গল্প: ছেলেটা: বনবীথি পাত্র

 

চেয়ারে বসে পেপারটায় চোখ বোলাচ্ছিলেন অভয়বাবু। শেষবার পুরী এসেছিলেন তা প্রায় বছর পঁচিশেক আগে। বাবলু তখনো বোধ হয় হাই স্কুলে ঢোকেনি। তখন বাংলা খবরের কাগজ আসত না পুরীতে। আজ ভোরবেলা সমুদ্রের ধারে গিয়ে দেখেন সব বাংলা কাগজই বিক্রি হচ্ছে। খবরের কাগজ ছাড়া সকালটা যেন ঠিক সকাল হয় না অভয়বাবুর। ছেলে-বৌমার হাতে সংসারের দায়িত্ব তুলে দিয়ে তিন হপ্তার জন্য পুরীতে গুরুদেবের আশ্রমে এসেছেন গিন্নি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সঙ্গ দিতে হয়েছে অভয়বাবুকে। শহরের ব্যস্ততা ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে আশ্রমটা বেশ নিরিবিলিতে। আশ্রম সংলগ্ন একটা বাড়িতেই ভক্তদের থাকার সুন্দর বন্দোবস্ত। গতকাল সন্ধেতে যখন এসেছিলেন, খেয়াল করেননি এত কাছেই সমুদ্র। বারান্দাতে বসে কিছুক্ষণ সমুদ্রের শোভা উপভোগ করে মন দিয়েছেন খবরের কাগজে। গিন্নি তো এখন ঠাকুরের প্রভাতকালিন ভোগ নিবেদনে ব্যস্ত। তাহলে বারান্দায় কে যেন ঘোরাফেরা করছে? পিছন ফিরে কাউকে দেখতে না পেয়ে মনের ভুল ভেবে আবার পড়ায় মন দেন।

কে যেন পাঞ্জাবিটা টানল! কী আশ্চর্য, তাকিয়ে তো কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না। চেয়ারে রাখা কাগজটা মাটিতে পড়ল কী করে? হাওয়া তো নেই। কাউকে তো দেখতে পাচ্ছেন না। বার বার এরকম হওয়াতে বেশ বিরক্ত বোধ করেন অভয়বাবু। চার বছর হল অবসর নিলেও গলাটা এখনো আগের মতো বাজখাঁই আছে। একটা ধমকে সারা ক্লাস ভয়ে কেঁপে উঠত। সবাই বলত, ইতিহাস-স্যারের বাদশাহী রাগ। বহুদিন পর বাজখাঁই গলাতে চেঁচিয়ে ওঠেন, “কে রে? সাহস থাকলে সামনে আয়।”

নাহ্, কেউ তো আসছে না। কোনো সাড়াশব্দও নেই। কিছুটা নিশ্চিন্ত মনেই এবার খবরের কাগজটা নিয়ে বসেন।

হঠাৎ কেমন একটা কান্নার শব্দ কানে আসে। ছোটো বাচ্চা ছেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এখানে তো সব বুড়োবুড়ির দল। কাল থেকে কোনো বাচ্চা ছেলেকে তো দেখেননি। তাহলে কে কাঁদছে? দোতলা বিল্ডিংয়ের ওপর তলায় দুটো ঘর। দুটো পরিবার থাকতে পারবে। একতলায় অনেক ঘর। একতলাটা ভক্ত সমাবেশে জমজমাট। ওপরের দুটো ঘরই ফাঁকা জেনে একটু নিরিবিলিতে থাকার জন্য ওপর তলার ঘরটা অভয়বাবুই পছন্দ করেছিলেন। তবে কি অন্য ঘরটায় কেউ এল? বারান্দা থেকেই তো দেখা যাচ্ছে বন্ধ ঘরটা। ওই তো দরজার বাইরে তালা ঝুলছে। কান্নার মৃদু শব্দটা এখনো তো আসছে। ভয় মেশানো একটা অস্বস্তি হচ্ছে অভয়বাবুর। অস্বস্তিটা মুহূর্তেই রাগে পরিণত হয়, আর সব রাগ গিয়ে পড়ে গিন্নির ওপর। রাগে গজগজ করতে করতে খবরের কাগজটা সরিয়ে রেখে চেয়ারে বসেন। আসুক গিন্নি। আজকেই সাফ কথা জানিয়ে দেবেন। নিজে থাকুক গুরুদেবের আশ্রম-ঠাকুর-দেবতা নিয়ে। আজকেই উনি ফিরে যাবেন কলকাতায়।

আরে আরে, পায়ে সুড়সুড়ি লাগছে কেন! কে যেন পা ধরছে।

“এই কে রে?” একটু ভয় ভয় গলাতেই চিৎকার করে ওঠেন অভয়বাবু।

“আমি।”

এ তো একটা বাচ্চা ছেলের গলা। কাউকে তো দেখতেও পাচ্ছেন না।

“আমি কে? কই তুমি, আমার সামনে এসো।” বাজখাঁই গলাটা এবার যেন একটু নরম অভয়বাবুর।

“এই তো আমি।”

রীতিমতো চমকে ওঠেন অভয়বাবু। সামনে দাঁড়িয়ে একটা বছর আটেকের ছেলে। পরনে আকাশি জামা আর কালো হাফ প্যান্ট। আহা রে, মুখটা কী মায়া মায়া। অভয়বাবুর নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হয়। অমন বকাবকি করাতেই ভয় পেয়েছে ছেলেটা।

“কী নাম তোমার? কী করছিলে এখানে?”

“কুন্তল বসু।”

অভয়বাবু আবার জিজ্ঞাসা করেন, “এখানে একা একা কী করছ তুমি?”

“পড়া মুখস্থ হচ্ছে না। বাবা মারবে, তাই লুকিয়ে আছি।”

“তোমার বাবা কোথায়?”

“মাকে নিয়ে সমুদ্রে চান করতে গেছে। অনেকক্ষণ গেছে, এখনই চলে আসবে।” কুন্তলের চোখে মুখে রীতিমতো আতঙ্কের ছাপ।

অভয়বাবু কাছে টেনে নেন কুন্তলকে। “কী পড়া মুখস্থ হচ্ছে না বলো তো শুনি।”

“ইতিহাস।”

“আরে! আমি ইতিহাসের মাস্টারমশাই। আমাকে বলো কী মুখস্থ হচ্ছে না। এখনই তোমাকে মুখস্থ করিয়ে দেব, তোমার বাবা আসার আগেই।”

“না, তুমি ইতিহাসের মাস্টারমশাই নও। ইতিহাসের মাস্টারমশাইরা খুব রাগী হয়।”

কুন্তলের কথায় হা হা করে হেসে ওঠেন অভয়বাবু। “আচ্ছা, এবার চটপট বলে ফেলো তো কোন পড়াটা মুখস্থ হচ্ছে না।”

“মোঘল সম্রাটদের নাম। কে কার বাবা, কে কার ছেলে কিচ্ছু মনে থাকছে না আমার।” কাঁদো কাঁদো কুন্তল।

“ওহো, এটা তো ভীষণ সোজা পড়া। এসো একটা ছড়ার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিচ্ছি তোমাকে। ‘বাবার হইল আবার জ্বর, সারিল ঔষধে।’ বাবার - সম্রাট বাবর, হইল - সম্রাট হুমায়ুন, আবার - সম্রাট আকবর, জ্বর - সম্রাট জাহাঙ্গীর, সারিল - সম্রাট শাহজাহান, ঔষধে - সম্রাট ঔরঙ্গজেব। বাবরের ছেলে হুমায়ুন। তাঁর ছেলে আকবর। তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীরের ছেলে শাহজাহান, আর তাঁর ছেলে ঔরঙ্গজেব। কী, এবার মনে থাকবে তো?”

‘বাবার হইল আবার জ্বর, সারিল ঔষধে।’ লাইনটা বিড়বিড় করে বলতে বলতে অভয়বাবুর কোলের কাছ থেকে সরে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ায় কুন্তল। মনে হয় বাবা-মা ফিরে আসছে কি না দেখছে।

“কেমন ম্যাজিকের মতো পড়াটা মুখস্থ করিয়ে দিলাম বলো তো! আচ্ছা এবার বলো তো বাবরের ছেলের নাম কী ছিল?”

“বলি আবার কি মাস্টারির পোকাগুলো মাথার মধ্যে নড়েচড়ে উঠল নাকি? তখন থেকে একা একা পাগলের মতো কী বকবক করছ বলো দেখি!”

গিন্নি কখন যে দোতলায় উঠে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল করেননি অভয়বাবু।

“আমার মাথা খারাপ হল, না নিজের চোখ খারাপ হল সেটা আগে দেখো। জলজ্যান্ত ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছ না?”

“এখানে আবার ছেলে কোথায়?”

“ওই তো।” আঙুল নির্দেশ করে কুন্তলকে দেখতে পান না অভয়বাবুও। “উফ্, আবার কোথায় পালাল ছেলেটা? কুন্তল, কুন্তল...” করে ডেকেও সাড়া পেলেন না।

গুরুদেবের অতিথিশালার দেখভাল করে নীতিশ। কী একটা দরকারে ওপরে এল সেই সময়েই। অভয়বাবুদের কথাবার্তা শুনে থমকে দাঁড়ায়। “নীচে একটা ঘর ফাঁকা আছে, আপনারা বরঞ্চ ওখানে চলুন।”

“খামোখা নীচের তলায় যাব কেন?”

প্রথমে কিছু একটা গোপন করতে চাইলেও শেষ অবধি সত্যিটা বলতেই হয় নীতিশকে। “বছর সাতেক আগের কথা। একবার গুরুদেবের এক শিষ্য এসেছিলেন শিলিগুড়ি থেকে। সঙ্গে ওঁর স্ত্রী আর ছেলে। ওঁর স্ত্রীকে হাওয়াবদল করতে বলেছিলেন ডাক্তার। প্রায় মাস খানেক থাকবেন বলে এসেছিলেন। একদিন ছেলেকে ঘরে পড়তে বসিয়ে ওঁরা গিয়েছিলেন সমুদ্রের স্নান করতে। ফিরে এসে দেখেন ছেলে ঘরে নেই। খোঁজ খোঁজ। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। কেউ তাকে গেট খুলে সমুদ্রের দিকেও যেতে দেখেনি। দোতলার ঘরগুলো কিছুদিন হল তৈরি শুরু হয়েছে। খানিকটা হয়ে কাজ বন্ধ আছে। ওপরেও নেই সে। অনেক পরে বাড়ির পিছনদিকে নর্দমার ওপর ছেলেটার রক্তাক্ত দেহটা পাওয়া যায়। তখন আর প্রাণ নেই সে দেহে। ওপর থেকে পড়ে গিয়েছিল বলেই সবার অনুমান। মাঝেমধ্যে দোতলার ঘরে কেউ কেউ নাকি তাকে দেখতে পান।”

“ও মা গো, এ তো ভূতুড়ে কাণ্ড! বাবা নীতিশ, তুমি আমাদের এখনি নীচের ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দাও। আর একটি মুহূর্তও আমি ওপরের ঘরে থাকব না।”

গিন্নি ঘরের জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন। নীতিশ নীচে চলে গেছে।

অভয়বাবুর কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে কুন্তলের প্রতি। কয়েকটা দিন ছেলেটার সঙ্গে কাটালেই-বা কী এমন ক্ষতি হত! ভূত হলেও অতটুকু বাচ্চা কী আর ক্ষতি করবে!

অভয়বাবু জানেন এখন গিন্নিকে বোঝানো বৃথা। তাঁর কোনো কথাই শুনবেন না তিনি। আরো একবার ছেলেটাকে চোখের দেখাটুকু দেখবার বৃথা আশায় দোতলার চার ধারে চোখ বোলান অভয়বাবু। নীচ থেকে আবার গিন্নির ডাক পেয়ে একটু মনখারাপ নিয়েই সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকেন একতলায়।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ উপাসনা কর্মকার


No comments:

Post a Comment