গল্প: গিলি গিলি ফুঁ: রক্তিম লস্কর


অনেক কাল আগে এক রাজ্য ছিল, স্বরূপনগর। সেই রাজ্যের হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ছিল ঘোড়া। আর তার কোষাগারেও ছিল প্রচুর সম্পদ। সবদিক থেকে এক সমৃদ্ধশালী রাজ্য ছিল স্বরূপনগর।

সেই স্বরূপনগরের রাজা ছিলেন অরূপরতন। রাজ্যের নানাদিকে ছিল তাঁর তীক্ষ্ণ নজর। তাই তাঁর রাজত্বে প্রজাদের কোনো কষ্ট ছিল না। রাজ্যের সকলেই খুব শান্তিতে থাকত।

স্বরূপনগরের রানি মধুমতীও ছিলেন স্নেহময়ী ও বুদ্ধিমতী। রাজ্যের প্রজাদের সুখ ও শান্তির দিকে তাঁরও ছিল তীক্ষ্ণ নজর। এই বিষয়ে তিনি রাজা অরূপরতনকে দিতেন নানা পরামর্শ। তাতে উপকৃত হত রাজ্যের প্রজারা। তাই সকলের খুব প্রিয় ছিলেন রাজা ও রানি।

রাজা অরূপরতন ও রানি মধুমতীর ছিল এক মেয়ে। রাজকন্যার নাম ইন্দ্রাণী। সে দেখতে যেমন ছিল অপরূপা, সেরকম তার ব্যবহারও ছিল চমৎকার। আর রাজা-রানির তো বটেই, রাজ্যের সকল প্রজার নয়নের মণি ছিল রাজকন্যা ইন্দ্রাণী।

এই স্বরূপনগর রাজ্যে হঠাৎ নেমে আসে অশান্তির কালো ছায়া। ভিনদেশ থেকে এক জাদুকর চিত্রবাহু এসে হাজির হয় স্বরূপনগর রাজসভায়। জাদুকর চিত্রবাহু রাজা অরূপরতনকে জানায় যে সে রাজকন্যা ইন্দ্রাণীকে বিবাহ করতে চায়। এর আগে কেউ জাদুকর চিত্রবাহুর নাম পর্যন্ত শোনেনি। রাজকন্যাকে এক অজ্ঞাতকুলশীল কারো হাতে ছাড়তে রাজা রাজি হন না। রাজার জবাব শুনে জাদুকর চিত্রবাহু রেগে যায়। রাজসভা ছেড়ে যাওয়ার আগে জানিয়ে যায় যে রাজা অরূপরতনের সে চরম ক্ষতিসাধন করবে। রাজা জাদুকরের কথাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না।

এরপর কিছুদিন কেটে যায়। জাদুকরের কথা লোকে আস্তে আস্তে ভুলেও যায়। একদিন সকালে রাজকন্যা ইন্দ্রাণীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। রাজা ও রানি পাগলের মতো রাজকন্যাকে রাজপ্রাসাদের আশেপাশে খুঁজে বেড়ান। কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যায় না।

এরপর জাদুকর চিত্রবাহুর একটি বার্তা আসে রাজার কাছে। সেই বার্তা থেকে জানা যায় যে রাজকন্যা ইন্দ্রাণীকে জাদুর সাহায্যে অপহরণ করেছে জাদুকর। তাকে স্বরূপনগরের রাজা করা হলেই একমাত্র রাজকন্যাকে ফিরে পাওয়া যেতে পারে।

জাদুকর চিত্রবাহুর কথা শুনে রাজা অরূপরতন খুব রেগে যান। তিনি জাদুকরকে ধরার জন্য তাঁর সেনাদলের বড়ো বড়ো বীরদের পাঠান। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ আর ফিরে আসে না।

এই ঘটনার পরে রাজা পড়ে যান ঘোর চিন্তায়। গুপ্তচর সূত্রে তিনি জানতে পারেন যে জাদুকর চিত্রবাহু থাকে স্বরূপনগর রাজ্যের সীমানার একেবারে শেষপ্রান্তে, এক গভীর জঙ্গলের ভিতরে। সেখানে যে একবার ঢোকে সে আর বেরিয়ে আসে না।

এরপর রাজার লোকজন ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে সারারাজ্যে জানিয়ে দেয় যে জাদুকর চিত্রবাহুর কবল থেকে যে রাজকন্যা ইন্দ্রাণীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারবে, তাকে অর্ধেক রাজত্ব দেওয়া হবে।

রাজার ঘোষণা শুনে অনেকেই এগিয়ে আসে। কিন্তু জাদুকরের সন্ধানে গিয়ে তারা আর ফিরে আসে না। এরকম চলতে থাকায় রাজা ও রানি আস্তে আস্তে হতাশায় ডুবে যান। স্বরূপনগর রাজ্যে দেখা দেয় নানা সমস্যা।

একদিন রাজা অরূপরতন রাজসভায় বসে আছেন। এরকম এক সময় সুতসোম বলে এক যুবক এসে হাজির হয়। সে জাদুকর চিত্রবাহুর সন্ধানে যেতে চায়। কিন্তু রাজা এক অজ্ঞাতকুলশীল যুবকের সাহস দেখে অবাক হয়ে যান। রাজা তাকে ঘটনার গুরুত্ব ও এর আগে বাকি বীরদের সঙ্গে যা হয়েছিল সবকিছু জানান। সুতসোম জানায়, সে গরিব চাষার ছেলে। তাই তার হারানোর কিছু নেই। অগত্যা রাজা সুতসোমকে জাদুকরের সন্ধানে যাওয়ার অনুমতি দেন।

এরপর সুতসোম যাত্রা শুরু করে। সে রাজার কাছ থেকে একটি ঘোড়া, কিছু শুকনো খাবারদাবার ও একটি তরোয়াল নিয়ে আসে।

সারাদিন ঘোড়ায় চড়ে দিনের শেষে সে এসে পৌঁছায় স্বরূপনগর রাজ্যের একেবারে শেষপ্রান্তে। সেখান থেকে শুরু হয় এক গভীর জঙ্গল। জঙ্গলে ঢোকার আগে সে ঘোড়াটাকে ছেড়ে দেয়। তারপর সুতসোম ঢুকে পড়ে গভীর জঙ্গলে।

এদিকে জঙ্গলে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। সুতসোম চাষার ছেলে হলেও তার মনে ভয়ডর কম। সে একটি বড়ো গাছ দেখে সেই গাছের তলায় বসে পড়ে। তারপর রাত বাড়লে খেয়েদেয়ে সে বিশ্রাম নিতে থাকে।

এদিকে সেই বড়ো গাছটির কোটরে বাসা ছিল ব্যাঙ্গমা ও ব্যাঙ্গমীর। রাতের বেলা তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকে। ব্যাঙ্গমা বলে, “শুনলাম, সেই জাদুকরকে ধরতে নাকি একটি চাষার ছেলে যাচ্ছে।”

শুনে ব্যাঙ্গমী বলে, “তাহলে জাদুকরের খাঁচায় আরেকটি পাখি বাড়বে।”

ব্যাঙ্গমা উত্তর দেয়, “ঠিক তাই। আর সেই জাদুকরের সকল শক্তি কোথায় আছে জানো?”

ব্যাঙ্গমী বলে, “কেউ যদি তার জাদুকাঠিটি নিয়ে নিতে পারে তাহলেই সব খেল খতম।”

“জাদুকাঠি হাতে নিলেই খালি হবে না, তারপর মন্ত্রও বলতে হবে।”

গাছের নীচে বিশ্রাম নিতে নিতে সবকিছু শুনতে থাকে সুতসোম।

পরদিন ভোরবেলা উঠে আবার যাত্রা শুরু করে সে। আকাশে সূর্য যখন প্রায় মধ্যগগনে তখন সে এসে পৌঁছায় জঙ্গলের আরেক প্রান্তে। সেখানে দেখা যায় একটি সুন্দর কাঠের বাড়ি। তার মনে হয়, এটাই জাদুকরের বাড়ি।

এরপর সুতসোম ধীরে ধীরে প্রবেশ করে বাড়ির ভিতরে। দেখা যায়, বাড়ির ভিতরে কেউ নেই। তার মনে হয়, জাদুকর কোনো কাজে হয়তো বাইরে গেছে।

বাড়ির ভিতরের একটা ঘরে রয়েছে বড়ো একটা খাঁচা। তার ভিতরে অনেকগুলো পাখি কিচিরমিচির করছে। এরপর বাড়ির একেবারে শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছায় সুতসোম। সে দেখে, একটা ঘরে শুয়ে ঘুমাচ্ছে একটি মেয়ে। মেয়েটি দেখতে অপরূপা। সে বুঝতে পারে, এই মেয়েটি হচ্ছে রাজকন্যা ইন্দ্রাণী। সে তার ঘুম ভাঙানোর অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু তার ঘুম ভাঙে না।

ইতিমধ্যে বাড়ির সদর দরজার সামনে পায়ের শব্দ হয়। সুতসোম চটজলদি ঘরের কোণে লুকিয়ে পড়ে। পরমুহূর্তে জাদুকর চিত্রবাহু এসে ঘরে ঢোকে। তার হাতে একটি জাদুকাঠি। সে মেয়েটির দিকে জাদুকাঠি দেখিয়ে বলে, “গিলি গিলি ফুঁ।”

পরমুহূর্তে রাজকন্যার ঘুম ভেঙে যায়। কিছুক্ষণ পর রাজকন্যাকে আবার ঘুম পাড়িয়ে জাদুকর চিত্রবাহু চলে যায়। সুতসোম চুপ করে লুকিয়ে থাকে ঘরের ভিতরে।

এদিকে দিনের শেষে রাত নেমে আসে। রাত গভীর হলে সুতসোম ঘর থেকে বের হয়ে পড়ে। সে ধীরে ধীরে জাদুকরের শোওয়ার ঘরে চলে আসে। দেখে জাদুকর গভীর নিদ্রায় মগ্ন।

এরপর সুতসোম তার বালিশের পাশ থেকে জাদুকাঠিটা হাতে নেয়। সেই শব্দে জাদুকর চিত্রবাহুর ঘুম ভেঙে যায়। সে ঘরের মধ্যে সুতসোমকে দেখে ভয়ানক রেগে যায়। সুতসোমের হাত থেকে জাদুকাঠিটা ছিনিয়ে নিতে যায়। অমনি সুতসোম জাদুকরের দিকে জাদুকাঠিটা দেখিয়ে বলে, “গিলি গিলি ফুঁ।”

পরমুহূর্তেই জাদুকর চিত্রবাহু হয়ে যায় একটা প্যাঁচা। সেই প্যাঁচাটি উড়তে উড়তে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

এরপর সুতসোম জাদুকাঠি দিয়ে প্রথমে রাজকন্যা ইন্দ্রাণীর ঘুম ভাঙায়। তারপর স্বরূপনগরের অন্যান্য বীরদের খাঁচা থেকে উদ্ধার করে। সকলে মিলে ফিরে আসে রাজ্যে। 

রাজকন্যা ইন্দ্রাণীকে ফিরে পেয়ে রাজা-রানি সহ সকল প্রজা আনন্দে ভেসে যায়। তারপর এক শুভদিন দেখে সুতসোমের সঙ্গে ইন্দ্রাণীর বিয়ে হয়ে যায়। আর রাজা অরূপরতন সুতসোমকে তাঁর সিংহাসন ছেড়ে দেন। সেই সঙ্গে স্বরূপনগরে শুরু হয়ে যায় পক্ষকাল জুড়ে উৎসব।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক


No comments:

Post a Comment