না-মানুষের পাঁচালি: মিলেমিশে করে কাজ: অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


মিলেমিশে করে কাজ, পিঁপড়ের নাই লাজ


অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

 


কথায় আছে, ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’। একা একা কোনো কাজ না করে যদি আরো দশজনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজটা করি, তবে সে কাজ যেমন সুষ্ঠু হয়, তেমনি নিজেদের মধ্যে আসে একাত্মতা। এই কাজটা মানুষকে দিয়ে করাতে যাওয়া বেশ কষ্টকর। একজুটে কাজ করতে গেলে যে সমস্যা দেখা যায়, তার গোড়ায় আছে মানুষের আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব। অথচ দলবেঁধে কাজ করতে যেমন আছে আনন্দ, তেমনি থাকে কম সময়ে সুচারুভাবে কাজটাকে সম্পূর্ণ করার সুবিধা।

মানুষকে দিয়ে ধরে বেঁধে দলবদ্ধভাবে কাজ করাতে গেলে যে অসুবিধা, পিঁপড়েরা সেই কাজটা স্বাভাবিকভাবে করে থাকে। একা একা পিঁপড়ে বেঁচে থাকতে পারে না। তাই তারা দলবেঁধে থাকে, একসঙ্গে কাজ করে। তিনটে কাজ পিঁপড়েরা করে থাকে জীবনধারণের জন্য। এক, বাসা বানানো এবং তাকে যত্নে রাখা। দুই, খাবারের সন্ধান। তিন, খাবার সংগ্রহ করে ভাঁড়ারে জমিয়ে রাখা।

পিঁপড়েদের কোনো দলনায়ক নেই। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিয়ে একসঙ্গে মিলেমিশে সবক’টি কাজ নিখুঁতভাবে করতে পারে। একটা পিঁপড়েকে হয়তো দেখা গেল উদ্দেশ্যহীনভাবে রান্নাঘরের গ্যাস স্টোভের পাশে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষের চোখে পিঁপড়ের এই চলাফেরা উদ্দেশ্যহীন মনে হলেও, সে কিন্তু খুব ব্যস্ত—আসলে সে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে।

খুব দূর পর্যন্ত দেখার ক্ষমতা পিঁপড়ের নেই। কিন্তু তার মাথায় প্রকৃতি লাগিয়ে দিয়েছে একগুচ্ছ অ্যান্টেনা, যার সাহায্যে সে খাবারের হদিশ পেয়ে যায় খুব সহজে। যেমন ধরা যাক, রান্নাঘরের তাকের উপর রাখা আছে চিনির বয়াম। সেই বয়ামের মুখটা ভালো করে হয়তো আটকানো নেই। গ্যাস স্টোভের কাছে ঘুরঘুর করা পিঁপড়েটা ঠিক গন্ধ পেয়েছে চিনির। গন্ধের দিশা পেয়ে সে এবার ঘুরতে ঘুরতে তাকের উপর চড়ে বসবে। কিন্তু এই পথটাও সে বার করে সহজাত অনুভূতি দিয়ে, একেবারে শর্টকাট বুঝে। কিন্তু সে তো চোখে দেখে না। চিনির ভাণ্ডার আবিষ্কারের খবর দলের সবাইকে না দিতে পারলে রসদ জড়ো করবে কীভাবে? এই কাজে পিঁপড়েকে সাহায্য করে একটা বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, যা তার শরীর থেকে বেরোয়। এই পদার্থটির নাম ‘ফেরোমন’। যে রাস্তায় গিয়ে সে খাবার খুঁজে পেয়েছিল, আবার সেই রাস্তা ধরে সে ফিরে এল, পৌঁছে গেল বাসায়। এবার ফেরোমনের প্রভাবে বাকিরা সব খাবারের সন্ধান পেল। খাবার সংগ্রহকারী শ্রমিক পিঁপড়েরা এবার লাইন দিয়ে যাবে চিনির বয়ামের ভিতর। যাওয়ার এই পথটা আমাদের চোখে যতই মসৃণ হোক না কেন, পিঁপড়েদের জন্য কিন্তু সেই পথে আছে চড়াই উতরাই, আছে নানা বিপত্তি আর বাধা। সেইসব ওত পেতে থাকা বিপদ এড়িয়ে তারা রাস্তা বার করে নেয়। পিঁপড়ের দল এবার সেই চিনির দানা পিঠে নিয়ে বাসায় ফিরে ভাঁড়ারে জমিয়ে রাখে। তবে ঠিক কতটা খাবার জমিয়ে রাখলে তাদের কাজ সম্পূর্ণ হয়, সেটা তারা কীভাবে স্থির করে, মানুষ গবেষকেরা আজ অবধি তার কূলকিনারা খুঁজে পায়নি। পিঁপড়েরা তো আর মানুষকে তাদের ভাষায় বলে দেয় না, তারা কী ভাবে আর কীভাবে জীবনধারণ করে! তবে প্রায় ৮০০০ পিঁপড়ে প্রজাতির গোটা দশেকের উপর অনেক বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান চালিয়েছেন আর চমৎকার সব তথ্য জানিয়েছেন।

পিঁপড়েরা খুব গৃহকর্ম নিপুণ। অন্যান্য পোকাদের আক্রমণ ঠেকাতে উপযুক্ত বাসা বানাতে তারা ওস্তাদ। প্রযুক্তিবিদ্যায় মানুষের চাইতে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে তারা। পিঁপড়ের ঢিপি খুব ভালো করে একটা আতস কাচ দিয়ে দেখলেই পিঁপড়েদের অত্যাশ্চর্য জগৎ দেখতে পাব আমরা। পিঁপড়ের বাসার মুখটা হয় খুব সরু, কিন্তু ভিতরে থাকে প্রকান্ড প্রকান্ড সব শোবার ঘর। এক-একটা কুঠুরিতে অনেকে মিলেমিশে থাকে। খুব সম্ভব মানুষের সমাজ পরিবার বলতে যা বোঝে, পিঁপড়েদের কাছে এই ধারণা একেবারেই অন্যরকম। বাসার মুখে যাতে অন্য পোকারা সহজে ঢুকে পড়তে না পারে, সেজন্য পিঁপড়েরা প্রবেশপথে গাছের পাতা মুড়ে লম্বা নল বানিয়ে রেখে দেয়। ঘরের দেওয়াল এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে বেশি আর্দ্রতা না থাকে। ভিজে আবহাওয়ায় তাদেরও তো শরীর খারাপ হতে পারে। ঘরবাড়ি বানানোর কেরামতিতে আর মেরামতিতে দক্ষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদেরও হার মানায় পিঁপড়েরা। পিঁপড়েদের বাসা অনেকরকমের হতে পারে—কখনো গাছের কোটর, বাড়ির দেওয়াল কিংবা মাটির নীচে সুড়ঙ্গ। যাতায়াতের জন্য তৈরি করতে হয় লম্বা লম্বা হাইওয়ে। তবে সেই রাজপথে গাড়ি চলে না, চলে পিঁপড়ের সার—খাবার সংগ্রহই আসল উদ্দেশ্য।

পিঁপড়েদের তৈরি হাইওয়ের জটিল নকশা দেখে বিজ্ঞানীরাও অবাক হয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে যে কোনো পিঁপড়ে একটা কাজ বেছে নিয়ে করতে থাকে। বিভিন্ন পিঁপড়ের বিভিন্ন কাজ করে। একটা দল হয়তো ঘর পরিষ্কার করে চলেছে, তখন আরেকটা দল চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে টহল দিতে। একবার খাবারের সন্ধান পেলে হয়, সঙ্গে সঙ্গে আরেক দলের কাজ শুরু হয়ে যাবে সেই খাবার বয়ে আনার। স্ট্যান্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক বিজ্ঞানী পিঁপড়েদের গতিবিধি দেখার জন্য একটা নকল পিঁপড়ের বাসা বানিয়ে তার ভিতর একগাদা পিঁপড়ে ছেড়ে দিলেন। খাবার রেখে দিলেন একটু উপরে। তারপর তাদের কান্ডকারখানা দেখতে লাগলেন। যারা ঘরের কাজ করছিল, তাদের তিনি নীল রঙ করে দিলেন, যারা খাবার সন্ধান করে বেড়াচ্ছিল তাদের করে দিলেন লাল রঙ, আর টহলদারির কাজে যারা ছিল তাদের রঙ করে দিলেন সবুজ। তারপর কয়েকদিন ওদের কীর্তিকলাপ দেখে বুঝলেন, যারা ঘরের কাজ করে, তারাই প্রয়োজনে খাবার সংগ্রহ করতে যায়। তবে কারো নির্দেশে যে কাজগুলো হয় না, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হয়ে যান। তাই তিনি গবেষণা পত্রে বলেন, এক-একটা পিঁপড়ে যেন মানুষের মাথার ঘিলুর এক-একটা নিউরন কোষের মতো কাজ করে, আর গোটা পিঁপড়ে কলোনি হচ্ছে মানুষের আস্ত মাথা। তাই যেমন মানুষের মাথার কাজ করার ক্ষমতা নির্ভর করে তার ঘিলুর প্রতিটি কোষের কাজের উপর, ঠিক তেমনই হল পিঁপড়েদের দলবদ্ধ জীবন।

পিঁপড়েরা দল বেঁধে থাকবে, তাদের উপর হবে বহির্শত্রুর আক্রমণ হবে না, তা তো হতে পারে না। তাই তাদের দলে থাকে সৈনিক পিঁপড়েও। শান্তির সময় তারা অন্য কাজগুলো করে, কিন্তু আক্রান্ত হলে নিজেদের কলোনিকে বাঁচাতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই পিঁপড়েদের অস্ত্র দিয়েছে প্রকৃতি। তাদের লেজে থাকে ফরমিক অ্যাসিড। আক্রান্ত হলে তারা হুল ফুটিয়ে দিলেই সেই ফরমিক অ্যাসিড আক্রমণকারীর চামড়ায় জ্বালা ধরায়। পিঁপড়ের কামড় যে খেয়েছে, সে জানে সেই কামড়ের ফলে চামড়ার উপর অনেকটা জায়গা কেমনভাবে ফুলে যায়।

একবার একটা মজার কান্ড হয়েছিল। আর্জেন্টিনা থেকে চিনি বোঝাই জাহাজ এসে পৌঁছল আমেরিকার লুসিয়ানা শহরে। পিঁপড়ের দলও চিনির বস্তার সঙ্গে সেই দেশে পৌঁছে গেল। এর আগে ওই জাতের পিঁপড়ে লুসিয়ানাতে ছিল না। লুসিয়ানায় ছিল আরেক রাক্ষুসে পিঁপড়ে, যাদের বলা হয় ‘ফায়ার অ্যান্ট’। সেই আগুনে পিঁপড়েগুলো আর্জেন্টিনার পিঁপড়েদের দিল খেদিয়ে। কীভাবে তারা এই উড়ে এসে জুড়ে বসা পিঁপড়েদের খেদিয়েছিল, সেটা জানা মুশকিল। কিন্তু দেখা গেল তারা লুসিয়ানা থেকে সরে গিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া শহরে জাঁকিয়ে বসল।

এই বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে যে আর্জেন্টিনার পিঁপড়েরা নতুন পরিবেশে কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিল। তবে পিঁপড়েরা যে অচেনা জায়গায় নিজেদের কৌশল বদলে বেঁচে থাকতে সিদ্ধহস্ত, সে ব্যাপারে গবেষকেরা একমত।

পিঁপড়েদের কার্যকলাপ থেকে মানুষ যে শিক্ষা পেয়েছে তা হল ‘কালেক্টিভ ইন্টেলিজেন্স’ বা সম্মিলিত বুদ্ধি। কঠিনতম কাজটিও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে ফেলা যায় এই সম্মিলিত বুদ্ধি প্রয়োগ করে। তাই আজকের আধুনিক বিজ্ঞান কম্পিউটারে কৃত্রিম বুদ্ধিমতায় (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) পিঁপড়েদের বাতলে দেওয়া পথে (সোয়ার্ম ইন্টেলিজেন্স) কাজ শুরু করেছে। রোবট তৈরিতে পিঁপড়ের খাবার সংগ্রহ করার অভিনব পদ্ধতি (যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘অ্যান্ট ফরেজিং’) ব্যবহার করার কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা। 

ছবি: ইন্টারনেট


No comments:

Post a Comment