গল্প: ফুটকি: বিজয় বোস

 

ফুটকি


বিজয় বোস




মিষ্টির রাগটা অবশেষে প্রকাশ্যে এল। অনেকদিন ধরেই ভেতরে ভেতরে ছাইচাপা আগুনের মতো রাগটাকে দমিয়ে রেখেছিল ও, কিন্তু আজ সব সহ্যের বাঁধ ভাঙল মিষ্টির। পাঁচ ঘণ্টা হয়ে গেছে কারেন্ট নেই। কারেন্ট যাবার রোগটা অবশ্য ব্যাঙ্গালোরের নতুন কিছু নয়। আগে সর্দিকাশির মতো খুকখুকে ছিল, এখন তা করোনার মতো অতিমারীর আকার নিয়েছে। আকাশে স্ট্র্যাটাস, সিরোস্ট্র্যাটাস, কিউমুলাস, অল্টোকিউমুলাস—যে ধরনের মেঘই থাকুক না কেন, কারেন্ট ঘরপোড়া গরুর মতো মেঘ দেখলেই পালায়, সিঁদুরে হবার অপেক্ষাতে না থেকেই। আর রাতের বেলা কারেন্ট গেলে কারই বা মাথার ঠিক থাকে? তাই আপাত শান্ত মিষ্টিও একসময় মাথা গরম করে ফেলল। পরিচিত শান্ত স্বভাবের একশো আশি ডিগ্রি বিপরীতে গিয়ে হাতে ধরা স্টিলের গ্লাসটা সজোরে মাটিতে আছড়ে ফেলে চিৎকার করে বলে উঠল, “আমি আর এ বাড়িতে থাকব না।”

মিষ্টির বাবা বিমল ভট্টাচার্য বেসরকারি অফিসে কর্মরত। কলকাতা থেকে সবে ট্রান্সফার নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে এসেছেন। প্রথম প্রথম অফিস থেকে দিন পনেরো থাকার মতো একটা গেস্ট হাউস দিয়েছিল, কিন্তু তারপরের ব্যবস্থাটা ওঁকে নিজেকেই করে নিতে হয়েছিল। এদিক ওদিক ঘুরে খুঁজেপেতে একটা ছোটো এক কামরার ফ্ল্যাট জোগাড় করে ফেললেন উনি। ফ্ল্যাটটা দোতলায়, আলো-হওয়ার কমতি নেই। কিন্তু গণ্ডগোলটা বাধল অন্য জায়গায়। বাড়িতে আরো পাঁচটা ফ্যামিলি ভাড়া থাকে। জলের সমস্যা, কাপড় শুকোতে দেওয়ার সমস্যা, যখন তখন পাড়ার মন্দিরের চাঁদা চাইতে আসার সমস্যা দিনে দিনে প্রকট হতে লাগল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কারেন্ট। কলকাতায় সেশন শেষ করে মিষ্টি যখন ব্যাঙ্গালোর এল তখন ও আট। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ, নতুন জায়গা ও অচেনা লোকজনের মাঝখানে শান্ত মিষ্টি যেন আরো চুপচাপ হয়ে গেল। চারদিকে শয়ে শয়ে বাড়ির জঙ্গলে মিষ্টি খোলা আকাশ, খেলার মাঠ, পুকুর এসব ধীরে ধীরে ভুলে যেতে লাগল। আর লোডশেডিং একসময় ওকে অতিষ্ট করে তুলল। অতঃপর ধৈর্যচ্যুতি, ‘আমি আর এ বাড়িতে থাকব না।’

বাবা বললেন, “এরকম করে না সোনা।”

মিষ্টি বলল, এটা বাজে বাড়ি, কারেন্ট থাকে না। আমি অন্য বাড়িতে যাব।”

মিষ্টি সাধারণত কাঁদে না, কিন্তু অসহায় দু-চোখ দিয়ে গড়িয়ে আসা জলের ধারা আটকাতে পারল না। বিমলবাবু ঠিক করলেন, পরদিন সকালেই নতুন বাড়ির খোঁজে বেরোবেন। ব্যাঙ্গালোরে সুস্থ বাড়ি বললেই পাওয়া যায় না। তার জন্য প্রচুর ঘোরাঘুরি, দর কষাকষি করতে হয়। প্রায় সারারাত জেগে ইন্টারনেট দেখে দেখে উনি বেশ কয়েকটা পছন্দমতো বাড়ির ফোন নম্বর জোগাড় করে ফেললেন।

পরদিন সকালে মিষ্টি বলল, “আমিও যাব তোমার সঙ্গে।”

“কিন্তু আমার যে অনেক দেরি হবে।” বিমলবাবু বললেন।

মিষ্টি কিন্তু নাছোড়। ও গোঁ ধরে বসে থেকে বলল, “হোক। আমি এখানে থাকব না, আমিও যাব।”

অতঃপর ঘুরে ঘুরে পাঁচ-সাতটা বাড়ি দেখার পর আট নম্বর বাড়িটা বিমলবাবুর বেশ পছন্দ হল। চারতলার ওপরে, সামনেটা অনেকটা খালি জমি, আলো-বাতাসের কোনো অভাব নেই। ঘরগুলো বেশ বড়োই, সঙ্গে একটা ব্যালকনিও আছে। তার সঙ্গে চারতলায় ওঠার জন্য লিফট আর চব্বিশ ঘণ্টা পাওয়ার ব্যাক-আপের ব্যবস্থা। খরচ একটু বেশি, কিন্তু বিমলবাবু হিসেব করে দেখলেন মোটামুটি টেনেটুনে চালিয়ে নিতে পারবেন। আর তাছাড়া এটাই মিষ্টির বেড়ে ওঠার বয়স, ওরও খোলামেলা পরিবেশ প্রয়োজন। আর লোডশেডিংয়ের ঝামেলাটাও নেই। বিমলবাবু বাড়ি নেওয়ার ব্যাপারটা মোটামুটি পাকা করে এলেন। সঙ্গে হাজার তিনেক টাকা অ্যাডভান্স। মিষ্টিও বাড়িটা দেখে খুব খুশি। ও বাবার জামা টেনে বলল, “তাড়াতাড়ি চলো, মাকে নতুন বাড়ির ছবি দেখাব।”



বিমলবাবুর স্কুটারের সামনের জায়গাটায় দাঁড়িয়ে মিষ্টি বাড়ি ফিরছিল। ওর মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। ও মনে মনে ঠিকই করে নিয়েছে, বারান্দায় একটা খাঁচা রাখবে আর তাতে পাখি পুষবে। তারপর রোজ বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে পাখিদের সঙ্গে গল্প করবে। তাদের দানা খাওয়াবে। আবার সকালে তাদের কিচিরমিচির শব্দে নিজের আলস্য ভাঙাবে। কত প্ল্যান। এখন শুধু নতুন বাড়িতে প্রবেশের অপেক্ষা।

বাজারের এইদিকটা গাড়িঘোড়ার প্রচণ্ড ভিড়। রোববারেও তার নিস্তার নেই। মিষ্টির মা ফোন করেছিলেন ফেরার সময় টুকটাক কিছু জিনিস কিনে আনার জন্য। এখানে বাইক-স্কুটারের সংখ্যা খুব বেশি। হুশ হুশ করে এদিক দিয়ে ওদিক দিয়ে স্কুটার বেরিয়ে যায়। কারো যেন থামার সময় নেই। গাড়ি-বাইকের এই প্রচণ্ড গতির ভিড়েও মিষ্টির চোখ আটকে গেল কালো রাস্তায় পড়ে থাকা ছোট্ট একটা হলুদের ওপর। হলুদটা হালকা নড়ছে। কী ওটা? স্কুটারটা আর একটু এগোতেই হলুদটা আর একটু স্পষ্ট হল। আরে, এ যে একটা ছোট্ট পাখি! রাস্তার মধ্যে কেমন অসহায়ের মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে, উড়তে পারছে না, বোধ হয় ডানায় চোট লেগেছে। চোখে ভয়। আর হবে নাই-বা কেন? চারপাশ দিয়ে কত গাড়ি-বাইক-স্কুটার প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলেছে, কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। কারো নজরেও পড়েনি রাস্তার মাঝখানে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা পাখিটার দিকে। মিষ্টিও ভয় পেল। যেরকমভাবে গাড়িগুলো ছুটে চলেছে তাতে যদি একটা গাড়ির সঙ্গে… মিষ্টি আর চিন্তা করতে পারল না, চেঁচিয়ে উঠল, “বাবা, দাঁড়াও দাঁড়াও!”

মেয়ের এহেন চিৎকারে বিমলবাবু তড়িঘড়ি রাস্তার ধারে স্কুটার থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল মিষ্টি?”

মিষ্টি হাতের আঙুলের ইশারায় পাখিটার দিকে দেখিয়ে বলল, “ওই দ্যাখো একটা পাখি বাবা। ও উড়তে পারছে না। ওকে বাঁচাও।”

বিমলবাবুও ব্যাপারটা লক্ষ করেছেন। উনি দ্রুতপায়ে রাস্তার মাঝখানে ছুটে গিয়ে হাতের ইশারায় দুরন্ত গতিবেগে আসা গাড়িগুলোকে দাঁড় করিয়ে পাখিটাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন। মিষ্টি দেখল, বাবার দু-হাতের তালুতে বন্দি একটা ছোট্ট হলুদ বদ্রি। বড়ো বড়ো চোখে এদিক ওদিক দেখছে। বাঁদিকের ডানাটা একটু বাঁকা, বোধ হয় ওটাতেই চোট পেয়েছে। গলার কাছে ছোট্ট একটা কালো ছোপ। মিষ্টির মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে এল, “ফুটকি।”

এরপর ফুটকির জন্য খাঁচা কেনা হল, সঙ্গে খাবারও। মিষ্টি মহানন্দে ফুটকিকে বাড়িতে এনে তুলল। তারপর ফুটকির সঙ্গে তার কত কথা। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে আজ কী খেয়েছে, ডানাটা একটু ভালো আছে কি না, দাঁড়ে বসে কতক্ষণ ঘুমিয়েছে এরকম নানা গল্পে দুজনে মশগুল হয়ে থাকত। ফুটকিও মিষ্টিকে দেখলে কিচিরমিচির গল্প জুড়ে দিত। অল্প ক’দিনেই দুজনে খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠল।

মিষ্টি একদিন বলল, “বাবা দ্যাখো, ওর ডানাটা মনে হয় ভালো হয়ে গেছে।”

“কী করে বুঝলি?” বিমলবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

“আজ গল্প করার সময় আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী রে, তোর ডানাটা কেমন আছে? ও দু-বার জোরে জোরে ডানা ঝাপটে দেখাল।”

“আচ্ছা, তাই নাকি? বেশ। কিন্তু তাহলে যে এবার ওকে বাড়ি ফিরতে হবে।”

“কোন বাড়ি? এটাই তো ওর বাড়ি।” মিষ্টি জিজ্ঞেস করল।

“তা কেন? ও ওর নিজের বাড়িতে ফিরবে। ওরও তো বাড়িতে মা-বাবা-ভাইবোন সবাই আছে, ও কতদিন ওদের দেখনি। ওর কি মনখারাপ হয় না?”

“কেন, আমরা ওর কেউ নই?” মিষ্টি ছলছলে চোখে উত্তর দিল।

“নিশ্চয়ই। কিন্তু আমরা তো ওর বন্ধু। বন্ধুর বাড়িতে কি সারাজীবন কেউ থাকে? ওর মা-বাবা যে ওর জন্য চিন্তা করছে।”

“তাহলে?”

“তাহলে কাল আমরা ওকে ওর মা-বাবার কাছে পাঠিয়ে দেব। ও ওর বাড়িতে চলে যাবে। তারপর আমাদেরও তো নতুন বাড়িতে যেতে হবে, তাই না?”

ফুটকিকে পেয়ে মিষ্টি একদিন লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা ভুলে গিয়েছিল। ফুটকিকে বাড়ি পাঠানোর কথায় মিষ্টির আবার সেই গুমরে ওঠা কান্নাটা বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল। ও প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “ও থাক না আমাদের কাছে! আমি ওকে রোজ খাওয়াব, গল্প শোনাব।”

“না, মিষ্টি। আমি তোমাকে বলেছি না পাখিদের কখনো খাঁচায় ধরে রাখতে নেই, তাতে ওরা কষ্ট পায়।”

“কিন্তু ও চলে গেলে আমার সঙ্গে যে ওর আর কোনোদিন দেখা হবে না।”

“কেন দেখা হবে না? তুমি তো ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। ও যখন ওর বেস্ট ফ্রেন্ডকে মিস করবে, ঠিক দেখবে তখন তার কাছে চলে এসেছে।”

সেদিন প্রায় সারারাত মিষ্টি ফুটকির দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

পরদিন সকালে বিমলবাবু বারান্দায় খাঁচাটা রেখে তার দরজাটা খুলে দিলেন। মিষ্টি দেখল, ফুটকি কিছুক্ষণ এদিক ওদিক দেখল, তারপর মুখ দিয়ে কিচকিচ একটা শব্দ করে দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে উড়ে গেল আকাশে। ছোটো হতে হতে একসময় ফুটকি একটা বিন্দু হয়ে হারিয়ে গেল আকাশের নীলে। আর মিষ্টি? কান্নাভেজা গলায় আলতো স্বরে বলল, “ভালো থাকিস।” তারপর একরাশ মনখারাপ আর এক চোখ জল নিয়ে দৌড়ে ঘরে ঢুকে বিছানায় উপুড় হয়ে লাফিয়ে পড়ল।



সামনের রোববার মিষ্টিরা নতুন বাড়িতে যাবে। শেষমুহূর্তের গোছগাছ চলছে। মিষ্টির মা বাসনপত্র, বিছানার চাদর, টুকিটাকি সব বাক্স বাক্স করে গুছিয়ে রাখছেন। বাবা গেছেন নতুন বাড়িতে কথাবার্তা বলতে। মিষ্টি সকাল থেকে এদিক ওদিক করছিল। ফুটকিকে হারিয়ে ফেলার দুঃখটা ওর মনে খানিকটা ফিকে হয়েছে। ও একটা ফড়িং দেখে একছুটে বারান্দায় এল। বারান্দার বাঁদিকে একটা টবে তুলসীগাছ রাখা। ও লক্ষ করল, তুলসীগাছের কোনায় ছোটো ছোটো শুকনো ডালপালা জড়ো করা। বেশ একটা পাখির বাসার মতো আকৃতি। এটা তো কাল রাতেও ছিল না, এটা আবার কোত্থেকে এল? ও বাসাটার আর একটু সামনে এগিয়ে ঝুঁকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করতেই একটা ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পেল। ও দেখল, একটা হলুদ বদ্রি পাখি ওই বাসাটায় এসে বসল। হলুদ পাখিটার গলার কাছটায় একটা কালো ছোপ। ও একগাল হাসি নিয়ে বলল, “তুই ফিরে এসেছিস ফুটকি! দাঁড়া, তোর খাবারটা নিয়ে আসি।”

আজ গরম পড়েছে। সকাল থেকে কারেন্টও নেই। কিন্তু তাও বিমলবাবু বাড়ি ফিরে আসতেই মিষ্টি একছুটে দৌড়ে গিয়ে ওঁকে জড়িয়ে ধরে বলল, “বাবা, আমি এই বাড়ি ছেড়ে যাব না। তুমি নতুন বাড়িকে না বলে দাও।”


___

অঙ্কনশিল্পীঃ স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়


No comments:

Post a Comment