গল্প: ফুচকা বিভ্রাট: উৎস ভট্টাচার্য

 

ফুচকা বিভ্রাট


উৎস ভট্টাচার্য



‘রথের মেলা, রথের মেলা বসেছে রথতলায়!’

হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছ। সনৎ সিংহের সেই কালজয়ী গান, যা আমাদের মুহূর্তে টাইম ট্র্যাভেল করিয়ে নিয়ে চলে যায় আমাদের ছোটোবেলার স্বর্ণালি দিনগুলোতে৷ তবে আমাদের এলাকায় এ-গানের অন্য একটা তাৎপর্যও আছে। আমার জীবনের একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতাও জুড়ে আছে গানটার সঙ্গে। সেকথা বলতেই আজকে হাজির হয়েছি।

বাস্তবেই উত্তর ২৪ পরগণার কাঁকিনাড়ায় অবস্থিত আমাদের এলাকাটির নাম রথতলা। আর নামকরণের সার্থকতায় রথের মেলাও বসে বৈকি! ছোট্টোবেলার নস্টালজিয়া জুড়ে রয়েছে এই মেলার সঙ্গে। রঙবেরঙের মাটির খেলনা, প্লাস্টিকের খেলনা, আরো কত কী! একটা খেলনা খুব ভালো লাগত—ওই যে হুঁকো হাতে একটা বুড়ো বসে আছে আর মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছে! এছাড়াও আমায় বিশেষত আকর্ষণ করত একটা দোকান। দোকানটাতে ছেলে-ভোলানো সব জাদুর সামগ্রী পাওয়া যেত। খুবই সাধারণ খেলনা সব, কিন্তু সেই বয়সে বেশ মজা পেতাম। ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া—কল থেকে জল পড়েই চলেছে, শেষ আর হয় না! ডিম এই আছে, এই নেই। বাহ! রঙ পরিবর্তন হচ্ছে ডিমের। অথবা নানারকম তাস আর দড়ির খেলা। কয়েনের খেলা। হরেকরকম মজাদার খেলা! এইসব অকিঞ্চিৎকর কিন্তু অমূল্য সব মজার সঙ্গেই ছিল বাদাম ভাজা, পাঁপড় ভাজা, জিলিপি আর... হ্যাঁ! এই তো ঠিক ধরেছ—ফুচকা! তা শুধু রথের মেলাতেই নয়, এই ফুচকাকে কেন্দ্র করে স্মৃতিমেদুর মধুরালাপনের অভিজ্ঞতা কম বেশি সকলের জীবনেই আছে। কিন্তু আজ যেটা বলতে চলেছি, তার স্বাদ অন্যরকম। ঠিক কেমন সেই স্বাদ? সেই বিচারের গুরুদায়িত্ব তোমাদের উপর—আমার কাজ নিছক পরিবেশনের।

এমনই একবার রথের মেলায় গিয়েছি আমি আর আমার এক বন্ধু, সায়ন্তন। মেলা ঘুরে জগন্নাথদেব দর্শন করে, বাদাম ভাজা, জিলিপি সব খেয়ে-টেয়ে ফেরার পথ ধরেছি। যেখানে মেলা হয়, সেখান থেকে আমাদের দুজনের বাড়িই হাঁটা পথে মিনিট পনেরোর রাস্তা। কিছু দূর আসতে সায়ন্তনের মাথায় হঠাৎ খেয়াল চাপল, যাহ! ফুচকা খাওয়া হয়নি তো! খেতেই হবে। এদিকে সেদিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। বিকেলের দিকে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বৃষ্টি একটু ধরে আসতে আমরা মেলায় এসেছিলাম। ইতিমধ্যে আবারও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করেছে। জোলো বাতাস এসে ভেজা ভেজা স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝেই। বেশ বোঝা যাচ্ছে, যে-কোনো মুহূর্তে ঝমঝমিয়ে নামতে চলেছে। পাগলটাকে বোঝাবার চেষ্টা চালাচ্ছি, “অন্যদিন হবে ভাই, আজ আর কাজ নাই, ফিরে চল!”

কিন্তু কে শোনে কার কথা!

যাই হোক, কী করব ভাবতে ভাবতেই যা আশঙ্কা করছিলাম তাই হল। ঝমঝমিয়ে নেমে এল বৃষ্টি। সঙ্গে ছাতা আছে ঠিকই, কিন্তু সেই বৃষ্টি ছাতায় মানে না। ওই জায়গাটা তখন একটু ফাঁকা ফাঁকাই ছিল—এখন যদিও অনেক বাড়িঘর হয়ে গেছে। অগত্যা তখনকার মতো মাথা বাঁচাবার একটা আশ্রয় দরকার হয়ে পড়ল আমাদের। আর কী সৌভাগ্য! অদূরেই হঠাৎ চোখে পড়ল একটা ছাউনি দেওয়া স্টল। মেলা থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে এসেছি, এখানে স্টল থাকার কথা তো নয়! আগেও কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ল না। সে যাই হোক। একটা আশ্রয় তো জুটবে! দৌড়ে গেলাম আমরা। আরে! এ যে দেখি মেঘ না চাইতেই জল! আরে না গো, না! এ জল, সে জল নয়। বৃষ্টির জল তো পড়ছিলই! এ হল গিয়ে ইচ্ছের মেঘ আর জিভের জল। বুঝলে না তো? আচ্ছা দাঁড়াও, বুঝিয়ে বলি৷ আশ্রয় তো জুটলই, সঙ্গে সায়ন্তনের ইচ্ছেপূরণের (আমারও যে একদমই ইচ্ছে ছিল না, একথা বললে নির্জলা মিথ্যে হবে।) উপায়ও হয়ে গেল। স্টলটা আর কিছুর নয়, ফুচকার। তবে বিশ্বাস কর, অমনধারা রাজকীয় ছাউনি দেওয়া ফুচকার স্টল আমি সেদিনের আগেও কখনো দেখিনি, পরেও নয়। খটকা যে লাগেনি তা নয়, কিন্তু বিপদে আশ্রয় পেলুম, পছন্দসই খাবার খেতে পারব—খারাপ কথা আর ভাবে কে?

যাই হোক, অনেকক্ষণ সেই স্টলের মালিক আমাদের দিকে দৃকপাতই করল না। ফ্যাসফ্যাসে গলায় ঈষৎ নাকি সুরে আপন মনে গাইতে লাগল—

‘রঁথের মেঁলা, রঁথের মেঁলা বঁসেছে রঁথতলায়!

ভঁরসঁন্ধেয় ফুঁচকা দেঁব গাঁমছা দিঁয়ে গঁলায়!

ফুঁচকা খাঁবে, ফুঁচকা খাঁবে হাঁজার হুঁড়োহুঁড়ি!

ঐঁ মেঁঘ গুঁরগুঁর আঁকাশ পাঁরে আঁধার লুঁকোচুঁরি!

রঁথের মেঁলা বঁসেছে রঁথের মেঁলা বঁসেছে...’

গানটা অনেকবার শুনেছি। লোকটির গলাটাও যেমন অদ্ভুত, গানের কথাগুলোও তেমনটাই বেয়াড়া ঠেকল কানে। শেষে একটু জোর গলাতেই আমরা বলে উঠলাম, “ও কাকু! ফুচকা দাও। আমরা ফুচকা খাব তো!”

তালঢ্যাঙা মিশেমিশে কালো লোকটা এতক্ষণে যেন আমাদের দেখতে পেল। ঝিলিক মারা সাদা দাঁত বের করে কান এঁটো করা একটা হাসি হেসে বলল, “নিঁশ্চয়ই খাঁবে, কেঁন খাঁবে নাঁ, নাঁ খাঁওয়ার কী আঁছে!”

তারপর আমাদের হাতে দুটো শালপাতার ঠোঙা ধরিয়ে দিয়ে লোকটা গুনগুন করে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে হাতের কেরামতি দেখাতে শুরু করল। প্রথম ফুচকাটা ঠোঙায় পড়ে মুখ অবধি যেতেই অপূর্ব স্বাদের আস্বাদনে আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। আহা! ফুচকা অনেক খেয়েছি, কিন্তু তেমনটা আর খাওয়া হয়নি। টপাটপ উদরস্থ করতে লাগলাম একের পর এক ফুচকা।

একমনে খেয়ে চলেছি, কোনোদিকে ধ্যান নেই। কখন যে সেই অদ্ভুত লোকটার মুণ্ডুহীন দেহটা ক্রমাগত ফুচকা সরবরাহ করে চলেছে, তা নজরে পড়েনি। নজরে পড়ল তখন, যখন ফুচকা সাপ্লাই বন্ধ রেখে সেই লোকটা মাটিতে পড়ে যাওয়া মুণ্ডুটা তুলে আবার ঠেসেঠুসে নিজের ঘাড়ে সেট করার চেষ্টা করছে!

আমাদের খাওয়া তখন মাথায় উঠেছে। ভয়ে কাঠ হয়ে গেছি দুজনেই। পাদুটো যেন গাছের শিকড়!

মাথাটা যথাস্থানে ফিট করে লোকটা ফিক করে হেসে বললে, “ভঁয় নেঁই খোঁকারা। খাঁও, খাঁও, প্রাঁণ ভঁরে খাঁও।”

আর খাওয়া! হঠাৎ দেখি, এতক্ষণ তো চোখে পড়েনি—আরো একটা রথের মেলা বসে গেছে এখানে! অনেকগুলো স্টল, প্রচুর লোকজন! তাদের সকলেরই কতগুলো মিল খুঁজে পেলাম। আলো-আঁধারির মাঝে গাঢ়তর অন্ধকারে তাদের দেহ গঠিত হয়েছে। চোখগুলো লালচে আভায় জ্বলজ্বল করছে আর আকর্ণলম্বিত হাসিতে তাদের চকচকে দাঁতগুলো বিদ্যুতের আলোয় ঝকমক করছে!

তারপর? পৈতৃক প্রাণটা যখন রয়েছে, এ কি আর প্রশ্ন করে জানতে হয় নাকি? নিজেদের হাতে পায়ে একটু জোর ফিরে পেতেই দ্রুতগামী এগারো নম্বর বাসের সওয়ারি হলাম আমরা। পিছন থেকে সমবেত খোনা গলায় ভেসে আসতে লাগল, ‘দঁর্শনে নঁয়, স্বাঁদেই পঁরিচয়।’

চেনা চেনা লাগল কথাটা। দৌড়াতে দৌড়াতে শুনলাম, পেছনে কে যেন দৌড়ে আসছে আর বলছে, “ফুঁচকা খাঁবে নাঁ? খাঁবে না ফুঁচকা?”


___

অঙ্কনশিল্পীঃ স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়


No comments:

Post a Comment