বিজ্ঞানের পাঠশালা: যা দেখি যা শুনি (৯ম): কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


নবম পর্ব


কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরে কেন?



ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শরীর অবশ হয়ে যায়, কোনো নড়াচড়া করা যায় না। একসময় মনে হয় কে যেন শরীরে ভর করেছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় স্লিপ প্যারালাইসিস বা ঘুমের মধ্যে পক্ষাঘাত। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে স্লিপ প্যারালাইসিস বা বোবায় ধরা হল গভীর ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি একটি স্নায়ুজনিত সমস্যা। ঘুমের এই পর্যায়কে বলা হয় র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট-রেম। রেম হল ঘুমের এমন একটি পর্যায় যখন মস্তিষ্ক খুব সক্রিয় থাকলেও শরীরের আর কোনো পেশি কোনো কাজ করে না। তাই এই সময় মস্তিষ্ক সচল থাকলেও শরীরকে অসাড় মনে হয়। এই পর্যায়ে মানুষ স্বপ্ন দেখে থাকে।

স্লিপ প্যারালাইসিস হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। এরকম পরিস্থিতি যে-কোনো বয়সে হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে স্লিপ প্যারালাইসিস হওয়ার পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অ্যাংজাইটি বা প্যানিক ডিস-অর্ডার বা বাইপোলার ডিজ-অর্ডারের মতো মানসিক সমস্যা, পরিবারে কারো স্লিপ প্যারালাইসিস থাকা ইত্যাদি।

বোবায় ধরলে বড়ো করে নিশ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হয়, বুকে চাপ বোধ হয়, চোখ খুলতে এবং নড়াচাড়া করতেও সমস্যা হয়, ভীষণ ভয় হয়, শরীর ঘেমে যায়, হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। এরকম অবস্থা কয়েক সেকেন্ড থেকে মিনিট খানেক স্থায়ী হতে পারে।

স্লিপ প্যারালাইসিসের কারণ হিসেবে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী প্যাট্রিসিয়া এল ব্রুকস এবং জন এইচ. পিভার জানিয়েছেন যে মস্তিষ্কে গ্লাইসিন ও গামা অ্যামাইনোবিউটিরিক অ্যাসিড-গ্যাবা নামে দু-ধরনের রাসায়নিকের নিঃসরণের কারণে মাংসপেশি অসাড় হয়ে পড়ে। এই সময় শরীর শিথিল থাকলেও মস্তিষ্ক জেগে থাকে। এই অবস্থাকেই আমরা বোবায় ধরা বলি। এটা কোনো গুরুতর রোগ নয়। মনকে চাপমুক্ত রাখার পাশাপাশি ঘুমানোর অভ্যাসে ও পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে অনেক সময় নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।


খোসা সহ একটি কমলালেবু জলে ভাসে, কিন্তু খোসা ছাড়ালে ডুবে যায় কেন?



আর্কিমিডিসের সূত্র অনুযায়ী কোনো বস্তু জলে ভাসবে না ডুববে তা নির্ভর করে বস্তু কর্তৃক অপসারিত তরলের (এখানে জল) ওজন (প্লবতা) যদি বস্তুর ওজনের চেয়ে বেশি হয় তবে বস্তুটি তরলের উপরিতলে ভাসবে। কমলালেবুর খোসায় খুব ছোটো ছোটো ছিদ্র থাকে। সেই ছিদ্রে এবং কমলালেবু ও খোসার মধ্যবর্তী অংশে বাতাস জমে থাকে। এর ফলে খোসা সমেত কমলালেবুর আয়তন অনেক বেশি হয় ফলে এই সময় যে জল অপসারিত হয় তার ওজন কমলালেবুর ওজনের চেয়ে বেশি হয় তাই খোসা সমেত কমলালেবু জলে ভাসে। খোসা ছাড়িয়ে নিলে তখন ওই বাতাস বা বায়বীয় অংশ থাকে না। ফলে কলালেবুর আয়তন অনেকখানি হ্রাস পায়। এই সময় কমলালেবু কর্তৃক অপসারিত জলের ওজন কমলালেবুর ওজনের তুলনায় অনেক কম হয়। ফলে খোসা ছাড়ানো কমলালেবু জলে ডুবে যায়।


জেব্রার গায়ে কালো-সাদা ডোরাকাটা দাগ কেন?



জেব্রা ও ঘোড়া একই পরিবারভুক্ত হওয়ায় এদের শরীরের আকৃতি অনেকটা একই ধরনের। তবে গায়ের রঙে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ঘোড়া সাধারণত নানা রঙের হয়—সাদা, বাদামি, কালো ইত্যাদি। কখনো কখনো দুটি রঙ দেখা গেলেও গায়ে ডোরাকাটা দাগ কখনোই দেখা যায় না। পক্ষান্তরে জেব্রার গায়ে রঙের কোনো বৈচিত্র্য দেখা যায় না। এদের সবারই গা কালো-সাদা ডোরাকাটায় আবৃত। কেন এদের গায়ে এই কালো-সাদার মায়াজাল? বিজ্ঞানীদের মতে এই দাগগুলি জেব্রাদের আত্মরক্ষায় সাহায্য করে। শরীরের এই ডোরাকাটা রঙগুলি এদের প্রধান শত্রু সিংহের চোখে ঝলমলানি সৃষ্টি করে। ফলে এদের শিকার সনাক্ত করতে অসুবিধা হয়। আলোছায়া অঞ্চলে বা কোনো জলাশয়ের কাছে যখন এরা দল বেঁধে পাশাপাশি থাকে তখন সিংহ নির্দিষ্ট কোনো জেব্রাকে চিহ্নিত করতে পারে না।


সাবান ঘষলে ফেনা হয় কেন?



সাবানে থাকা সোডিয়াম স্টিয়ারেট অথবা পটাশিয়াম স্টিয়ারেটের কারণেই তৈরি হয় সাবানের ফেনা। সাবান যখন গলে যায় তখন জল, বাতাস আর সাবানের মিশ্রণে তৈরি হয় বুদবুদ। সাবানের ফেনা হল ছোটো ছোটো বুদবুদের সমষ্টি। বেসিনের উপরের কল জোরে খুললে প্রথমদিকে জল ফেনামতো দেখায়। একটু পরে অবশ্য স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর কারণ হল শুধু জলের সারফেস টেনশন বা পৃষ্ঠটান খুব বেশি হয়। শুধু জলের ফেনাগুলোর দেওয়াল খুব পাতলা হয় বলে দ্রুত ফেটে যায়। অন্যদিকে সাবানগোলা জলে সারফেস টেনশন খুব কম। সাধারণ জলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তাই সাবান জলের অণুগুলোর চাপ বেশি থাকে না। দেওয়ালও অপেক্ষাকৃত মোটা হওয়ায় এটি অনেকক্ষণ একই অবস্থায় থাকতে পারে।


আমাদের দুটো চোখ কেন?


আমাদের দুটো চোখের একটা হাত দিয়ে ঢেকে অন্য চোখ দিয়ে আমরা দিব্যি দেখতে পাই। তাহলে দুটো চোখ কেন? আমাদের চোখ দুটোকে দুটো ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করা যায়। দুটো চোখই একই বস্তুর ছবি তোলে, তবে দু-রকমভাবে। সেই ছবি মস্তিষ্কে গিয়ে মিক্সিং হওয়ার পর তা আমরা ত্রি-মাত্রিক (থ্রি-ডি) আকারে দেখতে পাই। একটা চোখ থাকলে আমরা দেখতে পেতাম ঠিকই, তবে তা হত সিনেমার পর্দায় ছবি বা ক্যামেরায় তোলা স্টিল ফটো অথবা আঁকা ছবি দেখার মতো। অর্থাৎ ছবির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বুঝতে পারলেও গভীরতা বুঝতে পারতাম না। ছবিগুলো হত দ্বি-মাত্রিক। ফলে কোনো কিছু ধরতে গেলে তার সঠিক অবস্থান বুঝতে আমাদের অসুবিধা হত। এছাড়াও কোনো বৃহত্তর ক্ষেত্রের ছবি তোলার সময় যেমন ক্যামেরায় ওয়াইড লেন্স (wide lens) ব্যবহার করা হয় আমাদের দুটো চোখ সেই কাজটাও করে। আমাদের একটা চোখ থাকলে দৃষ্টিশক্তিযুক্ত ক্ষেত্র হত ১৫০ ডিগ্রির কাছাকাছি। দুটো চোখ থাকায় তা হয় ১৮০ ডিগ্রির মতো।


দৌড়বিদ বা খেলোয়াড়দের জুতোর ফিতে আচমকা খুলে যায় কেন?



খেলার মাঠে মাঝে মাঝেই খেলোয়াড়দের জুতোর ফিতে ঠিক করতে দেখা যায়। শক্ত করে বাঁধা সত্ত্বেও কিছুক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করার পর জুতোর ফিতের গিঁট আলগা হয়ে যায়। এই ঘটনা সাধারণ মানুষকে তেমন না ভাবালেও বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলল। গিঁট আলগা হয়ে হঠাৎ করে জুতোর ফিতে খুলে যাবার কারণ অনুসন্ধানে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বার্কলে)  মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক অলিভার ও’রেইলি পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করে দেন। তিনি একজন দৌড়বিদকে জুতো পায়ে ট্রেডমিল-এ দৌড়াতে বলেন। প্রথমদিকে কিছু না হলেও কিছু সময় পর হঠাৎ করে নিজে থেকেই জুতোর ফিতে খুলে গেল। অনেকের মনে হতে পারে এই ঘটনার পিছনে রয়েছে দৌড়ানোর সময়ে দৌড়বিদের পায়ের সংকোচন ও প্রসারণ।

অধ্যাপক অলিভার ও’রেইলি এত সহজ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি এক্সেলেরোমিটারের সাহায্যে জুতোর উপর মহাকর্ষীয় বল পরিমাপ করতে গিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ করলেন যে দৌড়ানোর সময় দৌড়বিদের জুতোর ফিতের গিঁটের উপর ৭ জি-এরও বেশি মহাকর্ষীয় বল প্রয়োগ হচ্ছিল। এই মহাশক্তিশালী বলের প্রভাবে একসময় ফিতের গিঁট আলগা হয়ে যায়। এছাড়াও দৌড়ানোর সময় ফিতের মুক্ত প্রান্ত দুটি বার বার উপরে-নীচে এবং সামনে-পিছনে আন্দোলিত হতে থাকে। এর ফলে মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে মুক্ত প্রান্তে একধরনের গতির সৃষ্টি হয়। এই গতির প্রভাবে মুক্ত প্রান্ত দুটিতে যে টান পড়ে অর্থাৎ বহির্মুখী বল ক্রিয়া করে তাতে ফিতের গিঁট খুলে যায়।


মশা মারা সহজ, কিন্তু মাছি মারা কঠিন কেন?



মশা মারার চেয়ে মাছি মারা যে কঠিন কাজ সেটা অনেকের জানা আছে। কিন্তু জানা নেই সহজে মাছি মারতে না পারার রহস্যটি। বিজ্ঞানীদের মতে এই রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে মাছির চোখে। কিন্তু কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে জানতে হবে চোখ ও মস্তিষ্কের মেলবন্ধনে কীভাবে ছবি সৃষ্টি হয় এবং আমরা দেখতে পাই। আমাদের চোখ প্রতি সেকেন্ডে ৬০টি স্থির ছবি মস্তিষ্কে পাঠায়। মস্তিষ্ক সেগুলোকে একত্র করে আমাদের চলমান দুনিয়া দেখায়। মাছির চোখ এ ব্যাপারে আমাদের থেকে অনেকটা এগিয়ে। তারা একসঙ্গে ২৫০টি অর্থাৎ প্রায় চার গুণ বেশি ছবি মস্তিষ্কে পাঠাতে পারে। মাছির মস্তিষ্ক যখন সেগুলোকে একত্র করে চলমান করে তোলে তখন সে আমাদের তুলনায় সবকিছু ধীর গতিতে দেখে, যাকে আমরা স্লো মোশন বলি।

যখন আমরা কোনো মাছিকে মারতে যাই তখন আমরা যে গতিতে চাপড় মারি মাছি সেটা দেখে চার ভাগের এক ভাগ গতিতে। ফলে আঘাত করার অনেক আগেই সে উড়ে যেতে পারে। এছাড়াও মস্তিষ্কে আসা ছবিগুলো মাছি আমাদের চেয়ে সাত গুণ দ্রুত গতিতে প্রসেস করতে পারে। তাই, কী দেখছি বুঝতে আমাদের যা সময় লাগে মাছির লাগে সাত ভাগের এক ভাগ সময়। আবার মাছির দৃষ্টিশক্তির ব্যাপ্তি আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি পিছনেও তারা দেখতে পায়। তাই চুপি চুপি এগিয়ে গিয়ে শেষ কাজটি করার আগেই সেকেন্ডে ২০০ বার ডানা ঝাপটিয়ে তারা পালিয়ে যায়। মাছির এই বিশেষ ক্ষমতা মশার নেই। তাই তারা অনেক সময়েই পালাতে পারে না। এই কারণেই মশার চেয়ে মাছি মারা অনেক বেশি কঠিন।

(চলবে)


No comments:

Post a Comment