গল্প: চোর নন্দ পাটারি এবং আমরা: মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ


সেদিন বাজার ফিরতি দেখা হয়ে গেল নন্দ পাটারির সঙ্গে। অনেকদিন বাদে। অন্তত বছর চার-পাঁচ পর। শেষ দেখা হয়েছিল সেই ভান্ডারটিকুরি স্টেশনে। বউ-ছেলে, আর পোঁটলাপুটলি সমেত। দেখেই বিব্রত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “কী হে, যাচ্ছ কোথায়? সপরিবার? এমন পোঁটলাপুটলি কাঁধে?”

হাসতে গিয়েও হাসেনি যেন সেদিন নন্দ। মুখটাকে আমসিপারা করে বলেছিল, “চলি যাচ্চি দাদা এই তল্লাট ছাড়ি। বাপ-ঠাকুদ্দা চোদ্দ পুরুষের ভিটা ছাড়ি।”

আমি অবাকই হলাম। কপালে সোয়া লক্ষ ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞাসা করলাম, “কোথায়? আশ্চর্য! কেন?”

ফোঁস করে অমনি একটি বড়ো নিঃশ্বাস ত্যাগ করল নন্দ। “কিচু মনে করবেননি দাদা, ওই পূর্বস্থলী থানার বড়োকুত্তাটির জ্বালায় এবে বনে যাচ্চি বলতি পারেন। দেশত্যাগী হতিচি।”

আমি বিস্মিত হয়ে চোখদুটি ছানাবড়া করে তাকিয়ে আছি তখনো ওর মুখের দিকে। ‘পূর্বস্থলী থানার ওই বড়োকুত...’ বলতে গিয়েও জিভে আটকাল আমার। তবে বুঝলাম, ওর টার্গেট থানার বড়োকর্তা, মানে বড়োবাবু।

“কেন? কী হয়েছে? কী করেছেন উনি তোমার, নন্দ?”

আমার প্রশ্নের ইন্ধন পেয়ে কিঞ্চিৎ উত্তেজিত হল ও মনে মনে। ঠোঁট ফাঁক করে বলতেও যাচ্ছিল উত্তরে কিছু একটা। হয়তো বিস্তারিত করেই। কিন্তু লম্বা হুইসেলটি দিয়ে ততক্ষণে হাওড়া-কাটোয়া আপ এসে দাঁড়িয়েছে স্টেশনে।

“পরে একদিন সব বলব’খন দাদা।” বলে ট্রেনে লাফিয়ে উঠল নন্দ।

ট্রেনের কামরার দিকে তাকিয়ে আমিও আশ্বস্ত করলাম ওকে, “ঠিক আছে ভাই। সাবধানে যেও।”

আমার দিকে তাকিয়ে আজ পূর্ণ চাঁদের মতন হাসল নন্দ। যদিও বাস্তবিক অত ঔজ্জ্বল্য নেই এই হাসিতে। থাকার কথাও নয়। পান-দোক্তা-খৈনি খেয়ে, বিড়ি ফুঁকে একটি দাঁতও সাদা নেই যে আর ওর। উপরন্তু ঠোঁটদুটিও মরচে পড়ে তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে। তবে আর প্রকৃত হাসির মর্ম কী করে ছড়ায় ওই বদনে? তবু ওর আন্তরিক হাসি স্পর্শ করল আমায়।


***


“নন্দ যে! অনেকদিন পর। তারপর, খবর কী? ভালো তো? কোথায় আছ যেন এখন? সেই যে চলে গেলে, লোটা-কম্বল গুটিয়ে, মনের দুঃখে।”

নন্দ কাঁচুমাচু ভাব করল। “এঁজ্ঞে, ভালোই আচি আপনাদির কিরপায়। গুপ্তিপাড়াতে গিয়ে উটেচিনু। আচি ওইকানেই। শালি-ভায়রার দ্যাশ। তাপ্পর আপনি কেমন দাদা? ভালো আচেন তো? আপনার নেকা-পত্তর? আমায় নিয়ে আরো নিকেচেন বুজি কিচু?”

আমি আহ্লাদিত হলাম। বাব্বা! ওকে নিয়ে লিখি-টিখি, সেকথাও মনে রেখেছে দিব্যি! উজ্জ্বল হেসে বললাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বেশ ভালো আছি। লেখা-পত্তরও চলছে খুব। তোমায় নিয়ে লেখার কি খামতি আছে আমার? তুমিই যে আমার গল্প-উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হে। গ্রেট হিরো। মানে নায়ক।”

লজ্জায় লজ্জাবতী লতাটি হল অমনি নন্দ। হাত কচলায়। “কী যে কন দাদা!”

“এই দ্যাখো, মিথ্যের কী আছে এতে? পাঠকমহলও এখন জানে যে, লেখক দিবাকর দত্ত মানেই নন্দ পাটারি সিরিজ। এবছর ‘শিশু ভারতী’ পুজোসংখ্যার আমন্ত্রণপত্রেও এবারে একই কথা লেখা ছিল। ‘শিশু ভারতী: শারদীয়া ১৪২৩-এর জন্য একটি হাসির গল্প পাঠান। অবশ্যই নন্দ পাটারি সিরিজের’।”

শুনে দাগ-ছোপ পড়া দাঁত নিটকে হাসল আবারও নন্দ। “একদিন শোনাবেন ত একটি। কত কত নেকা নেকেন আমারে নিয়ে, অথচ আমি মুখ্যু, একটু পড়তি পারি না।”

আমি আশ্বাসবাণী শোনাই ওকে, “বেশ, শোনাব একদিন। তাছাড়া তোমার ছানাটি এবারে কত বড়ো হল? ইস্কুলে ভর্তি হয়েছে, না? আরো একটু বড়ো হোক, তখন ও-ই তোমায় পড়ে শোনাতে পারবে।”

আশেপাশেই কোথায় কোন এক কুটুম বাড়িতে এক দরকারে এসেছে নন্দ। কথা শেষ করে অন্য পথে বিদেয় হল ও। ওর দিকে তাকিয়ে কেমন একটা মায়াও হচ্ছিল যেন আমার। চোর হোক, লোকে খারাপ বলুক, তবু আমার চোখে তো খারাপ হতে পারে না কখনো ও। ও-ই যে আমার হিরো।

একবার দারুণ একটা উপকার করেছিল নন্দ আমার। তখন পোলের হাটেই থাকত ও। মাঝেমধ্যেই দেখা হয়ে যেত বাজারে গেলে। অথবা এখানে ওখানে ঘুরতে বেরোলেও। রাস্তায় দেখা হতে একদিন আমার পথ আগলে দাঁড়াল ও। ঠোঁটের কোণে এক ছিলিমমতো হাসি। বলল, “একটা কতা ছেল দাদা।”

“কথা, আমার সাথে! কীসের?” আমি আকাশ থেকে পড়ার ভান করি। ভয়ও পাই ঈষৎ মনে মনে। পাছে ধার-টার চেয়ে বিব্রত করে। অভাবী কিনা। এদের বিশ্বাস নেই কোনো। শেষে ওর পেছন পেছন ঘুরতে ঘুরতে আয়ু ক্ষয় করি আর কী।

ভুরু কুঁচকে তাকাল ও। বলল, “একটা জিনিস হাতে এয়েচে দাদা। তিনখান বই। কিন্তু আপনার কাজে লাগবে বলি মনে হতিচে আমার।”

“বই! কার বই! কীভাবে এল তোমার হাতে?” আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করতে থাকি।

নন্দ আবারও হাসল। চোখ পিটপিট করল। “দেব’খন।”

দিলও একদিন। আমার বাড়িতে এসেই। বই তিনটির দিকে তাকিয়ে আমার চক্ষুস্থির এবং বাকরুদ্ধ। কথা সরল না অনেকক্ষণ।

ততক্ষণে আমার আপাত স্তব্ধ হওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে ও। “কী, ঠিক ধরিচি কি না? আপনার কাজে লাগবেনি এ? বলেছিনু না?”

আমি হাবার মতো মাথা নাড়ি ওর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে। ‘কিন্তু এ-বই তুমি কোথায় পেলে ভাই? বইগুলো যে আমারই।’ বলতে গিয়েও ব্রেক কষলাম। একটা চোরের সামনে সব সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলাও ঠিক নয়।

এতক্ষণে পরিষ্কার হাসল নন্দ। ঠোঁট উপচিয়ে যাকে বলে। “কী বলব দাদা, আপনার কাচে আমি ঋণী। আমারে লয়ে কত কী নেকাজোকা করেন। সে ত ভালোবাসেন বলিই? তা ভাবলুম, আপনারে একটু উপকার করি তবে সুযোগ পেয়ে।”

আরো বলতে থাকে নন্দ। আমি ওকে বাধা দিই না।

“আসলে, বই চুরি করতি ত ঢুকিনি সেতা। ইতিউতি টাকা খুঁজচিলুম হন্যে হয়ি। শেষে কোতাও কিচ্চুটি না পেয়ে বইগুলি বগলদাবা করনু। একপোকার রাগের চোটেই কতি পারেন। তাপ্পর বাড়ি এসে ভাবলুম আপনার কতা।”

বইগুলো হাতে পেয়ে যারপরনাই খুশি হলাম আমি। উলটেপালটে দেখতে লাগলাম একটা একটা করে। ততই আমার বিস্ময়ে হতবাক হওয়ার পালা। আশ্চর্য! এর সবক’টি বই আমারই। দস্তুরমতো আমার নামও লেখা রয়েছে সব বইতে। কবে কোথা থেকে কিনেছিলাম, উল্লেখ রয়েছে তারও। কিন্তু কার বাড়ি চুরি করতে গেছিল তবে নন্দ? কে-ই বা হাপিস করেছিল আমার এ অমূল্য গ্রন্থাবলী?

উত্তরও মিলল অবশেষে।

বইগুলি সব হাপিস করেছিলেন বিদ্যানগরের ননীমাধব। একটিতে নিজের নামটিও লিখে রেখেছেন বেশ স্টাইল করে। অথচ কী আশ্চর্য! কতদিন ও-বইগুলি খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়েছি। ছিঃ ছিঃ! ননীবাবু বন্ধু সেজে গল্প করতে এসে এত্তগুলো বই গায়েব করলেন আমার? এঁরাও ভদ্রলোক কখনো! নাকি শিক্ষিত চোর! কিন্তু ‘চোর’ সাব্যস্ত করে শাস্তির আয়োজন করব কিছু, তার উপায়ান্তর নেই। কেননা, ওই অপবাদটি আমাদের সমাজে কেবলমাত্র মুখ্যুসুক্কু নন্দ পাটারিদের জন্যই। অমন শিক্ষিত মানুষজনদের মানায় তা কখনো?


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সুমন দাস


No comments:

Post a Comment