গল্প: হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা আর টুলুমামা: চন্দন চক্রবর্তী


এখন রাতটা যেন কত্ত বড়ো হয়ে গেছে। ঋষি, ঋকু দুই যমজ ভাই। অনেক সকালে ঘুম ভেঙে গেছে। হঠাৎই দুজনের টুলুমামার কথা মনে পড়ল।

ওদের এখন ইশকুল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। বন্ধ বাইরে যাওয়া। নীচে আবাসনের ছোট্ট পার্কে গিয়ে যে খেলাধূলো করবে তারও উপায় নেই। এদিকে ওদের বাবাও অফিস যাওয়া বন্ধ। কোথাও বেরনো বন্ধ। অফিসের কাজ সব ল্যাপটপের মাধ্যমে করছে। ওরা যে একটু বেশি বেশি করে কম্পিউটারে গেম খেলবে, তার উপায় নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, শুধু আবাসন কেন, স্কুলের বন্ধুদের মুখও দেখতে পাচ্ছে না। কথাও বলা যাচ্ছে না। এখন ওরা দুজন শুধু কথা বলা বন্ধু খুঁজে বেড়াতে থাকে।

বন্ধু খুঁজতে গিয়েই টুলুমামার এসে হাজির। কদম ছাঁট চুল, সাদা ধুতি আর শার্ট পরত। চোখগুলো উজ্জ্বল। সবসময় হাসি লেগে ছিল মুখে। বয়সটাও সেই হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো বছর তিরিশ হবে। ‘সি’ ব্লকের বুল্টুদের বাড়ি মাস ছয়েকের জন্য এসেছিল। সম্পর্কে নাকি ওদের মামা হয়। ছোটোবেলায় নাকি ওদের দাদু টুলুমামাকে পেয়েছিল। দাদুর বাড়ির উলটোদিকের রকেই বেচারা দিন কাটাত। ওর কেউ কোথাও নেই দেখে দাদু নিজের ছেলের মতো মানুষ করেছিল। তাই বুল্টুর বড়োমামা, ছোটোমামার মতো টুলুমামাও একজন মামা হয়ে গিয়েছিল।

টুলুমামার এক অদ্ভুত গুণ ছিল। শিস দিয়ে বাঁশির মতো করে পাখির স্বর নকল করত। আর আবাসনের পাখিরা ছাড়াও বাইরের পাখিরা পার্কে চলে আসত। সবুজ ঘাসে চরত আর টুলুমামার সঙ্গে কথা বলত। আর ওরা আবাসনের বাচ্চারা মানে বুল্টু, ঋকু, ঋষি, পালক, রাহুল, রনি, রেশমি ওরা সবাই পার্কের বেঞ্চে বসে দেখত, বোঝার চেষ্টা করত সেই পাখির ভাষা। টুলুমামা বলেছিল, শিসে‌র মাধ্যমে টুলুমামা জিজ্ঞেস করত, ‘কী, তোমরা কেমন আছ? আজকে শস্যদানা পেয়েছ? ওই দ্যাখো মাথার ওপর বড়ো কয়েকটা চিল উড়ছে। দেখতে পাচ্ছ?’ ইত্যাদি বলত আর পাখিরা যে যার ভাষায় তার উত্তর দিত।

তখন ঋকু, ঋষি অনেক ভেবেচিন্তে জিজ্ঞেস করেছিল, “আচ্ছা টুলুমামা, একটা মানুষের অনুকরণ করা শব্দ পাখি কী করে বুঝবে? এটা কী করে সম্ভব?”

টুলুমামা হেসে বলেছিল, “এটাও তো বিজ্ঞান রে। ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ তরঙ্গ দিয়ে হ্যামলিনের সেই বাঁশিওয়ালা যেমন ইঁদুরকে ঘর থেকে বাইরে বার করেছিল, ঠিক তেমন করে শব্দ তরঙ্গের খেলা।”

তারপরে সব বাচ্চারা শিস দেওয়া শিখল। সবাই যে যার সরু, মোটা সুরেলা স্বরে ডাকতে শুরু করেছিল। পাখিদের সঙ্গে একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল। তারপর টুলুমামা এক ভোর সকালে চলে গিয়েছিল। কত কী কাণ্ড ঘটেছিল!


ঋকু হঠাৎ গম্ভীরভাবে বলল, “বুঝলি ভাই, এই সময় হ্যামলিনের সেই বাঁশিওয়ালার মতো মানুষ দরকার ছিল।”

“কেন? এখানে তো কোনো ইঁদুরের উপদ্রব নেই যে সেই বাঁশিওয়ালা বাঁশির সুরে আচ্ছন্ন করে সব ইঁদুরদের টেনে নিয়ে সেই ওয়েজার নদীতে ফেলে দেবে।”

“ধুর বোকা! তখন ইঁদুরের দ্বারা তৈরি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল জার্মানির সেই ছোট্ট শহর হ্যামলিন। তাও প্রায় ৭০০ বছর আগে। কিছুতেই প্লেগমুক্ত করা যাচ্ছিল না। তখন ওখানকার মেয়র বড়সড় পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন, যে এই ইঁদুর নির্মূল করতে পারবে তাকে প্রচুর অর্থ পুরস্কার হিসাবে দেওয়া হবে। তখন ওই তিরিশ বছর বয়সী বাঁশিওয়ালা একটা রুপোর বাঁশি বাজিয়ে তার মায়াবী সুরে সব ইঁদুরকে ঘর থেকে বার করেছিল। শহর প্লেগমুক্তও হয়েছিল।”

“কিন্তু এখনো তো এক মহামারী হতে চলেছে। করোনা ভাইরাসের জন্যও দেখ আমরা ঘরে বন্দি! মানুষ খাঁচায় আর পশুপাখিরা সব ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

‘হ্যাঁ রে দাদা, মেক্সিকো শহরে লেপার্ড ছাড়াও কচ্ছপে পার্কে এসে ডিম পাড়ছে। খবরে দেখাচ্ছিল সেদিন।”

“ব্যাপারটা মজার, না রে ভাই? আমি ভাবছি যদি অন্তত টুলুমামা থাকত, তাহলে শিসের সুরে ওই করোনা ভাইরাসকে দেশ থেকে নির্মূল করে দিতে পারত? কোনো ডাক্তার, মাস্ক এসব কিছুই লাগত না। ঠিক কিছু একটা করত।”

এবারে ঋষি বলল, “থাকবে কী করে বল? আমাদের আবাসনের সব বড়োরা মিলে তাড়িয়ে দিল। কী দোষ ছিল বল? আমাদের বাবাও তো শোনেনি আমাদের কথা, আমাদের যন্ত্রণার কথা।”

ঋকু একটু ভেবে বলল, “আসলে বড়োরা ভয় পেয়েছিল। যদি সত্যিই টুলুমামা সেই হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা হয়ে যায়!”

“তাহলে তো ভালোই হত। সব করোনাকে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় ফেলে দিত। ব্যস, ডুবে মরে যেত। করোনার তো হাত-পা নেই যে সাঁতার কাটবে।”

“ব্যাপারটা তো ভালই হত। কিন্তু তুই সেই বাঁশিওয়ালার গল্পটা ভুলে গেছিস।” এই বলে ঋকু হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার বাকি গল্পটা বলতে শুরু করল।

ওয়েজার নদীও নিশ্চয়ই খুব বড়ো এবং গভীর ছিল। খরস্রোতাও ছিল। কারণ, লক্ষ লক্ষ ইঁদুর বাঁশির সুরো মায়াবী আহ্বানে ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু পাড়ে গিয়ে বাঁশিওয়ালার শব্দ থেমে গেল। ইঁদুরগুলো সব ঘোরে ছিল, ঝাঁপ দিয়েছিল জলে। সেই বাঁশিওয়ালার বাঁশি ছাড়া আর কিছু ছিল না। সেই গরিব লোকটি ফিরে এসে তার প্রাপ্য পুরস্কারের অর্থ দাবি করল। কিন্তু শহরের মেয়র তা দিতে অস্বীকার করলেন। সে মনের দুঃখে চলে গিয়েছিল, কিন্তু কিছুদিন পরে সেই বাঁশির সুরে আরো মায়াবী জাল বিস্তার করল এবং বাজাতে বাজাতে সেই শহরের বাচ্চাদের ঘর থেকে বার করল। তারপর তাদের নিয়ে হারিয়ে গেল। কেউ বলে কোনো পাহাড়ে, কেউ বলে ওই নদীতেই মেরে ফেলেছিল।

গল্পটা শেষ করে ঋকু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছু বুঝলি?”

ঋষি ঘাড় নাড়ে। “উঁহু।”

“এখন আমাদের টুলুমামা কী করেছিল?”

“আমাদের মতো বাচ্চারা সব মামার শেখানো সুর শিখে শিস দিতে শিখলাম। রাত-দিন শিস দিতাম আর পাখিদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম। স্কুল থেকে ফিরে এসে পার্কে দৌড়াতাম। বিকেলের খেলা শেষ করে আমরা টুলুমামার সঙ্গে শিস দিতাম আর ঘরে ফেরা পাখিরা এমনকি হিংস্র চিলও দূরে রেলিংয়ে বসে গল্প করত। টুলুমামাই একদিন সেই সুন্দর চিলটাকে কাছে ডেকে নিয়ে এসেছিল। শালিক, চড়াই, পায়রা, বুলবুল ফিঙে যত রাজ্যের পাখিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে সেই চিলও আর পায়রার বাচ্চা বা অন্য পাখির বাচ্চা ছোঁ নিয়ে পালাত না।

“এইরকম যখন অবস্থা, বাচ্চারা সব টুলুমামার প্রতি ভীষণ আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। কেমন যে সম্মোহনী শক্তি ছিল সেই টুলুমামার! এদিকে বাচ্চারা বাড়িতে স্কুলে দিনরাত শিস দিতে শুরু করেছিল। বাড়ির লোকেরা, স্কুলের শিক্ষকরা রেগে গেলেন সব। রাস্তার ছেলেদের মতো শিস দেওয়া এক বাজে অভ্যাস। তা চলবে বা। গার্জেন মিটিং কল করে শিক্ষকরা সব শোনার পরে বলেন, ‘পাখির সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা, কথা বলা সব ঠিক আছে। কিন্তু এরা তো মোবাইলে গেম খেলার মতো অ্যাডিকশনে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া কখনো ভেবে দেখেছেন, লোকটি আপনাদের ওখানে স্থায়ী বাসিন্দা নয়। তার জন্মবৃত্তান্ত ঠিক নয়। ফুটপাতের অনাথ ছেলে ছিল একসময়। বলা তো যায় না, ওই লোকটি যদি হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো শিস দিয়ে কিছু বাচ্চাকে নিয়ে পালিয়েও যেতে পারে! বাচ্চারা কেন লোকটিকে এত চাইবে?

“যাই হোক, তারপরে আবাসনের লোকেরা সভা ডেকে টুলুমামাকে আবাসন ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেছিল। বাচ্চারা সেই সময়ে সব স্কুলে ছিল। আসার পর দেখে টুলুমামা আর নেই, চলে গেছে। বুল্টু নিজে কাঁদতে কাঁদতে সব বলেছে।

“এরপরে বাচ্চাদের সে কী মনখারাপ! তারা দুঃখে, রাগে পার্কে চুপচাপ বসে থাকত। সেই পাখিরা এসে বসত। কিন্তু বোবা লোককে কে আর পছন্দ করে! পাখিরাও বুঝে গেছে কম কথা বলা বা না কথা বলা লোকেরা ভালো হয় না। কিন্তু বাচ্চারা যে কলকল করে শিস দিয়ে কথা বলত! কী হলো? এরাও তাহলে বড়ো হয়ে গেল? এইসব ভেবে তারাও দূরে সরে গেল।”

এখন সেই টুলুমামা আর পাখিদের কথা মনে পড়ল। ঋকু আর ঋষি বিছানা থেকে উঠে বিশাল জানালার স্লাইডিং কাচ সরিয়ে দেখে ভোরের পাখিরা যথারীতি উড়ছে। ওরা আবাসনের বিভিন্ন জানালায় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে যেন মনে মনে বলে, তোমরা কথা না বলবে তো কী হয়েছে? আমরা নিজেরাই কথা বলব, গান গাইব আর উড়ব। আড়ি, আড়ি, আড়ি।

ঋষি বলে, “ভাই, আয় না, আমরা পাখিদের সঙ্গে ভাব করে নিই। দ্যাখ, ওই পার্কের গাছে দুটো ফিঙে কেমন খেলছে। পায়রাগুলো আকাশে উড়তে শুরু করেছে। এদিককার পায়রা ওদিকে। আবার ওদিকেরগুলো এদিকে উড়ে আসছে।”

ঋকু বলে, “হ্যাঁ রে, সার্কাসের ট্রাপিজের খেলার মতো।”

হঠাৎ ওদের এসির খোপ থেকে পায়রার বকবকম ডাক শোনা গেল। ঋকু সেই ডাক নকল করে ডেকে উঠল। দুটো শালিক ঘাড় কাত করে দেখে ফেলে। তারা উড়ে এসে জানালায় বসে। খানিক অবাক হয়ে দেখে। তারপরেই ডেকে ওঠে, ‘ক্যা-ক্যা-ক্যাক।’

অমনি ঋষি শিস দিয়ে কথা বলে, ‘আমরা ভালো নেই। তোরা কেমন আছিস?’

এবারে দুটো শালিকের ঝগড়া লেগে গেল কে উত্তর দেবে। তাদের বন্ধু এতদিন পরে শিস দিয়ে কথা বলছে, সুতরাং উত্তর আমি দেব। আরেকজন বলে, ‘না, আমি।’

এরা দু-ভাই মজা পেয়ে বলে, ‘ঝগড়া করিস না। আমরা জানি, তোরা ভালো আছিস।’

এবারে একটা গায়ে ছিট ছিট একটা ঘুঘু উত্তর করল, ‘না গো, ভালো নেই। তোমরা ছাড়া ভালো থাকা যায়?’

দুটো ফিঙে দূর থেকে দেখতে পেল। সব ‘ডি’ ব্লকের আটতলায় জানালার ধারে বসে। খুব গপ্প করছে। নাকি খাবার খাচ্ছে?

ইত্যিমধ্যে ঋষি-ঋকুর পেছনে ওদের মা দাঁড়িয়েছে। একটা বড়ো পাত্রে কিছু শস্যদানা, পাউরুটির টুকরো নিয়ে এল। এবারে দুই ভাই খুব উৎফুল্ল হয়ে শিস দিয়ে বলল, ‘খা, খেয়ে নে।’

ফিঙে দুটো ডালের দানা মুখে পুরে বলে, ‘আচ্ছা, তোমরা খাঁচায় বন্দি কেন?’ হঠাৎ যত মানুষ ঘরে ঢুকে কেন?’

তখন দুই ভাই ভাইরাস বৃত্তান্ত বলল। ঋকু বলে, ‘জানি না কবে মুক্ত হয়, জানি না। আমাদের বন্ধুরা কেমন আছে?’

একটা ফিঙে বিজ্ঞের মতো বলল, ‘ঠিক আছে। আমরা সব জানালায় জানালায় গিয়ে খবর এনে দেব।’

ঋষি বলে, ‘তা বললে হয়? আমরা তো সোজাসুজি গল্প করতে পারছি না। পার্কে যেতে পারছি না। আচ্ছা বন্ধুরা, তোমরা একটা কাজ করতে পারবে?’

পাখিরা সব একসঙ্গে কিচমিচ করে ডেকে উঠল। ‘বলো কীভাবে তোমাদের সাহায্য করব?’

ঋকু-ঋষি দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। ঋকু বলে, ‘সে কাজটা খুব সোজা। আগেকার দিনে পাখিরা যেভাবে একজনের চিঠি অন্যজনের কাছে পৌঁছে দিত....’

এবারে হঠাৎ ওদের মা দু-তিনবারের চেষ্টার পর শিস দিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ, ধর এই আবাসন ছেড়ে ওই দূরের বাড়িটাতে ওদের বন্ধু স্বাগ্নিক, শুভম ওরা থাকে। ওদের কাছে চিঠি পৌঁছে দেবে। ওরাও চিঠি দেবে। তা তোমরা নিয়ে আসবে।’

শুধু ঋকুরা দুই ভাই নয়, পাখিরাও অবাক—ওদের মাও পাখিদের ভাষায় শিস দিয়ে কথা বলছে!

কখন যে ঋকুদের বাবা পেছনে দাঁড়ায় ওরা খেয়াল করেনি। হঠাৎ একটা জোরালো শিসের শব্দ। ‘ঠিক আছে, আমারও দু-একটা চিঠি নিয়ে যাস। ব্যানার্জীবাবু কেমন আছে কে জানে।’

এবারে পায়রাগুলো ঘুরতে ঘুরতে বকবকম করে বলে, ‘ওরা যখন বাইরে আসবে, তখন ওদের আমাদের সঙ্গে কথা বলতে দেবে তো?’

এবারে ভদ্রলোক বিকট সিটি দিলেন। ‘অবশ্যই।’

তারপর হঠাৎ ঋকুদের বললেন, “বুঝলি, ছোটোবেলায় ময়দানে ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে এভাবে সিটি দিতাম। মনে পড়ছে, তখনো দেখতাম অনেক পাখি উড়ছে। হা হা হা।”


___

অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ


No comments:

Post a Comment