গল্প: টিকলির রূপকথারা: গীর্বাণী চক্রবর্তী


টিকলি দৌড়চ্ছে, দৌড়চ্ছে। বাঁদিকে বিশাল এক নদী। নদী না বলে সমুদ্র বলাই ভালো। কিন্তু দিদুন বলে, এর নাম হাওর। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। টিকলি মাঝে মাঝে মুখ মুছে নিয়ে আবার দৌড়চ্ছে। ওই তো দৈত্যটা জলের ওপর দিয়ে হেলেদুলে চলছে। দৈত্যটার অর্ধেক শরীর জলের তলায় আর মাথাটা ঠেকে আছে আকাশের গায়ে। একবার ডাঙায় উঠুক, টিকলি ডানহাতে ধরা নিমাইদাদুর বাঁশের লাঠিটাকে দিয়ে দেবে দৈত্যটার শরীরে মাঝ-বরাবর এক ঘা। ব্যস, দৈত্য ভ্যানিশ। তারপর জলে ডুব দিয়ে পৌঁছে যাবে সেখানে যেখানে লাল-নীল-হলুদ মুক্তো গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেই মুক্তোগুলো জামার কোঁচড় ভর্তি করে নিয়ে আসবে দিদুনের জন্য। কিন্তু দৈত্যটার তো ডাঙাতে ওঠার নামই নেই। কালো ধোঁয়ার মতো গোল গোল করে ঘুরতে ঘুরতে প্রচণ্ড হুঙ্কারে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিয়ে জলের ওপর দিয়ে চলছেই।

আরে, সামনে ওটা কী! বিশাল কালো মেঘপুঞ্জের মতো জমাট বাঁধা একরাশ অন্ধকার জলের মাঝে স্থির হয়ে আছে। একটু কাছে যেতেই টিকলি বোঝে, এটা তো সেই দ্বীপটা যেখানকার হিজলগাছের বনে শত শত কালো সাপ, যাদের চোখগুলো লাল লাল পুঁতির মতো তারা থাকে।

দৈত্য আর টিকলি এখন পাশাপাশি চলছে। একজন ডাঙায়, আরেকজন জলে। দৈত্যটা হঠাৎই হিজলগাছগুলোকে জড়িয়ে ধরে। আর সাপগুলো সব দৈত্যের পেটে। দ্বীপটা পেরিয়ে দৈত্যটা এবার একটু বাঁদিকে সরে আসে। টিকলি দাঁড়িয়ে পড়ে। এবার মনে হয় দৈত্যটা ডাঙায় উঠবে। একবার ডানহাতে ধরা বাঁশের লাঠিটা দেখে নেয় টিকলি। কোনো ভয় নেই। একঘায়েই সাবাড় হবে জলদৈত্যটা। ঠিক সেই সময়ই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। দৈত্যটা একদম টিকলির সামনে এখন।

হঠাৎই কোথা থেকে এক বিশাল আরশোলা ফড়ফড় করে এসে টিকলির ন্যাড়া মাথায় বসে। আর যায় কোথায়। সব বীরত্ব শিকেয় তুলে টিকলিরানি চিৎকার করে ওঠে, “ও দিদুন, বাঁচাও! আমার টাক চেটে দিল আরশোলাটা!”

“ও দিদিভাই, কী হয়েছে? এই তো আমি। কোথাও কোনো আরশোলা নেই।” দিদুন জাপটে ধরে টিকলিকে।

ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে টিকলি দেখে, ওমা, কোথায় কী? সে তো দিদুনের পাশে শুয়ে আছে। দিদুনের জর্দার গন্ধে চারদিক ভুরভুর করছে। টিকলি নিজের টেকো মাথাটাতে একবার হাত বোলায়। তারপর মশারির ভেতর জিরো পাওয়ারের নাইট বাল্বের আলোয় ধীরে ধীরে দেখে নেয়। নাহ্, কোথাও কোনো জলদৈত্য, আরশোলা কিচ্ছু নেই। তারপরেই পাশ ফিরে শুয়ে দিদুনের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, “ও দিদুন, কালকে তুমি আমাকে হাওর দেখাতে নিয়ে যাবে? আমি তোমার জন্য লাল-নীল মুক্তো আনব।”

“ধুর পাগল মেয়ে! হাওর কি এখানে আছে? সে তো আমার দেশের বাড়ি বাংলাদেশে ছিল। তোকে বললাম না তখন! সেই কোন ছোটোবেলায় সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে বাবার সঙ্গে এখানে চলে আসি। আর কথা বলে না টিকলি সোনা, এবার ঘুমিয়ে পড়ো। রাত অনেক হল।” দিদুন ঘুম ঘুম গলায় কথাগুলো বলে।

বাইরে তখন জোর বৃষ্টি। টিকলি আবার দিদুনকে একটু ঠ্যালা দিয়ে বলে, “আচ্ছা দিদুন, কালকেও যদি বৃষ্টি থাকে তাহলে কী হবে? আমি তো ভাবলাম নিমাইদাদুর সঙ্গে কালকে মাঠে খেলতে যাব।”

দিদুন টিকলিকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বলে, “কালকে সন্ধ্যায় তোমাকে একটা মন্তর শিখিয়ে দেব। তারপর দেখি পরশু রোদ ওঠে কি না। এখন ঘুমাও তো, ঘুমাও।”

বাইরে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে টিকলির চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে।

গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি এসেছে টিকলি। ছোটোমামা গিয়ে ওকে নিয়ে এসেছে। বাবার অফিস, তাই মা আসেনি। তবে দিদুন থাকলে টিকলির কাউকে লাগে না। শুধু একটাই অসুবিধা, দিদুনদের বাড়ির আশেপাশে ওর মনের মতো কোনো বন্ধু নেই। টিকলির বয়সী ছয়-সাত বছরের কয়েকটা বাচ্চা আছে ঠিকই, কিন্তু ওরা যেন টিকলিকে দেখলে কেমন গুটিয়ে থাকে। গ্রামে বিশাল বাড়ি দিদুনদের। দাদুন টিকলির জন্মের আগেই মারা গেছে। টিকলি শুনেছে মার কাছে, দাদুনের বাবা নাকি এখানকার জমিদার ছিল। এখন এত বড়ো বাড়িতে দিদুন, ছোটোমামা আর সর্বক্ষণের কাজ করার জন্য নীতু ও রাধামাসি আছে। আর দাদুনের জমিজমা দেখার জন্য নিমাইদাদু আছে। টিকলি ওই নিমাইদাদুর সঙ্গেই মাঝে মাঝে জমিতে যায়, খেলাধুলা করে। নয়তো এই বিশাল বাড়িটায় ঘুরতে ঘুরতেই সময় কেটে যায়। আর রাতে দিদুন কত্ত গল্প বলে। টিকলিরা তো শহরে ছোট্ট ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকে। তাই গ্রামের এই বাড়িটা টিকলির খুব ভালো লাগে।

পরেরদিনও টিকলি ঘুম থেকে উঠে দেখে আকাশের মুখ ভার। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। দাঁত মাজার মাঝখানেই ছোটোমামা এসে টিকলির টাকে দুটো চাঁটি মেরে যায়। মার ওপর ভীষণ রাগ হয় টিকলির। স্কুল থেকে আসার পর মা চুলে একটা উকুন পেয়েছিল। অমনি মাথা ন্যাড়া করে দিল। তাও ভাগ্যিস গরমের ছুটিটা পড়ে গেছে।

সারাদিনই দিদুনের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে টিকলি। একবার তো রান্নাঘরে দিদুনকে বলেই বসল, “ও দিদুন, ওই মন্তরটা কখন বলবে?”

“সে তো সন্ধ্যাবেলায়। যদি আকাশে মেঘের ফাঁকফোকর দিয়ে দু-একটা তারা দেখা যায়, তবে বলব।” দিদুন কথাগুলো বলে টিকলির গালটা টিপে দেয়।


সন্ধ্যা অনেকক্ষণ আগে ঘনিয়েছে। দিদুনের ঘরের সামনে বিশাল বারান্দায় একটা কাঠের চৌকির ওপর টিকলি আর দিদুন বসে আছে। সন্ধ্যার পর আকাশের মেঘ অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে টিকলি একটা দুটো করে তারা গুনে দিদুনকে বলে, “দিদুন, অনেক তারা উঠেছে। এবার মন্তরটা শুরু করো।”

দিদুন বেশ গম্ভীর হয়ে বলে, “আমার সঙ্গে কিন্তু তোমাকেও বলতে হবে দিদিভাই।”

“একদম দিদুন। তুমি বলবে, তারপর শুনে শুনে আমিও বলব।” টিকলি ঘাড় কাত করে বলে।

দিদুন শুরু করে রোদ ওঠানোর মন্তর—

এক তারা বাঁধলাম

দুই তারা বাঁধলাম

তারারা সাতভাই

ধইরা আনো বড়ো ভাই

বড়ো ভাইয়ের মাথা খাই

ঢেকা গেল হালে

ঢেকি গেল পালে

রোদ উইঠ্যা বইসা থাক

গোয়ালঘরের চালে।

                                     

মন্তর শেষ করেই দিদুন আঁচলে মারে গিঁট। তারপর হাসতে হাসতে দিদুন টিকলিকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তারা বাঁধা হয়ে গেল। কালকে দেখবি রোদ উঠবেই।”

সারারাত ধরে আকাশের মাঠে তারাদের সঙ্গে টিকলি কতরকম খেলা খেলে। তারপর খেলতে খেলতে ক্লান্ত তারারা একে একে অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকে। আর টিকলিও আকাশের মাঠ থেকে নেমে টুপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে।


জানালা দিয়ে সকালের নরম আলো এসে সারা ঘর ভরিয়ে দিয়েছে। টিকলি ঘুম থেকে উঠে অবাক হয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে রোদ থইথই সকালে দিদুন স্নান করে তুলসীতলায় জল দিচ্ছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে পায়েসের মিষ্টি সুগন্ধ। টিকলি আনন্দে হাততালি দিয়ে সকালের ঝকঝকে রোদ্দুরের মতোই হেসে ওঠে। তারপর এক ছুট্টে গিয়ে দিদুনকে জড়িয়ে ধরে।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল


No comments:

Post a Comment