গল্প: নৈনিতালে তিতলি: শ্রীপর্ণা ভট্টাচার্য


সকালে ঘুম ভাঙতেই জানালা দিয়ে সবুজের মেলা দেখতে পেল তিতলি। সবুজে ঘেরা পাহাড়, তবে মাটির রং যেন একটু অন্য ধাঁচের। খানিকটা পাথরের মতন। ট্রেন ছুটছে হু হু করে তার পাশ দিয়ে। এই ট্যুরটা ওর কাছে একদম আলাদা। দাদু, ঠাকুমা, বাবা, মার সঙ্গে বাড়ি থেকে এতদূরে এই প্রথম। প্রতিবার গরমের ছুটি বাড়িতেই কাটে তিতলির। বাবা-মার অফিস, কাজেই ঘুরতে যাওয়া সম্ভব নয়। এবার সে জেদ ধরেছিল ঘুরতে নিয়ে যেতেই হবে। প্রথমটায় বাবা নিমরাজি হলেও পরে মেনে নিয়েছে ওর আবদার। কিন্তু কেবল বাবা-মা নয়, ওর সঙ্গে চাই দাদু-ঠাকুমাকেও। অবশেষে দাদু আর ঠাকুমাও রাজি হলেন। এবার প্রশ্ন হল, যাবে কোথায়? তিতলির ইচ্ছে কাছে নয় দূরে যেতে হবে। সমাধানও অবশ্য সে-ই দিল। হঠাৎ ওর মনে পড়ে গেল ইন্দুমাসির কথা। ইন্দুমাসি মার পিসতুতো বোন। থাকে নৈনিতালে, ট্যুরিজমের ব্যাবসা। একাই থাকে। নৈনিতালে ওর বিশাল হোটেল আছে। অনেকবার যেতে বলেছে। তাই ঠিক হল, এবার গরমে নৈনিতালে যাওয়া হবে। ওদের যাত্রা শুরু হল। তিতলি জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল।

“এরপরের স্টেশনে নামতে হবে, ইন্দু গাড়ি পাঠিয়েছে। ড্রাইভারের নাম সুলতান।”

বাবার কথায় সবাই তৈরি হতে লাগল।

বেলা সাড়ে দশটায় ট্রেন এসে থামল কাঠগুদাম স্টেশনে। বাবাকে ইন্দুমাসি যদিও সুলতানের ছবিসমেত ফোন নম্বর পাঠিয়ে দিয়েছে হোয়াটস অ্যাপ-এ, তাও সুলতানভাইকে খুঁজতে বেশি সময় লাগল না ওদের। কারণ, স্টেশনটা ছোটো আর লোকসংখ্যাও বেশ কম।

এটাই হল কাঠগুদাম স্টেশন। চারদিকে পাহাড় আর একটা হালকা ঠান্ডা আবহাওয়া। আকাশটা ঝকঝক করছে। তিতলির মনে হল গরমকালেও শরৎ এসে গেছে।

সুলতানভাইয়ের মাঝারি গড়ন, পুরু গোঁফ, খানিকটা দেখতে ওর পাশের বাড়ির বুটুনদাদার মতন। ওদের মোট তিনখানা সুটকেস আর একটা খাবার-ব্যাগ। সুলতানভাই সেসব গাড়িতে রাখতে গেল। বাবার সঙ্গে বেশ আলাপ হয়ে গেছে সুলতানভাইয়ের। খুব হিন্দিতে কথা বলছে দুজনে। ধীরে ধীরে ওরাও উঠে পড়ল গাড়িতে। সামনে সুলতানভাই চালকের আসনে, পাশে বাবা আর তিতলি, পিছনে মা, ঠাকুমা আর দাদু।

“কিতনা টাইম লাগতা নৈনিতাল?”

ঠাকুমার হিন্দি শুনে হিহি করে হেসে উঠল তিতলি।

সুলতানভাই বেশ আমুদে মানুষ বোঝাই যাচ্ছে। হাসিমুখে জবাব দিল, “আধাঘণ্টা মাজি।”

পাহাড়ের উপর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে ওদের গাড়ি তরতর করে উপরে উঠছে। দু-পাশে গাছপালা, সবুজ বন। পাহাড় তিতলি আগেও দেখেছে, তবে এই পাহাড় দেখার মজাই আলাদা। হাজার হোক, দাদু-ঠাকুমাকে পাওয়া গেছে।



ইন্দুমাসির হোটেলটা একদম তাল মানে হ্রদের ধারে‌। বিশাল হোটেল, সামনে ফুলের বাগান। নৈনিতাল শহরটা ছোটো, কিন্তু খুব পরিষ্কার। একদম বিদেশের মতন। ইন্দুমাসি ওদের জন্য একদম নৈনিতালের দিকে মুখ করা তিনতলায় দুটো রুম রেখেছে। জানালা খুলেই সামনে নীল জলের হ্রদ আর পিছনে পাহাড়। অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। হ্রদের চারপাশে আবার সুন্দর বাঁধানো রাস্তা। এখানে বোটিং হয়।

সুলতানভাই ওদের জিনিসপত্র সব রুমে রেখে দিয়ে বাবাকে বলল, “আপকো হম ঘুমায়েঙ্গে ইয়াহা।”

ইন্দুমাসি বলল, “হ্যাঁ, সুলতান তোমাদের সবকিছু দেখিয়ে দেবে, কোনো অসুবিধা হবে না। আজ রেস্ট নিয়ে নাও, কাল থেকে ঘুরতে যাবে। জলখাবারের কথা বলে দিচ্ছি, আগে চা খাও।”

কথা হচ্ছিল রুমের সামনের বারান্দায় রাখা সোফায় বসে। ইন্দুমাসি সব ব্যবস্থা করে নীচে চলে গেল, সুলতানভাইও বিদায় জানিয়ে চলে গেল।

“এখানে বেশ ঠান্ডা কিন্তু।”

দাদুর কথার উত্তরে ঠাকুমা বলল, “ঠান্ডা হলেও কী সুন্দর জায়গা!”

মা বলল, “এই নৈনিলেকের জল নাকি কর্পোরেশন থেকে সারা শহরে সরাবরাহ করে। কী অদ্ভুত না?”

দাদু বলল, “গল্পে আছে, সতী স্বর্গে যাওয়ার সময় সাত জায়গায় পা ফেলে যান আর তাই এই সাত লেকের সৃষ্টি। সতীর একান্ন পীঠের এক পীঠ নৈনিতাল।”

ঠাকুমা সঙ্গে সঙ্গে কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করে বলল, “জয় মা।”

“উফ্! অমনি শুরু করে দিলে! আরে, এসব গল্প, সত্যি নয়।”

দাদুর দিকে চোখ কুঁচকে ঠাকুমা বলল, “তুমি থামো।”

তিতলি হিহি করে হেসে উঠল। ঠাকুমার পুজো আর দাদুর রাগ, এসব তার বড্ড পছন্দের।

“চা শেষ করে স্নান করে নাও সবাই। ইন্দু ফোন করেছিল, ব্রেকফাস্ট রেডি।” বাবা ইতিমধ্যে স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে।



সিজন টাইম বলে নৈনিতালে এখন বেশ ভিড়। দুপুরের খাবার খেয়ে সবাই যে যার রুমে ঘুমিয়ে পড়লে তিতলি মার পাশ থেকে চুপিচুপি নেমে রুমের বাইরে যাবার প্ল্যান করছিল।

“সামনের লাউঞ্জে থাকবে। একা একা কোথাও যাবে না।” চোখ বুজেই মা বলে উঠল।

তিতলি হেসে রুমের বাইরে লাউঞ্জে এল। লাউঞ্জ বেশ বড়ো আর ছোটো ছোটো ছাতার তলায় গোল করে সোফা দিয়ে বসার জায়গা। ওর হাতে ছোট্ট একটা ডিজিটাল ক্যামেরা, গতবছর মিলুপিসি ওর জন্মদিনে দিয়েছে। সেটা নিয়ে একদম সামনের ছাতার নীচে সোফায় বসল তিতলি। নীল জলের লেকটা দুর্দান্ত দেখাচ্ছে। দুপুর বলেই হয়তো লাউঞ্জে লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। লেকে বোটিং করছে কিছু মানুষ। তিতলি বেশ ক’টা ফটো তুলল। হঠাৎ একটা চিৎকার শুনে পাশে তাকিয়ে দেখে, ওর ঠিক পাশের ছাতার নীচে দুটো লোক বসে আছে। এদের মধ্যে একজন বেশ উত্তেজিত।

“হোয়াই ডোন্ট ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড? আই হ্যাভ পেড দ্য মানি। আমার মাল চাই যেভাবেই হোক।”

দ্বিতীয় লোকটার চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা, রং ফর্সা, লালচে চুল। সে শান্ত স্বরে বলছে, “পুলিশ এখন অ্যালার্ট হয়ে গেছে। এই অবস্থায় মাল পাবে কী করে? ইউ হ্যাভ টু ওয়েট ফর এটলিস্ট টু ডেজ। আমি দেখছি।”

দুটো লোকই বাঙালি। প্রথম লোকটার মাথায় টাক, চোখে সানগ্লাস, গোঁফ আছে। সে এবার বলল, “আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি এক্সকিউজ। নেক্সট উইকে দিল্লিতে মাল নিয়ে যেতে হবে, পার্টি ওয়েট করছে। সো হারি-আপ। পুলিশকে কন্ট্রোল করার দায়িত্ব তোমার, বোস।”

তিতলি আড়চোখে লোকদুটোকে ভালোভাবে দেখছিল। এমন সময় ‘কী দাদু?’ শুনে চমকে দেখল দাদু ওর পাশে এসে উপস্থিত। একটু ধাতস্থ হয়ে তিতলি বলল, “এই যে, ফটো তুলি।”

ততক্ষণে লোকদুটো লাউঞ্জ থেকে উঠে নীচে নেমে গেছে। দাদু ওর পাশে বসে গল্প শুরু করে দিল। কিন্তু তিতলির মনে ওই লোকদুটোর কথাই ঘুরছে খালি। কী এমন জিনিস যার জন্য পুলিশকেও কন্ট্রোল করতে হবে? বে-আইনি কিছু নয়তো?



বিকেলে লেকের জলে বোটিং করতে গিয়ে বেশ মজা হল। ঠাকুমা তো সর্বক্ষণ চোখ বন্ধ করে ‘জয় মা, জয় মা’ করে গেলে। আর দাদু বকেই অস্থির। “এত ভয় যখন, বোটিং করতে এলে কেন?”

তিতলির হাসি থামে না। আনন্দের চোটে মাথা থেকে লোকদুটো উধাও হয়ে গেল।

রাতে ডিনার টেবিলে গরম গরম মাংসের ঝোল দিয়ে রুটি খেতে খেতে তিতলি আবার দেখতে পেল দুপুরের সেই লোকটাকে। সঙ্গে যদিও বোস লোকটা নেই। একাই খাচ্ছে ওদের পাশের টেবিলে। ইন্দুমাসি এসে ওদের সঙ্গে কথা বলে গেল, ‘ভালো করে খাবে, রান্না ভালো হয়েছে কি না’ ইত্যাদি।

ওমা! ওদের টেবিল থেকে এগিয়ে পাশের টেবিলের লোকটাকেও ইন্দুমাসি হেসে হেসে বলল, “রায়বাবু, অসুবিধা হচ্ছে না তো?”

অর্থাৎ, লোকটার পদবি রায়। রায়বাবুও মাথা নেড়ে কী যেন বলল।

রাতে শুতে যাবার আগে ওরা সবাই লাউঞ্জে বসে নৈনি লেক আর পিছনের পাহাড়ের আলো দেখছিল। বাবা, মা, দাদু, ঠাকুমা সবাই গল্প করতে ব্যস্ত। এই সময় তিতলি ঘুরে বেড়াচ্ছিল এদিক ওদিক। লাউঞ্জের কোনার দিক থেকে নৈনিদেবীর মন্দিরের আলো দেখা যায়। সকালে ইন্দুমাসি বলছিল, তাই ওদিক থেকে রেলিংয়ের ধারে গিয়ে সেই আলো দেখার চেষ্টা করছিল ও। হঠাৎ সেখান থেকে পাশের একটা রুমে চোখ গেল তিতলির। রুমের জানালা খোলা, আলো জ্বলছে। লাউঞ্জের একদম গা-ঘেঁষা রুম এটা। ভিতরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে রায়বাবু নামের লোকটা, হাতে ফোন। কাউকে ফোন করার চেষ্টা করছে। লোকটা তিতলিকে খেয়াল করেনি, কারণ তিতলি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে আলো বেশ কম।

“বোস, আমায় সাহেব তাড়া দিচ্ছে, মাল না পেলে আমাকে খুন করবে বলছে।

...

“তাহলে কাল সকালে? আচ্ছা, আমি রেডি।”

...

“অত সকালে পুলিশ থাকবে না?”

...

“ওকে।”

কথা শেষ করে রায় ফোন রেখে দিল।

“তিতলি!”

বাবার ডাকে ফিরে এল তিতলি ওখান থেকে। ইন্দুমাসিও এসেছে গল্প করতে। “তাহলে কাল সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ো তোমরা, ভীমতাল সবথেকে বড়ো তাল এখানে। পথে সুখা তাল আছে আর রাজভবন। এই ক’টা দেখে ফিরে এসো। এইজন্য বলছি, হাতে তো আরো চারদিন আছে।”



সারারাত তিতলি ভাবতে থাকল, কী এমন জিনিস যা নেওয়ার জন্য রায় লোকটা এরকম পাগলামি করছে, আবার সাহেব বলে একজন তাকে মেরে ফেলবে বলছে? কিন্তু এসব কথা কাউকে বলাও যাবে না। মা শুনলেই বকা দেবে, ‘পরের কথা শুনতে নেই কতবার বলেছি!’ এসব বলবে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে তিতলি ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙল মার ডাকে সকাল ছ’টায়। ওরা সাতটার সময় সুলতানভাইয়ের সঙ্গে ভিমতাল দেখতে যাবে। দুপুরে নৈনিতালের বিখ্যাত এক ধাবায় খাবে।

সবাই মোটামুটি রেডি। ব্রেকফাস্টে গরম গরম অমলেট আর টোস্ট খেয়ে সুলতানভাইয়ের গাড়িতে উঠে পড়ল। হোটেলের এর সামনে সুলতানভাইয়ের গাড়ি ছাড়াও বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কিছু ফ্যামিলি এখনই বের হয়ে যাচ্ছে ঘুরতে ওদেরই মতন। সেই রায়বাবুরও তো সকালে বের হবার কথা। কিন্তু তাকে তো দেখা যাচ্ছে না! তবে কি সে চলে গেছে? এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল তিতলি। কিন্তু লোকটাকে দেখতে পেল না। সুলতানভাই গাড়ি চালাতে শুরু করে দিল।

নৈনি লেককে একপাশে রেখে ওরা চলতে শুরু করেছে শহরের বাইরের রাস্তায়। ঠাকুমা বলল, “বাবা সুলতান, মুঝে নৈনি মন্দির নিয়ে যাবে?”

সুলতানভাই হেসে বলল, “হাঁ মাজি, জরুর।”

অন্য সময় হলে তিতলি হাসত, কিন্তু এখন তার মাথায় অনেক কিছু ঘুরছে। রায় লোকটা সকালে কোথায় যাবে যেখানে পুলিশ থাকবে না আবার পরের সপ্তাহে দিল্লিতে সে জিনিস সাহেবকে দিতে যাবে? নানান প্রশ্ন।

মা হঠাৎ বলল, “তিতলি, শরীর ঠিক আছে তো? মুখটা কেমন লাগছে।”

তিতলি হেসে বলল, “না মা, এমনি পাহাড় দেখছি।”

মার নজর থেকে কিছুতেই পালানো যাবে না।

ভিউ পয়েন্ট থেকে নৈনি লেকটা একদম ডিম্বাকৃতির মতন লাগে। সেখানে গাড়ি থামাল সুলতানভাই। বাবা ক্যামেরা দিয়ে সবার ফটো তুলতে শুরু করে দিল। হঠাৎ ওদের গাড়ির পাশে একটা সাদা রঙের অল্টো গাড়ি এসে থামল। তিতলি নিজের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছিল। এবার সেই গাড়ির দিকে তার চোখ গেল। সুলতানভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছে ওই গাড়ির ড্রাইভার। মনে হয় পরিচিত। কিন্তু এ কি! গাড়ির মধ্যে বসে আছে সেই রায় আর বোস নামের লোকদুটো। সাদা গাড়িটা আর না দাঁড়িয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেল। তিতলি অবাক হয়ে দেখতে থাকল।

ওদিকে ঠাকুমা বলতে শুরু করেছে, “মাফলার পরেও কাশি হয় কী করে তোমার?”

দাদু রেগে বলছে, “তোমার জর্দার গন্ধে আমার কাশি হচ্ছে।”

তিতলির কানে সেসব কথা একদম ঢুকছে না। ও এগিয়ে গেল সুলতানভাইয়ের কাছে। বাবারা ওদিকে ছবি তুলতে ব্যস্ত, এই সুযোগে সাতপাঁচ চিন্তা করে তিতলি বলল, “আপকা দোস্ত থা?”

সুলতানভাই গান শুনছিল। তিতলির দিকে তাকিয়ে বলল, “কৌন বেটা?”

“ওই গাড়ি যে চালাচ্ছিল, আপনার সঙ্গে কথা বলল।”

সুলতানভাই হিন্দিভাষী হলেও বাংলা বেশ বুঝতে পারে আর তিতলি মনের চাপা উত্তেজনার জন্য এত কথা হিন্দিতে বলতে পারল না ।

“হাঁ, মেরা ভাই মেহমুদ।” হেসে বলল সুলতানভাই।

“ও।”

সুলতানভাই ফের বলল, “ওয়হ আজ রাজভবন যা রহা হ্যায়, উধার ঘুমেগা। হম ভীমতাল হোকে রাজভবন যায়েঙ্গে। ইতনা সুবহ রাজভবন খুলতা নহি হ্যায়।”



ভীমতালে এসে গাড়ি থামল। সবথেকে বড়ো তাল এটা। আশেপাশে অনেক দোকান আছে, আবার বোটিংয়ের ব্যবস্থাও বেশ অন্যরকমের। তিতলির যদিও এসবে মন নেই, ওর মন পড়ে আছে সেই রাজভবনে। এত সকালে রাজভবন খোলে না মানে কী? তাহলে রাজভবনে রায় আর বোস যাচ্ছে কেন? পুলিশ কি তবে সকালে থাকবে না? ধুর, বেলা দশটা বেজে গেছে তাও ভীমতাল দেখা শেষ হচ্ছে না মাদের। আবার বোটিং করতে হবে। কী দরকার? নৈনিতালেই তো সুন্দর বোটিং করেছে। আবার কেন? কিন্তু মনের কথা বলার উপায় নেই। সবাই সন্দেহ করবে। এখানে ঠাকুমা বোটিং করল না। দাদুও ক্লান্ত বলে গেল না। কেবল মা, বাবা আর তিতলি।

বেশ আধঘণ্টা বোটিং করার পরে আবার গাড়িতে উঠল ওরা, পথে কমলতাল, সুখাতালও দেখল। কমলতালে কেবল বড়ো বড়ো পদ্মফুল ফুটে আছে। ঠাকুমা তো দেখেই মুগ্ধ। যদিও তিতলি একটু গম্ভীর হয়ে আছে। যে কেউ ওর মুখ ভালো করে দেখলেই বুঝবে ও কিছু ভাবছে।

অবশেষে বেলা একটা নাগাদ ওরা রাজভবনে পৌঁছল। গেট থেকে নুড়ি বিছানো রাজার বাড়ি। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশরা এই ভবন বানিয়েছিল গরমের সময়। এটাই ছিল তাদের রাজধানী। বাকিংহ্যাম প্যালেসের আদলে তৈরি এই সৌধে আছে মোট ১১৩টা ঘর আর আছে বিশাল গলফের মাঠ। মনে হয় ঠিক যেন বিদেশ। দাদু এই গল্প তিতলিকে নৈনিতালে আসার আগেই করেছে।

ধীর পায়ে ওরা এগোল গেটের সামনে টিকিট কাউন্টারের দিকে। তিতলির মনের ভিতরে গুরগুর করে মেঘ ডাকছে। রায় আর বোস কি এখানেই আছে? কিন্তু এ কী! গেটের ভেতরে একটা ভিড় দেখা যাচ্ছে পুলিশের। টিকিট কাটতে পারল না ওরা। কিন্তু কী ব্যাপার? একদল টুরিস্ট ওর বাবাকে হিন্দিতে বলল, “ভিতরে যেতে দেবে না আজ, কী যেন হয়েছে।”

তিতলি কৌতূহল আর দমন করে রাখতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

সামনেই ছিল এক কনস্টেবল। সে উত্তর দিল, “চুরি হয়েছে। ভিতরে রাজার একটা দামি হিরে ছিল, আজ সকালে সেইটা চুরি গেছে।”

তিতলির দম বন্ধ হয়ে এল। তার মানে রায় আর বোস আজ সকালে কি সেই হিরে চুরি করতে এখানে এসেছিল? কিন্তু রাজভবন খোলা ছিল না, তাও চুরি? তিতলি বলল সেকথা। বাবা উওর দিল, “আরে ভিতরের লোক আছে। নিশ্চয়ই টাকাপয়সা নিয়ে চোরকে ঢুকিয়েছে।”

সুলতানভাইও বলল, “হাঁ সাব, অন্দরকে লোগ ঘুস লেতা হ্যায়, গদ্দারি করতা হ্যায়।”

ব্যর্থ চিত্তে ওরা ফিরে চলল ধাবার উদ্দেশে। খেতে হবে সেখানে।

ধাবায় খাবার খুব ভালো। ডাল তারকা, ভাত, চিকেন ভর্তা আর গরম গরম রুমালি রুটি। এখানে খাবারের সঙ্গে লঙ্কার গুঁড়োও সার্ভ করে। খাবার খেতে খেতে বাবা, মা, দাদু আর ঠাকুমা সেই চুরির কথাই আলোচনা করছে। তিতলি কিন্তু সেই রাজভবন থেকেই চুপ করে ভাবছে সমস্ত ঘটনার কথা। মনে মনে একটা কাল্পনিক ছবি এঁকে ফেলেছে সে। বয়স দশ হলে কী হবে, তিতলি যথেষ্ট বুদ্ধি রাখে মাথায়। সেই বুদ্ধি দিয়েই গোপনে একটা প্ল্যান করতে থাকল।

“কিন্তু কীভাবে হল এই চুরি? আর হিরেটা ছিল কোথায়?”

দাদুর এই কথার উত্তর দিল বাবা। “হয়তো কোনো ঘরে ছিল। তাছাড়াও কেবল একতলাই টুরিস্টের জন্য খোলা থাকে। কাজেই অন্য ঘরে কী আছে কেউ জানেই না।”

বাবার কথায় যুক্তি আছে। এত বড়ো রাজার বাড়ি, সেখানে হিরে কোথায় আছে সেটা সবাই নাই বা জানতে পারে। কাজেই সেটা যে জানে সে-ই চুরি করবে। তিতলির আর সময় নষ্ট করতে একদম ইচ্ছে করছে না। যে করেই হোক এখনই হোটেলে ফেরা খুব দরকার। কে জানে রায় দিল্লি চলে গেল কি না।



ধাবা থেকে হোটেলে যেতে সময় লাগলো মাত্র পনেরো মিনিট। তিতলি কোনোমতে গাড়ি থেকে নেমেই একছুটে তিনতলার লাউঞ্জের কোনায় চলে গেল। আড়চোখে পাশের ঘরটার দিকে তাকিয়ে দেখল জানালাটা অর্ধেক খোলা। তার মানে রায় লোকটা কি চলে গেছে? ইস, যদি সব সত্যি হয়ে থাকে তাহলে তো সর্বনাশ। হঠাৎ নীচের থেকে একটা হাসির শব্দ ভেসে এল। তিতলি ঝুঁকে দেখল, ইন্দুমাসি আর সেই রায়বাবু কী একটা কথায় খুব হাসছে। মানে লোকটা এখনো নৈনিতাল ছেড়ে যায়নি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল তিতলি। কিন্তু হিরে উদ্ধার হবে কী করে? একটা মোক্ষম প্ল্যান চাই। না হলে সবকিছু মাটি। ও জানে দেশের সম্পত্তি বাইরের দেশে পাচার করে অনেক লোক মুনাফা নিচ্ছে। দাদু বলেছে। তাই যে করেই হোক হিরেটা উদ্ধার করতেই হবে। কিন্তু সে হিরে আছে কোথায়? রায় লোকটা হিরেটা কোথায়ই-বা লুকিয়ে রেখেছে?

হোটেলে হিরে চুরি নিয়ে বেশ জল্পনা শুরু হয়ে গেছে। ইন্দুমাসি নিজেই বলে গেল, “এইসব চুরি খুব সাধারণ ব্যাপার। প্রায়ই হয়। দু-দিন আলোচনা হবে, তারপর আবার যে কে সেই।”

দুপুর আর সন্ধেটা একটা চাপা অস্থিরতায় কাটল তিতলির। কিছুই ভালো লাগছে না। যদিও রায় লোকটা হোটেলেই আছে, তাও জিনিসটা হাতে না পাওয়া অবধি ওর শান্তি নেই। সন্ধ্যাবেলায় পুলিশ বেশ টহল দিচ্ছিল লেকের আশেপাশে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ওর কথায় কেউ পাত্তা দেবে না। কাজেই চুপ থাকাই ভালো।

রাতে ডিনার টেবিলে মা, ঠাকুমা সবাই গল্প করতে ব্যস্ত, আচমকা তিতলি দেখতে পেল রায় লোকটা খেতে এসেছে। সঙ্গে ইন্দুমাসি। লোকটা ওদের পাশের টেবিলে বসে বলল, “বস কল সুবহ নিকল না হ্যায়। আপকা হোটেল বহত বঢ়িয়া হ্যায়।”

মানে কাল সকালেই পগারপার! তিতলি টানটান হয়ে বসল। একটা অদ্ভুত জিনিস তিতলি লক্ষ করল, লোকটা কথা বলছে আর বার বার নিজের কোটের বাঁদিকের পকেটে হাত দিচ্ছে।

ইন্দুমাসি কথা শেষ করে ওদের টেবিলে এল। তিতলি আড়চোখে লোকটাকে খেয়াল করছে। খেতে খেতেও লোকটা বার বার ওই বাঁদিকের পকেটে হাত দিচ্ছে। আর কেমন একটু অশান্ত দৃষ্টি তার চোখে। তার মানে কী? খাওয়া শেষ করে সবাই ওঠার সময় তিতলি একটা ন্যাপকিনে টেবিলের উপর থেকে দুটো জিনিসের গুঁড়ো বেশ করে ঢেলে নিল, কেউ বুঝতেও পারল না।

লাউঞ্জে ফের গল্পের আসর বসল। আজকের বিষয় হিরে চুরি।

রায় লোকটা কেমন চোরের মতন নিজের ঘরে ঢুকে বাঁ পকেট থেকে হিরেটা বের করে এক ঝলক দেখে আবার পকেটে ঢুকিয়ে দিল। তিতলি সেই কোনার আধখোলা জানালা দিয়ে পুরো ব্যাপারটা দেখল। এবার ও একটা সাংঘাতিক কাজ করে বসল। সবার চোখের আড়ালে চুপিচুপি লোকটার ঘরে গিয়ে টোকা দিল দরজায়। হাতে অস্ত্র তৈরি। বুকের ভিতরে দামামা বাজচ্ছে। ভিতর থেকে একটা ভারী গলার আওয়াজ এল। “কে?”

তিতলি জোর গলায় বলল, “রুম সার্ভিস।”

রায় লোকটা দরজা খুলতেই তিতলি তার হাতের অস্ত্র ছিটিয়ে দিল রায়ের চোখের দিকে। অস্ত্র মানে লঙ্কা আর নুনের গুঁড়োর মিশ্রণ। ব্যস, আর যাবে কোথায়। লোকটা দুই হাতে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করতে করতে মাটিতে বসে পড়ল আর সেই ফাঁকে তিতলি ওর কোটের বাঁ পকেট থেকে হিরেটা বের করে দরজা আটকে দে ছুট। চিৎকার শুনে বাবা, মা, ইন্দুমাসি, হোটেলের বাকি লোকজন ওদিকে ছুটে এল। কিন্তু তিতলির দাঁড়ানোর সময় নেই। ও নীচে সুলতানভাইয়ের সঙ্গে পুলিশকে গল্প করতে দেখেছে। একছুটে সেখানে গিয়ে সুলতানভাই আর পুলিশকে সবকথা বলল। হিরেটাও দিল পুলিশের হাতে। পুলিশের সবকথা শুনে তো চোখ কপালে। তৎক্ষণাৎ ফোন করে হেড কোয়ার্টার থেকে বড়োবাবুকে ডাকল।



টেবিলের একপাশে আধশোয়া অবস্থায় মুখখানা পেঁচার মতন করে আছে রায়বাবু। চোখমুখ লাল। আর তার দিকে বন্দুক তাক করে পুলিশ। ইন্সপেক্টর সিনহা বাংলা ভাষা জানেন। বেশ কঠিন গলায় রায় লোকটাকে বললেন, “দিলু রায় একনম্বরের স্মাগলার। বেশ পালটে এখানে চুরি? তাও আবার এই দামি হিরে?”

মার কোলে তিতলি বসে আছে। ডিম্বাকৃতির হিরেটা হাতে নিয়ে ইন্সপেক্টর ফের বললেন, “এই হিরে হল ভারতের দামি হিরের মধ্যে অন্যতম। সম্রাট আকবর হিরেজহরতের কদর করতেন। সেই আমলে এই হিরে ওঁর কালেকশনের অন্যতম আকর্ষণীয় বস্তু ছিল, যার এখনকার মূল্য প্রায় কোটি টাকা। এই কিছুদিন আগে সরকার এই হিরে দিল্লির মিউজিয়াম থেকে নৈনিতালের রাজবাড়িতে পাঠায় যাতে এখানকার মিউজিয়ামের আকর্ষণ বাড়ে। কিন্তু এই হিরে রাজবাড়ির দোতলার সিন্দুকেই ছিল, পুলিশের হেফাজতে। আগামীকাল সেটা মিউজিয়ামে প্রর্দশিত হবে। আমাদের কাছে খবর ছিল, দিল্লি থেকেই কিছু লোক এর পিছনে লেগেছে। তাদের মধ্যে এ মানে রায়ও ছিল। বেশ বদলে চুরি করছে।”

দাদু বলল, “কিন্তু পুলিশের পাহারা থাকতেও এ ঢুকল কেমন করে?”

ইন্সপেক্টর বললেন, “সেটা দেখতে হবে। আসলে এই রাজবাড়িতে বেশ কিছু চোরা কুঠুরি আছে যাতে ডাকাত পড়লে রাজা পালাতে পারেন। তাই সে ব্যবস্থা। এবার এ কোন পথে ঢুকেছে সেটা মেহমুদ বলতে পারবে হয়তো।”

তিতলি চট করে বলে উঠল, “এর সঙ্গে আরো একজন ছিল, নাম বোস।”

ইন্সপেক্টর চোখ কুঁচকে বললেন, “সিধু বোস এর ডানহাত। লোক লাগিয়েছি। পালাবে কোথায়? দাগি আসামী দুটোই। তবে মিস তিতলি, তুমি আজ অসাধারণ কাজ করেছ। দেশের জিনিস বাঁচিয়েছ। ইউ আর জিনিয়াস। কিন্তু তুমি একে ধরলে কী করে? আর একে ঘায়েল করলে কী করে?”

এবার তিতলি সব ঘটনা পরপর বলতে থাকল। সঙ্গে সেই লঙ্কা আর নুনের গুঁড়োর কথাও বলল। বাবা, মা, দাদু, ঠাকুমা, তাছাড়া হোটেলের সবাই ওর প্রশংসা করেই চলেছে। বিশেষ করে ইন্দুমাসি। সে এই রায় লোকটাকে ভদ্রলোক ভেবেছিল।

আচমকা সুলতানভাই চিৎকার করে উঠল, “থ্রি চিয়ার্স ফর তিতলি বেটিয়া!”

সমবেত সবাই বলে উঠল, “হিপ হিপ হুররে।”

মার চোখটা আনন্দে চকচক করে উঠল ঠিক ওই হিরের মতন।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী


No comments:

Post a Comment