ধারাবাহিক: রাক্ষসের যম জ্যাক: অনুবাদ: পুণ্ডরীক গুপ্ত

 

রাক্ষসের যম জ্যাক


লেখক: অজ্ঞাত

অনুবাদ: পুণ্ডরীক গুপ্ত

 

প্রথম পরিচ্ছেদ

 

সে অনেক আগেকার কথা। রাজা আর্থার তখন ইংল্যান্ডের অধীশ্বর। তা সে-দেশের একেবারে শেষ সীমায় কর্নওয়াল প্রদেশে বাস করত এক সম্পদশালী কৃষক। তার একমাত্র ছেলে জ্যাক অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির হলেও উপস্থিত বুদ্ধিতে তার জুড়ি নেই। দত্যি-দানব আর রূপকথার গল্প শুনতে পেলে সে আর কিছু চায় না। গাঁয়ের বুড়ি দিদিমারা যখন রাজা আর্থারের নাইটদের পরাক্রমের গল্পগাছা শোনাতে আরম্ভ করত, ছোট্ট জ্যাক তখন গোল্লা গোল্লা চোখে তা গিলত।

মাঠে গরু-মেষ চরাবার সময় জ্যাক যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের পরাক্রম জল্পনা করতে করতে মনে মনে অত্যন্ত আমোদ পেত। আর কাল্পনিক শত্রুকে অনায়াসে পরাজিত করে উত্তেজিত হয়ে উঠত। জ্যাক কখনোই সমবয়সীদের সঙ্গে সাধারণ খেলাধুলায় মেতে উঠে না। তার প্রিয় খেলা হচ্ছে দ্যূতক্রীড়া। মুষ্টিযুদ্ধে তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। দৈহিক বল, দক্ষতা আর ক্ষিপ্র চাতুর্য জ্যাককে সর্বদাই বিজয়ীর আসনে বসিয়ে দেয়।

সেই সময় কর্নওয়াল পর্বতশ্রেণিতে কর্মোর‍্যান নামে এক বিশালকায় দানব বাস করত। সে এক ভয়ংকর হিংস্র চেহারার রাক্ষস বটে। উচ্চতায় সে আঠারো ফুট, প্রায় তিন গজ বেড়। দূরদূরান্ত অবধি তার ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপত সকলে। পর্বতের ঠিক মাঝখানে এক সুবিশাল গুহায় তার বাস আর এতটাই স্বার্থপর ছিল সে যে নিজের আশেপাশে কাকপক্ষীকেও ঘেঁষতে দিত না। পেটে ক্ষুধার উদ্রেক হলেই সে আশেপাশের জনবসতিতে গিয়ে হামলা করত। তার এই গতিপথে যা-ই পড়ত নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিত সে। চারদিকে হৈ-হট্টগোল পড়ে যেত তখন। প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে চোখ যায় ছুটে পালাত। কর্মোর‍্যান তখন ধীরেসুস্থে গোটা ছয়েক গাই-গরু পিঠে তুলে নিয়ে আর শূকর-মেষ ইত্যাদি যতগুলো সম্ভব কোমরে বেঁধে নিজ আস্তানায় পথে রওনা দিত। বিগত অনেক বছর ধরেই এই রীতি চলে আসছে। ধীরে ধীরে নিঃস্ব ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছিল সে প্রদেশ।



যুবক জ্যাক একদিন সেই রাক্ষসকে হত্যা করবার মনস্থ করল। এক শীতের অন্ধকার রাতে একখানা করে শিঙা, বেলচা ও গাঁইতি গুছিয়ে নিয়ে সে সেই পর্বতের পথে রওনা হল। অকুস্থলে পৌঁছেই জ্যাক বাইশ ফুট গভীর এক চওড়া গর্ত খুঁড়ে ফেলল দ্রুত হাতে। তারপর লম্বা লম্বা কিছু শলার ওপর ঘাস চাপিয়ে গর্তের মুখটা ভালো করে ঢেকে দিল। দূর থেকে ফাঁদটা সমতল এক ঘাসজমির মতো দেখে জ্যাক আশ্বস্ত হল।

এইবারে সঙ্গে আনা শিঙাখানাতে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ফুঁ দিতেই তা দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে বেজে উঠল। এই বিজাতীয় শব্দে রাক্ষস হঠাৎ ঘুম ভেঙে একছুটে জ্যাকের সামনে দাঁড়াল এসে। হুঙ্কার ছেড়ে বলল, “কে রে পাপিষ্ঠ, এই অসময়ে আমার ঘুম ভাঙালি? তোকে তার ফল ভোগ করতে হবে। দাঁড়া এখনই তোকে তুলে নিয়ে যাব আমার আস্তানায়, আর আমার কাল সকালের জলখাবার হবি তুই। হা হা হা...”

বলতে বলতে রাক্ষস ছুটে আসতেই কীসে মোক্ষম একখানা হোঁচট খেয়ে সোজা গর্তের মধ্যে পড়ল গিয়ে।

জ্যাক মনের আনন্দে বলে উঠল, “আরে আরে রাক্ষস মশাই, কোথায় গিয়ে ঢুকলেন বলুন তো আপনি? সকালের জলখাবারে আমাকে আর চাই না বুঝি? এই শর্মা ছাড়া জলখাবারে কে আর উদরপূর্তি করবে আপনার?”

সুগভীর গর্তের ভেতর থেকে তখন কর্মোর‍্যানের মুহুর্মুহু গর্জন ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না।

এই উপায়ে জ্যাক সেই বিশালাকৃতির সে ক্রুর রাক্ষসকে সমুচিত শিক্ষা দিল। বেড়াল যেমন থাবার নাগালে পেয়ে ইঁদুরের সঙ্গে একপ্রকার খেলায় মেতে ওঠে, ঠিক তেমনই জ্যাকও কিছুক্ষণ সেই দানবকে নিয়ে আমোদ-আহ্লাদ করল। তারপর আচমকা গাঁইতিখানা বাগিয়ে ধরে ব্রহ্মতালুতে এক ভীষণ আঘাত করে বসল রাক্ষসের। সঙ্গে সঙ্গেই রাক্ষসের ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল।

জ্যাক যখন নিশ্চিত হল যে রাক্ষস আর জীবিত নেই তখন সে মাটি ফেলে সে-গর্ত বুজিয়ে ফেলল। কাজ সেরে এইবারে সে রাক্ষসের গুহায় ঢুকল গিয়ে। গুহার ভেতরে রাশি রাশি ধনরত্নের সম্ভার দেখে দুই চোখ চকচক করে উঠল তার। তারপর সম্বিৎ ফিরে পেতেই জ্যাক বন্ধুবান্ধবদের রাক্ষসের নিধন সংবাদ জানিয়ে আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে উঠবার জন্যে গাঁয়ের পথে ছুট লাগাল।



যখন কর্নওয়ালের কর্তাব্যক্তিদের জ্যাকের এই বীরত্বের কাহিনি কানে গেল, জোট বেঁধে জ্যাকের কাছে এসে উপস্থিত হলেন তাঁরা। জ্যাককে ‘রাক্ষসের যম জ্যাক’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। শুধু তাই নয়, জ্যাককে তাঁরা একখানা চমৎকার তরোয়াল আর সুতোর কাজ করা দারুণ একখানা কোমর বন্ধনী উপহারও দিলেন। তাতে জ্যাকের রাক্ষস বধের প্রশস্তি লেখা সোনার জলে।


 

অল্প সময়ের মধ্যেই জ্যাকের এই দানববিজয় কাহিনি পশ্চিম ইংল্যান্ডবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। আর তাতে ব্লান্ডারবোর নামের আরেক রাক্ষস কর্মোর‍্যান বধের প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞা করে বসল। এই রাক্ষস আবার বাস করে ইয়া মোটা এক গাছের কাণ্ডের ভেতরে এক মায়াবী কোটরে।

কর্মোর‍্যান বধের চার মাস পর জ্যাক ঘোড়ায় চড়ে সেই গাছের পাশ দিয়ে ওয়েলসের দিকে রওনা হয়েছিল। অত্যন্ত সুন্দর এক ঝরনা চোখে পড়তে পথশ্রমে ক্লান্ত জ্যাক ঝরনার পাড়ে নেমে দাঁড়াল ঘোড়া থেকে। তারপর নরম কচি ঘাসের গালিচায় শরীর এলিয়ে দিতেই দুই চোখ ভর করে ঘুম নেমে এল তার। এমন সময় সেই বৃক্ষরাক্ষস ঝরনার জলে তৃষ্ণা মেটাবার প্রয়োজনে উপস্থিত হয়ে জ্যাককে আবিষ্কার করল। জ্যাকের কোমর বন্ধনীতে দৃষ্টি পড়া মাত্র সে আগন্তুকের পরিচয় জেনে দুই চোখ দিয়ে আগুন ছুটল রাক্ষসের। তারপর আচমকা জ্যাককে কাঁধে তুলে দিল দৌড়। পথে লতাগুল্মের কাঁটার আঘাতে জ্যাকের ঘুম ছুটে গেল। ঘুম ভেঙেই নিজেকে এক রাক্ষসের কবলে আবিষ্কার করে মুহূর্তের জন্যে খুব ভয় পেয়ে গেল জ্যাক। তাকে কাঁধে ফেলে ব্লান্ডারবোর ততক্ষণে নিজ আস্তানার কাছাকাছি পৌঁছেছে এসে। জ্যাক কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চুপ করে রইল। রাক্ষসের আস্তানায় ঢুকতেই মেঝেতে রাশি রাশি হাড়গোড় আর মাথার খুলির দিকে লক্ষ গেল জ্যাকের।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জ্যাককে একখানা প্রশস্ত কুঠুরিতে টেনে নিয়ে গেল রাক্ষস। সেই কুঠুরিতে ঢুকে জ্যাক মানবদেহের এমন কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লক্ষ করল যাদের অল্প আগেই হত্যা করা হয়েছে। রাক্ষস হঠাৎ ভয়ানক এক কষ্টহাসি হেসে বলে উঠল, “এই মানুষগুলোর হৃৎপিণ্ডগুলো নুন-মরিচ মাখিয়ে খেতে যা দারুণ ছিল না! আশা করছি, তোর বেলায়ও সেই মজাটাই পাব। কী বলিস?”

কথার ফাঁকে রাক্ষস করল কী, জ্যাককে সেই কুঠুরিতে তালাবন্ধ করে বেরিয়ে গেল নিজের বন্ধুকে নিমন্ত্রণ জানাতে। রাক্ষসের সেই বন্ধুও একই গাছে বাস করে।

রাক্ষস বেরিয়ে যেতেই জ্যাক ভয়ংকর এক আর্ত চিৎকার শুনে শিহরিত হয়ে উঠল। ক্ষণে ক্ষণে দীর্ঘশ্বাস আর বুক ভাঙা কান্নায় রাক্ষসের এই আস্তানা কেঁপে উঠল। অজ্ঞাত কোনো স্থান থেকে মুহুর্মুহু কানে আসতে লাগল এক সাবধানবাণী, “হে সাহসী আগন্তুক, শিগগিরি পালাও! নয়তো ওই নিষ্ঠুর রাক্ষসের শিকার হবে তুমিও। সে আরেক শয়তানকে গেছে ডাকতে। সে স্যাঙাত আরো নিষ্ঠুর। পালাও, পালাও!”

এই আর্ত বিলাপ জ্যাককে যেন পাগল করে তুলছিল। সে তাড়াতাড়ি জানালায় দৃষ্টি ফেলে দেখল, দুই নিষ্ঠুর রাক্ষস হাত ধরাধরি করে যেন নাচতে নাচতে এদিকপানেই আসছে। জানালাটা দরজার ঠিক ডানদিকে ওপরে। জ্যাক বুঝল আর সময় নেই। মনে মনে স্থির করে নিল, যা করবার এই মুহূর্তেই করতে হবে। নিজের জীবন-মৃত্যু এখন নিজের হাতেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে সৌভাগ্যক্রমে এই কুঠুরিতেই দু-গাছা শক্ত কাছি নজরে পড়ল তার। সে কাছি দুটোর দুই প্রান্তে গিঁট পাকিয়ে বড়ো বড়ো ফাঁস তৈরি করে ফেলল দ্রুত। আর তারপর দৈত্যেরা দরজার লোহার কপাট ঠেলে ঢুকবার মুহূর্তেই ওপর থেকে ফাঁসগুলো তাদের মাথা গলিয়ে ফেলে দিল জ্যাক। মুহূর্তের মধ্যেই সে কাছিগুলোর অন্য প্রান্ত দুটো ছাদের শক্ত কাঠে প্যাঁচ দিয়ে শরীরের সর্বশক্তি একত্র করে টেনে ধরল যতক্ষণ না রাক্ষস দুটোর শ্বাসরোধ হচ্ছে। এই অতর্কিত আক্রমণে গলায় ফাঁস লেগে রাক্ষস দুটো আধমরা হয়ে এল। জ্যাক মুহূর্তের মধ্যে তলোয়ার খুলে নিয়ে লাফিয়ে পড়ে রাক্ষস দুটোর ধড় মুণ্ডু আলাদা করে দিল।

তারপর ব্লান্ডারবোরের কাছ থেকে একগোছা বিশালাকৃতির চাবি হাতিয়ে নিয়ে জ্যাক ওপরে উঠে এল ফের। প্রত্যেকটা কুঠুরি খুলে তন্নতন্ন করে খুঁজে শেষে এক কুঠুরির এক কোনায় তিনজন নারীকে আবিষ্কার করল সে। তাদের প্রত্যেককেই অন্যজনের মাথার চুল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ক্ষুধাতৃষ্ণায় আধমরা অবস্থা তাদের। তারা কোনোমতে জানাল যে তাদের স্বামীদের নির্মমভাবে হত্যা করে তাদের বন্দি করে রেখেছে রাক্ষস। দীর্ঘদিনের অনাহারে বর্তমানে তারা মরতে বসেছে। কারণ, খাদ্য হিসাবে দেওয়া নিজেদের স্বামীদের মাংস তারা খেতে রাজি হয়নি।

জ্যাক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “শুনুন, আমি সেই নৃশংস রাক্ষস আর তার সঙ্গীকে হত্যা করেছি। এই রইল চাবি। আপনারা নির্ভয়ে এখানে থাকুন। আশা করি রাক্ষসের সমস্ত ধনসম্পদ আপনাদের যাবতীয় প্রয়োজন আর দুঃখ-দুর্দশা মেটাতে কাজে আসবে।”

এই বলে জ্যাক রওনা হয়ে গেল ওয়েলসের পথে তার গন্তব্যের দিকে। অপরিমিত ধনসম্পদের নাগাল পেয়েও জ্যাক এক কদর্পও সঙ্গে নেয়নি। নিজের যৎসামান্য টাকাকড়ি যা সঙ্গে ছিল তাতেই সে সন্তুষ্ট। দ্রুতবেগে ওয়েলসের দিকে চলে গেল সে।

কিছুদূর এগোবার পরই পথ হারিয়ে ফেলে জ্যাক। বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরতে ঘুরতে সে দুই ধারে দুই সুউচ্চ পর্বতের মাঝখানে এক উপত্যকায় এসে হাজির হল। সন্ধে পেরিয়ে ততক্ষণে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরে একটা আলোকবিন্দু চোখে পড়লে তা লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল সে। অল্প দূরেই জ্যাক মস্ত একখানা ঘর দেখতে পেয়ে দরজায় ধাক্কা দিল। আর অল্পক্ষণের মধ্যেই সে আশ্চর্য হয়ে দেখে, সামনে এক দুই মাথাওলা রাক্ষস দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে এসে। অত্যন্ত মার্জিত আচার ব্যবহার সে রাক্ষসের। জ্যাকের বিশ্বাস অর্জন করতে তাকে বেগ পেতে হল না। জ্যাককে তক্ষুনি ঘরে ডেকে আনল সে রাক্ষস। জ্যাক একজন পথভ্রষ্ট পথিক হিসেবে নিজের পরিচয় দিল। দুই মাথাওলা রাক্ষস তখন সাদরে আপ্যায়ন করে অন্য একটা ঘরের দরজা খুলে দিল জ্যাককে। নরম বিছানায় শুয়েও জ্যাকের কিন্তু ঘুম এল না। অবসন্ন শরীরে বিছানায় পড়ে থাকলেও চোখদুটো জেগেই রইল।



একসময় জ্যাকের কানে এল, সেই রাক্ষস অন্য ঘরে অবিরাম পায়াচারি করতে করতে কী যেন বিড়বিড় করে চলেছে আপন মনে। কান খাড়া করতেই জ্যাক শুনতে পেল, রাক্ষস বলছে, “এসেছিস, ভালোই হয়েছে। সকালের আলো দেখা তোর আর হবে না। আমার মুগুরের এক ঘায়েই তোর মাথা আমি ছাতু করে দেব।”

জ্যাক মৃদু হেসে মনে মনে বলল, ‘আচ্ছা, এই তবে ছিল তোর মনে! তার জন্যই এতসব চাতুরি তবে?’

সে বিছানা ছেড়ে উঠে সমস্ত ঘর আঁতিপাঁতি করেও একখানা কাঠের টুকরো ছাড়া আর কিছু খুঁজে পেল না। সেটাই তুলে এনে জ্যাক সযত্নে বিছানায় সাজিয়ে রেখে দিয়ে নিজে ঘরের এককোণে লুকিয়ে রইল। মাঝরাতে রাক্ষস তার বিশালাকৃতির মুগুর হাতে ঢুকে জ্যাক মনে করে কাঠের টুকরোটাকে অবিরাম আঘাত করতে করতে একসময় ক্ষান্ত হল। এতক্ষণে জ্যাকের সমস্ত হাড়গোড় গুঁড়ো হয়ে গেছে ভেবে রাক্ষস বেরিয়ে গেল।

পরদিন সকালে জ্যাক যেই রাক্ষসের ঘরে ঢুকে তাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ জানাল, রাক্ষস তো জ্যাককে জীবিত অবস্থায় দেখতে পেয়ে রীতিমতো তোতলাতে শুরু করল। বলল, “রা-রাতে তোমার ভালো ঘু-ঘুম হয়েছিল তো পথিক? মাঝরাতে কোনো কিছু আবার তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়নি তো?”

জ্যাক নিঃস্পৃহ গলায় জবাব দিল, “সে তেমন কিছু নয়। সম্ভবত ইঁদুর একটা লেজ দিয়ে আমার গায়ে দু-চারবার ঝাপটা মেরে চলে গেছে। আমি তক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ফের। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেনি বিশেষ।”



রাক্ষস আর একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। রাতে ভীষণ মার খেয়ে যে অক্ষত দেহে ঘুম থেকে উঠতে পারে সে রাক্ষসের চেয়েও বেশি পালোয়ান। রাক্ষস চুপচাপ উঠে গিয়ে জলখাবারের জন্যে অতিকায় দুই পাত্র মিষ্টান্ন এনে হাজির করে। জ্যাক এইবার বিপদে পড়ে গেল। এতসব মিষ্টান্ন সে খাবে কী উপায়ে! অথচ রাক্ষসের সমপরিমাণ অন্তত না খেতে পারলে তার চালাকি ধরা পড়বার সমূহ সম্ভাবনা। জ্যাক তৎক্ষণাৎ এক বুদ্ধি পাকাল মনে মনে। সে রাক্ষসের অমনোযোগের সুযোগে নিজের কোটের ভেতরে চামড়ার তৈরি থলেটা দ্রুত খুলে ফেলে খাওয়ার ভান করে চটপট তার ভেতর মিষ্টান্ন চালান করে দিল। রাক্ষসও ততক্ষণে নিজের পাত্র শেষ করে এনেছে।

জ্যাক সহাস্যে বলল, “দাঁড়াও, আমি তোমাকে একখানা জাদু দেখাচ্ছি। মুহূর্তের মধ্যেই নিজের মুণ্ডু কেটে ফের জোড়া দিতে পারি আমি। তবে তার আগে এটা দেখো।”

বলে জ্যাক একটা ছোরা চালিয়ে নিজের পেটের কাছটা চিরে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গেই ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল মিষ্টান্ন। রাক্ষস প্রথমে বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠে পরমুহূর্তেই আবার তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, “এ আর এমন কী। তুমি পারলে আমিও পারি, এই দেখো।”

বলেই বিদ্যুদ্বেগে ছোরাখানা জ্যাকের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের পেটে চালিয়ে দিল আর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। নিজের উপস্থিত বুদ্ধি আর চালাকি দ্বারা দুই মাথাওলা রাক্ষসকে মেরে ফেলে জ্যাক নিজের পথ ধরল।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

 

জ্যাক দ্রুত গিয়ে দেখা করল রাজা আর্থারের একমাত্র পুত্রের সঙ্গে। রাজপুত্র তখন নিজের যোগ্য রাজকন্যে খুঁজে বের করবার তোড়জোড় করছে। জ্যাক সটান উপস্থিত হয়ে রাজপুত্রের খাস পরিচারক হওয়ার আবেদন জানাল। খানিক কী ভেবে নিয়ে সে আবেদনে রাজি হয়ে গেল রাজপুত্র।

কতদিন পার হয়ে গেল, কতশত স্থান ঘুরে বেড়ালো দুজনে। একদিন তারা সন্ধের মুখে এসে পৌঁছল এক জায়গায়। ততদিনে দুজনেই কপর্দকশূন্য, কারো হাতে একটা মোহরও নেই যে কোনো সরাইখানায় ঢুকে রাতটুকু কাটায়। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছে যে গাছের তলা ছাড়া রাত কাটাবার আর কোনো উপায় নেই। জ্যাক কিন্তু তাতে হতোদ্যম হল না। বলল, “আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না কুমার, উপায় একটা এখনো আছে হাতে। এখান থেকে দু-মাইল দূরে আমার এক খুড়ো থাকেন—তিন মাথাওলা অতিকায় এক রাক্ষস। পাঁচশো বর্মধারী সেনাও তাঁর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না, অল্প সময়ের মধ্যেই পালাতে বাধ্য হয়, এমনই বীর তিনি।”

প্রথমে খানিকটা চাঙ্গা হয়ে উঠলেও জ্যাকের শেষের কথাগুলো শুনে দমে গেল রাজপুত্র। বলে, “তবে আর সেখানে গিয়ে কী কাজ আমাদের? দেখামাত্রই কপ করে গিলে ফেলবে তোমার সেই রাক্ষস খুড়ো।”

জ্যাক তাড়াতাড়ি বলল, “না না কুমার, সেজন্যে ভাববেন না কিছু। আমি আগে সেখানে গিয়ে আপনার জন্যে সুরক্ষিত পথ খুঁজে বের করে ফিরে আসব ফের। ততক্ষণ দয়া করে এখানেই অপেক্ষা করবেন।”



রাজপুত্র এই প্রস্তাবে রাজি হতেই জ্যাক দ্রুত রওনা হয়ে গেল তার খুড়োর কেল্লার উদ্দেশ্যে। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে কেল্লার ফটকে হাজির হয়ে এমন ঘা দিল যে চারদিকের পাহাড়ে পাহাড়ে তা ঠোক্কর খেয়ে বজ্রের মতো ফিরে এল সে শব্দ। প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে রাক্ষস ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠল, “কে রে ওখানে?”

“অধম তোমার অচেনা এক ভাইপো, খুড়ো।” উত্তর দিল জ্যাক।

“তা কী মনে করে?”

“সাংঘাতিক এক খবর আছে খুড়ো।” জ্যাকের সটান উত্তর।

“যা যা, ওসব খবর-টবরে আমার কাজ নেই। আমি তিন মাথাওলা রাক্ষস জানিস তো? পাঁচশো বর্মধারী সৈন্যও আমার কাছে নস্যি।”

“সে কি আর জানি নে খুড়ো?” জ্যাক বলে, “তবে কিনা দেশের রাজপুত্র রওনা হয়েছেন শুনলুম হাজার সেনা সঙ্গে করে, তোমায় মেরে ধূলিসাৎ করে ছাড়বে তোমার এই এতদিনের রাজত্বি। এ খবরটাই আগাম এসেছিলুম দিতে। তা তুমি যখন...”

“ওরে দাঁড়া দাঁড়া, ভাইপো আমার।” দৌড়ে এল রাক্ষস। “কী অলুক্ষণে খবরই না নিয়ে এলি বল তো! এ অবস্থায় তো আর পালানো ছাড়া উপায় নেই দেখছি। এক কাজ কর, রাজপুত্র ফিরে যাওয়া অবধি কেল্লার চাবিখানা নিজের কাছেই রাখ, পরিস্থিতি তেমন হলে আমি ফিরে আসব ফের। এখন পালাই।” বলে কেল্লা ছেড়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে পালাল রাক্ষস। গিয়ে সেধোল মাটির নীচের এক গুপ্ত গুহা-ঘরে।

এরপর আর কী, জ্যাকও একদৌড়ে গিয়ে রাজপুত্রকে এনে তুলল সে কেল্লায়। তারপর দুজনে মিলে মহানন্দে মহা ভোজ সেরে তোফা ঘুম দিল। ওদিকে গুপ্ত গুহায় শুয়ে শুয়ে রাক্ষস তখন থরথরিয়ে কাঁপছে ভয়ে।

পরদিন সকালবেলায় জ্যাক রাজপুত্রকে একরাশ মণিমুক্তো উপহার দিয়ে তিন মাইল দূরে এক নিরাপদ জায়গায় রেখে এল রাক্ষসের নাগালের বাইরে। জ্যাক কেল্লায় ফিরে এসে রাক্ষসকে বের করে আনল গুপ্ত গুহা থেকে। আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়েই রাক্ষস নিজের জানমাল ও কেল্লাখানা বাঁচিয়ে রাখবার মূল্য স্বরূপ জ্যাককে কিছু পারিতোষিক দিতে চাইল। জ্যাক সঙ্গে সঙ্গে জানাল, “বিশেষ কিছু চাই না খুড়ো। এ তো আমার কর্তব্য ছিল। তবে চাইছই যখন, তখন নয় তোমার ওই বিছানার পাশে ঝোলানো শত জীর্ণ কোটখানাই দাও। তবে সঙ্গে রাখা টুপিখানা, ওই জংধরা তলোয়ার ও ছেঁড়াখোঁড়া জুতোজোড়াও মন্দ নয়।”

রাক্ষস খুশি মনে বলল, “তা নিয়ে যাও না। এ আর এমন কী। তবে যে জিনিসগুলো চাইলে তুমি সেসব সাধারণ নয় মোটেও। কোটখানা যতক্ষণ পরে থাকবে, তোমায় অদৃশ্য করে রাখবে সে। টুপিখানা হল জ্ঞানের ভাণ্ডার। আর ওই তলোয়ারখানার এমনই গুণ যে যা কিছু চাইবে তৎক্ষণাৎ কেটে ফেলতে পারো সে দিয়ে। জুতোজোড়া তোমার চোখের পলকে পৌঁছে দেবে যেখানে যেতে চাও। সাবধানে যত্ন করে রেখো, এগুলো আজ থেকে তোমায় দিলুম।”

***

ওদিকে জ্যাকের পথ চেয়ে বসে আছে রাজপুত্র। জ্যাক দ্রুত গিয়ে দেখা করল তার সঙ্গে। তারপর দুজনে মিলে ঘুরতে ঘুরতে সুবিশাল এক অট্টালিকার দরজায় উপস্থিত হল এসে। সে অট্টালিকায় বাস করে অতীব সুন্দর এক রমণী। রাজপুত্রকে সাদরে আপ্যায়ন করল সে। এক আনন্দ ভোজের আয়োজন করল নিজের মহলে। একথা-সেকথায় ভোজ সাঙ্গ হল একসময়। রমণী উঠে দাঁড়িয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে আচমকা বলে উঠল, “এই রুমালটা কিন্তু কাল আমায় অবশ্যই দেখাতে হবে আপনাকে রাজকুমার। নয়তো মৃত্যু অবধারিত।”

বলেই রুমালখানা সঙ্গে নিয়ে মহল ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে রমণী। রাজকুমার এই অকারণ শর্তে হতচকিত হয়ে পড়লেও জ্যাক কিন্তু ঘাবড়াল না মোটেই। সে কিছু একটা আঁচ করেছে।

বিমর্ষ রাজপুত্র ঘুমিয়ে পড়লে জ্যাক রাক্ষসের কাছ থেকে চেয়ে আনা টুপিটা মাথায় পরল। আর সঙ্গে সঙ্গেই সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল। এ অট্টালিকার রমণী এক জাদুকরের ফাঁদে আটকে আছে। জাদুকর নিজের ইচ্ছেমতো চালনা করছে তাকে। এ মুহূর্তে সে রমণী গভীর এক জঙ্গলে রওনা হয়েছে জাদুকরের সঙ্গে দেখা করবার আদেশে। প্রতি রাতেই যেতে হয় তাকে।

জ্যাক আর দেরি করল এক মুহূর্তও। অদৃশ্য হওয়ার কোটখানা গায়ে চাপিয়ে, আর দ্রুতগামী জুতোজোড়া পায়ে গলিয়ে শীগগিরই বেরিয়ে পড়ল সে জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। পৌঁছে দেখে রমণী সে রুমালখানা জাদুকরের হাতে তুলে দিয়েছে ততক্ষণে। জ্যাক টের পেল তারই মতো অদৃশ্য কিছু প্রেতাত্মা ঘুরপাক খাচ্ছে তাকে ঘিরে। কী একটা অস্পষ্ট মন্ত্রধ্বনি যেন ধীরে ধীরে জালে জড়িয়ে আনছে তাকে। জ্যাক দেরি না করে তক্ষুনি তলোয়ারখানার এক কোপে কেটে নিল সে দুষ্ট জাদুকরের মুণ্ডুখানা। রমণীও জাদুর মায়াবলের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল সঙ্গে সঙ্গে।

রাজপুত্র সে রমণীকে সঙ্গে করে ফিরে গেল নিজের দেশে। আনন্দের সঙ্গে তাদের বরণ করে নিল সবাই। জ্যাক তার এই সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে নাইট উপাধিতে ভূষিত হল রাজা আর্থারের রাজসভায়।



(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

অঙ্কনশিল্পী: রিচার্ড ডয়েল


No comments:

Post a Comment