লোককাহিনি: কিকু সিনের ঢোল: অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আফ্রিকার লোককাহিনি - ৪



গহিন জঙ্গলের মধ্যে ছোট্ট এক গ্রামে থাকত এক কিশোর, তার নাম ছিল কিকু সিন। ঘরে মানুষ বলতে ছিল সে আর তার বাবা। কিন্তু কিকুর বাবাটা ছিল হিংসুটে আর স্বার্থপর প্রকৃতির। কিকুকে সে ভালো তো বাসতই না, সারাক্ষণ শুধু গজগজ করতে করতে বলত, কিকুকে জন্ম দেবার পরই নাকি কিকুর মা তাকে ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে, আর ফিরে আসেনি। তাই মায়ের হারিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী কিকুই।

গাঁয়ের লোকে অবশ্য অন্য কথা বলত। তাদের মতে, কিকুর বাবার স্বার্থপরতা আর অবহেলা সহ্য করতে না পেরেই কিকুর মা গ্রাম ছেড়েছিল। নিজের ভাগ্যে কী লেখা আছে জানা না থাকায় সে হয়তো কোলের ছেলে কিকুকে রেখে গিয়েছিল তার বাবার কাছে। কিকু রোজ নিজের কল্পনার জগতে মাকে বসিয়ে, ফিরে আসবার জন্য মায়ের কাছে কাকুতিমিনতি করত। তার বিশ্বাস ছিল, একদিন তার মা ঠিক তার কাছে ফিরে আসবে।

জঙ্গল কেটে কিকুদের গাঁয়ের মানুষ যত্ন করে বানিয়েছিল চাষের ক্ষেত। সেখানে বাজরার চাষ হত। জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা ফল পাকুড়, ক্ষেতের বাজরা, আর শিকার করে আনা পশুদের মাংস খেয়ে গোটা গাঁয়ের মানুষের পেট ভরত। হঠাৎ তিন-তিনটে বছর লাগাতার বৃষ্টি হল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মানুষের চোখ ব্যথা হয়ে গেলেও দেখা মিলল না একটুকরো মেঘের। কিকু ভাবে, মেঘেরা সব পালাল কোথায়! সে রোজ রাতে খালি পেটে শুয়ে শুয়ে মাকে ডেকে বলত, “মা, ও মা, এক পশলা বৃষ্টি এনে দাও। খিদের জ্বালা আর পারি না সহ্য করতে।”

একদিন সকালবেলা একপেট খিদে নিয়ে কিকু জঙ্গলে ঢুকে পড়ল চুপিচুপি। গাঁয়ের বড়োরা জানতে পারলে বাধা দিত, কারণ কিকু তখনো জঙ্গলে শিকার করতে যাওয়ার মতো বড়ো হয়ে ওঠেনি। পেটের খিদে বড়ো জ্বালা যে! একটু ভিতরে ঢুকতেই কিকু মাটিতে তিনটে ফল দেখতে পেল। সবক’টা শুকনো, গাছ থেকে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এই ফল ও চিনত, ভাঙলেই ভিতরে নরম শাঁস পাওয়া যায়। মিষ্টি খেতে। এদিক ওদিক খুঁজেপেতে বেশ একটা বড়ো পাথরের টুকরো হাতে তুলে নিল কিকু। তারপর ফলের উপর আছড়ে ফেলল পাথরটা। কিন্তু ফল তো ভাঙলই না, গড়িয়ে গিয়ে পড়ল একটা বিরাট গর্তে। আবার একটা শুকনো ফল শক্ত মাটিতে রেখে পাথর আছড়ে ভাঙার চেষ্টা করল কিকু। সেই ফলটার গতিও একই হল, ছিটকে উঠে গর্তের ভিতর পড়ে হারিয়ে গেল। হতাশ কিকু তৃতীয় আর শেষ ফলটা মাটিতে রেখে সাবধানে পাথর ছুড়ল। কী আশ্চর্য! সেটাও গড়াতে গড়াতে গর্তে ঢুকে অদৃশ্য হল।

এবার কিকু নিজের উপরই ভয়ংকর রেগে উঠল। খিদের টানে পেটে প্রবল মোচড় দিচ্ছে, আর তিন-তিনটে ফলই কিনা হাতছাড়া হয়ে গেল! গর্তের মধ্যে উঁকি দিয়ে কিকু কিছু দেখতে পেল না। ঘন জঙ্গলের চাপচাপ অন্ধকারে বাইরে থেকে গর্তের মধ্যে কিছুই দেখা যাবে না, ভিতরে ঢুকে দেখতে হবে ফলগুলো কোথায় গেল। এই ভেবে কিকু সাহস করে দুই হাতে ভর দিয়ে গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ল। মাটির সোঁদা গন্ধ কিকুর বুকে ঢুকে যাচ্ছে। গর্তের মধ্যে নামতেই সামনে হাতড়ে কিকু দেখল একটা সুড়ঙ্গ। ফল তিনটের কথা সে বেমালুম ভুলে মেরে দিয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে লাগল ধীরে ধীরে।

অবাক কান্ড! গর্তের একবারে মাথায় ছোট্ট আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে না? কিকু আলোর দিকে দু-চোখ মেলে সাবধানে এগোতে থাকল। গর্ত শেষ হতে না হতেই বিস্ময়ের অন্ত থাকল না। সামনে দেখা যাচ্ছে সুসজ্জিত এক নগরী। সার সার সুন্দর বাড়ি, সোনার তৈরি। এক অদ্ভুত আলোয় নগরীর সব বাড়িঘর থেকে সোনালি আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। কিন্তু নগরী সম্পূর্ণ জনমানুষহীন। অজানাকে জানার দুর্বার ইচ্ছেয় কিকুর দুই পা তাকে টেনে নিয়ে গেল নগরীর ভিতরে। একটু এগোতেই কিকু দেখে সুন্দর এক বাড়ির দাওয়ায় বসে আছে এক বুড়ি। পরনে তার দামি পোশাক। কিকুকে দেখে তার মুখ-চোখ খুশিতে ভরে ওঠে। মিষ্টি হেসে সে বলে, “ফল তিনটে খুঁজতে এসেছ? তার চাইতেও ভালো জিনিস আছে আমার বাগানে। যাও, ডানদিক বরাবর হেঁটে গেলেই একটা বাগান দেখতে পাবে। সেখানে দেখবে অনেক মেটে আলুর গাছ। ওরা তোমার সঙ্গে কথা বলবে। যেই তুমি ওদের শিকড় খুঁড়তে যাবে, অমনি তারা কেউ বলবে, ‘আমার শিকড় খুঁড়ো না’, কেউ বলবে, ‘তোমার যা ইচ্ছে নিয়ে নাও’। যে গাছ মানা করবে শিকড় খুঁড়তে, তুমি সেখান থেকেই মাটি খুঁড়বে। পেয়ে যাবে মেটে আলু। আর সেই মেটে আলু আমার কাছে নিয়ে এস। আমি তোমাকে একটা খেলা দেখাব।”

কিকু খুব বাধ্য ছেলে ছিল। গাঁয়ের সবার কথা শুনে চলার জন্য সবাই তাকে ভালোবাসত। বুড়ির কথা মেনে বাগানে গিয়ে তো সে আবাক! নানা রঙের ফুলের বাহার, তাদের স্বর্গীয় সুবাসে পেটের খিদে কোথায় যে পালাল, কিকু জানতেও পারল না। মেটে আলুর সার সার গাছ দেখতে পেয়ে এক ছুট্টে কিকু গেল আলু তুলতে। কিকুকে দেখে কোনো গাছ বলল, “আমার শিকড় থেকে মাটি তুলে যত খুশি আলু নিয়ে যাও।” কেউ বলল, “একদম শিকড়ে হাত দেবে না বলছি।”

যে গাছ আলু তুলতে বারণ করল, বুড়ির কথামতো সেই গাছের শিকড় থেকে মাটি আলগা করে আলু তুলল কিকু। বুড়ির হাতে সেই আলু দিতেই বুড়ি খুব খুশি হয়ে বলল, “এবার তুমি আলু ছাড়িয়ে খোসাটাই শুধু সেদ্ধ করো। ছাড়ানো আলুটা ছুড়ে ফেলে দাও জঙ্গলে।”

নির্বিবাদী কিকু বাধ্য ছেলের মতো আলুর খোসা ছাড়িয়ে আলু ফেলে দিল জঙ্গলে। তারপর উনুনের উপর রাখা হাঁড়িতে খোসা সেদ্ধ করতে দিতেই মেটে আলু গজিয়ে উঠল খোসা থেকেই। কিকু খুব মজা পেয়ে হাততালি দিতেই বুড়ি দৌড়ে এসে বলল, “ভালো ছেলে, এবার সেদ্ধ আলু দুটো থালায় ঢেলে ফেলো দেখি। নিশ্চয়ই তোমার খুব খিদে পেয়ে গেছে? চলো দুইজনে মিলে খেতে বসি।”

কিকু দুটো সুন্দর সোনার থালা বুড়ির রান্নাঘর থেকে নিয়ে এসে ছুরি দিয়ে সেদ্ধ আলুর লম্বা লম্বা ফালি কেটে আগে বুড়িকে খেতে দিয়ে, পরে নিজে খেল। এত সুস্বাদু আলুসেদ্ধ কিকু জীবনে খায়নি। খেয়েদেয়ে বুড়ির ঘরের বারান্দায় সে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল। সকাল থেকে তার সেদিন অনেক খাটাখাটনি গিয়েছিল যে!

সন্ধেবেলা ঘুম ভাঙতে কিকু দেখে বুড়ি তার ঘরের কাজ করতে ব্যস্ত। কিকুকে ঘুম থেকে উঠে পড়তে দেখে বুড়ি বলল, “উঠে পড়েছ? যাও তো খোকা, একবার বাগানে গিয়ে দেখো, অনেক ঢোল পড়ে আছে এদিক ওদিক। এক-একটা ঢোলে চাঁটি মেরে দেখবে; যে ঢোলে ডং ডং শব্দ হবে, শুধু সেটাই নিয়ে আসবে। খবরদার, যে ঢোলে চাঁটি দিলে ডিং ডিং শব্দ হবে, সেটা কিন্তু ভুলেও এনো না।”

শান্ত সুবোধ ছেলে কিকু, বুড়ির কথামতো বাগানে গিয়ে সেই ঢোলটাই আনল যাতে চাঁটি মারলে ডং ডং শব্দ উঠল। বুড়ির হাতে ঢোল তুলে দিতে যেতেই বুড়ি বলল, “এই ঢোল তোমার। ঢোলে চাঁটি মেরে যা খেতে ইচ্ছে হবে, মুখ ফুটে শুধু বলার অপেক্ষা। খাবার আপনা-আপনিই তোমার সামনে হাজির হবে।”

কিকু খুব গরিব ছিল। অনেক খাদ্য সে কোনোদিনই চোখে দেখেনি, নামও শোনেনি। তাই প্রথমে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঢোলে চাঁটি দিয়ে বলল, “বাজরার রুটি আর নুন খাব।”

যেই না এই কথা বলা, অমনি কিকুর সামনে সুদৃশ্য থালায় চেপে সুগন্ধি বাজরার রুটি আর নুন এসে হাজির। কিকু খেয়েদেয়ে বিরাট এক ঢেঁকুর তুলল। তারপর গড় হয়ে বৃদ্ধাকে প্রণাম করল। সে কিকুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “এই ঢোল নিয়ে গাঁয়ে যাও। তারপর গাঁয়ের লোককে পেট ভরে খাওয়াও। দেখবে তোমার সব মনের ইচ্ছে পূর্ণ হবে।”

কিকু মনে মনে ভাবল, গাঁয়ের লোক যদি খেয়েদেয়ে খুশি হয়, তবে সে মাকে চাইবে। মা ফিরে এলে কোনো দুঃখই আর থাকবে না। এই ভেবে গাঁয়ে ফিরে গিয়ে ঢোলে চাঁটি মেরে গাঁয়ের সব ছেলেমেয়ে, বুড়ো-বুড়িকে কিকু যে যা খেতে চাইল তাই তাদের পেট ভরে খাওয়াল। গাঁয়ের লোকে তাকে অনেক আশীর্বাদ করল, তার মঙ্গল কামনা করল।

কিকু সিনের হিংসুটে বাবা আনাসি, ছেলের সুখ্যাতি আর নামডাক সহ্য করতে পারল না। কিকুর উপর তার ভারি হিংসে হল। কিকুর ঢোল কেড়ে নিয়ে আনাসি তাতে চাঁটি মেরে সুস্বাদু শুয়োরের মাংস খাওয়ার বায়না জানাল। কিন্তু যতই সে ঢোলে চাঁটি মারুক না কেন, কোনো খাবারই তার বরাতে জুটল না। আনাসি বুঝল, ঢোল শুধু কিকুর কথাই শুনবে। হাল ছেড়ে দিয়ে আনাসি কিকুকে বলল, “আমাকে এক্ষুনি সেই গর্তের সন্ধান দে, যেখান থেকে এই ঢোল এনেছিস। আমারও একখানা ঢোল চাই। সব খুলে বল, নইলে এই ঢোল আমি আজ তোর মাথায় ভাঙব।”

বাবার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে মেটে আলুর কথা, বুড়ির কথা—সব খুলে বলল। তারপর সেই রাতের মতো ঘুমিয়ে পড়ল কিকু। পরদিন সক্কাল বেলা হতেই কিকুর বাবা আনাসি তাকে টেনে হিঁচড়ে তুলে দিল বিছানা থেকে। কিকু বাবাকে গর্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বাড়ি চলে এল নিঃশব্দে। তারপর তার ঢোল লুকিয়ে ফেলল গোপন এক জায়গায়।

গর্তের মধ্যে কিকুর মতোই হাঁটতে হাঁটতে আনাসি খুঁজে পেল সুন্দর সেই সোনার নগরী। দেখা পেল সেই বুড়ির। তার সামনে এসেই চেঁচিয়ে বলে উঠল আনাসি, “এই বুড়ি, আমায় কিছু খেতে দে। এক্ষুনি দে, নয়তো তোকে...”

বুড়ি মুচকি হেসে বলল, “পাবে, সব পাবে। যাও, ওইদিকের বাগানে গিয়ে দেখো অনেক মেটে আলুর গাছ দেখতে পাবে। যে গাছ বলবে আমার শিকড়ের মাটি আলগা করে আলু তুলো, তুমি সেখান থেকে আলু তুলে আনবে না। যদি কোনো গাছ বলে, আমার শিকড় আলগা করে আলু তুলো না, তবেই সেখান থেকে আলু তুলে আনবে।”

আনাসি ভীষণ রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, “চালাকি নাকি? যে বলবে আলু তোল, আমি তার কাছ থেকেই আলু তুলে আনব। তোমার কথা কোন দুঃখে শুনতে যাব? তুমি নিশ্চয়ই ডাইনি বুড়ি। তোমার কথায় আমি ভুলছি না।”

এই বলে আনাসি বাগানে গিয়ে সেই গাছের গোড়া উপড়ে মেটে আলু তুলে নিয়ে এল, যে গাছ তাকে আলু তুলতে বলল। যে গাছ বলল আলু তুলো না, সেই গাছের দিকে সে ফিরেও তাকাল না।

আলু এনে বুড়ির হাতে দিতেই বুড়ি আনাসিকে বলল, “যাও, এখন আলুর খোসা ছাড়িয়ে আলু বাগানে ছুড়ে ফেলে দিয়ে খোসা সেদ্ধ করে ফেলো।”

আনাসি হা হা করে গলা ফাটিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “আবার আমায় বোকা বানাবে ভেবেছ? পৃথিবীর সবচাইতে বোকা লোকটাও আলু ছাড়িয়ে শাঁস ফেলে দিয়ে খোসা সেদ্ধ করার মতো নির্বুদ্ধিতা করবে না। আমায় বোকা বানাবার মতলব! এর পিছনে নিশ্চয়ই তোমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে।”

এই বলে আনাসি আলুর খোসা ছাড়িয়ে তা ফেলে দিয়ে আলু সেদ্ধ করতে গিয়ে দেখে সব আলু জমে পাথর হয়ে গিয়েছে, মুখে তোলার অবস্থায় নেই। পাথরসুদ্ধু কড়াই ছুড়ে মাটিতে ফেলে ভীষণ গর্জন করে ওঠে আনাসি, “ডাইনি বুড়ি, আমাকে তুক করবি ভেবেছিস? এক্ষুনি আমাকে ঢোল দে, যে ঢোল বাজালে খাবারেরা হাতের কাছে চলে আসে। এমন ঢোল দে, যেন তাতে চাঁটি মেরে যা চাইব তাই পেয়ে যাব।”

আনাসিকে রেগে যেতে দেখে বুড়ি একটু মুচকি হাসল। তারপর যেমন সে কিকুকে বাগানের ভিতর সেই ঢোল আনতে বলেছিল যাতে চাঁটি মারলে ডং ডং শব্দ হয়, ঠিক তেমনি করেই সে আনাসিকেও নির্দেশ দিল। বার বার আনাসিকে সাবধান করে দিল, ডিং ডিং শব্দ করা ঢোল যেন সে না আনে।

চতুর আনাসি মনে মনে বুড়িকে বোকা বানাবার মতলবে নাচতে নাচতে বাগানে গিয়ে সেই ঢোলটাই চাঁটি মেরে তুলে আনল, যেটা ডিং ডিং শব্দ করল। তার মনে হল, বুড়ির কথা মেনে চললে ঠকে যাবার থেকে তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।

তর সইল না আনাসির। সে ভাবল, ঢোল নিয়ে এক্ষুনি গ্রামে ফিরে গিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে হবে। সবার সামনে সে নিজের পারদর্শিতা জাহির করবে। কিকুর চাইতেও ভালো ভালো খাবার খাইয়ে সব্বাইকে বশ করবে। তারপর আর গাঁয়ের মোড়ল হওয়ার থেকে তাকে কে আটকায়! যেমন ভাবা তেমন কাজ। বুড়ির নগরী থেকে এক ছুটে গর্তের মধ্যে দিয়ে গাঁয়ে ফিরে এল আনাসি।

গাঁয়ে ফিরেই আনাসি চিৎকার করে লোক জড়ো করে ফেলল। খুশিতে দুই পাক নেচে নিয়ে সে বলল, “এই আমি ঢোলে চাঁটি দিচ্ছি। সবাই বলো, কার কী খেতে ইচ্ছে করছে। এই জাদু ঢোল আজ তোমাদের পেট ভরে খাওয়াবে। বৃষ্টি না হলে বয়েই গেল। কীই-বা আসে যায় ক্ষেতে যদি ফসল না ফলে? তবে বাছাধনেরা, খেয়েদেয়ে পেট পুরে নিশ্চিন্তে ঘুম লাগাও যত খুশি, কিন্তু যাবার আগে আমাকে এই গাঁয়ের মোড়ল বলে মেনে নিতে হবে। যদি রাজি থাকো বলো, তবেই পড়বে ঢোলে চাঁটি।”

উৎসাহী গাঁয়ের লোকেরা খেতে পাওয়ার লোভে হইহই করে বলল, “আজ থেকে তুমিই হবে মোড়ল। আমরা সব তোমার প্রজা হব। নাও, আর দেরি না করে লাগাও দেখি তোমার ঢোলটাতে জোরসে এক চাঁটি!”

তারপর আনাসি যেই না কষে ঢোলে এক চাঁটি লাগিয়েছে, অমনি ঢোল বেজে উঠে গম্ভীর ডিং ডিং শব্দ করল। আর সঙ্গে সঙ্গে ঢোলের ভিতর থেকে কিলবিল করে বেরিয়ে এল যত বিষধর সব সাপ। তাদের হিস হিস শব্দে ভয় পেয়ে গাঁয়ের মানুষ দৌড়ে পালাল। বিষধর সাপেরা আনাসিকে ঘিরে ধরে ফণা তুলল। আনাসি পালাতে গিয়েও হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। কিকু খবর পেয়ে দৌড়ে এল, কিন্তু সাপেদের দেখে সামনে যেতে সাহস পেল না। তার মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দ বেরোল, “মা!”

হঠাৎ কিকু দেখে এক লাবণ্যময়ী রমণী তার সামনে দুই হাত বাড়িয়ে বলছে, “আয় খোকা, আমার কাছে আয়। আমি তোর মা। তোর ডাকে ফিরে এলাম। পিছনে তাকাস না। তোর দুষ্টু বাপকে সাপে কামড়েছে। সে আর উঠবে না।”

মায়ের কথা শেষ হতে না হতেই কিকু দেখে, কোথায় তাদের গ্রাম, কোথায় সেই ঘন জঙ্গল! মায়ের হাত ধরে সে সোনার নগরীর দরজায় দাঁড়িয়ে।

___

অঙ্কনশিল্পী: অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়


No comments:

Post a Comment