গল্প: স্বর্গের সিঁড়ি: সায়নদীপা পলমল


কানের কাছে কীসের যেন একটা সুড়সুড়ি লাগতে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই কানটা একবার চুলকে নিলেন মলয় সেন। কিন্তু পরক্ষণেই আবার সুড়সুড়িটা লাগাতে এবার অগত্যা চোখ খুললেন, আর চোখ খুলেই তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়—এ কোথায় শুয়ে আছেন তিনি! এটা কোন জায়গা! ধড়ফড় করে উঠে বসলেন মলয়বাবু। তাঁর চাপে ঘাসগুলো শুয়ে পড়লেও দলে গেল না। আশেপাশে তাকালেন তিনি। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ ঘাস আর ঘাস, আর কিচ্ছুটি নেই। আশ্চর্য! যতদূর মনে পড়ছে তিনি তো নিজের বাড়ির বিছানায় শুয়ে ছিলেন, এখানে এসে পড়লেন কীভাবে! হতভম্ব অবস্থাতেই উঠে দাঁড়াতে যেতেই মোক্ষম চমকটা পেলেন তিনি। বুঝলেন তাঁর শরীরে এক কণা কাপড় অবধি অবশিষ্ট নেই। আঁতকে উঠলেন মলয়বাবু। প্রতিবর্ত ক্রিয়ার বশে দুই হাত দিয়ে লজ্জা নিবারণে উদ্যত হলেন, কিন্তু এভাবে কতক্ষণ! এই অবস্থায় কোথায় যাবেন পোশাকের সন্ধানে? যতদূর দেখা যাচ্ছে শুধু ঘাস আর ঘাস, একটাও বড়ো কেন ছোটো গাছ অবধি নেই যার পেছনে আশ্রয় নিতে পারেন তিনি। এসব কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? আচ্ছা, এটা কোনো স্বপ্ন নয়তো! নিজের শরীরে চিমটি কাটলেন তিনি। ব্যথা লাগল না। উফ্‌, তার মানে স্বপ্ন। বাঁচা গেল। কিন্তু এমন বিতিকিচ্ছিরি স্বপ্ন তিনি দেখছেনই বা কেন, আর যদিও-বা দেখছেন তা এটা ভাঙবে কখন! চোখদুটো বন্ধ করে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে অনেক চেষ্টা করলেন মলয়বাবু যাতে স্বপ্নটা ভাঙে, কিন্তু কোনো লাভ হল না। আর স্বপ্নটা এতটাই জীবন্ত যে মনে হচ্ছে যেন সত্যিই এসব ঘটছে। আবার হতবুদ্ধি হয়ে আশেপাশে তাকালেন মলয়বাবু। আর তখনই কানে ভেসে এল সরসর একটা শব্দ। শব্দের উৎস আন্দাজ করে পাশ ফিরতেই দেখলেন তিনজন লোক ছুটে যাচ্ছে উদ্ভ্রান্তের মতো এবং বলাই বাহুল্য, মলয়বাবুর মতো ওদের শরীরেও এক কণা কাপড় নেই। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে ওদেরকে যতদূর দেখা যায় চোখ দিয়ে অনুসরণ করলেন মলয়বাবু। তারপর তাঁর সম্বিৎ ফিরল আরেকজনের আগমনে। সেও নগ্ন, সেও ছুটছে একইভাবে। তবে মলয়বাবু এতক্ষণে খানিক সামলেছেন নিজেকে। ওদের দেখে লজ্জা ভাবটা খানিক হলেও কেটে গেছে। তাই এবার তিনি লোকটাকে লক্ষ্য করে ছুটে গেলেন। “দাঁড়ান, দাঁড়ান।”

আশ্চর্যজনকভাবে লোকটা মলয়বাবুকে দেখল কিন্তু ছোটা থামাল না। পরিবর্তে ছুটতে ছুটতেই বলল, “দাঁড়ানো চলবে না, দাঁড়ালেই শাস্তি।”

“কীসের শাস্তি?” অবাক গলায় জানতে চাইলেন মলয়বাবু।

লোকটা জবাব দিল, “অত আমি বোঝাতে পারব না। আগে পৌঁছাতে চান তো ছুটুন।”

এই বলে ছোটার গতি আরো বাড়িয়ে দিল লোকটা। অগত্যা নিরুপায় হয়ে তাকে অনুসরণ করবেন বলে মনস্থির করলেন মলয়বাবু।

লোকটার সঙ্গে ছুটতে ছুটতে যেখানে এসে পৌঁছলেন মলয়বাবু সেখানে ভিড় তো ভিড়, গিজগিজ করছে লোক। হরেকরকম চেহারা তাদের—কেউ দেশি, কেউ বিদেশি, কেউ রোগা তো কেউ মোটা, কেউ কালো তো আবার কেউ ফর্সা। কিন্তু এত লোকের মধ্যে যেটা একমাত্র মিল সেটা হল ওদের কারুর শরীরে কাপড় বলে কিছু নেই, সবাই নগ্ন। মলয়বাবুর মনে হল, উনি বুঝি কোনোভাবে প্রাগৈতিহাসিক যুগে এসে পড়েছেন। তবে সে যাই হোক, একটা অবাক করা জিনিস খেয়াল করলেন মলয়বাবু, দেখলেন, এত লোকের ভিড়, কিন্তু কেউ কোনো চেঁচামেচি করছে না, সবাই কেমন দু-তিনটে লাইন করে এগিয়ে যাচ্ছে কোথাও। লাইনগুলো এতই লম্বা যে শুরুটা চোখেই পড়ছে না। তাই অগত্যা মলয়বাবু এগিয়ে গিয়ে একজন সোনালি চুলওয়ালা সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, “লাইন করে কোথায় যাচ্ছেন আপনারা?”

সোনালি চুল সাহেব হতাশ গলায় জবাব দিল, “আমাকে তিন নম্বর নরকে যেতে হবে।”

“কোথায়? নরওয়ে? তা তিন নম্বরের ব্যাপারটা তো ঠিক বুঝলাম না।”

“আরে মশাই নরওয়ে নয়, নরওয়ে নয়, নরক।” বোঝানোর চেষ্টা করলেন সাহেব।

“নরক!” আঁতকে উঠলেন মলয়বাবু, “কীসব বলছেন আপনি? ইয়ার্কি করছেন আমার সঙ্গে?”

মলয়বাবুর কথা শুনে সাহেব কিছুক্ষণ কুতকুতে চোখে ওঁকে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর বললেন, “হুম, বুঝেছি। আপনাকে এখনো কোথায় পাঠানো হবে স্থির হয়নি, না? তবে নরকে যে যাচ্ছেন তা নিশ্চিত। আজকাল ক’টা লোকই বা আর স্বর্গে যাওয়ার সুযোগ পায়?”

“আরে মশাই, কীসব বলছেন আপনি? আপনার কি মাথা-টাথা খারাপ হল নাকি?” অধৈর্য হয়ে পড়লেন মলয়বাবু।

সাহেব একটুও বিরক্ত না হয়ে বললেন, “আমার মাথা একদম ঠিক আছে। আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। আপনি এক কাজ করুন, ওই ওইদিকটায় চলে যান, ওখানে সহায়তা কেন্দ্র আর তথ্যকেন্দ্র আছে। ওরাই আপনাকে সাহায্য করবে। আমি লাইন ছাড়তে পারব না, নয়তো আপনাকে নিয়ে যেতাম।” এই বলে সাহেব আঙুল তুলে দূরের দিকে দেখাল।

লোকটার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে যদিও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে মলয়বাবুর, তাও যা সব ঘটছে তাতে করে নিজের মাথাটার ওপরেও ঠিক যেন ভরসা হচ্ছে না। তাই অগত্যা সাহেবের নির্দেশিত পথে গুটিগুটি পায়ে এগোতে লাগলেন মলয়বাবু।

অনেকটা হাঁটার পর তিনি দেখতে পেলেন, একটা জায়গায় আবার কিছু মানুষের জটলা। তবে এরা কেউই নগ্ন নয়, এদের শরীরে এক অদ্ভুতরকমের ঢোলা পোশাক রয়েছে। যদিও পোশাকের রংটা সাদা, তবুও ঠিক যেন সাদা নয়, কেমন যেন রুপোলি দ্যুতি ছড়াচ্ছে ওটা থেকে। এদের দেখে আবার লজ্জার অনুভূতিটা ফিরে এল মলয়বাবুর। ভাবলেন পেছন ফিরে দৌড় লাগাবেন, কিন্তু তার আগেই ওদের মধ্য থেকে একজন ওঁকে দেখতে পেয়ে বলে উঠল, “আরে, ইনি তো একজন নরকের যাত্রী! কিন্তু উনি এখানে কী করছেন?”

পাশ থেকে আরেকজন জবাব দিলেন, “নিশ্চয় কোনো সাহায্যের জন্য এসেছেন।”

অপর আরেকজন বললেন, “দিগভ্রান্তও হতে পারে। মিতুদাকে খবর দাও।”

লোকটার কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিকের মতো ওদের সামনে আবির্ভূত হল একজন লোক। মলয়বাবু দেখলেন, এই লোকটার পোশাকটা অন্যদের থেকে আরো বেশি উজ্জ্বল। আর সবচেয়ে অবাক কথা হল লোকটার পাদুটো মাটিতে ঠেকছে না, হাওয়ায় ভাসছে লোকটা। মলয়বাবুর বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই লোকটা ভেসে ভেসে হাজির হয়ে গেল ওঁর সামনে। তারপর একটা ভুবন ভোলানো হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলল, “বলুন, কী সাহায্য করতে পারি আপনাকে। আমার নাম মিত্রগুপ্ত, সবাই ভালোবেসে ডাকে মিতুদা বলে। আপনিও তাই বলবেন।”

“কিন্তু আপনি তো আমার চেয়ে বয়েসে অনেক ছোটো, দাদা বলব কীভাবে!”

“তাই বুঝি? আসলে আমি যখন মারা যাই তখন আপনার চেয়ে অনেক কম বয়সই ছিল বটে আমার। তবে এখানে আমি এসেছি আপনার আসার অনেক অনেক আগে। সেই হিসেবে আমি আপনার সিনিয়র, তাই না?”

“কী বললেন! মারা যান যখন? মানে?”

“আহা ঘাবড়াবেন না। মনকে শক্ত করুন। আসলে গতকাল রাতে ঘুমের ঘোরে আপনি আপনার পার্থিব দেহ ত্যাগ করেছেন।”

“কীসব বলছেন আপনি! উফ্‌, কীসব হচ্ছে এখানে আমি কি পাগলা গারদে এলাম নাকি?”

“নাহ্‌ মশাই, এটা পাগলা গারদ নয়, এটা পার্গেটরি। আর এই যে এঁদের দেখছেন, এঁরা সব স্বর্গের যাত্রী।”

“আর আমি?”

“আপনি তো নরকের।”

“নরক! কেন, আমি কেন নরকে যাব?”

“কর্মফল মশাই, কর্মফল। ওটাই তো সব নির্ধারণ করে কে কোথায় যাবে। আগে বুঝলেন, আমি যখন এখানে এসেছিলাম তখন এখানের পরিস্থিতি এত উন্নত ছিল না। সময়ের সঙ্গে সবই বদলেছে বুঝলেন। আগে এখানে শুধু মৃত আত্মারা পার্থিব মোহ কাটানোর জন্য আসত, কিন্তু এখন এখান থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সে স্বর্গে যাবে না নরকে। নরকে গেলে কত নম্বর নরকে যাবে চিত্ত শুদ্ধি করতে—এইসব এখানেই স্থির হয়।”

“নরকের নম্বর!”

“হ্যাঁ মশাই, যে যেমন পাপ করেছে সে তেমন শাস্তি পাবে, তার জন্য নরকেরও ভাগ আছে।”

“উফ্‌, আপনার কথা এখনো ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না, সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।” মাথার চুলগুলো মুঠো করে ধরতে গেলেন মলয়বাবু। কিন্তু টের পেলেন, তার মাথায় একটাও চুল নেই।

মলয়বাবুর অবস্থা দেখে মুচকি হাসল মিত্রগুপ্ত, কিন্তু কিছু বলল না মুখে। একটা ঢোঁক গিলে নিয়ে মলয়বাবু বললেন, “আপনার কথা যদি বিশ্বাসও করে নিই, তবুও আমার তো নরকে যাওয়ার কথা নয়।”

“তাই?”

“হ্যাঁ। আমি কে আপনি জানেন? আমি ছিলাম আই.পি.এস অফিসার মলয় সেন। কত অপরাধীকে ঘায়েল করেছি এ জীবনে তার ইয়ত্তা নেই। আর তারপরেও আপনি বলতে চান আমি নরকে যাব? দেশ-মায়ের সেবা করার কি কোনো মূল্য নেই!”

“বটে বটে। কিন্তু মশাই, লৌকিক জীবনের পেশা দিয়ে কি আর কর্মফল যাচাই হয়! আপনি দেশ-মায়ের সেবা করেছেন কর্মজীবনে এ তো খুব ভালো জিনিস। কিন্তু তার জন্য যে আপনার দম্ভ সেটাও কি খুব ভালো?”

“কী, বলতে চান কী আপনি?”

“কিছু বলছি না। তবে চলুন আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। আগে এখানে এসবের ব্যবস্থা ছিল না, তবে এখন চাইলেই সকলকে তাদের পার্থিব জীবনের দোষত্রুটিগুলো দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে পরের জন্ম কিছুটা হলেও দোষমুক্ত হয়।”

মিত্রগুপ্ত আরো অনেক কিছু বলে যাচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে মন ছিল না মলয়বাবুর। তিনি এখন সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন মলয় সেনকে। ঊনত্রিশ বছরের মলয় সেনকে যে কিছুদিন আগেই আই.পি.এস অফিসার পদে যোগ দিয়েছে। মলয়বাবু দেখলেন, যুবক মলয় একটা দামি বাইক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রাস্তায়, পেছন থেকে একটি ছেলে তাকে ডাকল। যুবক মলয় শুনতে পেল, কিন্তু ফিরে তাকাল না, কারণ সে জানত তার ওই সহপাঠীটি তার চেয়েও মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও ভাগ্যের ফেরে এখন এক সরকারি অফিসের সামান্য কেরানি। ছেলেটি বরাবর পড়াশুনায় ভালো ছিল বলে ওকে হিংসা করত মলয়। ছেলেটির বাবা মারা যেতে ওর পড়াশুনো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মনে মনে বেশ খুশি হয়েছিল সে। আজ সুযোগ পেয়ে ওর ডাকে সাড়া না দিয়ে নিজের বুকের ঈর্ষার জ্বালাটাকে কিছুটা জুড়োল সে।

দৃশ্যপট পরিবর্তন হল আবার। মলয়বাবু দেখলেন, এক ভিখারিনী তার শিশু সন্তানটিকে নিয়ে হাত পাতছে যুবক মলয়ের কাছে, সে উপেক্ষা করে চলে গেল। পেছনে পড়ে রইল ক্ষুধার্ত শিশুটির কাতর দৃষ্টি আর এক অসহায় মায়ের দীর্ঘশ্বাস।

আবার দৃশ্যপটের পরিবর্তন। যুবক মলয় অস্বীকার করল এক দরিদ্র আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে।

অতীতের দৃশ্যপট উধাও হল এবার। মিত্রগুপ্ত নরম গলায় বললেন, “দেখলেন?”

উত্তর দিতে পারলেন না মলয়বাবু। চুপ করে রইলেন। আজ ওই ঘটনাগুলোর এত বছর পর বুকটা কেমন চিনচিন করে উঠল। মিত্রগুপ্ত আবার বললেন, “আপনার দম্ভের আরো অনেক নিদর্শন রয়েছে, তবে আশা করছি সেগুলো আর দেখানোর প্রয়োজন হবে না। আপনার স্মরণে আসছে সব এক এক করে। এবার আসুন, অন্য একটা জিনিস দেখাই।”

সামনে আবার এক দৃশ্যপট ভেসে উঠল। তবে এবার আর যুবক মলয় নয়, কিশোর মলয়। সুনিপুণ হাতে সে এক সহপাঠীর ব্যাগ থেকে একটা পেন বের করে নিল সবার অলক্ষ্যে। তারপর সেটা ঢুকিয়ে দিল আরেকজনের ব্যাগে।

দৃশ্যটা দেখামাত্রই মলয়বাবুর স্মৃতিতে ঝলসে উঠল দুটো নাম, সুভাষ আর রথী। দুই হরিহর আত্মা। মলয়ের কাছে সুভাষ ছিল তার প্রিয় বন্ধু, কিন্তু সে বেশ বুঝত, সুভাষ রথীকে মলয়ের থেকে অনেক বেশি ভালোবাসে। শুধু এটুকুই নয়, সুভাষ ছিল ক্লাসের সেরা ছাত্র। তার সাহায্যে রথীও পড়াশুনোয় বেশ উন্নতি করেছিল। ওদের দুজনের থেকেই ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিল মলয়। তাই ওদের দুজনকে আলাদা করতে এই চক্রান্তটা করে সে।

পরের দৃশ্যপটে কিশোর মলয় রাতের অন্ধকারে চুপিসারে ওদের পাড়ার রামু পাগলার পাশে লঙ্কা পটকা রেখে দিল। অঘোরে ঘুমোচ্ছিল রামু, আচমকা পটকা ফাটতেই চমকে জেগে উঠল আর চমকের চোটে জ্বলন্ত পটকায় হাতটা লেগে গেল তার। বীভৎসভাবে পুড়ে গেল হাতটা।

মলয়বাবুর মনে পড়ল, রামু পাগলার হাতটা পুড়ে দগদগে ঘা হয়ে গিয়েছিল অনেকটা। তাতে নোংরা লেগে কিছুদিনের মধ্যেই বিষিয়ে উঠেছিল ঘা-টা। তারপর আচমকা একদিন ওদের পাড়ার থেকে উধাও হয়ে যায় লোকটা।

অতীতের দৃশ্যপট আবার উধাও হল। মিত্রগুপ্ত বলল, “লোকটা বাঁচেনি এরপর। যন্ত্রণায় কাতর অবস্থাতেই আপনাদের পাড়া ছেড়েছিল সে। আপনার কাজে খুব আঘাত পেয়েছিল কিনা, তাই। তারপর… আচ্ছা চলুন, কৈশোরের বাকি ঘটনা থাক আপাতত, এখন সবচেয়ে মজার জিনিসটা দেখাই আপনাকে।”

এবার আর যুবক বা কিশোর নয়, শিশু মলয়। হামাগুড়ি দিচ্ছে, হাসছে, খেলছে, খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে। মা যত্ন করে তাকে খাইয়ে দিচ্ছেন, ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন। সারাদিন সংসারের কাজ করে রাতের বেলাও জেগে ছোট্ট মলয়কে ভোলাচ্ছেন। জ্বর হতে ঠায় ওর কাছে বসে ওর সেবা করছেন মা।

ছোটোবেলার স্মৃতি সত্যই সুখের। এসব দৃশ্য পুনরায় দেখতে আনন্দে কান্না পেয়ে গেল মলয়বাবুর। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না শিশু অবস্থায় আবার কোন পাপ কাজটা করে বসেছেন তিনি। একথা মিত্রগুপ্তকে জিজ্ঞেস করতেই সে আবার তার বিখ্যাত ভুবন ভোলানো হাসিটা হাসল, কিন্তু মুখে কিচ্ছুটি বলল না। সামনে তাকাতেই মলয়বাবু এবার দেখতে পেলেন মধ্যবয়সী মলয়বাবুকে। একটা পার্টির শেষে বেডরুমে বসে গায়ের সব গয়না খুলতে খুলতে ওঁর স্ত্রী বলছেন, “হল তো আজ সব সম্মানের দফারফা! আমি জানতাম তোমার মা এরকম কিছুটা কাণ্ড বাধাবেন। উফ্‌, বুঝি না বাবা বুড়ো মানুষ নিজের ঘরে থাকলেই তো পারেন, তা নয়…”

দৃশ্যটা দেখামাত্রই মলয়বাবুর মনে পড়ে গেল এর পরের কথা। চাকরিতে পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মাকে বড়োই ব্যাকডেটেড মনে হত তাঁর। মায়ের সবকিছুতেই বিরক্তি লাগত। বিয়ের পর তো আরো বেশি করে বোঝা মনে হত মাকে। তারপর সেদিনের পার্টির ঘটনার পর দেবযানীর পরামর্শে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছিলেন তিনি। মা মাঝে মাঝে সেখান থেকে ফোন করে দেখা করতে চাইতেন, কোনোভাবে কাটিয়ে দিতেন মলয়বাবু। তারপর তো বৃদ্ধাশ্রম থেকে ফোন এলে ধরাই ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। আর তাই তো মা যেদিন চলে গেলেন সেদিনও উনি যথারীতি ফোন কেটে দিয়েছিলেন মায়ের ফোন ভেবে। কিন্তু…

বুকটা হঠাৎ মুচড়ে উঠল মলয়বাবুর। “মা, মা গো!” বলে মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়লেন তিনি। কত কথাই না মনে পড়ে গেল এক লহমায়। আজ এত বছর পর হঠাৎ মনে হল, সেই সময় মা কত কষ্টই না পেয়েছেন ওঁর অবহেলায়। মা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিল বিছানায়, তখনো একদিন দেখতে যাওয়ার সময় হয়নি তাঁর। তারপর তো মা চলেই গেলেন।

“মা, মা গো, আমায় ক্ষমা কোরো মা।” ডুকরে কেঁদে উঠলেন মলয়বাবু।

যে মানুষটার অধ্যবসায়ে তিনি যাবতীয় শিক্ষা, সম্মান, অর্থ অর্জন করেছিলেন সেই মানুষটাকেই একসময় এভাবে ছুড়ে ফেলে দিলেন! সেই সঙ্গে মলয়বাবুর হঠাৎ মনে হল, এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁর স্থান বৃদ্ধাশ্রমে হয়নি ঠিকই, কিন্তু তাঁরও একমাত্র ছেলেও তো নিজের স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকে। তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িতে তিনি আর দেবযানী একলা। সময় হয়তো এভাবেই সব ফিরিয়ে দেয়।

আস্তে আস্তে মলয়বাবুর কাঁধে হাত রাখলেন মিত্রগুপ্ত। তারপর নরম স্বরে বললেন, “শান্ত হোন। এ শুধু আপনার গল্প নয় মশাই, এ তো এখনের সবার গল্প। মানুষ এখন শৈশব থেকেই বড়ো অসংযমী, অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে আর ফলস্বরূপ একটার পর একটা পাপ। শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের প্রতিটা অধ্যায়কে এখন মানুষ ষড়রিপুর তুলি দিয়ে আঁকছে। তাই তো এখন নরকে এত বেশি সংখ্যক মানুষ যাচ্ছে আর স্বর্গে গুটিকতক।

“উঠে বসুন মশাই। ভয় পাবেন না। বলিষ্ঠ চিত্তে আপনার জন্য যে বিধান স্থির হয়েছে তাকে গ্রহণ করুন। দেখবেন ওখানে গিয়ে আপনার আত্মশুদ্ধি হবে। হ্যাঁ, নরক শুধু শাস্তিই দেয় না, মানুষকে আত্মশুদ্ধিতেও সাহায্য করে। আশা করি পরের বার যখন জন্মাবেন তখন জীবনের প্রতিটা অধ্যায়কে ভালো কাজের মাধ্যমেই মাহাত্ম্যপূর্ণ করে তুলবেন যাতে মৃত্যু পরবর্তীকালের জন্য স্বর্গের সিঁড়ি আপনার অপেক্ষায় থাকে।”


___

অঙ্কনশিল্পীঃ উপাসনা কর্মকার


No comments:

Post a Comment