গল্প: পাস্টোস্কোপ: আশিস কর্মকার



সেপ্টেম্বরের এক ছোট্ট ছুটিতে আমি আর প্রফেসর রায় চলে আসি ডুয়ার্সে। লক্ষ্য ছিল গরুমারায় এলিফ্যান্ট সাফারি। আমরা যে হোটেলটা বুক করেছি, তাদেরকেই এলিফ্যান্ট সাফারি বুকিংয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কেননা ডুয়ার্সে এসে নিজেরা এলিফ্যান্ট সাফারি বুকিং করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য এবং ভাগ্য নির্ভরও বটে। একথাটা বলতে হচ্ছে এই কারণে যে, আমাদের এক সহকর্মী তার পরিবার নিয়ে জলদাপাড়ায় এলিফ্যান্ট সাফারি বুকিংয়ের জন্য ভোর চারটের সময় লাইন দিয়ে যখন কাউন্টারে পৌঁছেছে ঠিক তখনই জানতে পারল যে সব হাতি বুক হয়ে গিয়েছে, আর আসন ফাঁকা নেই। তখন আর কী করা, বিফল মনোরথে তারা জিপ সাফারিতেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাল। একে ভাগ্যের পরিহাস ছাড়া আর কীই বা বলা যেতে পারে? তাই আমরা আগে থেকেই আটঘাট বেঁধে নেমেছি। বুকিং-টুকিংয়ের ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে পারব না। আবার এলিফ্যান্ট সাফারিও মিস করা চলবে না।

সে যাই হোক, আমাদের এই দু-দিনের গরুমারা সাফারিটা ভালোই হল। যাকে বলে স্যাটিসফায়েড। গরুমারা দেখে আমরা বাকি দিনটা হোটেলেই কাটাই। আর কোথাও যাইনি। ছোট্ট অবকাশে একটা নিটোল বিশ্রাম করে দিন কাটালাম। কাল দুপুরের তিস্তা-তোর্ষা এক্সপ্রেস করে কলকাতায় ফিরব।

হোটেলের ম্যানেজারকে বলে একটা গাড়ি ঠিক করে বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম কাছাকাছি কম দূরত্বের মধ্যে কী আছে দেখিয়ে নিয়ে আসার জন্য। ম্যানেজার প্রস্তাব দিলেন কাছেই ডায়না নদী আছে, সেটা দেখতে যেতে পারি, ভালোই লাগবে। এখন আমরা সেখানেই এসেছি। ডায়না নদীর বুকে একটা ঢাউস মার্কা পাথরের উপর বসে সূর্যাস্ত দেখছি।

এখানে একটা কথা বলে রাখি। বছর দেড়েকের প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমে আমার বন্ধুবর অংশুমান রায় একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। যন্ত্রটা স্রেফ একটা বাক্স। আগেকার দিনে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে ছবি তোলা হত যে ক্যামেরা দিয়ে, ঠিক সেরকমই দেখতে। তবে যন্ত্রের ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখতে হবে মাথা নীচু করে, যেমনভাবে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখ রাখা হয়। যন্ত্রের লেন্সের নীচে কোনো কিছু রেখে কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে তার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখলে কিছুক্ষণ পর লেন্সের নীচে রাখা জিনিসটার অতীত দেখা যায়। যেন বাক্সের ভেতরে সিনেমা চলছে। এখন তর্কের খাতিরে বলা যেতেই পারে যে জড় বস্তুর আবার অতীত-ভবিষ্যৎ কী? কথাটা ঠিকই। জড় বস্তুর অতীত-ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। কিন্তু জড় বস্তুর সঙ্গে যদি কেউ বা কোনো ঘটনার সম্পর্ক থাকে তবে নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তি বা ঘটনার অতীত-ভবিষ্যৎ বলে কিছু দাবি রাখে।

প্রথমে আমিও ব্যাপারটা বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম ব্যাপারটা নিছকই একটা কল্পনাপ্রসূত ব্যাপার। কিন্তু রায়ের কথামতন যখন নিজের অতি পরিচিত জিনিস যেমন আমার হাতঘড়ি, কলম, মোবাইল ফোন এসব লেন্সের নীচে রেখে ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখলাম তখন আমার চোখ ছানাবড়া হওয়ার সামিল। এও কি সম্ভব!



প্রথমে হাতঘড়িটার কথাই বলা যাক। অংশুমানের ডাকে আমি ওর বাড়িতে এসে যখন ওর দেওয়া ডেমনস্ট্রেশন দেখি তখন মনে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। আমার সন্দেহ ওর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। সে নিজেই বলল, “আমার দেওয়া বস্তুগুলোয় যদি তোমার অবিশ্বাস থেকে থাকে তবে নিজের জানা পরিচিত জিনিস দিয়েই পরীক্ষা করে দেখতে পারো। তাতে সন্দেহ দূর হবে, আর আমার সৃষ্ট জিনিসটাও প্রমাণিত হবে।”

ওর কথামতন আমি হাতঘড়িটা খুলে যন্ত্রে লেন্সের নীচে রেখে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখি। কিছুক্ষণ সব অন্ধকার। তারপর ধীরে ধীরে দেখতে পেলাম, কয়েকটা অংশ অ্যাসেম্বল হয়ে ঘড়িটা তৈরি হল কোম্পানিতে। সেখান থেকে ডিস্ট্রিবিউটর মারফত ঘড়িটা এল শো-রুমে। শো-রুমে দুজন ক্রেতা ঘড়িটা হাতে পরে দেখছিল কেমন লাগে। তারা অবশ্য নেয়নি। আর তিন নম্বর ক্রেতাই হলাম আমি। শো-রুমে ঘড়িটা যে কাস্টমার কেয়ার অফিসার আমাকে দেখিয়েছিলেন, ওদের বেলায় কিন্তু তিনি দেখাননি। দেখিয়েছিলেন লম্বা কালো মতন অন্য একজন কাস্টমার কেয়ার অফিসার। এটা অবশ্য আমার জানার কথা নয়। এখন রায়ের এই পাস্টোস্কোপ যন্ত্রে দেখলাম। আর আমাকে যে কাস্টমার কেয়ার অফিসার দেখিয়েছিলেন, তিনি মাঝরি উচ্চতার ফর্সা মতন এক তরুণ। এখন তাঁকেও দেখতে পেলাম। এই ঘড়িটা তিন বছর ধরে আমার হাতে শোভা পাচ্ছে।

এটা দেখে আমি অবাক হয়ে রায়ের দিকে তাকাতে সে হেসে বলল, “কী, এবার প্রত্যয় হল, নাকি আরো ডেমো দরকার?”

“আরো একটা। প্রত্যয় হয়েছে, তবে খুব কৌতূহল হচ্ছে।”

সে তার ঘর কাঁপিয়ে হা হা করে একটা অট্টহাসি দিয়ে বলল, “তা দেখো না। একটা কেন, যত খুশি দেখো। যত বেশি দেখবে তত বেশি প্রত্যয় বাড়বে।”

এবার দেখব আমার কলমটা।

সেটা একটা বাড়িতে অ্যাসেম্বল করা হয়েছে। তারপর তা কোম্পানিতে গিয়েছে। কোম্পানির নাম, মডেল নম্বর, ব্যাচ নম্বর ইত্যাদি পড়ার পর প্যাক হয়ে চলে এল ডিস্ট্রিবিউটারের কাছে। সেখান থেকে পাইকারি বিক্রেতার হাত ধরে চলে এল খুচরো বিক্রেতার কাছে। তারপর একদিন আমার এক বন্ধুবর কলমটা কিনে আমাকে উপহার দিলেন। এই হল কলমের ইতিহাস। মাস খানেক ধরে এটা আমার বুক পকেটে শোভা পাচ্ছে।

আমি এবার ক্ষান্ত দিলাম। অংশুমান বলল, “আরো দেখতে চাও, নাকি কফি খাবে? কফি বলব?”

“কফি বলো। তোমার মেশিন একটা জ্যান্ত বায়োস্কোপ।”

হা হা হা করে হেসে উঠে অংশুমান দয়ালকে কফি আনতে বলল।

কফি খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করলাম, “এ কী করে সম্ভব?”

অংশুমান বলল, “দ্যাখো, এ হল সময়ের বিভিন্ন তরঙ্গ আর আলোক তরঙ্গের সমন্বয়। এই আলোক তরঙ্গ সেই বস্তুর শরীর থেকে বিকীর্ণ হয়। এখানে বাইরের আলো বা অন্য কোনো তরঙ্গ এসে পড়লে পাস্টোস্কোপ ভুল রিডিং দেবে।”

“বাবা, এ যে দেখছি মারাত্মক সেনসিটিভ!”

“হবে না-ই বা কেন? তুমি দেখছ অতীতের ঘটনা। সেক্ষত্রে এখানে বর্তমানের সময়ের আলোক তরঙ্গের উপস্থিতিতে সমস্যা হবে বৈকি।”

সেই পাস্টোস্কোপই সপ্তাহ খানেক আগে জেনেভা সায়েন্স কংগ্রেসে স্বীকৃতি পেল। স্বীকৃতি পেল অংশুমানের দেড় বছরের কর্মফল।


অংশুমান এখানে এসেছে মূলত বিশ্রামের জন্য। প্রকৃতির সবুজ কোলে নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রাম নিতে। এই কারণে গরুমারা জঙ্গল দেখার পর সময় থাকলেও সাইট সিইং করিনি। সূর্য এখন অনেকটাই নীচে নেমে এসেছে, আর কিছুক্ষণ পরেই দিগন্তরেখা স্পর্শ করবে। আকাশে এখন কমলা আভা। বেশ নির্জন। অপুষ্ট নদী। এবার সেরকম বর্ষা হয়নি বলে এখনই নদীর বুক শুকিয়ে হাড়-পাঁজরা বেরিয়ে পড়েছে। শুধু মাঝখান দিয়ে একটা ক্ষীণ জলের ধারা প্রাণের স্পন্দন বাঁচিয়ে রেখেছে। চারদিকে ছোটোবড়ো পাথর ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই কেবল পাথর আর পাথর। মনে হচ্ছে যেন আমরা পাথরে ভূমিতে বসে রয়েছি।

অংশুমান তন্ময় হয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে ছিল। বললাম, “কী ভাবছ?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলল, “ভাবছি প্রকৃতির সহ্য গুণ।”

“হঠাৎ?”

ও দূরে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ওই দ্যাখো। নদীর বুক থেকে পাথর, বালি তুলে নিচ্ছে। আমরা মানুষরা দিতাম আমাদের বুক থেকে ফুসফুস, হৃদপিণ্ড তুলে নিতে? তারপর গরুমারায় দেখেছ কত প্রাচীন গাছ থরথরে লাশের মতন পড়ে রয়েছে। কেমন নির্বিকারে করাতের দাঁতের ঘর্ষণ সহ্য করছে। ভেবে দেখো তো। আমরা কি এরকম সহ্য করতে পারতাম?”

“অবশ্যই না।”

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। সত্যিই, প্রকৃতির কাছাকাছি না থাকলে বোঝা যায় না তাদের কষ্ট। যেমন মানুষের কাছাকাছি না থাকলে জানা যায় না তাদের দুঃখ।

নদীর শূন্য বুকে কানায় কানায় পূর্ণ করে যান্ত্রিক শব্দ তুলতে তুলতে পেছনেই একটা রেল ব্রিজের উপর দিয়ে এক্সপ্রেস ট্রেন ছুটে বেরিয়ে গেল। কতগুলো আদিবাসী মেয়ে-বউ দিনের শেষে জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে ফিরছে ওপারের বন থেকে। একটা বাচ্চাও দেখলাম তাদের দলে। তারা নদী পার হয়ে আবার এবারে উঠে কতদূর তাদের বাড়িতে ফেরে। তাদের পায়ে পায়ে চলার পথে নদীর ঘাসজমিতে মেঠো পথ তৈরি হয়ে গিয়েছে। আমরা নদীর বুকে অনেকটাই ভিতরে বসে ছিলাম। যে পাথরের ওপরে বসে ছিলাম, সেটাও বর্ষার সময় জলের নীচে থাকে বোঝাই যায়, কেননা তার গায়ে জলের সবজেটে দাগ রয়েছে।

দেখতে দেখতে সূর্য দিগন্তরেখার নীচে নেমে গেল। ড্রাইভার বলল, “স্যার, সন্ধ্যার পর এই জায়গাটা ভালো নয়।”

“চলো অংশুমান, ওঠা যাক।”

“চলো।” বলে অংশুমান নামতে গেলে ডাইভার বলে উঠল, “সাবধান স্যার, কাচ আছে।”

দেখলাম পায়ের কাছে একটা কাচের বোতল ভাঙা পড়ে রয়েছে। অংশুমান সাবধানে নীচু হয়ে একটা গোলমতন পাথর তুলে নিল। পাথরটা ক্রিকেট বলের মতন।

“একটা স্মৃতি নিয়ে যাই।” বলল অংশুমান।

ফেরার সময় বেশ কিছু জায়গায় কাচের বোতল ভাঙা দেখতে পেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ড্রাইভারের কথার সত্যতা প্রমাণিত হল। দেখি দুটো বাইক আর একটা প্রাইভেট কার নেমে আসছে নদীর রুক্ষ বুকে।



সকালে বাড়ি ফেরার পর দুপুরেই যে অংশুমানের ডাক পাব তা ভাবতেই পারিনি। ট্রেন প্রায় একঘণ্টা লেট করে শিয়ালদায় ঢোকে। রায়ের ড্রাইভারকে বলাই ছিল, সে এসেছিল আমাদের নিতে। এমনিতে দুপুরে আমার ঘুমানোর অভ্যাস নেই, কিন্তু সারারাতের ট্রেন জার্নিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তাই দুপুরে খেয়েদেয়ে একটু শুয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পরে রায়ের ফোন এল। কণ্ঠস্বরে বেশ উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। বলল, “যদি পারো এখনই একবার চলে এসো।”

“কেন, কী হয়েছে?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম আমি।

“ডায়না নদীর বুক থেকে যে পাথরটা কুড়িয়ে এনেছি, সেই পাথরটায় একটা রহস্য আছে।”

“মানে!”

“এর বেশি কিছু ফোনে বলা যাবে না। তুমি পারলে চলে এসো।”

“ঠিক আছে, আমি এখনই রওনা দিচ্ছি।”

ওর বাড়ি পৌঁছে দেখি মুখটা থমথমে। আমি যেতেই বলল, “আমি ভীষণ দুঃখিত এভাবে তোমায় বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য। তুমি যথেষ্ট ক্লান্ত আমি বুঝতে পারছি।”

“সে যাই হোক। কিন্তু ব্যাপারটা কী হে? কী এমন রহস্য পেলে ওই মামুলি একটা পাথরে?”

“এসো আমার সঙ্গে।” বলে সে আমাকে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গেল। তারপর ডায়না নদীর সেই পাথরটা তার নতুন আবিষ্কৃত পাস্টোস্কোপ-এর লেন্সের নীচে রেখে বলল, “ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখো।”

আমি ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে কালো কাপড়ে মুখ ঢাকলাম। প্রথমে সব অন্ধকার। তারপর ধীরে ধীরে ছবি ফুটে উঠতে লাগলো। একটা বড়ো পাথর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সেই অনিয়ত পাথরের একটা টুকরো জলের তোড়ে নদীর বুকে গড়াতে গড়াতে ক্ষয়ীভূত হতে হতে গোল আকার ধারণ করে বর্তমান আকারের হল। জলের তোড়ে তোড়ে নদীর ধারে চলে আসে। এবার একজন পাথরটা তুলে নিল। তারপর সেটা পিছনে ধরে এগিয়ে চলল। নদীর দিকে মুখ করে একটা লোক বসে দুলছিল। আগের লোকটা দ্বিতীয় লোকটার পিছনদিক দিয়ে লোকটার মাথার পিছনে জোরে একটা আঘাত করল। দ্বিতীয় লোকটা পড়ে গেল। তারপর প্রথম লোকটা পাথরটা নদীর জলে ছুড়ে ফেলে দিল। পাথরটার চারদিকে জল বইতে লাগল। তারপর একসময় নদীর জল নেমে গিয়ে জলের নীচের সব পাথর বেরিয়ে পড়ল। অংশুমান তুলে নিল পাথরটা।...

আমি ভিউ ফাইন্ডার থেকে চোখ সরালাম। আমার শ্বাস-গতি বেড়ে গিয়েছে। চোখের সামনে যেন একটা খুনের ঘটনা ঘটল। রায় আমার অবস্থা দেখে বলল, “আমারও প্রথমে এই অবস্থাই হয়েছিল।”

“এ তো সাংঘাতিক কাণ্ড!” আমি একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম।

“এবার বুঝলে কেন তোমাকে ডেকেছি? এটা দেখার পর আমি দু-চোখের পাতা এক করতে পারিনি।”



পরদিন আমি চলে গেলাম ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। সেখানে ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’-এর আগস্ট মাসের গোছাটা বের করলাম। একটা খবর আমার জানার খুব প্রয়োজন। সেটা আগস্টের পেপারে না পেলে আমাকে আরো দু-মাস পেছনে, মানে জুলাই-জুন মাসের খবরের কাগজগুলো ঘাঁটতে হবে। কেননা পাস্টোস্কোপে দেখা ঘটনাক্রম অনুযায়ী নদীতে জল ছিল, মানে বর্ষাকাল।

আগস্টের সবক’টা খবরের কাগজ আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও ওইধরনের কোনো খবর নজরে পড়ল না। আগস্টের গোছটা রেখে জুলাইয়ের গোছটা বের করে আনলাম। নাহ্‌, এবারও পেলাম না। এবার জুন মাসেরটা নামিয়ে আনলাম। কিন্তু ফল হল একই। কিন্তু এর আগে তো বর্ষা নামার কথা নয়! তবুও আমি আরো দু-মাস মানে, মে আর এপ্রিল মাসের গোছাগুলো দেখলাম। এবারও পেলাম না।

হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। মনটা খারাপ হয়ে রয়েছে। যেটা খুঁজতে গিয়েছিলাম সেটা পেলে ভালো হত। ঘটনার একটা কিনারা করতে পারতাম হয়তো।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। জলখাবার খেয়ে পাথরটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম। পাস্টোস্কোপে দেখার পর পাথরটা আমার কাছে নিয়ে এসেছি। ক্রিকেট বলের মতন সাইজ হলেও বেশ ভারী। সবজে সবজে ভাব রয়েছে পাথরটাতে। আমি হাতে নিয়ে ভাবতে লাগলাম কীভাবে ব্যাপারটার একটা কিনারা করব। এমন সময় রায়ের ফোন এল। ওকে সব জানালাম। শুনে হেসে বলল, “তুমি পারোও বটে। ফেলে দাও ওটা। দেখবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এ খুনে পাথরটা কেন যে রেখে দিয়েছ বুঝতে পারছি না।”

“থাক না। এমনিতে কোনো ক্ষতি তো হচ্ছে না। ফেলে দিলে তো দেওয়াই যায়।”

ঠিক এমন সময় পাথরটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে খানিকটা চলটা খসে গেল। দেখি ভেতরটা হলদেটে।

“এখন রাখছি। পরে কথা বলব।” বলে তাড়াতাড়ি করে ফোনটা কেটে দিলাম। পাথরটার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, শ্যাওলা সবুজ রংটা ওর প্রকৃত রং নয়। শ্যাওলা ধরা রং। আসল রং হলদেটে। তার মানে পাথরটা অনেকদিন জলের তলায় ডুবে ছিল। কতদিন হতে পারে... কতদিন হতে পারে... হ্যাঁ, গতবছরই তো উত্তরবঙ্গে এমন বৃষ্টি হয় যে বন্যার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। উত্তরের নদীগুলোয় হলুদ সংকেত জারি করা হয়েছিল। খুব সম্ভব গতবছরের কাগজে পেয়ে যাব।

একটা আশার আলো পেয়ে পরদিনই ছুটে গেলাম ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে এবং বলাই বাহুল্য, পেয়েও গেলাম কিছুক্ষণের মধ্যে। গতবারের জুলাই মাসের সতেরো তারিখের খবরের কাগজের পাতায় হেড লাইন ‘ডায়না নদীর ধারে রুপালি পর্দার অভিনেতার মরদেহ’। সঙ্গে বড়ো করে ছবি।

খবরটা আমি জানি। শুধু আমিই নই, অনেকেই জানে। জানে না শুধু এর পরিণতি। সব প্রিন্ট মিডিয়া আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াই একসময় ফলাও করে টানা কয়েকদিন কভার করেছিল। গতবছর ‘জীবনধারা’ নামে একটা মেগা সিরিয়ালের শুটিংয়ের জন্য ডায়না নদীর ধারে এসেছিল ওই সিরিয়ালের প্রোডাকশন টিম। সিরিয়ালের বেশ কয়েকটা পর্ব একটা জনপ্রিয় বাংলা চ্যানেলে দেখানো হয়েছে ইতিমধ্যেই। সিরিয়ালটা বেশ সাড়াও ফেলেছিল দর্শক মহলে। এসব ধারাবাহিকের যা হয় আর কী, ধারাবাহিক চলাকালিনই আগামী কয়েকটা পর্বের শুটিং চলতে থাকে। এরকমই শুটিং করতে এসেছিল ‘জীবনধারা’র কুশীলবরা আর প্রোডাকশন মেম্বাররা। ধারাবাহিকের দুই নায়ক অর্ক আর নীল। নায়িকা ঐন্দ্রিলা। অর্কর ভূমিকায় ছিল শুভব্রত গুহ আর নীলের ভালো নাম গৌরব মজুমদার। ঐন্দ্রিলা হয়েছিল মধুরিমা সরকার। টিভির দৌলতে তারা তখন বেশ পরিচিত মুখ। জনপ্রিয়ও বটে। তার মধ্যে অর্কর অভিনয় সবার মন জয় করেছে। ও খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে রূপালি জগতে। ফলে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে ওকে খাতির করার লোকও বেশি।

যাই হোক, সেই শুটিংয়ের তৃতীয় রাত থেকে অর্ক হঠাৎই নিপাত্তা হয়ে যায়। অনেক খোঁজ করেও ওকে পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে ময়নাগুড়ি থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করে শুটিং বন্ধ করে ফিরে আসতে হয় পুরো দলটাকে। এর তিনদিন পরে ডায়না নদীর ধারে অর্কর মরদেহ পাওয়া যায়। নদীতে পড়ে যাওয়া একটা মরা গাছের ডালে আটকে ছিল।

এই ঘটনায় পুরো রূপালি জগতে শোকের ছায়া নেমে আসে। মর্মাহত হয় দর্শকরাও। ময়না তদন্তে অর্কর শরীরে অ্যালকোহল পাওয়া যায় এবং মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশের অনুমান, অর্ককে পাথর জাতীয় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ খুনের মামলা রুজু করেছিল। তদন্ত চলছে অনেকদিন। কিন্তু প্রমাণের অভাবে পুলিশ কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ফলে অমীমাংসিত অবস্থায় কেস ফাইল ক্লোজ করে দেওয়া হয়। তারপর যা হয় আর কী, খবর ক্রমশ থিতিয়ে পড়ে আর খবরের লোকেরা নতুন ‘হট কেক’-এর খোঁজ করে। তাই ধীরে ধীরে এ-খবর বাসি হয়ে গেল।

আমি মোবাইলে একটা স্ন্যাপ নিয়ে নিলাম।

পরদিন ইউনিভার্সিটিতে এসে রায়কে সব বললাম। দেখালাম ফোনের ছবিটাও। ও হেসে বলল, “আমার সি.সি.জি-র ঘটনায় তোমাকে বলেছিলাম যে তুমি প্রোফেসর না হয়ে ডিটেকটিভ হতে পারতে। তোমার এতে বেশ ন্যাক আছে দেখছি। ঠিক খুঁজে বের করেছ। আবার জলজ্যান্ত প্রমাণও নিয়ে এসেছ।”

“কী করব বলো, রহস্যের গন্ধ পেলে আমার নাকটা কেমন সুড়সুড় করে।”

হো হো করে ও হেসে বলল, “বেশ বলেছ তো। নাকটা সুড়সুড় করে।”

আরো খানিকটা হেসে নিল সে। আমি বললাম, “কেস ফাইলটা তো ক্লোজ হয়ে গিয়েছে। আবার ওপেন করাতে পারলে হয়।”

রায় বলল, “সেটা তুমি বা আমি বললে হবে না। কোনো কেউকেটাকে দিয়ে কমিশনারকে বলালে হতে পারে।”

“কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিশ্বজিৎ সরকার আমার ব্যাচ-মেট। ওকে ফোন করলে কেমন হয়?” বললাম আমি।

“বেশ তো। উনি চাইলেই করতে পারেন।”

আমি আর দেরি না করে একটা ফোন করলাম। বিশ্বজিৎ ধরে বলল, “হ্যাঁ বল, কী খবর?”

“এই চলছে। তারপর? তোর কী খবর?”

“আর বলিস না। সবসময় চাপ আর চাপ।”

“চাপাচাপি কাণ্ড একেবারে।”

ও হো হো করে হেসে উঠে বলল, “তা যা বলেছিস, চাপাচাপি কাণ্ড।”

“যাক শোন, তোর সঙ্গে একটু জরুরি দরকার আছে। ভাবছি ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে আজ একবার যাব।”

কথাটা শুনে একটু গম্ভীর হয়ে গেল বিশ্বজিৎ। বলল, “কী ব্যাপার রে? কোনো প্রবলেম?”

“না না, এমনি। কোনো প্রবলেম নয়। আমি গিয়ে সব বলব’খন।”

“বেশ মোটামুটি কখন আসছিস সময়টা বল, আমি গেটে বলে রাখব।”

“এই ধর সাড়ে পাঁচটা-ছ’টা। আর হ্যাঁ, আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধু থাকবেন, নাম মিস্টার অংশুমান রায়।”

“ঠিক আছে, চলে আয়।”

“রাখছি তবে।”

“ওকে। বাই।”



সন্ধ্যার সময় কলকাতার রাস্তার কথা মাথায় রেখে আমরা হাতে একটু সময় নিয়েই বেরিয়েছিলাম। সময়মতন পৌঁছে গেটের সিকিউরিটি অফিসারকে আমাদের নাম বলতেই উনি আমাদের ছেড়ে দিলেন।

বিশ্বজিতের চেম্বারে ঢুকতেই ও বলল, “আরে আয় আয়। বোস।” তারপর অংশুমানকে বলল, “বসুন।”

আমি বললাম, “ইনি অংশুমান রায়।”

নমস্কার বিনিময়ের পর বিশ্বজিৎ বলল, “আপনার নাম আমি জানি। কিন্তু আজকেই প্রথম দেখলাম। এমনকি তোর কলিগ সেটাও আজই জানতে পারলাম। আমার খুব সৌভাগ্য যে আপনার মতন একজন মানুষ আমার চেম্বারে পা রেখেছেন।” তারপর আমাকে বলল, “কী নিবি, চা না কফি?”

“কফি।”

“বেশ।” বলে ও টেবিলের ওপর রাখা ঘণ্টি বাজাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন আর্দালি এলে তিনটে কফি আর পিৎজা আনতে বলল। তারপর বলল, “হ্যাঁ, এবার বল তোর প্রবলেমটা কী।”

আমি বললাম। সঙ্গে মোবাইলে তোলা ছবিটাও দেখালাম। সব দেখে ও শুনে বিশ্বজিৎ বলল, “তাহলে তো যন্ত্রটার একবার চাক্ষুষ দর্শন করতে হচ্ছে। যেতে হবে একদিন আপনার বাড়ি।”

“একদিন কেন, আজই চল না।” বললাম আমি। “এই তো কসবাতেই ওর বাড়ি।”

ও একটুক্ষণ কীসব ভেবে নিয়ে বলল, “ঠিক আছে, আমি যাব। শুভস্য শীঘ্রম।”

আর্দালি কফি আর পিৎজা নিয়ে এল। আমরা তা শেষ করে উঠে পড়লাম।


অফিস পাড়ায় সন্ধ্যা নেমেছে। পিল পিল করে অফিস-ফেরতা মানুষ শিয়ালদার দিকে হেঁটে চলেছে। বাস স্টপে স্টপে প্রতীক্ষারত যাত্রী।

রায়কে বিশ্বজিতের গাড়িতে উঠিয়ে আমি রায়ের গাড়ি নিয়ে আমার বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। কারণ, পাথরটা আমার কাছেই রয়েছে। ওটা নিয়ে রায়ের বাড়ি যাব।

রায়ের বাড়িতে পৌঁছে দেখি ওরা কফি খাচ্ছে। যন্ত্রটা টেবিলের ওপর রাখা। আমি পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই দয়াল আমার জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে এল। বিশ্বজিৎ বলল, “তুই কফি খা। আমাকে পাথরটা দে।”

“দাঁড়া লেন্সের নীচে বসিয়ে দিই।” বলে আমি পাথরটা সঠিক জায়গায় বসিয়ে ওকে দেখতে দিয়ে কফি খেতে লাগলাম।

দেখা হলে ও উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরে, এ যেন ফ্ল্যাশব্যাক দেখছি! সে যাই হোক, অর্ককে পিছন থেকেই চেনা যাচ্ছে। যে খুন হয়েছে, মানে সনাতনের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা মিলে গিয়েছে। আর যে মেরেছে তার আইডেন্টিফিকেশন...”

“ওর ডানহাতের মধ্যমাতে নখের গোড়ায় একটা তিল আছে।” বিশ্বজিতের কথা কেটে নিয়েই বললাম আমি।

আমার এই কথায় বিশ্বজিৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বলল, “তুই তো দেখছি গোয়েন্দাদের মতন অবজারভ করেছিস!”

এতক্ষণে মুখ খুলল রায়। বলল, “জার্মানিতে আমার আরেকটা যন্ত্র সি.সি.জি নিয়ে ধনকুবের স্টোবিলাসকে দুঁদে গোয়েন্দাদের মতন যেভাবে ধরাশায়ী করেছিল তা দেখে আমিও অবাক হয়েছিলাম। জার্মান গোয়েন্দা পুলিশকে ও-ই তো নেতৃত্ব দিয়েছিল সে সময়। তখনই বলেছিলাম, ও প্রফেসর না হয়ে যদি তদন্ত অফিসার হত তাতেও শাইন করত।”

“একদম ঠিক বলেছেন মিঃ রায়। যাই হোক, কেস ফাইল আবার ওপেন করতে হবে। আমি প্রস্তুত করব। এই কেস উদ্ধারে আপনার পাস্টোস্কোপের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য মিঃ রায়।”



দিন দুয়েকের মধ্যেই আমাকে আবার জলপাইগুড়ি যেতে হল। এবার আমি একাই এলাম। রায়কে আর এসব ঝুটঝামেলায় জড়ালাম না। ওর মতন বিজ্ঞান সাধকের জায়গা এটা নয়। বিশ্বজিৎই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমাকে আসতে হয়েছে এই কারণে যে, পাথরটা কোথায় পেয়েছি তার অবস্থানটা জানাতে। বিশ্বজিৎ আমার সঙ্গে একজন পুলিশের লোক দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি নিইনি।

ভোর পৌনে পাঁচটা নাগাদ নিউ ময়নাগুড়ি রোড রেল স্টেশন থেকে বেরনোর মুখে একজন পুলিশ অফিসার আমার দিকে এগিয়ে এলেন। নাম মিঃ দীপক বসুনিয়া। ময়নাগুড়ি থানা ওসি। ওঁর সঙ্গে পুলিশ ভ্যানে উঠলে উনি বললেন, “আপনি হোটেলে গিয়ে একটু বিশ্রাম করুন। ফ্রেশ হয়ে নিন, তারপর কাজ শুরু করা যাবে।”

ময়নাগুড়ি একটা ছোট্ট শহর গোছের এলাকা। এখনই একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব এসে গিয়েছে। এত সকালে ছোট্ট শহরটা যেন ছোটোদের মতনই শীতের কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছে।

গরুমারার রাস্তা দিয়ে যাবার সময় ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। এরকমটা যে হতে পারে তা আমার ধারণাতেই ছিল না। দু-পাশে সবুজ গহিন বনের মধ্য দিয়ে পিচ ঢালা মসৃণ রাস্তা দিয়ে আমাদের ভ্যানটা চলছিল। মুখ্যত এই রাস্তায় বন্য পশুদের করিডোর হওয়ায় গাড়ির গতি স্বাভাবিকভাবেই কমিয়ে ফেলতে হয়। বিশেষ করে ভোরবেলা আর রাত্রিবেলাতে। আমি দেখছিলাম ভোরের নরম আলোয় বনানীকে। ভোরের স্নিগ্ধ আলো তখনো পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেনি বৃক্ষশাখা-প্রশাখার ফাঁকে-ফোকরে আটকে থাকা জমাট বাঁধা অন্ধকারকে। হঠাৎ গাড়ি থমকে গেল। তারপর মিঃ বসুনিয়া গাড়ি পিছাতে শুরু করলেন।

“ব্যাপার কী?” অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

“মহাকাল।”

“মহাকাল! মানে?”

এর উত্তরে উনি মুখে কিছু না বলে আমাকে সামনের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে ইঙ্গিত করলেন। সামনে তাকাতেই যা দেখলাম তাতে আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। আবছা অন্ধকার বন-প্রান্তরের ভেতর থেকে বিশাল বিশাল জমাট বাঁধা অন্ধকারের মতন দুটো বিশালাকায় হাতি বেরিয়ে এল। আমরা যে হাতির পিঠে এলিফ্যান্ট সাফারি করেছি তার চাইতে অনেক বড়ো। একটা আবার দাঁতাল হাতি। তলোয়ারের মতন সাদা দুটো দাঁত আছে। হাতির পিঠে চড়ে যতটা না ভয় পেয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি ভীত হয়ে পড়লাম এ দৃশ্য দেখে। হঠাৎ দেখি হাতিদুটো দাঁড়িয়ে পড়ল। মিঃ বসুনিয়া একাগ্র চিত্তে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে গাড়িটি পিছিয়ে নিয়ে চলেছেন। শুনতে পেলাম ওর মুখে অস্ফুট শব্দ, “জয় বাবা মহাকাল, জয় বাবা মহাকাল।”

দেখি দাঁতালটা এক পা দু’পা করে এগিয়ে আসছে। আমি প্রমাদ গুনলাম। মিঃ বসুনিয়া গাড়ি পিছনোর গতি বাড়িয়ে দিলেন।  এক পা, দু’পা করে এগোতে এগোতে হঠাৎ থেমে গেল দাঁতালটা। শুঁড় তুলে একটা ডাক ছাড়ল। ঘন সবুজ প্রান্তরের আকাশ বাতাস যেন কেঁপে উঠল সেই বৃংহণে। চঞ্চল হয়ে উঠল পক্ষীকুল। মৃত্যুর অপেক্ষা করতে থাকলাম আমরা।

প্রতিমুহূর্ত যেন একেকটা যুগের সমান। সকালের হালকা ঠান্ডাতেও শরীর ঘেমে উঠল। এবার পিছনের হাতিটা ডেকে উঠল। আর তাতেই বোধ হয় দাঁতালটা ঘুরে গেল পিছনের হাতিটার দিকে। তারপর তার পিছু পিছু রাস্তা পার হয়ে রাস্তার অন্য পাশের বনের দিকে চলে গেল।

গাড়ি থামালেন মিঃ বসুনিয়া। দু-হাত কপালে তুলে বললেন, “জয় বাবা মহাকাল। জয় বাবা মহাকাল।”

কিছুক্ষণ আমরা ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। শুধু আমরাই নই, বেশ কিছু গাড়িও দেখলাম দাঁড়িয়ে পড়েছে। যতক্ষণ না হাতিদুটো আবছা অন্ধকারে পুরোপুরি মিলিয়ে গেল ততক্ষণ আমাদের অপেক্ষা করতে হল।

এরপর দু-দিকেই সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলেছি। বেশ খানিকটা গিয়ে মিঃ বসুনিয়া হঠাৎ গাড়িটা রাস্তার বাঁদিকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আমি ভয় পেয়ে বললাম, “আবার কী হল?”

“একটু প্রণাম করে আসি মহাকাল বাবারে।” বলে উনি ভ্যান থেকে নেমে বাঁদিকে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন। আমিও নামলাম। গাছের তলায় কয়েকটা কালো পাথর, প্রায় অর্ধেকটা মাটির নীচে প্রোথিত। তাতে মোটা করে সিঁদুরের লেপন দেওয়া। পুজোর ফুল ছড়িয়ে রয়েছে। ধূপ জ্বলছে। তার সুবাস মিলিয়ে যাচ্ছে সকালের নির্মল বাতাসে। জায়গাটা দেখেই বোঝা যায় যে নিয়মিত পুজো করা হয়। এই শিলাখণ্ডগুলি বাবা মহাকালের প্রতিমূর্তি। মিঃ বসুনিয়া বললেন, “খুব জাগ্রত এই মহাকাল বাবা। দেখলেন না, নাম করতেই হাতিগুলো ফিরে গেল।”

প্রাকৃতিক পরিবেশে, প্রাকৃতিক উপাদানে কল্পিত মহাকাল বাবার প্রতিমূর্তি। ভক্তি না থাকলে এ কি সম্ভব? যদিও ভক্তির মূল উৎস হল ভয়। এই কথা তো ইতিহাসেই স্বীকৃত।


স্নান-টান করে একটু বিশ্রাম নিয়ে সকাল দশটা নাগাদ আমি মিঃ বসুনিয়াকে ফোন করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভদ্রলোক ভ্যান নিয়ে চলে এলেন। সঙ্গে আরেক পুলিশ অফিসার রয়েছেন। মিঃ বসুনিয়া আলাপ করিয়ে দিলেন। ভদ্রলোকের নাম মিঃ রাজেশ সিং। অর্কর মৃত্যুর তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। বর্তমানে ধূপগুড়ি থানায় বদলি হয়েছেন।

যেখানে পাথরটা পেয়েছিলাম আমরা সেই জায়গাতে গেলেও গোল বাধল পাথরটা পাওয়ার জায়গা, অর্কর মরদেহ পাওয়ার জায়গা আর শুটিং স্পট, এই তিনটে জায়গা পরস্পরের থেকে বেশ দূর। অর্কর মরদেহ পাওয়ার জায়গা আর শুটিং স্পটে নিয়ে গেলেন মিঃ সিং। যদিও অর্কর মরদেহ পাওয়ার জায়গাতে সেই শুকনো গাছটা এখন আর নেই। এই তিনটে জায়গায় মিলে একটা অদৃশ্য ত্রিভুজ তৈরি করেছে।

প্রথমেই ধরা যাক শুটিং স্পট। আমরা পাথরটা যেখানে পেয়েছি সেখান থেকে শুটিং স্পট প্রায় পনেরো কিলোমিটার পশ্চিমে। আবার অর্কর মরদেহ যেখানে পাওয়া গিয়েছে সেই জায়গাটা শুটিং স্পট থেকে প্রায় বারো কিলোমিটার দক্ষিণে। স্বভাবতই মিঃ বসুনিয়া প্রশ্ন তুললেন নদীগর্ভে পাওয়া পাথরটা এ বিষয়ে কতটা সম্পর্কিত। প্রশ্নটা অমূলক নয়। যুক্তি আছে। এর উত্তর এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পাস্টোস্কোপ এক্ষেত্রে কি ঠিকঠাক কাজ করছে না?



দুপুরে হোটেলে ফিরে এলাম। এর মধ্যেই রায়কে ফোন করে ঘটনার আপডেট জানিয়েছি। বিশ্বজিৎ নিজেই ফোন করেছিল। ওকেও বললাম সংশয়ের জায়গাটা। দুপুরের খাবারটা হোটেলের ঘরেই দিয়ে যেতে বলেছিলাম। মাছ-ভাত। এখানে এরা কাতলা মাছকে ‘কাতল মাছ’ বলে। তা-ই অর্ডার করেছিলাম। অন্যান্য সবজি দিয়ে খাওয়ার পর মাছটা যখন বাটি থেকে ঢালছিলাম তখন মাছে দেওয়া মটরশুঁটিগুলো ঝোলের সঙ্গে ভাতে পড়ে গেল। এই দেখে হঠাৎ আমার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। এই সামান্য ব্যাপারটা আমি ভুলে গিয়েছিলাম! ধিক আমার স্মৃতিশক্তিকে। আমি এবছরের কথা ভাবছি কেন? ঘটনাটা তো গতবছরের এবং নদীতে বন্যা-প্রায় অবস্থা হয়েছিল। ফলে মরদেহ বা পাথর ভেসে বা গড়িয়ে আসতে পারে। হ্যাঁ, তাই-ই হয়েছিল। দেহটা ভেসে ছিল বলে অতটা চলে এসেছে আর পাথরটা জলের তলায় গড়িয়ে এসে বড়ো পাথরটাতে আটকা পড়ে গিয়েছে যেটাতে আমরা বসেছিলাম । কিন্তু অর্ক শুটিং স্পট ছেড়ে এত দূরেই বা গেল কেন? সঙ্গে কেউ ছিল, নাকি একাই গিয়েছিল? ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল, সেদিন আমাদের গাড়ির ড্রাইভার বলেছিল সন্ধের পর এই জায়গাটা ভালো নয় এবং আমরা আসার সময়েই দেখছিলাম বাইক আর গাড়ি ঢুকছিল নদীর বুকে। ব্যস, হিসেব মিলে গেল। অর্ক নিশ্চয় কারো সঙ্গে এসেছিল। নেশা করেছিল আর তারপরেই... এই কারণে অর্কর পেটে অ্যালকোহল পাওয়া যায়।

খেতে খেতে বিশ্বজিতকে ফোন করলাম ওর কোটা থেকে আজকেই উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে আমার ফেরার টিকিট কেটে দেওয়ার জন্য। এই ট্রেন ময়নাগুড়ি রুটে থামে না। জলপাইগুড়ি রুট থেকে ধরতে হবে।



পরদিন ভোরবেলা শিয়ালদা স্টেশনের নর্থ সেকশন থেকে বেরনোর সময় আচমকাই একটা ঘটনা ঘটল। ঘটনাটা এতটাই আকস্মিকভাবে ঘটল যে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই।

ট্রেন থেকে নেমে আমি নিজের মতন করে হাঁটছিলাম। প্ল্যাটফর্মের ধারে রেলের দিকে ভিড়টা কম ছিল বলে আমি ওদিকটা দিয়েই হাঁটছিলাম। সাউথ সেকশনের দিকে যাবার আগে হঠাৎই একটা পাগল আমার চোয়ালে সপাটে একটা ঘুসি মেরে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। আমি শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে গেলাম প্ল্যাটফর্মের নীচে। হাঁটুতে আর কোমরে খুব চোট পেলাম। বাঁ পায়ের হাঁটুটা যেন গুঁড়ো হয়ে গিয়েছে—এমন যন্ত্রণা হচ্ছে। কপালটা জোরে রেলে আঘাত পাওয়ায় কপাল ফেটে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। এমন অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে যে প্রাণ বেরোনোর উপক্রম হল।

দেখতে দেখতে লোকের ভিড় হয়ে গেল। অনেকে আমাকে তোলার জন্য নীচে নেমে এল। কিন্তু তুলবে কী করে? আমার যে নিজেরই উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। কোমর, মাথা যেন ছিঁড়ে পড়ছে। রেলওয়ে পুলিশ এল। আমাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে তোলা হল। তারপর ওরাই নিয়ে গেল বি.আর সিং হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে। ইমারজেন্সিতে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা করে আমাকে ভর্তি নেওয়া হল। হাঁটু-কোমরের এক্স-রে হবে আর মাথার স্ক্যান করে দেখবে গুরুতর কিছু ইনজুরি আছে কি না। আপাতত মাথায় ব্যান্ডেজ করে দুটো পেন কিলার ইঞ্জেকশন দিয়ে বেডে শুইয়ে দেওয়া হল। 

একটু বেলার দিকে রায় আর বিশ্বজিৎ দুজনেই ফোন করল। ওদের বললাম আমার অবস্থাটা। রায় ইউনিভার্সিটি যাওয়ার আগে দেখতে এল। সব শুনে আফশোস করে বলল, “কী দরকার ছিল নিজেকে এসবের মধ্যে জড়াতে? আবার যদি ময়নাগুড়িতে না যেতে আজ তাহলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না।”

“সবই কপালের ফের, বুঝলে?”

জানি এসব অদৃষ্ট-টদৃষ্ট রায় বিশ্বাস করে না। বলল, “স্ক্যান বা এক্স-রে কখন হবে?”

“দুপুর দুপুর তো বলল।”

“ঠিক আছে। বিকেলে আবার আসব। এখন চলি। সাবধানে থেকো।”

এর খানিক পরে বিশ্বজিৎ এল। সব শুনে বিরক্ত হয়ে বলল, “কলকাতার রাস্তায় এত পাগল আর ভিখারি থাকে যা অন্যান্য জায়গায় দেখা যায় না।” হঠাৎ আমার চোয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘুসিটা তোর ডানদিকের চোয়ালেই মেরেছিল, তাই না?”

“হ্যাঁ।”

“একজায়গায় ফেটে গিয়েছে। ঠিক আছে, বিকেলে পারলে একবার ঘুরে যাব। সাবধানে থাকিস।”

আমি বললাম, “আসার দরকার নেই। তুই সবসময় ব্যস্ত থাকিস... আমি এমনিতে ভালোই আছি।”

“ঠিক আছে, দেখছি। চলি রে।”


দুপুরে এক্স-রে, স্ক্যান দুটোই হয়ে গেল। কোনো মেজর ইনজুরি নেই। দু-দিন রেস্টে রেখে ছুটি দিয়ে দেবে।

বিকেলে রায় এল। শুনে বলল, “যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।”



বাড়ি ফিরে প্রথমদিন কোথাও বেরোলাম না। পুরো বেড-রেস্টে ছিলাম। অর্কর মৃত্যু রহস্যের ফাইলটা যে আবার ওপেন করা হয়েছে এবং আবার তদন্ত শুরু হয়েছে সেটা খবরের কাগজে বেরিয়েছে দেখলাম। অবশ্য খবরটা প্রথমেই কভার করেছে ‘উত্তরের সারাদিন’। ময়নাগুড়ি থেকে ফেরার সময় বিকেলে ট্রেনে পেপার হকার এই কথাটা বলেই পেপার বিক্রি করছিল। তা শুনে আমিও একটা পেপার কিনেছিলাম। ওতে আবার আমাদের ছবি বেরিয়েছে।

পরদিন রিজেন্ট পার্ক থানা থেকে একটা ভ্যান আমাকে নিতে এল। টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে ‘জীবনধারা’ ধারাবাহিকের পুরো প্রোডাকশন টিমটাকে ডাকা হয়েছে। আমাকে নিয়ে যাওয়ার কারণ খুনিকে সনাক্ত করা। যদিও এটা আমার কাজ নয়, তবুও বিশ্বজিৎ আমাকেই করতে বলে। ও পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী আমাকে নিয়ে। ও-ই সব ব্যবস্থা করেছে।

থানা থেকে যিনি এসেছেন, উনি রিজেন্ট পার্ক থানার সেকেন্ড অফিসার। নাম মিঃ শোভন পাল।

টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে একটা ঘরে আমাদের কাজের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। টেকনিশিয়ান টিম সহ পুরো দলটা বাইশ জনের। একজন একজন করে আমাদের ঘরে আসবে। প্রাথমিক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়া হবে সবার।

প্রথমেই এল ঐন্দ্রিলা, মানে মধুরিমা সরকার। মিঃ পাল একটা বড়ো খাতায় নাম, ঠিকানা লিখে নিয়ে কিছু প্রশ্ন করে দশ আঙুলের ছাপ নিলেন। এরপর এল নীল। তাকেও একইভাবে ছেড়ে দেওয়া হল। এরপর পার্শ্বচরিত্রেরা, তারপর টেকনিশিয়ান টিমের সদস্যরা একে একে আসতে লাগল। নয় নম্বরে যে এল, তার নাম বাদল দাস। ফিঙ্গার প্রিন্ট দেবার সময় তার হাত এতটাই কাঁপছিল যে প্রিন্ট ওভার ল্যাপ হয়ে যাচ্ছিল। পরপর তিনবারের চেষ্টায় মিঃ পাল সফল হলেন আঙুলের ছাপ নিতে।

দেখতে দেখতে পনেরো জনের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়ে গেল। কিন্তু ডানহাতের মধ্যমায় নখের ঠিক ওপরে তিলওয়ালা হাত দেখতে পেলাম না। আমি তো চিন্তায় পড়ে গেলাম। শেষে মিঃ বসুনিয়ার কথাই ঠিক হবে না তো? তাহলে আমার বন্ধুবরের আবিষ্কৃত পাস্টোস্কোপ ফেল করে যাবে! বিশ্বাস করতে পারছি না।

ষোলো নম্বরে যিনি এলেন তিনি একজন মেক-আপ আর্টিস্ট। নাম সমর দাশ। উনিও ওই টিমে ছিলেন। ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়ার সময় তার ডানহাতের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। এ যে সেই হাত, যার মধ্যমার নখের ঠিক ওপরেই কালো তিল আছে। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম একটা আংটি আছে মধম্যায়। কিন্তু আমার দেখা আঙুলে আংটি ছিল না।

এরপরেও অনেকক্ষণ কিছু চোখে পড়ল না। সতেরো নম্বরে যে এল, সে অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরাম্যান। এরও ডানহাতের মধ্যমায় একটা তিল আছে। প্রথম করের ঠিক ওপরে। কিন্তু আমার দেখা আঙুল বলে মনে হচ্ছে না।

মোট বাইশ জনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হল। কিন্তু খুনির কোনো হদিশ পাওয়া গেল না। সবাই একে একে চলে গেল। আমরাও আমাদের কাজ গুটিয়ে নিলাম। মিঃ পাল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী হল, খুনিকে পেলেন না?”

ওঁর কথায় একটু ব্যঙ্গ মিশে আছে। নিশ্চয় মিঃ বসুনিয়ার সঙ্গে আগেই এ বিষয়ে ওঁর কথা হয়েছে। আমি চুপ করে রইলাম। তাহলে মিঃ বসুনিয়ার কথাই ঠিক হল!

আমার মাথায় প্রবল দ্বন্দ্ব শুরু হল, খুনির মধ্যমার ঠিক কোথায় তিলটা দেখেছিলাম! দুজনের হাতে তিল দেখে আমার নিজেরই এখন সংশয় হচ্ছে। পাথরটা এখন লালবাজারে আছে। নইলে রায়ের বাড়ি গিয়ে আরেকবার দেখে মিঃ বসুনিয়া আর মিঃ পালকে যোগ্য জবাব দিয়ে দিতে পারতাম। অবশ্য রায় বা বিশ্বজিতকে ফোন করলেই জানা যাবে। কেননা ওরাও তো দেখেছিল।

আমি ফোনটা বের করে বিশ্বজিতকে ফোন করতে যাব, এমন সময় হঠাৎ আমার মাথায় এল, আরে, মেক-আপ আর্টিস্টের আংটিটা তো পরেও পরতে পারে। সেদিন শিয়ালদা স্টেশনে ঘুসি খেয়ে আমার থুতনির একজায়গায় ফেটে যায়। তার মানে ওই হাতে আংটি ছিল। আংটির পাথরেই থুতনি ফেটেছে। নিজে মেক-আপ আর্টিস্ট বলে ওই ভোরবেলায় মেক-আপ নিয়ে আসতে অসুবিধা হয়নি। তাড়াতাড়ি বললাম, “মেক-আপ আর্টিস্ট সমর দাশকেই অ্যারেস্ট করুন মিঃ পাল। ও-ই অর্কর হত্যাকারী।”


১০


স্টুডিও পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে গেল। এমন নিরীহ লোকটা, যার কথাবার্তায় এত বিনয়, আচার-আচরণে ভদ্রতা মিলেমিশে থাকে, সে-ই কিনা অর্কর খুনি!

হ্যাঁ। সমর দাশই অর্কর খুনি। গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশের কাছে সমর দাশ দোষ স্বীকার করেছে। পুলিশের জেরায় জানিয়েছে যে, শুটিংয়ের তৃতীয়দিন রাতে ও অর্ককে নিয়ে নদীর ধারে যায়। সেখানে দুজনে নেশা করার ভান করে অর্ককে আকণ্ঠ নেশা করায়। তারপর অর্ক যখন নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছিল না, শুয়ে পড়ছিল বারে বারে, তখন একটা বড়ো সাইজের পাথর তুলে পিছন থেকে ওর মাথায় আঘাত করে। তারপর ওর দেহটা নদীর জলে ফেলে দেয়। বর্ষায় নদীতে খুব জল ছিল। স্রোতও ছিল। দেখতে দেখতে অর্কর মরদেহটা ভেসে চলে যায়। তারপর পাথরটা জলে ছুড়ে ফেলে।

সমর দাশকে এই কাজ করার জন্য রাজ তিন লাখ টাকা দিয়েছিল। রাজ মানে রাজর্ষি সেন, বর্তমানে বাংলা সিনেমার বড়ো পর্দায় অশ্বমেধ ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে। অর্ক খুব তাড়াতাড়ি উঠছিল। এর মধ্যেই বড়ো পর্দায় কাজেরও দুটো কন্ট্রাক্ট সাইন হয়েছিল। রাজ অর্কর এই উঠে আসা ভালো চোখে দেখেনি, সে প্রমাদ গুনেছিল।


বিশ্বজিৎ আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানাল। আর আমার কাছ থেকে রায়ের ফোন নম্বরটাও নিয়ে নিল। আগেরদিন নেওয়া হয়নি। ওর ইচ্ছা ও নিজে রায়কে ফোন করে ধন্যবাদ জানাবে। রায়ের আবিষ্কৃত যন্ত্রের জন্যই একটা খুনের কেস সমাধান হল। সঙ্গে এও জানাল যে, আমাদের কোর্টে যেতে হতে পারে সাক্ষ্য দিতে। এমনকি প্রয়োজনে পাস্টোস্কোপটাও নিয়ে যেত হতে পারে। আমি বললাম, “তথাস্তু।”


রায়ের বাড়িতে কফি খেতে খেতে কথা হচ্ছিল। সব শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রায় বলল, “রূপালি পর্দার আড়ালে যে এরকম কালা কাহিনি থাকতে পারে তা ভাবাই যায় না। অথচ পর্দায় মুখগুলো কত সুন্দর লাগে দেখতে।”

আমি বললাম, “সেটাই। পর্দার আড়ালের খবর আমরা কতটাই বা জানি। যাই হোক, তোমার পাথরটা এখন পুলিশের জিম্মায় রয়েছে। কোর্টে প্রোডিউস করা হবে।”

ও বলল, “ভালোই হয়েছে। হত্যার ওই হাতিয়ারটা ঘরে না রাখাই ভালো। তার চাইতে তুমি যখন গিয়েছিলে, মনে করে ছোটো দেখে একটা পাথর নিয়ে আসতে পারতে। সেটাই হত আমাদের গরুমারা-ডায়না ভ্রমণের স্মৃতি।”

আমি বললাম, “তা আর বলতে। একটা সুন্দর পাথর আমি ইতিমধ্যেই নিয়ে এসেছি। এই যে সেটা। তোমার কাছেই রেখে দাও।”

ব্যাগ থেকে বের করে পাথরটা ওর হাতে দিলাম। পাথরটা গোল নয়, ঠিক যেন পায়রার ডিম। সবজে সবজে রঙ। রায় পাথরটা হাতে নিয়ে বলল, “বাহ্‌, বেশ সুন্দর তো পাথরটা। কিন্তু এই সুন্দরের পশ্চাৎপট আবার ভয়ংকর কিছু হবে না তো?”

“আশা করি এবার তা হবে না।”

“না হওয়াই ভালো। ঈশ্বর যেন তাই-ই করেন।”


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সুমন দাস


No comments:

Post a Comment