গল্প: অভিজিৎ হতভম্ব: অরূপ দাস



বালিগঞ্জ থেকে পায়ে হেঁটে বিজয়নগর আসতে মিনিট কুড়ি সময় লাগে। এই এলাকাতে বনেদি বাড়ি বলতে একটাই, তাই খুঁজতে দেরি হল না। গতকাল রাতে এই বাড়ি থেকেই ফোন করা হয়েছিল।

বাড়ি নয় অভিজিৎ খুঁজে পেল, কিন্তু এবার সে কী করবে? মানে, গিয়ে দরজাটা কি নক করবে? নাকি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সেই সংবাদটা বাড়ির মালিক দেবরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে জানাবে? এই নিয়ে সবে ভাবতে শুরু করেছে, এমন সময় তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। বাড়ির মালিক দেবরঞ্জনবাবু ফোন করেছেন। অভিজিৎ মোবাইল রিসিভ করতেই ও-প্রান্ত থেকে দেবরঞ্জনবাবুর গম্ভীর স্বর ভেসে এল, “বাড়ির ভিতরে চলে এসো। দরজা খোলা আছে।”

অভিজিৎ কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই দেবরঞ্জনবাবু ফোন কেটে দিলেন। অদ্ভুত! এভাবে কেউ ফোন কেটে দেয়? গতকাল রাতে ফোনে কথা বলার সময় অভিজিৎ বুঝতে পেরেছিল, লোকটার মধ্যে কোনো সৌজন্যতা নেই। না থাকুক, অভিজিৎ তো আর ওঁর বাড়িতে থাকতে আসেনি। কাজ করে টাকা নিয়ে চলে যাবে।

প্রথমে বাড়ির ফটক। ফটকের গ্রিল ঢাকা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই সামনে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। এরপর বাড়ির ভিতরে ঢোকার দরজা। দরজাতে যদিও হাত দিতে হল না অভিজিতকে। দরজা অনেকটা ফাঁক হয়ে আছে। যার ফলে সে অনায়াসে ভিতরে চলে এল। সে দেখে চেয়ারে দেবরঞ্জনবাবু বসে আছেন। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দেবরঞ্জনবাবু একপ্রকার হুকুম করে বলে উঠলেন, “দরজাটা বন্ধ করে এসো।”

এবার কি বাড়ির চাকর হতে হবে? নেহাত টাকার দরকার, তা না হলে নিকুচি করত এই কাজের। দরজাটা বন্ধ করে সোফার সামনে এসে অভিজিৎ দাঁড়াল। দেবরঞ্জনবাবু হাত দিয়ে ইশারা করলেন সোফাতে বসার জন্য। অভিজিৎ সোফাতে বসল। এরপর কথা শুরু করার জন্য অভিজিৎ বলে উঠল, “বাড়ির সামনেটা দেখলাম অনেকটা ফাঁকা। বাগান বানাতে পারেন তো!”

দেবরঞ্জনবাবু গম্ভীর হয়ে জবাব দিলেন, “কী করব না করব, সেই পরামর্শ কী এখন তোমার থেকে নিতে হবে?” এই বলে তিনি একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে অভিজিতের দিকে দেখলেন। এরপর তিনি হাতে থাকা সিগারেট অ্যাশ-ট্রেতে নিভিয়ে আবার বলে উঠলেন, “তুমি বসো। আমি ঘড়িটা নিয়ে আসছি।”

দেবরঞ্জনবাবু জুতোর কচমচ আওয়াজ করে সিঁড়ি দিয়ে দুতলাতে উঠে গেলেন। দেবরঞ্জনবাবুর অনুপস্থিতিতে অভিজিৎ মুখটা ভেংচে আপন মনে রাগ উগড়ে দিল, “বনেদি বাড়ি, অথচ বাড়ির ভিতরে পুরোনো কোনো জিনিস নেই। সব বোধ হয় বিক্রি করে রেসের মাঠে উড়িয়ে দিয়েছেন। দূর দূর, বংশের কুলাঙ্গার একটা।”

কিছুক্ষণ পর দেবরঞ্জনবাবু এলেন। ওঁর কাঁধে ঝোলা ঝুলছে। কাঁধ থেকে ঝোলাটি নামিয়ে টেবিলে রাখলেন। কিছু না বলেই তিনি এবার হলঘরের দক্ষিণদিকে গেলেন। এদিকে অভিজিৎ ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছে। কাজের সময় যতসব আতলামি! মনে হচ্ছে উঠে চলে গেলে দেবরঞ্জনবাবুকে উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে।

ঘড়ির লাইনে এসে কত মানুষকেই তো অভিজিত দেখল। মনে পড়ে যাচ্ছে সেই খদ্দেরের কথা। তখন অভিজিৎ ঘড়ি সারানোর লাইনে নতুন। পাড়ার মোড়ে ছোট্ট গুমটিতে সারাদিন বসে ঘড়ি সারাত। একদিন এক খদ্দের দামি হাতঘড়ি নিয়ে অভিজিতের দোকানে এল। খদ্দের বলে ওঠে, “দেখুন তো, ঘড়িতে টিকটিক শব্দ হচ্ছে না কেন।”

এমন দামি ঘড়ি এর আগে অভিজিৎ কখনো সারায়নি। ঘড়িটার দাম কত হতে পারে তা জানার জন্য অভিজিৎ জিজ্ঞাসা করে উঠল, “কত দাম হবে ঘড়িটার?”

খদ্দের আপন খেয়ালে ছিল। তাই প্রশ্নটা কানে আসতেই খদ্দের সত্যি কথাটা বলে ফেলে, “দূর, কিনেছি নাকি। এই তো কিছুক্ষণ আগে বাসে এক প্যাসেঞ্জারের হাত থেকে খুলে নিলাম।”

খদ্দের এই কথাটা বলে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দিল ছুট। তা দেখে সেদিন অভিজিতের সে কী হাসি। সে হাসতে হাসতে দোকানে লুটিয়ে পড়েছিল। সেই খদ্দের-বাবাজি কোনোদিনও আর ঘড়িটা নিতে আসেনি।

সেই হাস্যকর স্মৃতি মনে পড়তেই অভিজিৎ ফিক করে হেসে ফেলে। ঠিক এমন সময় উপস্থিত হলেন দেবরঞ্জনবাবু। ওঁর হাতে মিষ্টির প্লেট। অভিজিতকে হাসতে দেখে তিনি বলে উঠলেন, “হাসছ কেন?”

এবার রাগটা সামলাতে পারল না অভিজিৎ। সে বলে ওঠে, “দেখুন, আমি হাসব না কাঁদব সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। শুরু থেকে দেখছি আপনি আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছেন।”

“যদি তোমার তাই মনে হয়, তাহলে তাই করছি।”

“এরপর আর এক মুহূর্ত এখানে থাকা মানে নিজেই নিজেকে অপমানিত করা। আমি আপনার ঘড়ি সারাতে পারব না। উঠলাম।”

“তুমি যেতে চাইলেই কি যেতে পারবে? তাছাড়া আমাদের বাড়িতে কেউ দুপুরবেলা এলে না খাইয়ে ছাড়ি না। মিষ্টিগুলো খেয়ে নাও।”

অভিজিৎ কথা না বাড়িয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিল। হঠাৎ একটা বীভৎস শব্দ। অভিজিতের কান ঘেঁষে গুলি গিয়ে দরজায় বিঁধল। নিশ্চয়ই দেবরঞ্জনবাবু গুলি চালিয়েছেন! পিছনে ঘুরে অভিজিৎ দেখল, ঠিক তাই। রিভলভার হাতে নিয়ে আয়াসে বসে আছেন দেবরঞ্জনবাবু। অভিজিৎ গাঢ় আতঙ্কে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, “এ কী করছেন!”

দেবরঞ্জনবাবু স্বাভাবিকভাবেই বলে উঠলেন, “কোথায়! এখনো কিছু করা হয়নি। তবে করতে কতক্ষণ। এখানে এসে বসো।”

পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে পালটে গেল। একটা চাপা গুমোট ভাব ক্রমশ হলটাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। অভিজিৎ টের পাচ্ছে, তার শরীরে পরিবর্তন ঘটছে। এই যেমন, তার শরীর জুড়ে নেমে এসেছে দুর্বলতা। প্রচণ্ড ঘামছে সে। পা-দুটো এগিয়ে চলার তালে তালে বুকের স্পন্দন বাড়ছে। যেন তার মনে হচ্ছে, জেনে বুঝে এগিয়ে যাচ্ছে কোনো এক গিরিখাদের দিকে। মৃত্যু যে কতটা ভয়ংকর, মুখোমুখি হয়ে সে আজ বেজায় টের পাচ্ছে।

অভিজিৎ সোফাতে এসে বসল। দেবরঞ্জনবাবুকে রিভালভার তুলে ধরতে দেখে অভিজিৎ কান্না জড়ানো স্বরে বলল, “দোহাই, আমাকে মারবেন না। আপনি যা বলবেন আমি তাই করতে রাজি।”

রিভালভার নামিয়ে দেবরঞ্জনবাবু আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলেন, “আগে রাজি হলে এত হ্যাপা সামলাতে হত না। ঠিক আছে বাপু, এবার কাজে হাত দাও। তোমার ভাগ্যে মিষ্টি থাকলে পরেও খেতে পারবে। ঝোলা থেকে ঘড়িটা বের করো।”

অভিজিৎ ঝোলা থেকে ঘড়িটা বের করতেই আঁতকে উঠল। ঘড়ির কী বীভৎস রূপ! যেন কোনো অভিশাপে ঘড়িটা তার জৌলুস হারিয়েছে। ঘড়িতে একটা কাঁটা থাকলেও সংখ্যা বা চিহ্ন নেই।

ঘড়ির কাঁটা দিব্যি চলছে, চলার গতিও স্বাভাবিক। ঘড়ির কোনো সমস্যা আছে বলে তো এখনো মনে হচ্ছে না। তবে একটা বিষয়ে ভীষণ খটকা লাগছে। ঘড়ি কীসের মাধ্যমে চলছে তা জানার জন্য অভিজিৎ ঘড়িটা তুলে পিছনের দিকটা দেখতে যাবে এমন সময় দেবরঞ্জনবাবু বলে উঠলেন, “তোমাকে যা বলব, সেই অনুযায়ী কাজ করবে। ঘড়িটা তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। টেবিলে রেখে দাও। আর তোমার মোবাইলটা আমাকে দাও দেখি।”

কোনো কথা না বলে অভিজিৎ প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইটা বের করে দেবরঞ্জনবাবুকে দিল। মোবাইলটা টেবিলে রেখে দেবরঞ্জনবাবু ঝোলা থেকে একটা ছোটো চাকতি বের করলেন। চাকতির গায়ে আঙুল বসিয়ে কিছু একটা লিখলেন তিনি। এরপর চাকতি খুব আলতোভাবে ঘড়ির মাঝ বরাবর বসালেন। কয়েক সেকেন্ড পর চাকতি ঘুরতে শুরু করল। ধীরে ধীরে চাকতি লাল বর্ণে পরিণত হয়।

এসব দেখে অভিজিৎ হতভম্ব। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর পাহাড় সমান কৌতূহল নিয়ে সে বলে উঠল, “কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না!”

দেবরঞ্জনবাবু চাপা কণ্ঠে বলে উঠলেন, “ধীরে ধীরে সব বুঝতে পারবে। এবার আমার কথা মন দিয়ে শোনো। তোমাকে একটা স্থানে পাঠানো হবে। সেই স্থানে তুমি একটা মশাল পাবে। পাশে পড়ে থাকা দুটি পাথর খণ্ড ঘষে মশালে আগুন ধরাতে হবে। এরপর কিছুটা হাঁটলে একটা বড়ো কক্ষ। সেই কক্ষে একটা বেদির উপর দেখতে পাবে এই ঘড়ির ফর্মুলা। তোমার শুধু কাজ, ফর্মুলাকে দুই নয়ন জুড়ে দেখা। সময় নষ্ট করবে না। কারণ, তোমার হাতে বেশি সময় থাকবে না।”

দেবরঞ্জনবাবুর এরূপ কথা শুনে অভিজিৎ আরো বেশি ঘাবড়ে গেল। অভিজিতের কথা জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে, “হেঁয়ালি কথাবার্তা বন্ধ করুন, প্লিজ...”

“তোমার কোনো ভয় নেই। সেখানে শুধু তুমি আর ফর্মুলা। এই দুইয়ের মাঝে সেখানে গুরুত্ব দেওয়ার মতো আর কিছু পাবে না। তাই শান্ত মনে কাজটা করবে। তারপর তুমি আজাদ। নাও, এবার তুমি দাঁড়িয়ে ডানহাতের তালু চাকতির উপর রাখো।”

“না। আগে বলতে হবে সেখানে বলতে কোথায় বোঝাচ্ছেন।”

“তোমার কপালে বুলেট বসাতে আমার একবারও হাত কাঁপবে না।” এই বলে তিনি রিভালভারটা তুলে ধরে আবার চাপা স্বরে বলে উঠলেন, “আমার বলা কথাটা যখন তোমার মাথায় ঢুকছে না, তখন গুলিটাই মাথার ভিতরে ঘুরে বেড়াক।”

অসহায় অভিজিৎ আর কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে চাকতির ওপর তার ডানহাতের তালু বসাল। আর এর সঙ্গে সঙ্গে ঘটল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। চাকতি থেকে আলোক রশ্মি ঠিকরে বেরিয়ে এসে অভিজিতের ডানহাত স্পর্শ করল। ডানহাত থেকে ধীরে ধীরে আলোক রশ্মি পলক ফেলতেই অভিজিতের সমগ্র শরীর মুড়ে নিল। আলোক রশ্মির ভিতরে অভিজিতকে আর দেখা গেল না। এরপর পুনরায় আলোক রশ্মি ফিরে গিয়ে চাকতিতে মিলিয়ে গেল।

অভিজিতের মোবাইলটা মেঝেতে আছাড় দিয়ে দেবরঞ্জনবাবু বলে উঠেন, “তুমি যেখানে যাচ্ছ, সেখানে এই যন্ত্রে কোনো কাজ হয় না।”



বহুবছর আগের কথা। তখন দেবরঞ্জনবাবু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তেন। একদিন তিনি স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখলেন তাঁর বাবা গালে হাত দিয়ে কাঁচুমাচু মুখে বসে। আর মা দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করছেন। পাশে টেবিলে রাখা ছিল ঘড়িটা। অদ্ভুত দেখতে ঘড়িটার প্রতি দেবরঞ্জনবাবুর দৃষ্টি যেতেই বুকটা  ধড়াস করে উঠেছিল।

মা এগিয়ে এসে দেবরঞ্জনবাবুকে জড়িয়ে ধরে সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “তোর ঠাকুরদা হারিয়ে গেছে।”

সেইদিন মধ্যরাতে দেবরঞ্জনবাবুর ঘুম ভেঙে যায়। মা কোথায় গেল! তিনি বিছানা থেকে নেমে ঝুল বারান্দাতে গিয়ে দাঁড়ালেন। দেখলেন, বাগানে বাবা-মায়ের সঙ্গে কোদাল হাতে নিয়ে দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। পাশে একটা গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর বাড়ির ফাইফরমাশ খাটা দিনুদা সেই ঘড়িটা নিয়ে হাজির হল। সেদিন সুরক্ষিতভাবে ঘড়িটার সঙ্গে একটা চিঠি সেই গর্তে মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

স্কুল থেকে কলেজ, তারপর কর্মজীবনে পা। এই দীর্ঘ পথ চলার মাঝে দেবরঞ্জনবাবু সেই ঘড়ির কথা ভুলে গেছিলেন। বন্ধুদের এক আড্ডায় ঘড়ি নিয়ে আলোচনা করার সময় তাঁর ছোটোবেলার সেই ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। বাড়ি ফিরে এসে দেবরঞ্জনবাবু সেই স্থান খুঁড়ে ঘড়ি আর চিঠি উদ্ধার করেন। চিঠিতে প্রথমেই লেখা আছে, ‘এই ঘড়ি একটি টাইম মেশিন।’


***


এই ঘড়িটা যে একটি টাইম মেশিন তা অভিজিৎ কখন বুঝতে পারল? আলোক রশ্মির দ্বারা অভিজিৎ যখন চাকতির ভিতর প্রবশ করল, তখন সে দেখল একটা আলোক পথ সোজা বেরিয়ে গেছে। আর সেই আলোক পথ ধরে আলোক রশ্মি অতি দ্রুত ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। তখনই সে বুঝতে পারল, এটা একটি টাইম মেশিন। তবে বেশিক্ষণ সেই আলোক পথে থাকতে হল না। আলোক পথ থেকে সে বেরিয়ে আসতেই আলোক রশ্মিও অদৃশ্য হয়ে গেল। সে দেখল একটা গুহা-মুখের সামনে দাঁড়িয়ে। পাশেই মশাল আর পাথরের দুটি খণ্ড পড়ে আছে। দুটি পাথর খণ্ড ঘর্ষণের দ্বারা আগুন উৎপন্ন করে সে মশাল জ্বালাল। এরপর কিছুটা এগিয়ে আসতেই বিশাল কক্ষ। সে দেখতে পেল, বেদির উপর ফর্মুলা সাজানো রয়েছে। সে সেই বেদির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জোর দিতে হল না, নিজে থেকে ফর্মুলার প্রতি তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন অভিজিতের মনে বার বার উঠে আসছে। দেবরঞ্জনবাবু নিজেই তো ফর্মুলা দেখতে আসতে পারতেন! অভিজিতকে পাঠাতে গেলেন কেন?



দরজার উপর থাকা পেন্ডুলাম ঘড়িটা ঢং ঢং করে বেজে উঠল।

দেবরঞ্জনবাবু জুতোর কচমচ আওয়াজ করে দুতলা থেকে নিচে নেমে এসে চেয়ারে বসলেন। অভিজিতের আসার সময় হয়ে এসেছে। তাই অধীর আগ্রহে তিনি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর ঘড়ির চাকতি থেকে আলোক রশ্মি ঠিকরে বেরিয়ে আসে। আর আলোক রশ্মি থেকে বেরিয়ে আসে অভিজিৎ।

ঘড়ির নীচের দিকে থাকা সুইচটা দেবরঞ্জনবাবু টিপতেই আলোক রশ্মি ফিরে এসে চাকতিতে মিলিয়ে গেল।

অভিজিৎ কোনোমতে সোফাতে বসল। শরীরে জোর পাচ্ছে না সে। দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে গেছে। শ্বাসপ্রশ্বাসে টান ধরেছে।

ঘড়ি থেকে চাকতি আলতো করে তুলে দেবরঞ্জনবাবু ঝোলাতে রাখলেন। এরপর তিনি মজা করে বলে উঠলেন, “বিনায়ক মণ্ডলের কৃপাতে টাইম মেশিন করে ভালোই পৃথিবী ছাড়িয়ে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ থেকে ঘুরে এলে। জানি, মোটেই তোমার সুখময় যাত্রা ছিল না। কিন্তু কী করব, যত নষ্টের গোড়া ওই বিনায়ক মণ্ডল। বিনায়ক মণ্ডল লোকটা মোটেই ভালো ছিলেন না। তাঁর জন্যই আমাকে যত পাপ করতে হচ্ছে। তোমাকে বলাটা আমার কর্তব্য। তাই বলছি, বিনায়ক মণ্ডল হচ্ছেন আমার ঠাকুরদার বাল্যকালের বন্ধু। তিনি ছিলেন বৈজ্ঞানিক। এই ঘড়িটা অর্থাৎ টাইম মেশিনটা তাঁরই আবিষ্কার। যদিও টাইম মেশিনটি তৈরি করতে টাকা ঢেলেছিলেন আমার ঠাকুরদা। তাই কথা হয়েছিল, টাইম মেশিন আবিষ্কার হওয়ার পর ফর্মুলা ঠাকুরদার হাতে তুলে দিতে হবে।

“টাইম মেশিন আবিষ্কার হল। ততদিনে টাইম মেশিন বানাতে গিয়ে ঠাকুরদা টাকা জোগানে জন্য ষাট শতাংশ সম্পত্তি বিক্রিবাট্টা করে দিয়েছিলেন। এতে ঠাকুরদার কোনো আক্ষেপ ছিল না। কারণ, টাইম মেশিন বানানোর সময় ধাপে ধাপে সাফল্য আসছিল। যদিও টাইম মেশিন আবিষ্কারের পর বিনায়ক মণ্ডল ফর্মুলা দিতে অস্বীকার করলেন। কিন্তু ঠাকুরদা ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। ঠাকুরদা ব্যবস্থা নিলেন। তিনি গুন্ডা ভাড়া করলেন বিনায়ক মণ্ডলকে উচিত শিক্ষা দেবেন বলে।

“ভাড়া করা গুন্ডা দ্বারা ঘড়ি সহ বিনায়ক মণ্ডলকে এই বাড়িতে নিয়ে আসা হল। তাঁর ওপর টর্চার করে জানা গেল, পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে প্রাণহীন গ্রহের এক গুহাতে তিনি সেই ফর্মুলা রেখে এসেছেন। সেই গ্রহে যাওয়া, থাকা এবং ফিরে আসা সব মিলিয়ে টাইম মেশিন ঘড়িতে মোট একঘণ্টা সময় নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। অথাৎ একঘণ্টা পূর্ণ হওয়ামাত্র ব্যক্তি আপনা-আপনি ফিরে আসবে। এই কথা শুনে ঠাকুরদার আর তর সইল না। ঠাকুরদা টাইম মেশিন ঘড়ির মাধ্যমে সেই গ্রহে গেলেন ফর্মুলা আনতে। এরপর একঘণ্টা পার হয়ে গেল, কিন্তু ঠাকুরদা আর ফিরে এলেন না।

“ঠাকুরদা ফিরে না আসায় বিনায়ক মণ্ডলকে বাবা চেপে ধরলেন। বিনায়ক মণ্ডল স্বীকার করলেন, তিনি ঘড়িটার সময়ের ওপর কারসাজি করেছেন। যাওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেই গ্রহে চলে যাচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীতে আসার সময় পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৃথিবীতে ফিরে এলেও অদ্ভুতভাবে তার বয়স পঞ্চাশ বছর বেড়ে যাচ্ছে।

“ঠাকুরদার ক্ষেত্রে হয়েছে কী, তাঁর বয়স ছিল সত্তর বছর। আসার সময় বয়স বাড়ার কারণে ঠাকুরদা মৃত্যু-আয়ু ছুঁতেই মারা গেলেন। তাই টাইম মেশিনের সঙ্গে তাঁর মৃতদেহের সংযোগ ছিন্ন হয়ে পড়ে। যার ফলে ওঁর মৃতদেহ মহাকাশেই হারিয়ে গেছে। এই কথা শুনে রাগের বশে আমার বাবা সেই মুহূর্তেই বিনায়ক মণ্ডলকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিলেন।

“বিনায়ক মণ্ডল এত ধড়িবাজ, ঘড়ির ভিতরে যন্ত্রগুলোর ক্ষেত্রেও কারসাজি করে রেখেছেন। ঘড়ি খুলতে গেলে ভিতরের সব যন্ত্রপাতি এক স্থান থেকে আরেক স্থানে সরে যাবে। তাই ঘড়ি খুলেও লাভ হবে না।”

অভিজিতের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা হিম গলায় গিয়ে জমাট বাঁধল। শ্বাসপ্রশ্বাসের টানের গতি বাড়ছে। ঝাপসা চোখ জলে আরো বেশি ঝাপসা হয়ে উঠল। অভিজিতের বয়স পঁচিশ। আরো পঞ্চাশ যোগ করলে দাঁড়াচ্ছে পঁচাত্তর। বার্ধক্যের জন্যই দুর্বল মনে হচ্ছে অভিজিতের। চোখের পাতা ঝাপসা লাগছে তার। নিজের দুটো হাত সামনের দিকে তুলে ধরতেই সে আঁতকে ওঠে। হাতের চামড়া বৃদ্ধদের মতো কুঁচকে গেছে।

দেরি করে হলেও জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ অভিজিতের বহিঃপ্রকাশ হল। ভাঙা ভাঙা শব্দে সে বলে ওঠে, “প্রতারক!”

দেবরঞ্জনবাবু হাসলেন। এরপর তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে বলে উঠলেন, “ধন্যবাদ। কিছু করার নেই। ঘড়ি মিস্ত্রিদের না পাঠিয়ে অন্য কাউকে পাঠালে সে গিয়ে ফর্মুলা বুঝতেই পারবে না। আর না বুঝলে মাথায় সেটা গাঢ়ভাবে বসবে কী করে?” এই বলে দেবরঞ্জনবাবু এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে থাকা ছোটো ঘরটির পর্দা সরালেন।

ছোটো ঘরটির মধ্যস্থলে একটি বলিকাঠ আর রামদা রাখা রয়েছে। তার পেছনে পাঁচিলের তাকে রাখা আছে কতগুলো কাচের পাত্র। প্রত্যেক পাত্রের ভিতর রয়েছে কেমিক্যালে চুবানো ঘড়ি মিস্ত্রিদের মুণ্ডু। প্রত্যেকটা মুণ্ডু পরীক্ষানিরীক্ষা করে রাখা। এই মুণ্ডুগুলো থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। কারো মুণ্ডুতে ফর্মুলা নিয়ে স্মৃতি একদম নেই। আবার কারো মুণ্ডুতে সামান্য পাওয়া গেলেও তা স্পষ্ট নয়। আসলে আসার সময় পঞ্চাশ বছর বয়স বেড়ে যাওয়াতে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে দেবরঞ্জনবাবুর বিশ্বাস, কারো না কারো স্মৃতিশক্তির দ্বারা ফর্মুলা বাগিয়ে নিতে পারবেন।

অভিজিতকে কিছু বলবেন বলে দেবরঞ্জনবাবু পিছনে ঘুরলেন। কিন্তু কাকে বলবেন! অভিজিতের অচৈতন্য দেহ সোফাতে লুটিয়ে পড়ে আছে। দেবরঞ্জনবাবুর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তিনি হাতে গ্লাভস পরে নিলেন। এরপর এগিয়ে এসে অভিজিতের চুল মুঠো করে ধরে টানতে টানতে ছোটো ঘরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। ঠিক এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল।

দেবরঞ্জনবাবু সি.সি.টি.ভি ক্যামেরার টি.ভি স্ক্রিনের দিকে দেখলেন। দরজার বাইরে একজন ঘড়ি সাড়ানোর মিস্ত্রি দাঁড়িয়ে। সেই মিস্ত্রির নাম আফসার। আজ সকালে দেবরঞ্জনবাবু আফসারকে ফোন করেছিলেন। আফসারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দেবরঞ্জনবাবুর মুখে লোভাতুর হাসি ফুটে উঠল।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী


No comments:

Post a Comment