গল্প: পরজীবী: বুদ্ধদেব চক্রবর্তী

 

পরজীবী


বুদ্ধদেব চক্রবর্তী

 


সুজতাভবাবুর অমরকণ্টক যাওয়ার সেরকম কোনো প্ল্যান ছিল না। কিন্তু বন্ধু ঋষভবাবুর পাল্লায়ে পড়ে একরকম বিনা প্রস্তুতিতে তাঁকে সেখানে যেতেই হল। হাওড়া থেকে মুম্বাই মেল ধরে সোজা বিলাসপুর হয়ে পরের দিন ভোরে পেন্দ্রা বলে একটা নিরিবিলি স্টেশন নামলেন দুজনে। সঙ্গে আর কেউ নেই।

সুজতাভবাবু বিয়ে-থা করেননি আর ঋষভবাবুর স্ত্রী মাস ছয়েক হল গত হয়েছেন। ঋষভবাবুর মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আর এক ছেলে কর্মসূত্রে দেরাদুনে থাকে। তাই দুজনেই এক্কেবারে ঝাড়া হাত-পা। দুজনে দিন কয়েক থাকবেন বলে মনস্থির করেছেন তবে লাগেজ সেরকম বিশেষ কিছু নেননি।

স্টেশনটি বেশ। ছিমছাম, গাছগাছালিতে ভরা। ঋষভবাবুর কোন এক গুরুভাই এখানে থাকেন। তাঁর একটি ধর্মশালাও আছে নর্মদা নদীর কুণ্ডের কাছে। তাঁর নিমন্ত্রণেই এখানে আসা। তবে শুধু যে একেবারে সেটা, তাও বলা যায় না। সুজতাভবাবুর গাছগাছালির শখ বহুদিনের। স্কুলে দীর্ঘকাল বোটানি পড়িয়ে এসেছেন, কলেজেও বটানিতে তাঁর বেশ ঝোঁক ছিল। কিন্তু ওটা নিয়ে আর বিশেষ এগোনো হয়নি। তাই এখন কোথাও নতুন গাছের সন্ধান পেলেই সেটা এনে তাকে লাগিয়ে বড়ো করে তোলার চেষ্টা করেন। এতেই তাঁর আনন্দ। তবে তিনি ফুল বা ফলের গাছ যে লাগান তেমনটি নয়। সুজতাভবাবুর আগ্রহ ভেষজ উদ্ভিদের দিকে। সে শখ পূরণে তিনি দেড় বিঘা জমি দিয়ে আস্ত একটা ভেষজ বাগান করে ফেলেছেন বাড়ির চারপাশে। কী নেই সেখানে। ভৃঙ্গরাজ, বহেড়া, শ্বেতচন্দন, হরিতকি, আমলকি, রুদ্রাক্ষ থেকে শুরু করে আরো কত জানা অজানা গাছ, লতা, গুল্ম। কিছু লতা-গুল্মের সঠিক নাম এবং কাজ সুজতাভবাবুরও জানা নেই। দেশে-বিদেশ থেকে যে কতরকমের গাছগাছড়া এনে লাগিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। বন্ধু ঋষভবাবুর বাড়ি সুজতাভবাবুর বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে একটা গঞ্জমতো জায়গায়। তবে তাঁর গাছগাছালির শখ বিশেষ নেই। তিনি অমরকণ্টকে এসেছেন নেহাতই ঘোরার উদ্দেশ্যে।

স্টেশন ছাড়িয়ে বেরিয়ে দুজনে একটা অটো নিলেন। স্টেশন থেকে কিলোমিটার আটেকের পথ। তবে যাত্রাপথটি অতীব মনোরম। গভীর অরণ্যের ঘেরাটোপে ঘেরা। চারপাশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক শোভা দেখতে দেখতে দুজনের যাত্রাপথ বেশ কেটে গেল।

“অমরকণ্টক হল বিন্ধ্য পর্বতের উচ্চতম শিখর। তার উপর আবার নর্মদা নদীর উৎসস্থল। তাই এর একটা আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য আছে। সতী পীঠের এক পীঠ। কিন্তু এসব বাদ দিয়েও এর সিনিক ভিউ অসামান্য। কী বলেন?” অটোর ভাড়া দিতে দিতে সুজতাভবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন ঋষভবাবু।

সুজতাভবাবু কোনো মন্তব্য না করে স্মিত হাসিতে তাঁর সম্মতি প্রকাশ করলেন মাত্র।

নর্মদা নদীর মন্দিরের বিশাল চত্বরকে পাশে ফেলে কিছু দূর এগোলেই নর্মদা কুণ্ড। এখান থেকে জলধারা কিছুটা বয়ে গিয়ে নর্মদা নদী সৃষ্টি করেছে। তার আগে অবশ্য দুটি জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে। জায়গাটা বেশ।

তাঁদের দুজনকে দেখে একটি গেরুয়া বসন পরিহিত লোক তাদের দিকে এগিয়ে এলেন। ইনিই ঋষভবাবুর গুরুভাই মহেশনাথ। বয়স ওই ঋষভবাবুর মতোই। মাথায় কাঁচাপাকা চুল। বেশ বলিষ্ঠ গড়ন। গায়ের রং কিছুটা ময়লা, তবে গোলগাল মুখের গড়নটি বেশ অমায়িক প্রকৃতির। অভ্যর্থনা প্রতি-অভ্যর্থনা পর্বের শেষে মহেশনাথজি সুজতাভবাবুদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন তাঁর ধর্মশালার দিকে। আগেই একটা টেলিগ্রাম করে দিয়েছিলেন ঋষভবাবু, তাই রুম বেশ গোছানো-বাগানোই ছিল।

সেই দিনটা আর দূরে কোথাও গেলেন না তাঁরা। কাছাকাছি মন্দির আর সাইট সিয়িং করেই কাটল।

অক্টোবর মাস হলেও এখানে তেমন ঠান্ডা নেই। গায়ে একটা শাল জড়িয়ে রাত্রে খাওয়া শেষে শুতে যাবার আগে ধরমশালার লম্বা বারান্দায় জোৎস্নায় ভেজা বেতের চেয়ারে বসে মহেশনাথের কাছে কথাটা পাড়লেন সুজতাভবাবু। অর্থাৎ, তিনি এখানকার ভেষজ উদ্ভিদের জঙ্গলটা একটু ঘুরে দেখতে চান। কথিত আছে, যখন রামায়ণের যুদ্ধে লক্ষ্মণ মেঘনাদের দ্বারা আহত হন, হনুমান স্বয়ং এখান থেকে প্রাণদায়ী ঔষধ বিশল্যকরণী নিয়ে যান। তবে এ ভেষজ চিনতে না পেরে তিনি তাঁর জন্য তিনি পুরো পর্বতটাকেই নাকি মাথায় করে নিয়ে গিয়েছিলেন। এ ঘটনা মিথ হলেও সুজতাভবাবুর বিশ্বাস, এখানে নিশ্চয়ই দুষ্প্রাপ্য ভেষজ লতা-গুল্ম এখনো আছে যা এই বিংশ শতকেও রয়ে গেছে লোকচক্ষুর আড়ালে। সুজতাভবাবু আগ্রহ সেই দিকেই।

সুজতাভবাবুর কথা শুনে মহেশনাথজি বেশ উৎসাহিত হলেন এবং তাঁকে কথা দিলেন, উনি কাল সকাল উঠে এমন একজন গাইড ঠিক করে দেবেন যিনি জানেন এই বিন্ধ্য পর্বতের ঢালে কোথায় ভেষজ লতা-গুল্ম পাওয়া যায়। উনি নিজেই সঙ্গে যেতেন, কিন্তু কাল একটি বিদেশি পর্যটকদের দল আসায় তাঁকে তাঁদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে।

কথাগুলো শুনে সুজতাভবাবু খুব আশান্বিত হলেন।

তবে ঋষভবাবু সুজতাভবাবুর সঙ্গে আর গেলেন না। তিনি দিনটা ধর্মশালায় শুয়ে বসে আর চারপাশে ঘুরেফিরে কাটাবেন বলেই স্থির করলেন।

সূর্যের প্রথম সোনালি আভা যখন বিন্ধ্য পর্বতের শিখরগুলির মাথায় সোনালি পাতের রাংতা মুড়ে দিচ্ছে, ঠিক সেই সময় সুজতাভবাবু মহেশনাথজির ঠিক করা সেই গাইডের সঙ্গে চললেন অমরকন্টকের গভীর জঙ্গলের দিকে। তিনি সঙ্গে বিশেষ কিছু নিলেন না। শুধু একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ লতা-গুল্ম সংগ্রহের জন্য আর চায়ের জন্য একটি ফ্লাস্ক।

প্রথমে কিছুটা অটো-রিকশায়, তারপর চড়াই উতরাই পেরিয়ে সেই গভীর অরণ্যের বিশেষ জায়গায় নিয়ে গেল গাইড হরি সিং। যেখানটিতে তার মতে অনেক দুষ্প্রাপ্য ও অজানা ভেষজ উদ্ভিদ পাওয়া গেলেও পাওয়া যেতে পারে। সে আরো জানাল, এখানে ভেষজ গাছগাছড়া খুঁজতে ফি-বছর শুধু দেশের লোকরাই নয়, বিদেশিরাও আসে। তবে সবাই সঠিক জায়গায় সবসময় পৌঁছতে পারে না। বলা বাহুল্য, নিজের কর্মদক্ষতা দেখানোর সুযোগ সে পেয়েছে।

অটো থেকে নামার পর থেকে প্রায় পৌনে একঘণ্টার মতো পথ হাঁটার পর একটা গুহার মতো জায়গার সামনে এসে দাঁড়াল গাইড হরি সিং। গুহামুখটার সামনে একটা ঝোরা। সেটাকে কাটিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল বেশ অপরিসর জায়গা। তবে বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। গুহাটা এতটাই সরু যে সেখানে কোনোক্রমে একজন মাত্র লোক সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গুহার দেয়ালগুলো ভিজে স্যাঁতসেঁতে এবং ঠান্ডা। হরি সিং জায়গাটা খুব ভালো করে চেনে, তাই সুজতাভবাবুকে তাকে অনুসরণ করতেই হল।

কখনো হেঁটে, কখনো হামাগুড়ি দিয়ে তাঁরা একটা হলঘরের মতো প্রশস্ত জায়গায় এসে থামলেন। এখানে বেশ আলো। বাইরের রোদ এখানে একটা ছাদের মতো বিশাল ফাঁকা অংশ দিয়ে এসে পড়ছে গুহার তলদেশে। আর সেখানে চোখ দিয়ে যা দেখলেন সুজতাভবাবু, তা এককথায় অবর্ণনীয়। গুহার মেঝে জুড়ে রয়েছে হরেক প্রকারের লতা-গুল্ম। কিছু চেনা, কিছু অচেনা। সুজতাভবাবুর যে ক’টা চেনা ছিল, তিনি তুলে নিলেন। কয়েকটা হরি সিংও তাঁকে চিনিয়ে দিল।

বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কাটল। যখন সুজতাভবাবুর প্ল্যাস্টিকের ব্যাগটা বেশ ভরে উঠেছে লতা-গুল্মে তখন তাঁরা গুহা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাছাড়া এবার তাঁদের ফিরতেও হবে।

ঠিক চলে আসার মুহূর্তেই সুজতাভবাবুর চোখ নিজের অজান্তেই চলে গেল গুহাটির একটি খাঁজের দিকে। সেই খাঁজে একটি বিশেষ লতানো গাছ জন্ম নিয়েছে। তবে সে গাছ পরজীবী গোছের, তাই সে অন্য আরেকটি বিরুৎ জাতীয় গাছের গায়ে আশ্রয় করে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু সে তো সব লতানো কিংবা পরাশ্রিত গাছ বেড়ে উঠে। সেটাতে অবাক হবার মতো কিছু নেই।  নতুনত্ব সেখানে নয়। নতুনত্ব গাছটির পাতায়। গাছটির নিজের পাতার আকৃতি একটা আছে বটে, কিন্তু যেই তার সরু কাণ্ড ছুঁয়েছে আশ্রয়দাতাকে সেই তার কাণ্ড থেকে শুরু করে পাতা পর্যন্ত সব কিছুই পালটে নিয়েছে আশ্রয়দাতার অনুকরণে। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে অনুকৃতি করেছে হুবহু। কোথাও এতটুকু ভুল নেই। এমনকি পাতার ধারের খাঁজগুলি পর্যন্ত এক। দূর থেকে দেখলে লতাটিকে ওই গাছের অংশ বলেই ভুল হয়।

প্রাণীজগতে এরকম উদাহরণ অনেক আছে। বাগানের গিরগিটি থেকে শুরু করে সমুদ্রের অক্টোপাস এধরনের ছদ্মাবরণে দক্ষ। কিন্তু উদ্ভিদের মধ্যে এ ঘটনা তো আগে কখনো লক্ষ করেননি সুজতাভবাবু। তিনি বিষয়টাতে বেশ আশ্চর্যচকিত হলেন। ভালোভাবে দেখার জন্য আরো কিছুটা এগিয়ে গেলেন সেই অলৌকিক লতাটির দিকে। নাহ্‌, তাঁর ভুল নেই। সুজতাভবাবু এইরকম লতা আরো কিছু গাছের সঙ্গে আবিষ্কার করলেন যাদের প্রত্যেকটি তাদের আশ্রয়দাতার অনুকরণে হয়ে উঠেছে একদম জেরক্স কপির মতো। এইরকম গাছ সম্পর্কে তিনি আগে পড়েছেন কিংবা শুনেছেন বলে মনে করতে পারলেন না। হরি সিংকে ডেকে এ-গাছ দেখাতে সেও চিনতে পারল না। এমনকি আগে কখনো এ-লতা সে দেখেনি বলে জানাল। সুজতাভবাবু চট করে একটা খুরপি গোছের যন্ত্র দিয়ে এ লতার একটা চারা খুঁজে তার মূল সমেত পকেটে পুরলেন ধর্মশালায় গিয়ে লাগাবেন বলে। যদিও এ-গাছ কতটা এ-গুহার বাইরের পরিবেশে বেঁচে থাকবে সেটা নিয়ে তাঁর মনে একটা দ্বন্দ্ব থেকে গেল।


***


অমরকণ্টক থেকে সুজতাভবাবুরা ফিরে এসেছেন প্রায় একমাস। গাছের চারাটাকে অমরকণ্টকে থাকাকালিন একটা মাটির ছোটো টব কিনে লাগিয়ে দিয়েছিলেন, তাই সেটা মরেনি। সেটি এখন সুজতাভবাবুর শোবার ঘরের সামনের বারান্দায় শোভা পাচ্ছে। বাংলার এই গরম আবহাওয়াতেও বহাল তবিয়তে টিকে আছে সেটি। সুজতাভবাবু ভেবেছিলেন টিকবে না বোধ হয়। কিন্তু সে শুধু টিকেই গেল না, পাশের শিউলিগাছটাকে আঁকড়ে ধরে বাড়তে শুরু করেছে তার তরু পল্লবিত লকলকে লতানো কাণ্ডটি।

এর মধ্যে কথায় কথায় ঋষভবাবুকেও এ লতাটির সম্পর্কে বলেছেন সুজতাভবাবু। তাই তিনিও একান্ত কৌতূহল নিবৃত্ত করতে বার তিনেক এসে দেখে গেছেন চারাটিকে। সুজতাভবাবু এখন রোজ নিয়ম করে দিনে দু-বার গাছটার গোড়ায় জল দেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে গাছটাকে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন।

কাছের যে সমস্ত বোটানির বইপত্র আছে তা ঘেঁটেও সেই লতাটার নাম জানতে পারেননি তিনি। সুজতাভবাবু জানা পরিচিত কয়েকজন স্কুল-কলেজের বোটানির শিক্ষক-অধ্যাপকদের দেখিয়েছেন সেই গাছটাকে, কিন্তু তাঁরাও এইরকম গাছ কোনোদিন দেখেছেন বলে জানাননি। কোনো উপায় না দেখে গাছটার গোটা তিনেক ছবি তুলে হার্বেরিয়াম বানিয়ে ও বিবরণ সহ পাঠিয়েছিলেন বোটানিক্যাল গার্ডেন কর্তৃপক্ষের কাছে। উত্তর আসতে দিন চারেক সময় লাগল বটে, কিন্তু তাঁরাও জানালেন, এ প্রজাতি ভারতে আগে কখনো দেখা যায়নি।

সুজতাভবাবুর মাথায় জেদ চেপে গেল। তিনি আরো কিছু ছবি সহ বিবরণ লিখে পাঠালেন ব্রিটেনের রয়েল বোটানিক্যাল সোসাইটির কাছে। হপ্তা তিনেক পর উত্তর এল। গাছটির মতো একপ্রকার লতা চিলি এবং আর্জেন্টিনার দুর্গম জঙ্গলে পাওয়া যায়, নাম বকিউলিয়া ট্রায়ফোলিউলাটা। তবে এ-গাছ আর সেই গাছের প্রজাতি যে এক তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

নিরাশ হলেন সুজতাভবাবু। তবে তাঁর পর্যবেক্ষণ বজায় রাখলেন। ভাবলেন, দেখা যাক না শেষপর্যন্ত কী হয়। যদি আরো কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, তবে হয়তো গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে। হয়তো-বা নতুন কোনো ঔষধি গুণাবলি পাওয়া যেতে পারে গাছটি থেকে।


***


এপ্রিলের এক রবিবার। সুজতাভবাবু অমরকন্টক থেকে ফিরেছেন মাস ছয় হল। মাঝে বেশ কিছুদিন শরীর খারাপ হওয়ায় একদম শয্যাশায়ী ছিলেন। বন্ধু ঋষভবাবু এবং ডাক্তার-বদ্যিদের অনেক চেষ্টায় সে যাত্রায় কোনোক্রমে সেরে উঠলেন।

সেদিন বিকেলের দিকটা বেশ গরম পড়ায় অনেকদিন পর আবার সেই বারান্দায় এসে বসেছেন। প্রায় মাসাধিক আসা হয়নি এদিকে। অমরকণ্টকের সেই লতাটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবে বারান্দায় বসতেই সুজতাভবাবুর চোখ চলে গেল সেই লতাটার টবের দিকে। কী অবাক কাণ্ড! সেই টবে সেই লতাটার নামগন্ধ পর্যন্ত নেই। এমনকি শুকনো ডালটি পর্যন্ত কবে শুকিয়ে মিলিয়ে গেছে। মনে মনে খুব আফসোস হল তাঁর। মাসাধিক শরীর খারাপ হওয়ায় এদিকটায় আসা হয়নি, তাই ভাবলেন অযত্নে মারা গেছে লতাটি। অথচ শয্যাগত হয়েও তিনি বার বার তাঁর চাকর অন্নদাকে বলে দিয়েছিলেন বাগানের গাছগুলির প্রতি যত্ন নিতে এবং বিশেষ করে ওই চারাটির প্রতি। তাহলে কি তার কর্তব্যের অবহেলা এই গাছটির মৃত্যুর কারণ? ভাবলেন, চাকরকে ডেকে এর একটা বিহিত করা দরকার। তাই তিনি অন্নদাকে ডেকে পাঠালেন।

সুজতাভবাবু এমনিতে চাকরবাকরদের উপর হম্বিতম্বি বিশেষ করেন না। তাই অন্নদা এসে উপস্থিত হওয়াতে তিনি শান্তভাবেই জানতে চাইলেন, “আচ্ছা অন্নদা, আমার শরীর খারাপ হওয়াতে গাছগুলোতে কি জল-টল দাওনি, নাকি?”

মনিবের কাছে এমন প্রশ্ন শুনে অন্নদা কিছুটা আশ্চর্য হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলল, “না বাবু, আমি রোজ দু-বেলা গাছে জল দিয়েছি, সপ্তাহে সপ্তাহে নিড়ানি দিয়েছি। বিশ্বাস না হয় আপনি আপনার বন্ধু ঋষভবাবুকেই শুধাবেন।”

সুজতাভবাবু আর কথা বাড়ালেন না।


এই ঘটনার হপ্তা তিনেক পর তিনি বাগানে সেই শিউলিগাছটার বেশ কিছু ডাল ছেঁটে দিতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন শিউলিগাছটাতে বেশ কিছু লাল লাল ছোটো ছোটো কুলের মতো ফল দেখা দিয়েছে। এ-গাছ তাঁর বাড়িতে নতুন নয়। গাছটির আয়ু কম করে পাঁচ বৎসর। এত বছরে তিনি এ ফল এ গাছে তো কোনোদিন দেখেননি। তাছাড়া তাঁদের গ্রামের বাড়িতেও তো এ গাছ বহুবছর ধরে ছিল। কই, তার তো এধরনের ফল কখনো দেখা যায়নি! তাহলে?

সহসা অবাক না হলেও আজ এ ঘটনা দেখে সুজতাভবাবু বেশ কিছুটা অবাক হলেন বৈকি। পরীক্ষার জন্য তিনি বেশ কিছু ফল ছিঁড়ে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখতে লাগলেন। তারপর সেই ফলগুলিকে এনে তাঁর পড়ার ঘরের টেবিলের উপর রেখে দিলেন। ফলের বিচি থেকে কী গাছ বেরোয় তা দেখার জন্য একটা পাকা ফল থেকে একটা বিচি বের করে একটা টবের মাটিতে পুঁতে দিলেন।

কিন্তু দিন সাতেক অপেক্ষার পরও তার থেকে কোনো চারা বের হল না। নিরাশ হলেন সুজতাভবাবু। তারপর ভাবলেন, শিউলিগাছের একটা ভেষজ গুণ আছে তা তো তিনি জানেন। তাহলে এই ফল যদি ওই গাছের হয় তাহলে নিশ্চয়ই তা বিষাক্ত নয়। তাই খেয়ে দেখলে কেমন হয়? কিন্তু তা সমীচীন হবে কি না তা ভেবে পেলেন না। তারপর অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলেন আজ ফলটা তিনি খেয়ে দেখবেন।

অতএব পূর্বপরিকল্পনামতো রাত্রিবেলা নিজের নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়াদাওয়া শেষে একটা ফল হাতে নিয়ে খেয়ে ফেললেন তিনি। খেতে খুব একটা মন্দ নয়। ছোটোবেলায় খাওয়া সেই টোপা কুলের মতোই। কিন্তু অসাবধানতাবশত খেতে গিয়ে ফলের সঙ্গে সেই ফলের ছোট্ট বিচিটাও গিলে ফেললেন সুজতাভবাবু। যাহ্‌, এইবার কী হবে?

তবে এইটুকু ঘটনায় বিচলিত হবার মানুষ সুজতাভবাবু নন। ছোটোবেলায় এইরকম কত ফলের বিচি খেয়ে ফেলেছেন, সেগুলি সব বিনা বাধায় তার শরীর পরিত্যাগও করেছে। অতএব এটা নিয়েও চিন্তার কিছু নেই। তবে তাঁর সন্দেহ গেল, যদি ফলটা খেয়ে পরে কিছু হয়! তাই ফলটি খেয়ে তিনি বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় বসে দেখলেন তার কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় কি না।

কিন্তু প্রায় ঘণ্টা খানেক পরও যখন তার কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সুজতাভবাবুর শরীরে দেখা গেল না তখন তিনি নিজের পালস চেক করে দেখলেন। সেটাও নরমাল। রুমের বড়ো আয়নাটার সামনে গিয়ে একবার দেখলেন নিজেকে গায়ে এবং মুখে কোনো র‍্যাশ জাতীয় কিছু বেরিয়েছে কি না। নাহ্‌, সেটাও যখন কিছু হল না তখন তিনি নিশ্চিন্তে নিদ্রা গেলেন এবং মনে মনে ভাবলেন, ওইটুকু ফলের ওইটুকু বিচি গলায় যখন আটকায়নি তখন নিশ্চয়ই কাল প্রাতঃকৃত্যর সময় তা শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন সুজতাভবাবু।

আনুমানিক তখন রাত্রি দুটো হবে। একটা ভীষণ স্বপ্ন দেখে ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসলেন সুজতাভবাবু। কপাল এবং মুখে তাঁর অজস্র স্বেদবিন্দু। যদিও ঘরের ফ্যানটা বেশ জোরে ঘুরছে এবং পরিবেশটাও খুব একটা গরম নয়।

বেশ ভয়ংকর স্বপ্ন। তিনি দেখলেন, তাঁর সমগ্র শরীর জুড়ে গজিয়ে উঠেছে লতাপাতা। আর শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ধীরে ধীরে লতা-গুল্মে পরিণত হয়েছে। কোন এক অদৃশ্য শক্তি তাঁর শরীরের উপর ভর করেছে। নিঃশব্দে সে অধিকার করে নিচ্ছে সুজতাভবাবুর শরীর এক পরজীবীর মতো।

কী ভয়ানক! মাথা-কপালের ঘাম মুছে, ঘাড়ে কপালে জল দিয়ে কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে খেলেন সুজতাভবাবু। তারপর নিজের মনের এই ভয়ানক স্বপ্ন দেখার একটা যুক্তিযুক্ত, জুতসই কারণ নির্ধারণ করলেন। ভাবলেন, বিচিটা খেয়ে ফেলেছেন বলেই মনের অন্তরালের অনাবশ্যক দুঃশ্চিন্তা থেকেই এইধরনের স্বপ্ন তিনি দেখেছেন। লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন ফের। দুঃস্বপ্নটা আর না দেখলেও বাকি রাতটা আর সেইরকম ঘুম হল না।

পরদিন সকালে অন্নদার ডাকে ঘুম ভাঙল সুজতাভবাবুর। সুজতাভবাবু রোজ ভোরে উঠলেও আজ মনিবের দেরি দেখে অন্নদা তাঁকে ডেকে তুলেছে।

সুজতাভবাবু বিছানা ছেড়ে উঠে মুখ হাত ধুয়ে প্রাত্যহিক নিজের কর্ম সেরে খাওয়ার টেবিলে এসে বসতেই অন্নদা চা দিল। চা খাবার পর প্রতিদিন সুজতাভবাবু প্রাতঃকৃত্যে অভ্যস্ত, তবে আজ ঠিক সেরকম শান্তি হল না। গ্যাস-অম্বলের রোগ তাঁর কস্মিনকালেও ছিল না এবং কোষ্ঠকাঠিন্যর অভ্যাসটাও নেই। তাহলে আজ হঠাৎ কী হল? পাড়ার মোড়ে দোকানে গিয়ে একটা হজমের বড়ি কিনে খেয়ে ফেললেন, কিন্তু খুব একটা সুবিধে হল না।

দুপুরবেলা ঋষভবাবুর বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল খাওয়ার। পেটের অবস্থা খুব একটা সুবিধে না বুঝে সেখানেও গেলেন না। বাড়িতেও খেলেন যৎসামান্য। একবার সুজতাভবাবুর মাথায় এল, সেই বিচিটার জন্য এইসব হয়নি তো? কিন্তু বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে তিনি জানেন, ওইটুকু ফলের ওইটুকু বিচি মানুষের খাদ্যতন্ত্রে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। সেটাও নিশ্চয় তাঁর পেটে নেই। হয় সেটা পাকস্থলীর গাঢ় রসে হজম করে ফেলেছেন, নয়তো দু-একদিনে তা শরীরের খাদ্যপ্রণালীর স্বাভাবিক নিয়মে নিষ্কাশিত হবে। কিন্তু মনটা কেমন যেন খুঁতখুঁত করতে লাগল।

অন্নদা গ্রামের লোক এবং গাছগাছড়া সম্পর্কে বেশ ভালোই জ্ঞান আছে। তাকে একবার শুধালে কেমন হয়? কিন্তু পাছে মনিবের এমন অবান্তর কথা শুনে যদি অন্নদা হাসে, তাই ভেবে তিনি ক্ষান্ত হলেন। কিন্তু বিকেলের দিকেও পেটের অস্বস্তি ভাবটা কাটল না দেখে পাড়ার মোড়ে গোবিন্দ ডাক্তারকে একবার দেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।

মাঝবয়সী গোবিন্দ ডাক্তারের বয়স সুজতাভবাবুর থেকে কম। তিনি সুজতাভবাবুর সব কথা শুনে একটু স্মিত হেসে বললেন, “ওইটুক নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কয়েকটা হজমের ওষুধ আপনাকে লিখে দিচ্ছি, খেয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

গোবিন্দ ডাক্তারের কথামতো ওষুধগুলো সেইদিনই সুজতাভবাবু খেয়ে নিলেন। ওষুধের কারণেই হোক আর অন্য কোনো কারণেই হোক, পরদিন তিনি বেশ স্বস্তি লাভ করলেন।

তবে সেই স্বপ্নটা তাঁর পিছু ছাড়ল না। দিন দুয়েক বাদে রাত্রে ঘুমের মাঝে আবার সেই স্বপ্ন। এবার তিনি দেখলেন, তাঁর গায়ের চামড়ার রং একটু একটু করে সবুজাভ হয়ে যাচ্ছে আর হাতের আঙুলগুলো সরু হতে হতে লতিয়ে চলেছে। তার থেকে শাখাপ্রশাখা বের হচ্ছে। সে শাখাপ্রশাখার গা থেকে বেরিয়ে আসছে নতুন, সবুজ কচি গাছের ছোটো ছোটো পাতা। সেই পাতার আকার চেনা লাগছে সুজতাভবাবুর। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলেন না।

ঘুমটা ভেঙে গেল তাঁর। চোখ মেলে লাইট জ্বালিয়ে উঠে বসতেই চোখ চলে গেল টেবিলের উপর রাখা সেই ফলের বিচি পোঁতা টবটার দিকে। সেটাতে অঙ্কুর বেরিয়েছে। তাতে প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। দুটি নতুন পাতা মাথা তুলে জানান দিচ্ছে তাদের গোত্র পরিচয়। এবার চিনতে পেরেছেন তিনি। সেই ফল এবং তার থেকে অঙ্কুরিত চারাগাছটি তাঁর আনা অমরকন্টকের সেই পরজীবী লতার। নাহ্‌, সেটা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। এও কি সম্ভব! কথাটা ভেবে শিউরে উঠলেন সুজতাভবাবু। কী ভয়ানক অথচ ধীর মৃত্যু ঘটেছে শিউলিগাছটার! তাহলে কি এখনকার শিউলিগাছটাই আসলে সেই পরজীবী গাছ? পরজীবী লতা আত্মসাৎ করেছে তার সম্পূর্ণ শরীর, অবয়ব, অস্তিত্বটুকু?

একরাশ চিন্তার মাঝে ঘরের মৃদু হলদেটে আলোয় সুজতাভবাবু অনুভব করলেন, তাঁর গায়ের রংটা ক্রমে যেন পালটে যাচ্ছে সবুজাভের দিকে এবং আঙুলের ডগাগুলো সরু হয়ে লতিয়ে চলেছে। তাতে দেখা দিয়েছে পাতার মতো নতুন উপাঙ্গ। তবে কি সত্যি পরজীবী অধিকার করে নিচ্ছে তার শরীরের অবয়ব? নাকি তিনি রূপান্তরিত হচ্ছেন সেই অলৌকিক লতায়?


___

অঙ্কনশিল্পীঃ স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়


No comments:

Post a Comment