরের খাবার, আর রাত আটটার মধ্যে রাতের খাবার। এখন তো দশটার উপর, তাই রান্নাঘর বন্ধ হয়ে গেছে বাবু। এখানে ওটাই নিয়ম।”

একশ্বাসে অতটা বলার পর ভোলা একটু থামল। তারপর মিনমিন করে বলল, “আর আপনাদের নিজে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা তো রয়েইছে। তা যা ভালো মনে হয় করবেন। ভালো কথা, কাল রজনীগন্ধা ফুলের তোড়া এনে এখানে ফুলদানিগুলোতে সাজিয়ে দেব।”

দুটো খালি ফুলদানি, একটা খাবার টেবিলে, আরেকটা বসবার ঘরের টেবিলে চোখে পড়েছিল। বললাম, “আচ্ছা, ঠিক আছে। খাবারের ব্যাপারটা কাল ভেবে বলব।”

এবারে ভোলার প্রশ্ন, “কার শরীর খারাপ বাবু? আপনার? আমরা যত্ন করে তেল-মশলা ছাড়াই রান্না করে দিই।”

বললাম, “তা ভালো। জানা হয়ে গেল। শরীর খারাপ আমার বাবার। এখন কিছু চাই না, তুমি এসো।”

ভোলা চলে গেলে আমরা হাত-মুখ ধুয়ে রুটি-সবজির প্যাকেটগুলো খুলে খাবার টেবিলে সাজিয়ে নিয়ে খেতে বসে গেলাম। রুটি আর আলু-পটলের তরকারি, সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা আর খানিকটা স্যালাডও রয়েছে।

খাবার খেয়ে বাথরুম সেরে ঘরের সব আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম দুজনেই। দুটো শোবার ঘরেই পরিপাটি করে বিছানা পাতা রয়েছে যখন, আরাম করে হাত-পা ছড়িয়েই-বা শোব না কেন? একটি ঘরে আমি একা, আর পাশের ঘরে বাবা। গেটে দারোয়ান রয়েছে, ভাবনার কিছু নেই। তাই আমার খাটের পাশের জানালাটাও খুলে দিলাম। বেশ জোরে বৃষ্টি পড়ছে এখনো, তাতে বৃষ্টির ছাঁট আসছে খোলা জানালা পথে। তবু বড্ড আরাম বোধ হচ্ছিল। বিছানা থেকে জানালার দূরত্ব হাত দেড়েক, তাই ওটা আপাতত খোলাই রইল। খুঁজে খুঁজেও শোবার ঘরে কোনো ডিম-লাইট বা রাত-বাতির অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারিনি। তা হোক, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুয়ে পড়তে হবে এখন। আগামীকাল আবার ডাক্তারের খোঁজে ছুটতে হবে, অনেক কাজ। না ঘুমোলে পরদিন এত ঝক্কি সামলানো কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠবে।

ভাবছিলাম, হলই না হয় ঘুরঘুট্টি অন্ধকার ঘর, তবু তো এই ঝমঝম বৃষ্টি আর ঠান্ডা আবহাওয়াতে প্যাঁচপ্যাঁচে গরম, ঘাম এবং রেল ভ্রমণের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে শরীর জুড়ে এখন এক অপরিসীম স্বস্তি। এই অবস্থায় একবার যদি ঘুমের দেশের মাসি-পিসি এসে চোখের এই কোমল পাতায় পিঁড়ি পেতে বসে পড়ে, তাহলে যাকে বলে একেবারে চরম নিশ্চিন্তি।

মূহূর্তে সকল সমস্যার সমাধান। ভেতরদিককার শোবার ঘরে বাবা শুয়ে পড়তে, তাঁর ঘরের লাইট নিভিয়ে আমি অন্য শোবার ঘরটিতে চলে এলাম।

ভালো থাকা-খাওয়া, ওসব কিছুর ব্যাপারে আমার বাবা অবশ্য চিরটা কাল যাকে বলে একেবারে উদাসীন প্রকৃতির এক মানুষ। ঘামে ভেজা ফতুয়া আর ধুতি পরে দিনরাত ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের পরও সংসারের বাকি সকলের মুখে হাসি ফোটাতে তাঁর অপরিসীম যত্ন। বরাবর সুখদুঃখ ওসব কিছুর ঊর্ধ্বেই যেন তাঁর নিজের অবস্থান। ভাবছিলাম, এখানে চিকিৎসাটুকু ঠিকঠাক হলে মানুষটা যদি একটু আরাম পান, তাতেই আমার শান্তি। আর সেজন্যেই কষ্ট করে এখানে আসা।

যাই হোক, অন্ধকার বিছানায় শুয়ে শুয়েই কানে আসছিল বাইরে অঝোর ধারায় বর্ষণের আওয়াজ, কান ফাটানো বজ্রপাত, আর খোলা জানালা পথে বিদ্যুতের ঝিলিক। নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ক্লান্তিতে আমার দুটো চোখের পাতা কখন যে বুজে এসেছিল, আর কখন যে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম জানি না।

ভারী কোনো কিছু পতনের শব্দে যখন ঘুম ভাঙল, রাত তখন ক’টা কে জানে। তারপরই সব চুপচাপ। পরক্ষণেই একটা ভয়ানক দুর্গন্ধ এসে নাকে লাগল। উফ্, অমন তীব্র নরক-গন্ধ কোথা থেকে আসছে! ইঁদুর-টিদুর মরে পচে গেলে যেমন গন্ধ হয়, খানিকটা সেরকমই। কিন্তু আরো আরো তীব্র সেটা, আর কেমন যেন অসহনীয়। ঘরে কোথাও ইঁদুর-ছুঁচো কিছু মরে পচে রয়েছে না তো! কিন্তু ঘুমোবার আগে ওসব কিছুই তো ছিল না! বালিশ থেকে তোয়ালেটা উঠিয়ে নিয়ে নাকে চাপা দিলাম, আর তাতে খানিকটা যেন স্বস্তি পাওয়া গেল। দেখছিলাম, ওপাশের খোলা জানালায় গ্রিলের ফাঁক গলে হালকা চাঁদের আলোর আঁকিবুঁকি আমার বিছানা আর মেঝের কতকটা জুড়ে। তার মানে বৃষ্টি থেমে গেছে কখন।

আমার মনে এখন প্রবল খটকা, কীসের আওয়াজ হল ওটা? ওসব যখন ভাবছি, কোথা থেকে আবার একটা গোঙানোর মতো আওয়াজ ভেসে এল কানে, একটানা। কে যেন প্রবল যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আমার বাবার গলার আওয়াজ নয় তো! বাবা খাট থেকে পড়ে-টড়ে গেলেন না তো! মুহূর্তে আমার বুকের ভেতরে হাজারো হাতুরির ঘা। বাবা ঠিক আছেন তো! সর্বনাশ! বাবা খাট থেকে পড়ে গেলে, এখন কী হবে! হায় হায়, কেন অমন অসুস্থ বাবাকে একা এক ঘরে শুতে দিতে গেলাম আমি? ভয়ে ভাবনায় শরীরটা আমার কাঁপতে শুরু করল।

হাতড়ে হাতড়ে বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা খুঁজে পেলাম। সময় দেখাচ্ছে রাত পৌনে চার। মোবাইল-টর্চটা জ্বালিয়ে খাট থেকে এবারে নেমে পড়লাম। টর্চের আলোয় সুইচ বোর্ডটা আবিষ্কার করে সবগুলো সুইচ টিপে টিপে অন করে ফেললাম। নাহ্‌, তবু আলো জ্বলল না। বুঝতে পারলাম লোডশেডিং হয়ে গেছে হয়তো। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত আর ঝড়ো হাওয়াই বোধ হয় এর কারণ। সঙ্গে আবার ও রে বাবা, কী গন্ধ, কী গন্ধ! বাঁহাতে তোয়ালেটাকে নাকে চেপে আছি বলে বেঁচে আছি বোধ হয়। তোয়ালে সরিয়েছি একটু তো, পাগল হবার জোগাড়! মোবাইলের টর্চটাকে ভরসা করেই পা টিপে টিপে কোনোরকমে বাবার ঘরে গিয়ে পৌঁছলাম। বিছানায় আলো ফেলতে খানিক নিশ্চিন্তি—বাবা চিত হয়ে শুয়ে আছেন খাটের উপরে। তারপর আলোটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাবার গায়ে মুখে ফেলে, তাঁর বুকে হাত দিয়ে ভালো করে দেখলাম, নাহ্‌, বাবা তো অকাতরে ঘুমোচ্ছেন, হালকা নাক ডাকছে। তার মানে তো আমার বাবা ঠিকঠাক আছেন। বাবাকে ঘুমোতে দেখে অনেকটাই স্বস্তি পেলাম এবারে। আমার বাবা ঠিক আছেন, আমার বাবা ঠিক আছেন। বাবার কিছু হয়নি তাহলে।

কী মনে হতে মোবাইলের আলোটাকে খাটের তলার দিকে নিয়ে গেলাম। বৈদ্যুতিক আলোয় পুরো ঘরটাই তো ঘুমোবার আগে দেখেছিলাম, কেবল দুটো খাটের তলা ছাড়া। কিছু মাকড়সার জাল এদিকে ওদিকে— আলো চোখে পড়তেই বুঝি ইঞ্চি দুয়েক লম্বা একটি কালো রঙের বিদঘুটে মাকড়সা নড়েচড়ে তার স্থানবদল করতে ব্যস্ত হল। আমার খাটের তলাটাও একটু দেখে এলাম। খানিক ঝুল-টুল ছাড়া কোথাও আর কোনো কিছু চোখে পড়ল না। নাকে চেপে রাখা তোয়ালেটা এখন নাক থেকে সরিয়ে ফেলতে মনে হল, সেই বিদঘুটে গন্ধটা যেন এখন আর নেই।

ভাবছিলাম, এ কি তবে সবটাই আমার মনের ভুল! স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে উলটোপালটা কীসব শুনছি আর ভাবছি! তা ওই যে শব্দ, গন্ধ—ওগুলোই-বা তাহলে কী? ঘুমোতে যাবার আগে তো ওসব কিছুই ছিল না। সবটাই কি তাহলে আমার মনের ভুল? এত বেসামাল কেন হয়ে পড়ি মাঝে মাঝে, কে জানে!

শিলংয়ের কাছে সোনারপুরে বেশ ক’বছর আগে একটি বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। বাঁক নিতে গিয়ে ষাট ফুট গভীর খাদে পড়ে গিয়েছিল সেটি। দুর্ঘটনাগ্রস্ত সেই বাসে আমি নিজেও যাত্রী ছিলাম। নিজের চোখে দেখা সেই নারকীয় দৃশ্যই বুঝি আমার অজান্তে আজ এতকাল ধরে অবচেতন মনে আমাকে কেবল ভয় দেখিয়েই যাচ্ছে। আমি একা একটি মাত্র লোক সেদিন ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় বেঁচে ফিরেছিলাম। কিন্তু হায় ভগবান, আজ এত কাল বাদে এ কী হাল হল আমার! কী দুশ্চিন্তায়ই না পড়েছিলাম এই এক্ষুনি! বৃষ্টিভেজা দিন, তবু শরীর বেয়ে দরদরিয়ে ঘাম নামছে। নাকমুখ দিয়ে গরম বাতাস বেরোচ্ছে। কানমাথা ঝিমঝিম করছে। বিনা কারণেই বুঝি কতগুলো অহেতুক দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনা আমার মাথায় এসে জুটে বাসা বানিয়ে ফেলে!

বাবা ঘুমোচ্ছেন, কিন্তু এই অসময়ে আমার ঘুম ভেঙে যাওয়াতে চোখদুটো কেমন যেন জ্বালা জ্বালা করছে। চোখেমুখে জল ঝাপটা দেব, আর সঙ্গে বাথরুমটাও সেরে নেব। তারপর ফিরে এসে খানিক ঘুমোব। এই ভেবে সন্তর্পণে বাবার শোবার ঘর লাগোয়া সেই বাথরুমটার দিকে পা বাড়ালাম। অমন অচেনা জায়গায় রাতের অন্ধকারে... বুকের ভেতরে কেমন এক ঢিপঢিপ আওয়াজ। ওটাই বুঝি হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন। এ কী! নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছি যে! ওরকম কেন হচ্ছে আবার! রাত্রে শোবার আগেও তো এই বাথরুমটাই ব্যবহার করেছিলাম— তবে!

বাথরুমের দিকে ক’পা এগোতেই আবার সেই গোঙানোর আওয়াজটা! আরো তীব্র্র এবারে। বাথরুমের বাইরের ছিটকিনিটা খুলে ভেতরে মোবাইলের আলো ফেললাম। সেই বোঁটকা গন্ধটা ফের তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে নাকে এসে লাগল। কিন্তু মোবাইল-টর্চের আলোয় যা দেখলাম, তাতে আমার গোটা শরীর অসাড় হয়ে গেল। সেই মূহূর্তে নিজের শরীরটাকে আর বুঝি সামলে রাখতে পারিনি, বেহুঁশ হয়ে ওই শক্ত মেঝের ওপর পড়ে গিয়েছিলাম, আর কিছু মনে নেই।

দেখেছিলাম, বাথরুমের মেঝেয় রক্ত-বন্যা! আর তার উপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে একটি মাঝবয়সী লোক। চোখদুটো তার অক্ষিকোটর থেকে ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ফাটা থেতলানো মাথার চারপাশে হলদে-সাদা ঘিলুগুলো সব ছড়ানো। খালি গা, পরনে একটা গাঢ় নীল রঙের টার্কিসের তোয়ালে।

আজ ভাবতে গিয়েও শিউরে উঠি, এ আমি কী দেখেছিলাম সেদিন!

হুঁশ ফিরতে দেখলাম, আমি বাথরুমের দরজার বাইরে আড়াআড়ি শুয়ে রয়েছি। এখন বুঝি লোডশেডিং আর নেই, চারদিকে আলোয় আলোময়। চারদিকের সবক’টা আলোই বুঝি সুইচ টিপে জ্বালিয়ে ফেলা হয়েছে এখন। কেয়ারটেকার, ভোলা, গেটের দারোয়ান কমলসিং সকলে আমার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে। সকলেরই চোখে মুখে প্রবল উদ্বেগ আর ভয়ের চিহ্ন সুস্পষ্ট।

মাথাটা কেমন যেন ভার ভার বোধ হচ্ছে। চোখে মুখে বুঝি জল-ঝাপটা দেওয়া হয়েছে। মাথা, মুখ, ঘাড় আর পরে থাকা টি-শার্টেরও খানিকটা ভিজে জবজবে হয়ে আছে। হাত খানেক দূরত্বে আমার মোবাইলটা পড়ে রয়েছে।

দু-হাতে বাবাকে আঁকড়ে ধরেই উঠতে যাচ্ছিলাম। কারণ, বাবা পাশেই বসেছিলেন আমার মাথাটা কোলে নিয়ে। বাবা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “এখন তোমার কেমন বোধ হচ্ছে গণেশ? দাঁড়াও, তোমাকে এখন বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিতে হবে আগে। কী করে যে পড়ে গেলি বাবা! সকাল হোক, একটা ডাক্তার ডাকাও বড্ড দরকার। মাথায়-টাথায় কোথাও লেগে থাকলে বাইরে থেকে তো কিছু বোঝার উপায় নেই। শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গিয়ে তোকে ওখানে দেখে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম একেবারে। আমার অমন জোর চিৎকার শুনে বুঝি এরা সকলে ঘুম ভেঙে দৌড়ে এল।”

কমল সিং বলল, কী যে বলেন স্যার, আমার তো জেগে থাকাই কাজ। আর অমন বিপদে না এসে কেউ পারে! লালাবাবু আর ভোলাকে তো আমিই ডেকে নিয়ে এলাম। তা এখানে এই আবাসনের ভেতর ডিসপেনসারি রয়েছে, বেলা দশটা নাগাদ রোজই ডাক্তারবাবু আসেন স্যার।”

এদিকে আমার চোখের সামনে ভাসছিল সেই দৃশ্য! বাথরুমের মেঝেয় রক্ত-বন্যা, একটি মাঝবয়সী লোক উপুড় হয়ে পড়ে আছে। চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে, মাথার ঘিলুগুলো সব চারদিকে ছড়ানো।

সকলের আপত্তি আর বারণ উপেক্ষা করে, মনে বল সঞ্চয় করে আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। পাদুটো ভারী আর অবশমতো লাগছে। তার মানে ভালোই চোট লেগেছে মনে হচ্ছে। উঠেই কোনোদিকে না তাকিয়ে বাথরুমের ওদিকটাতে ঘুরে দাঁড়াই। বাবা বললেন, “বাথরুম যাবে গণেশ? যাও। তবে অন্ধকার বাথরুমে আর কখনো নয়। তখনো বুঝি তুমি আলো না জ্বালিয়েই যাচ্ছিলে, তাই অমন করে পড়ে গেলে।”

ভাবছিলাম, বাবা কত কী বলছে। আলো জ্বালাব কী, তখন তো সম্ভবত লোডশেডিংই ছিল।

আমি বাবার কথার জবাব না দিয়ে দরজার পাল্লাদুটো এক ধাক্কায় হাট খুলে দিয়ে বাথরুমের ভেতরটা দেখতে গিয়ে তো থ হয়ে গেলাম একেবারে। এ কী, নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না যে! কোথায় কী? এ তো দেখছি ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার মেঝে! তখন নিজের চোখে দেখা ওসব কোন কিছুর বিন্দুমাত্র চিহ্নটি যে নেই কোথাও! চোখদুটোকে ভালো করে রগড়ে নিয়ে ফের তাকাই। নাহ্‌, নেই। কিচ্ছুটি নেই।

পায়ে পায়ে আমার নিজের বিছানা ঘরে চলে আসি, সঙ্গে বাবা আর ভোলা। বাবার উদ্বেগ নিরসন করতে বাবাকে বললাম, “ডাক্তারের কোনো প্রয়োজন হবে না বাবা, আমি ঠিক আছি।”

গেটের দায়িত্ব, তাই বুঝি দারোয়ান দ্রুত ফিরে গেছে। কেয়াটেকার ভদ্রলোকও। ভোলা তখনো দাঁড়িয়ে। আমি ভোলাকে বললাম, “একটা ট্যাক্সি ডেকে দিবি ভোলা, বুঝলি। ব্যারাকপুরে আমার মাসতুতো দিদির বাড়ি যাব।”

ভোলা মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে, আমি ডেকে দেব। তবে আমি জানি, আপনি আর ফিরবেন না। অমন ফিরব-টিরব সবাই-ই বলে, তবে কেউ আর ফিরে আসে না বাবু, কেউ ফেরেনি।”

কথাগুলো বলে ফেলেই ভোলা কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল বুঝি। বাঁহাতে মাথা চুলকোতে লাগল।

আমি বললাম, “কেন কেন, ও-কথা বললি কেন?” ধমকে ওঠলাম আমি, “কেন বলছ ও-কথা, শিগগির বলো!”

ভয়ার্ত মুখে ভোলা বলল, “আমি তা জানি। কাউকে বলবেন না বাবু, কথাটা আমি বলেছি বলে। কেউ জানতে পারলে আমার আর চাকরি থাকবে না গো বাবু! এখানে প্রভুপাদর আত্মা আজও ঘুরে বেড়ায়। ওঁর পারলৌকিক কাজকর্ম কিছুই হয়নি যে! কাল বুঝি আপনি ওঁর দেখা পেয়েছেন?”

আমি ওর কথার জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “প্রভুপাদ কে, ভোলা?”

ভোলা বলল, “সে তিনি তো নাকি আপনাদের অফিসেরই রিটায়ার্ড অফিসার। চিকিৎসা করাতে এসে বহুদিন এখানে ছিলেন। কুঁদঘাটের কোন এক ডাক্তারের কাছে তাঁর চিকিৎসা চলছিল।”

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তা কী অসুস্থতা ছিল ওঁর?”

ভোলা বলল, “ব্রেনে টিউমার না কী হয়েছিল। অপারেশনে বড্ড ভয় ছিল বাবুর। বলতেন, ওঁর স্ত্রী নেই, ছেলেমেয়ে নেই—তিনকুলে আর কেউ নেই।” ভোলা বলতে থাকে, “তারপর একরাতে বাথরুমে পড়ে গিয়েই সবশেষ। বডিটা একদিন আমিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম। তিনদিন ধরে দরজা বন্ধ, খোলে না, দুর্গন্ধ আসছিল খুব। তারপর মিস্ত্রি ডেকে দরজা ভাঙতে দেখলাম, বাথরুমে বডি পড়ে আছে। মাথা ফেটে চৌচির, ঘিলু সব চারদিকে ছড়িয়ে। শুকনো জমাটবাঁধা কত রক্ত! অবশেষে এই আমরাই নিমতলায় নিয়ে গিয়ে দাহকর্ম করেছি। ব্যস, আর কিছু নয়। একটু নাম সংকীর্তন, পারলৌকিক কাজ—কিছুই তো হল না বাবু।”

কিছুক্ষণ ভোলা চুপ করে থাকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “এই ঘটনার তো মাস ছয় হয়ে গেল, তবু আজ অবধি এই ফ্ল্যাটে কেউ এলেই রাতবিরেতে এক দুর্গন্ধ সকলকে তাড়া করে বেড়ায়।”

ও-পাশে খোলা জানালা পথে বাইরে তাকিয়ে দেখি, রাত্রির অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোরের আলো ফুটি ফুটি। কোথাও একটা মোরগ ডেকে উঠল, কঁক্করকোঁ-কঁক্করকোঁ।

আমি বললাম, “ভোলা, এই সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরোব, ট্যাক্সি ডেকে দিও তো একটা। এখন যাও।”

তারপর বাবাকে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে বলেছিলাম, কারণ এখানে একটা রাতও আর নয়।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী


No comments:

Post a Comment