গল্প: একদিন কবরখানায়: বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য


(১)


চ্যালেঞ্জটা অংশু এভাবে নিয়ে নেবে, কেউ তা ভাবতে পারেনি।

রোজকার মতো আমরা নিতাইদার তেলেভাজার দোকানে আড্ডা মারছিলাম। গরমাগরম তেলেভাজা মুখে ফেলে কথা শুরু হয়েছিল নেটফ্লিক্সে হরর মুভি দেখা নিয়ে। সৈকত আর শোভন এ নিয়ে বেশ জমিয়ে গল্প করছিল। কথার পর কথা জমল। ক্রমে হলিউডের পর এল বলিউড-টলিউড। দক্ষিণী ভূতের ছবি হয়ে আলোচনা ব্রেক কষল কে সত্যি ভূত দেখেছে এ বিষয়ে।

সৈকত শুরু করল, “আচ্ছা, ঝালুপাড়ায় একটা খ্রিস্টান কবরখানা আছে না?”

অংশু, শোভন আর আমি একসঙ্গেই বললাম, “হ্যাঁ।”

চোখ গোল গোল করে সৈকত বলল, “জানিস, এটা সাহেবদের কবরখানা ছিল। এটার বয়স প্রায় একশো সত্তর বছর!”

“তাতে এমন আর কী? ইংরেজদের সময় তৈরি অনেক কিছুই তো এখনো আছে যার বয়স এই কবরখানার চেয়ে ঢের বেশি।” ঠোঁট উলটে অংশু বলল।

আমি আর শোভন বেশ অবাক হয়েই বললাম, “আরিব্বাস! এ তো অনেক পুরোনো কবরস্থান!”

“এই কবরখানায় একটা সাহেব পাদ্রির ভূত আছে, জানিস। গভীর রাতে বেরোয়।” শোভন কেমন অদ্ভুতভাবে গলাটা নামিয়ে কথাটা বলল।

শোভন ফের কী বলতে যাচ্ছিল, তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে অংশু সশব্দে হেসে বলল, “যতসব গাঁজাখুরি গল্প। এক কাজ কর সৈকত, তুই একটা ভূতের ছবি বানা। নাম দিবি ‘কবরখানার চৌকিদার’। ভালো চলবে মাইরি।”

নিতাইদা সহ আমরাও হেসে ফেললাম অংশুর কথা শুনে। কিন্তু সৈকত গম্ভীর গলায় বলল, “আমার কথা বিশ্বাস না হলে একবার ওই পাড়ায় গিয়ে খবর নিস।”

“হয়েছে! এসব শোনা কথা। অনেক পুরোনো কবরখানা নিয়ে এমন গল্প থাকে। আর তোর মতো পাবলিকরা এসব গল্প ফাঁদে।” অংশু পালটা উত্তর দিল।

“এটা গল্প নয়। সবাই জানে। আচ্ছা, তোর কী মনে হয়, আমি বানিয়ে বলছি?” গলা চড়িয়ে সৈকত বলল।

“নিশ্চয়ই বানিয়ে বলছিস। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আবার ভূত! ধুস, যত্তসব আষাঢ়ে গল্প। আমি এসব বিশ্বাস করি না। তবে তা সত্যি, এটা এক ঐতিহাসিক গোরস্থান। ইতিহাস আর ঐতিহ্য এখানে আছে। ভূত নয়।”

“ধুর তোর ইতিহাস। ওখানে সাহেব ভূতেরা রাতে ঘুরে বেড়ায়। সেদিন পাড়ার বান্টিদার সঙ্গে দুপুরে গিয়েছিলাম ওখানে। গা শিরশির করছিল। আচ্ছা, তোর যদি এত সাহস তাহলে একদিন রাতে ওই কবরখানায় গিয়ে একটা ফেসবুক লাইভ কর না। তাহলে মানব।”

অংশু আর সৈকতের বাকবিতন্ডা সপ্তমে চড়ল। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি আর শোভন ওদের কথার মাঝখানে গিয়ে ঢুকে পড়লাম। সঙ্গে নিতাই দাও যোগ দিল। “আরে, তোরা তো  পুরো সিরিয়াস হয়ে পড়েছিস এই কবরখানা নিয়ে! যা, ছাড় তো। ও নিতাইদা, চারটে চপ দাও তো।”

“না। এসব খাব না।”

“আমিও না।”

বুঝলাম, অংশু আর সৈকত দুজনেরই মেজাজ পুরো খিঁচড়ে আছে।

“তোমরা রোজ এখানে আসো। কত কথা হয়। আজ হঠাৎ কী হল? এক কবরখানা নিয়ে ঝগড়া করছ?” গামছায় হাত মুছতে মুছতে বলল নিতাইদা।

শোভন আর আমি অসহায়ভাবে তাকালাম। ওরা দুজনই চুপ। পরিস্থিতি একেবারে থম মেরে আছে। ঝড়ের পূর্বাভাস।

“আমি ওই কবরখানায় যাব। আজকে রাতেই যাব। একা যাব। যাবার আগে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেব আর পৌঁছে লাইভ করব। আর তা না করলে আমার নাম অংশুমান আচার্য নয়।” অংশু এক লাফে ব্রেঞ্চ থেকে উঠে হাতের মুঠি শক্ত করে বলল।

শোভন আর আমি সত্যি ওর কথায় এবার ঘাবড়ে গেলাম। ঠান্ডা মাথার মানুষের রাগ বেশি হয়। অংশু আগে থেকে কারো সঙ্গে ঝামেলা করে না। ওকে স্কুল থেকে চিনি।

“রাতে ফেসবুকে লাইভ দেখিস।” কথাটা বলে গটগট করে নিতাইদার দোকান থেকে বেরিয়ে গেল অংশু।

“অ্যাই, শোন অংশু। অ্যাই!”

কারো কথা কানে না তুলে অংশু স্কুটি স্টার্ট দিয়ে সন্ধ্যার আবছায়ায় মিলিয়ে গেল।

“আমিও আসি।” ফাঁকতালে কেটে পড়ল শোভনও।


(২)



কয়েকবার ফোন করলাম। কিন্তু অংশু ফোন ধরল না। বুঝলাম জল অনেক দূর গড়িয়েছে। এদিকে শোভন জানাল, সে আসতে পারবে না। ওর শরীর খারাপ। বুঝলাম ব্যাটা অবস্থা বেগতিক দেখে ডুব মেরেছে। শরীর খারাপ মিথ্যে বাহানা ছাড়া আর কিছু নয়। অগ্যতা সৈকত আর আমি ঠিক করলাম, আগেভাগে গিয়ে কবরখানার ভিতরে কোনো একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকব, অংশু কবরখানায় এলেই ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে আসব। সৈকত না হয় ওর পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নেবে। কারণ, হঠাৎ কোনো অঘটন ঘটলে অংশুর বাবা-মার সামনে মুখ দেখাতে পারব না আমরা।

সৈকতকে কয়েক রাউন্ড গালিগালাজ করলাম। সে বেচারা এমনিতেই আগে থেকে টেনশনে। আমার গালির চোটে আরো মুষড়ে গেছে। বার বার আফশোস করছে, অংশুকে ফোন করেছে। হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে মেসেজও পাঠিয়েছে, কিন্তু অংশু উত্তর দেয়নি, ফোনও ধরেনি।

সন্ধে সাতটা নাগাদ আমরা হাজির হলাম পুরোনো সেই ইউরোপিয় কবরখানায়। চারদিক শুনশান। ঝিঁঝিঁর টানা কোরাস চলছে। গা ছমছম করছে। মোবাইল জ্বালিয়ে দুজন সাবধানে ঢুকলাম বটে, কিন্তু বার বার মনে হচ্ছে কারা যেন আমাদের দেখছে, পিছনে পিছনে আসছে। পিছনে তাকালেই সুড়ুত করে সরে পড়ছে।

আমার ধারণা, অংশু চটে গিয়ে চ্যালেঞ্জটা নিলেও বেশি রাতে গোরস্থানে আসবে না। খুব বেশি কি বেশি রাত ন’টার ভেতরই আসবে।

সৈকত আগেও এই কবরখানায় এসেছে। তাই দাঁড়ানোর একটা জায়গা খুঁজে বের করতে সময় লাগেনি। এক বুক অস্বস্তি আর চাপা ভয় নিয়ে বিশাল একটা গাছের নীচটা বাছলাম। কবরখানার গেটের ঠিক বাঁদিকে গাছটা। ওদিকটায় কবর নেই। গাছটা মূল ফটকটার একদম কাছেই। অংশু ঢুকলেই ওকে আটকাব।

মোবাইলের আলোয় চারপাশ দেখে ব্লিচিং পাউডার, কার্বলিক অ্যাসিড ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। কাছে একটা মশা তাড়ানোর ধূপকাঠিও জ্বালিয়ে দিয়েছি।

মোবাইলের আলো নেভাতেই ঝুপ করে অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমরা। ফিসফিস করে  সৈকত বলল, “ভয়ংকর লাগছে রে!”

“তোর জন্যই এটা হয়েছে। কে বলেছিল অংশুকে চটাতে!” দাঁতে দাঁত চেপে বললাম।

“প্লিজ এখন আর বকিস না। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।”

“আমার কি খুব মজা লাগছে?”

“অংশুকে আরেকটা ফোন কর না।”

“পাগল! ফোন করে কী করব? নিজে দেখলি না ধরছে না! পুরো খেপে আছে।”

“যদি না আসে! তাহলে তো আমরা বোকা বনে যাব। রাতের বেলা এই পুরোনো কবরখানায় তুই আর আমি দুজন শুধু জ্যান্ত মানুষ এতটা মৃত মানুষের মধ্যে!”

“অংশু আসবে। ও যা বলে, তাই করে। ঠান্ডা মানুষদের কখনো চটাতে নেই, বুঝলি?”

“তোমাদের বন্ধু সত্যি আসবে তো?”

চোস্ত ইংরেজিতে খসখসে একটা পুরুষ কণ্ঠে একথা শুনে আমাদের দুজনের হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে যেন মুখে এসে পড়ল।

“কে?” আমার গলাটা কাঁপল।

সৈকত আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। চারদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। গলার আওয়াজটা ঠিক কোনদিক থেকে এল ঠাহর করতে পারলাম না।

“কে?” আবার বললাম।

“রাতের বেলা হুট করে এত পুরোনো কবরস্থানে আসা ঠিক নয়। তোমাদের বন্ধুকে বারণ করো আসতে।”

সেই আওয়াজ। এবার ভাঙা বাংলায় কথা বলছে। আরো কাছে মনে হল আওয়াজটা।

বুঝতে পারছি আমার হাত-পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে। পা শেকড় ছড়াচ্ছে মাটিতে। পাদুটো নাড়াতে পারছি না। মোবাইলের আলো জ্বালতেও ভুলে গেছি। শ্বাস বন্ধ করে একটা দৌড় দিলে কেমন হয়? কিন্তু সৈকতকে এই কথা বলার জন্য মুখ খুলতে পারছি না। ও-ও কিছু বলতে পারছে না। কেমন একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোচ্ছে ওর মুখ দিয়ে। বুঝতে পারছি ও খুব ভয় পেয়েছে। ঘরে বসে হরর মুভি দেখা আর নিকষ কালো অন্ধকারে কবরখানায় আসার পার্থক্যটা হাড়ে হাড়ে ও টের পাচ্ছে। সঙ্গে আমিও।

ফের সেই গলা আওয়াজ, “১৮৬৬ সালে তৈরি হয়েছিল এই সমাধিক্ষেত্র। এখানে অনেক চা-বাগানের সাহেবদের কবর আছে। গিলবার্ট হেরোন, জেমস উইনচেস্টার, লেফটেন্যান্ট রবার্ট রুনড্যাল সউনন্টন সাহেবরা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন এই জমিতে। তোমরা যদি চাও তাহলে ওদের ঘুম থেকে ওঠার জন্য বলব। কী বলো?”

আর বিন্দুমাত্র দেরি না করে ঘন অন্ধকার ভেদ করে দৌড় দিলাম আমি আর সৈকত। কপালে যা আছে দেখা যাবে। পিছন ফিরে একবার দেখলাম। মনে হল, বিশাল একটা ছায়ামূর্তি যেন কবরখানার গেট আগলে দাঁড়িয়ে আছে।

বাড়ি ফিরে বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর মনে পড়ল অংশুর কথা। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে আট। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ও ভৌতিক সে কবরখানায় পৌঁছে গেছে। সে বিশ্বাস করুক বা না করুক, তাকে জানাতেই হবে। ফোন করব, এর মধ্যেই হোয়াটস অ্যাপে একটা মেসেজ ঢুকল। অংশুর  ভয়েস মেসেজ। চটজলদি ডাউনলোড করে ক্লিক করতেই বেজে উঠল কবরখানায় ভাঙা বাংলায় শোনা সেই খসখসে গলা, ‘রাতের বেলা হুট করে এত পুরোনো কবরস্থানে আসা ঠিক নয়।’


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল


5 comments: